কোলাজ : কংকাল-কলম-ব্রিফকেস : মাহবুবা হোসেইন

কংকাল

আসলামের ব্যবসাটা বড় অদ্ভুত, মেডিকেলে মেডিকেলে কংকাল সাপ্লাই দেওয়া। নিশুতি রাতের মতো গোপন ব্যবসাটায় লাইসেন্স করার কথা ভাবাই যায় না, তারপরও এইটা একটা ব্যবসা, এইখানেও পুঁজি খাটাতে হয়, লাভ-লোকশান গুনতে হয়, লোক-লশকর, গোডাউন, গাড়ি-লরি, রিকশা-ভ্যানের জোগাড়-যন্ত্র দেখতে হয়, সবচেয়ে বড় কথা অসংখ্য হাঁ করা মুখের মুখপূর্তির বড় ধরনের ব্যবস্থা লাগে। লাভক্ষতির কারবার সংক্রান্ত বিষয়ে যে যে রূপ টেনশন আছে এই ব্যবসায় তার চেয়ে কিছু বেশিই আছে, কারণ ঘুলঘুলির মতো কিছু ব্যাপার স্যাপার এখানকার অলিতে গলিতে আছে। ঘুলঘুলি আক্রান্ত ব্যবসাটা তারপরও আসলামকে করতে হয়, কারণ এই ব্যবসাটা আগেরটার চেয়ে ভালো, মন্দের ভালো। অজীর্ণ রোগ দেখা দেওয়ায় হাতকাটা, পাকাটা, বিকৃত-অর্ধবিকৃত লাশের দুর্গন্ধযুক্ত লাশকাটা ঘরের কাজটা সে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, কারণ খেতে বসলেই সুনসান অশরীরী গন্ধটা তার নাকে ঝাপটা দিত।

কাজ, সে যেকোনো কাজ হেলায় পরিত্যাগ করার মতো ছেলে সে নয়, কবরস্থান ও লাশকাটা ঘরের মধ্যে চলাচলতির পথে আমের সাথে মাছির মতো মুহব্বত মিঞার সাথে তার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় এবং সে সুবাদে এই ব্যবসাটারও গোড়াপত্তন হয়। মুহব্বত মিয়া জুরাইন কবরস্থানের খাশমোহর, তার কথা ছাড়া জুরাইনের একটা লাশও পাশ ফিরে শোয় না।

জীবিত মানুষের বিরল অস্তিত্ব কবরস্থানের চিপায় চাপায় যে আয় ইনকামের এত ব্যবস্থা, চিন্তা করলেই মুহব্বতের মাথা ঘুরে যায়। ম্যাকানিজম আর কিছু না, খালি হাত গুটাইয়া বসে থাকা, নিজে দেরি করা আর লাশবাহী মানুষকে দেরি করাইয়া দেওয়া। শৃগালবুদ্ধি মুহব্বত জানে অন্য কাজে মানুষ অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু লাশের বিষয়ে অপেক্ষা করতে পারে না, লাশের ভার মৃত্যুচিন্তার ভারের চেয়ে কিছু কম না। তাই সে লাশ আসার সাথে সাথে হামলাইয়া পরে না, বিভিন্ন জোগাড়যন্ত্রে দেরি করে, কবর খুঁড়তে দেরি করে, মাটি অর্ধেক দিতেই প্রকৃতি তারে চাপ দেয়। কাজ যতই দেরি হয় তার রেটও ততই বাড়ে।

এটা হইল লাশের জীবিতকালীন অবস্থা, মৃতকালীন অর্থাৎ লাশ কব্বরের নিচে অন্তরীণ হলে মুহব্বতের থোক বরাদ্দ আরও বাড়ে। মৃতসঙ্গ অস্বস্তিকর কিন্তু স্মৃতি-সঙ্গ মোটেই অস্বস্তিকর নয়, সেই স্মৃতি-স্বস্তি যতদিন পারা যায় ধরে রাখার জন্য মানুষ পকেট উপড়াইতেও কসুর করে না, কব্বর ঠিক রাখা মুহব্বতের আরেকটা মুহব্বতি কাজ।

কোন লাশটার কদর কেমন, মুহব্বতের সাথে থাকতে থাকতে আসলাম বুঝে গেছে। মুহব্বত বলে, ‘বুচ্ছুইননি মিঞা ভাই, শিশু আর বুড়া লাশের কদর নাই, কদর বেশি মধ্য বয়সী লাশের। আবার ছয় মাস বয়সী কব্বরী লাশের কদর সব চা বেশি, ছয় মাসের আগে গেলে কংকাল চর্বিহীন রাহা শক্ত, হেরপরে গেলে কাঠামো ঠিক রাহা বেচাইন।’

সোডিয়াম কার্বনেটে জাল দিয়ে ব্লিচিং পাউডারে চুবিয়ে রাখলে কংকাল সম্ভ্রান্ত হয়, পরে ব্র্যান্ডেড এই কংকাল সম্ভ্রান্ত মেডিকেল পড়ুয়ারা নাড়াচাড়া করেÑ এই খবর মুহব্বতই দেয় আসলামকে। ব্যবসার এইসব চিপাচাপার শিক্ষা মুহব্বতের কাছেই পায় আসলাম, এই সবের খবরাখবরও দেয় সে-ই, দুই-জনের লাভালাভ সমান।

একটা পর্যায়ে জাহাজের সাথে গাদা বোটের মতো এসে জোটে হারগিলা কুব্বত। কুব্বতের ডানহাত বামহাতের কায়কারবারে কিছু সিস্টেমলস হলেও আসলাম কুব্বতরে সাথে সাথে রাখে, সেও আসলামের সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকে, কারণ গাধার মালিকের মেয়েকে পাওয়ার মতো ক্ষীণ একটা আশা কুব্বতের আছে।

গাধার গল্পটা এই রকম, ‘দুই গাধার খুব বন্ধুত্ব। কিন্তু একদিন তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। একজন কাজ পায় ধোপার কাছে, সে খুব আরামে থাকে, তার কাজ কম, ধোপার আর কাজ কী? সময় সময় কাপড় আনা আর সময় সময় দিয়ে আসা। আরেকজন কাজ পায় সার্কাসে, তার খুব কষ্ট দিন রাত খাটুনি। একদিন দুই বন্ধুর দেখা। সার্কাস-গাধা জিজ্ঞেস করে ধোপা-গাধাকে।

কেমন আছ বন্ধু?

মাশাআল্লাহ খুব ভালো আছি। কাজ কম খাই দাই ঘুমাই। তুমি কেমন আছ?

না রে ভাই ভালো নাই, সার্কাসে দিন রাত খাটুনি, দিনে মহড়া, রাতে সার্কাস, নাওয়াখাওয়ার ঠিক নাই।

তা হলে আমার সাথে চলে আস বন্ধু, এক সাথে থাকি, খাইদাই গল্পগুজব করি। ধোপাকে বললে তোমাকেও কাজে নিয়ে নিবে।

না বন্ধু না।

কেন বন্ধু এখানে তোমার এত কষ্ট?

ভাই তারপরেও এখানে আমার একটা আশা আছে।

কী আশা?

বুঝলে সেদিন মালিকের মেয়ে খেলা দেখাতে গিয়ে পড়ে গেল। মালিক রেগে বললেন,‘আবার যদি পড়ে যাও আমার গাধাটার সাথে তোমার বিয়ে দিব। সেই আশায় আছি বন্ধু।

কুব্বতও সেই রকম আশায় আশায় থাকে, ভাগ্য কোথায় ঘাপটি মেরে থাকে কে জানে?

সে খুব করিৎকর্মা, কোনো কাজে ফেইল নাই, জগতের সেরা গুণ ‘সায় দিয়া যাওয়ার ক্ষমতা’ তার অসীম। তাই আসলাম তারে ছায়া বানাইয়া রাখে।

সেই ছায়ারে নিয়া আসলাম একদিন রাস্তা পার হইতেছিল, রাত ছিল নিশুতি, এক চক্ষু লরিটা তাদের দেখতে পায় নাই, না পাইয়া পাড়াইয়া চলে যায়, কুব্বতের তেমন কিছু হয় নাই, আচড়ওচড় লাগে কিছু কিন্তু আসলাম লাশ হইতে বাধ্য হয়। ধরাধরি করে তারে ঢাকা মেডিকেলে নিলে ডাক্তার তাকে লাশ হিসেবে বৈধ করে দেয়, তখন সঙ্গে থাকা ‘বিরবলের’ মতো বুদ্ধিমান কুব্বতও হিসাব করে উঠতে পারে না, লরির নিচে চাপা পড়া হাড্ডি ভাঙা আসলাম কোনো মানের কংকাল হবে।

কলম

এই কলমটা দিয়ে এখন আমি করবটা কি মানিকের মনে যখন এই কষ্ট জন্মে, তখন ‘অসির চেয়ে মসি বড়’ এই কথাটার কোনো মানে থাকে না। বীরবিক্রম মসির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে মানিকের মনে ‘চিতোরের অগ্নি’ জ্বললেও বাস্তবে  মানিককে কলম হাতে চুন মুখেই বসে থাকতে হয়, কারণ লাবণ্য এই মাত্র সদম্ভ বলে গেল, ‘যা করছি বেশ করছি। যতসব জঞ্জাল। টুনটুনির বাসায় সুতা ঢুকানোর জায়গা নাই, আবার রাজসূয় যজ্ঞ’ কথা সত্য, সাত আর তার সাথে আধা স্কয়ার ফিটের এইটুকুন বাসার নাম ‘টুনটুনি ভিলা’ না হয়ে ‘রানী ভিলা’ হলে যদিও মানাত না তবুও কথাগুলা কাটাওলা থাওকা গোলাপ ফুলের মতো মানিকের মনে গেঁথে দিছিল লাবণ্য, অবশ্য প্রথমেই দেয় নাই, দিছিল চরম মুহূর্তে যখন মনিকও চরম হইল। মানিক যখন নরম ছিল বলেছিল, ‘আমার কলমগুলা কি করছ বনী?’ আদর লাগলে সময় সময় লাবণ্যরে এই নামেই ডাকত মানিক।

অদ্য বিদেশফেরত মানিকের কাছে সন্ধ্যার অন্ধকারে হরিৎ কালারের শাড়ি ও তিতাকফি কালারের ব্লাউজের ভিতরে লাবণ্যরে দেখতে ভালোই লাগতেছিল কিন্তু আনুষঙ্গিক আরও কাজের তাড়নায় ‘নৈকট্য লাভের’ বিষয়টা রাত পর্যন্ত তুলে থোয়ার ধৈর্যে কুলাইলেও হৃৎকলমের খোঁজে দীর্ঘসূত্রতা পোষাইতেছিল না তাই ঐ নামেই ডাকতেছিল। বনী আদরে সারা দিল কিন্তু ভাব ধরল উদাসী পথিকের, বলল, ‘আমি কেমনে কমু?

আমি কেমনে কমু মানে? যাওয়ার সময় তো এই ড্রয়ারেই রাইখ্খা গেলাম। এগুলার কি পা আছে যে হাইট্টা যাবে?

পা আছে না নাই আমি কেমনে জানমু। আমি কি ডেলিভারি নার্স নাকি, উল্টাইয়া দেখুম ছেলে হইছে না মেয়ে, পা আছে না নাই?’

রাগ হয় কিনা কন? মানিকের কত আশা ছিল কলমের ঝাঁকে এই কলমটাও আরেকটা পেখম হয়ে কলমের সংসার আলো করবে কিন্তু হইল কই, লাবণ্য সব ভণ্ডুল করে দিল। মানিক কত কষ্ট করে কলমগুলা জোগাড় করছে, কত ‘রংঢঙের’ কলম মানে কত রঙের আর কত ঢঙের।

জালালি কবুতরের মতো ধূসর রঙের চৌখাপ্পা ঝরনা কলমটা দিয়েছিল রুমা। টেক্সাসে তার বাসায় নির্ঘুম রাত কাটাইয়া জ্যাটলেগ কাটানোর জন্য যখন ব্ল্যাক কফির মৌতাত নিতেছিল তখন রুমা ঐ কলমটা হাতে ধরাই দিয়া কইল ‘এই নে তর কলম।’

কোন কলম?

যেই কলমটা বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আম্মায় তরে কিন্না দিছিল, আমার অঙ্কে মাথা নাই আমি বঞ্চিত হইছিলাম, পড়ালেখায় মাথা না থাকলেও অন্য কোনো কিছুতে মাথা থাকবে না এমন কোনো কথা নাই, তর আদরে হিংসা কইরা বালিশের নিচে থেইক্কা কলমটা আমিই চুরি করছিলাম কিন্তু তর চিৎকারে মার খাইছিল তমাইল্লা, রাগে তমাইল্লা পুকুর পাড়ে কাপড়সহ বালতি রাইখ্খা পলাইয়া গেছিলÑ বালতি ঘরে ফিরলে দেখা গেল সব কাপড়ের চেহারা ঠিক আছে কেবল আম্মার ধাক্কা পাড়ের শাড়ির আঁচলের খানিকটা নাই, সব ক্রিয়ার একটা প্রতিক্রিয়া আছে না সেইটা আর কি’ বইল্লা রুমা হি হি কইরা হাসছিল অনেকক্ষণ।

ধূসর রঙের পার্কার কলমটা ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এম এস করার সময় দিছিল মার্গারেট, পরে যেটা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেওয়ার বিরতিতে বিধুকে দিয়েছিল মানিক। বিধু নিবের কালি ঠিক আছে কিনা দেখার জন্য বাবুলের খাতা টাইন্না লিখছিল, ‘বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে’ কেন লিখছিল কে জানে?

লাল কলমটার ইতিহাস আরও জটিল। কাজী নজরুল ইসলাম লাল কলমে লাল কালি দিয়া লেখতে পছন্দ করতেন। মানিক বিস্তর খোঁজাখুঁজি করতে লাগল কেমনে কাজীর নিজ হাতের একটা কলম জোগাড় করা যায়। ল ডিপার্টমেন্টের বিরাশির ব্যাচে ছিল বিখ্যাত নায়ক রহমানের মেয়ে চাম্পি, সে আবার তারেকের ছোটবেলার বন্ধু, তারেকের পাঁজরের দোস্ত আবার কাজী সাহেবের নাতি বাবুল কাজী। পাজলের মতো ঠুক্কর খাইতে খাইতে মানিক বাবুল পর্যন্ত পৌঁছল এবং একটা লাল কলমের মালিক হইল।

একই কায়দায় স্ট্যাট্সে রবীন্দ্রনাথেরও একটা কলম জোগাড় কইরা ফেলাইছিল মানিক। এই কলমটার ইতিহাস একটু দীর্ঘ, দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে একশ’-দেড়শ’ বৎসর হইতে পারে। ইন্দ্রানী মহালনবিশ ছিল রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রশান্ত কুমার পালের মেয়ের ঘরের পুতিন। রবীন্দ্রনাথের কালো  রঙের একটা প্রিয় কলম পাওয়া যাইতেছিল না, এমনে তার কলম প্রায়ই হারান যাইত, যারা নিত তারা মনে করত এই কলম দিয়া লিখলে রবীন্দ্রনাথের মতো লেখা বার হইব, হইত কিনা ইতিহাস এই ব্যাপারে নীরব।

কলমটা চুরি করছিল লাল বাহাদুর দপ্তরি, ধরা পড়ছিল প্রশান্ত পালের হাতে, এই বিষয়ে তিনিও লাল বাহাদুরের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন নাই, রবীন্দ্রনাথের কলম বইলা কথা। আশীর্বাদপুষ্ট কলম হস্তান্তরে হস্তান্তরে পড়ল গিয়া ইন্দ্রানীর হাতে, সে তার সাথে পাড়ি দিল সাত সমুদ্র তেরনদী, পৌঁছল গিয়া ম্যাচাচুয়েটসের টাফ্টস ইউনিভার্সিটিতে। ইন্দ্রানীর রুম মেট ক্লারা প্রাক্তন বাঙালি বয়ফ্রেন্ডের কাছে বেগুনভর্তা করতে শিক্ষা পেয়েছিল, একদিন নষ্টালজিক হইয়া সেই ভর্তা খাওয়াইছিল ইন্দ্রানীকে, সাদা হাতে কালো বেগুন ভর্তা খাইয়া ইন্দ্রানী আবেগে আপ্লুত হইয়া কালপর্বে হস্তান্তরিত কালো কলমটা ক্লারাকে দিয়ে দেয়। ক্লারা প্রাক্তন প্রেমিককে রিপ্লেস করার মানসে সেইটা আরেক বাঙালি মানিককে দিয়া দেয় কিন্তু রিপ্লেসমেন্ট ঠিকমতো না হওয়ায় ক্লারা ক্লারার জায়গায় থেকে যায় কলম চলে আসে বাংলাদেশে। এই ইতিহাস মানিকের এম এস পর্বের।

ডক্টরেট পর্বের বৃত্তান্ত আগে বিবৃত হইছে। এক্ষণে আবার বিবৃত করা যায়।

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এইভাবে। মানিকের খুব কলম জমানোর শখ। লাবণ্য না আসা পর্যন্ত সেই শখে পানি দিছিল পারিপার্শ্ব, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত, স্বল্পপরিচিত, অপরিচিত বিপণিবিতান, বেশি দিছিল মুন্নি, সে তখন মানিকের অন্তরের ফাঁকফোকর খুঁজতেছিল কিন্তু ছোটছোট ফাঁকফোকরগুলা বই দিয়া আটকান ছিল, বড় দরজায় খাঁড়ায় ছিল হবু লাবণ্য। অন্তরে প্রবেশ না দিলেও কলম নিতে তো দোষ নাই, কবি তো বলছেই যেখানে দেখিবে ছাই…ইত্যাদি।

লাবণ্য আসার পর সেই শখে সাময়িক ছেদ পড়ে, লাবণ্যের লাবণ্যপ্রভা কলমকে কিছুদিন স্বপত্নীজ্ঞানে দূরে ঠেলে রাখে কিন্তু বৎসর দুই বাদে প্রভার ক্ষারত্ব কিছু কমে এলে মানিক আবার কলম নিয়ে মাতে, স্বপত্নীকে কবে কে মধু চোখে দেখে, লাবণ্যও দেখত না যদি না ‘ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’- আধুনিকতার পরিপন্থি না হইত। কলম সংক্রান্ত বিষয়ে লাবণ্য তাই এতদিন মৌনব্রত পালন করে আসছিল।

মাতোয়ারা হওয়ারও সীমা থাকে, তাতেও ছেদ পড়ে, কারণ মানুষ পেট সর্বস্ব, মস্তিষ্ক সর্বস্ব নয়, তাকে খাওয়া-পড়ার চিন্তা করতে হয়, কলমের সাথে মানিকের সাময়িক ছেদঙ্কটা সেই কারণেই।

কিছুদিন বিরতির পর সম্প্রতি লন্ডন সফরে গিয়া এডগার এলান পোর একটা কলম নিলামে কিনে ফেলেছে মানিক। কিনা ফেইল্লা পুরা উত্তেজনার বশে সারা সেমিনারে উল্টাপাল্টা উত্তর প্রতিউত্তর শেষে ফিরার সময় টার্কিস এয়ার লাইন্সের উলুসগন্ধা পোলাও যদিও খারাপ লাগতেছিল না, কিন্তু বিমানটারে মনে হইতেছিল কচ্ছপের পিঠে চইড়া আগাইতাছে। এমন অবস্থায় বাসায় ফিরে কলমের ড্রয়ার খুলে দেখে সব ফকফকা, লাবণ্যরে নরম কইরা জিগাইলে কয় আমি কি জানি, গরম কইরা জিগাইলে কয় আমি উল্টাইছিনি। কেমন লাগে?

মানিকের হাতের কলম হাতেই থাকিয়া যায়, কলমের ঝাঁকে এডগার এলেন পোর আর জায়গা হয় না। সত্যি তো সাত প্লাস আধা স্কয়ারফিটের বাসায় শখের  আর জায়গা থাকে কোথায়?

ব্রিফকেস

ভাইয়া টাকাটা পেয়েছি।

ঠিক আছে। ভালো করে পড়ো।

দোয়া করবেন ভাইয়া কালকে দুদকে পরীক্ষা আছে, যেন কিছু একটা হয়ে যায় ভাইয়া।

ইনশা আল্লাহ।

মানুষ নয়, সাক্ষাৎ ফেরেস্তা। ভাগ্যিস এমন মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল, মনে মনে সে তার লেখালেখির অভ্যাসটাকে ধন্যবাদ দেয়, কষ্ট করে হলেও কবিতার বইটা প্রকাশ করেছিল ভাগ্যিস, তা না হলে কি এই ফেরেস্তা মানুষটার সাথে পরিচয় হতো? একুশের বইমেলায় তার সাথে পরিচয়,  বন্ধুর বই কিনতে এসেছিলেন, বন্ধুই পরিচয় করে দিলেন তার সাথে, তারও একটা বই কিনে নিলেন, উচ্চারণ করলেন ‘নিলীমা তোমাকে’-ইমরোজ ইকবাল, কয়েকটা কবিতাও পড়লেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বললেন ‘ভালোই তো লিখ, চালিয়ে যাও।’ বই ঘাঁটাঘাঁটির আর কথার ধরন দেখে বোঝা যায় লেখাপড়া ভালোই করেন। যাওয়ার সময় নিজের কার্ড দিয়ে গেলেন। কাঁধ চাপড়ে বললেন ‘এস একদিন।’ বলার জন্য বলা নয়, আন্তরিকতার ছোঁয়া আছে তাতে, দুর্মূল্য খাঁটি মানুষের স্পর্শ। কার্ডটা যত্ন করে রেখে দেয় সে।

বিশাল অফিস। লিফটের সাতে উঠে পিয়নকে কার্ডটা দেখাতেই দরজা খুলে বড় একটা রুমে ঢুকিয়ে দেয়। চকচকে বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পিছনে বসে আছেন তিনি। সামনে আরেকজন ভদ্রলোক। শারীরিক অভিব্যক্তি বলে অফিসিয়াল কোনো কথা হচ্ছিল না তাদের মধ্যে, হোমলি পরিবেশ, হয়তো সাহিত্য নিয়েই কথা হচ্ছিল। তাকে দেখেই আন্তরিকভাবে বললেন ‘আরে আস আস’, ব্যবহারে অপরিচিতের বিস্ময় নেই, বললেন ‘বস’। পাশের একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। সে গিয়ে বসল। বন্ধুর সাথে কথা চালিয়ে গেলেন। বলশেভিক বিপ্লব ইত্যাদি ইত্যাদি। তার সাথে কথা না বললেও নিজেকে অনাহূত মনে হচ্ছিল না তার, কথার পিঠে পিঠে জড়িয়ে থাকছিল, মাঝে মাঝে তার মতামতও জানতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে মতামত তার তখনও স্পষ্ট হয়নি বলে মৃদু হেসে উত্তর ফিরিয়ে দিচ্ছিল সে। আরেকটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে বলে এক সময় বন্ধু উঠে গেলেন কিন্তু তাকে তিনি ছাড়লেন না, দুপুরের লাঞ্চ শেয়ার করে খেলেন, জায়গামতো নামিয়ে দিয়ে তারপর ছাড়লেন।

তারপরে যখন তখন হয়ে গেল সম্পর্ক, দুজনার পরিবারও জড়িয়ে গেল সম্পর্কে, জীবনের ওঠা-পড়া কিছুই তাঁর কাছে গোপন রইল না, অনেক দীর্ঘ নিঃশ্বাসের আশ্রয় দিলেন তিনি। তিনি জেনে গেলেন পিতৃহীন, অসহায় মায়ের একমাত্র সন্তান সে, সহায় সম্পদহীন বহু কষ্টে লেখাপড়া, বর্তমানে বেকার, কবিতা বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কুশল জিজ্ঞাসায়, ‘তোমার মা কেমন আছেন?’ না বলে এখন বলেন, মা কেমন আছেন? আরও বলেন, ‘আমি তোমাকে চালিয়ে নিব যতদিন না তোমার কিছু একটা হয় তবে এক শর্তে ‘আজীবন অসৎ পথ থেকে দূরে থাকতে হবে’, আমাদের মধ্যে লিখিত চুক্তি হবে, পাক্কা ব্যবস্থা।

এ আর এমন কি শর্ত?

তাইমুল রাব্বানি, ডিরেক্টর…

ফাইলের ওপর নামটা দেখেই আঁতকে ওঠে সে, চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ওপর থেকে নেমে এসেছে ফাইলটা আবার ওপরে উঠে যাবে, ত্রস্ত হাতে ভিতরের কাগজগুলো দেখে নেয় সে। সর্বনাশ।

দুদকের চিঠিটা কালকেই হাতে পেয়েছেন, রাতে ভালো ঘুম হয়নি, খুব ভোরে অফিসে এসেছেন যে করেই হোক ম্যানেজ করতে হবে। মনে ভেসে ওঠে সেই মুখ, তার হেল্প কি নেওয়া যায় না? না না কিছুতেই না, তাকে জানানোই যাবে না, সে জানার আগেই সব ম্যানেজ করতে হবে। গুছিয়ে নেন ব্রিফকেস।

ভিতরে ঢুকে ইস্যু সেকশনে নোটিশটা দেখান, সেকশন অফিসার নির্দিষ্ট রুম দেখিয়ে দেন। সে দিকে পা বাড়ান তিনি। ভয়ে মৃদুমৃদু কাঁপছেন, ব্রিফকেসটাও কাঁপছে মৃদু, কাছে গিয়ে নেমপ্লেটে চোখ আটকে যায়, ‘ইমরোজ ইকবাল’ ফ্রিজ হয়ে যান তিনি, কয়েক মুহূর্ত তারপর ঘুরে দাঁড়ান, মুষ্টিটা দৃঢ় হয়ে যায় ব্রিফকেসের হেন্ডেলে, ভাবেন ‘যা হয় হোক’, ফিরতি পথ ধরেন তিনি, হাতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দুলতে থাকে ভারী  ব্রিফকেস।

ইমরোজ ইকবালের স্লথহাত পড়ে থাকে ফাইলের ওপর, ভাবতে থাকে ‘কেন তবে? কেন সেই শর্ত? কি তার উদ্দেশ্য?’ উত্তর প্রজন্মের কাছে পূর্বপ্রজন্মের পাপ স্বীকার? ‘কন্ফেশন?’ মৃত্যুর আগে নিজের কৃতকর্মের জন্য খ্রিস্টানরা যেমন ক্ষমা প্রার্থনা করেন পোপের কাছে? অথবা মুসলমানরা করেন তওবা? পৃথিবীর কাছে মানুষের এক ধরনের জবাবদিহিতা?

কবি ইমরোজ কোনো উত্তরই খুঁজে পায় না, ভাবেÑ হবে হয়তো!!!

বিচ্ছিন্ন

মালেক রেলে চাকরি করে, তবে তার চাকরিতে কিছু উপরি থাকায়, মোটামুটি ভালোই চলে। তার দুই মেয়ে এক ছেলে, মেয়ে রিনি ও মিনি ভিকারুন্নেছায় ক্লাস এইট ও টেনে পড়ে, ছেলে সিটন সিটি কলেজে মাধ্যমিকের ছাত্র। বাবার চাকরির আশীর্বাদে ব্র্যান্ডের জিনিস ছাড়া তাদের রোচে না এবং সেই সুবাদে নামিদামি ব্র্যান্ডের সালোয়ার কামিজ, প্যান্টশার্ট, ফতোয়া, টাইটস, প্লজো, গয়নাগাটি, হাতঘড়ি,  সেন্ডেল, স্মার্টফোন, হেডফোন সবই তাদের হাতে নীরব ক্লেশহীন উঠে যায়। পরিবারের গাড়ি না থাকলেও উবার, পাঠাও, এখনই আসছি, সিএনজিতে যাতায়াত ভালোই চলে, হাতের কাছে রিকশা তো আছেই, কোনো কষ্ট হয় না। কষ্ট যা হয় তা জ্যামে, তা গরিব-বড়লোক সবার জন্য সমান, এখানে সাম্য সমতা সমাজতন্ত্র কিছুটা বজায় আছে। মালেক-গিন্নি রিনা মৌচাক ছেড়ে বর্তমানে বসুন্ধরা সিটিতে মার্কেটিং করে, তাতে মালেকের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই, আপত্তির কি? খরচ তো জোগাবে ‘স-হ-জ’- সরকার, হাওয়া আর জনগণ।

তবে তার সংসারে অসুবিধা একটা আছে, যা তাদের বর্তমান অবস্থার সাথে যায় না, যায় না বললে ভুল হবে, ছেলে মেয়েদের মতে যা রীতিমতো বেমানান, তবুও আছে। মালেকের ইনকাম ভালো হলেও এজিবি কলোনির ‘ডি’ টাইপে থাকে। ইচ্ছাকৃতই থাকে। যাত্রাবাড়িতে তার একটা দোতলা বাড়ি আছে কিন্তু নিজের অফিস ও ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজের সুবিধার্থে ওটা ভাড়া দিয়ে কলোনিতে থাকে। এখানে আধুনিক আবাসন ব্যবস্থার রীতি মেনে সবই আছেÑ দুই বেড, এক ড্রয়িং, এক ডাইনিং, এক এটাচ্ট সহ দুই বাথ, রান্নাঘর, রান্নাঘর সংলগ্ন ‘টুনি’ বারান্দা, কাপড় ছড়ান, শুষ্কংকাষ্ঠং ফুলের টব, ইস্ত্রি-স্ট্যান্ড, প্রায় পরিত্যক্ত জুতা সেন্ডেলের র‌্যাক ইত্যাদি রাখার জন্য আরেকটি অপ্রশস্ত বারান্দা, তবে সবই মিনি সাইজের যে কারণে ডাইনিং টেবিলের একটি পাশকে সবসময় দেয়াল সংলগ্ন হয়ে থাকতে হয়, সেই একই কারণে ছয়টি চেয়ারকে তিন পাশের জায়গা দখল করতে কিছু ঠেলাঠেলি করতে হয়। তার মধ্যে চারশ পঞ্চাশ লিটারের একটা বড় ফ্রিজ, একশ’ চল্লিশ লিটারের একটা ডিপ, সাড়ে আট কেজির একটা ওয়াশিং মেশিনকেও জায়গা দিতে হয়েছে। ওয়াশিং মেশিনটি ছুটা বুয়ার আগমন নির্গমনের অনিশ্চয়তায় সম্প্রতি সংযোজিত হয়েছে যার ফলে ঠাসাঠাসি ঠেলাঠেলি একটু বেশিই হয়ে গেছে, ঘটনাটি ডিপের তেমন মনঃপুত হয় নাই কারণ তাকেই বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয়েছে, তবুও জাত ভাই বলে কথা, তেমন গাইগুই করে নাই, অবশ্য করেও লাভ হতো না, সংসারে তার প্রয়োজন বেশি বলে দেমাকও বেশি, তার হাত নাড়ায় অসুবিধা হলে গুতাগাতা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে তাই নীরবে ডিপ একটেরে হয়ে আছে।

তবে তিন তিনটি রুমেই দু’টনি তিনটি এসি সংযোগ করে মালেক এই অবস্থার কিছুটা সহনীয় করে নিয়েছে।

এমতাবস্থায় মালেকের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় যা কেবলমাত্র শুক্রবারেই সম্ভব হয়, পরিবারের সকলে মিলে খেতে গেলে অর্থাৎ রিনি, মিনি, সিটন, মালেক, রিনা মিলে খেতে গেলে, রান্নাঘর থেকে রিনিকে এটাসেটা আনতে ডানপাশের সর্বশেষ জনকে উঠে দাঁড়াতে হয়, মেহমান এলেও এই একই ব্যবস্থা, যা তাদের সময় সময় কিছু বিব্রত করে।

শুক্রবারের সম্মিলিত আহারও একটা অসম্ভব ব্যাপার হতো যদি না মালেক বকাঝকা করে রিনি মিনি সিটনকে টেবিলে আনত, তারা প্লেটের চারদিকে মাছ, মাংস, সবজি, ভাজি, ডাল ভাতের একটা ভজঘণ্ট সাজিয়ে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে ল্যাপটপ মোবাইল টিপিতে টিপিতে খেতে বেশি পছন্দ করে।

তাদের কিঞ্চিৎ সামাজিক করার মানসে মাঝে মাঝে মালেক এই যৌথ আহারের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে। আরেকটি প্রচেষ্টাও সে করে, অধুনালুপ্ত বিরল প্রজাতির কোনো মেহমান দৈবক্রমে তার আসবাবপত্রের সমন্বয়হীন জবরজং ড্রইংরুমে এসে বসলে, ছেলে মেয়েদের ডেকে এনে প্রাণপণ চেষ্টা করে তাদের অংশগ্রহণ করাতে, তবে তারা বিরক্ত মুখে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে কায়ক্লেশে একটা সালাম দিয়া পালিয়ে যায়, কেননা তাদের এসব পছন্দ না, আরেক অবস্থায়ও তাদের মুখের অবস্থা পূর্ববৎ হয় যখন কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে মালেক তাদের জোর করে নিয়ে উপস্থিত হয় অথবা ঠেলেঠুলে পাঠায়, তাদের সর্বাধিক রাগ হয় মাও যখন এতে সায় দেয়, কেবল বন্ধুরাই তাদের একমাত্র আত্মীয়, তাদের সাথেই তাদের কিছুটা সহজ সম্পর্ক, তারপরও মলেক আত্মপ্রসাদ লাভ করে যে, আর যাই হোক তার ছেলে মেয়েরা এখনও সম্পূর্ণ  অসামাজিক হয় নাই।

ড্রয়িংরুম, ডাইনিংরুম, রান্নাঘর ছাড়া অন্যান্য ঘরগুলো যার যার তার তার, এহেন অবস্থায় আত্মীয় স্বজন এসে থাকবার জায়গা বা অবকাশ কোথায়? তারপরও মালেকের ছোট বোন আম্বিয়া নিরুপায় হয়ে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে নেত্রকোনা থেকে সেদিন এসে উপস্থিত। মাঠে খেলিতে গেলে মেয়েটাকে কুকুরে কামড়েছিল, পাগলা কুকুর। মাঠে খেলাধুলা, কুকুর দুই-ই এখন বিরল হলেও পরী নিকটবর্তী মাঠে খেলতে গিয়েছিল এবং পাগলা কুকুরটি কোথা থেকে এসে কামড়েও দিয়েছিল। স্থানীয় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে, এইচডিসিভি’র পাঁচটি ডোজ যথানিয়মে পুশ করলেও ভ্যাক্সিনে আটা ময়দা কি ছিল কে জানে কাজ হয়নি, কয়েকদিন পরেই রোগের লক্ষণ দেখা দেয় এবং বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, এদিকে আম্বিয়ার প্রবাসী স্বামী উদ্বিগ্নচিত্তে যত টাকা লাগে মেয়েকে সারিয়ে তুলতে তাগাদা দিতে থাকে, উপায়ান্ত না দেখে আম্বিয়া একাই মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় ভাইয়ের বাসায় এসে উপস্থিত হয়, ঢাকায় আসতে আসতে তার রাত হয়ে যায়, মালেক তখনও বাসায় ফিরে নাই, আম্বিয়া বুঝে নেয় বাসায় একজন কলেজ পড়ুয়া সংসার বিচ্ছিন্ন ভাতিজা থাকলেও মালেক না ফিরা পর্যন্ত মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার উপায় নেই, তা আগামীকালের আগে হওয়ার নয়।

ইদানীং প্রায়ই মালেকের বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যায়, সে বেশ একটা বিপদের মধ্যে আছে, বিপদের কারণ একটা ‘জিজ্ঞাসা’, ঐ একটা জিজ্ঞাসাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মালেক রেলে চাকরি করে। অনেক তয়-তদবির, খরচা-খরচি করে দীর্ঘদিন ধরে কমলাপুরের  পোস্টিংটা  ধরে রেখেছে। সেদিন সন্ধ্যায় ডিউটিতে থাকা অবস্থায় সে লক্ষ করে একজন সুন্দরী মহিলা, বোধকরি বিদেশিই হবে, অনেক্ষণ ধরে গোমরামুখে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে। মালেকের কৌতূহল হয়। কৌতূহলও জগতের আরেকটি অনিষ্ট। জিজ্ঞাসা করি করি করেও সে বেশ কয়েকবার মহিলার আশপাশ দিয়ে হেঁটে এসেছে, মহিলা ভ্রুক্ষেপহীন। কৌতূহল দমন করতে না পেরে মালেক এক সময় বাংলাতেই জিজ্ঞাসা করে বসে, ‘আপনার কি হয়েছে, এখানে বসে আছেন কেন?’ সহমর্মিতার ভাষা সর্বত্রই এক, তা সার্বজনীন, মহিলা বিদেশি হলেও মালেকের কথা বুঝতে অসুবিধা হয় না, তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে দুর্বোধ্য ইংরেজিতে যা বললেন তার মর্মোদ্ধার করলে দাঁড়ায়, ‘চিটাগাং থেকে ট্রেনে আসার সময় তার হাতব্যাগটি চুরি হয়ে গেছে, তার সাথে গেছে তার পাসপোর্ট ডলার সব। তিনি শুনেছেন বাংলাদেশের পুলিশে ধরলে আঠার ঘায়ের ওপর বত্রিশ ঘা, তাই সাহস করে পুলিশে যেতে পরছেন না।’  তিনি একটু বেশিই শুনেছেন। সুন্দরী মহিলাটির ওপর মালেকের এত মায়া হয় যে তার সমস্ত সমস্যা নিজ কাঁধে তুলে নিতে মুহূর্তও লাগল না, সে সেই রাতেই পুলিশের শরণাপন্ন হয়, পুলিশ এফআইআর লিখে নেয়, সেই সাথে আশ্বাস দেয় যে উদ্ধারের সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, তবে কিছু সময় লাগবে কিন্তু এখন সমস্যা হলো মেমসাহবকে নিয়ে মালেক করে কি? বিবিধ কারণে বাসায় নেওয়ার উপায় নেই, তাই সে ভালো দেখে একটা হোটেলে তুলে দেয়। মেমসাহেবের হাতে টাকা পয়সা নাই, মালেকের তাতে তেমন অসুবিধা নাই, টাকার অভাব তার নাই, মালেক উপেক্ষণীয় সরকারি চাকরি উপেক্ষা করে এদেশে বিরল ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডের’ আশায় পুলিশে পুলিশে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে, অন্তত পাসপোর্টটি ছাড়া তো ভদ্রমহিলা দেশে ফিরতে পারবে না কিন্তু তাতে তেমন লাভ হয় না, লাভের মধ্যে লাভ যা হতে পারে তাদের মধ্যে ‘লাভ’ অর্থাৎ প্রেম হতে পারে। ভদ্রমহিলা মালেকের ওপর যে পরিমাণ নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে সে সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এদিকে মালেকের রাতকে দিন এবং দিনকে রাত এক হতে দেখে রিনার চোখে সন্দেহ উঁকি দেয়। বাসায় ফিরলেই রিনা নীরবে তার মুখ নিরীক্ষণ করতে থাকে, তাতে তার অস্বস্তি বাড়ে, মুখে অপরাধের ছাপ গাঢ়তর হয়, রিনার সন্দেহে আরেক পোঁচ কালি পড়ে, মালেকের কাপড়-চোপড়, মোবাইল, মানিব্যাগ উত্তমরূপে চেকিং হতে থাকে।

মালেক এদিকে কতদিন আর মেমসাহেবকে হোটেলে রেখে চলবে, পুলিশের দীর্ঘসূত্রতার পরিসীমা না থাকলেও পকেটের রেস্তের তো সীমাপরিসীমা আছে, মালেককে তাই বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে হয় কিন্তু কিছুই খুঁজে পায় না, অস্থির মাথায় কিছুই কাজ করে না, মরিয়া আম্বিয়া যেদিন পরীকে নিয়ে বাসায় এসে ওঠে, মরিয়া মালেকও সেদিনই মনিকাকে বাসায় এনে তোলে।

মনিকার রূপে ঘর আলো হলেও রিনার হৃদয়ে ঢেঁকির শব্দ বাজে, তার মুখ অন্ধকার হয়ে ওঠে, এরূপ অবস্থায় দুর্ব্যবহার মধ্যবিত্তের সৌজন্যের বাইরে না পড়লেও রিনা স্বভাবগত কারণেই তা করতে পারে না সুতরাং সে বুকে পাথর বেঁধে ঘরকন্যা করতে থাকে, প্রাণপণ চেষ্টা ও শাসন সত্ত্বেও নীরব কান্নায় তার বুক ভার হয়ে থাকে, শাড়ির আঁচল আষাঢ়স্য হয়ে উঠতে চায়। মনিকা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ও মালেক চিন্তিত মুখে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে থাকে।

বন্ধ দরজার ভিতরে নিজ নিজ জগতের অন্তরালে বিশ্বজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছেলেমেয়েরা বাইরের পৃথিবীতে যে এতকিছু ঘটে চলেছে তার কিছুই টের পায় না, টের পেলেও তাদের আগ্রহ আকর্ষণ করিতে পারত কিনা সন্দেহ।

ইতিপূর্বে রিনা ছেলেমেয়েদের ঘরের দখল নিতে না পেরে আপাতত আম্বিয়াকে নিজের ঘরের দখল ছেড়ে দিয়েছে। পরীর অবস্থা ভালো নয়, অস্থির চিত্তে আম্বিয়া বারবার মেয়ের মুখ নিরীক্ষণ করছে আর ভাইয়ের অপেক্ষায় অস্থির সময় পার করছে।

নিজের একান্ত অস্থির মানসিক অবস্থায় রিনা আম্বিয়াকে ভাইয়ের আগমনের খবর দিতে সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। ইত্যাকার ঘটনা দুর্ঘটনায় কখন রাত  একটা বেজে গেছে, হঠাৎ পরী চোখ উল্টে দেয়, ঘন ঘন শ্বাস উঠতে থাকে, কষ্টে পরীর হাত মুখ পা ধনুষ্টংকার রোগীর মতো বেঁকে যেতে থাকে। আম্বিয়া ভাইয়ের নীরব আগমনের খবর পায় নাই, সে মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অসহায়ের মতো বলতে থাকে, ‘হে আল্লাহ যদি নিতেই হয় নিয়ে যাও, ওকে আর কষ্ট দিও না, আমি ওর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।’

এ দিকে সারা দিনে রিনার কষ্টও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, সে আর থাকতে পারল না, রান্নাঘর থেকে ছুটে গিয়ে মালেকের পায়ের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে বলতে লাগল,‘আমি আর পারছি না, আমাকে মুক্তি দাও, মুক্তি দাও, এই মেয়েকে আমার চোখের সামনে থেকে যেখানে খুশি নিয়ে যাও, এক্ষুনি।’ মালেক প্রথমে থতমত খেয়ে যায় পরে রিনাকে তুলতে তুলতে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘তাই তো নিব, এতক্ষণ ধরে তাই তো ভাবছিলাম কি করে কথাটা তোমাকে বলব, তুমি তো কাজটা সহজ করে দিলে। ভাইয়ের জন্য ইতালিতে বসবাস করে এমন মেয়ে খুঁজছিলে, ওতো ইতালিরই মেয়ে, ওর পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে, মুন্নার সাথে বিয়ে দিলে ও ইতালি ফিরে যেতে পারে, মুন্নাও নাগরিকত্ব পেয়ে যায় সহজে, ভেবে দেখ।’ আগে হলে রিনা রাজি হতো কিনা সন্দেহ, এখন বিপদ অন্যের ওপর দিয়ে যাওয়ায় সে খুশি হয়ে ওঠে, ঠোঁটে হাসি, চোখে কান্না, মুখে লাল লজ্জা নিয়ে একবার মালেকের দিকে একবার মনিকার দিকে তাকায়।

এমন সময় ভিতরের ঘর থেকে আম্বিয়ার আর্ত চিৎকার ভেসে আসে, মালেক ও রিনা আতঙ্কিত চোখে পরস্পরের দিকে তাকায়, দৌড়ে যায় আম্বিয়ার ঘরের দিকে। মনিকা কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিছুক্ষণ পর নিস্তব্ধ রাতের আঁধার বিদীর্ণ করে একটা অ্যাম্বুলেন্সকে  দ্রুতগতিতে এদিকেই ছুটে আসতে দেখা যায়। 

নাক-মুখ ঢাকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করুন সুস্থ ব্যক্তি  থেকে ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন আইইডিসিআর- এর হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করুন।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares