হোসনার পারলৌকিক একটি রাত্রি : মাহবুবর রহমান

দেড়শ বছর ধরে মাতবরের খালটি কেওড়ার জলে পা ডুবিয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছে। তার পায়ের বাম গোড়ালি বরাবর মাছধরা মজিবর আর সোহরাবের বাড়ি। ডান গোড়ালি ঘেঁষে কালু শিকদার আর আমেনা বুবুদের নারকেল সুপারির বাড়ি। আরেকটু ওপরে হাঁটুর উচ্চতায় বাম দিকে মাতবরের বাড়ি আর ডান বরাবর হাসেম কবিরাজ আর মোতা খাঁর দোচালা কুঁড়েঘর। এখানে এসে খালটি কোমর বরাবর একটি মোচড় দিয়ে ডান দিকে সরে গিয়ে সোজা দক্ষিণে যেতে যেতে বাম কোলঘেঁষে যথাক্রমে শফী মৃধা, সেকান্দার মহুরি, মজিদ শিকদার, সুলতান শিকদার, আজাহার ফকির, মজিদ খাঁ, সেকা, আজিবর, শাহজাহান, নেপ্তার, ধলু চৌকিদারের ডেরা পার হয়ে খালটির কাঁধ বরাবর দু’ধারে গাজিদের বিশাল বাড়ি।

আরও উপরে বিস্তীর্ণ গ্রীবাদেশ ধরে তোতা, ময়না, হাসেমসহ কম করে হলেও বিশটি খেটে খাওয়া গরিব পরিবার ঠাসাঠাসি করে বেঁচে আছে। তার একটু পরেই খালটি ডানে মোড় নিয়ে কিছুদূর এগিয়ে বিস্তীর্ণ জলাভূমির ভেতর মাথা গুঁজে দীর্ঘ ঘুমে নিমজ্জিত।

খালটির প্রলম্বিত গ্রীবা যেখানে ডানে মোড় নিয়েছে সেই বরাবর একটি নারকেল গাছের সাঁকো। অল্প বয়েসি বাচ্চারা সেই সাঁকো ডানবামে না তাকিয়ে অবলীলায় হেলেদুলে পার হয়ে ওপারে চলে যায়। কিন্তু বয়স্ক মানুষদের জন্য বাঁশ দিয়ে একটি হাতলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাল পার হয়ে সোজা দক্ষিণে দু’পাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে মাটির রাস্তাটি অনু তালুকদারের বাড়ির পাশ ঘেঁষে বাম দিকে মোড় নিয়ে ফুলহাতা বাজারের দিকে চলে গেছে।

বিদ্যুৎহীন গ্রামে সন্ধ্যার পরপরই লোকজন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। পশ্চিম আকাশে গোধূলির বিলুপ্ত রেখার ঈষৎ আভাস এখনও দৃশ্যমান। ট্রেন মিস করা যাত্রীদের মতো কিছু কিছু ক্লান্ত পাখি নীড়ের দিকে বিলম্বিত যাত্রায় উড়ে চলেছে। এদিকে রাতজাগা বাদুড়ের দলছুট সদস্যরা এদিকে সেদিকে এক অদ্ভুত আঁধার ভেদ করে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

এই বিষণ্ন স্নিগ্ধ নির্জন সন্ধ্যায় হোসনা নারকেল গাছের সাঁকোর গোড়ার দিকটায় এসে বসল। অনেকদিন সে এদিকটায় আসেনি। প্রথমে চারদিক একবার দেখে নিল। না কেউ নেই। শুধু একটি অস্পষ্ট অজানা পাখি খালের ওপারে বাঁশের হাতলের ওপর বসে নিবিড় মনে কী যেন ভাবছে। তার নিবিষ্ট দেহছায়া গোধূলির আকাশের গায়ে লেপ্টে এক ঐন্দ্রজালিক ক্যানভাস সৃষ্টি করেছে। পাখিটি কী তবে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে? করুক। ব্যাপারটা মাথায় আসতেই হোসনা নারকেল গাছের গুঁড়ি ছেড়ে বাঁশের হাতলের ওপর বসল। অমনি পাখিটি উধাও হয়ে গেল। কিন্তু কী আশ্চর্য! পাখিটির নিবিষ্ট দেহভঙ্গির ছায়াটি আকাশের গায়ে এখনও স্থির হয়ে আছে!

এমনটি প্রায়ই ঘটে চলেছে। কায়ার সঙ্গে ছায়ার যে আবশ্যক সম্পর্ক সেটি এখানে ছিন্ন হচ্ছে। যখন সে এ জগতে প্রথম এলো তখন আগের অভিজ্ঞতাগুলো পরস্পর অসংলগ্ন হয়ে সাংঘর্ষিক হতে থাকল। তার জানা ছিল জগতের এ অংশে মানুষের সময়টি ধ্রুবতারার মতো স্থির হয়ে যায়। কিন্তু তার তো সেরকম হচ্ছে না! দিনে দিনে তার চৈতন্যে যুক্ত হচ্ছে নতুন সব অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। শুধু আগের আর পরের জগৎটির সংযোগটুকু ছিন্ন হয়ে গেছে। যেমন একদিন তার ইচ্ছে হলো বন্ধুদের সাথে স্কুলে যাবে। জামাল কামাল মানিক বিধান হুমায়ূন মাহবুব সবাই মিলে একসাথে স্কুলে যাচ্ছে। সেও তাদের দলে যোগ দিল। সবাই নানান মজার গল্প শোনাচ্ছে আর মাঝে মধ্যে অকারণে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ছে। সেও হাসবার চেষ্টা করছে কিন্তু কোনো শব্দ তৈরি হচ্ছে না। তার শব্দগুলো কি নিঃশব্দ হয়ে গেল?

তবে শব্দের গতিবেগের নিয়মবিধি ভঙ্গ করে দুটি শব্দ ধ্রুব সত্য হয়ে তার শ্রবণদ্বারে চিরস্থায়ী প্রহরী হয়ে বসে আছে।

তখন ১৯৭১। ভাদ্র মাস। অমাবস্যার গভীর রাত। হঠাৎ রাইফেলের গুলির এক তীব্র শব্দে হোসনার ঘুম ভেঙে যায়। আকস্মিকতা ও আতঙ্কে সে থরথর করে কাঁপতে থাকে। তার মা আর দু’বোন তাকে জড়িয়ে ধরে। নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসে মানুষের অসহায় কাতর ধ্বনি। কয়েক সেকেন্ডের বিরতি। এরপর দ্বিতীয়বার আবার গুলি। তারপর সমস্বরে আর্তচিৎকার।

পাড়ার সবাই হঠাৎ ঘুম ভাঙা চরম আতঙ্ক নিয়ে রাতের বাকি সময়টুকু পার করে দেয়। ভোর না হতেই দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেকান্দার মহুরিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই অন্ধকার অজপাড়াগাঁয়ের একমাত্র পাঠশালার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। কিছুদিন থেকে এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোকের সাথে জমিজমা নিয়ে তার বিরোধ চলছিল। সবাই অনুমান করে তারাই ডাকাতবেশে মহুরিকে হত্যা করেছে।

যুদ্ধের ভয়াবহ অরাজক হিংস্রতা মহুরির-হত্যাকাণ্ডকে ম্লান করে দেয়। কোনো রকম বিচার-আচার ছাড়াই তাকে খালের এই জায়গায় তাদের পুরনো বাড়িতে কবর দেওয়া হলো।

এরপর যখনই হোসনা এই পথে স্কুলে যেত, এখানে এলেই পরপর দু’টো গুলির শব্দ শুনতে পেত। শত চেষ্টা করেও সেই শব্দ দুটো দূর করতে সক্ষম হয়নি। সে তার কান বরাবর হাত চালায়। অদ্ভুত ব্যাপার! সে শব্দ দুটিকে ধরে ফেলে। শব্দগুলো কানের সাথে দুটো টেনিস বল হয়ে সেঁটে আছে। সে বল দুটোকে টেনে আনতে চেষ্টা করে। কিন্তু না। সেগুলো কানের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। সে এই খালটির পশ্চিম পার্শ্বের সর্বশেষ বাড়িটির দিকে তাকায়। বাড়িটি পাড়ার শেষ বাড়ি হওয়ায় তার দক্ষিণে অবারিত শস্যহীন খোলা মাঠ। সেই মাঠ ঘেঁষে দুটো হিজল গাছ মাথাভর্তি ঘন সবুজ পাতার ঝাঁকড়া কেশ নিয়ে মহুরির কবরকে ঘিরে আছে। সেখানে সে দেখতে পেল মহুরির দুই ছেলে জাফর আর জামাল এক প্লেট ভাত আর এক জগ পানি নিয়ে কবরের পাশে বসে আছে। তাদের ধারণা তাদের বাবার খুব খিদে আর তেষ্টা পেয়েছে। বড় আদরের এই দুটি ছেলে মহুরির। যেদিন তাদের বাবাকে হত্যা করা হয় তার পরের দিন থেকে তাদের ঘরে খাবার মতো কোনো খাদ্য ছিল না। পাড়ার সবচেয়ে অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারটি একটিমাত্র লোকের অনুপস্থিতিতে একদিনের ব্যবধানে পাড়ার সবচেয়ে নিঃস্ব পরিবারে পরিণত হয় এবং একইভাবে পাড়ার একমাত্র আলোকবর্তিকা পাঠশালাটি চিরতরে নিভে যায়।

হোসনা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেঁটে যাওয়া গুলির শব্দ দুটো সঙ্গে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। উঠতে গিয়ে সে টের পায় তার শরীরের কোনো ওজন নেই। তার দুরন্ত কৈশোরের সেই ভারন্ত শরীরটি কোথায় গেল?

না, এসব নিয়ে সে আর ভাববে না। একবার তার মনে হলো খালের ভাটির স্রোতের ওপর শুয়ে ভেসে ভেসে কেওড়ার গভীর জলে মিশে যাবে। কিন্তু এই ঘন অমাবস্যায় সেটি খুব ভালো হবে না। তার চেয়ে যদি এই নক্ষত্রখচিত আকাশের নিচে ধ্যানমগ্ন বৃক্ষরাজির শরীরের শিরায় শিরায় বয়ে চলা গানের সুরগুলো কানের ভেতর ঢুকিয়ে নেওয়া যায় মন্দ হয় না।

হোসনা নিমিষে বসন্তের সন্ধ্যার এই মন আকুল করা মৃদুমন্দ বাতাসের চাদরে শুয়ে পড়ল। সেই চাদরখানি মুহূর্তে কর্তিত ধানক্ষেতে একটি ছন্দময় ঢেউ তুলে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের শীর্ষে পৌঁছে গেল।

বাতাসের চাদর থেকে হোসনা তালগাছের একটি পরিপুষ্ট পাতার ওপর বসে পড়ল। তালপাতার শক্ত পাতায় বাতাসের ঘর্ষণে এক অদ্ভুত বাঁশির সুর বেজে উঠছে। তালপাতার সাথে বাতাসের ঘর্ষণের মুখোমুখি আরও একবার হয়েছিল সে। তবে এ রকম সুর সে আগে কখনও শোনেনি। যেন মাটির নিচে চাপা পড়া আত্মাদের সম্মিলিত ক্রন্দন তালগাছের কাণ্ডের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাতার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। মাটির নিচে চাপা পড়া সবাই কি তবে দুঃখ ভারাক্রান্ত? সে কি তবে চিরবিরহী হৃদয়ের আর্তনাদ? হোসনা ঠিক বুঝতে পারে না। তার কাছে সবকিছু ঘোরের মতো লাগছে। সে তালগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু গোধূলির দিকে তাকায়। হোসনা সেই গাঢ় অন্ধকারের ভেতর গভীর রক্তবর্ণের আল্পনায় তার মায়ের মুখের একটি আভাস দেখতে পেল।

তখন চৈত্রের তপ্ত বায়ু হুহু করে বইছে। গ্রামের খাল বিল পুকুর প্রায় সব জলশূন্য। পানীয় জলের তীব্র সংকট। কেউ কেউ দুই মাইল দূরের ফুলহাতা স্কুলের পুকুরের পানি এনে ফিটকিরি দিয়ে ব্যবহার করছে। যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা ডোবা বা নদীর দূষিত পানি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সকাল থেকে হোসনাও অসুস্থ। বার কয়েক পাতলা পায়খানা হতেই সে বিছানায় নেতিয়ে পড়ল। চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তার মা উ™£ান্তের মতো ছোটাছুটি করে সবাইকে ডাকাডাকি করছেন। কেউ কেউ ডাবের জল দিতে বলল। আবার কেউ কেউ ডায়রিয়ায় সবধরনের তরল নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। হোসনার শরীর ক্রমশ শীতল হয়ে আসছে কিন্তু তা সত্ত্বেও তার গরম বোধ হচ্ছে।

মা আজ আমার স্কুলে যাওয়া হলো না।

একদিন স্কুলে না গেলে কিচ্ছু হবে না বাপ।

মা আমার খুব গরম লাগছে!

তার মা একটি পুরনো তালপাতার পাখা এনে বাতাস করতে শুরু করলেন। ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা জিঘাংসু বাতাসে ঘূর্ণ্যমান তালপাখার ঘর্ষণে ছিঁড়ে ছিঁড়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। বাতাসের সাথে তালপাখার এই সংঘর্ষে এক অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ সৃষ্টি হলো। সেই শব্দের আড়ালে তের বছরের হোসনার জীবনের সব শব্দ, সব কোলাহল ঢাকা পড়ে গেল!

হোসনা তালপাতার শব্দতরঙ্গে নিজেকে স্থাপন করল। তারপর দৃষ্টিকে পূর্বদিকের দিগন্তরেখার দিকে নিবদ্ধ করল। সেখানে মাতবর বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর একটি ঘন বাঁশঝাড় আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হোসনার শব্দতরঙ্গযানটি মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে গেল। এই চৈত্রের মধ্যরাতে বাতাসের তেমন কোনো তীব্র প্রবাহ নেই। তা সত্ত্বেও একটি মৃদুমন্দ বাতাস বাঁশঝাড়ের ভেতর এক অদ্ভুত ঝিরিঝিরি শব্দজাল তৈরি করেছে। গাছের ফাঁকফোকরকে আশ্রয় করে কতগুলো ঝিঁঝিঁ পোকা পালাক্রমে তাদের জীবনের যাবতীয় কথকতা তানপুরার বিরামহীন সুরের মতো অচেনা অদেখা কারও উদ্দেশ্যে নিবেদন করে চলেছে। বাঁশঝাড় এবং ঝিঁঝিঁ পোকাদের এই যৌথ আয়োজনে এক অভূতপূর্ব সুরমূর্ছনা সমগ্র চরাচরকে গ্রাস করেছে। হোসনার এই মুহূর্তের একটি আর্তি বারবার তার গভীর থেকে বক্ষ বিদীর্ণ করে বের হয়ে আসতে চাইছে-

‘তোমার কাছে এ বর মাগি,

মরণ হতে যেন জাগি

গানের সুরে।

যেমনি নয়ন মেলি যেন

মাতার স্তন্যসুধা-হেন

নবীন জীবন দেয় গো পুরে

গানের সুরে।

সেথায় তরু তৃণ যত

মাটির বাঁশি হতে ওঠে গানের মতো।

আলোক সেথা দেয় গো আনি

আকাশের আনন্দবাণী,

হৃদয় মাঝে বেড়ায় ঘুরে

গানের সুরে।’

এভাবে একটি পারলৌকিক রাত ক্রমশ ক্ষয় হতে হতে কেওড়া নদীর পবিত্র জলধারার বুক ছুঁয়ে পুবাকাশে আরও এক নতুন দিনের আভাস পরিস্ফুট হতে শুরু করল; যে দিনটির ওপর হোসনার আর কোনো অধিকার নেই। একটি অতৃপ্ত অসমাপ্ত জীবনের অকাল-প্রস্থানের দীর্ঘশ্বাস পেছনে ফেলে হোসনা বাঁশঝাড়ের নিচে তার জন্য নির্ধারিত চিরস্থায়ী একটি মাটির পিঞ্জরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares