নিমজ্জিত : জাহিদ হায়দার

চৈত্র মাস। নিঃশ্বাসে হলকা। আকাশের কোথাও মেঘের শাদাকালো চিহ্ন নেই। ওপরে তাকালে চোখ তিরতির করে। মাটির বুকের হাড় চৌচির। কৃষকেরা আকাশ দেখে। মাটি দেখে। সেচ দিলেও মাটিতে লাঙল যতটা সহজে চলবার কথা, চলবে না। লাঙল টানতে গরুর জিহ্বা বের হয়ে যাবে। লালা পড়বে মাটির ওপর। গাছের পাতার ছায়ার নিচে, ছায়াও গরম, বসে পাতি কাক হাঁপাচ্ছে।

২.

এ রকম পোড়া দিনে মালিবাগের ছত্রিশ নম্বর বাসায় আসে প্রথম আসাদ হাবিব। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি। সুন্দর যুবক। উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফিট আট ইঞ্চি হতে পারে। দাড়ি ও গোঁফ নেই। চুলে চিরুনি লাগাতে তার আলস্য লাগে। কিছু চোখ আছে, গভীরতা বেশি, একটা ঘুমন্তভাব, আসাদের চোখ সে-রকম। বাপের পাশে প্রতিদিন বসে বড় শাড়ির দোকানের ব্যবসা বোঝার চেষ্টা করে। একাডেমিক পড়াশোনা বিএ পর্যন্ত। ছাত্র ছিল সাধারণ মানের। আসাদ কলেজ থেকে কবিতাকে ভালোবাসতে শেখে। বাংলার শিক্ষক ক্লাসে জীবনানন্দ দাশের কবিতার সৌন্দর্য আর রহস্যময়তার কথা বলতেন। গায়ের রং উজ্জ¦ল শ্যাম। শ্যাম বললে অনেকের কৃষ্ণের মুখ মনে পড়ে। মনে পড়ে না প্রয়াগের বটগাছবিশেষ।  

দ্বিতীয় আসাদ হাবিব কবি। বাসিন্দা মালিবাগের ছত্রিশ নম্বর বাসার। উচ্চতা পাঁচ ফিট চার ইঞ্চি। মাথায় ঘন চুল। নাক আর ঠোঁটের মধ্যে ভালো গোঁফ। বাম চোখ অল্প ট্যারা। মা তাকে বলতো : ‘লক্ষ্মীট্যারা।’ বোয়াল, পাঙাস, আইড়Ñ এসব মাছের নাভি কালো হলে মাছটি পচা, জানে। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের শোল, মাগুর কিনতে হয় না, এসব মাছের মাথায় তখন পোকা হয়, জানে। বিভিন্ন রকমের, রঙের ছোটো পাথর স্বচ্ছ কাচের পাত্রে রাখে। চশমা ছাড়া মাশরাফির সাধারণ গতির ক্রিকেটের শাদা বলও টিভিতে ভালো মতো দেখতে পায় না। এরও গায়ের রং শ্যামলা। কোনো মেয়ে এই দ্বিতীয়কে কখনও বলেনি কৃষ্ণের গায়ের রং ছিল তোমার মতো। বলেনি, ‘এসো, ধরো হাত। ওই যে তমাল।’  

৩.

শুক্রবার। বেলা তিনটে। ভ্যাপসা গরম। দ্বিতীয় আসাদ কিছুক্ষণ ভাতঘুম, ভাত পেটের ভেতর পড়বার পর ধীরে ধীরে দোচোয়ানির মতো হয়, তা বাংলার এক বিশেষ স্বাদযুক্ত মদ, তার প্রতিক্রিয়ায় চোখে আলস্যজড়ানো, সুখবহুল ঘুম আসে, উপভোগের জন্য বিছানায় গেছে।

ফুল স্পিডে মাথার পাশে ঘুরছে টেবিল ফ্যান। বালিশের পাশে ‘জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা’। খাটের মাথার দিকে দুই ফিট উঁচু খাড়া কাঠের ওপর দুটো বালিশে মাথা ও ঘাড় ঠেকিয়ে, এক আরামপ্রদ শয্যা, খুললো ‘সাতটি তারার তিমির।’ আকাশের অসীম অন্ধকারের সঙ্গে সাতটি তারা রক্তপাতহীন কঠিনতম নিঃশব্দ যুদ্ধে অক্লান্ত । লক্ষ্য : আলোর পরাজয় নয়। 

প্রেমিকদের জন্য নিষ্ঠুরতম কবিতা ‘আকাশলীনা’ সম্পর্কে কবি জাহিদকে পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখতে হবে। বসন্ত ঋতু নয়, পত্রিকার সম্পাদক কেন চৈত্রমাসের সংখ্যা ‘প্রেমের কবিতায় সুখ-দুঃখ’ করবে আসাদ বুঝতে পারে না। সম্পাদককে কথা দিয়েছে, লিখবে।

‘আকাশলীনা’র প্রথম পঙ্্ক্তি ‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি’ পড়ে দ্বিতীয় পঙ্্ক্তিতে যাবার আগে আসাদের মনে হয়, ‘সুরঞ্জনার পর জীবনানন্দ কমা ব্যবহার করলেন কেন? এই মুহূর্তবিরতিতে কি প্রেমিক যুবকের দীর্ঘশ^াস আছে? ‘ওইখানে’ আসলে কোন্খানে? প্রথম চার পঙ্্ক্তির স্তবকে দু’বার একটি নাম বলা কবিতার জন্য দুর্বলতা। অন্যভাবে ভাবলে, প্রেমপীড়িত যুবক দু’বার নাম ধরে ডাকতেই পারে।’ ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনে আসাদের বউ যূথিকা। কবির স্বর বিরক্তির। ‘মানুষের আক্কেল দিনদিন কমে যাচ্ছে। এই সময়, এই দুপুরে কেউ আসে? বউ দেখো না কে?’ ‘খুব জরুরি কাজ না থাকলে আসতো না’ বলে যূথিকা দরজা খুলতে যায়।

‘বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;/ফিরে এসো সুরঞ্জনা:’ যুবকের দুটো বিনয়ী অনুরোধ ‘বোলোনাকো’, ‘ফিরে এসো’ সুরঞ্জনাকে। প্রথম পঙ্্ক্তির ‘ওইখানে’ এবং  ‘নাকো’, দ্বিতীয় পঙ্্ক্তির ‘বোলো’র সঙ্গে ‘নাকো’ এবং ‘ওই’, এ রকম দুর্বল ধ্বনিপূর্ণ অন্তমিলের পরও এখনও কবিতার দীক্ষিত পা কেরা মুগ্ধ হয়ে ‘আকাশলীনা’ পড়ে। হয়তো যখন পড়ে, মনে করে, প্রেম ডাকছে অপ্রেমের কাছে চলে যাওয়া প্রেমকে। আহ্বানে শুধু মিনতি। তৃতীয় পঙ্ক্তির সুরঞ্জনা’র পর আশ্চর্য কোলনে  থেমে কবি আসাদ ভাবছে, ‘যুবক আর সুরঞ্জনার দূরত্ব কতটুকু ছিল? যুবকের কথা বা ডাক কি সুরঞ্জনা শুনেছিল? নাকি যুবক এক কষ্টকর স্বগতোক্তি করেছে মাত্র, শুধু কথা বলেছে নিজের ক্ষরণের সঙ্গে? প্রথম পঙ্ক্তিতে ‘ওইখানে’ বলতে যে-জায়গার প্রতি ইঙ্গিত, তা কী জীবনানন্দের বিখ্যাত ‘নির্জন’ কোনো জায়গা, যেখানে সুরঞ্জনা যাচ্ছে যুবকের সাথে। যুবক শব্দে অনেক যৌবন। এমনও হতে পারে, এক অন্য যুবক সুরঞ্জনার সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত। এবং ‘ফিরে এসো হৃদয়ে আমার’ বলে প্রেমিক বা স্বামী যুবক শুধু সতর্ক বা নিষেধ করছে সুরঞ্জনাকে।

‘শুনছ, তোমার কাছে একটি ছেলে এসেছে। ছেলেটি ঘামছে।’ যূথিকার ঘষঘষে গলা। ভোরবেলা আসাদের সঙ্গে নৃত্যপরবশ ধরনে প্রেম করবার পর বেশিক্ষণ গোসল করবার ফল : গলায় ঠান্ডা লেগেছে।  

দরজা খুলে, দ্বিতীয় আসাদের কণ্ঠে, চোখেমুখে বিরক্তি, ‘কাকে চান?’ প্রশ্নের উত্তরে প্রথম আসাদ বলল, ভাষা প্রমিত, টান যশোর অঞ্চলের, ‘ভদ্রমহিলা বললেন, এটাই আপনার বাসা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটাই কি কবি আসাদ হাবিবের  বাসা?’

ক্লান্ত। অবসন্ন মুখ। না ঘুমানো চোখ। পরনের জিন্সপ্যান্ট মলিন। হালকা নীল পাঞ্জাবি কুচকানো। পায়ে খয়েরি স্যান্ডেল শ্যু। বিকালে বা গতরাতে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে শেভ করেছিল। যুবককে দেখে দ্বিতীয় আসাদের মায়া হলো। মায়া শিশিরে সর্বক্ষণ ধৌত এক সৌন্দর্য, যা চিরদিনের সংগ্রহে রাখবার মতো এক মানবিক ব্যথা। বললো ‘ভেতরে আসুন।’

প্রথম আসাদ সকাল দশটার দিকে ঢাকার গাবতলিতে নেমেছে। যাত্রা নড়াইল থেকে। সারারাত বাসযাত্রা ও রাস্তার ধকলে যতপরনাস্তি ক্লান্ত। গাবতলি থেকে দ্বিতীয় আসাদের বড় ভাইয়ের অফিস প্রেসক্লাবে গেছে। বড় ভাই সাংবাদিক। কবির খোঁজ প্রথম আসাদ পেয়েছে নড়াইল প্রেসক্লাব থেকে। ক্লাবের এক সাংবাদিক আসাদকে বলেছে, আমাদের কাগজের রশিদ হাবিব কবি আসাদ হাবিবের বড় ভাই। ঘরে ঢোকার সময় আগন্তুক বিনয়ের স্বরে বলে : ‘আমি আপনার কবিতার ভক্ত।’

দ্বিতীয় আসাদ প্রথম আসাদকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, ‘ডানদিকে বাথরুম, আপনি হাতমুখ ধুয়ে নিন। আপনি খুব ক্লান্ত। ঘামছেন।’ 

কাঁধে ছিল চামড়ার ছোটো ব্যাগ। প্রথম আসাদ কোনো কথা না বলে, একবার ড্রয়িংরুমের বইয়ের আলমারির দিকে তাকাল। এবং ব্যাগটা বেতের চেয়ারের পাশে ‘সন্তর্পণে’ রেখে ‘ম্লান হেসে’ ক্লান্তি ধুতে বাথরুমে যায়। দ্বিতীয় আসাদ বেশ উঁচু গলায়, যেন প্রথম আসাদ বাথরুম থেকে শোনে, ‘বউ একটু চা দিও।’ ডাইনিং টেবিলের কাছেই ছিল যূথিকা, বলল ‘বলবার আগেই তুলে দিয়েছি।’ যূথিকা জানে আসাদের অতিথি সেবার আচরণ। সাত বছরের সংসার-সঙ্গ দু’জনের। তার আগে ছিল তিন বছরব্যাপী দুজনের স্বপ্ন এবং বাস্তবতার সন্ধিক্ষণ বোঝার রাত্রি আর দিন। ‘সঙ্গে বিস্কুট’, দ্বিতীয় আসাদের কথার উত্তরে শোনা গেল,‘আচ্ছা।’ 

প্রথম আসাদ বাথরুমে বেশ সময় নিচ্ছে।

ফোন আসল। ‘প্রবন্ধ কতদূর?’ সম্পাদকের ফোন। ‘কিছু নোট করেছি, জানেন তো আকাশলীনা এক নিষ্ঠুরতম কবিতা’ কবি আসাদের কথা শেষ হয়নি, সম্পাদকের ইনট্রাপশন, বেশ জোরে জোরে, কণ্ঠে উত্তেজনা, ‘আপনার লেখার শিরোনাম হতে পারে, ‘আকাশলীনার নিষ্ঠুরতা।’  ‘আরে আপনি যদি আমার লেখার শিরোনাম ঠিক করে দেন তা হলে কেমন হবে?’ সম্পাদক ভদ্র। বললেন : ‘স্যরি। পরশু বিকালের মধ্যে পাঠাবেন। আর্টিস্ট সুরঞ্জনার একটি অসাধারণ ছবি এঁকেছে।’ ‘প্লিজ আমার মেইলে ছবিটা পাঠিয়ে দিন।’ কবির অনুরোধ। সম্পাদক হাসলেন, ‘এখনি পাঠাচ্ছি।’

যূথিকা ড্রয়িংরুমে এসে বলে গেল : ‘চা প্রায় রেডি।’ 

দ্বিতীয় আসাদের মাথার কোষে কোষে ‘আকাশলীনা’র ‘লীনা ও আকাশ’ এবং ‘আকাশ ও লীনা’  নিঃশব্দে, যে-ভাবে জীবনানন্দ রাত্রির কলকাতায় হাঁটতেন, দেখেছেন : হাইড্রান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল’, পা ফেলে ফেলে ওই আকাশ, ওই লীনা, দুই বিপরীত অবস্থা হাত ধরে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। লীন হচ্ছে বিশেষণ। অর্থ : লয়প্রাপ্ত, লুপ্ত, সংলগ্ন, স্থিত। স্ত্রী : লীনা। আকাশ এক ক্ষয়হীন নীল শূন্যতা। অপটিকাল ইলিউশন। কবিতায় যখন আকাশ ব্যবহার করা হয়, কবি অপার স্বাধীনতার, স্বেচ্ছাচারিতার নয়, অবাধ উদারতার রূপচিত্র পাঠককে বোঝান। জীবনানন্দ লীন শব্দের কোন্ অর্থটি ভেবে আকাশের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন? নাকি সুরঞ্জনা নামের মেয়েটি আসলে ‘লুপ্ত’ হয়ে গেছে, নাকি যুবকের চেতনায় ‘সংলগ্ন’ বা ‘স্থিত’? বরিশালের মানুষটির সঙ্গে অলৌকিক দুর্ঘটনায় বা স্বপ্নে দেখা হলে  জিজ্ঞেস করা যেত : ‘সুরঞ্জনা লয়প্রাপ্তা নাকি স্থিতা, নাকি সংলগ্না?’ আকাশের সঙ্গে যে-জন লীন হয়ে যায়, সে-জন কি ভালোবাসাপীড়িত একজন যুবকের ‘কথা বোলোনাকো, যেয়ো নাকো ওই যুবকের সাথে’ বিনয়ী স্বর শুনতে পায়? ভুল হলেও মনে করা যেতে পারে, জীবনানন্দ ‘লীন’ শব্দটির অর্থ ‘স্থিত’ বা ‘সংলগ্ন’ অর্থে ভাববার দ্বন্দ্বে তাঁর পাঠককে তর্কপ্রিয় করতে চেয়েছেন কি না?

আগন্তুক আসাদের মুখচোখ পানির ব্যবহারে কিছুটা প্রসন্ন। ঘাড় ভালো করে মোছেনি। হাতে বড় আকারের শাদা নীল পাড়অলা রুমাল। ভেজা। ও এসে বসবার পর যূথিকা বিস্কিট, নুডল্স আর গ্লাসে বরফের দু’তিনটে টুকরো দেওয়া পানি দিয়ে গেল। স্বচ্ছ কাচের ওপর জমছে ঘামাচির মতো জলকণা। 

প্রথম আসাদ ঠান্ডা পানি গলায় ঢকঢক শব্দ তুলে এক চুমুকে শেষ করে। বলে, ‘আরও পানি খাবো।’ পিপাসিত যুবক আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তুলেছিল হাত, অনেক মানুষ আছে হাতের নড়াচড়ার সঙ্গ না পেলে কথা বলতে পারে না, থেমে যায়। দ্বিতীয় আসাদ বলে, ‘পানি আনছি, নুডল্স খান, বিস্কিট খান।’  

সম্পাদকের টেক্সট : আকাশলীনার ছবি কিছু তথ্যসহ, তথ্যগুলো আপনার প্রবন্ধের জন্য কাজে লাগতে পারে, আপনার মেইলে ও ফোনেও পাঠিয়েছি।

দ্বিতীয় আসাদ ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিল। ড্রয়িংরুমে এসে সম্পাদককে ইংরেজি শব্দটির সংক্ষিপ্ত, মোবাইল কালচারে ব্যবহৃত ‘টিএনএক্স’ লিখে পাঠায়।  

প্রথম আসাদের মুখ থেকে দুটি নুডল্স থুঁতনির নিচ পর্যন্ত ঝুলছে। ছোটো শাদা চিকন কৃমি। ‘তাড়াহুড়া করবেন না। ধীরে ধীরে খান। তারপর কথা বলি।’ 

দ্বিতীয় আসাদ মোবাইলের স্ক্রিনে ‘আকাশলীনা’র ছবি দেখে। ছবির নিচে কিছু তথ্য। পড়ে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার আশি^ন ১৩৪৪ সংখ্যায় প্রকাশিত।

ছবিটি ভালো লাগেনি। সুরঞ্জনার পরনে জিন্স। ওপরে হলুদ আর নীলের মিশ্রণে কামিজ। লম্বাটে গলার দুইপাশ থেকে হালকা সবুজ দড়ির মতো পাকানো ওড়না অসুখি স্তনের ওপর ঝুলছে। বিভাজনের বিন্দুতে আটকে আছে খয়েরি কাঠের ছোটো হার্ট। কানে রূপার ঝুলন্ত দুল। দুই হাতের কব্জিতেই লালহলুদনীলকালো চিকন চামড়ার চুড়ি। চোখ মাঝারি। ঠোঁটে অফ কালারের শেড। দৃষ্টি রহস্যঘন। চুলের কাট স্টেপ। হাঁটছে। ফলে চুল সামান্য উড়ন্ত। হঠাৎ পেছনে তাকানো। গ্রীবার কিছু অংশের ‘নিস্তব্ধতা’ দৃশ্যমান। সামনে শূন্য নীল অনন্ত আকাশ। অদূরে আবছায়া ট্রাম। সুরঞ্জনার হালকা ছায়া তার সামনে রাস্তার ওপর পড়েছে। মনে হতে পারে, ‘গোধূলিসন্ধি’-তে আকাশের গভীরের দিকে চলে যাচ্ছে সুরঞ্জনা।

দ্বিতীয় আসাদের ছবির তিনচারটি মোটিফ ভালো লাগে। সুরঞ্জনার পেছনে তাকানো, শূন্য আকাশ ও ট্রাম। যুবক যখন সুরঞ্জনাকে না-যাবার কথা বলে, সুরঞ্জনা আকাশে লীন হওয়ার দিকে যেতে যেতে একবার পেছনের দিকে তাকাতেই পারে। মনে করা যেতে পারে, সুরঞ্জনার যুবক ওই ট্রামে অপেক্ষমাণ। এবং পরে ওই রকম চলমান ট্রামের ধাক্কায় জীবনানন্দ মারাত্মক আহত হন। পরে মৃত্যু। তার আসল প্রেমিক তখন তাকে যেতে বারণ করে। সব জায়গায় সমকালের ফ্যাসন ব্যবহার করতে নেই, এখনকার অনেক শিল্পী জানে না, বোঝে না রোহিণী কেন বলে, ‘কলিকাতায় বারুণী পুকুর নেই।’  

যূথিকা দুই কাপ চা দিয়ে গেল।

‘আমি নড়াইল থেকে আসছি। আপনার সাথে আমার খুব জরুরি কথা আছে।’ প্রথম আসাদ চায়ে চুমুক দেবার আগে, হাতে কাপ, স্পষ্ট গলায়, কোনো কাঁপন নেই, বললো।

‘বলুন। বেশি সময় নেবেন না। আমি এই সময়ে একটু দিবানিদ্রা দিই। তা ছাড়া অন্য কাজও আছে।’ দ্বিতীয় আসাদ কথাগুলো শেষ করতেই প্রথম আসাদ, ‘আমার নামও আসাদ হাবীব। আমাদের দুজনেরই বড় ভাইয়ের নাম এক। রশীদ হাবীব।’

দ্বিতীয় জাহিদের চোখ স্থির হয়ে যায়। মুখ অল্প হাঁ। যা কখনও করে না, শব্দ করে চায়ে চুমুক দেয়। এবং প্রায় অস্ফুট, অবাক স্বরে বলে : ‘কী বলছেন ! সত্যি?’

প্রথম আসাদ ব্যাগ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র দ্রুত বের করে। দ্বিতীয় আসাদের হাতে দিয়ে বলে, ‘দেখুন।’ নাম সত্য। যুবক নড়াইলের।

‘কী জরুরি কথা?’ দ্বিতীয় আসাদ হেসে জিজ্ঞেস করে। আগন্তুকের চোখের ওপর তার চোখ।

‘নড়াইল কলেজে পড়ে বিএ পড়ে, শ্যামলী।’ শ্যামলী নামটি শুনেই দ্বিতীয় আসাদ বলে, ‘সুন্দর নাম।’ এবং মৃদু হাসে।

‘আপনি হাসছেন কেন?’ প্রথম আসাদের প্রশ্নে দ্বিতীয় আসাদের মনে হয়, হাসা ঠিক হয়নি।  যুবকের কথা বিশেষ মনোযোগে শুনতে হবে। যার সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে তাকে সামান্য গুরুত্বহীন করাও অসভ্যতা।

তিন মাস আগে শ্যামলী শাড়ি কিনতে এসেছিল। দোকানে তখন ছিল প্রথম আসাদ। বেলা বিকাল। সঙ্গে ছিল এক বান্ধবী। নাম রেহানা। একটা সূতির শাড়ি কেনে। বড় নীল পাড়। শাদা জমিন। আঁচলে ময়ূরের নাচ। প্রথম আসাদ হেসে রুচির প্রশংসা করেছিল। ক্যাশবাক্সের পাশে ছিল ‘সাতটি তারার তিমির।’ বেশি কথা বলেছিল রেহানা। প্রথম আসাদ কলেজে যখন ছাত্র তখন থেকেই কবিতা পড়তে ভালোবাসে। পনেরো দিন পর দ্বিতীয়বার যখন দেখা হয়, প্রথম আসাদ উদ্দেশ্যমূলক কথাপ্রসঙ্গে জেনেছিল, শ্যামলীও কবিতা ভালোবাসে। নিয়মিত পড়ে। সেদিন ওরা শাড়ি কেনেনি। শ্যামলী ও রেহানাকে প্রথম আসাদ সেদিন বলেছিল সে কবিতা লেখে। এই বিপজ্জনক মিথ্যাটি শোনার পর শ্যামলী হেসে বলেছিল : ‘সুন্দর শাড়ির নকশার সাথে কবিতার সম্পর্ক আছে।’ সে-রাতে শাড়ি বিক্রেতা আসাদ ঘুমাতে পারেনি। শ্যামলীর চোখ, মুখ, হাসি সেই বিকালের ‘শক্তির মতন’।   

‘আমি কী করব?’ দ্বিতীয় আসাদের প্রশ্নে প্রথম আসাদ উত্তর দেয় না। যুবক গ্লাসে পানি ভরে। এবার এক চুমুকে খায় না। ছোটো ছোটো দুটো চুমুক দেয়। কণ্ঠস্বর বেশ সহজ। ‘আপনি কি সিগারেট খান।’ কবি আসাদ সিগারেট খায় না। বলে, ‘সংকোচ করবেন না। আপনি খেতে পারেন।’

বিদেশি সিগারেট স্মার্টলি ধরায় প্রথম আসাদ। ‘আমি তো কবিতা লিখি না। কবিতা ছাড়া অন্য কিছু পড়ি না। শ্যামলীকে বলেছিলাম আমি কবিতা লিখি। কবি।’

দ্বিতীয় আসাদ বুঝতেই পারে না এই যুবক আসলে কী বলতে এসেছে। চিন্তার জটিলতা দূর করতে বলে : ‘একটু পরিষ্কার করে বলুন আপনার আসল সমস্যাটা কী?’

‘শ্যামলী প্রতি সপ্তাহে তিনচারটি কাগজের সাহিত্যপাতা পড়ে। সাহিত্যের ম্যাগাজিন কেনে। আমিও পড়ি। আপনার কবিতা বের হলে ও জানে ওটা আমার কবিতা। ওর দোষ নেই। আমিই বলেছি, আমার কবিতা আজ সংবাদে ছাপা হয়েছে। আজ ইত্তেফাকে ছাপা হলো। আগামী সংখ্যায় উত্তরাধিকারে ছাপা হবে, তোমাকে কপি দেব। তুমি কিনবে না। আসলে ও-গুলো  তো আপনার কবিতা।’

দ্বিতীয় আসাদ অনেকদিন পর বিস্মিত হয়। চোখেমুখে কৌতূহল। আগন্তুককে আপাদমস্তক দ্যাখে।

শ্যামলী অন্যরকম। নিজস্ব রুচির মেয়ে। নিচু স্বরে কথা বলে। আত্মসম্মানবোধ, বাস্তববোধ প্রখর। তিন মাস আগেও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার সময় এই যুবক অনেক খারাপ খারাপ কথা বলত। শ্যামলী তাকে প্রতিদিন সুন্দর করে তুলছে। অনেক কবিতা ওর মুখস্থ। প্রিয় কবিতা কাগজ থেকে, পত্রিকা থেকে কেটে ব্যক্তিগত অ্যালবামের পাতায় পাতায় সেঁটে রাখে। দ্বিতীয় আসাদের কবিতাও ওর অ্যালবামে আছে। চিত্রা নদীর তীরে হাঁটে। সুলতানের বাড়িতে যায়। ঐ বাড়িতে সাপও দেখেছে। সুলতান নাকি নিজ হাতে সাপকে দুধ খাওয়াতেন। সাপ তাঁকে কখনও কামড়ায়নি। সুলতানের নৌকায় রেহানা আর শ্যামলী অনেকক্ষণ, দুজন কোনো কথা না বলে, নদীতে সন্ধ্যা নামা দেখেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র যখন নড়াইলে ম্যাজিট্রেট, থাকতেন যে-বাড়িতে, সেখানে বসে শ্যামলী রেহানাকে কপালকুণ্ডলা পড়ে শুনিয়েছে। ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী চিত্রা। এই নদীর দিকে তাকালে মনে শান্তি আসে।’ তীরে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম আসাদকে শ্যামলী বলেছিল।

‘এক মাস হলো আপনার কবিতা কোনো কাগজে বের হচ্ছে না। শ্যামলী আমাকে বলছে, তুমি কি কাগজে আর কবিতা পাঠাও না? নাকি তোমার কবিতা মনোনীত হচ্ছে না? আমার কবিতার খাতা পড়তে চায়, দেখতে চায়। ওকে বলেছি, অনেক কাটাকাটি, দেখে কিছু বুঝবে না’, বলে স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনে শ্যামলীর ছবি বের করে যুবক।

দ্বিতীয় আসাদ শ্যামলীর ছবি দেখে। প্রথম আসাদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। কবির মুখের দিকে চোখ, শ্রবণ সজাগ, কী বলবে। ‘শ্যামলী, তোমার মুখ সেকালের শক্তির মতন।’ প্রায় স্বগতোক্তি দ্বিতীয় আসাদের। এবং তাকায় আগন্তুকের দিকে। তার চোখে আনন্দ। সুখ। বলে, ‘সেকালের জায়গায় একালের বসালে কোনো ক্ষতি হবে?’  দ্বিতীয় আসাদ হাসে, যুবকের চোখে আশার দ্যুতি দেখে, বলে ‘আপনার জন্য কোনো ক্ষতি হবে না।’ 

দ্বিতীয় আসাদ ভালো কবিতা লিখতে পারছে না। সে মনে করে, যে-লেখা নিজের ভালো লাগে না, সে-লেখা শুধু নাম ছাপাবার জন্য কাগজে দেওয়া অন্যায়। প্রথম আসাদকে কারণটি বলে।  

‘যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা, না কথা না, আমার বিশেষ অনুরোধ, আপনার দু’একটি অপ্রকাশিত, ভালো, এবং চারপাঁচটা বাজে কবিতা আমাকে দেবেন?’ প্রথম আসাদের অন্যায় অনুরোধে কবি আসাদ অবাক হয়। রাগও হয়। প্রকাশ করে না। কারণও জিজ্ঞেস করে না। প্রথম আসাদ বোঝে খুবই বালকোচিত আবদার করে ফেলেছে। কবি আসাদের মনে পড়ে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের পঙ্ক্তি : ‘প্রেমিকমাত্রেই অপরিণত।’ ‘আমি ভেতর থেকে আসছি,’ বলে দ্বিতীয় আসাদ যখন যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে প্রথম আসাদ বললো, ‘আমার খারাপ লাগছে, সরি, কথাটি বলা ঠিক হয়নি।’ 

দ্বিতীয় আসাদ বাথরুমে যাবার আগে বউকে আবার চা দিতে অনুরোধ করে।

‘সুরঞ্জনার ছবি কেমন লাগল?’ প্রস্রাব করবার জন্য দ্বিতীয় আসাদ কেবল উরু পর্যন্ত লুঙ্গি তুলেছিল তখন সম্পাদকের ফোন। ‘পরে কথা বলব।’ যূথিকার প্রেমিকের মাথার ভেতর ঘুরছে শ্যামলী, প্রথম আসাদ, কবিতা দেবে, নাকি দেবে না।

জীবনানন্দ জানতেন, ‘রঞ্জন’ শব্দটি বিশেষ্য। অর্থ : রং করা, আনন্দবিধান, তোষণ। যখন বিশেষণ, অর্থ : আনন্দদায়ক, সুখকর। সামনে ‘সু’ উপসর্গ বসিয়ে কবি কোন্ আনন্দবিধানকে আরও রঞ্জিত করতে চাইলেন, চাইলেন আরও সুন্দর করতে? এবং শেষ অক্ষর দন্ত’র সঙ্গে একটি আকার বসিয়ে সুখকে নাকি তোষণকে অন্য ভাবরূপের মাত্রায় নারী করলেন?   

যে-যুবতী বা নারী অন্য এক যুবকরূপের সঙ্গে আকাশে লীন হতে যায়, যে-অনন্ত নীলের শূন্যতার মধ্যে আছে ‘নক্ষত্রের রূপালী আগুন’ আর ‘রাত’, তাকে মনস্তাপে দগ্ধ প্রেমিক ডাকছে ‘ ফিরে এসো হৃদয়ে’। ‘আকাশলীনা’ পড়তে পড়তে, আত্মস্থ করতে করতে কারও যদি মনে হয়, এই কবিতা ডাকছে জীবনকে, কাম্য নয় লীন হওয়া, মানে মৃত্যু হওয়া, ওই পাঠক/পাঠিকাকে কখনও বলা যাবে না : ‘তুমি জীবনানন্দ বোঝ না।’  

দ্বিতীয় আসাদের প্রস্রাবে অনেক ফেনা হলো। শিশ্নের রগে সামান্য জ¦লুনি হলো। ফ্লাসের পানি ধুয়ে নিচ্ছে ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত প্রস্রাব। ‘আমি যে-ভাবে ভাবছি, যে-বিশ্লেষণে লিখব, এই লেখা সম্পাদক কি ছাপবে? বলতে পারে, আরও সহজ করে লিখে দিন। জানেন তো, আজকালকার পাঠক সিরিয়াস লেখা পড়তে চায় না।’ লুঙ্গির গিঁট আবার বাঁধতে বাঁধতে কবির মনে হলো।

‘এই চা নিয়ে যাও।’ যূথিকা চা করে টেবিলে রেখেছে।

প্রথম আসাদ বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছে। দ্বিতীয় আসাদের পায়ের শব্দে পেছনে তাকায়। ‘আবার চা।’ বলে হাসে।

‘আচ্ছা আপনি ফোনেই তো সব কথা আমাকে বলতে পারতেন। এত কষ্ট করে আসবার কি দরকার ছিল? চা নিন,’ দ্বিতীয় আসাদ সোফার সামনের টেবিলে চা রাখতে রাখতে বলল।

‘একবার ভেবেছিলাম। পরে মনে হলো মুখোমুখি বসে কথাগুলো বললে আপনি আমাকে, আমার অবস্থাকে ভালো মতো বুঝতে পারবেন। আমার আসতে কোনো কষ্ট হয়নি। আজ রাতেই ফিরে যাবো। কাল বিকালে শ্যামলীর সাথে যাবো চিত্রা নদীতে নৌকাভ্রমণে। রেহানাও থাকবে। আপনি যদি আমাকে কবিতা দেন, ওকে শোনাব।’

প্রথম আসাদ চা খাবার পর চলে গেলে, খুশি হবে দ্বিতীয় আসাদ। কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই প্রথমকে দ্বিতীয় জিজ্ঞেস করে : ‘আপনি জীবনানন্দের ‘আকাশলীনা’ পড়েছেন?’ প্রশ্ন শুনে প্রথমের মুখ উজ্জ্বল হয়। পড়েছে কি না, না ব’লে, বলে, ‘শ্যামলীর মুখস্থ। আমিও ওর জন্য মুখস্থ করেছি। বলব?’

হাতের ইশারায় মানা করে দ্বিতীয় আসাদ। বলে, ‘পড়েছেন, শুনেছেন অনেকবার, কী বুঝেছেন?’

প্রথম আসাদের সৎ স্বীকারোক্তি, ‘যতবার পড়ি, বিভ্রান্ত হই। শ্যামলী বলেছিল : নিষ্ঠুর কবিতা। প্রেম ঘাস হয়ে আসে। যদিও ঘাস এই বাংলায় নতুন বউকে বাড়িতে গ্রহণের একটি বিশেষ প্রতীক। ঘাসের শেকড় বা মূল সহজে মরে না। বড় মাঠে বিস্তৃত সবুজ ঘাস দেখলে বোঝা যায় : প্রসন্নতা কী। কবি সুরঞ্জনাকে ‘মাঠে’ আর ‘ঢেউয়ে’ ফিরে আসতে বলে। মাটি জীবনের অন্যরকম সত্তা, ঢেউ চলমানতার রূপ, অর্থাৎ মৃত্যু নয়? শ্যামলী ঐসব বলে। ঠিক বলে? আমি কাপড়ের সুতা বুঝি, বুনন বুঝি, দশবিশ টাকা কীভাবে এদিকসেদিক কথা বলে খদ্দেরের কাছ থেকে বেশি নিতে হয়, জানি। আরও জানি, কোন্ শাড়ির রং দু’তিনবার ধোয়ার পর উঠে যাবে। আমি কোনোদিন ভাবিনি, আমার মতো ছেলেকে কোনো মেয়ে ভালোবাসবে। দিনদিন বাবা-মার অবাধ্য হয়ে যাচ্ছিলাম। ক্যাশ থেকে টাকা সরাতাম। খারাপ জীবনে চলে যাচ্ছিলাম। পাড়ার লোকজন ঘৃণার চোখে তাকাত। শ্যামলী আমাকে বদলে দিল। নতুন মানুষ করে দিল।’ 

দ্বিতীয় আসাদ মনে করে, তার প্রবন্ধে শ্যামলীর কিছু পর্যবেক্ষণ লিখলে খারাপ হবে না। ‘শ্যামলী আর কি বলে?’

‘আকাশলীনা কবিতাটি ভুলে যেতে চায়। আমাকেও ভুলে যেতে বলে। ভুলে যাবার চেষ্টা করে। গত পরশু শ্যামলী বলল, প্রশ্ন করল, আমরা তখন ছিলাম সুলতানের ফসলবোনার একটা ছবি আছে না, মূল ছবি নয়, প্রিন্ট, তার সামনে, বললো ‘আকাশলীনা মানুষের বা প্রেমিকের স্বপ্নের, আশার মৃত্যুচিত্র। আকাশের ওপারে, বাতাসের ওপারে কী আছে?’ শ্যামলী আমাকে প্রশ্ন করেছিল। আমি বলতে পারতাম, বেহেস্ত, দোজখ, তা বলিনি। ওর সামনে মূর্খতা হতো। আমাকে চুপচাপ দেখে শ্যামলী আমার হাতে হাত রেখে বলে, ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি।’ আমরা দুজন হেসে দিই। আমিই শুধু বলছি, আপনি কিছু বলুন?’

দ্বিতীয় আসাদ হেসে বলে : ‘কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে!’ পৃথিবীতে মানুষ কথা বলা শেখার পর প্রশ্ন করে বেশি। মনে রাখবেন, মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি ও কাজের কাছে বা অন্যের কাছে হেরে যায়, তখন প্রশ্ন করে। এই পঙ্ক্তির প্রথম ‘সাথে’র পরে ঐ প্রশ্নচিহ্ন নিজের প্রতি সর্পফণার ক্ষত। প্রশ্নটি কি উঁচু কণ্ঠে করা হয়েছিল? আমার অজানা। মনে হয়, করা হয়নি। লক্ষ্যণীয়, ‘তার সাথে’ বলা হচ্ছে খুবই বিনয়ী ও আশ্চর্যমিশ্রিত স্বরে। কেন না ‘তার সাথে’র পর একটি বিক্ষত বিস্ময়চিহ্ন দেওয়া হয়েছে। আর একটা মজার ব্যাপার আছে, তা হলো ‘আকাশলীনা’য় সুরঞ্জনার নাম ডেকে যুবক অনুরোধ করছে এবং জীবনানন্দ’র ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থে ‘সুরঞ্জনা’ নামে কবিতাটি ‘আকাশলীনা’র দশ বছর পর লেখা। এই সুরঞ্জনার প্রতি কোনো অনুরোধ নেই। প্রথম পঙ্ক্তি : ‘সুরঞ্জনা, আজও তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছ;’ এই পঙ্ক্তি কবি জীবনানন্দ’র বিনয়ী স্টেটমেন্ট। পাঠককে সুরঞ্জনার অস্তিত্ব জানানো হলো। নারীর চিরন্তন সত্তাকে অস্তিত্ববাদী দর্শনের পয়েন্ট থেকে দেখা হলো। যেন সুরঞ্জনার সামনে বসে, তাকে মুগ্ধ করতে, তার দিকে তাকিয়ে বলছেন জীবনানন্দ। তা হলে কি বলা যায়, ‘আকাশলীনা’র যুবকের নাম ডাক নীলু, ভালো নাম জীবনানন্দ দাশ?

প্রথম আসাদ বলে : ‘আমি ভাবিনি। শ্যামলী বলতে পারে।’

দ্বিতীয় আসাদ যুবককে হাত তুলে থামায়। ‘এই কবিতায় জীবনানন্দর ‘মতো’ ব্যবহার অসাধারণ।  আমি দেশবিদেশের কবিতা যতটুকু পড়েছি তাতে মনে হয়েছে, কবিতায় ‘মতো’ ব্যবহার একটি বড়ো দুর্বলতা। মনে হয়, পৃথিবীর কবিদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন ‘মতো’। অবশ্য সব বড়ো কবিরই কোথাও না কোথাও সুলভ কবির দু’একটি কর্মকাণ্ড থাকে। জীবনানন্দের একটি বড় দুর্বলতা অনাবশ্যকভাবে ‘মতো’ ব্যবহার করা। পৃথিবীর এ রকম একজন বড় কবি আর একটু ভাবলেই অনাবশ্যক ‘মতো’ এড়াতে পারতেন। যদিও আমরা জানি ‘মতো’ বলে আরও একটি চিত্র কবি পাঠককে দেখান। আধুনিক কবিতায় মতো, কারণ, যেহেতু, সুতরাং, তারপর এবং তবু ব্যবহার এখন অচল। জীবনানন্দে অনেক ‘তবু’ পাবেন। প্রায় প্রতিদিন আমি জীবনানন্দ পড়ি।’

প্রথম আসাদ বলল, ‘আমার তত পড়াশোনা নেই। শ্যামলী থাকলে কিছু বলত। ও যখন আমার দিকে তাকায়, একজন কবিকে দেখে। যখন আমি ওর হাত ধরি ও বলে, ‘আমার স্বপ্ন একজন কবির হাত ধরে আমি ঘুমাব।’ আমি কবি হতে চাই। কীভাবে আমি কবি হবো?’ 

দ্বিতীয় আসাদ এবার বেশ উঁচু গলায় হাসে। ‘শুনুন, কেউ কোনোদিন কাউকে কবি বানিয়ে দিতে পারে না। সত্যি জানি না, কীভাবে একজন মানুষ কবি হয়। জানেন বোধ হয়, পৃথিবীর প্রথম কবি, রামায়ণের কবি বাল্মীকি, কবি হওয়ার আগে ষাট হাজার বছর উইঢিপির মধ্যে বসে ধ্যান করেছিলেন। তাঁর সত্তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল একজন কবি। মিথুনরত ক্রৌঞ্চকে ব্যাধ হত্যা করে। তখন বাল্মীকি তমসা নদীতীরে হাঁটছিলেন। ঐ কষ্টকর দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ে এবং হঠাৎ যেন এক বিদ্যুচ্চমক, তার মুখ থেকে, আসলে হৃদয়ের ক্ষরণ থেকে বের হয় : ‘মা নিষাদ! প্রতিষ্ঠাং স্ত¡মগমঃ শাশ্বতী সমাঃ’। কোনো একটা বড় আঘাত, কষ্ট একদিন আপনাকে হঠাৎ কবি বানিয়ে দিতে পারে।’

প্রথম আসাদ : ‘আপনি কি এই কথা বলে আমাকে বোঝাতে চাইছেন, শ্যামলী আমাকে ছেড়ে চলে যাবে আর ঐ আঘাতের পর আমি কবি হবো?’

দ্বিতীয় আসাদ : আমি তা বলতে চাইনি। প্রেমে পড়লে এবং প্রেমে ব্যর্থ হলে দুটোর মধ্যে যেকোনো একটি অবস্থা একজনকে ক্রিয়েটিভ করতে পারে, না-ও পারে। ব্যাপারটা খুবই জটিল। দুটো অবস্থাই সহজভাবে বহন করা কষ্টকর।

প্রথম আসাদ : মেয়েরা কি সত্যি কবিকে ভালোবাসে?

দ্বিতয়ি আসাদ : শ্যামলীকে এই প্রশ্ন কখনও করেছেন?

প্রথম আসাদ : তিন মাসের পরিচয়ের বয়সে ওই প্রশ্ন কখনও করিনি। বলতে পারেন, ভয়েই করিনি।

দ্বিতীয় আসাদ : শুনুন, কবি হলো একই সঙ্গে দেবদূত ও শয়তান। নারীরা কবিকে ভালোবাসে, চুম্বন পেতে, দিতে আপত্তি নেই কিন্তু কবির সাথে বিয়ে নামের প্রতিষ্ঠানে যেতে তাদের খুব আপত্তি আছে। কবি সারা জীবনের সঙ্গী, মানে এক স্বপ্নচারী যন্ত্রণাকে বহন করা, নারীর জন্য অসহ্য। তবে নারীরা বীরকে ভালোবাসে। প্রেমিকের মধ্যে একজন বীরকে খোঁজে।  

  প্রথম আসাদ কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। উঠে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় আসাদ খুশি হয়, এবার সত্যি চলে যাবে। যুবক বলে, ‘কিছু ভাবলেন, আপনার কবিতা আমাকে দেবেন কি না?’

দ্বিতীয় আসাদ  হ্যাঁ না কিছুই বলে না। ‘আচ্ছা দেখি।’ সমাধানহীন ছোটো উত্তর। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আপনি শ্যামলীর সামনে একটা জীবন্ত মিথ্যা, এই মিথ্যা সবসময় নিঃশ^াস নেয়। সত্যটা বলবেন। আপনার ভালোবাসায় তো কোনো খাদ নেই। অবশ্য প্রেমের জন্য আর যুদ্ধক্ষেত্রে মিথ্যে বললে পাপ হয় না।’

প্রথম আসাদ : ‘আবার অনুরোধ করছি, কবিরা তাদের অনেক কবিতা ফেলে দেয়, নিশ্চয়ই আপনিও দেন। ও-গুলো আমাকে পাঠাবেন। শ্যামলী তিনদিন আগে কবিতা লেখার জন্যে আমাকে সুন্দর ডায়েরি দিয়েছে। কবিতাগুলো আমি ডায়েরিতে লিখব। আপনি যে-ভাবে কাটাকাটি করেছেন, করব। শ্যামলী আমার হাতের লেখা চেনে। ও কোনোদিন জানবে না আমি আপনার কাছে এসেছি। যাচ্ছি।’ বলে দ্বিতীয় আসাদের হাত ধরে। চাপ দেয়। আগন্তুকের হাত উষ্ণ। চোখে আশাপূর্ণ আবেগ।

দ্বিতীয় আসাদ নির্বাক। পায়ের তলায় বাইরের দরজার সামনের সিঁড়ি তখনও শেষ বিকালের রৌদ্রে বেশ গরম।

প্রথম আসাদ কবির হাত ছেড়ে দেয়। ডান পা সিঁড়িতে। বাম পা ধুলোর পথে। গলার স্বর দ্বিধাহীন, দৃঢ় : ‘যাচ্ছি। আমি  কিন্তু মিথ্যা না।’ 

দ্বিতীয় আসাদ আগন্তুকের যাবার দিকে, দৃষ্টি স্থির, তাকিয়ে আছে। চলমান মানুষ, রিকশা, ঠেলাগাড়ি এবং কোলাহলের মধ্যে প্রথম আসাদ হাঁটছে। হাঁটছে। কবির চোখ থেকে অপসৃয়মাণ হচ্ছে না। 

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares