অরোরা আলোর হাত : হামিদ কায়সার

ঝকঝকে রোদের বিকেলবেলার অরোরা আলো মাইকের শব্দে শব্দে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তৈরি করে চলেছে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সমস্ত প্রাঙ্গণজুড়ে। সারাদেশে কর্মীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন আর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ডাকা হয়েছে এ সমাবেশ। আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে একটি ট্রাকের মাঝখানে প্রধান সারির নেতৃবৃন্দের মধ্যমণি হয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখছিলেন আয়োজনের শেষ এবং প্রধান বক্তা জননেত্রী।

দীর্ঘ এক ভাষণের পর জননেত্রী ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তৃতা শেষ করলেন। হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে সরে পড়লেন মাইকের সামনে থেকে। তিনি এখন এগিয়ে যাবেন ট্রাকের শেষ মাথায় রাখা মইয়ের উদ্দেশে। সবে এক-পা দু-পা এগিয়েছেন কী এগোননি ঠিক তখনই হঠাৎ দক্ষিণ দিক থেকে একটি গ্রেনেড এসে আছড়ে পড়লো ট্রাকের বাঁ-পাশে। মুহূর্তেই গগনবিদারী বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে প্রকম্পিত হলো চারদিক। নেত্রী নিজের অজান্তেই বসে পড়লেন ট্রাকের ওপর।

সন্দেহ নেই যে গ্রেনেড যারা ছুঁড়েছিল তাদের লক্ষ্য ছিল জননেত্রী। কিন্তু অরোরা আলোর দৈব ইশারাতেই কিনা নিশানা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। আর চকিত ঝলকেই যেন অতীব ক্ষিপ্রতায় বসে থাকা জননেত্রীকে ঘিরে তৈরি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অমর এক মানবপ্রাচীর। নেতৃবৃন্দ, প্রধান সারির সব নেতৃবৃন্দ যেন তাদের মুক্তিযুদ্ধ-চেতনার প্রধান রক্ষাকবচটিকে হারিয়ে ফেলতে রাজি নয়। যেন যে কোনো মূল্যে শুভধারার জীয়নকাঠিকে ধরে রাখবেন, ধরে রাখতেই হবে! নইলে যেন সমূলে নস্যাৎ হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন! নিজের জীবন বাজি রেখে তারা এক-একজন হয়ে উঠলেন লখিন্দরের দুর্ভেদ্য দেয়াল। তবু বিষধর সাপের ছিদ্র অন্বেষন থেমে রইলো না। অব্যাহত ফোঁসফোঁসানির মতো একের পর এক গ্রেনেড এসে আছড়ে পড়ছে ট্রাক এবং ট্রাকের আশপাশে। কে যে কোথায় ছিটকে পড়ছে, কে কোথায় মুখ থুবড়ে ধুঁকছে মৃত্যু-কাতর যন্ত্রণায়, কারও দিকে কারও তাকানোর ফুরসৎ নেই। প্রাণভয়ের চিৎকার, অস্থির ছোটোছুটি আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ প্রাঙ্গণে নেমে এসেছে কারবালার হাহাকার।

জননেত্রী ক্ষণকালের হতবিহ্বলতা কাটিয়ে কোথায় আছেন কেমন আছেন আঁচ করতেই বুঝলেন, তিনি একটি আবেষ্টনের ভেতরÑ চারপাশ ঘেরা সুগভীর মানব-আবেষ্টনীতে সুরক্ষিত। যেন তাকে বাইরে থেকে কেউ একটা কাকপক্ষীও দেখার সুযোগ না পায়, যেন কোনো শত্রুর সামান্য ঢিলও শরীর স্পর্শ করতে না পারে, নেতৃবৃন্দ এমনভাবে তাকে ঘের দিয়ে রেখেছেন! আগলে রেখেছেন পরম মমতা আর যত্নে! মুহূর্তেই এ-চরম বিপদ-ক্ষণেও নেতা-কর্মীদের প্রতি অপার মমতা আর কৃতজ্ঞতায় মন আপ্লুত হয়ে উঠল। এ-কর্মী এবং নেতৃবৃন্দ যে কতবার তাঁকে স্বাধীনতার ঘোর শত্রুদের কালো হাত থেকে বাঁচিয়েছে, রক্ষা করেছে, কেউ কেউ তো অকাতরে জলাঞ্জলি দিয়েছে নিজের জীবন পর্যন্ত! সেসব ঋণ কি কখনও শোধ করা যাবে? যাবে না। বড় অপরিশোধ্য সেসব ঋণ! বাইরের আহাজারি চিৎকার কান্নাধ্বনি শুনে জননেত্রী স্বভাবতই উৎকন্ঠিত বোধ করেন। তিনি অস্থির কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে জানতে চান, আমার কর্মীরা কেমন আছে হানিফ সাহেব, কর্মীরা? মায়া, সেলিম, জলিল ভাই দেখেন তো! আমু ভাই!

জননেত্রীর বর্ম হয়ে থাকা নেতৃবৃন্দ, নিজেরাও উদ্বেগ-তাড়িত, বড় অসহায় মনে হয় সবাইকে বড় বিপন্ন লাগে, এর মধ্যেই কে একজন যেন সান্ত¦না জোগায়, জানি না নেত্রী কী হচ্ছে! একটু পরই বুঝতে পারব! কথা যেন জড়িয়ে আসতে চায় সে-মানুষটার!

তখনও গ্রেনেড বিস্ফোরিত হচ্ছিল, প্রচণ্ড শব্দে ভূ-ভাগ কাঁপিয়ে। তবে প্রকোপ কিছুটা কম। নেতৃবৃন্দের মধ্যে ফিসফাস উঠল, নেত্রীকে গাড়িতে উঠিয়ে দাও! গাড়ি বুলেট প্রুফ! এখানে স্টে করা ঠিক হবে না!

নেতৃবৃন্দসহ দেহরক্ষীগণ জননেত্রীকে গভীর যত্নে আগলিয়ে ট্রাক থেকে দ্রুত নামিয়ে আনতে থাকে নিচে। আর সেই নিচে নামার মুহূর্তেই নেত্রীর চোখে দৃশ্যমান হয়ে উঠল ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা দুমড়ানো-মুচড়ানো ছেঁড়া স্যান্ডেল-ব্যানার পতাকা, মুমূর্ষু কাতরানো কর্মীদের রক্তাক্ত দেহ, বাঁচার আকুতি!

তাঁর মন কিছুতেই মার্সিডিজ বেঞ্জের দিকে এগিয়ে যেতে সায় দিল না। বাবা কোনোদিন পেছন হাঁটেননি। পেছন হাঁটার স্বভাবটাই তার ছিল না। শেখের বেটির কণ্ঠে গভীর আকুতি ঝরে পড়লো, আমাকে নিয়ে যাচ্ছো! ওদের কি হবে! ওদেরকে দেখো! ওদেরকে দেখো!

দেহরক্ষীগণ এবং নেতৃবৃন্দ জননেত্রীকে প্রবোধ দেন আশ্বস্ত করেন, আমরা দেখছি নেত্রী। আপনি গাড়িতে উঠুন। প্লিজ গাড়িতে উঠুন।

সবার তাড়না আর তাড়ার কাছে অবশেষে হার মানতেই হয়। জননেত্রী দ্রুতই এগিয়ে যান বুলেট প্রুফ মাসির্ডিজ বেঞ্জের কাছে। উঠতে গিয়েও পারেন না। পা যেন স্থবির অবশ হয়ে পড়ে। ‘আইভি আপা কোথায়? আইভি আপাকে তো দেখছি না! তাঁর কণ্ঠে গভীর উদ্বেগ!

সামনে দাঁড়ানো আবদুল জলিল বিষণ্ন কণ্ঠে জানালেন, শি ইজ ইনজ্যুরড।

কোথায়! আমি দেখব।

আবদুল জলিল তাড়া দিয়ে উঠলেন, আপনি গাড়িতে উঠুন।

আবদুল জলিলের পাশে দাঁড়ানো মোহাম্মদ হানিফের দিকে তাকিয়ে এই এতক্ষণে চমকে উঠলেন নেত্রী, ধবধবে সাদা পায়জামায়, পাঞ্জাবির কোণে কোণে লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্ত। আপনি ঠিক আছেন তো হানিফ সাহেব?!

মোহাম্মদ হানিফ কি বললেন তা চাপা পড়ে গেল দেহরক্ষী মাহবুবের চিৎকারে, মুভ! নেত্রী মুভ! গাড়িতে উঠুন জলদি!

কথার মাঝখানে বাধা পেয়ে নেত্রী অসহিষ্ণু, ‘নাহ! আমি উঠব না গাড়িতে! ওরা আমাকে মারলে মারুক।’

দেহরক্ষী মাহবুব আর নেত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেন না এক মুহূর্তও। ক্ষিপ্র বেগে প্রায় ঠেলে-ধাক্কিয়ে জোর করে তুলে দেন গাড়িতে! আর তখনই কোথা থেকে একটা গুলি এসে মাহবুবের মাথা ভেদ করে যায়। আরেকটা গুলি, আরেকটা, মাহাবুবের বুক শরীর রক্তাক্ত ঝাঁঝরা হয়ে ওঠে।

কে যেন গাড়ির দরোজা ত্বরিত লাগিয়ে দিয়েছিল। গাড়িটা দ্রুতগতির ঝড়ো হাওয়ার মতো সরে যেতে থাকে স্পট থেকে। গ্রেনেডের শব্দ তবু মতো তেড়ে তেড়ে পেছন-পেছন আসে। টের পায় গুলি এসে লাগছে বুলেট প্রুফ মার্সিডিজ বেঞ্জের শরীরে, সামনে পেছনে, সর্ব-দিক!

২.

থম মেরে গাড়িতে বসে আছেন জননেত্রী। এখনও সন্ধ্যার অন্ধকার গলা চেপে ধরেনি প্রকৃতির। তবু জননেত্রী স্তব্ধ-বিমূঢ়-নির্বাক। কোনো বোধ কোনো চৈতন্যই যেন কাজ করছে না! গাড়িটা জিপিওর মোড় পেরিয়ে সচিবালয়ের ভেতরের রাস্তা দিয়ে দ্রুত বেগে ছুটে চলেছে।

এমনভাবে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। তবে আজকের মতো এতটা ভেঙে পড়েননি আগে কখনও। ১৯৮১ সালের ১৭ মে যখন দেশে ফিরে এসেছেন, তখনই নিজের মৃত্যু কবুল করেই ফিরেছিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুকে বংশসুদ্ধ নিপাত করতে চেয়েছে, তারা যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন! নিজের ওপর আসা আঘাতগুলো তাই মোকাবিলা করেছেন রাজনৈতিক গেম হিসেবে। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় এভাবে নগ্ন চোরা আক্রমণ আগে কখনও হয়নি। হলেও রয়েসয়ে হতো।

অবশ্য তাঁর ওপর প্রথম আক্রমণটা এসেছিল সরাসরি রাষ্ট্র-যন্ত্রের কাছ থেকেই। চট্টগ্রামে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেদিন তিনি যখন পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে মিছিল নিয়ে লালদিঘি জনসভার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, তখনই পুলিশ আর বিডিআরের গুলিতে তছনছ হয়েছিল তাঁদের ট্রাক মিছিল। সাতজন তরতাজা কর্মীর প্রাণ সঙ্গে সঙ্গেই ঝরে পড়েছিল রাজপথে। আহত হয়েছিল তিন-শতাধিক কর্মী।

এভাবে প্রায় প্রতি-বছরই কোথাও না কোথাও তাঁর ওপর আক্রমণের পর আক্রমণ চালিয়েই যাচ্ছে দেশের স্বার্থবিরোধী অশুভ চক্র! ঈশ্বরদীতে ট্রেনের বগিতে, বরিশালের গৌরনদীতে, নওগাঁয়, সিলেটের জনসভায়, রূপসা নদীর সেতু উদ্বোধনকালে, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায়, কলারোয়ায় তাঁকে কতভাবেই না হত্যার প্রচেষ্টা হয়েছে!

এবার এ-বঙ্গবন্ধু এভিনিউতেও ওরা অ্যাটেম্পট নিয়েছে হত্যার। এমনকি ঘরের কাছের রাসেল স্কোয়ারসহ ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের বাড়িতেও ফ্রিডম পার্টির লোকজন গ্রেনেড চার্জ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। প্রতিটি আক্রমণের প্রতিটি অমাবস্যার কালো অধ্যায়ে এ-কর্মীরাই তাঁকে ঢাল হয়ে বর্ম হয়ে আগলে রেখেছে, প্রতিবাদে-প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সেই কর্মীদের বারবার এভাবে অকাল প্রাণ-বিয়োগে তাঁর মনটা আজ সত্যিই চিরেফারা হয়ে যাচ্ছে! জানে না আজ কতজন কর্মী হারাতে হবে, খালি হবে কত মায়ের বুক?

পরিস্থিতি মোটেও ভালো ঠেকেনি। আইভি আপার জন্য মন হু হু করে কাঁদছে। যেভাবে জলিল ভাই খবরটা জানালেন, মনে হচ্ছে অবস্থা আশংকাজনক। মাহবুবের অবস্থাও ভালো মনে হলো না। চোখের সামনে ছেলেটা কেমন ঢলে পড়ল। আল্লাহ যেন ওকে বাঁচিয়ে রাখে। বড় মা-অন্তপ্রাণ। ক’দিন আগেই ওকে একটা ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন জননেত্রী। ওর নিষ্ঠা আর আন্তরিকতা দেখে। ঘড়িটা ও কিছুদিন ব্যবহার করে ক’দিন পরই মানিকগঞ্জে রেখে এসেছিল মায়ের কাছে! পাছে হারিয়ে যায়, নষ্ট করে ফেলে। আল্লাহ মায়ের কোলটা তুমি খালি করে দিও না প্রভু। মাহবুবকে তুমি বাঁচিয়ে রাখো! আইভি আপাকে তুমি বাঁচিয়ে রাখো! আমার কর্মীদেরকে তুমি সুস্থ করে দাও! তুমি ছাড়া আর কে আছে রক্ষাকারী মালিক?

জননেত্রী হৃদয়ের সমস্ত আকুলতা নিয়ে মাহবুবের জন্য, আইভি আপার জন্য, কর্মীদের জন্য মনে মনে প্রার্থনা করে চলেন। স্বজনহারানোর বেদনা যে কী, তাঁর চেয়ে বেশি আর এ দুনিয়ার কেউ জানে না, জানার কথাও নয়! সে যন্ত্রণা উপলব্ধি করার ক্ষমতাও নেই কারও। যেখানে একজন স্বজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর যন্ত্রণা সারা-জীবনে ভোলা সম্ভব হয় না, সেখানে তাঁকে পরিবারের সাত-সাতজন মানুষসহ আরও কত নিকট-আত্মীয়কে একসঙ্গে হারানোর শোক বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এর কোনো সান্ত¦না নেই, প্রবোধও চলে না। 

সুধা সদনের গেট দিয়ে মার্সিডিজ বেঞ্জ যখন ভেতরে ঢুকল, সন্ধ্যার অন্ধকার তখনও ঘনিয়ে আসেনি। আজ কোনো অতিথি নেই, বাইরের কোনো লোকজন নেই। আজ এখানে বাড়তি সতর্কতা। নিরাপত্তা কর্মীরা সকলেই সুশৃৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে। জননেত্রী ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নামেন। শেখ রেহানা, বেবী মওদুদসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজন সামনে এসে দাঁড়ায়। জয় আসে, পুতুল আসে। কেউ কেউ নেত্রীকে জড়িয়ে ধরে, কেউ কেউ ভেঙে পড়ে কান্নায়। কেউ আবার মোনাজাতের ভঙ্গিতে আল্লাহর কাছে শোকরিয়া জানাতে থাকে যে, নেত্রী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তারই অশেষ রহমতে নতুনভাবে জীবনপ্রাপ্ত হয়েছে।

অব্যক্ত কান্নার ভারী বাতাসে নেত্রী অতি কষ্টে নিজেকে সংবরণ করার আপ্রাণ প্রয়াস পান।

তাঁর তো ভেঙে পড়লে চলবে না। সকল গরল আত্মসাৎ করে সব বিষ হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। তবু চোখ অশ্রুসজল হয়। নেত্রী নিজেকে সামলে সবাইকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসেন, পানি পান করেন, কফি পান করেন। তারপর কথাবার্তা শেষ করে সবার অনুরোধ আর সম্মতিক্রমে বিশ্রাম নিতে এগিয়ে যান নিজের কক্ষের দিকে।

বাথরুমে ঢুকে জননেত্রী ফ্রেশ হন। তারপর দরোজা ভেজিয়ে নিজেকে বাইরের পৃথিবী থেকে পুরোই আলাদা করে নেন। এখন তাঁর চাই একটু নিভৃতি। অনেকখানি একাকিত্ব। যে নিভৃতিটুকু কিনা সেদিন সেই পঁচাত্তরে দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার দুতিন-দিন পরই পেয়েছিলেন গভীর রাত্রিতে।

হ্যাঁ, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সে সাক্ষাৎটা ছিল বড়ই তাৎপর্যময়। সেই সাক্ষাতের পর একদিকে যেমন তাঁর জীবন ক্ষণকালের হতাশায় গভীর কালো শোকের তমসাচ্ছন্নতায় ডুবে গিয়েছিল, তেমনি দোদুল্যমানতা আর সংশয়াচ্ছন্ন অস্পষ্টতার বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট পথও খুঁজে পেয়েছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত তাঁর বা রেহানার ১৫ আগস্টের প্রকৃত সত্য সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। অঘটন যে একটা বড় ধরনেরই ঘটেছে, তা টের পেয়েছিলেন সেই ব্রাসেলস্-এ ঠিকই! কিন্তু ঘটনার নির্মমতা যে এতটা ভয়াবহ হবে এতটা কঠিন, তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, ভাবতে পারেননি! ওয়াজেদ মিয়া, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী দু’জন মিলে এত সতর্কতার সঙ্গে পুরো বিষয়টা হ্যান্ডেল করেছেন যে, কোনোভাবেই তাঁকে এবং রেহানাকে প্রকৃত সত্য জানতে দেওয়া হয়নি। তারা ভেবেছিলেন এত বড়ো আঘাত দু’জনের কেউই হঠাৎ নিতে পারবে না।

উফ! কী যে অভিশাপ নিয়ে এসেছিল পনেরোই আগস্টের ব্রাসেলস্-এর সেই কাক-সকাল। সেদিন ছিল শুক্রবার! ভোর ছয়টার দিকে ওয়াজেদ মিয়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল বেলজিয়ামের তখনকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের স্ত্রীর ডাকেÑ জননেত্রী তখন ওয়াজেদ মিয়া, জয়, পুতুল ও শেখ রেহানাসমেত সে-বাড়িতেই আতিথেয়তা গ্রহণ করছিলেন।

কী কারণে এত সকালে রাষ্ট্রদূতের স্ত্রীর এই ঘুম থেকে ডেকে তোলা? বিশেষ করে যখন অনেক রাত পর্যন্ত শেখ রেহানা তার দু-মেয়ের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে, অনেক রাতে এসে ঘুমিয়েছে, তার রেশ ফুরাতে না ফুরাতেই এত সাতসকালে কেন রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী এভাবে এসে ঘুম ভাঙাবেন! সেটা তো একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার! তা ছাড়া হঠাৎই যেন মিসেস সানাউল হকের আচরণেও একটা দুর্বোধ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল। আগের রাতের সেই স্নেহমাখা আন্তরিকতা নিমিষেই উধাও। গোমরো মুখ করে তিনি জানালেন, জার্মানির বন থেকে সেখানকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী টেলিফোন করেছেন, তিনি ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জরুরি কী কথা বলবেন।

ওয়াজেদ মিয়ার বদলে জননেত্রী নিজেই গিয়েছিলেন কৌতূহলের দুর্নিবার তাড়নায়। কিন্তু হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সোজা জানিয়ে দিলেন, তিনি শুধু ওয়াজেদ মিয়ার সাথেই কথা বলতে চান।

বুকের ভেতরটা তখনই ধক করে উঠেছিল জননেত্রীর। কী এমন কথা যে তাঁকে বলা যাবে না। জননেত্রী নিচে এসে ওয়াজেদ মিয়াকে পাঠিয়ে দিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার জন্য।

খানিক বাদে থমথমে মুখে ফিরে আসলেন ওয়াজেদ মিয়া! জননেত্রী আর শেখ রেহানার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে শুধু জানালেন, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আজ আমাদের নির্ধারিত প্যারিস যাত্রা বাতিল করে বনে যেতে বললেন তাঁর কাছে।

জননেত্রী আর শেখ রেহানা দু’জনই চেপে ধরলেন, বাংলাদেশে কী হয়েছে না জানালে তারা কিছুতেই এই ব্রাসেলস ছেড়ে এক পাও নড়বেন না। ওয়াজেদ মিয়া তখন বাধ্য হয়েই জানালেন, বাংলাদেশে কি একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেছে যার জন্য আমাদের প্যারিস যাওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে না।

এ কথা শুনেই সেই যে দু-বোনের হৃদয়ে শ্রাবণের ধারাপাত শুরু হলো, তার বারিসিঞ্চন ব্রাসেলস থেকে বন, বন থেকে দিল্লিতে পৌঁছেও শেষ হলো না। বনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পরামর্শ আর সহযোগিতায় সিদ্ধান্ত হলো, একমাত্র দিল্লিই হতে পারে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তখনও তাদের দু-বোনকে কেউ জানায়নি, কেন তাদের জন্য এতটা সিরিয়াসভাবে নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভাবা হচ্ছে। অথচ ওয়াজেদ মিয়া শুরু থেকেই জানতেন সবকিছু। কী করবেন, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তাঁকে ওয়াদা করিয়েছিলেন, নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত জননেত্রী এবং শেখ রেহানাকে কোনো কিছুই জানানো যাবে না! ওয়াজেদ মিয়া সে ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।

কী যে কঠিন ছিল সে সময়টা! ঢাকায় কী হয়েছে সে টেনশন তো আছেই, মানুষের হৃদয়হীনতার পরিচয়ও বেঢপ মিলছিল। যে রাষ্ট্রদূত সানাউল হক জননেত্রীদেরকে আতিথ্য দিতে পেরে নিজেদেরকে ধন্য মনে করছিলেন, একরাতের ব্যবধানেই তিনি ও তার স্ত্রী নেত্রীদেরকে বাড়ি থেকে বিদায় করার জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন। অনেকটা রূঢ় ভাষায়ই ওয়াজেদ মিয়াকে জানিয়ে দিলেন, তিনি আর দুই বোনের ঝামেলা নিতে রাজী নন। তাড়াতাড়ি যেন তারা বাসা ছেড়ে যেখানে খুশি চলে যায়! তিনি ব্রাসেলস থেকে বনে যাওয়ার জন্য জননেত্রীদেরকে গাড়িটা ব্যবহার করতে দিতেও রাজী হলেন না। বন থেকে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীই যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। সেদিন সত্যিই ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সম্মানিত রাষ্ট্রদূত। তিনি শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নেত্রীদেরকে ব্রাসেলস থেকে বনে নিজের বাড়িতে নিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, অর্থ-আশ্রয় সব রকম সাহায্যই দিয়েছিলেন হৃদয় উজাড় করে, সেই সঙ্গে নেত্রীদেরকে দিল্লি যাওয়ারও ব্যবস্থা করেছেন।

২৫ আগস্ট তারা ফ্রাংকফুর্ট বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়ে সেদিনই পৌঁছে গিয়েছিলেন দিল্লির পালাম বিমানবন্দর। দুপুরের দিকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো ডিফেন্স কলোনির এক বাসায়। তারপর সেখানেই আত্মগোপন বসবাস। ভারতে তখন চলছিল জরুরি অবস্থা।

এর দু-সপ্তাহ পর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জননেত্রী এবং ওয়াজেদ মিয়াকে পৌঁছে দিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসায়। প্রায় দশ মিনিট পর ইন্দিরা গান্ধী এসে জননেত্রীর পাশে বসলেন। সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষে প্রধানমন্ত্রী ওয়াজেদ মিয়ার কাছে জানতে চাইলেন, ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে তাঁরা পুরোপুরি অবগত কি-না।

জবাবে ওয়াজেদ মিয়া জননেত্রীকে এতদিন যা শুনিয়ে এসেছিলেন সেটাই আবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জানালেন। তখন ইন্দিরা গান্ধী কী রকম এক শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেখানে উপস্থিত এক কর্মকর্তাকে ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য জানাতে বললেন। ইন্দিরা গান্ধী যে নিজের মুখে সেসব নৃশংস বর্বরতার কথা বলতে চাইছিলেন না বেশ বোঝা যাচ্ছিল।

তখন ওই কর্মকর্তা ইন্দিরা গান্ধীর দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে জানালেন, শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের কেউ-ই বেঁচে নেই।

জননেত্রী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। বাষ্পীভূত সব কান্না যেন অঝোর বৃষ্টিধারায় ঝরতে লাগল। নিথর বসেছিলেন ওয়াজেদ মিয়া। যেন এতদিন মনের ভেতর গুমরে থাকা কথাগুলো জানাতে পেরে নির্ভার হলেন! ইন্দিরা গান্ধী আরও একটু এগিয়ে এসে জননেত্রীকে জড়িয়ে ধরলেন। বুকের মধ্যে সঘন আশ্রয় দিয়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সান্ত্বনা জোগালেন। আজ এত বছর পরও বাতাসে কান পাতলে সে কণ্ঠের প্রতিধ্বনি মেলে, ‘তুমি যা হারিয়েছ, তা আর কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না। তোমার ছোট ছোট দুটো ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। এখন থেকে তোমার ছেলেকেই তোমার বাবা এবং মেয়েকে তোমার মা হিসেবে ভাবতে হবে।’

‘এ ছাড়াও তোমার ছোট বোন ও তোমার স্বামী রয়েছে তোমার সঙ্গে। এখন তোমার ছেলে-মেয়ে দুটোকে এবং বোনকে মানুষ করার ভার তোমাকেই নিতে হবে। অতএব, এখন তোমার কোনো অবস্থাতেই ভেঙে পড়লে চলবে না।’

যদিও ইন্দিরা গান্ধীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন ভেঙে পড়বেন না, ছেলেমেয়ে দুটোর জন্য হলেও নিজেকে শক্ত রাখবেন, কিন্তু পারেননি! বর্বরতা যে এমন বীভৎস হতে পারে, পৃথিবীর তাবৎ হিংস্রতার ইতিহাসকেও করতে পারে অতিক্রমÑ সেটা কখনও দুঃস্বপ্নেও মনে আসেনি নেত্রীর।

বাসায় ফিরে যতবার মনে হয়েছে ছোট্ট রাসেল আর বাৎসল্যের মায়ায় সিক্ত করবে না কখনও, ততবারই বুকচেরা চিৎকার বেরিয়ে এসেছে হৃৎপিণ্ড দুমড়ে ছিঁড়ে! তীব্র রোদনে রোদনে মনের সব স্থৈর্য ভেঙে চুরমার হয়েছে! ছোট্ট একটা মাসুম বাচ্চা কার কি ক্ষতি করলো যে খুনিরা ওকেও রেহাই দিল না!

যে মানুষটিকে ঘিরে দেশ স্বাধীন হলো, নিজের সার্বভৌম সত্তার ঠিকানা খুঁজে পেলÑ জাতির সে পিতাকেই বংশসুদ্ধ নিপাত করতে হবে? দুনিয়া থেকে মুছে ফেলতে হবে নামনিশানা! কী অন্যায় করেছিলেন আমার বাবা? দেশের দুঃখী মানুষের মুখে শুধু হাসি ফোটাতে চেয়েছেন! এটাই তার অপরাধ? অবশ্য যারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি, তারা তো চাইতেই পারে একাত্তরের পরাজয়ের বদলা নিতে!

তাই বলে এতটা নৃশংসতা! এতটা বর্বরতা! আমার মা, মমতাময়ী মা, মা তুমি কোথায়? না জানি কত কষ্ট পেয়েছিলে চোখের সামনে ছেলে, ছেলের বউকে হত্যার নির্মম দৃশ্য দেখে! জামালের বউ কামালের বউ কারওই হাত থেকে বিয়ের কাঁচা মেহেদির দাগ মোছেনি! সেই মেহেদির দাগ নিয়ে চলে যেতে হলো সাজানো সংসারের স্বপ্ন ছেড়ে!

জননেত্রী কিছুতেই মন শান্ত রাখতে পারেননি, স্থির রাখতে পারেননি। কীভাবে যে অথই অশ্রুর ধারায় দু-তিনটা দিন ভেসে গেল রাতগুলো গেল জলাঞ্জলি টেরই পেলেন না। অবশেষে তিন দিন পর এলো অরোরার আলো ভরা সেই মহার্ঘ্য রাত!

স্পষ্ট মনে আছে সে-রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। ফেলে আসা জীবনের কত ছবি মনে ভাসছিল, কত স্মৃতি, বাবার কত অনন্য মুহূর্ত, কত দুর্যোগগ্রস্ত জেলজীবনে মায়ের একলা দিনযাপনের ক্ষণ! কী যে হাসিখুশিতে কাটতো সময়গুলো! সযত্ন ছায়ার আড়ম্বর আল্পনায়! আর আজ সেই তাঁদেরকেই কিনা থাকতে হচ্ছে ভিন্ন দেশে নির্বাসনে, তাও আবার লুকিয়ে লুকিয়ে।

হ্যাঁ, লুকিয়েই তো! হিংস্র হায়েনার থাবা আবার কোথা থেকে আসে কোন দিক দিয়ে! তাই সবারই ছিল চোখ-কান খোলা! তাঁদেরকে বাসার চার দেয়ালের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কারও সঙ্গেই যেন যোগাযোগ না রাখে সে-ব্যাপারে করা হয়েছিল সতর্ক। বিশেষ করে সংবাদপত্রসহ মিডিয়ার কোনো সোর্স যেন মোটেই জানতে না পারে, নিহত বঙ্গবন্ধুর পরিবার কোথায় কীভাবে আশ্রয় গ্রহণ করে বসবাস করছে সে-তথ্য।

এভাবে এতটা অসহায় হয়ে কতদিন বাঁচা যায়! সে-রাতে উপচিয়ে উপচিয়ে কান্না আসছিল! স্বজন-হারানোর বিপুল শোক তো আছেই, নিজেদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বর্তমানের অসহায়ত্বের দিনযাপন সব ভেবে ভেবে রোদন আর কিছুতেই বাধ মানছিল না। পাছে কান্নার শব্দে জয়Ñ পুতুলের ঘুম ভেঙে যায়, ওয়াজেদ মিয়া জেগে ওঠেন, তাই জননেত্রী বিছানা থেকে নেমে এসে চুপি চুপি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

নিজেকে এবার একা পেয়ে মনের অবদমিত কান্না হু হু করে বেরিয়ে এসেছিল। মা-বাবা-কামাল-জামাল-রাসেলের কত টুকরো মুহূর্তের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আর ফোঁপানো বেড়েই যাচ্ছিল ক্রমাগত! অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছিল বন্যা-জলের ধারায়! তখনই হঠাৎ জননেত্রী টের পান মাথায় কার হাত পড়ল। বড় চেনা এ-হাত! বড় মায়ার বন্ধনে সুরচিত! এতদিন পর কত অযুত নিযুত বছর পর এ-হাতের ছোঁয়া পেয়ে সমস্ত শরীরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিল। অবিশ্বাস ভরা উত্তেজনায় পাশ ফিরে যে দেখবে, তাও ইচ্ছে করল না, যদি সত্যি সত্যি বাবা না হন, যদি সত্যি সত্যি মনে হয় যে এ শুধু অলীক কল্পনা! তাই জননেত্রী শুধু উপলব্ধি দিয়েই গ্রহণ করছিলেন মাথার ওপর বাবার হাতটিকে। আর তা উপলব্ধ হতেই কান্না আরও পাচ্ছিল প্রমত্ততা। আর তখনই সেই চির-পরিচিত চিরন্তন সেই কণ্ঠ, যা দিয়ে গাঁথা হয়েছিল ৭ মার্চের অমর কাব্য, মন্দ্রসপ্তকের ব্যঞ্জনা ছড়িয়ে বেজে উঠেছিল, মা হাসু! তুই আর কত কাঁদবি মা, তুই আর কত কাঁদবি?

কণ্ঠ শুনে ভয়ে ভয়ে পাশ ফিরে তাকাতেই জননেত্রী দেখলেন, বাবা। সত্যিই বাবা।

জননেত্রী বাবার বজ্রকঠিন বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে অবরুদ্ধ কান্নার তোলপাড় তুলেছিলেন। বাবা মাথার ওপর হাত বোলাতে বোলাতে সেই আদি এবং দরাজ-দিল ধীরোদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, হাসু মা! তোকে শক্ত হতে হবে। তোকে যে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে মা। আমার সব অসমাপ্ত কাজ যে তোকেই শেষ করতে হবে!

বাবা একটু দম নেন। চিরাচরিত ভঙ্গিতে চোখের চশমা খুললেন। চশমার কাচ-দুটো পাঞ্জাবির কোণ দিয়ে মুছে স্বপ্নভরা কণ্ঠে, স্বপ্নের সঙ্গে যেন কিছুটা খেদও মেশানো এমন স্বর, কত রক্ত ঝরিয়ে কত ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা আনলাম, কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ তো ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারলাম না। সে কাজের ভার মা তোকেই নিতে হবে!

বাবা! নেত্রীর কণ্ঠে ভয় বা বিস্ময়।

বঙ্গবন্ধু স্বপ্নভরাট কণ্ঠে বলে চলেন, বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে তুই হাসি ফোটাবি! তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবি! সুশিক্ষায় সবাইকে সুশিক্ষিত বানাবি! ধর্মের নামে আমার বাংলার সহজ-সরল মানুষগুলোর সাথে যেন কেউ বজ্জাতি করতে না পারে, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। দেশের হিন্দু দেশের বৌদ্ধ দেশের খ্রিস্টান দেশের মুসলমান দেশের অন্যান্য যেসব জাতিÑ ধর্মের মানুষ আছে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে, দেশটাকে যেন কেউ মিনি পাকিস্তান বানাতে না পারে! তাহলে যে আমার সকল অর্জন ব্যর্থ হয়ে যাবে মা! ব্যর্থ হয়ে যাবে! বঙ্গবন্ধুর ভরাট স্বর বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে! স্তব্ধ হয়ে যান তিনি।

বাবা! আমি কী করব! আমি কীভাবে কী করব! বড় অসহায় লেগেছিল নেত্রীর কণ্ঠ। নেত্রী ফুঁপিয়ে উঠেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু নেত্রীর মাথায় তাঁর বলিষ্ঠ হাত রেখে আশ্বস্ত করেছিলেন, তুই পারবি মা, আমি জানি তুই পারবি! তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল কোন সুদূরের আহ্বান, কথা দে মা কথা দে! তুই ঘুরে দাঁড়াবি! তুই উঠে দাঁড়াবি! তুই হয়ে উঠবি শক্তি আর সাহসের প্রতীক! ফিরে যাবি আবার আমার সোনার বাংলাদেশে, ঝড় এলে তার সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকবি! ভাঙবি না, মচকাবি না, ঝড় তোর সামনে এসে মাথা নুইয়ে পড়বে! বল মা দেশে ফিরে যাবি তুই। কথা দে মা কথা দে!

বলতে বলতে বাবা যেন ওর হাতটা খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, নেত্রী বাবার হাতটা ধরে আগুন-ঝরা কণ্ঠে দীপ্ত শপথ নেয়ার ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছিলেন, কথা দিলাম বাবা, তোমাকে কথা দিলাম!

বাবা আরও কতক্ষণ থাকতেন কে জানে, কার পায়ের শব্দ ভেসে এলো দূর থেকে। জননেত্রী তাকিয়ে দেখলেন তারই দিকে এগিয়ে আসছেন ওয়াজেদ মিয়া। ঘুম থেকে জেগে নেত্রীকে বিছানায় না দেখে হয়তো খুঁজতে বেরিয়েছেন। কাছে এসে ভালোবাসার আকুতি ছড়িয়ে মিনতি জানালেন, একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো। এভাবে ঘুমহীন থাকলে তো তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে! এসো রুমে এসো।

ওয়াজেদ মিয়ার পাশে হেঁটে যেতে যেতে পেছন ফিরে দেখেন, বাবা দূরে, অনেক দূরে, অনেক দূরে যেতে যেতে মিলিয়ে যাচ্ছেন অরোরা আলোর ভেতর।

তবে বাবা এসেছেন, বারবারই এসেছেন বাবা। বাবা আসেন, বিপন্নতায় আসেন, অসহায়ত্বে আসেন, চুপিসারে এসে মাথায় হাত রাখেন, সাহস যোগান, এগিয়ে চলার মন্ত্রণা দেন। আজও বাবা আসবেন, ঠিক ঠিক আসবেন, এতবড় একটা বিপদ এলো জীবনে! আর বাবা আসবেন না! তা কি হয়? হয় না। জননেত্রী বড় আশায় থাকেন, অন্ধকার ঘরে একা একা বড় আশায় থাকেন নেত্রী, বাবা এসে হতাশার গভীর খাদের কিনার থেকে তাঁকে টেনে তুলবেন। আবারও বজ্রদীপ্তি নিয়ে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেবেন!

কিন্তু বাবা আসেন না, বাবা আর কিছুতেই আসেন না! একটু পর জয় আসে, পুতুল আসে, রেহানা আসে, ঘরের আলো জ্বলে ওঠে, যত রাত হয় রাতের অন্ধকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুঃসংবাদ আসে একের পর এক, মাহবুব নেই, রতন শিকদার নেই, হাসিনা মমতাজ রিনা নেই, রিজিয়া বেগম নেই, সুফিয়া বেগম নেই, লিটন মুনশি নেই, কুদ্দুস পাটোয়ারী নেই, আবুল কালাম আজাদ নেই, আব্বাস উদ্দিন শিকদার নেই, আতিক সরকার নেই, মামুন মৃধা নেই, নাসিরউদ্দিন সরদার নেই, আবুল কাশেম নেই, বেলাল হোসেন নেই। আরও অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক, আইভি রহমানও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন, বাঁচার আশা ক্ষীণ। সীমাহীন নৈরাশ্যের অন্ধকারে ডুবে থাকেন জননেত্রী।

৪.

একুশে আগস্টের পর আজ চার-চারটা দিন পেরিয়ে গেছে। জননেত্রীর হতাশা একটুও কমেনি, বরং উলটো, বেড়েই চলেছে ক্রমাগত! একের পর এক চারদিক থেকে আশার আলোগুলো কেবল নিভেই যাচ্ছিল! আজ আইভি আপাও চলে গেলেন। মাথার ওপর থেকে একটা বটবৃক্ষের ছায়া যেন মুখ থুবড়ে পড়লো। তাছাড়া মানসিক অবসাদের পাশাপাশি শরীরও ভালো যাচ্ছে না।

একাশি সালে দেশে ফেরার পর অনেকবার হত্যার প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনোবারই ঘাতকরা কোনো-রকম শারীরিক আঘাত করতে সক্ষম হয়নি। এবার বুঝি আর শেষ রক্ষা হলো না। একুশে আগস্ট রাত থেকেই অনুভব করছিলেন কানে চিনচিনে ব্যথা। ব্যথা যত সময় গড়িয়েছে, বেড়েছে। শেষে আর থাকতে না পেরে তিন দিনের মাথায় এক রকম বাধ্য হয়েই নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ প্রাণ গোপল দত্তকে বাসায় ডেকে আনা হলো। তিনি ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, কানের পর্দা ফেটে গেছে, কানের ভেতর রক্ত জমাট বেঁধে আছে।

গ্রেনেডের স্পিøন্টার শরীর ভেদ করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু বিস্ফোরণের ভয়াবহ শব্দ কানের ঠিকই ক্ষতি করেছে। প্রাণ গোপাল দত্ত সোজা জানালেন, সমস্যা মারাত্মক, উন্নত চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে দেশের বাইরে যেতে হবে!

নেত্রী রাজী হলেন না। সঙ্গে সঙ্গেই প্রাণ গোপাল দত্তের সাজেশন প্রত্যাখ্যান করলেন। আমার কত আহত কর্মী এখনও হাসপাতালে ধুঁকছে। কত নেতৃবৃন্দের শরীরে স্পিøন্টার ঢুকে আছে আর আমি তাদেরকে মরণাপন্ন রেখে নিজের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবো! এটা কখনও সম্ভব নয় গোপাল বাবু।

জননেত্রীর তীক্ষè বিবেক বোধ বিদেশে চিকিৎসা নিতে সায় দিল না। তিনি প্রাণ গোপাল দত্তের চিকিৎসাই গ্রহণ করছেন। অদূর ভবিষ্যতে যদি কখনও কোনো প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার দরকার হয়, তখন দেখা যাবে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর জীবনে বুঝি সত্যি এত বিষাদময় দিন আর আসেনি। আইভি রহমান তো গেলেনই। চিকিৎসাধীন অন্যান্য কর্মীরাও প্রতিদিন একজন কী দু’জন করে মৃত্যুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেই চলেছেন আর জননেত্রীর বিষাদ কেবলই বাড়ছে, যন্ত্রণা হচ্ছে প্রগাঢ়! সেই সঙ্গে নানা ঘটনা-পরম্পরায় বেরিয়ে আসছে একুশে আগস্টকে ঘিরে শাসক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশার এক একটা প্রামাণ্য দলিল। নোংরা সব অপচেষ্টা। সব মিলিয়ে হতাশার চক্কর থেকে বেরিয়ে আসার বদলে নেত্রীর মনোবল যেন হারিয়ে যেতে বসেছে!

এ রকম শনিশংকার দিনেই তো বাবা নানা উছিলায় নানা রূপ ধরে উপস্থিত হন, ঠিক ঠিকই নেত্রী অনুভব করতে পারেন সে মাহেন্দ্রক্ষণ! তবে কি তিনি নিজেই বাবার উপস্থিতিকে চিনে নিতে পারছেন না? না না তা হবে কেন, বাবা এলে ঠিক ঠিক বোঝা যায়, তাঁর অস্তিত্ব বেজে ওঠে পলে পলে। বাবার জন্য নেত্রীর অপেক্ষা বাড়ে, বাড়ে অধীরতা! হতাশাও কূলকিনারা উপচে ভাসায়! তাহলে কি তাঁর জীবনে আবারও শুরু হলো কৃষ্ণপক্ষ? এখনও যে কত কাজ বাকি। বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলোকে বাস্তব রূপ দিতে হবে। অথচ দেশ চলছে পুরো উলটো ধারায়। একাত্তরের রাজাকাররা মন্ত্রীর নিশান উড়িয়ে সারাদেশে দর্পিত আস্ফালনে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তাদের স্পর্ধা দিন দিন বেড়েই চলেছে!

এমনই যখন হতাশা-নিরাশার দুর্বিপাকের দিন, যখন ভেতরে ভেতরে নেত্রী অনেকটাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন, বিকেল বেলা বাসায় এসে হাজির হলেন নিকট আত্মীয় এক ফুফাতো ভাই। ফুফাতো ভাই এবার শুধু দেখা করতে আসেননি, জননেত্রীর সামনে এসে একটি সুদৃশ্য ব্যাগ থেকে বের করলেন চারটি অতি পুরনো এ ফোর সাইজ খাতা।

বিষাদগ্রস্ত জননেত্রী কৌতূহলী চোখে তাকালেন ফুফাতো ভাইয়ের দিকে।

ফুফাতো ভাই ধীর কণ্ঠে জানালেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী!

কি বলছ? বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী? কোথায় পেলে? জননেত্রীর চোখে-মুখে বিস্ময় ঠিকরে পড়ছে! অবিশ্বাসের গোলকধাঁধায় যেন খাবি খেতে থাকেন।

মণি ভাইয়ের অফিসের ড্রয়ারে পড়েছিল, পঁচাত্তরের পর সেই ড্রয়ার আর খোলা হয়নি, সেদিন খুলতেই পেয়ে গেলাম।

উনার কাছে কীভাবে গেল?

হয়তো বই করতে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু! তারপর তো যা সর্বনাশ ঘটার ঘটেই গেল!

নেত্রীর মুখে কথা নেই। তিনি বিস্মিত চোখে একের পর এক খাতাগুলো খুলে খুলে দেখতে থাকেন, জীর্ণ, পুরনো হলুদ বিবর্ণ রং হয়ে যাওয়া খাতার পাতায় পাতায় বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখা, সেই চিরচেনা হাতের লেখা! অক্ষরে অক্ষরে হাত বুলিয়ে বাবার সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারেন জননেত্রী। তাঁর চোখ-মুখ থেকে বিষাদের নীল কোথায় উবে যায়, খুশি চিকচিক করে ওঠে অবয়বে। ওদিকে দেখো অরোরা আলোয় ভরে উঠেছে পুরো সুধা সদন, সুধা সদন উপচিয়ে পুরো ধানমন্ডির লেক, ধানমন্ডির লেক পেরিয়ে পুরো ঢাকা শহর, ঢাকা শহর আলোকিত করে বাংলাদেশের দশদিগন্ত।

জননেত্রীর চোখে আনন্দধারা ঝরে পড়ে। এ-চারটি আত্মজীবনীর খাতার কথা তাঁর জানা ছিল। ১৯৭১ সালে যখন পাকবাহিনী দখল নিয়েছিল বত্রিশ নম্বরের বাড়িটা, তারপর অনেক কিছু ধ্বংস করলেও অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও, হানাদার বাহিনী বাবার শোবার ঘরের পাশের ড্রেসিং রুমের আলমারিতে রাখা এ চারটি খাতা বুঝি ছুঁয়েও দেখেনি। নাকি গুরুত্বই বোঝেনি। এ চারটি আত্মজীবনীর খাতার সঙ্গে আরও ছিল বাবার লেখা স্মৃতিকথা, ডায়েরি, চীন ভ্রমণের কাহিনি!

জননেত্রীর খাতা চারটি দেখা আর শেষ হয় না। বঙ্গবন্ধু জেলে বসে লিখেছেন তাঁর এ-অসমাপ্ত আত্মজীবনী, এই তো সেই জেলখানার জেলরের অনুমতিপত্রের লিপিটিও সঙ্গে আছে!

একাত্তরে যে-চারটি খাতা হারায়নি, পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর সে খাতাই কীভাবে ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়ে গেল! ইতিহাসের কী নির্মম ট্র্যাজেডি, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হচ্ছিল না, বত্রিশ নম্বরের বাড়িটাও সামরিক সরকার দখল করে রেখেছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে ১৯৮১ সালের মে মাসে দু’বোন দেশে ফিরে এসে দেখলেন, একাত্তরের মতোই বত্রিশ নম্বরের বাড়িটি তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। বাড়িতে প্রবেশের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হলো সাত্তার সরকারের সময়কাল পর্যন্ত। তারপর একদিন নিজের প্রিয় বাসস্থানে ঢুকতে পেরেই দু-বোন ছুটে গিয়েছিলেন বাবার শোবার ঘরের পাশের ড্রেসিং রুমের সেই আলমারিটার কাছে, যেখানে রাখা ছিল অমূল্য এসব হীরে-জহরত।

স্মৃতিকথা, ডায়েরি, চীন ভ্রমণের কাহিনি খুঁজে পেলেও আত্মজীবনীর এই চারটি খাতা পাওয়া গেল না, কিছুতেই আর পাওয়া গেল না। শুধু কিছু টাইপ করা কাগজ পেল, তাও আবার সেসব পাতাগুলোর অর্ধেক উইয়ে খাওয়া।

সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন এ চারটি খাতা। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে জানতে চেয়েছেন বাবার লেখা আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপি কারও হদিসে আছে কিনা। কেউ কোনো তথ্য জানাতে পারেনি। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে বিষণ্ন মনে সেই অসমাপ্ত আত্মজীবনী ছাড়াই বাকি পাণ্ডুলিপিগুলো বই আকারে প্রকাশের কাজ শুরু করেছেন! এক রকম ধরেই নিয়েছিলেন সে খাতা চারটি আর পাওয়া যাবে না। এর মধ্যেই ঘটে গেল আজকের এই মিরাকল।

জননেত্রী আনন্দে খুশিতে কী করবেন দিশা খুঁজে পান না। কী এক ঘোর থেকে টেলিফোনের সামনে বসে যান। শেখ রেহানাকে ফোন করেন, রেহানা জলদি চলে আয়! এখনই!

শেখ রেহানা জানতে চান, কেন বুবু?

আয় না! নিজেই দেখবি!

কথা বলতে বলতে জননেত্রী টের পান মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর হাত প্রসারিত হতে হতে অরোরা আলোর সঙ্গে মিলেমিশে কোথায় একাকার হয়ে যাচ্ছে!

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares