ডিসেম্বর কুড়ি : ফয়জুল ইসলাম

ডিসেম্বরের কুড়ির সকালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ক্যাম্পাসের মূল গেট দিয়ে টমটমটা ভেতরে ঢুকতেই মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে চোখ যায় কলেজের জীববিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল ফাত্তাহ এবং তার স্ত্রীÑগুলনার বানুর। নরম রোদ ফেটে পড়া বিশাল মাঠটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, রাধানগর মজুমদার একাডেমির গা ঘেঁষে, দাঁড়িয়ে থাকা বাসাটা পুড়ে গেছে, মানে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছেÑ পুড়িয়ে দিয়েছে বিজিত পাকিস্তানি সৈন্যরা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়টায় কলেজের হোস্টেল-সুপারের জন্য নির্ধারিত এই কোয়ার্টারেই তারা থাকত।  

কালো কালো ছাইয়ের মস্ত বড় সব ছোপ পড়ে থাকা বাসাটার দিকে দূর থেকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মুখে শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদতে বসে গুলনার বানু। অস্ফুট স্বরে সে তার স্বামী আবুল ফাত্তাহকে বলে, ‘খাটপালঙ্ক পুইড়া গেলে ঘুমাব কই?’

এই ধরনের কিছু বিপদ আসতে পারেÑ এ কথা যে আবুল ফাত্তাহ এবং গুলনার বানুর মাথায় একেবারেই আসেনি তা নয়, এসেছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর ষোলতে দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে ফেল্লে তারা যুদ্ধপরবর্তী নানা বিপদের সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ করেছিল বটে। পাবনা শহরের উপকণ্ঠের আরিপপুরে একই কলেজের সহকারী অধ্যাপক আসাদুন্নবির বাসায় তখনও আশ্রয়ে ছিল তারা। এপ্রিলের দশে যখন পাকিস্তানি আর্মি নগরবাড়ি ঘাটের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয় তখন পাবনারই মানুষ আসাদুন্নবি উৎকণ্ঠিত হয়ে তাদের বাসায় এসেছিল। আবুল ফাত্তাহকে সে বুঝিয়েছিল যে এই বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে আবুল ফাত্তাহরা যেন কোনোভাবেই ভুয়াপুরে তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা না করে। পাবনা শহর থেকে ভুয়াপুর পর্যন্ত দীর্ঘ পথের কোথাও না কোথাও তারা দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যদের সামনে পড়বেই! তখন জান চলে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়। আসাদুন্নবির এই জোরালো যুক্তির মুখে ভুয়াপরে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছিল তারা। তারপর আসাদুন্নবি আবুল ফাত্তাহকে সপরিবারে নিয়ে গিয়েছিল শহরতলিতে আসাদুন্নবিদের মূল বাড়িতে থাকার জন্য।  সেখানে আশ্রয় নেওয়ার তিন দিন পরেই বোঝা গিয়েছিল, আরিপপুরের মতো একটা শহরতলিও নিরাপদ নয়। খবর এসেছিল যে সহসাই আরিপপুর আক্রমণ করবে পাকিস্তানি সৈন্যরা, করেও ছিল তাইই। তার ঠিক আগ দিয়েই আসাদুন্নবিদের সাথে আরিপপুর থেকে মাইল চারেক দক্ষিণ-পশ্চিমের দোগাছিতে পালিয়ে গিয়েছিল আবুল ফাত্তাহরা, সেখান থেকে ক’দিন বাদেই বনাইনগর ফরিদপুরের মৌদে।

আসাদুন্নবির গ্রামের বাড়িতে বসে গুলনার বানুকে ডিসেম্বরের ষোলতেÑ এখন থেকে তিন দিন আগেÑ বলেছিল আবুল ফাত্তাহ, ‘শহরে যে ফিরা যাবা, গিয়া কী দেখবা তা আল্লাই জানে! পাকিস্তানি সৈন্যরা নাকি এপ্রিল মাসেই কামান মাইরা গুঁড়াইয়া দিছে এডওয়ার্ড কলেজের শহিদ মিনার; আত্মসমর্পণের পর দিয়া পুড়ায়া দিছে কলেজের বিল্ডিংগুলা। আমরা হোস্টেল-সুপারের যে বাসাটায় থাকতাম তার যে কী হাল হইছে তা কেডায় কইব! হয়তো আগুন দিয়া নাশ করছে সেইটাও!’

আবুল ফাত্তাহকে ভরসা দিতে গুলনার বানু বলেছিল, ‘সারা দেশটাকেই তো শ্মশান বানাইছে পাকিস্তানি সৈন্যরা! তবুও যাইগা, চল। আসাদ ভাইয়ের বাসায় তো নয় মাস আশ্রিত থাকলাম। উনাদের আর কত অত্যাচার করা যাইব?’

এসব কথা অবশ্য ঠিকই কানে গিয়েছিল আসাদুন্নবির। আসাদুন্নবি তখন তাদের অভয় দিয়েছিল এই বলে, ‘এত তাড়ার কী আছে? সপ্তাহ দুয়েক পরেই শহরে যান ভাবি! আবুল ফাত্তাহ আগে কলেজপাড়ায় যাক; বাসাটা দেখুক; পয়পরিষ্কার করার থাকলে, করুক। আর দেখেন ভাবি, গতকালÑআঠারো ডিসেম্বরেও নুরপুরে ডাকবাংলোর আশপাশে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ হয়েছে! খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলছে এখনও কোথাও কোথাও! এখন ফিরে যাওয়াটা কি নিরাপদ হবে, বলেন?’

সজ্জন আসাদুন্নবিকে আশ্বস্ত করতে গুলনার বানু তখন বলেছিল, ‘নাহ্ ভাই! আমরা যাই গিয়া! পরিস্থিতি যা হবে তা সামাল দিবেন। নুরপুরের যুদ্ধ তো থাইমাই গেছে, আত্মসমর্পণ কইরা ঢাকায় চইলাও গেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। এখন আর ভয়ের কিছু নাই। আর এইটাও তো ঠিক যে গেল নয় মাস যাবৎ আপনেদের ঝামেলাই বাড়াইছি ভাইÑ আপনেদের আশ্রয়ে থাকছি, খাইছি, পাবনার প্রত্যন্ত এলাকাগুলায় পলায়া বেড়াইছি সেই আপনেদের সাথেই! আর কত তকলিফ দিব আপনেদেরে?’

হাসতে হাসতে গুলনার বানুকে বলেছিল আসাদুন্নবী, ‘কী যে বলেন না ভাবি! আপনারা কি আমার দূরের মানুষ? ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আবুল ফাত্তাহ আর আমি একই হাউজে থেকেছি দীর্ঘদিন। তখন থেকে আবুল ফাত্তাহ আমার অনেক দুর্দিনের বন্ধু। বিপদে যদি বন্ধুর পাশেই দাঁড়াতে না-পারলাম তবে কি আর চলবে? একে অপরকে সাহায্য না-করলে অবরুদ্ধ এই নয় মাস আমরা সকলেই কি আর উতরে যেতে পারতাম, জানে বেঁচে থাকতে পারতাম, বলেন?’

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে তাদের পুড়ে যাওয়া কোয়ার্টারটা দেখে গুলনার বানুর জড়ো করে আনা সেই সমস্ত মনোবল শেষতক ভেঙে চুড়চুড় হয়ে গেল। কলেজগেট থেকে টমটমটা যখন বিধ্বস্ত বাসাটার দিকে মাঠের কোনাকুনি ছুটল তখন টমটমের পিছু নিল চার-পাঁচটা বেওয়ারিশ কুকুর। বিস্ফারিত চোখে পুড়ে যাওয়া বাসাটার দিকে তাকিয়ে থাকা গুলনার বানু কাঁদতে কাঁদতে উচ্চারণ করল দ্বিতীয় বাক্যটা, ‘হায় আল্লাহ! এই দুধের বাচ্চাকাচ্চা নিয়া কোথায় থাকব এখন?’ 

আবুল ফাত্তাহ এর ভেতরেই বুঝে নিয়েছে, এই ধ্বংসস্তূপেই তাদের থাকতে হবে। আত্মীয়স্বজনহীন এই শহরে আর কোথাও তাদের থাকার জায়গা নেই। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, এডওয়ার্ড কলেজে শিক্ষকতার সূত্রে মুক্তিযুদ্ধের দু’বছর মতো আগে ভুয়াপুরের ঘাটান্দির আবুল ফাত্তাহ এই ছোট্ট শহরে এসেছিল, তার সহগামী হয়েছিল টাঙ্গাইল শহরের আকুরটাকুরপাড়ার গুলনার বানু। এর আগে আবুল ফাত্তাহ প্রভাষক হিসেবে চাকরি করেছিল ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে। কাজেই এই পাবনা শহরটা তার কাছে প্রবাস ছাড়া আর কী? এখানে হোস্টেল-সুপারের বাসা ছাড়া আর কোথায়ইবা যাবে তারা? আর যাইই হোক না কেন, এই মুহূর্তে ভুয়াপুর বা টাঙ্গাইল শহরে চলে যাওয়াটাও সম্ভব নয়। যুদ্ধের কারণে সড়ক যোগাযোগ ধসে পড়েছে সারাদেশেই। বাসটাস চল্লেই বরঞ্চ ভালো ছিলÑ কিছু দিনের জন্য তিন বাচ্চাসহ গুলনার বানুকে রেখে আসা যেত টাঙ্গাইলের কোথাও, বিধ্বস্ত বাসাটাকে গোছগাছ করার পরে ফিরিয়ে আনা যেত তাদের। আপাতত সেটা আর হচ্ছে না। অবশ্য এটাও ঠিক যে ভুয়াপুরের ঘাটান্দিতে আবুল ফাত্তাহদের গ্রামের বাড়ি অথবা আকুরটাকুরপাড়ায় গুলনার বানুদের বাড়ি আদৌ অক্ষত আছে কিনা তাইই বা কে বলবে?

টমটমটা যখন কোনাকুনিভাবে কলেজের বিশাল মাঠটা পার হচ্ছে তখন মাঠের উত্তরে, কলেজের মূল বিল্ডিংয়ের সামনে, ভেঙে পড়া শহিদ মিনারটার দিকে তাকিয়ে এসবই ভাবছিল আবুল ফাত্তাহ। সে দেখতে পাচ্ছিল, দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যরা সত্যিই কামান দাগিয়ে কলেজের মস্ত বড় শহিদ মিনারটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে; পুড়িয়ে দিয়েছে মূল বিল্ডিং, কলেজের হোস্টেল এবং তরুণ শিক্ষকদের কোয়ার্টারটা। প্রত্যক্ষদর্শী তবে ভুল কোনো সংবাদ দেয়নি তাদের! এখন দেখা যাচ্ছে, তাদের বাসাটাও ধ্বংসের থাবা থেকে বাঁচেনি যেটা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর কোনো ধারণা ছিল না! আবুল ফাত্তাহ ভাবে: কী হবে এবার? এই ধ্বংসস্তূপের ভেতরে তারা কীভাবে থাকবে?

উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত পড়ো বাসাটার সামনে টমটমটা পৌঁছালে কাঠপোড়া উৎকট একটা গন্ধ ছুটে এসে তাদের নাকে সজোরে বাড়ি দেয়। তখন দেখা যায়, আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে আছে দৃশ্যমান তিনটা জানালার ফ্রেম; মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে আছে জানালাগুলোর পুড়ে যাওয়া লোহার শিক; কোথাও জানালার পাল্লা খুলে পড়ে গেছে ভেতরের দিকে, ফ্রেমের সাথে বিধ্বস্ত পাল্লা ঝুলছে কোথাও কোথাও। সদর দরোজাটা যে কেন পোড়ানো হয়নি তা আর তাদের মাথায় আসে না। আর বাসায় যদি আগুনই দেওয়া হলো তবে দরোজায় তালা এলো কোথা থেকে? কীভাবে ভেতরে ঢোকা যাবে এখন?

টমটম থেকে মাঝারি একটা চামড়ার বিবর্ণ স্যুটকেস আর শাড়ির একটা গাঁটরি নামাতে নামাতে গুলনার বানুর দিকে তাকিয়ে আবুল ফাত্তাহ বলে, ‘তোমরা না-হয় বারান্দায় গিয়া বসগা। তালা ভাঙতে হইব। তার আগে তো আর ভিতরে ঢোকা যাইব না।’

গুলনার বানুর পরিকল্পনাটা অবশ্য অন্য রকম। সে বলে, পেছনের দরোজাটা যদি খোলা থাকে তবে তো আর বাইরের দরোজার তালাটা না-ভাঙলেও চলছে আপাতত। এমন তো হতেই পারে যে ভেতরের বারান্দার সাথে ঘরগুলোতে ঢোকার যে দরোজাগুলো আছে সেগুলো খোলা! এই যুক্তিতে গুলনার বানু বাসাটার দক্ষিণ দিক দিয়ে পেছনের দরোজা অভিমুখে রওনা দেয়। তার পিছে পিছে পায়ে পায়ে হাঁটে তাদের তিন সন্তানÑসাত বছরের ফারাজ, ছয় বছরের আজমেরি এবং চার বছরের ইসরার। একটু এগিয়ে গুলনার বানু দেখতে পায়, হাতের বামে একতলা বাসাটার ছাদে ওঠার লোহার সিঁড়ির নিচে পড়ে আছে বড় বড় দু’টা বেলচা, খাকি রঙের একটা বড় রুকস্যাক আর থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের কিছু গুলির খোল। আরেকটু এগিয়ে সে দেখতে পায়, হাতের বামেই বাসায় ঢোকার পেছনের দরোজাটাও বন্ধ। দরোজাটার মুখে বসে আছে বা ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে বেওয়ারিশ কুকুরগুলো। তাদেরও চোখ দরোজাটার দিকেই। ব্যর্থ মনোরথে বাসার সামনের অংশে ফিরে যেতে যেতে গুলনার বানুর চোখে পড়ে, উঁচু দেয়ালের ওপারের রাধানগর মজুমদার একাডেমি নামের স্কুলটার দোতলার ক্লাসরুমগুলো আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে।

গুলনার বানুরা যখন বাসাটার সামনের অংশে ফিরে যায় ততক্ষণে টমটমওয়ালাকে ভাড়া বুঝিয়ে দিয়ে বারান্দায় বসে আছে ক্লান্ত আবুল ফাত্তাহ। কাঠ পোড়া গন্ধের ভেতরে গুলনার বানু তার পাশে বসে পড়ে তাকে বলে, ‘টমটমের ভাড়া কমানো গেল না?’

‘নাহ্! এই দুর্দিনে ছাক্কা দশ ট্যাকা চইলা গেলগা! আরিপপুর থিকা টমটমে এখান পর্যন্ত দশ মাইল মতো পথের ভাড়া কি এত দেওনের কথা আছাল?’

‘হাতি প্যাকে পড়লে কী আর করা যাইব, কও! ভাগ্যি ভালো যে আসাদুন্নবি ভাই একশো ট্যাকা কর্জ দিছিলেন! তা না-হইলে তো টমটমের ভাড়াও দিতে পারতা না তুমি!’

‘সেইটা ঠিক। সেই জুন মাসে পাকিস্তান সরকার যে কাজে যোগ দিতে বলছিল সেইটা করলে অন্তত আজকে এই অর্থকষ্টটা হইত না!’

‘হ্যাঁ! মরতে জয়েন করতা তুমি! কাজে যোগ দিয়ার পরে কত সরকারি কর্মকর্তারে তুইলা নিয়া গিয়া খুন করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা, রাজাকার-আলবদররা! ভালো হইত নাকি সেইটা?’

‘তা হইত না! কিন্তু এই নয় মাসে শালার সব সঞ্চয় তো শেষ হইলই উল্টা ধারদেনা হইল আসাদুন্নবি ভাইয়ের কাছে!’

‘বেতন পাইলে পয়লাতেই ধার শোধ কইরা দিওনে।’

‘আর বেতন! কোষাগারের সব ট্যাকা লুট করছে মাদারচোত পাকিরা! বেতন আসব কই থেইকা?’

‘টাকাপয়সার ধার তো শোধ করতে পারবা কিন্তু আসাদুন্নবি ভাই আমাদের জন্যে গেল নয় মাসে যা করছেন সেই ঋণ তো কখনোই শোধ করতে পারবা না! ’

‘তা ঠিকই বলছ তুমি!’

ফারাজ, আজমেরি আর ইসরার নামের তিনজন শিশু অনেকদিন পরে পরিচিত খোলা মাঠটা পেয়ে ছোঁয়াছুঁই খেলতে শুরু করেছে। এখন বড়রা আর কেউ তাদের বলবে না: খরবদার বাইরে যাবা না! চারদিকে নজর রাখতাছে রাজাকারদের দল! শিশুরাও আর জিজ্ঞাসা করবে না কাউকে, হয়তো বা তাদের মা’কেই: আম্মু! রাজাকার মানে কী? এর উত্তরে তাদের অসহিষ্ণু মা তাদের বলবে না: তোমাদের অতশত বুঝা লাগবে না! এই উঠানে বইসা বইসা খেলগা, যাও!

বাসার প্রবেশমুখের বারান্দায় বসে কীভাবে তালা খোলা যাবে তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তিতই হচ্ছিল আবুল ফাত্তাহ আর গুলনার বানু। তখন মাঠের পশ্চিমে এল-শেপের কলেজ-হোস্টেলটার দিকে ফের চোখ পড়ে যায় তাদের। দূর থেকেই দেখা যায়, পুড়ে গেছে হোস্টেলের বেশিরভাগ রুম। অর্থাৎ পাকিস্তানি আর্মিরা আত্মসমর্পণের পরে রাগে- জেদে অঙ্গার করেছে হোস্টেলের রুমগুলোও।

‘দেখলা, কী করছে হারামি পাকিস্তানি সোলজাররা?’ ক্ষিপ্ত হয়ে আবুল ফাত্তাহকে বলে গুলনার বানু।

‘বদমাশ রাজাকাররাও তো আগুন দিতে পারে! বুঝতে পারতাছি না!’

‘ওগো সব কয়টারে না শুলে চড়ানো উচিত ছিল!’

‘পাকিস্তানি সোলজাররা এখন প্রিজনার অফ দ্যা ওয়ার! হু-হু! আর কিছুই করতে পারবা না তাগোরে! সারেন্ডার করার আগেই লাইনে খাড়া কইরা ব্যাটাদেরকে ব্রাশ ফায়ার কইরা মাইরা হালানোর দরকার ছিল, রাজাকারগুলারেও, যেইটা তারা আমাদের উপরে করছে নয় মাস ধইরা!’

‘এখন তাগো আর যুদ্ধ করতে হইতাছে না। দুইদিন পরে পাইক্যা সোলজারগুলা নিজেগো দেশেও ফিরা যাইবনে!  দেখ গিয়া, তারা এখন মনের সুখে মুরগির মুসাল্লাম খাইতাছে!’

এসব আলোচনার ফাঁকে আবুল ফাত্তাহ বারান্দা থেকে উঠে গিয়ে পাশের বাগান থেকে একটা আস্ত ইট নিয়ে আসে। ইট দিয়ে সে জোরসে বাড়ি বসাতে থাকে বাইরের দরোজায় লাগানো বিশাল তালাটায়। তালাটা এতই শক্ত যে ইটটাই ভেঙে যায় মাঝে থেকে! হতাশ হয়ে বারান্দায় এসে বসে সে গুলনার বানুকে বলে, ‘কী আর করা! তালা খুলনেওয়ালা কাউরে খুঁজতে যাইতে হইব এখন! কী আর করব! কিন্তু দোকানপাট তো কিছুই খোলে নাই অহনতরি!’

‘হাসান আলি, বাবু বা রমজান মিয়াÑ হোস্টেলের এসব কর্মচারী ফেরত আসছে নেকি? গিয়া দেখবা নেকি একটু! ওগো কাছে তো হাতুড়ি-শাবল থাকে। আর ওরা তো লোকাল বইলা মিসতিরিটিসতিরিও চেনে ভালো।’

‘যাইতেছি। খাড়াও। একটা সিগারেট টাইনা নেই আগে।’

আবুল ফাত্তাহ তার পকেট থেকে কে-টু সিগারেটের একটা তোবড়ানো প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরায়। তখনই দেখা যায়, হোস্টেলের দিক থেকে মাঠ ভেঙে দৌড়ে এদিকে আসছে বাবুÑ হোস্টেলের কিশোর-পিওন, কলেজ-ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরের নুরপুরে যার বাসা।

বাবু তাদের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘স্যার! আপনেরা আইসবেন আইজÑ এই সুংবাদডা তো আমাক কেউ দেয় নেই! তালি পরে আমি এহেনেই খাড়া থাইকতেম!’ এই বলে হাতের চাবির ছড়া থেকে একটা চাবি নির্দিষ্ট করে সদর দরোজার তালাটা খুলে ফেলে বাবু। সাথে সাথেই পোড়া গন্ধটা এসে আরও জোরে আছড়ে পড়ে আবুল ফাত্তাহ আর গুলনার বানুর নাকে। কী বিচ্ছিরি গন্ধ, কতই না পরিচিতÑ নয় মাসের বেঁচে থাকার সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বীভৎস সেই গন্ধটাÑমানুষের লাশ পচা গন্ধের চাইতে আলাদা অবশ্য! আজ সকালে আরিপপুর থেকে শহরে আসার পথে মেথরপট্টির মোড়ে এই পোড়া গন্ধটাই তারা পেয়েছিল, গন্ধটা তীব্র হয়েছিল কালাচাঁদপাড়ার বিধ্বস্ত বাড়িগুলো এবং দইবাজারের দোকানগুলোর সার পার হওয়ার সময়। 

পোড়া গন্ধটা এতই সর্বগ্রাসী, এতই ভয়ংকর যে, নিজেদের বাসায় ঢুকতে অস্বস্তিই বোধ করে গুলনার বানু এবং আবুল ফাত্তাহ। তাদের মনে পড়ে, মে মাসে আসাদুন্নবিদের সাথে দোগাছি থেকে মৃত্যুভয়ে পালিয়ে বনাইনগর ফরিদপুর যাওয়ার পথে শিবপুর বাজারে তারা এমন বীভৎস পোড়া গন্ধ পেয়েছিল। শিবপুর বাজারের পাশের একটা বিধ্বস্ত বাসার সামনে তারা থামিয়েছিল তাদের মোষের গাড়ি। বাসাটার বারান্দায় বসে তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল ক্ষণিকের জন্য। কাছেধারের কোনো বাজারের দিক থেকে শোনা যাচ্ছিল মেশিনগানের গুলির আওয়াজ। বোঝা যাচ্ছিল, কচুকাটা হচ্ছে মানুষজন। সে কারণে ভীষণ আতঙ্ক জেগেছিল তাদের সকলের মনে। তখন শিবপুর বাজারে এমন তীব্র একটা পোড়া গন্ধ পেয়েছিল তারা। তার ঠিক একদিন আগেই শিবপুর বাজারে রেইড করেছিল পাকিস্তানি সৈন্যদল এবং রাজাকাররা। বাজার পুড়িয়েছিল তারা; খুন করেছিল নিরীহ দোকানদার আর সদাই করতে আসা মানুষজনদের। কাঠ, বাঁশ, টিন, মালামাল ইতাদি পোড়া গন্ধটা তাই সর্বত্র ভাসছিল তখন। তেমনই একটা কদর্য গন্ধ নাকে এসে হামলে পড়লে বাসায় ঢোকার মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে গুলনার বানু এবং আবুল ফাত্তাহ।

অভিজ্ঞতা থেকে গুলনার বানু এবং আবুল ফাত্তাহর ধারণা হয়, বড় জোর দিনদুয়েক আগে আগুন দেওয়া হয়েছে তাদের এই বাসাটায়।

সদর দরোজায় দাঁড়িয়ে থাকা বাবুকে জিজ্ঞাসা করে দুশ্চিন্তিত গুলনার বানু, ‘খাটটাট পুড়তে কিছু বাকি আছে নেকিরে?’

‘নাহ্! বাকি নেই চাচি আম্মা! আপনের শুয়ার ঘরের আলমারি আর ট্রাঙ্কগুলা মালামালসুদ্ধা সব তো লুট হইছিলে আগেইÑ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি! শোয়ার ঘরের বড় খাট আর কাপুড়চুপুড়ও লুট হইছিলে তহন। মধ্যিখানের ঘরের বইগুলে, টিরাঙ্ক দুইখেন আর পেলেটবর্তন তহনই তুইলে লিয়ে গেছিলে তারা। বাসায় আর কাঠের জিনিসপত্তর যা পড়ে ছিলে তা সব এই যাত্রায় পুড়া দেছে পাঞ্জাবি আর খানেরা মিলে!’

‘বাসার মালপত্তর লুট করছিল কারা তা তুমি জান?’

‘পিস কমিটির মেম্বারগের লোকজন। আর কিডা? উরা ছাড়া এই ইল্লতি কাম আর কিডা কইরবের যাবিনি, কন?’

বাবুর উত্তরের পরে চুপ হয়ে যায় গুলনার বানু।

বাসা থেকে ধেয়ে আসা উৎকট পোড়া গন্ধটার তীব্রতা কমানোর জন্য আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বাবুকে জিজ্ঞাসা করে আবুল ফাত্তাহ, ‘দরজায় তালা দিছলা তুমি?’

বাবুর ভাষ্যে জানা যায়, আঠারো তারিখে পাবনায় আত্মসমর্পণ করে ঢাকা-অভিমুখে রওনা দেওয়ার আগে পরাজয়ের ক্ষোভে বিজিত পাকিস্তানি সৈন্যরা পুড়িয়ে দিয়েছে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ ক্যাম্পাস, রাধানগর মজুমদার একাডেমি এবং নুরপুর ডাকবাংলো। সেই সাথে পুড়েছে হোস্টেল-সুপারের এই কোয়ার্টারটাও। অতিসম্প্রতি পাকিস্তানি আর্মি কলেজ-ক্যাম্পাসের এসব স্থাপনা এবং রাধানগর মজুমদার একাডেমির ক্লাসরুমগুলো  সৈন্যদের ব্যারাক হিসেবে ব্যবহার করেছে। নুরপুর ডাকবাংলোতে ছিল উঁচু র‌্যাঙ্কের অফিসারেরা। উনিশ তারিখে  হোস্টেলের পিওন বাবু হোস্টেল-সুপারের পড়ো কোয়ার্টারটায় ঢুকে টিউবওয়েল থেকে বালতিকে বালতি পানি টেনে এনে নিভিয়েছে অঙ্গার, তারপর হোস্টেলের  স্টোর থেকে একটা তালা নিয়ে এসে সে আটকে দিয়ে গেছে সদর দরোজাটা। 

পাবনা শহরের উপকণ্ঠের আরিপপুরে লুকিয়ে থাকার শেষদিনগুলোতে এমনটাই শুনেছিল আবুল ফাত্তাহরা: ডিসেম্বরের তিন তারিখে উত্তরবঙ্গের সীমান্তগুলো দিয়ে যৌথবাহিনী ঢুকে পড়লে উত্তরবঙ্গে মোতায়েন করা পাকিস্তানি বাহিনীর ১৬তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের বিভিন্ন ব্রিগেড এবং রেজিমেন্টের সৈন্যরা রাজধানী অভিমুখে রিট্রিট করতে শুরু করেছিল। তারপর তারা পাবনায় এসে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল এডওয়ার্ড কলেজ ক্যাম্পাস, রাধানগর মজুমদার একাডেমি এবং নুরপুর ডাকবাংলোতে। ষোল ডিসেম্বরে ঢাকায় যৌথবাহিনীর কাছে দখলদার পাকিস্তানি আর্মির ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার নিয়াজি আত্মসমর্পণ করলেও পাকিস্তানি সৈন্যদের উত্তরবঙ্গের ব্রিগেড এবং রেজিমেন্টগুলো যুদ্ধংদেহী অবস্থাতেই ছিল। ষোল থেকে শুরু করে আঠারো ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেকগুলো সম্মুখযুদ্ধে পাবনার মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পরাস্ত এবং নিরস্ত্র করে। পরাজিত হয়েও আবার তাদের গায়ের ঝাল এভাবে মেটাতে হলোÑ পাবনা শহরে তাদের সামনে যা পড়েছিল তা জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে? নয় মাস ধরে সারা বাংলাদেশে আগুন দিয়ে আর নির্বিচারে মানুষ খুন করেও আশ মেটেনি তাদের! কী আশ্চর্য!

‘কত বড় হারেহারামজাদা এই পাইক্যা সোলজারগুলাÑ দেখলা তুমি?’ রাগে গরগর করতে করতে গুলনার বানুকে বলে আবুল ফাত্তাহ।

সে কথার কোনো উত্তর না-দিয়ে সদর দরোজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাবুর সাথে বাসার ভেতরে ঢুকে যায় গুলনার বানু।  

সিগারেটটা বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এবার ধ্বংসস্তূপে পা রাখে আবুল ফাত্তাহ। চৌকাঠ পার হলেই বসার ঘর। আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে ডানের দেয়ালের কাছে বসানো বড় সেক্রেটারিয়েট-টেবিল আর তিনটা চেয়ার। তিনটা জানালা পুড়ে গিয়ে জানালাগুলোর কিয়দংশ কবজার সাথে ঝুলছে ভেতরের দিকে। ঘরটার দেয়ালগুলোতে জেগে আছে খাবলা খাবলা কালির ছোপ! পুড়ে যাওয়া দেয়াল থেকে চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে অজস্র গুলির চিহ্ন। মেঝের একাংশে জমে আছে ছাই গলা কাদা! উত্তরের দেয়ালের সাথে পড়ে আছে পাকিস্তানি সৈন্যদের ফেলে যাওয়া কিছু জিনিসপত্তরÑখাকি রঙের তিনটা রুকস্যাক, ছোট ছোট বেলচা ক’টা, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের অনেকগুলো তাজা গুলি, একটা রিভলবার, খাকি রঙের ইউনিফর্মের একটা জামা, একটা বেল্টÑখাকি রঙের, একপাটি কালো বুট, কর্ডসহ হুইসেল দু’টা, একটা নেইম প্লেট, সবুজ রঙের একটা ক্যাপ, গাঢ় সবুজ হেলমেট দুটা, খাকি রঙের চারটা গুলির পাউচ, একটা খাকি স্লিপিংপ্যাড এবং একটা ওয়ালেট। নিজেদের এসব মালসামানায় আর আগুন দেয়নি তারা! এ কারণে হাসি পায় আবুল ফাত্তাহর। রিভলবারটা পরখ করে সে দেখে, হাতিয়ারটার চেম্বারে কোনো গুলি নেই। নেইম প্লেটটা ক্যাপ্টেন পদবির কোনো সোলজারেরÑ নাম তার মকবুল। ওয়ালেটটা কার তা বোঝা যাচ্ছে না। ওয়ালেটের ভেতরে একটা পারিবারিক ছবি ভরা আছে। ছবিটার পেছনে লেখাÑমুলতান, পাঞ্জাব, ১৯৭০।

তীব্র ঘৃণায় ওয়ালেট, নেইম প্লেট এবং রিভলবারটা মেঝেতে ছুড়ে দিয়ে মাঝের ঘরটায় ঢোকে আবুল ফাত্তাহ। সেখানে পুড়ে যাওয়া পশ্চিমের জানালার ধারে দেয়াল বরাবর সিঙ্গেল চৌকিটাকে কয়লার গাদা ছাড়া আর কিছুই মনে করার অবকাশ নেই! দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় রাখা বইয়ের আলমারিটা পুড়ে গিয়ে, ধসে পড়ে আছে গভীর কালো ছোপ পড়ে থাকা দেয়ালের সাথে। কিন্তু সেখানে, ছাইগাদায়, আবুল ফাত্তাহ, গুলনার বানু, ফারাজ বা আজমেরির বইগুলোর কোনো চিহ্নই নেই। বাবু বলছিল, তাদের সংগ্রহের বইগুলো সব লুট হয়েছে এপ্রিল মাসেই। আরও অনেক কিছুই যে লুট হয়েছে তা এবার স্পষ্ট হচ্ছেÑএই ঘরের মিটসেফে রাখা ছিল কাচের প্লেট-বাটি-কাপ। সেইসব প্লেট-বাটি-কাপগুলো নেই। মিটসেফটা কেবল পুড়ে খাঁক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঘরটার পূর্ব কোনায়। আর সেখান থেকে উধাও হয়েছে সাজিয়ে রাখা মাঝের এই ঘরটায় ছিল দুটা বড় বড় ট্রাঙ্ক। একটা ট্রাঙ্কে রাখা ছিল তাদের শীতের কাপড়চোপড়। আরেকটাতে ছিল আবুল ফাত্তাহ আর গুলনার বানুর সার্টিফিকেট গুচ্ছ, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্তর, দুটা ফটো অ্যালবাম এবং বাচ্চাদের জন্য জমানো প্রগতি আর রাদুগা প্রকাশনের বই।  সেই ট্রাঙ্ক দু’টা চোখে পড়ছে না।     

কাঠকয়লার গন্ধটা এবার তীব্রতর হয়েছে বলে মাঝের ঘরে দাঁড়িয়ে ফের সিগারেট ধরায় আবুল ফাত্তাহ। সিগারেট টানতে টানতে মেঝেতে জমে থাকা ছাইগলা কাদার নদী পার হয়ে সে সর্ব-উত্তরের শোবার ঘরটায় যায়। সেখানে তাদের সেগুনকাঠের ডাবল খাটটা নেই। খাটটা লুট হয়েছে। সেখানে পড়ে আছে একটা সিঙ্গেল খাট। খাটটা যে হোস্টেলের কোনো রুম থেকে আনা হয়েছিল তা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। সিঙ্গেল খাটটা তো পুড়েছেই, সেই সাথে পুড়েছে পশ্চিম-দেয়ালের সাথে বসানো ওয়ারড্রোবটাও। ওয়ারড্রোবে যে কাপড়চোপড় নেই তা আগেই জানা  গেছে বাবুর কাছ থেকে। এই ঘরটায় আরও পুড়েছে তিনটা জানালাই। কবজা খুলে গিয়ে মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে দুটা জানালার পাল্লা। এ ঘরেও পুড়ে যাওয়া দেয়ালে অজস্র গুলি দাগিয়েছে পাকিস্তানি সৈন্যরা।

কাদায় মাখামাখি ধ্বংসস্তূপের মাঝে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় আবুল ফাত্তাহ। ভীষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগে তার শ্মশানে বহ্নিমান চিতা দেখলে যেমনটা মনে হয়Ñমনে হচ্ছে যেন পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে সে নিজেই, নিজের পোড়া মাংসের দুর্গন্ধ যেন আছড়ে পড়ছে নিজেরই নাকে, যেন পুড়ছে তার নিজের দু’পাÑ পা চলছে না তাই। ভেতরের বারান্দা থেকে গুলনার বানু যখন আবুল ফাত্তাহকে চিৎকার দিয়ে ডেকে বলেÑ ‘এই দেখে যাও তো এইদিকে!’ তখনও পা সরে না আবুল ফাত্তাহর। তারপর শরীরের সমস্ত জোর সংহত করে সে বারান্দায় পা রাখে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা গুলনার বানু বাসাটার দক্ষিণ পাশের দেয়ালটার দিকে আঙুল তুলে তখন তাকে বলে, ‘ঐখানে কাঁচা মাটির গর্ত একটা। গর্তটায় কী আছে দেখ তো!’

আবুল ফাত্তাহ দেখতে পায়, উঁকিঝুঁকি মেরে গর্তটা পরখ করছে বাবু।

দু’গজ বাই একগজ মতো মাপের গর্তটার কাছে যেতেই হিম হয়ে যায় আবুল ফাত্তাহর বুক। কাঁচা মাটি ভেদ করে জেগে আছে কোনো মানুষের হাতের কনুইয়ের সামান্য নিশানা! কনুইটা মাটিতে মাখামাখি হয়ে আছে। আর নাকে এসে লাগছে মাংস পচা একটা দুর্গন্ধ, সামান্য মাত্রায় হলেও। এখানেও? এখানেও পুঁতে রাখা হয়েছে এ দেশের মানুষের লাশ? বাবুর মাপজোকের ফলাফলও সেটাই বলছে। মুখের রেখায় কোনো ভাবান্তর ছাড়াই বাবু তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কী করব স্যার? লাশ টাইনে তোলব নেকি? তা-হলি তো ফের সেই গোর দিয়াই লাগবিনি! আরেকটু মাটি ফেলা সারে লাশের কনুইডা না-হয় ঢাকে দেই! কী কন?’

বাবুকে চোখের ইশারায় সেটাই করতে বলে আবুল ফাত্তাহ। আলোচনা দীর্ঘায়িত না-করে পাকিস্তানি সৈন্যদের ফেলে যাওয়া একটা বড় বেলচা দিয়ে কবরটার পাশ থেকে মাটি কেটে কেটে কবরে আরেক প্রস্থ মাটি ফেলতে লাগে বাবু।

ব্যাপারটা ঠিকই ধরতে পারে গুলনার বানু এবং বারান্দায় ঝপ করে বসে পড়ে সে সভয়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, ‘এই বাসায় আমি থাকতে পারব না!’

গুলনার বানুকে বোঝাতে বসে আবুল ফাত্তাহ: সারা বাংলাদেশই তো মস্ত বড় একটা কব্বরখানায় পরিণত হয়েছে! গণকবর কোথায় নেই, বল তো? মাঠেঘাটে, বাজারে, বিলে, ইটগাদায়, নদীর কিনারায়Ñ কোথায় মিশে যায়নি খুন হয়ে যাওয়া মানুষের লাশ? আর এই একটা কি দুটা কি তিনটা লাশ বাসার কোনায় পড়ে থাকলে কী আর হবে? বরংচ তাদের সম্মানের সাথে রেখে দেওয়াটাই কি ভালো নয়?

‘তা ঠিক। কিন্তু ভয়ে গা ছমছম করতাছে আমার! জানাজা তো আর দেওয়া হয় নাই!’ এই বলে চুপ হয়ে যায় গুলনার বানু। সেই সাথে স্তব্ধতা নামে পুরো পরিবেশটায়। গর্তটায় বাবুর মাটি ফেলার কর্মকাণ্ড মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে আবুল ফাত্তাহ।

গর্তটা ভরাট করা হয়ে গেলে বাবুকে ডাকে গুলনার বানু, ‘দেখ তো, ঝাঁটাটাটার ব্যবস্থা করা যাইব কিনা? ঘরদুয়ার তো পরিষ্কার করতে লাগব এখন!’

গুলনার বানুর কথা মতো হোস্টেলে ঝাঁটা খুঁজতে চলে যায় বাবু। তখন মাঠ থেকে খেলা শেষে ঘরে ঢোকে গুলনার বানু এবং আবুল ফাত্তাহর ঘর্মাক্ত তিন ছেলেমেয়ে। ঘরে কোথাও বসার বা শোয়ার জায়গা না-পেয়ে বারান্দার সিঁড়িতে বাবা-মা’র পাশে এসেই বসে পড়ে তারা। বড় ছেলেÑ ফারাজ তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমাদের বাসাটা পুড়ে গেছে কেন আব্বু?’ সে প্রশ্নের কোনো উত্তর করে না চিন্তিত আবুল ফাত্তাহ।

আজমেরির ক্ষিধে পেয়েছে। কাজেই রান্নাঘর থেকে ধুলায় ধূসরিত একটা বাটি উদ্ধার করে টিউবওয়েলের পানিতে বাটিটা ধুতে বসে গুলনার বানু। আবুল ফাত্তাহকে তখন গুলনার বানু বলে, ‘বিকালে একটু ছাইটাইয়ের ব্যবস্থা যদি করা যায় তয় ভালো হয়! চাল-ডাল-সবজি কিনতে বড় বাজারে যাওয়ার সময় দেইখ তো!’

ছাই বা সাবান ছাড়াই বাটিটা ধুয়ে এনে গাঁটরি থেকে যবের ছাতু বের করে গুলনার বানু এবং সে ছাতু মাখিয়ে খেতে দেয় তাদের সন্তানদের। আসার সময় আসাদুন্নবির স্ত্রী গমের ছাতু দিয়ে দিয়েছিল কিছু।

গুলনার বানুকে জিজ্ঞাসা করে আবুল ফাত্তাহ, ‘দুপুরে খাব কী?’

‘চিড়া ভিজায় দিমুনি। ভাবি চিড়া দিয়া দিছে জোর কইরা।’

যবের ছাতু খেতে খেতে তাদের বড় ছিলে ফারাজ আবুল ফাত্তাহকে বলে যে সারা বাসা খুঁজেও সে তার ট্রাইসাইকেলটা পাচ্ছে না। 

আবুল ফাত্তাহ ফারাজকে আশ্বস্ত করে এই বলে, ‘সাইকেল আর খুঁজতে হবে না তোমাকে। ঢাকায় গেলে নিউ মার্কেট থেকে তোমার জন্যে আরেকটা ট্রাইসাইকেল কিনে দিবনে।’

‘আর আমার খেলনা বন্দুকটাও তো পাচ্ছি না!’

‘ওকে। বন্দুকও কিনে দিবনে আরেকটা।’

‘কবে ঢাকায় যাব আমরা?’

‘মাস তিনেক পরে। একটু গুছায় নিই।’

‘কী গুছাইতে হবে আব্বু?’

‘তুমি বুঝবা না! খাও তো এখন।’ অসহিষ্ণু কণ্ঠে আবুল ফাত্তাহ তার ছেলে ফারাজকে জবাব দেয়।

তখন আবুল ফাত্তাহর ফের মনে পড়ে যায় তার বড় ভাইয়ের কথা। স্কুল টেক্সট বুক বোর্ডের উপ-পরিচালক তার বড় ভাইÑআবুল বাসেতÑ অপারেশন সার্চ লাইটের সময় ঢাকা শহরের আজিমপুরার কলোনিতে থাকত। তার সেই বড় ভাই সহিসালামতে আছে কি না তা সে জানে না। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের মারফত জানা গেছে, অপারেশন সার্চ লাইটের হত্যাযজ্ঞে পঁচিশে মার্চ থেকে সাতাশে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা শহরে খুন করেছে কমপক্ষে পনের হাজার নিরপরাধ মানুষকে। মার্চ-পরবর্তী সময়েও সেখানে নিরীহ মানুষ হত্যার অভিযান থেমে থাকেনি। এদিকে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরে রয়ে যাওয়া তার আব্বা-আম্মা বেঁচে আছে নাকি খুন হয়েছে পাকিস্তানি সৈন্য বা রাজাকারদের হাতে তাও তার কাছে পরিষ্কার নয়। টাঙ্গাইল শহরে গুলনার বানুদের বাসার মানুষজনদেরই বা কী হাল হয়েছে সে সম্পর্কেও কোনো খবর সংগ্রহ করতে পারেনি তারা। গেল নয় মাসে তাদের স্থির কোনো ঠিকানা থাকলে নিশ্চয় পরিবারের মানুষজনদের সাথে চিঠির আদানপ্রদান সম্ভব হতে পারত। তাই স্বগতোক্তি করে আবুল ফাত্তাহ, ‘কালকে একবার টাঙ্গাইল শহরে তোমার চাচতো ভাইয়ের বাসায় ট্রাঙ্ককল কইরা দেখমুনি। দেখি, তাগো সকলের কোনো খবরটবর পাওয়া যায় কিনা!’

‘জলদি আমি টাঙ্গাইল যাইতে চাই! আম্মা-আব্বা বাইচা আছে কিনা কে বলবে!’ এই বলে কাঁদতে বসে গুলনার বানু। অবরুদ্ধ ন’মাসে পরিবারের মানুষজনের কোনো খবর না-পেয়ে আশঙ্কায় সে এভাবে অনেক কেঁদেছে।

‘কালকে চাকরিতে যোগ দিব। বেতন কবে হইব তা জানি না। বেতন পাইলেই টাঙ্গাইল যামুনি। ততদিনে বাসটাস চলা শুরু করবে বইলা মনে হয়।’

একটু পরেই নারকেলের শলার ক্ষয়ে যাওয়া একটা ঝাঁটা, একটা ছেঁড়া ছালা আর একটা পুরনো তেলকাষ্টে মাদুর নিয়ে আসে বাবু। বারান্দার এক কোনায় ছোট মাদুরটার ওপরে বাচ্চাদের বসায় আবুল ফাত্তাহ। তাদের ছোট ছেলে ইসরার মাদুরে শুয়ে সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায়। বসার ঘর থেকে হেলমেট নিয়ে এসে মাথায় হেলমেট চড়ায় ফারাজ আর আজমেরি। বড় আকারের হেলমেটগুলো ঢলঢল করে শিশুদের মাথায়। তারপর তারা দু’জনে গুলির খোল আর রিভলবার নিয়ে মাদুরে বসে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলতে শুরু করে দেয়।

 শোয়ার ঘরটা আগে পরিষ্কার করতে নামে গুলনার বানু, আবুল ফাত্তাহ আর বাবু মিলে। প্রথমে পুড়ে যাওয়া সিঙ্গেল খাটটা বাবুর সাথে মিলে আলগাতে যায় আবুল ফাত্তাহ। অমনি খাটটা ভেঙে পড়ে মাথার দিক থেকে। বাবু খাটটার পা’র দিকের অংশটা টান দিলে ভেঙে পড়ে একটা পায়া। মেঝের সাথে বিশ্রি একটা কোণ তৈরি করে খাটটা পড়ে থাকে তখন। খাটের খণ্ডাংশ, কয়লা হয়ে যাওয়া ওয়ারড্রোব আর জানালার কবজা থেকে ভেঙে পড়া পাল্লাগুলো ধরাধরি করে উঠানের পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে ফেলে দিয়ে আসে আবুল ফাত্তাহ আর বাবু। তার মাঝে গুলনার বানু নিজের মুখে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে কাদাপানিতে ভর্তি ঘরটা শলা দিয়ে ঝাঁট দিতে শুরু করে দেয়। মাঝের ঘর আর বসার ঘরের পুড়ে যাওয়া, ভেঙে পড়া সব আসবাব তখন টেনে টেনে ওঠানের পূর্ব দিকের দেয়ালের সাথে জড়ো করা হয়। তারপর বাবু স্টোররুম থেকে পুরনো একটা বালতিতে করে নিয়ে আসে টিউবওয়েলের পানি। শোয়ার ঘরটায় পানি ঢেলে নিয়ে অবশিষ্ট কাদা দূর করার জন্য দু’বার ঘরটায় ঝাঁটা চালায় আবুল ফাত্তাহ এবং সে ফুল স্পিডে ছেড়ে দেয় সিলিংফ্যানটা। এর মাঝেই কাদায় মাখামাখি বাকি দুটা ঘর শলা দিয়ে ঝাঁট দেয় গুলনার বানু এবং বাবু। পাকিস্তানি সৈন্যদের ফেলে যাওয়া মালপত্তর তারা বারান্দার একপাশে জমা করে রাখে। তারা ভাবে, বাচ্চারা এসব দিয়ে খেললে খেলুক। থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের তাজা গুলিগুলো বাবুকে ফেলে দিতে বলে গুলনার বানু। বাবু তাই একটা রুকস্যাকে গুলিগুলো ভরে রুকস্যাকটার মুখ আটকে দেয়। হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার সময় বাবু রুকস্যাকটা নিয়ে যাবে কোথাও ফেলে দেওয়ার জন্য।

তারপর মাঝের ঘর আর বসার ঘরের মেঝেতে জমে থাকা অবশিষ্ট কাদা সরাতে বারবার পানি মেরে শলা দিয়ে মেঝে ঝাঁট দেয় আবুল ফাত্তাহ। এতে করে কাদার বেশিরভাগ অংশই ঘর থেকে ভাগানো যায়।

পানি কাঁচানোর জন্য ছেঁড়া ছালাটা দিয়ে ঘরগুলোর মেঝে মুছতে মুছতে বাবু বলে, ‘তিন-চাইর দিন ধরে সমানে ঘর ঝাঁট না-দিলি পরে এই কেদো যাবি নানে!’

আবুল ফাত্তাহ বাবুকে বলে, ‘হু! কালকে আবার ঘরদোর ঝাঁট দিবনে। আর দেয়ালের ওপরের কালিঝুলিও তুলা দরকার। সেইটা যে কীভাবে করব!’

‘ন্যাকড়া আর শিরিষকাগজ লিয়ে আসপনে স্যার!’ পথ বাতলায় বাবু।

আবুল ফাত্তাহ তখন দেখতে পায়, ঘরগুলো থেকে কিছু পানি আপনাতেই উঠানে গড়িয়ে পড়লেও এবড়োখেবড়ো বারান্দাটার বিভিন্ন জায়গা পানিতে ভরে উঠছে। এবার বারান্দাটা কাঁচানো প্রয়োজন। বাসাটার উত্তরের স্টোররুম আর রান্নাঘরের বারান্দায় তাই মাদুরটা বিছিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে সেখানে আশ্রয় নেয় গুলনার বানু। তারপর শলাটা দিয়ে ঝাঁট দিয়ে বারান্দায় জমতে থাকা পানি উঠানে ফেলে দেয় আবুল ফাত্তাহ। 

ঘরদোর পরিষ্কার করা হলে স্টোররুম আর রান্নাঘরের বারান্দায় গিয়ে বসে পড়ে ক্লান্ত আবুল ফাত্তাহ এবং বাবু। একটা সিগারেট ধরিয়ে বাবুকে জিজ্ঞাসা করে আবুল ফাত্তাহ, ‘মাঝের ঘর আর বসার ঘরের সিলিংফ্যান নাই। দেখছ তুমি?’

‘তা দেহিছি। লুট হয়ছে আরকি! শোয়ার ঘরে যেই সিলিংফ্যানটা চলতাছে সিডা কইল আগেরডা লয়। হোস্টেল থেন কেউ ফ্যানখেন খুলে লিয়ে আয়ছে।’ উত্তর দেয় বাবু।

‘যাই হোক, তুমি কি শোয়ার ঘরের সাথের বাথরুমটা একটু পরিষ্কার কইরা দিতে পারবা?’

শলা হাতে বাবু যখন বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠছে তখন তাকে জিজ্ঞাসা করে গুলনার বানু, ‘আচ্ছা! হাসান আলি কই? তারে তো দেখতেছি না!’

গুলনার বানুর এই প্রশ্নে থমকে দাঁড়ায় বাবু। সে যা বলে তা এমন: এপ্রিলের তেরতে আবুল ফাত্তাহদের আসাদুন্নবির পরিবারের সাথে আরিপপুর থেকে দোগাছি পৌঁছিয়ে দিয়ে হোস্টেলে ফেরত এসেছিল হাসান আলি। আবুল ফাত্তাহর পরামর্শমতো সে পরিকল্পনা করছিল ভুয়াপুরে তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য। সে ভাবছিল, সিরাজগঞ্জ হয়ে সে নৌকায় যমুনা পার দিয়ে নদীর পুবপারে কোথাও নামবে, তারপর হেঁটে বা টমটমে চেপে সে চলে যাবে ভুয়াপুর। পাবনা শহর থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত পথেঘাটে তখন ছড়ানো ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের অনেকগুলো চৌকি। শত্রুদের এতগুলো চোখ এড়িয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়াটা নিরাপদ মনে হচ্ছিল না তার কাছে। তাই সে সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারই মাঝে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে জুনের পয়লাতে হোস্টেল রেইড করেছিল রাজাকাররা। হোস্টেলে কোনো ছাত্র ছিল না স্বাভাবিকভাবেই। তবুও হুজ্জতি করেছিল রাজাকাররাÑ হোস্টেল তল্লাশি করেছিল তারা এবং কাউকে না-পেয়ে রাইফেলের কুঁদো দিয়ে তারা পিটিয়েছিল বৃদ্ধ কুক রমজান মিয়া আর তরুণ পিওন হাসান আলিকে। মারধরের পর রমজান মিয়াকে রেয়াত দিলেও তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল হাসান আলিকে। তারপর থেকে হাসান আলি নিখোঁজ। হাসান আলিকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে তা জানার জন্য নুরপুরের পরিচিত একজন রাজাকারকে ধরেছিল রমজান মিয়া; দশ টাকা ঘুষও দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও হাসান আলির কোনো হদিস বের করা যায়নি।

বাবুর দেওয়া তথ্য শোনার পরে স্তব্ধ হয়ে যায় আবুল ফাত্তাহ কেননা ভুয়াপুরে তার নিজ গ্রামÑ ঘাটান্দি থেকে এই হাসান আলিকে নিয়ে এসে এডওয়ার্ড কলেজের হোস্টেলে পিওনের কাজে লাগিয়েছিল সেইই। এখন হাসান আলির পরিবারকে সে কী জবাব দেবে? আর এমন কাছের একজন মানুষের কোনো ক্ষতি কি মেনে নেওয়া যায়? হয়তো তাকে খুন করেই ফেলেছে রাজাকাররা! তাই যদি হয় তবে এখন কোন গণকবরে খোঁজা যাবে হাসান আলির লাশ? হাসান আলি যদি তখন খুন হয়ে গিয়েই থাকে তবে এতদিন পরে কোনো গণকবরে পড়ে থাকা হাড্ডিগুড্ডি দেখে কীভাবে চেনা যাবে তাকে অথবা আলাদা করা যাবে আর সব মুর্দা থেকে? এসব ভাবতে ভাবতে ভীষণ অস্থির হয়ে পড়ে আবুল ফাত্তাহ এবং সে সিগারেট ধরিয়ে পায়চারি করতে থাকে উঠানময়।

দুপুর গড়িয়ে দেড়টা মতো বাজে। জাকিয়ে বসছে ডিসেম্বরের শীত। বাসায় কেরোসিনের কোনো স্টোভ বা মাটির চুলা নেই বলে এই বেলায় রান্না করাটা অসম্ভব হবে, বাচ্চাদের গোসলের জন্য পানিও গরম করা যাবে না। এ কারণে গুলনার বানুকে আবুল ফাত্তাহ বলে, আজ আর বাচ্চাদের গোসল করানোর দরকার নেই। তাই বাবু বাথরুম পরিষ্কার করে ফেলার পরে ঠান্ডা পনিতেই বাচ্চাদের গা ধুয়ে দেয় গুলনার বানু। তখনই তাদের ক্ষিধে লাগে হা-রে-রে করে। গুলনার বানু চিড়া ভেজাতে নামলে বাবু প্রস্তাব দেয়, ‘চাচি আম্মা! আমার কাছে চাইল রয়ছে খাইনটেক। আমি ভাত আর আলু ছ্যানা করে লিয়ে আসতিছি। কষ্টেশিষ্টে এই বেলাডা চালা দেন। বিকেলবেলায় আমি খাইনটেক বাজারসদাই করে লিয়ে আসপোনে।’

বাবুর এই প্রস্তাবে আবুল ফাত্তাহর প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে গুলনার বানু। আবুল ফাত্তাহর দিকে সে তাকায়। অস্বস্তি নিয়েই বাবুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় আবুল ফাত্তাহ। তবে সে বাবুকে বলে যে দুপুরের খাবার বাবদ যা খরচ হবে বাবুকে তা সে দিয়ে দেবে কড়াক্রান্তিতে। মৃদু হেসে হোস্টেলে চলে যায় বাবু। ছোট্ট ইসরার ক্ষিধেয় কান্নাকাটি শুরু করে দিলে তাকে চিড়া ভিজিয়ে দেয় গুলনার বানু। বাসায় চিনি নেই বলে নির্জলা চিড়া খেতে বসে আবারও কান্না লাগিয়ে দেয় ইসরার।

ঠান্ডা পানিতে কাঁপতে কাঁপতে পালা করে গোসল সারে আবুল ফাত্তাহ এবং গুলনার বানু। রোদে চুল শুকাতে বসে গুলনার বানু আবুল ফাত্তাহকে বলে যে বিকেলে অবশ্যই কিছু কেনাকাটা দরকারÑ চাল, ডাল, ডিম, লাল আটা, সবজি আর মাছ, যদি এসব আদৌ কিনতে পাওয়া যায়। বড় বাজারের দোকানপাট হয়তো এখনও খোলেইনি! এসবের সাথে সর্ষের তেল, পেঁয়াজ আর মরিচ তো কিনতে হবেই। নাজিরশাল পেলে ভালো। নয় মাস ধরে আমন আর আউশের চাল খেতে খেতে কড়া পড়ে গেছে পেটে! কেরোসিনের একটা স্টোভ কেনার কথা বলে আবুল ফাত্তাহ। তাতে একমত প্রকাশ করে না গুলনার বানু। তার যুক্তি : এই টানাটানির দিনে আর স্টোভ কিনে কাজ নেই। তাতে করে খসে যাবে দশ থেকে বার টাকা। তাই মাটিতে গর্ত খুঁড়ে ইটের ঝিঁক বানিয়েই আপাতত রান্নার কাজ চালিয়ে নেওয়াটা সম্ভব হবে। বাসার পেছনের আম-পেয়ারা-মেহগনি-সেগুনের ডাল আর পাতা পুড়িয়ে আগুন জ¦ালিয়ে নিলেই হলো। হ্যাঁ বা না কিছুই বলে না আবুল ফাত্তাহ। 

ছোট একটা পাতিলে ভাতের ওপরে আলু ভর্তা বসিয়ে নিয়ে এসেছে বাবু। আর বুদ্ধি করে হোস্টেলের স্টোর থেকে তিনটা কাচের প্লেটও নিয়ে এসেছে সে। এবার ক্ষুধার্ত তিনজন শিশুকে খাইয়ে দেয় গুলনার বানু। নির্জলা ভাত আর আলুভর্তা খেতে তারা কোনো আপত্তি জানায় না। বিগত ন’মাসে তারা খাওয়াদাওয়ার মান নিয়ে অভিযোগ জানাতে ভুলে গেছে। বাচ্চাদের খাওয়া হয়ে গেলে তারপর খেয়ে নেয় গুলনার বানু আর আবুল ফাত্তাহ। বাবু হোস্টেলে চলে যায় গোসল করে খাবে বলে।

ততক্ষণে সিলিংফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে গেছে শোয়ার ঘরের মেঝেটা। কাজেই শোয়ার ঘরে ছোট মাদুরটা পেতে আবুল ফাত্তাহ বাচ্চাদের সেখানে শুইয়ে দেয়। ঘুমাক তারা একটু। তাদের গায়ে নিজের একটা শাড়ি মুড়ে দিতে দিতে গুলনার বানু বলে, ‘লেপও তো কিনা লাগবে! সবই তো লুট হইয়া গেলগা!’

‘আজ বিকালেই লেপ কিনা নিয়া আসমুনি ইঁদারাপট্টি থিকা। খাটও তো নাই। ডাবল খাটের মাপে রেডি মেইড তোষক পাওয়া যায় কি না একটা তাও দেখমুনি। জলদি কইরা খাটও কিনন নাগব।’ গুলনার বানুকে বলে আবুল ফাত্তাহ।

‘বাচ্চাদের জন্যে তো সোয়েটারও কিনতে হইব! বনাইনগর বাজার থিকা ওদের জন্য একটা কইরা সোয়েটার কিনছিলা তুমি। ওইগুলা ধুইলে শুকাইতে লাগে কমসে কম চব্বিশ ঘণ্টা! আর তখন শীতে কাঁপতে থাকে বাচ্চারা!’ আবুল ফাত্তাহকে বলে গুলনার বানু।

‘দেখি, কালকে গরম কাপড়চোপড় খুঁজমুনি!’

মাদুরের ওপরে বাচ্চাদের পাশে দ-ভঙ্গীতে শুয়ে সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায় ক্লান্ত গুলনার বানু। আবুল ফাত্তাহরও ঘুম পায় ভীষণ। কিন্তু ছোট মাদুরটায় নিজেকে খুসে দেওয়ার মতো স্থান অবশিষ্ট নেই। ডিসেম্বর কুড়ির শীতে ঠান্ডা মেঝেতে সটান শুয়ে পড়তেও সে ভরসা পায় না। কাজে কাজেই বারান্দায় বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে সে ঝিমায়। ঝিমানির ভেতরে ফের আতঙ্ক ভর করে তার ওপরে। তার মস্তিষ্ক তাকে ফিরিয়ে দেয় বনাইনগর বাজারে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী এবং রাজাকারদের যুগপৎ আক্রমণের স্মৃতিটা। সেদিন যেমনটা করতে হয়েছিল তাকেÑ মৃত্যুভয়ে আরও অনেকের সাথে চিকনাইনদীর পার ধরে সে পশ্চিমে উর্ধ্বশ^াসে দৌড়াচ্ছিল মৌদ নামের বিল-এলাকার একটা গ্রামের দিকে যেখানে সেই সময়টায় সপরিবারে লুকিয়ে ছিল তারা। অচেনা সব গ্রামের ভেতর দিয়ে গন্তব্য অভিমুখে দৌড়াতে দৌড়াতে সে পথ ভুলে যাচ্ছিল বারবার। তার পেছনে জেগেই ছিল ফুটন্ত চাইনিজ রাইফেল আর মেশিনগান। ঝিমানির ভেতরে তার বিভ্রম হচ্ছিল: যেন একটা তপ্ত গুলি এসে বিঁধেছে তার পিঠের কোথাও। আর তার পা যেন ঢুকে গেছে মাটির ভেতরে  এবং তাই সে বনাইনগর বাজার থেকে দূরে আর দৌড়ে পালাতে পারছে না। এমন একটা নাজেহাল অবস্থায় আবুল ফাত্তাহর ঘুম ভাঙায় গুলনার বানু। ঝিমানি চটে যায় আবুল ফাত্তাহর এবং বুক ধরফর করতে থাকে তার।

গুলনার বানু তাকে বলে, ‘যাও, বাচ্চাদের পাশে শুইয়া ঘুমাও গিয়া। আমি ঘুমায় নিছি।’

তখন বিকাল প্রায় চারটা। ঢলে পড়ছে ডিসেম্বরের সংক্ষিপ্ত বিকাল। আবুল ফাত্তাহ ভাবে, বেলা থাকতে থাকতেই ইঁদারাপট্টি থেকে লেপ-তোষক আর কিছু হাঁড়িপাতিল কিনে ফেলা যাক। তারপর বড় বাজারে গিয়ে সে বাজারসদাই সারবে। যেহেতু এই ডিসেম্বর কুড়িতে তার একটা মাত্রই ফুলপ্যান্ট অবশিষ্ট আছে কাজেই সে লুঙ্গি পরেই রওয়ানা দেয়, পায়ে লাগায় সবেধন একটা স্পঞ্জ। মাঠের মাঝ দিয়ে হেঁটে কলেজের ভস্মীভূত হোস্টেলের দিকে যাওয়ার পথে দেখা যায়, কলেজের মাঠটা আবারও সরগরম হয়ে উঠেছেÑ পঁচিশে মার্চের আগের সময়ের মতোই শিশু-কিশোররা মাঠে ক্রিকেট খেলছে, ফুটবল খেলছে কেউ কেউ; মাঠের উত্তরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করছে ক’জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা যাদের কাঁধে ঝুলছে স্টেনগান, এসএলআর, টমিগান আর সাবমেশিনগান। মাঠ পার হয়ে হোস্টেলে গিয়ে আবুল ফাত্তাহ সাথে নেয় তার পিওন বাবুকে। বাবুকে সে বলে, ‘হোস্টেলের যেই সব রুমগুলার দরজা পুইড়া যায় নাই সেইগুলার ছিটকিনি লাগায় রাখবা। কলেজের ফান্ড থেকে ট্যাকা তুইলা লেবার লাগায়া পুইড়া যাওয়া রুমগুলা পরিষ্কার কইরা দিমুনি।’

মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানায় বাবু।

বাবুকে সে ফের জিজ্ঞাসা করে, ‘রমজান মিয়া কবে আসব, জান কিছু?’

বাবু তাকে জানায় যে ডিসেম্বরের পয়লাতে পাকিস্তানি আর্মি উত্তরের জেলাগুলো থেকে পিছু হটে মুলাডুলি পর্যন্ত চলে এলে হোস্টেলের কুক রমজান মিয়া প্রাণভয়ে হোস্টেল থেকে পালিয়ে যায়। সে এখন বেড়ায় আছে তার নিজের বাড়িতে। বেড়া থেকে কবে যে পাবনা শহরে ফিরবে রমজান মিয়া তা বাবু জানে না।

‘থাক! ডাইনিং তো আর চালাইতে হইতাছে না। ছাত্ররা তো এখন পর্যন্ত কেউ হোস্টেলে ফিরেই নাই।’ 

এসব আলাপ করতে করতে আবুল ফাত্তাহ আর বাবু যখন ডাকঘর আর জামে মসজিদ বামে ফেলে কলেজের মূল গেটে পৌঁছায় তখন দেখা যায়, মেইন রোডের পশ্চিমদিক থেকে এগিয়ে আসছে হুড খোলা জলপাই রঙের একটা জিপ। এটা পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর ফেলে যাওয়া কোনো জিপ তা রঙ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। জিপের ভেতরে আর পাদানিতে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে স্লোগান দিচ্ছেÑজয় বাংলা! তোমার-আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। রাজাকারের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও! আবুল ফাত্তাহ দেখে চিনতে পারে যে এই দলটার মুক্তিযোদ্ধারা সকলেই তার ছাত্র। কলেজের গেট বরাবর জিপটা চলে এলে গতি কমে যায় জিপটার। আবুল ফাত্তাহ দেখতে পায়, জিপের ড্রাইভিংসিটের পাশের সিটটায় মাথা হেঁট করে বসে আছে পাকিস্তানিদের পিস কমিটির চেয়ারম্যান। তার টেকো মাথা থেকে ঝরছে রক্তের ক’টা ক্ষীণ ধারা। ছেঁড়া জুতা আর স্যান্ডেলের মালা তার গলায় ঝুলছে, আরও ঝুলছে ছোট একটা চাটাইতে সাঁটা সাদা পোস্টার যেখানে বড় করে কালো কালিতে লেখা আছেÑআমি রাজাকার। আশপাশের মানুষজন তখন ‘জয় বাংলা’ আওয়াজ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তাদের পা’র স্যান্ডেল বা পাম্প স্যু খুলে পিস কমিটির চেয়ারম্যানের গালে এবং পিঠে ঘা বসিয়ে দিয়ে আসছে ইচ্ছামতো। বাবুও তার ব্যতিক্রম নয়। তারপর জিপ থেকে নেমে এসে শামীম নামের একজন ছাত্র কদমবুচি করে আবুল ফাত্তাহকে। শামীমের কাঁধে ঝুলছে সাবমেশিনগান। শামীমের মাথায় সস্নেহে হাত রেখে আবুল ফাত্তাহ বলেÑ জয় বাংলা!

ধৃত রাজাকারকে নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করার জন্য জিপটা নতুন ব্রিজের দিকে চলে যায়। ইঁদারাপট্টি যাবে বলে  সেদিকেই হাঁটা দেয় আবুল ফাত্তাহ আর বাবু। নতুন ব্রিজ পার হয়ে পয়লাতে তারা সোনাপট্টি থেকে রূপালি রঙের দু’টা বড় হাঁড়ি, একটা কড়াই এবং একটা হারিকেন কিনে ফেলে। জনৈক মুদির দোকানদারের হাতেপায়ে ধরে একটা শিশি ধার নেয় বাবু। ফলে হারিকেনটায় এবং শিশিটায় তারা কেরোসিন ভরে নিতে পারে। লোডশেডিং যে কোন বাজে পর্যায়ে যাবে তা তো আর বোঝা যাচ্ছে না! কাজেই বাসায় হারিকেনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত কেরোসিন তেলের ব্যবস্থা থাকাটা জরুরি। তারপর ইঁদারাপট্টিতে গিয়ে তারা একটামাত্র লেপতোষকের দোকান খোলা পায়।  রেডি মেইড একটা ডাবল তোষক, একটা ডাবল লেপ, একটা সিঙ্গেল লেপ আর পাঁচটা বালিশও কিনে ফেলে তারা। এসব কেনাকাটা বাবদ খরচ হয়ে যায় একুনে পনের টাকা। পনের টাকা? লেপতোষকের দাম একটু বেশিই পড়ল বলে মনে হচ্ছে!

রিকশার অপেক্ষাতে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এ নিয়ে আবুল ফাত্তাহ বাবুর কাছে অভিযোগ দায়ের করে, ‘দেখলা তো, কত বেশি দাম হাঁকাইল ব্যাটা!’

বাবু ঐকমত্য হয় সঙ্গত কারণেই। আবুল ফাত্তাহকে সে বলে, আগামীকাল সে আবুল ফাত্তাহদের জন্য কাঁঠালকাঠের একটা ডাবল চৌকি খুঁজবে। এডওয়ার্ড কলেজের পশ্চিমে মক্তবপাড়ায় তৃপ্তিনিলয় নামের হোটেলটার পাশে স-মিল আছে একটা। স-মিলটার একজন লেবার বাবুর চাচাতো ভাই। বাবু বাজি ধরে বলে যে অবশ্যই সে কম দামে ভালো একটা চৌকি জোগাড় করে ফেলতে পারবে।

‘ভাবতেছিলাম যে বেতন পাইলে খাটটাট কিনব। দেখ, কাঁঠালকাঠের ডাবল একটা চৌকির দাম পড়ব কমসে কম পনের টাকা! এখন এত্তোগুলা টাকা খরচ করা কি উচিত হইব? তুমিই কও!’ আবুল ফাত্তাহর এই যুক্তির পরেও নাছোরবান্দা বাবু তাকে ছাড়ে না। সে বলে, ‘মেঝেত দিনের পর দিন শুলি পরে কইল নিমুনিয়া হয়ে যাবিনি বাচ্চাগেরে!’

বাবুর যুক্তি ফেলতে পারে না আবুল ফাত্তাহ। সে বলে, ‘আচ্ছা! দেখি!’

দুটা রিকশায় লেপতোষক তুলে দিয়ে বাবুকে রিকশার সাথে বাসায় পাঠিয়ে দেয় আবুল ফাত্তাহ। তারপর সে ইঁদারাপট্টি থেকে নির্জন পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বড়বাজারের দিকে যায়। সোনাপট্টি বামে রেখে বাজারের দিকে আগালে সে দেখতে পায়, আশপাশের হাঁড়িপাতিল, জামাকাপড়, রডসিমেন্ট, ফটোস্টুডিও, সোনা-রূপা-কাঁসা ইত্যাদি মালের বেশিরভাগ দোকানপাটই পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানি সৈন্য আর রাজাকারের দল। অনেকগুলো  দোকানের দরোজা বা শাটার ভেঙে পড়ে আছে যা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে লুটপাট করা হয়েছে দোকানগুলো। কাঁচাবাজারটাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে রাস্তার পাশেই বসেছে সবজির ক’টা টুকরি। একটা টুকরি থেকে চার আনার সবজি, বার আনা দিয়ে এক ডজন ডিম এবং এক সিকার গুঁড়ামাছ কেনে আবুল ফাত্তাহ। এসবেরও দাম  বেড়েছে বলে বোঝা যায়। আবুল ফাত্তাহ বিরক্তই হয় সে কারণে। দইবাজারে গেলে সে সেখানে একটামাত্র  হোলসেল দোকান খোলা পায়। তার বিরক্তি তখন চরমে উঠে যায় কেননা দোকানটায় সে নাজিরশাল চাল খুঁজে পায় না এবং বেশি দরেÑ সেরপ্রতি এক টাকা দশ আনায়Ñ তাকে পাঁচ সের আউশের চাল কিনতে হয়। এবার সে দোকানদারের সাথে কলহে নামেÑ চাউলের দাম সেরপ্রতি দশ আনা কইরা বেশি নিলা কেন তুমি?

‘আক্কারার বাজার স্যার!’ কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দেয় দোকানদার।

‘তা বুঝলাম। আমি যে মাসের পর মাস বেতন পাই নাই সেইটা কি তুমি জান?’

‘রাইসমিল তো দাম কমালে না স্যার! কী আর করব আমি!’

দোকানদারের যুক্তিটা না-বোঝার মতো নয়। তবু একটা অবোধ রাগে কাঁপতে কাঁপতে দইবাজারের পথের ধারে বাসনকোসন মাজার জন্য ছাই খুঁজতে যায় আবুল ফাত্তাহ। ছাই খুঁজে না-পেয়ে অগত্যা সে একটা মুদিদোকান থেকে একটা বল সাবান কিনে ফেলে। তারপর কলেজপাড়ার বাসার উদ্দেশে সে রিকশা নেয়। তখন ডিসেম্বর কুড়ির সন্ধ্যা নামে।

সুনসান পথ ধরে রিকশাটা ইঁদারাপট্টির মুখে এলে দেখা যায়, দোকানপাট যে ক’টা খোলা হয়েছিল বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলো। লোডশেডিংয়ের কারণে অন্ধকার নেমেছে আব্দুল হামিদ রোডে। এমনকি জ¦লছে না ইঁদারাপট্টির মুখের পথবাতিটাও। রিকশার পেছনে ঝুলিয়ে রাখা হারিকেনটাই তখন আলোর একমাত্র উৎস। এই শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে বলে তখন আবুল ফাত্তাহর ধারণা হয়। তার মনে পড়ে, সেপ্টেম্বরে পাওয়ার হাউসে বোম মেরেছিল গেরিলারা। তারপর নিশ্চয় দখলদার পাকিস্তানি সৈন্যরা আর পাওয়ার হাউস ঠিক করার তাগিদ অনুভব করেইনি। নতুন ব্রিজের ওপরে যখন ধুঁকতে ধুঁকতে রিকশাটা উঠে পড়ে তখন দেখা যায়, ইছামতি নদীর দু’পারের বাসাগুলোতে জ¦লছে টিমটিমে হারিকেন বা কুপিবাত্তি। ব্রিজের ঢাল বেয়ে রিকশাটা পাঁই পাঁই করে নামার সময় তার চোখে পড়ে, এক পাওয়ার হাউসের সামনে ছাড়া পৈলানপুর, পাওয়ার হাউসপাড়া আর যুগিপাড়ার কোথাও কোনো পথবাতি নেই, বৈদ্যুতিক বাতির নামনিশানাও নেই কোনো বাসায়ও।

বাসায় ফিরে গিয়ে আবুল ফাত্তাহ দেখতে পায়, অন্ধকারে বারান্দায় চুপচাপ বসে আছে গুলনার বানু আর বাচ্চারা। বাজারসদাই বারান্দাতে রেখে তাই চটজলদি হারিকেনটা জ¦ালে আবুল ফাত্তাহ। গুলনার বানুকে সে বলে, আগামীকালকে সে এক টিন কেরোসিন কিনে রাখবে। কেরোসিন মজুদ করে রাখাটা ভালো কেননা যুদ্ধবিধ্বস্ত এই শহরে লোডশেডিংয়ের ঝামেলা সহজে মিটবে বলে মনে হয় না।

এর ভেতরে তিনটা জরুরি কাজ করেছে গুলনার বানুÑ শোয়ার ঘরে সে তোষকটা পেতেছে এবং কলতলার কাছে উঠানের মাটি খুঁড়ে সে বানিয়ে ফেলেছে অস্থায়ী একটা চুলা। আর বাবুকে দিয়ে সে হোস্টেল থেকে একটা ছোট বটি আনিয়ে নিয়েছে।

হারিকেনের আলোতে বারান্দায় বসে আলু, পটোল, বেগুন, ডাঁটার শাক আর গুঁদিমাছ কুটতে বসে গুলনার বানু। বাচ্চারা শোয়ার ঘরে গিয়ে চাদরবিহীন তোষকে শুয়ে ঘুমিয়ে যায়। সবজি কুটতে কুটতে গুলনার বানু আবুল ফাত্তাহকে বলে যে আগামীকাল জরুরি কিছু জিনিসপাতি কেনা প্রয়োজন, যেমন, বিছানার চাদর একটা, বাচ্চাদের ক’টা জামাকাপড়, পারলে তার জন্য একটা আটপৌরে শাড়ি। আর বাচ্চাদের জন্য সোয়েটার কিনতে লাগবেÑমনে আছে তো তোমার?

‘হু! মনে আছে। চা-পাতাও কিনব। কতদিন যে মন খুইলা চা খাই না!’ স্বগতোক্তি করে আবুল ফাত্তাহ।

‘তা ঠিক। চা খাওয়া তো ভুইলাই গেছিগা! নয় মাস ধইরা ভাত খাইতে পারি নাই পেট ভইরা তো কী কইরা আর চা-টা খাওন যাইব, কও!’

‘জালাল ভাই আর লাহিড়ীদা কলেজপাড়ায় ফিরছে নাকি, কে জানে! দেখব নাকি গিয়া?’

‘বাবুর কাছে শুনলাম, তারা কেউই ফিরা আসে নাই এখনও।’

‘তারা যে কই আছে তা কেডায় কইব!’

‘বাবু কইতাছিল, জালাল ভাইরা আর দেলদুয়ার ফিরা যায় নাই। পাবনার মাধপুরে আছে জালাল ভাইরাÑজালাল ভাইয়ের ডিপার্টমেন্টের পিওন কুদ্দুসের গ্রামের বাসায়। লাহিড়ী বাবুরা যে কই তা অবশ্য বাবু কইতে পারল না। ধামরাইতে তাদের গ্রামের বাড়িতে তারা চইলা গিছল কিনা তা কেডায় কইব! লাহিড়ী বাবুর বড় মেয়ে নীপা তো ক্র্যাক ডাউনের সময় রোকেয়া হলেই থাকত। তার খবরও তো জানি না!’

‘দুর্ভাবনা হইতাছে লাহিড়ীদাগো জন্য!’

‘ডিগ্রি কলেজে ধামরাইয়ের একজন পিওন ছিল না? বাসেত না কি যেন তার নাম? তার কাছে জিজ্ঞেস কইরা দেইখ তো!’

‘আচ্ছা!’

‘হাসান আলির জন্যও খুব টেনশন হইতাছে। তুমিই তারে পাবনায় নিয়া আইসা চাকরি দিছিলা। ওরও তো একটা খবর নিয়া দরকার!’

‘কই খবরটা নিব? রাজাকারেরা যাগোরে তুইলা নিয়া গেছে তারা ফিরা আসছে কয়জন? কী যে করব তা বুঝতে পারতাছি না! রাজাকারেরা সবগুলা তো গা-ঢাকাও মারছে!’

উঠানের অস্থায়ী মাটির চুলায় গুলনার বানু রান্না চাপালে দীর্ঘ একটা নীরবতা নামে। কিছু পরে আবুল ফাত্তাহ গুলনার বানুকে বলে যে সে হোস্টেলে যাচ্ছে বাবুকে খুঁজতে।

‘কেন? কী হইল আবার?’

বাবুকে দরকার এখনÑ এক প্যাকেট আগরবাতি কেনার পরিকল্পনা থকেলেও কাজটা করতে ভুলে গেছে আবুল ফাত্তাহ। উঠানের দক্ষিণ পাশের দেয়ালটার সাথের কবরটায় আজ সে আগরবাতি জ¦ালিয়ে রাখতে চায়। আগামীকাল মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডেকে এনে অবশ্যই সে জানাজা পড়িয়ে নেবে। এ কথার পরে আর কিছু বলে না গুলনার বানু।

বারান্দা থেকে উঠে গিয়ে হোস্টেলে যায় আবুল ফাত্তাহ। বাবু তখন রান্না সেরে কিচেনের বারান্দায় বসে তার কোনো বন্ধুর সাথে গল্প করছে। এক প্যাকেট আগরবাতি কিনে আনতে বললে সাথে সাথেই বন্ধুকে নিয়ে বের হয়ে পড়ে বাবু।

আগরবাতি খুঁজে পেতে বাবুর লেগে যায় এক ঘণ্টামতো। কলেজগেটের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে বলে সে একটু দূরের মক্তবপাড়ার দিকে গিয়েছিল। ওখানে পেট্রোল পাম্পের পাশের একটা মুদিদোকানে সে আগরবাতি পেয়ে গেছে। এবার বাবুকে ওজু করে আসতে বলে আবুল ফাত্তাহ। সে নিজেও ওজু করে নেয়। তারা দু’জন মিলে দু’গজ বাই একগজ কবরটার চার কোনায় আগরবাতি জ¦ালে। তারপর মৃৃতের বা মৃতদের আত্মার শান্তির জন্য কবরের পাশে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে সরবে সুরা ফাতেহা আর কলেমা শাহাদাত পাঠ করে তারা। কাল সকাল সকাল আসবে বলে হোস্টেলে চলে যায় বাবু।  

বাচ্চাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তাদের ভাতের সাথে নিরামিষ মাখিয়ে খাওয়ায় গুলনার বানু। শোয়ার ঘরের চাদরবিহীন তোষকের ওপরে শুয়ে আবারও ঘুমিয়ে যায় বাচ্চারা। গুলনার বানু আর আবুল ফাত্তাহও রাতের খাবার সেরে ফেলে। কলতলায় গিয়ে হারিকেনের আলোতে বাসনকোসন ধুয়ে এসে হারিকেন নিভিয়ে দেয় আবুল ফাত্তাহ। তেল বাঁচানো প্রয়োজন। রাতের বেলায় যদি বিদ্যুৎ না-আসে আর বাচ্চারা কেউ ঘুম থেকে উঠে যদি বাথরুমে যেতে চায় তবে আবারও হারিকেন জ¦ালিয়ে নেয়া যাবে। তারপর বারান্দায় বসে একটা কে-টু সিগারেট ধরায় আবুল ফাত্তাহ। তার পাশে এসে চুপ করে বসে থাকে গুলনার বানু। তাদের চারদিকে জমাট বেঁধে আছে লোডশেডিংজনিত ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে নতুন চাঁদ উঠেছে, তারারা জেগেছে বলে রাতের স্বাভাবিক আলোতে অন্ধকারটা চোখ সওয়া হয়ে যায় তাদের।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে গুলনার বানু আবুল ফাত্তাহকে বলে, ‘তোমার মনে আছে, সেপ্টেম্বরে আমরা যখন আরিপপুরে লুকায় ছিলাম তখন দুনিয়া ভাসানো বন্যা হইল? তখন প্রতিদিন ইছামতি নদীতে ভেসে আসত খুন হয়ে যাওয়া মানুষের পচা লাশ!’

‘হ্যাঁ, মনে আছে। মৌদে থাকার সময় চিকনাই নদীতেও মানুষের গলিত লাশ ভাইসা আসত। মানুষের লাশ ঠুইকা ঠুইকা খাইত মাছরা, কুকুরগুলাও।’

‘তেমন একটা লাশ পচা গন্ধ আইসা লাগতাছে আমার নাকে!’

‘আমি পুরা এক প্যাকেট আগরবাতি জ¦ালায় দিছি কব্বরটায়! দুর্গন্ধ আসব কই থেকে? আমি তো আগরবাতিরই গন্ধ পাইতেছি!’ 

‘আমার না গা ছমছম করতাছে ভয়ে! অপঘাতে মৃত্যু!’

‘আমারও। বাসার ভিতরে পুঁইতা রাখা হইছে মানুষের লাশÑকয়টা তা আল্লাই মালুম!’

আর কিছু বলে না গুলনার বানু। সিগারেটা শেষ করে মুথাটা উঠানে ছুড়ে দিতে দিতে আবুল ফাত্তাহ গুলনার বানুকে বলে, ‘তাও তো আমরা নিজেগো একটা দেশ পাইলাম শেষপর্যন্ত! এখন আর কেউ আমাগোরে খামাখা গুলি কইরা খতম করতে আসব না!’

‘আমি আবার ঘুমের ভিতরে আতঙ্কে কাঁইপা উঠব না তো! নয় মাস ধইরা তো এইসবই হইল আমাদের!’

‘দেখা যাক। চল, শুইয়া পড়ি। কালকে সকাল সকাল অফিসে গিয়া জয়েনিং দিতে লাগবে। যাহ্ শালা! পিঁড়ি বেলুন তো কিছু কিনা হইল না! খিচুড়ি পাকায়া ফেইল না-হয়! ডাইল তো আনছি!’

‘ঠিক আছে! পাকামুনি।’

বারান্দা থেকে উঠে গিয়ে বাসার সবগুলো দরোজার খিল আটকে দেয় আবুল ফাত্তাহ। তারপর গুলনার বানু আর সে শুয়ে যায় মেঝেতে বিছানো তোষকের ওপরে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাদের পাশাপাশি। 

ডিসেম্বর কুড়ির নিস্তব্ধ রাত চৌচির করে দিয়ে আজ আর দূর থেকে ধেয়ে আসছে না পাকিস্তানি সৈন্যদের চাইনিজ রাইফেল অথবা মেশিনগানের গুলির আওয়াজ, রাতের আকাশ লাল হয়েও উঠছে না প্রজ্বলিত আগুনে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares