সাদার্ন ভিউ : মিলু শামস

ঘটনা শুরু বেশ ক’দিন আগে থেকে। ফাহিমের মনে হচ্ছিল তার অবয়ব ক্রমশ বদলাচ্ছে, কথা বলতে গেলে মুখ সুচালো হয়, শব্দ বেরোয় না। নাকের দু’পাশে চিকন শুঁড় লিকলিক করে। যা কিছু ধরতে যায়, ধরা যায় না। দু’হাত সরু সুতার মতো বাতাসে দোলে। পা-ও যেন পরিচিত প্রকরণে কাজ করে না আর। হাতের মতোই সরু হয়। এ অনুভূতির কথা সে লুকিয়ে রাখে নিজের ভেতর। কারও সঙ্গে শেয়ার করে না। সবচেয়ে কাছের বন্ধু শাকিল কিংবা প্রেমিকা নবনীর সঙ্গেও না।

নবনী যে কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে কাজ করে তাদের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড সুনামে নবনীর অবদান অপরিসীম। কাজের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, কোম্পানির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে কোম্পানির সঙ্গে নিজের ব্যক্তিসত্তা একাকার করে দেওয়ার অবিরাম প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করেছে কোম্পানিও। সদ্য তাকে দক্ষিণ এশিয়া জোনের বাংলাদেশ শাখার চিফ মার্কেটিং অফিসার পদে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে।

ফাহিমও সদাগরি আপিসে হরিপদ কেরানি নয়। দেশের প্রথম সারির আবাসন কোম্পানির সেলস উইংএ দায়িত্বশীল পদে কাজ করে। কথা সেটা নয়, ওই বদলে যাওয়া নিয়ে বিব্রত সে। দেশি-বিদেশি বন্ধুদের নিয়ে নবনী যে দিন প্রমোশন সেলিব্রেটের পার্টি ডেকেছিল বিপত্তি ঘটেছিল সেদিন।

সাদার্ন ভিউ প্রকল্পের শেষ বাধা সেদিন দূর হয়েছে। তিনটি প্রতিবন্ধকতার জন্য দীর্ঘদিন প্রকল্পের পুরো কাজই প্রায় আটকে ছিল। এ ধরনের বেশ কয়েকটা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বেশিরভাগই টাকা পয়সা লেনদেনে শেষ হয়েছে। এককালীন পরিশোধ করেছে কোম্পানি। আর যা হোক, টাকা পয়সা নিয়ে ছোটলোকি পছন্দ নয় এমডির। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসীদের মধ্যেও কোম্পানি সুনাম কুড়িয়েছে। কিছু টাকার জন্য তা নষ্ট করা যায় না। যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোনো না কোনোভাবে তারা এখানকার আবাস তুলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু বেঁকে বসে প্রকল্পের মাঝ বরাবর তিন পরিবার। কোনো কিছুর বিনিময়েই পূর্বপুরুষের ভিটার আবেগ ছাড়তে রাজি নয় তারা। প্রথমে বাজারদর অফার করেছিল কোম্পানি। গা করেনি তারা। এরপর দ্বিগুণ, তিনগুণ, শেষে আরও বেশি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এক কথাÑ আবেগের কোনো বিনিময়-মূল্য হয় না। পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল। অতএব বাধ্য হতে হয়েছিল কোম্পানিকেও।

এত বড় প্রকল্প লোকসানে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মানুষের হাতে এখন অঢেল টাকা। বিত্ত বদলের সঙ্গে জন্মেছে লাইফ স্টাইল বদলের আকাক্সক্ষা। আকাক্সক্ষা উস্কে দেওয়ার মধ্যেই আসল ব্যবসা। এমডি মাঝে মাঝে তরল গলায় বলেন, এও এক ধরনের আর্ট। মানুষের মনে স্বপ্ন বোনা। সময়ের সুরকে সঠিকভাবে ধরতে পারাই সফল ব্যবসায়ের অন্যতম শর্ত। কে জানে, আজ থেকে বিশ বছর পর হয়তো মানুষের আকাক্সক্ষার রঙ বদলে যাবে।

তবে এমডি যাকে আর্ট বলেন, ফাহিম তার স্বরূপ কিছুটা হলেও জানে।

সাদার্ন ভিউ প্রশ্নে বোর্ড মিটিং থেকে সিদ্ধান্ত এসেছিলÑ একবারে নয়, অ্যাকশনে যেতে হবে সময় নিয়ে। পর্যাপ্ত বিরতির পর পর। প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এতে আপাতত পিছিয়ে যাবে, তা যাক। লাভ-ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাবে প্রফিট এতেই বেশি। আর গুড উইলের ব্যাপার তো রয়েছেই। কোনোভাবেই তা নষ্ট করা যাবে না। ধৈর্য এবং গুডউইল ব্যবসায়ের অন্যতম মূলধনÑ এমডি দৃঢ় গলায় বলেছিলেন। টেলিভিশন রেডিও বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন যেমন চলছে চলবে। পুরনোগুলোর পাশাপাশি নতুন বিজ্ঞাপনে যেতে হবে এবং টেলিভিশনের প্রাইম টাইমে প্রচার নিশ্চিত করতে হবে। সাদার্ন ভিউ’র আগমনি বার্তার টানটান ইমেজ থেকে দর্শকের মনোযোগ সরানো যাবে না। তা প্রকল্প বাস্তবায়নে যত দেরিই হোক। বিজ্ঞাপনের বর্ণাঢ্য আকর্ষণে সম্ভাব্য ক্রেতার স্বপ্নের সিঁড়ি তরতর করে আকাশ ছোঁবে। সুন্দর একটি ফ্ল্যাটের অভাববোধ তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।

সেদিন বোর্ড মিটিংয়ে ফাহিমসহ আরও অনেকে উপস্থিত থাকলেও এমডি তার দুই সহযোগী নিয়ে একান্তে আরেকটি মিটিংয়ে বসেছিলেন। খুব জরুরি কিছু হলে এ ধরনের গোপন মিটিং হয়। ফাহিমরা এটুকুই শুধু জানতে পারে। ওখানে আলোচনা কি হয়, সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মপরিকল্পনাÑ কিছুই জানা যায় না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বড়সড় কোনো পরিবর্তন বুঝিয়ে দেয় মিটিংয়ের বিষয়বস্তু কি ছিল। এবারও তাই হলো। তবে এবারের ঘটনার ব্যাপ্তি ধারণ করা ফাহিমের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বোর্ড মিটিংয়ের মাসখানেক পর সেদিন ছুটির দিনের শুরুটা ঢিলেঢালাভাবে হলেও সন্ধ্যায় নবনীর নিমন্ত্রণে যাওয়া নিয়ে খানিক উত্তেজনাও ছিল। বিশেষ করে পার্টির বিষয় যখন প্রমোশন সেলিব্রেট। কিছুদিন ধরে ওই অদ্ভুত অনুভূতি হওয়ায় স্বস্তিতে ছিল না ফাহিমের মন। বহুদিন পর সেদিন সকালটা একটু অন্যরকম শুরু হয়েছিল। মনে মনে গোটা দিনের পরিকল্পনা ছকে নেয়। ব্রেকফাস্ট সেরে বিউটি স্যালনে গিয়ে হেয়ার ট্রিটমেন্ট ও ফেসিয়াল। তারপর উষ্ণ জলে লম্বা শাওয়ার। তারপর…

হঠাৎ টেলিভিশনের স্ক্রলে চোখ আটকে যায় ফাহিমের। ‘গত রাতে পিকনিক থেকে ফেরার পথে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় তিন পরিবারের নয়জন নিহত।’

তিন পরিবার! হৃৎপিণ্ডে রক্ত ছলকে ওঠে। সাদার্ন ভিউ  প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তাদের অফিসে এ শব্দ দুটো এখন বার্নিং ইস্যু। টেলিভিশনের কোন চ্যানেলে নিউজটাইম এখন? কিছুতেই মনে পড়ছে না। দ্রুত সেল ফোন হাতে নেয় ফাহিম। অনলাইন পোর্টালে পেয়ে যায় বিস্তারিতÑ ‘তিন প্রতিবেশী পরিবার চন্দ্রায় পিকনিক করে মাইক্রোবাসে ফিরছিল। আরিচা রোডের ব্যাংকটাউন ও ফুলবাড়িয়ার মাঝামাঝি পৌঁছলে বালিভর্তি দুটো ট্রাক মাইক্রোবাসের পেছন থেকে পরপর ধাক্কা দেয়। ড্রাইভারসহ গাড়িতে মোট তেরো জন ছিল। নয়জন স্পট ডেড। ড্রাইভারও ঘটনাস্থলে নিহত। বেঁচে যাওয়া তিনজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় সাভার ঈমান আফল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দু’জন শিশু একজন নারী। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন অবস্থা আশঙ্কাজনক। চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে কিছু বলা যাচ্ছে না…’

ফাহিমের চেতনা মুহূর্তে বিবশ। অদ্ভুত সেই অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়ে শূন্যে ভাসে সে। শেকড়হীন। অবয়বহীন। নিজের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে না। কোথায় সে? রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকায়? সে কি বিকশিত সভ্যতার আরিচা রোড নামের এক নির্জন রাস্তার বাঁকে নাকি বিকাশমান ‘নিউ ওয়ার্ল্ডে’র কৃষ্ণাঙ্গবাহী জাহাজের খোলে? দস্যু কলম্বাসের সঙ্গে পৌঁছে গেছে আন্দেজ, গুয়াতেমালা মেক্সিকোর ইন্কা, মায়া, আজটেক সভ্যতার ধ্বংসযজ্ঞে? ‘সভ্য নতুন দুনিয়া’র জলতরঙ্গের সুরে ভাসছে কি সেÑ ‘দখল বাড়াও, অধিপতি হও…’। সেকি তলিয়ে গেছে সেখানে? নাকি চাপা পড়েছে সাদার্ন ভিউ’র নগরায়নের নিচে? গত রাতে যেখানে একটি বসতির ইতিহাস মুছে গেল।

দুপুরের দিকে এমডির জরুরি তলব, সন্ধ্যায় দেখা করতে বলেছেন বাসায়।

নবনীর পার্টিতে তার আর যাওয়া হয় না সেদিন।

দুই

‘এসো এসো ফাহিম, চিয়ার আপ’। এমডির ড্রয়িং রুমে পা দিয়ে ফাহিম থ। সফ্ট মিউজিক, হার্ড ড্রিংকস আর আলো-আঁধারির স্বপ্নময়তায় শুধু এমডি নন, ভাসছে তার দুই সহযোগীসহ অফিসের আরও ক’জন।

‘জেনে খুশি হবে আগামীকাল থেকে সাদার্ন ভিউ প্রকল্পের কাজ পূর্ণোদ্যমে শুরু হচ্ছে’।

গমগমে গলায় বলেন এমডি। ‘অনেক দেরি হয়েছে। পুষিয়ে নিতে দু’গুণ তিনগুণ এফোর্ট দিতে হবে। সেভাবে তৈরি রাখতে হবে নিজেকে।’

ফাহিম টের পায় আবার,  নাকের দু’পাশে তেলাপোকার মতো সূক্ষ্ম  শুঁড়। হাত নেই। পা নেই  মেরুদণ্ড নেই। সেকি তবে সত্যিই এ নগরীর তেলাপোকা এক!

তাহলে… তাহলে…

তার চারপাশে শব্দ থেমে যায়।

নিভে যায় আলো।

থমথমে আঁধারে সে যাচ্ছে…যাচ্ছে … ডাইনিং টেবিলের তলা দিয়ে… চেয়ারের পা ঘেঁষে স্টোরের নির্জন কোনে… ইতিহাস প্রাগৈতিহাসিক কালের সরীসৃপদের খোঁজে। নিজের অক্ষমতাকে করুণা করতে করতে, করুণা করতে করতে মিশে যায় স্টোরের তেলাপোকাদের ভিড়ে…

তিন

রাতে নবনী এসে নিয়ে যায় তাকে। যাওয়ার আগে দৃঢ় কণ্ঠে ফাহিমের এমডিকে বলে,

আশা করি সামনের সপ্তায় মিটিংয়ে উপস্থিত থাকবে ফাহিম।

অফকোর্স, আমরাও তাই আশা করি। ফাহিমের মতো ব্রিলিয়েন্ট তরুণ আমাদের প্রকল্পকে বহুদূর এগিয়ে নেবে। সৃমদ্ধ করবে কোম্পানিকে।

সাফল্যের খুশি জমে থাকা ঘরের বাতাস ভেদ করে ভেসে আসে এমডির গলা।

ধীর শান্ত পায়ে বেরিয়ে যায় নবনী, বহুজাতিক বাণিজ্য সংস্থার সফল কর্মকর্তা।

ফাহিম এখন তার তত্ত্বাবধানে।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares