শহরটাকে মারা হলো রসিয়ে রসিয়ে,- ঘটনাটা কেবল আমিই জানি।

হতে পারে, আরও অনেকেরই জানা আছে। কিন্তু তারপরও বলব, ব্যাপারটা শুধু আমিই জানি; কারণ কোনো কিছু স্মৃতিতে থাকার মানেই তাকে ঠিক মনে রাখা নয়Ñ ঠিকঠাক জানতে পারা নয়। মনে রাখা আর জানতে পারার মানে তার সঙ্গে বসবাস করা, তাকে বিন্দু বিন্দু রক্তের মধ্যে জিইয়ে রাখা, তার অনুপস্থিতির ফুলগুলো ফুটে উঠতে দেখা। স্পর্শ করতে ভুলে গিয়ে, আতপ্ত নিঃশ্বাস ছড়িয়ে তুলে নিতে ভুলে গিয়ে মানুষ কেবল অপলক অতৃপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে,- এতই অবিশ্বাস্য সুন্দর সেইসব ফুল। রাতদিনের বালাই নেই, দিনক্ষণ মুহূর্তেরও না,- সেইসব ফুল এসে খেলা করে আমার দু’চোখ জুড়ে, কেননা ঘটনাটা কেবল আমিই জানি, কেননা কেবল আমিই শহরটাকে মনে রেখেছি, কেননা তার সঙ্গে এখনও আমি জীবনযাপন করি। ক্ষণ গেছে, দিন গেছে, গিয়েছে বছর; কিন্তু আমার বয়স একটুও বাড়েনি, একটুও বাড়ে না; শহরটারও না। অতএব এ কথাও বলা যায়, আমি আসলে মরে গেছি, শহরটার সঙ্গে সঙ্গে আসলে আমারও মৃত্যু ঘটেছে। অথচ কী আশ্চর্য, হাজার বছর বাদেও আমি বেঁচে আছি! বেঁচে আছি মৃত শহরটায় বেশ জাঁকিয়ে। কারণ আপনারা রসিয়ে রসিয়ে শুনতে চান একজন মৃত ব্যক্তির বেঁচে থাকার কথা, যদিও আমি শুধু খুঁজে ফিরি এমন কাউকে, যাকে এই শহরটার মৃত্যুর ঘটনাটা খুলে বলা যায়।

তবে ঘটনা হলো কী, এই যে আমিÑ এই যে আপনারা, এই আমাদের বাঁচতে হবে বলেই তো শহরটাকে মরতে হয়েছে। তার মানে ঘটনাটা দাঁড়াল এই,- শহরটা আসলে মারা যায়নি। শহরটাকে খুন করা হয়েছে। আর সেই হত্যাটা ছিল রীতিমতো উৎসব। নরবলির কাল নাকি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে; অথবা এখনও হয়, আমরা ঠিক বুঝতে পারি না, বুঝলেও বলতে পারি না। তা সেটা যখন বলা যাবে না, তা হলে বরং বলি, সেসবই ছিল শহরবলির দিন। অবশ্য আমি জানি, শহরবলিই বলি আর নরবলিই বলি কিংবা খুনোখুনির কথাই বলিÑ আপনারা খুব রাগ করবেন এবং নতুন করে আবার খুনোখুনিও বাঁধিয়ে বসতে পারেন। এমনকি মারা যাওয়ার কথা বলাতেও যে আপনাদের ঢের আপত্তি রয়েছে, সেটাও দিব্যি টের পাচ্ছি আমি। কারণ, স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, রসিয়ে রসিয়ে শহরটাকে মারা হয়েছে, বলতে না বলতেই দেখা যাচ্ছে আপনারা বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। যেখানে আমাদের সম্মানিত সভাপতি থেকে শুরু করে আপনাদের প্রত্যেকেরই বক্তৃতা শুনতে শুনতে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে মাথাটাকে পেন্ডুলামের মতো দোলানোর কথা, সেখানে এভাবে সচকিত হয়ে ওঠাটা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক। হাজার বছর আগের ঘটনা সেটা কিংবা আরও আগের; তার পরও ইতিহাসের ট্যাবু হয়ে আছে তা, কোনো কথাই বলা যায় না সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে। ২০১৯ সালে কি কোনো ইনডেমনিটি বিল করা হয়েছিল? মোটেও না। কিন্তু কোনো কোনো ঘটনা সত্যিই ভীতিকর। মানুষজন তা নিয়ে কথা বলতে চায় না, শুনতেও চায় না। বুঝতেই পারছেন, ভয়ের সংস্কৃতি- একেই বলে ভয়ের সংস্কৃতি; একবার রক্তের মধ্যে যদি আপনি এটাকে ঠিকঠাক ঢুকিয়ে দিতে পারেন, আর কোনো সমস্যা নেই, ‘আমরা দুজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার’। তাই আমি নিজেও ঠিক বুঝতে পারছি না, এ নিয়ে কথা বলা ঠিক হবে কি না। আপনারা যতই বলেন না কেন, একজন বর্ষীয়ান নাগরিক হিসেবে, পুরনো সেই শহরের একমাত্র জীবিত একজন মানুষ হিসেবে আমাকে আপনারা সম্মানিত করতে চান, কেননা একমাত্র আমার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে নতুনকালের একটি শহরের সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, সময়স্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাজার বছর বাদেও বেঁচে থাকা- আমার কিন্তু তা বিশ্বাস হয় না। মনে মনে আমি তো স্পষ্ট জানি, আপনারা আমাকে সম্মানিত করতে চান এ জন্য যে আমি মূক ও বধির হয়ে নতজানু হয়ে পদলেহন করতে জানি। পদলেহনের মতো পদলেহন করে কত শত বছর যে বেঁচে থাকা যায়, আমি হচ্ছি তেমন একটি নিদর্শন। তবে কে না জানে, পদলেহনকারীও একদিন না একদিন পদাধিকারীর মতোই শক্তিমান হয়ে ওঠে, কেননা তার ওপরের বড় বড় সব পদাধিকারী তাকে ছাড়া অন্য কাউকে আর বিশ্বাসই করে না। তাই এই অপরূপদেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা সেনাপতি কিংবা এখানকার এই সেনানিবাসের শীর্ষ কর্মকর্তা, যার কথাই বলুন না কেন, সবাই আমার কথাকেই বিশ্বাস করে থাকে, গুরুত্ব দিয়ে থাকেÑ কেননা আপনারা কেউই পদলেহনকারী থেকে পদাধিকারী হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ মই বেয়ে ওপরে উঠতে পারেননি আমার মতো।

এত নিষ্ঠুরভাবে, এত স্পষ্ট করে নিজের সম্পর্কে এমন কথা জনারণ্যে কেউই বলে না; আমিও বলছি না, আমি শুধু মনে করছি। মনে-মনে মনে করছি। তবে বয়স যতই হোক না কেন, কেউ কি আর মরে যেতে চায়? এই যে এই শহরটা খুন হয়ে গেল, স্যরি, এই যে এই শহরটা মরে গেল,Ñ তাতে আমারও তো মরে যাওয়ার কথা, আমারও তো খুন হয়ে যাওয়ার কথা ওর সঙ্গেই। অথচ কী আশ্চর্য, তার পরও আমি কী সুন্দরভাবে বেঁচে আছি। পদলেহনকারী হওয়ার কত সুবিধা দেখুনÑ এই সুন্দর পৃথিবীটাতে তা হলে পাছার ওপর দু’দশটা লাথি খেয়েও, সকালবিকাল পাছামারা দিয়েও কী সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা যায়!

কিন্তু আপনারা এমনভাবে তাকিয়ে আছেন… আমি কি তা হলে একটু এলোমেলো বকছি!? একটু, নাকি খুব? মানে ওই যে অনেকে যেমন বলে থাকেন, প্রগলভ হয়ে ওঠা,Ñ আমি কি তেমন কিছু হয়ে উঠেছি? তেমন হওয়াটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়, দু’একদিন আগের কথা তো নয়Ñ রীতিমতো এক হাজার বছর আগের ব্যাপার এসব। মানুষের আয়ু আর কয়দিন, কিন্তু ৪০০ বছরের শহরটা মরতে শুরু করল, যেসব মানুষ সময়ের সঙ্গে দৌড়াতে পারল না, সময়স্ফীতি ব্যাপারটাকে ধরতেই পারল না, অক্কা পেল তারা সকলে কিংবা চলেই গেল এই শহর ছেড়ে। কিন্তু সদর্পে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করলাম আমরা সবাই। তবে মানুষ তো আর অমর কিছু নয়! মানুষ তো মরণশীলই।…না, না, আমি আসলে মৃত্যু-টৃত্যু নিয়ে কিছু বলতে চাইছি না, খুনটুন নিয়েও না- বোধহয় এক হাজার একশ’ বছর হতে চলল আমার, আর বয়স হলে এ রকম হয়। আমি তো আগেই বলেছিলাম, আপনারা যখন আমাকে এই প্লানেটর সবচেয়ে বর্ষীয়ান সংগঠক হিসেবে সম্মানিত করতে চাইলেন, তখনই তো বলেছিলাম, আমার আসলে বয়স হয়ে গেছে, আমি কিন্তু উল্টাপাল্টা বকি, আমাকে টানাহেঁচড়া না করাই ভালো; কিন্তু আপনারা কিছুতেই ছাড়লেন না, নিয়ে এলেন। এখন দু’চারটা উল্টাপাল্টা কথা যদি বলেও বসি, শুনতে তো হবেই, নিজগুণে ক্ষমাও করে দিতে হবে কিন্তু। তবে আমার ঘাড়ে কি আর দুই’চারটে মাথা যে সজ্ঞানে হাবিজাবি বলতে যাব? একটা কথা মনে রাখবেন, আমি কিন্তু এখনও টিকে আছি, এখনও বেঁচে আছি। কত কর্মকর্তা এলেন-গেলেন, কত কর্মচারী হাবুডুবু খেতে খেতে ভেসে গেল, কিন্তু ওই যে ডারউইনের একটা কথা আছে না, ‘সারভাইভাল অব্য দ্য ফিটেস্ট’Ñ আমি কিন্তু ঠিকই টিকে আছি। এই জীবনের বিছুটিভরা চাতাল পেরিয়ে আমি এখন সমাসীন মখমল আসনে। একদম চিন্তিত হবেন না আপনারা- ইনডেমনিটি বিল না করেও কী এক অদ্ভুত জাদুবলে জীবনহনন আর জীবনহননের মতো যত কুৎসিত গোলাপজল এই মহাজাগতিক কৃষ্ণগহ্বরের গহিন অন্ধকারে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে কখনই কোনো কথা হবে না। ভয় পাবেন না আপনারা, ভীত হবেন না, আমি আসলে একটা গেঁয়ো শহরের সত্যিকার শহর হয়ে ওঠার গল্পই বলব।

ব্যাপারটা হলো এই, শহরটা যখন মৃত ছিল নাকি মরতে বসেছিল, বড় ভয়ানক একঘেয়ে আর ক্লান্তিকর ছিল, সেইসব দিনগুলোয় এইখানটায় কোনো কোনো দিন কুয়াশা এসে সব কিছু কেমন আবছা করে ফেলত, টপটপ করে শিশির ঝরত, আলো এসে হইচই না করে বসে থাকত আপনমনে, যেমন অন্ধকার এসেও বসে থাকত বড় বেশি একলা কোনো এসিডদগ্ধা মেয়ের মতো। তার মানে, উন্নয়ন আমাদের শহরটার নিশ্চয়ই হয়েছে, না হলে এখন সারা বছরই তেমন কুয়াশার মতো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকবে কেন শহরটা! সে অতীত বড় ভয়ঙ্কর, বড় কুশ্রী, যারা আজকে পারমাণবিক বর্জ্য নিয়ে অযথা বুলি কপচান, তারা সেসবের কিছুই জানেন না। সেইসব দিনগুলোয় পথের ধারের গাছপালাগুলো এমন সুন্দর প্লাস্টিক-প্লাস্টিক সবুজরঙা ছিল না, ছিল না এমন সুন্দর রাস্তা, ছিল না এই শহর পাব-বার আর রিসোর্ট-ক্যাসিনোময়। এই শহরে তখন এমন কোনো ট্যাবলেট ছিল না, যার মাত্র একটি খেয়েই একটি নারী সারা বছর তার দুই উরু আকাশের দিকে বার বার তুলে ধরতে পারবে নিশ্চিন্তে। সবচেয়ে জঘন্য ব্যাপার হলো, এই শহরটায় তখন কোনো সেনানিবাসই ছিল না। একটা আধুনিক শহর, মেগাসিটি, অথচ সেখানে কি না কোনো সেনানিবাস নেই, রাস্তায় চোখ মেললেই জলপাইরঙা পোশাকপরা কোনো সৈনিক নেই, মোড়ে মোড়ে চেকিং পোস্ট নেইÑ সেটাকে কি কোনো শহর বলা যায়? সুনিয়ন্ত্রিত, সামরিকায়িত, ব্যারাকময় না হলে কোনো শহরকে কি সত্যিই কোনো শহর বলা যায়! রাস্তাগুলো ঝকঝকে এখানে; কত অধীর হয়েই না থাকে তারা দিনরাত- কতক্ষণে দু’চারটা গাড়ি আসবে তাদের পিচঢালা বুকে শিহরণ জাগিয়ে তুলতে। অনেক অনেক বছর আগে আমি যখন এই শহরটায় প্রথম আসি, তখন এগুলো যেন কেমন ছিল, রাস্তার পাশে ছিল বর্ষীয়ান সব বট, পাকুড়, দেবদারু; সেগুলো সারা দিনরাত ছায়া দিত, শূন্যতাময় প্রশান্তি ছড়াত, এই মুল্লুকের প্রচণ্ড গ্রীষ্মকালও কাবু করতে পারত না সেই ছায়াকে। লাল রঙের একটা কোয়ার্টার পেয়েছিলাম আমি রেলস্টেশনের কাছে। তবে বোঝেনই তো মফস্সলের মানুষ ছিলাম, বড় মানুষ হতে হলে যেরকম বড় নজর থাকতে হয়, সেরকম বড় কোনো নজরও ছিল না; তাই ওই কোয়ার্টারটাকেই মনে হতো স্বর্গ, দুপুরের দিকে উথলাতে থাকা সকালটাও যখন রোদে রোদে বলকে উঠত তখন বট, পাকুড়, দেবদারুর নিচে দাঁড়িয়ে মনে হতো, এমনটাই তো চেয়েছি আমি, এমন ছায়াময় রোদময় এক লোকালয়; এমন এক লোকালয় যেখানে মাঝেমধ্যেই রেলের কুউউ ঝিকঝিক শোনা যাবে, খুব ভোরে রেলের শিস শুনে ঘুম ভেঙে যাবে, খুব সন্ধ্যায় দিগন্তরেখার দিকে তাকিয়ে ফের রেলের হুইসেল শুনতে শুনতে মনে করা যাবে, এবার তবে ঘরে ফেরা যাক। কখনও খরস্রোতা কখনও বা বিশীর্ণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা যাবে সারা দিন। রাস্তার ধারে কোনো সস্তা শিঙাড়ার দোকানের সামনে পাতা মাচালে বসে ধুম আড্ডা দেওয়া যাবে দিনভর, সন্ধ্যারাত।

কষ্ট যে ছিল না তা কিন্তু নয়। আমাকে আসলে সমস্ত কষ্ট থেকে দূরে রেখে দিয়েছিল সুষমা। সংসারের দুঃখকষ্ট, আলাইবালাই ষাট, এসব আমাকে কোনোদিনই তেমন স্পর্শ করেনি তার কারণে। আমি সকালবেলা নাস্তা করে অফিসে চলে আসতাম হেঁটে হেঁটে। কোনো কোনোদিন আসতে হতো বাজার করে। কোনো কোনোদিন গলার স্বরটাকে আমি এমন করে রাখতাম যে সুষমা সাহসই পেত না বাজার করার কথা বলার। তিন-তিনটা বাচ্চা সামলাতে সামলাতে সব কিছু ও-ই করত। এই শহর তাকে বড় স্বস্তি দিয়েছিল। আমার অফিসটার অবশ্য ছিরিছক্কি কিছুই ছিল না, থাকার কথাও ছিল না; কবে কোনকালে সরকারের ইচ্ছা হয়েছিল- এখানে নিউক্লিয়ার প্লান্ট করা যাক, বিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত হোক এলাকার পর এলাকা, দূর হোক পৃথিবীর যত আঁধারমানিক। ব্যাপারটা তখনকার মানুষজন যে খুব একটা বুঝতে পেরেছিল, সেরকম আমার মনে হয় না। নদীর ধারে যে একটা চা-শিঙাড়ার দোকান আছে… এহ্, কী বলতে কী বলছি- নদীর ধারে তখন একটা দোকান ছিল, সেখানকার দোকানদার আমাকে বলেছিল একদিন, মানুষজন বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার কথা শুনে নাকি তখন বলাবলি করত, ‘কেরোসিন তো আছেই, বিদ্যুতের দরকার কী?’ কিংবা অন্য কেউ হয়তো বলত, ‘দিনে তো আলো থাকেই, আর রাত আসে ঘুমানোর জন্যে, তা হলে এইসব নকশার কী দরকার? এ কি আর রেলস্টেশন যে ২৪ ঘণ্টাই কারেন্ট লাগবে?’ আর এইসব কথাবার্তা তাদের খুব যুক্তিসঙ্গতও মনে হতো। কিন্তু গোটা দেশেই শহর বাড়ছিল অথবা সেই লোকটার অনুকরণে বলতে গেলে, সারাটা দেশ একটা রেলস্টেশনে পরিণত হচ্ছিল, ইলেকট্রিসিটি তাই অপরিহার্য হয়ে উঠছিল। অতএব এইখানে এই পদ্মা নদীর ধারে চাষিরা হারিয়েছিল ৩০০ একর জমি; সেখানে কিছু অফিস, বাড়িঘরও গড়ে উঠেছিল।

সেদিন খুব রোদই ছিল, যেদিন আমি এসে নেমেছিলাম এই মফস্সল ছোট্ট শহরটার রেলস্টেশনটাতে। যদিও ছিল বসন্তদিন- তাই হাওয়াও বইছিল বেশ প্রচুর। যত ছোটই হোক না কেন, কেমন প্রাচীনতার আস্বাদ লাগা আকাশ-বাতাস, এখানে ওখানে ছোট বড় লালঘর, রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ করেই বেজে ওঠা রেলের বাঁশিÑআমার কাছে খারাপ লাগেনি। একদিন এইসব রাস্তায় ইংরেজরাও ঢের হেঁটেছে, হঠাৎ একটু থেমে অনুভব করার চেষ্টা করেছে আকাশ আরও কতটুকু উত্তাপ আর ঘাম ঝরাতে পারে। এই যে একটা অফিসার্স কোয়ার্টার, মাঠের কোণে ফার্নগাছের অপরূপ বিস্তার, হতেই পারে, এখানে কোনো দোলনা ছিল; হতেই পারে, কোনো ইংরেজ মেয়ে সেই দোলনায় বসে বসে জেন অস্টিনের বই পড়ত। চায়ের কেটলির ঢাকনা বাষ্পের ঠেলায় ঘট ঘট করত আর হঠাৎ করেই অস্বস্তিকর সেই আওয়াজ শুনে মেয়েটি বই নামিয়ে রেখে দৌড় দিত চা বানাতে।

এলাকার লোকজন তখন আমার পদ-পদবি ভালো করে বুঝতে পারত না। তারা আমাকে ডাকত বৈজ্ঞানিক বলে। বলত, এই বৈজ্ঞানিক আরও সব বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে মিলে এমন এক চুলা তৈরি করবে, যেটা দিনরাত বিদ্যুৎ বানাবে। আর কোথাও গেলে, চায়ের জন্যে রাস্তার পাশে দাঁড়ালে কথাবার্তা বলত বেশ সমীহ নিয়ে। আমাকে কখনই কোনো দরদাম করতে হয়নি কোনো ভ্যানওয়ালা কিংবা রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে। যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমি। অবশ্য শুধু আমি কেন, এখানকার সব মানুষই ছিল কেমন শান্তশিষ্ট আর প্রশান্তিতে ভরা। নদী যখন ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসত, ভরা বর্ষার প্লাবনে ভেসে যেত গ্রামের পর গ্রাম, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামত আর ছনের, টিনের দুর্বল ছাউনি চুঁইয়ে ঘরের ভেতর শুরু হতো বৃষ্টিজলের আগ্রাসন, তখনও তারা একটুও উত্তেজিত না হয়ে বলত, ‘এহ্, শুরু হয়ে গেল দেখছি!’ বলতে বলতে রাজ্যের অলসতা নিয়ে কুঁড়েঘরের একদিকের হাঁড়িপাতিল বিছানা অন্যদিকে সরিয়ে রাখত। মানকচু গাছের বিশাল পাতা মাথায় দিয়ে তারা এত স্বাচ্ছন্দ্যে বৃষ্টির সময় হেঁটে বেড়াত যে, সুষমা বলত, ‘দেখ, অযথাই তোমরা ছাতা-ছাতা কর!’ আমার ছেলেমেয়েরাও সেসব দেখতে দেখতে ছাতা নিয়ে চলাফেরা করতে ভুলে গেল।

কিন্তু নানা হুজ্জতে আমাদের নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট করার কাজ বার বার থমকে যাচ্ছিল। একবার তো আমরা মোটামুটি নিশ্চিতই হয়ে গেলাম যে,  প্রজেক্টটা একেবারে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু টিমটিমিয়ে তার আলো জ্বলতে লাগল। মাঝখানে যুদ্ধ হলো। তার পর নানা হুজ্জতে নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের কথা লোকজন বোধহয় ভুলেই গেল। অনেকের চাকরি চলে গেল, অনেকে প্রেষণে অন্য কোনো বিভাগে বা প্রতিষ্ঠানে চলে গেল। আমিও হয়তো চলে যেতে পারতাম। হয়তো কেন, নিশ্চয়ই পারতাম। কিন্তু ততদিনে ভালোবাসার মতো শ্যাওলা আর অলসতা জমেছে এই জায়গাটিকে ঘিরে। আমার ছেলেটা কিংবা মেয়েটা একেকদিন ঘরে ফিরত চোখজোড়া হীরের দ্যুতি নিয়ে, হয়তো বলত, ‘বাবা, আজ না অমিয়ভূষণ মজুমদার যে গাঁয়ে থাকতেন,- পাকুরিয়া গ্রাম- সেই পাকুড়িয়া গ্রাম খুঁজে এলাম…’

‘তাই? কোনখানে সেটা? শহরের মধ্যেই পড়েছে নাকি?’

‘তুমি যে কী না! সেই গ্রাম কী এখনও আছে না কি? নদী কবে গিলে খেয়েছে!’

আহত কাতরতা তাদের কণ্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসত, আর তার পরেই উদ্দীপ্ত হয়ে উঠত তারা, ‘তবে সেই পোস্টাফিসটা কিন্তু এখনও আছে বাবা! আর শঙ্খ ঘোষের স্কুলটাও এখনও আছে। কেবল সেই ইঁদারাটা কেমন হয়ে গেছে!’

আমি শুধু এটুকুই জানতাম, অমিয়ভূষণ আর শঙ্খ ঘোষ নামে দু’জন বড় লেখক আছেন, মেয়েটা তাদের ভারী ভক্ত আর ছেলেটাও একই পথে হাঁটছে। তাদের দু’জনের বইয়ের তাকে এদের বইপত্তর থাকে, সেগুলো নিয়ে তাদের মালিকানাবোধও ভীষণ প্রবল। তাই একই বই দু’জনেই কেনে আলাদা-আলাদাভাবে। কেউ যদি কোনো বই আগে কিনতে পারে, তাহলে তার চোখেমুখে দেখা দেয় বিজয়ীর হাসি; আর আরেকজনের চোখমুখ কেমন কালো কিন্তু উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তা আর কিছুতেই স্বাভাবিক হয় না নতুন একটি অমিয় কিংবা শঙ্খ না কেনা পর্যন্ত। ভাইবোনের এইসব মারপ্যাঁচ, ঝগড়াবিবাদ অবশ্য মূলত তাদের মাকেই সহ্য করতে হতো। আমার তাই তাদের বইপত্তর যেমন না পড়া ছিল, তেমনি অজানা ছিল তাদের সঙ্গে এই ছোট্ট শহরটার সম্পর্ক, ভালোবাসা।

সেই পাকুড়িয়া গ্রাম খুঁজে আসার পর থেকে এই শহরটার প্রতি তাদের মমতা ও ঘনিষ্ঠতা যেন আরও বেড়ে গেল। সাহিত্যিকের লেখায় তার ভূগোল আর ব্যক্তিগত জীবনকে কতটুকু খুঁজে পাওয়া যায় কিংবা আদৌ পাওয়া যায় কি না, তা জানি না আমি; কিন্তু আমার এই ছেলে আর মেয়ে, যাদের নাম আমার বউয়ের এক বন্ধু রেখেছিল, তারা সেরকম উদ্ঘাটনের চেষ্টাও করে যেতে শুরু করল। তাতে কতটুকু সত্যাসত্য মিশে থাকল, তা বোঝার উপায় ছিল না, কিন্তু এটি ঠিক, উজ্জ্বল কোনো অতীতের বিষণ্ন স্পর্শ খুব স্পষ্ট করেই ছুঁয়ে যেত আমাকে। আমার এই দুই মেয়ে, যাদের নাম অজন্তা আর ইলোরা, আমার এই একমাত্র ছেলে, যার নাম প্রত্ন, কোনো কোনোদিন মনে হতো, এই বুঝি তারাও টুপ করে অতীত হয়ে যাবে, সারা দিনরাত এইসব অতীতের আবর্তে হাবুডুবু খেতে খেতে। অতীত হয়ে যাবে তাদের নাম রেখে যাওয়া তাদের মায়ের বন্ধুর মতোÑ ক্যান্সারে যে মেয়েটি কেমো নিতে শুরু করার পর স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যায় এবং আমাদের কারও সঙ্গে আর দেখাসাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানায় আর ওই অবস্থাতেই সে হারিয়ে যায় চিরতরে। তবে প্রায় প্রতিদিনই সুষমা তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরের রেলইয়ার্ডে রাখা পুরনো রেলগাড়িটা দেখতে যায় আর প্রায় প্রতিদিনই মনে করে, একদিন সে আর তার সেই বন্ধু স্কুল পালিয়ে চলে গিয়েছিল প্রথম রেলস্টেশন দেখতে।

আমি জানি না, আপনাদের বিরক্ত লাগছে কি না; জানি না, খুব বেশি সময় নিচ্ছি কি না, খুব বেশি কথা বলছি কি না। তবে বোঝেনই তো, বয়স তো কম হলো না, আর বয়স বেড়ে গেলে অনেক কথাও জমে। কিংবা কোনো কথা না জমুক, জমে ওঠে ব্যর্থ সব আত্মঅহংকার। অক্ষমতার পাহাড়ে উপেক্ষার চূড়ায় বসা মানুষটি তখন  সুযোগ পেলেই সেই অহংকারের বন্যা বইয়ে দিতে থাকে, তার কণ্ঠস্বর হয়তো ক্রমশ করুণ ও নিঃস্বই হয়ে ওঠে, কিন্তু সে সেই কারুণ্য আর নিঃস্বতা ঢালতে ঢালতে চারপাশের মানুষজনের মনোযোগ দাবি করে চলে : ‘শোনো, আমার একটা অতীত আছে, তোমরা দৌড়াচ্ছ, কিন্তু আমি এর মধ্যেই দৌড়ে এসেছি কত শত পথ। তোমরা আমাকে অবহেলা করো কেন?’ আপনারা মুখের ওপর না বলতে পারেন, আমি কিন্তু অনুভব করতে পারি, আমিও এখন তেমনই একটা মানুষ। নইলে সম্মাননা জানানোর প্রতিত্তরে দু’চারটে কথা বলতে গিয়ে একটা শহরের কথা তুলে আনব কেন! আর একটা শহরের মৃত্যু হলেই বা কী! শহরের মৃত্যু ঘটবে, তাতে তো উৎফুল্লই হওয়ার কথা। শহরের মৃত্যু হওয়ার মানেই তো আবার বিস্তৃত সবুজের ফিরে আসা, বিস্তীর্ণ নদী আর জলাভূমি ফিরে আসা, সার্কাসের ব্যথিত সব বাঘ সিংহের চোখজুড়ে উজ্জ্বল আভা ফিরে আসা। আবারও ফিরে পাওয়ার কথা মানুষের সেই সময়, যখন ক্লান্ত দিনের শেষে উন্মুক্ত প্রান্তরে সঙ্গম শেষে সঙ্গীর গলা জড়িয়ে সে তাকিয়ে দেখতে পেত খোলা আকাশের তারা আর অসংখ্য মেঘেদের ঘরবাড়ি।

কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও সেরকম ছিল না। আর সেরকম হওয়ার কথাও ছিল না। শহরের পাশের নদীটা তখন হেমন্ত এসে পড়ায় বিশীর্ণ ভীষণ, কিন্তু আমি দেখেছিলাম, মানুষজন যেন বাঁধভাঙা নদীর মতো উচ্ছ্বসিত, উদ্ভাসিত। কেননা সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই যে প্রচণ্ড বিদ্যুৎ সংকট, তা মেটানোর জন্যে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বসাতেই হবে। কেরোসিন কিংবা দিনের আলোতেই সন্তুষ্ট মানুষজনও অবশ্য ততদিনে ফুরিয়ে এসেছিল। ইরি-বোরো চাষ করতে শ্যালো মেশিনের ব্যবহার বাড়ছিল, মেশিন চালানোর ব্যয় আর পরিশ্রম কমাতে লোকজনও বিদ্যুতের জন্য মুখিয়ে উঠেছিল। সবাই বলাবলি করছিল, হোক, বিদ্যুৎ প্লান্ট হওয়াই উচিত। নইলে এত বিদ্যুৎ আসবে কোত্থেকে! মরতে বসা রেলওয়ে জংশন এবার আবারও জমে উঠবে, অনেক মানুষজনই কাজ পাবে প্লান্টে, তাদের আর রিকশা-ভ্যান চালাতে হবে না, রাস্তার ধারে ঝুপড়ি দোকান দিয়ে বসে বসে সারাদিন ঝিমুতে হবে না। আমার ব্যস্ততা নতুন করে ফিরে আসছিল, অনুভব করছিলাম মানুষজনের কাছে গুরুত্ব বাড়ছে বেশ। আমার কাছ থেকে তারা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে নিউক্লিয়ার প্লান্টের বিষয়আশয়। এমনকি অজন্তা আর প্রত্নকেও দেখা যাচ্ছিল, অমিয়ভূষণ কিংবা শঙ্খ ঘোষের ব্যাপারে সাময়িক ক্ষান্তি দিয়ে এই নিয়ে ভাবতে।

শুধু সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো নিঃসঙ্গ কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে সুষমাই বলেছিল, ‘পদ্মা, বড়াল, গড়াই, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র এত ভেঙেছেÑ তার পরও কোনো মানুষজনকে তাড়াতে পারেনি এ তল্লাট থেকে। কিন্তু এবার মানুষজনকে নিজে থেকেই বিদায় নিতে হবে।’

তা কেবল সুষমাই বলল এমন কথা; কিন্তু যেখানেই গেলাম, সেখানেই দেখছিলাম ভীষণ উত্তেজনা। লোকজন বলাবলি করছিল, ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে এই শহরটা দিনকে দিন মরতে বসেছে; এইবার আবারও এর চেহারা খোলতাই হবে। আর তাই হঠাৎ করেই জমিজমার দরদাম বেড়ে গেল দ্বিগুণ-ত্রিগুণ। দিনের পর দিন অবহেলিত হয়ে পড়ে থাকা প্লান্টের একেবারে শুরুর সময়কার ৩০০ একর জায়গার আশপাশে রাস্তার ধারে মানুষজন ঘরবাড়ি তুলতে শুরু করল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার- সরকার নিশ্চয়ই আরও জমি অধিগ্রহণ করবে; তখন তারা বাড়িঘর হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যেতে হচ্ছে বলে মোটা ক্ষতিপূরণ নেবে সরকারের কাছ থেকে। মেরেকেটে খাওয়ার এইসব কথাবার্তাও হচ্ছিল একেবারে স্পষ্ট স্বরে, কোনো রং না চড়িয়ে একেবারে নিখাদ নির্লজ্জতার সঙ্গে। সারা শহর প্রতিদিন মুখিয়ে উঠতে শুরু করল- কবে, আবার কবে জমি অধিগ্রহণ শুরু হবে?! লোকজন মুখিয়ে উঠছিল, কেননা তখনও তাদের ধারণা কেবল এটুকুই ছিল যে, বিদ্যুৎ বানানোর বিরাট এক কারখানা বসছে, সে জন্য অনেক জমি লাগবে, তবে জমি চলে গেলেও কোনো সমস্যা নেই, কেননা কারখানার জন্য হাজার হাজার লোক লাগবে। আমাদের ছোট মেয়ে ইলোরা এবং আরও কয়েকজন ছোট ছেলেমেয়েকে যে ভ্যানওয়ালা স্কুলে নিয়ে যায়, সে হঠাৎ করেই একদিন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসল। ভ্যানটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা খেলো বড় একটা কড়ুইয়ের সঙ্গে। তা ভাগ্য ভালো, কম বেশি সবাই ভ্যান থেকে ডিগবাজি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও, কারও তেমন কিছু হলো না। কিন্তু ভ্যানওয়ালাকে এই নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হতে দেখা গেল না। সত্যি কথা বলতে গেলে, হঠাৎ করেই মনে হতে লাগল, সারা শহরে কারও কোনো কাজে মন নেই। রিকশাওয়ালা ঠিকঠাক রিকশা চালাচ্ছে না, ভ্যানওয়ালা ঠিকমতো ভ্যান চালাচ্ছে না, গোয়ালা ঠিকমতো দুধ দিচ্ছে না, শাকসবজিওয়ালা কিংবা মাছওয়ালারাও ঠিকমতো জিনিসপত্তর বিক্রি করছে না। সবাই উদগ্র, ক্ষিপ্র ও মারমুখো, কবে- কবে কারখানা হবে? কারখানা হলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়!

কিন্তু কবে যে কী হবে, তা বোঝাই যাচ্ছিল না। আর সরকারি জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদটা যত ভারীই মনে হোক না কেন, আমার ভূমিকা কিন্তু খুব সামান্যই ছিল। না, না,Ñ বিনয় না,Ñ সব কিছুই তো ওই যাকে বলে, নাযেল- নাযেল হচ্ছিল আরকি ওপর থেকে। আর সরকারি বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের ভূমিকাটাও ছিল বেশ আলাদা। মানে বুঝতেই পারছেনÑ বিজ্ঞানেরও সরকারি ব্যাখ্যা থাকে, সরকারি ব্যাখ্যা হয়; আমাদের কাজ তো শুধু বিজ্ঞান নিয়ে নয়, সরকারের সিদ্ধান্তকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে উপস্থাপন করা হলো তারও চেয়ে জরুরি কাজ। না, না,Ñ আমি কোনো সমালোচনা করছি না। এই বয়সে এসে সমালোচনা করার আর কী আছে, বলেন? বলতে পারেন, স্মৃতিচারণ আরকি। তাও ধরে নেন ভুলেভালে ভরা; যদি আপনাদের খুব বেশি লাগে, তা হলে তেড়ে আসেন, ঘাড়ের ওপর হাতটা উঁচিয়ে ধরেন, সঙ্গে সঙ্গে আমি বিবৃতি দিয়ে বলে দিব, পত্রপত্রিকায় আমার বক্তব্য বিকৃতভাবে এসেছে। বুঝবে শালার পত্রিকার লোকেরা! অথবা বলব, আজকাল তো আমি পারকিনসন্স না আলঝেইমারÑ কী সব যেন বলে, ওই রকম কোনো একটা রোগে ভুগছি। ঠিক আছে, না?

তা প্লান্টের জন্যে নতুন করে যখন কিছু জমিজমায় খুঁটি পোঁতা হলো, তার পরই কার যেন মাথায় এই চিন্তা এলো,Ñ  আচ্ছা, এই যে এত বড় একটা কাজ হচ্ছে, তাতে এতসব বিদেশি বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার আর টেকনিশিয়ান কাজ করছেন, তার পর আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন যখন শুরু হবে, তখনও তো কত বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, কর্মকর্তা থাকবেন,Ñ এদের সবার একটা নিরাপত্তা আছে না? তা হলে সেই নিরাপত্তার বন্দোবস্ত হবে কেমন করে!? তখন এই কথা বলার লোকেরও অভাব পড়ল না যে, এইখানে একটা সেনানিবাসও থাকা প্রয়োজন। অতএব আরেক দফা জমিজমা অধিগ্রহণ করা হলো। ঠিক এই সময়টা থেকেই আমি টের পেলাম, সুষমা কেমন যেন ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে, এলোমেলো কথাবার্তা বলছে, প্রায়ই তার সেই ক্যান্সারে মরে যাওয়া বন্ধুটাকে স্বপ্ন দেখছে আর শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছে। আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকেও কেন যেন ভীষণ উদ্বিগ্ন লাগে; উদ্বিগ্ন আর ক্লান্ত ভীষণরকম। আমাদের সচ্ছলতা আসছিল একটু একটু করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এইসবও আসতে শুরু করল হঠাৎ করে।

এক রাতে খেতে বসে আমাদের মেয়ে অজন্তা বার বার কাটা চামচ ঠোকরাতে লাগল প্লেটের ওপর। আমি তার মার দিকে তাকালাম, কিন্তু মনে হলো এ নিয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। প্রত্ন আর ইলোরাকে মনে হলো তারা বেশ মজা পাচ্ছে এবং নিজেরাও কাটা চামচ ঠোকরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঘরের আলো তেমন হয়ে উঠেছে, যেমনটা হয় পৃথিবী বদলে যাওয়ার আগে। আমি কটমটিয়ে তাকালাম তাদের দিকে, আর অজন্তাকে বললাম, ‘এসব কী হচ্ছে মা?’

অজন্তা আমার কথার উত্তর দিলো না, বরং উল্টো প্রশ্ন করল, ‘তোমরা নাকি রাস্তার পুরনো সব গাছপালা কেটে ফেলবে?’

আমি অবাক হলাম। এরকম কোনো কিছুই জানি না আমি। আর জানার কথাও নয়Ñ আমি তো আর প্রশাসনে কাজ করি না। তার মানে এই না যে, এরকম কিছু আমি জানতে পারি না। কেবল কাজকর্ম শুরু হচ্ছে, মেশিনপত্র কেনাকাটা হচ্ছে, অনেক মেশিন এসেও গেছেÑবলতে গেলে প্রকল্পের এই পর্বে প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ না থাকলেও অনেক কিছুই কানে এসে উঠছে আমাদের। এটুকু অবশ্য আমার কানে এসেছে যে, সেনাবাহিনী চাইছে, সেনানিবাসটা হোক যাকে বলে শহরটাকে কোলের ওপর তুলে। আর শহরটার আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বও দেওয়া হোক তাদের ওপর। এই প্ল্যান্ট এলাকা, বৈজ্ঞানিক-টেকনিশিয়ান-ওয়ার্কার সবার আবাসিক এলাকা আর তাদের এন্টারটেইনমেন্টের জন্যে ইতিমধ্যেই গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও বার এবং কাছেই নদীর ওপর বিরাট সেতুÑ এসব ঘিরে একটা নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তুলতে চাইছে তারা। কিন্তু পুরনো গাছপালা কাটার কোনো কথা সত্যিই আমার কানে আসেনি। আমি তাই একটু হেসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা চালালাম, ‘গাছপালা কেন কাটা হবে? এসব কথা তোমাকে কে বলেছে?’

‘সবাই বলছে। কেন, রাস্তা দিয়ে চলাফেরার সময় তোমার চোখে পড়েনি, সব গাছের গায়েই লাল ক্রসচিহ্ন দেওয়া?’

আমার ঠোঁট বেয়ে অস্ফুট বিস্ময়সূচক ধ্বনি বেরিয়ে আসে, ‘কই, দেখিনি তো!’

‘তা দেখবে কীভাবে!’Ñ প্রত্ন খুব বাঁকা গলায় বলে- ‘আজকাল তো তুমি নিশান পেট্রলে চলাফেরা কর! তেমন রাস্তা থাকলে অবশ্য বিএমডব্লিউ-ই চালাতে!’

এই শহরটা যখন জীবন্ত ও ধীরস্রোতা অথচ মরীচিকার মতো ঢেউতোলা ছিল আর আমাদের জীবনটাও ছিল ছায়া খুঁজে ক্লান্তি দূর করার জীবন, তখন আমরা অসংখ্যবার নিজেদের মধ্যে নিজেদের অজান্তেই এমন চটুল আর তির্যক কথাবার্তা বলে হাসাহাসি করতাম। কিন্তু এই বেলা সেরকম হলো না, আমার ভারী রাগ হলো এরকম কথা শুনে আর সুষমাকেও দেখলাম অযথাই চটে উঠতে, ‘শুধু গাছপালা কাটবে কেন, সব কিছু কাটবে। সব সম্পর্কও দেখবি কুচি কুচি করে কাটবে।’

খুব ভয়ঙ্কর মনে হলো কথাটা। কিন্তু বুঝতেই পারলাম না সুষমা কেন এরকম বলল, আর আমারই বা কেন কথাটাকে এত ভয়ঙ্কর মনে হলো। পরদিন অফিসে যেতে যেতে একবার মনে হলো বইকি, সত্যিই দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, ঘর থেকে বেরুনোর পথে যে অপরাজিতাটার সঙ্গে প্রতিদিন চোখে চোখে কথা হলো, সেটার দিকে অনেকদিন তাকানো হয় না, কিংবা তাকালেও হয়তো অনুভব করি না কোনদিকে তাকিয়েছি, কী দেখেছি আর রাস্তার সেই টং দোকানটায়ও চা খেতে খেতে দু’চারটে বেলা বিস্কুটও খাওয়া হয় না। সেদিনই বোধহয় আমি নিজে থেকেই প্রজেক্টের নানা কিছুর খবরাখবর নেওয়ার চেষ্টা চালাই আর জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারি, প্রত্ন আর অজন্তারা যতটুকু বলেছে, ঘটনা আসলে তারও চেয়ে বেশি। শুধু গাছ কাটাই হবে না, আরও জায়গাজমি অধিগ্রহণ করা হবে, তার বেশিরভাগই সেনানিবাসের জন্যে, আর সামান্যই আমাদের প্লান্টের জন্যে। অতএব সত্যি কথা বলতে গেলে, এইখানকার অনেক কিছুই থাকবে না। স্কুলগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে, রেলজংশনও বন্ধ হয়ে যাবে। কিংবা থাকবে, কিন্তু কেবলমাত্র অনুমতিপ্রাপ্তরাই নামতে পারবে স্টেশনটাতে। আমি এ কথাও জানতে পারলাম, কয়েকজন ছেলেমেয়ে নাকি পরিবেশ দূষণের প্রশ্ন তুলে একটুআধটু প্রচার চালিয়েছিল; কিন্তু এলাকার লোকজনই ক্ষিপ্ত হয়ে খুব মারধর করেছে তাদের।

হঠাৎ করেই আমার মনে পড়ে যায়, প্রথম যেদিন এই ইস্টিশানটাতে এসে নামি আর ছয়-সাতটা প্লাটফর্ম দেখে চোখে ধাঁধা লেগে যায়- সেদিনই বোধহয় আমি প্রথম চা-পানের মজাটা বুঝতে পারি। বিশাল বিশ্রামাগারের সামনে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে বসা চায়ের দোকানটায় চা পান করে চিত্ত পরিতোষ হলে আমি ইস্টিশানের বাইরে এসে একটা মান্দার গাছ দেখি। দেখি তার গা ভর্তি কাঁটা আর ফুলের ভারে ডালগুলো যেন বাঁকা হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর সেই সৌন্দর্যের দিকে আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি, যতক্ষণ না একজন বিহারি এসে আমাকে বলে, কুলি লাগবে কি না।

আমার খারাপ লাগছিল; সত্যিই ভীষণ খারাপ লাগছিল- কিন্তু সেই মান্দার ফুল দেখার স্মৃতি কেন মনে পড়েছিল, তা আমি বলতে পারব না। একবার মনে হচ্ছিল, এটা ঠিক হচ্ছে না, সত্যিই ঠিক হচ্ছে না। একবার মিটিংয়ের ফাঁকে হঠাৎ চোখ বুজে এলে যেন হঠাৎ দেখতে পেলাম, পুরনো একটা স্টিমার এসে হঠাৎ পদ্মার কুমারী তীরটায় থামল, অথবা কুমারী সে তীর কখনই ছিল না, এই অখ্যাত জনপদটার কত শত মানুষ সেই তীরের জমিতে চাষবাদ করেছে, গড়ান বেয়ে নেমে গোসল সেরেছে, বর্ষাশেষে পাড়বেয়ে গজিয়ে ওঠা মাষকলাই সংগ্রহ করেছে, নিজেদের জন্যে, গোয়ালের গরু-মহিষের জন্যে, না জানি কত না মানুষ সেখান দিয়ে চলে গেছে শীত-বসন্তে নৌকার গুণ টেনে। তার পরও সে তীর কুমারীই রয়ে গেল, যতদিন না স্টিমার থামিয়ে তা থেকে নামল ইংরেজরা। জনপদটা তখন হয়তো হয়ে উঠেছিল ঠিক শিলংয়ের মতো- পূর্ববঙ্গের শিলং। যদিও এখানে কোনো পাহাড় ছিল না, ছিল না কোনো বন। কিন্তু নদী তো ছিল; ছিল বিস্তৃত জলাভূমি, যেখানে কেবল শীতের সময়ই নয়Ñ সারা বছরই জন্মদানের উৎসবে মেতে থাকত পরিযায়ী পাখিরা। আর আরও ছিল বিস্তীর্ণ সমতল ফসলের প্রান্তরÑ যার সৌন্দর্য বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে, কিন্তু একবার সেই সমতলের মরীচিকার ডাক হৃদয়ের শ্রুতিঘরে পৌঁছলে মানুষ আর তারপর থামতে পারে না-মানুষ কেবলই হাঁটতে থাকে তখন দিগন্তরেখার দিকে। আমি স্বপ্নের মধ্যে কিছুক্ষণ পড়ে থাকা অতীতের সেইসব একটুআধটু হাতড়ে দেখি, রেলজংশনের গেট পেরিয়ে বাইরে এসে পুরো জনপদকে দেখি, দেখি তারও আগের পদ্মাকে, দেখি তার এদিক ওদিক রেল বসছে, ফেরিঘাট বসেছে। নতুন এক ইতিহাস রচিত হতে চলেছেÑ এই প্রথম কোনো দীর্ঘ সেতু বসছে পূর্ববঙ্গের কোনো নদীর ওপর। এসেছে ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার, সাহেব-সুবো কতজন; তাদের জন্যে ক্লাবঘর, তাদের জন্যে স্নানঘর, তাদের জন্য টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন কিংবা ক্রিকেট মাঠ! আর তাদের জন্য নারীÑ নম্র, সুস্থির ও নত অথচ থই থই শাওনভরা নারী। তারা মুছে দেবে এই বঙ্গের গরমে ঘেমে ওঠা শ্বেতবর্ণের মানুষগুলোকে, তারা ক্লান্তি দূর করে দেবে পরবাসে আসা এই পুরুষগুলোর। কিন্তু কোনো স্বপ্নই তো সম্পূর্ণ হয় না, কেননা মানুষের ঘুম ভেঙে যায় আর মানুষের ঘুম বার বার ফিরে আসে, কেননা প্রতিটি স্বপ্নই সম্পূর্ণ হতে চায়; কিন্তু কোনো স্বপ্নই সম্পূর্ণ হয় না, কেননা খুন হয়ে যাওয়াই মানুষের নিয়তি আর শেষ পর্যন্ত নিয়তিই মৃত্যুঞ্জয়ী, কেননা সে স্বপ্নকে খুন করতে পারে।

ধীরে হলেও আমাদের কাজকর্ম এগোচ্ছিল। ধীরে এগুচ্ছিল, কেননা বোঝাপড়া ঠিক হচ্ছিল না সবসময়। একদিকে স্থানীয় ঠিকাদার, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঠিকাদার; এর মধ্যে আবার রাজনীতিবিদগণ! তারাও থাবা বসাচ্ছিলেন এবং তা নির্বিঘ্নেই; কিন্তু এত বড় একটা প্রকল্প এটা যে, যেখানেই হাত রাখা যাক, সেখান থেকেই টাকাপয়সা ভুরভুর করতে থাকে, একটু হাত ডোবাতে না ডোবাতেই হাত উপচে উঠতে থাকে নানা মুদ্রা। তাদের মেলে ধরা থাবা তাই যেন একেবারে খাঁটি জিগার আঠায় আটকে গেল। পাচ্ছিলাম বইকিÑ আমরাও ছিটেফোঁটা পাচ্ছিলাম ভাগবাটোয়ারার পরে- কিন্তু সেই ছিটেফোটাও এত বড় অঙ্কের যে আমাদের মতো বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা এইবেলা নিবেদিতপ্রাণ সরকারি কর্মকর্তা হয়ে ওঠার দিকে মনোযোগী হয়ে উঠল। শহরটা যে মরতে শুরু করল, নাকি শহরটাকে আমরা যে খুন করতে শুরু করলাম, তা বোধহয় ঠিক এই সময় থেকেই। মানুষজন গাছপালার গায়ে লাল দাগ পড়তে দেখে একটু থমকে গিয়েছিলÑবাপরে বাপ, এত জমিজায়গা নিয়ে নিল, তার পরও লাগবে? আরও কত লাগবে? কতদিনে যে এই প্লান্ট বানানো শুরু হবে, তারই কোনো ঠিকঠিকানা নেই, অথচ একরের পর একর ধরে টান মারছে, ঘটনাটা কী? তা ছাড়া গাছপালা কেন কাটতে হবে? মানুষজন এরকম প্রশ্ন যতই করুক, সব প্রশ্নই ডুব দিচ্ছিল পদ্মার জলে। কারণ হরেদরে সব সাংবাদিকই আমাদের রিসোর্টের পার্টিগুলোয় নিয়মিত আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ পেতে লাগল আর আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ রাখতে রাখতে তারা প্রশ্ন করাই ভুলে গেল। তারা বরং আমাদের প্রশ্নগুলোই উচ্চারণ করতে লাগল আরও উচ্চস্বরে, এত পুরনো গাছ রাখার দরকার কি? দেড়শ’ বছর আগে লাগানো হয়েছিল, এ ছাড়া কি এর অন্য কোনো গুরুত্ব আছে? এগুলোর জীবনীশক্তি ফুরিয়ে এসেছে, ডালপালা ভাঙতে শুরু করেছে, ঝড়ে প্রতি বছরই দু’চারটে করে উপড়ে পড়ে, বাড়িঘর ভাঙে, রাস্তাঘাট ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধ থাকে- তার চেয়ে এসব গাছ কেটে ফেলে বরং নতুন করে একটা কিছু লাগানো তো অনেক ভালো। আর এখানে তো আলাদা একটা শহরই গড়ে উঠবে নতুন করে। ঠিক যেমন করে গড়ে উঠেছে রাজধানীর কাছেই পূর্বাচল। তা হলে ঐতিহ্যের নামে এইসব ত্যাদরামো করার কোনো মানে হয়?

সত্যিই তো, এগুলো কেটে ফেলতে সমস্যা কি? এই প্রশ্নের উত্তরে জমে ওঠা যাবতীয় মৌনতা আমাকে চমৎকৃত করে, আশ্বস্ত করে। প্রতিদিন নিকোনো উঠোন সৃজন করে চলা নারী, নদীজলে গা ভিজিয়ে নদীকে পবিত্র করে তোলা নারী-কিশোরী, ভ্যান কিংবা রিকশা চালিয়ে যাওয়া ভীত মানুষজন, প্রতিদিন ছোটখাটো সব দোকান পেতে বসা ভীত লোকজন, বংশপরম্পরায় বিশুদ্ধ দুধ-পানিতে বিশুদ্ধ সব মিষ্টি বানানো দোকানদার, পলিপরা এঁটেল গাঢ় মৃত্তিকার সহচর পালদের দল কিংবা শেষ বয়সে একটু নিবিড় নিস্তরঙ্গতায় জীবন কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্নবিলাসী ঘরদোর তোলা মধ্যবিত্তÑ সবাই উদ্বিগ্ন হতে থাকে। অথচ নির্বিকার হতে থাকি আমি। আমার পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রীর উদ্বেগও আমি টের পাই না, ধরতে পারি না। প্রতিদিন ঘরে ফিরে টের পাই, অনেক আগেই আমার স্ত্রী কিংবা ছেলেমেয়েরা শুয়ে পড়েছে, যদিও জেগে আছে; কিন্তু আমাকে এতই নির্বিকারত্ব আঁকড়ে ধরে যে, সেসবে কোনো প্রতিক্রিয়াই হয় না আমার। এই যেমন, এখনও কোনো প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে না। আমার কিন্তু এখন বরং মনে হচ্ছে যে, শহরটা আসলে জেগে উঠছিল, সত্যিকার অর্থেই জেগে উঠছিল তখন। আর এখনও জেগেই আছে। … কী, ঠিক বলি নি আমি? প্রতিদিন বিকেল হতে না হতেই তখন আমার মধ্যে ভীষণ এক চঞ্চলতা জেগে উঠত, অতীতের বিকেলগুলোর চঞ্চলতার সঙ্গে তার পার্থক্য ছিল খুবই পরিষ্কার। কখনও আর হাঁটতাম না, সরাসরি ক্লাবে গিয়ে ঢুকতাম গাড়ি থেকে নেমে, হয়তো একটু টেবিল টেনিস খেলতাম অথবা গল্প করতাম রাশান কিংবা দেশি সব সুবেশি নারীদের সঙ্গে। অবশ্য এখনও তাই করি আমি; মানে করতে চাই, যদিও বয়সের কারণে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। এই যেমন একটু আগেও তালগোল পাকানো অবস্থাতে ছিলাম, শহর খুনের গল্প ফেঁদেছিলাম, কিন্তু আসলে তো খুন-টুন কিছু না, শহর বরং উন্নত হয়েছে। আর জানেনই তো উন্নত শহরে, বেগময় নগরে অনেক কিছুই প্রশ্রয় পায় না। কে বলে সত্যিকারের ভালোবাসায় কাউকে আর নির্বোধ কিংবা নিচু মনে হয় না? যে শহর গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছিল, সেই শহরের প্রতি নিবিড় কী এক ভালোবাসায় আমি বুঝতে পারছিলাম, স্ত্রী ও সন্তানরা বড় বেশি বুদ্ধিহীন আর অকালকুষ্মাণ্ড আমার। মনে হচ্ছিল, এই নির্বোধগুলো কী করে বুঝবে শহর তো আর বন নয়, শহরে গাছ থাকবে বইকি, কিন্তু তা ঘরের কোণ আর উদ্যানে। আমাদের মাননীয় সরকারও এই কথা বার বার বলছিলেন, কিন্তু তা যেন কারও কানেই যাচ্ছিল না। শহরটাকে আতঙ্কপুরীতে পরিণত করা হচ্ছিল চক্রান্তমূলকভাবে। ফিসফিসানি বেড়ে গিয়েছিল, মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছিল, কিন্তু সাহস পাচ্ছিল না মুখ খুলবার।

কিন্তু সে আর কয়দিন! কী করে আবারও পত্রপত্রিকায় খবর এলো, আবারও জমি অধিগ্রহণ করা হবে। আর সেই জমি অধিগ্রহণের তোড়ে উচ্ছেদ হয়ে যাবে শহরটার নতুন-পুরনো মানুষজন। তাদের চলে যেতে হবে এ জায়গা ছেড়ে। স্কুল-কলেজগুলো উঠে যাবে। ইক্ষু গবেষণা কিংবা কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও থাকবে না। থাকবে না রেলস্টেশন কিংবা এই বাসস্ট্যান্ডও। একটা এয়ারপোর্ট থাকবে বটে, কিন্তু কেবল সামরিক বাহিনীর সদস্য ও নিউক্লিয়ার প্লান্টের বৈজ্ঞানিক, গবেষক ও চাকরিজীবীদের জন্যে। হঠাৎ করেই মফস্সল শহরটা যেন পাল্টে গেল। মিছিলের পর মিছিল, বৃক্ষের জন্যে মানববন্ধন, ছায়াময় পথের জন্যে মানববন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যে মানববন্ধন, কবে কোন কবি সাহিত্যিক এই রেলস্টেশন নিয়ে কী না কী লিখেছে সেইসব নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গানবাজনা… অশ্লীলতার চূড়ান্ত। সে এক ভয়াবহ ঘটনা- রাস্তা প্রতিদিনই দখল করে থাকে নির্বোধ মানুষেরা, মিছিল করে তারা, মিটিং করে- গাড়ি নিয়ে বেরুনোই দায়। তাও একদিন অনেক কসরত করে অফিসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই খবর পেলাম, সেনানিবাসের শীর্ষ কর্মকর্তা নাকি আমাকে তলব করেছেন!

ভাবছেন, আমি ভয় পেয়েছিলাম?! মোটেও না। ভয় কেন পাব? আমি কি কোনো পাপ করেছি? ভুল করেছি? আমি কি শিখিনি- নুন খাও যার, গুণ গাও তার? আমি তো জানি, এই শহরটা কী করে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে, আরও বসবাসযোগ্য হয়ে উঠবে। একমাত্র সামরিক বাহিনীর পক্ষেই তো সম্ভব সেরকম করে তোলা। আর শুধু আমি কেন, এ দেশের সবাই-ই তো জানে, নগরের সুন্দর ব্যবস্থাপনা করা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব; সুন্দর ও মানসম্মত রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ভবন, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ- এসব কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব। কেন, আমরা কি দেখিনি, আমাদের রাজধানীতে কেবল সেই অংশটুকুই যানজটমুক্ত ও নির্ভেজাল ব্যবস্থাপনাযুক্ত, যেটুকু এলাকায় রয়েছে ক্যান্টনমেন্ট? আমরা কি দেখিনি সেখানে, কী সুন্দর পানির নহর বইছে- যা কি না করেছে সামরিক সদস্যরাই? আর এখন এই শহরটায় সেই কাজগুলো যারা করবে বা করতে শুরু করেছে, তাদের শীর্ষ কর্মকর্তা আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন, এর চেয়ে বড় গৌরবের ব্যাপার আর কী হতে পারে! আমি পড়ি মরি করে ছুটে যাই অস্থায়ী সেনানিবাসে-কেননা এখনও কাজ শেষ হয়নি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নতুন সেনানিবাসের।

তা সেখানে দেখি, জনপ্রতিনিধিও আছেন। পর পর চার বার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ মনজুর। কিন্তু তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না, এমন একজন মানুষকে জনগণ ভোট দিতে পারে, এমন একজন মানুষের ওপর জনগণ বার বার আস্থা রাখতে পারে। পুরোপুরি বিধ্বস্ত, চেহারা নীলাভ, পাঞ্জাবি-পায়জামা এলোমেলোÑ অবশ্য একেবারে ধবধবে পরিষ্কার সমস্ত কিছু।

মনে হলো গ্রিল করা হচ্ছে জনপ্রতিনিধিকে; কেননা ভিজে জবজবে হতে হতে বলছিলেন তিনি, ‘দেখেন, আমাদের তো পলিটিক্স করা লাগে-জনগণের দিকটাও তো দেখবেন একটু… আমরা তো জানিই কী হচ্ছে, কী হবে; তবে পাবলিক তো আলাদা জিনিস, তাদের সামনে অনেক কিছুই বলতে হয়। কখন কী বলি, নিজেরাও জানি না, নিজেদেরও আর মনে থাকে না। তাই বলে সব কিছুকে সত্য বলে ধরে নেবেন আপনারা? আপনারাও কি সব কিছু সত্যি সত্যি করেন? আরে ভাই, মানুষকে খেপতে দ্যান না খানিকটা, খেপতে খেপতে হয়রান হয়ে দেখবেন একেবারে শুয়ে পড়ছে। মুখে কোনো কথা নাই। এখন বিরোধিতা তো আমাদের করতেই হবেÑ আমরা তো আর পজিশন নষ্ট করতে পারি না, আমাদের দিকটাও তো আপনাদের দেখতে হবে।’

আমি গিয়ে হাজির হওয়ায় এইসব কথাবার্তায় ছেদ পড়ে। অথবা নতুন কোনো কথার ছদ্মবেশে পুরানো আলাপই যেন ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। এই প্রথম সেনানিবাসের শীর্ষ কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়েছি আমি। বয়সে তিনি বেশ জুনিয়রই বলতে হবে আমার চেয়ে। তবে আমি তো এখানে আমন্ত্রিত হয়েই এসেছি। তিনি তো আর আমাকে নির্দেশ দিয়ে নিয়ে আসেননি! যদিও এ-ও জানি, এ এমন আমন্ত্রণ, যা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে হয়। টকটকে ফরসা, তারচেয়ে বড় কথা হলো অত টগবগ করলেও বিনয়ের শেষ নেইÑ আর নতুন করে এসব বলার কি-ইবা আছে, আপনারা তো জানেনই, শীর্ষ কর্মকর্তারা সব সময় বিনয়ীই হন। কত যে দ্বিধা করলেন মূল প্রসঙ্গে আসতে! শেষ পর্যন্ত অনেক কুণ্ঠা আর অনিচ্ছা নিয়েই তাকে বলতে হলো, আপনি একজন সরকারি কর্মকর্তা, অথচ আপনার স্ত্রী-পুত্র-কন্যারাই কি না সভা-সমাবেশ করে বেড়াচ্ছে, আবার ভাষণও দিচ্ছে! আপনি তো এসবের মধ্যেই আছেনÑ আপনার কি মনে হয় চুরিচামারি হচ্ছে কিছু? আপনার কি মনে হয় আমরা পরিবেশ দূষণ করব? আপনার কি মনে হয়, আমাদের সরকারপ্রধান বুঝেশুনেই এমন একটা ক্ষতিকর কাজ করছেন? তার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক আর কে আছে বলেন? তাকে কটাক্ষ করে ভাষণ দেয়া কি ঠিক?

অন্য কোনো সময় হলে হয়তো ব্যক্তি অধিকার নিয়ে অনেকক্ষণ অনেক কথাই বলতে পারতাম আমি, কিন্তু তখন সত্যিই বিরক্ত লাগল। সত্যিই তো সুষমার কী দরকার এইসবের মধ্যে যাওয়ার, তাও আবার অজন্তা, প্রত্ন, ইলোরা সবাইকে নিয়ে!

তবে আমি হাসলাম, মৃদু শব্দ করে হাসলাম, ‘ওদের জন্যে ভাববেন না, আসলে আমার নিজেরই দোষÑ ওরা তো রাজধানীতে চলে যাওয়ার জন্যে মুখিয়ে আছে! আমিই পাঠাই-পাঠাই করে পাঠাচ্ছি না। বড় মেয়েটা স্কলারশিপ পেয়ে গেছে, কানাডায় চলে যাবে; আর ছেলেটা রাজধানীতে কোচিং শুরু করবে, ছোট মেয়েটাকেও ভালো একটা স্কুলে দিতে হবে। একটা বাসা খুঁজছি আমরা। এখানে যা ঘটছে, মনে করবেন না সেসব পুরোপুরি সত্য। মানে, বুঝতেই পারছেন, সামাজিকতা, বন্ধুত্ব, সাময়িক উত্তেজনাÑ মানুষ এসবের জন্যেও কিন্তু অনেক কিছু করে বসে। এগুলোকে এত গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন না।

তো, এই হলো ঘটনাÑ কী আর বলব, বলেন! এসব কত আর বলা যায়। ভাবছি, আত্মজীবনী লিখব নাকি! কিন্তু আমার এই জীবনে বলার মতো ঘটনাও তো তেমন কিছুই নেই। লোকজন বলে, এ দেশের মানুষজন নাকি আত্মজীবনীতে আরও বেশি মিথ্যা কথা লেখে। হতে পারে তাই, কিন্তু কবে কোন মেয়েকে প্রথম লাগালেন, জীবনে কয়টা মেয়েকে আর কয়টার পেট খসাতে হলো, এইসব বললেই কি আর আত্মজীবনী বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে? যে মেয়েটার কথা বললেন, তারও তো একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে- নিজের জীবনের উন্মত্ততাকে তুলে ধরে বাহবা কুড়ানোর লোভে আপনি কি আপনার ওপর তার বা তাদের বিশ্বাস ও আস্থাকেই নষ্ট করলেন না? আমি তাই ওদিকে বরং না যাই, শুধু বলি, সুষমাদের বিদায় দেয়ার পর আমার জীবন যে বর্ণিল থেকে বর্ণিলতর হয়েছে, তা আমি অস্বীকার করব না। মানুষের জীবন কত বিচিত্র, মানুষের সুখদুঃখ কত বিচিত্র, কেবল বহুগামী মেয়েরাই পারে আপনার সামনে তার ছবি তুলে ধরতে। তারাই পারে কেবল পৃথিবীর সত্যিকারের ক্রন্দনের সঙ্গে আপনাকে পরিচিত করতে। অবশ্য সেজন্য আপনাকেও সাহস করে বহুগামী হতে হবেÑএই আরকি। এইসব নয়,- আমি চিন্তা করেছি, আত্মজীবনী যদি লিখি, আমার সেই আত্মজীবনীতে শুধু বিশাল এই পৃথিবীর প্রকৃতির কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর কথাটুকুই বর্ণনা করবÑযার কাছে আমি আত্মসমর্পণ করে মুক্তি খুঁজে পেতাম, কিন্তু ভয়ে এখন আর সেই প্রকৃতির কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পারি না।

যা আমি বলতে চাই, তা আপনারাও জানেন; কথা এটুকুই- এই শহরটাকে শহর করে তোলার জন্য আমাদের কতই না মূল্য দিতে হয়েছে। অসচেতন জনগণের বিক্ষোভকে সামাল দিতে হয়েছে, ঘরের শত্রু বিভীষণকে বিদায় করতে হয়েছে; সবচেয়ে বড় কথা কি জানেন, নিজেদেরকেও পালটাতে হয়েছে। বড় কিছু করতে হলে, বড় কিছু পেতে হলে তো আগে নিজেদেরও পালটাতে হয়; আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের ব্যাপার হলো, নিজেকে পালটাতে পেরেছি। রাজনীতি, অর্থনীতি ও পরিবেশের এই যে নতুন এক প্রত্যয় সময়স্ফীতিÑ সেই সময়স্ফীতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছি। এ ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, সময়স্ফীতির দরকার ছিল আর আমাদের সরকারপ্রধানের প্রধান কৃতিত্বই হলো তিনি এই সময়স্ফীতি ঘটাতে পেরেছেন সাফল্যের সঙ্গে; সময়স্ফীতি ঘটানো না গেলে এত সব মহাবিপর্যয় থেকে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারতাম না, সামাল দিতে পারতাম না এই অসচেতন নির্বোধ জনগণকে, আসতে পারতাম না এই ৩০১৯ সালে। বিশাল মূল্যস্ফীতি যেমন আমাদের বড় বেশি প্রয়োজনীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে, পুঁজি আহরণকে শক্তিশালী করে তুলতে, সময়স্ফীতিও তেমনি আমাদের বড় বেশি দরকারি হয়ে উঠেছে একটা আদর্শের ওপর আমাদের এই অপরূপদেশটাকে দাঁড় করাতে, অপরাধকে দমন করে ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠা করতে। সময়স্ফীতিই কেবল পারে আমাদের শক্তিশালী করে তুলতে। মাত্র পাঁচ বছরের শাসনকাল এখন ওই স্ফীতির জোরে পেরিয়ে এসেছে রীতিমতো এক হাজার বছর। সময় এই অপরূপদেশে টেকসই এক রাবার, তাকে যতই টানা যাক না কেন, আমাদের শাসনকাল কেবলই বেড়ে চলে।

অবশ্য মাঝেমধ্যে কিন্তু ভীষণ ক্লান্তি লাগে- তবে আপনারা তরুণ, আপনারাই আমাদের উদ্দীপ্ত করে তোলেন আরকি। টেকসই গাছপালা এসে গেছে আমাদের এই ছোট্ট শহরটায়, টেকসই রাস্তাঘাটও; সময়স্ফীতির কারণে সেগুলো নির্মাণেও সময় গেছে বেশ, নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে তাতে, বেড়েছে প্রকল্প সময় আর তার ফলে বেড়েছে শ্রমিক, ঠিকাদার থেকে শুরু করে আমাদের সকলেরই কাজের মেয়াদ। তা হলে আর কী চাই আমাদের? পারমাণবিক বিকিরণের কিছু কিছু সমস্যা আছে বটে, তবে আমাদের শ্রমিকদেরও দোষত্রুটি কম নয় কিন্তু। এক হাজার বছরেও তারা ঠিক মতো দক্ষ হয়ে উঠল না, এখনও তারা মাঝেমধ্যেই পারমাণবিক চুল্লীর কার্বাইটে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি দিচ্ছে। এটা কি বিজ্ঞানের দোষ, না মানুষের দোষ? অথচ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সবাই বলতে থাকবে, আমরা আগেই বলেছিলাম, এরকম হতে পারে! পারমাণবিক বিকিরণে মানুষ অসুস্থ হচ্ছেÑ তা তো হতেই পারে। আমরা কি অনেক চেষ্টা করেও ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকতে পারছি? উচ্চ রক্তচাপ থেকে দূরে থাকতে পারছি? তেল-চর্বি আর কার্বোহাইড্রেটের মতো পারমাণবিক বিকিরণেও একটু-আধটু রোগবালাই হবে, সমস্যাও হবে। কিন্তু আমাদের তো প্রচুর শ্রমিকও আছে! নাতিশীতমণ্ডলীয় এই শ্রমিকদের আবার উল্লেখযোগ্য একটি স্বভাব হলো, তারা কনডম পরে সঙ্গম করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। সেটা অবশ্য আমিও করি না। আর শুধু আমি কেন, কোনো ভদ্রলোকই করে না। তার পরও আমাদের উত্তরসূরি বৃদ্ধির হার একটু একটু করে কমছে; আমি জানি না, আপনাদের আসলে সেক্সের প্রতিই আগ্রহ কমছে কি না। এটি আমাদের মাননীয় সরকারপ্রধানের একটি বড় সাফল্য, তিনি শ্রমিকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, জীবন কয়দিনের সেটি বড় ব্যাপার নয়, বড় ব্যাপার হলো যে কয়দিন জীবিত আছেন, সে কয়দিন সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটানো, আর মাত্র সেই কয়েকদিনের মধ্যেই উত্তরসূরিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে যাওয়া। অতএব এই শ্রমিক শ্রেণির কারও তাড়াতাড়ি মরতে দ্বিধা নেই, অসুস্থ হতেও দ্বিধা নেই। এমন শ্রমিক শ্রেণি আছে বলেই না এই দেশটা এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে।

তবে ক্লান্তির কারণেই দৃশ্যটা বোধহয় আজকাল বড় বেশি করে মনে পড়ে। ওই যে, ওই দৃশ্যটাÑ ট্রেনে তুলে দিচ্ছি আমি সুষমা, অজন্তা, ইলোরা আর প্রত্নকে। তা জোরজবরদস্তির ব্যাপার একটু ছিল বইকি-যা করার সাহস হচ্ছিল না, অথচ করার ইচ্ছে ছিল অনেক আগে থেকেই। সেনানিবাসের শীর্ষ কর্মকর্তা তার নিজের অজান্তেই আমাকে সেই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, এই আরকি। তার কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞ। যদিও সুষমার ব্যথিত মুখ আমাকে সত্যিই পীড়া দিয়েছিল আর ফিরতে ফিরতে, রেলপ্লাটফর্ম পেরুতে পেরুতে এসবের মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ততদিনে বুলডোজার এসে গেছে, এসে গেছে ক্রেন, এসে গেছে আরও কত কি। লাল ক্রস চিহ্ন শুধু গাছে নয়, মানুষের বাড়িতেও ফুটে উঠতে শুরু করেছে। দেখছিলাম মানুষজন পথে হাঁটছে অথবা বাসস্টপেজ কিংবা রেলস্টেশনমুখো। তাদের লটবহর দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তারা কখনই, কোনোদিনই এখানে ফিরে আসবে না। তবে বুঝতেই পারছেন, নির্বিবাদে বিষয়টা ঘটে যাওয়ায় আমার সারা শরীরে একটা চাপা উল্লাস খেলা করছিল। গাড়ি যখন ছাড়ছিল তখন বেশ বিষণ্নই হয়ে উঠেছিলাম, সুষমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছিলাম, ‘আমাদের অচিরেই দেখা হবে। সামনের মাসেই আমি তোমাদের নিয়ে আসব। ততদিনে এইসব ক্ষোভবিক্ষোভ নিশ্চয়ই বন্ধ হয়ে যাবে।’

সুষমা রেলের জানালা থেকে মুখটা ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে নিতে নিতে বলেছিল, ‘আমাদের আর কোনোদিনই দেখা হবে না।’

ক্লাব থেকে ফেরার পথে সেদিন আমি তীক্ষè সুন্দরী, জুনিয়র লেবার ইন্সট্রাক্টর ওলগাকে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। অনেকদিন ধরেই আসতে চাইছিল সে, কিন্তু আমারই সময় হচ্ছিল না। তবে একটা ভারী অদ্ভুত ব্যাপার, সেদিন রাত থেকে বারান্দার হাসনাহেনাগুলো থেকে আর কখনই সুঘ্রাণ ভেসে আসেনি। অবশ্য আসার কথাও ছিল না। বোঝেনই তো, ভাঙাগড়া চলছিল। কোদাল, শাবল এসব তো ছিলইÑ বুলডোজার আর ক্রেন প্রতিদিন কত কিছু যে ভাঙচুর করছিল, নতুন করে একই সমতলে এসে দাঁড়াচ্ছিল বিস্তৃত এলাকা। কোথায় অমিয়ভূষণ আর কোথায় শঙ্খ ঘোষ, কোথাই-বা কে! আমার নিজেরও আর মনে হয় না, কোনোকালে ওইসব এখানে ছিল একদিন। 

আমি জানি না, সুষমারা এখন কেমন আছে! জানা যে খুব দরকারি, সেরকমও নয়। আচ্ছা, এই শহরটাকে আপনাদের এখন কেমন লাগে? যথেষ্ট সুন্দর না? হাবিজাবি রাজনীতিক নেই, সুশীল নাগরিক নেই, গরীবগুর্বো নেই- যতদূরে যান কেবলই সুনিয়ন্ত্রিত চৌকিতে ফৌজি পোশাকপরিহিত মানুষ, নিয়মনিষ্ঠ মানুষ; সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার শব্দ ভেসে আসছে কেমন দীর্ঘ লয়ে, রাস্তাঘাটে লোকজন নেই, চলাফেরাও করা বারণ, কারণ বাইরে বেরুলেই বাতাসের অদৃশ্য কোনো রশ্মিতে চামড়ার নিচে টিউমার জন্মায়, টিউমার দিনে দিনে বড় হয়। শ্রমিকরা অবশ্য এসবের তোয়াক্কা করে না, দুইদিনের জীবন তাদের, তারা ঠিকই মাঝেমধ্যে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং নিয়ম অমান্য করার কুফলও ভোগ করে। নিয়ম মেনে চলি বলে রাস্তায় আর হাঁটা হয় না আমার, অবশ্য হাঁটলেও এখন আর কোনো মান্দার গাছ চোখে পড়বে না। শুধু একটা ঘটনাই মাঝেমধ্যে পীড়িত করে আমাকেÑ নদীটার তীরে যাওয়া দূরে থাক, গাড়িতে বসে অনেক দূরের রাস্তা দিয়েও যাওয়ার সময় কী এক ভয় জমতে থাকে, মনে হয় মৃত নদীটা যে কোনো সময় জেগে উঠবে আর তীব্র জলস্রোত বয়ে যাবে এই শহরে, ভেসে যাবে সব কিছু। যদিও তেমন হওয়ার প্রশ্নই আসে নাÑ পারমাণবিক বর্জ্য গিয়ে জমছে নদীটাতে, বিশ্রী গন্ধে পালাতে চাইছে সে, দম বন্ধ হয়ে মরতে বসেছে। আমি জানি না, শহরটা মারা গেছে কি না, শহরটাকে হত্যা করা হয়েছে কি না; তবে নদীটা বোধহয় জানে আর জানে বলেই যে কোনো দিন হঠাৎ করে রুষে উঠবে। নদীর কাছে যেতে আমার ভারী ভয় হয়, আমার আর আত্মসমর্পণ করা হয় না নিত্যদিন, আমার আর মুক্তি খুঁজে পাওয়া হয় না নিত্যদিন, দেখুন এত ভীত একটা মানুষ আমি- স্বীকারোক্তিটাও ঠিকমতো দিতে পারি না ভয়ে-আতঙ্কে।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares