গায়ে কাঁটা দেয়, এমন রটনার ঢেউ সারা গাঁয়ে। একটা কথা খইয়ের মতো ফুটছে সবার মুখে। ছেলেটি মোহর পেয়েছে। ছেলেটি রহমত। গ্রামে এসে রহমত ভাবল, টপ স্টোরি অব দ্য ভিলেজ। এর ভাইব্রেশন চড়া। কম্পনের কেন্দ্রবিন্দুতে সে। এক ঘড়া মোহর পেয়েছে রহমতÑ কত বড় ঘড়া? ঢাউস! আকবর বাদশার আমলের ঘড়া। বাদশাহি ঘড়া।

গ্রামের কাছে নদীটি বারবার বাঁক বদল করে বইছে। তার নাম বৈঁচিমালা। বৈঁচিমালার জলে ভেজা জনপদ, কী জানি কেন, রহমতের কাছে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যায়।

 নদীর কাছে ঘাসের ওপর বসেছিল গ্রামের দু’জন। বিকেলের নিত্য অবকাশ। দু’জনেই বেকার। একজন কলেজ-পড়ুয়া বেকার। অন্যজন প্রাথমিক শ্রেণি থেকে ড্রপ আউট। আড্ডায় উভয়ই স্বপ্ন্নচারী। তাদের আজকের আড্ডায় নদীর ভেজা জল থেকে উঠে এলো এক ঘড়া মোহর।

এক ঘড়া? মানে বাড়িঘর বোঝাই! ড্রপ-আউট বেকার জানতে চায়।

আরে দূর। এক ঘড়া মানে এক হাঁড়ি, বোঝায় কলেজপড়ুয়া বেকার।

এক হাঁড়ি সোনার বিস্কুট! এক হাঁড়ি ই ই!

তুই দেখি স্টুপিড ছেলে। পুরোনো আমলের কথা। সোনার বিস্কুট নয়, স্বর্ণমুদ্রা। কাঁচা সোনার টাকা। মোহর। রাজা-বাদশারা লেনদেন করত!

ও ও, ওজন কত!

ওজন যাই থাক। কথা হলো, জিনিস আসল কিনা। আজকের সোনার বিস্কুট তো ভেজালে ভরা। মোহরে ভেজাল নাই। ক্যারেট নাই।

ক্যারেট!

তুই ক্যারেট বুঝবি না। আসল কথা, মোহর মানে মোহর। কাঁচা সোনা। সোনার বিস্কুট তার ধারেকাছে নাই।

বিমানের লোকজন মনে হয় চিনতে পারে নাই। ধরা পড়ে নাই।

আরে দূর। তুই তো বাপের কুলাঙ্গার পোলা। ননসেন্স একটা। মোহর বিমানে চালান হয় নাকি!

মাটিতে খনির মতো আছে! কত বছর ঘুমিয়ে ছিল কে জানে! যার ভাগ্যে আছে সে পায়। রহমতের ভাগ্যে ছিল, পেয়েছে।

মোহর ঘুমায়! বছর বছর ঘুমায়!

হ্যাঁ ঘুমের মতোই। এই ধর পাঁচশ বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

তা হলে ঘুম ভেঙে উঠে এলো এখন!

হ্যাঁ তা বলতে পারিস। শীতনিদ্রা। হাইবারনেশন। ঘুম শেষে কারও কাছে ধরা দিল।

রহমতের কাছে?

হ্যাঁ।

দুজনে চুপ করে যায়। রহমতের কাছেই ধরা দিল! একজনের আজন্ম আক্ষেপ বুকেই চাপা পড়ে থাকে। আরেকজন চাপা দিতে পারে না। আর্তি দীর্ঘশ্বাসের মতো বেরিয়ে যায়। হাহাকার শুষে নেয় নদী। বৈঁচিমালা। তীর ঘেঁষে মখমলি ঘাস। ঘন ঘাস দীর্ঘ  কার্পেটের মতো বিছিয়ে আছে। তার বাহার কর্পোরেট শোরুমের কার্পেট কে শরম দিতে পারে। সেখানে বসেছিল দুজন। গল্পে উঠে এসেছিল মোহর। কারণ সারা গ্রামে এখন মোহরের কানাকানি, ফিসফাস। মোহরের মাতন। নদীটি এখন ভরা-বুক নদীর মতো। জলের ধারায় কলকলিয়ে যায়। চৈত্রের মুখেই বৈঁচিমালা শুকাতে শুরু করে। তখন খণ্ড খণ্ড পুকুরের মতো দেখায় তাকে। কোথাও জল কোথাও শুকনো বালু। ইদানীং বালুর ট্রাক ভিড় করতে শুরু করেছে। নদীর বুকে কোদাল মেরে, বালু বোঝাই ট্রাক আসে যায়। শহরে দালান উঠছে। এখানে নদী মরছে। এই নদীতেই বড়শি ফেলে সকাল-বিকাল মাছ ধরার স্মৃতি দু’জনের মনে মোহরের মোহের মতোই লাগে।

দু’জন নয় এখন তিনজন লোকের মুখোমুখি রহমত। সৌম্যদর্শন ও নির্বিকার দু’জন একটি সোফায় বসে আছে। আরেকজন চেয়ারে, তার মুখে ছটফাটানি। সামনে টেবিল। টেবিলটি অফিসে দেখা টেবিলের মতো। ফাইলপত্র আছে। লাল ফিতে আছে। কম্পিউটার, আর অফিস স্টেশনারিতে টেবিল ভরা। বড়সড় টেবিলটিও এত দ্রব্যের মেলা সামলাতে পারছে না। টেবিলকে অসহায় মনে হয় রহমতের।

ঘরে ঢুকে সবাইকে সালাম-আদাব দিয়ে রহমত দাঁড়িয়ে ছিল। তখনও কেউ তাকে বসতে বলেনি।  বড়সড় টেবিলে এ-ফোর সাইজের কাগজে মাথা গুঁজে লিখছিলেন ছটফটে ভদ্রলোক। তিনি লিখছেন, নাকি কলম ঘষছেন রহমত বোঝার চেষ্টা করে। না তিনি কলম পিষছেন না, জরুরি কিছু গভীর মনোযোগ আর দ্রুত হাতে লিখছিলেন। রহমত ঢোকার পর লোকটি আন্দাজ-অনুমান করতে পেরেছিল, মনে হয় রহমতের। তার কারণও আছে। টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই লেখক ভদ্রলোক কলিংবেল টিপেছিলেন। তবু সে মুখ তুলে তাকায়নি একবারও। অখণ্ড মনোযোগ তাকে সে সুযোগটিও দেয়নি। জরুরি লেখা শেষ হোক, অব্যাহতি পাক সে। রহমত অপেক্ষা করে।

দ্বিতীয়বার কলিংবেল টিপলেন ভদ্রলোক। আগে একবার টিপেছিলেন। এবার পরপর দু’বার টিপলেন। একজন শ্যামলা মধ্যবয়সী নারী পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল। ঘরে ঢুকলো না, সে দরজায় বা হাতে পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে রইল, মুখে ‘কি বলবেন স্যার বলুন’ কথাটি পড়া যায়, যদিও তা সে মুখ ফুটে বলেনি।

এত দ্রুত কলম চালিয়ে কী লিখছেন ভদ্রলোক! রিপোর্ট! স্ক্রিপ্ট! রহমত অনুমান করার চেষ্টা করে। জায়গাটা নাটক-সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার কথা বলে না। তাহলে কোনো জরুরি রিপোর্ট! ঠাহর করতে না পেরে রহমতের চিন্তা অন্য দিকে যায়।

পরীক্ষার খাতায় শেষ প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণ করার সময় রহমতের এ রকম হয়। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে রহমত ধরে নেয়, ভদ্রলোক পরীক্ষার খাতায় লিখছেন। আর পাঁচ মিনিট পরই পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা বাজবে। এর মধ্যে দুইবার ফোন বেজেছে। ফোন ধরেননি। যা লিখছে সে, তা এখনই লিখে ফেলতে হবে, নাহলে পরীক্ষা-পাস হবে না।

একটানা চিঁ চিঁ শব্দ জানিয়ে দেয় সিলিং ফ্যানটির বয়স হয়েছে। পুরোনো বা সস্তা হবে। শব্দ করে ঘুরছিল। সোফার লোক দুটি নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। তাদের তাড়া নেই, নিম্নস্বরের কথা কানে আসে না।

 সিলিং ফ্যানের শব্দ অতিক্রম করেও হঠাৎ একগুচ্ছ উচ্চারিত শব্দ রহমতের কানে এলো। ওই শব্দগুলোর অ্যাকসেন্ট জোরালো। হিস্ট্রি, মুঘল, পার্টিশান, কলোনিয়াল, কয়েন, আর্কিওলোজি শব্দগুলো ঠিক কানে এলো রহমতের।

দরজায় পর্দা ছুঁয়ে যে শ্যামলা মহিলা, এবার সে মুখ খুলল, স্যার! অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর একটিই শব্দ উগরে দিল সেÑ ‘স্যার’!

তখনও লিখছেন ভদ্রলোক। মুখ না তুলেই বাম হাতে ইশারা করলেন। ইশারা বোঝা যায়। প্রতিদিনের নৈমিত্তিক ক্রিয়াকর্মের বডি ল্যাংগুয়েজগুলো সাধারণ। পড়া যায়, ইশারা বোঝা যায়। কিন্তু এই ইশারা বুঝতে পারল না রহমত। মহিলাটি বুঝল, পর্দা ছেড়ে চলে গেল সে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটি কাঠের আনকোরা চেয়ার নিয়ে ঢুকল আরেকজন। সে মধ্যবয়সি, পোড়খাওয়া কেরানির মতো মুখ। কপালে বলিরেখা। শক্তপোক্ত চোয়াল। কর্কশ শব্দের জন্য কান খাড়া করেছিল রহমত। মেলেনি। চেয়ার মেঝেতে রেখে বিনয়ের সাথে শক্ত চোয়াল বলল, স্যার বসেন।

রহমত বিহ্বল হয় না। সম্বিত হারায় না। এই ঘরে তাকে ডেকে আনা হয়েছে। ঘরে ঢুকেই সে যা দেখছে তা তার পরিচিত পর্যবেক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তার কোনো অনুমানই মিলছে না। রহমত নিশ্চিত হলো, একটার পর একটা ধাঁ ধাঁ পড়ছে সে। দেখছে, আর শুনছেও। সবকিছু ছাপিয়ে এ কথাও রহমতের মনে হলো, এসবের কেন্দ্রবিন্দু সে। লোকটি যা লিখছে, তাকে নিয়ে লিখছে। তাহলে ওটা রিপোর্ট। তাকে নিয়ে রিপোর্ট।

প্রথম ধাঁধাঁটি ছিল, এটা কী বাড়ি না অফিস। তারপর অনেক ধাঁ ধাঁ ও হেঁয়ালির স্তর পার করে এখন শুনল, স্যার। শক্ত চোয়ালের  লোকটি তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করছে। সে ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ে।

রহমতের ভাবনায় বিরাম চিহ্ন পড়ে। রিপোর্ট-লিখিয়ে লোকটি এইমাত্র তার লেখা শেষ করল।

এটা টাইপ করতে দাও। সিরাজকে দিয়ো। ভুল থাকে না যেন। ওর কম্পোজ ভালো। রিপোর্টে ভুল হলে চলবে না, আমার চেয়ার নড়বড়ে হয়ে যাবে। এক ঘড়া মোহর।

শক্ত চোয়ালের লোকটি, যে কাঠের চেয়ার এনে তাকে স্যার বলেছে, তাকে ধরিয়ে দিল কাগজগুলো। রহমতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্ময়ে কপালে চোখ তুলে বলল, সে কি তুমি এখনও দাঁড়িয়ে আছো! বসো বসো। প্লিজ সিট ডাউন।

চেয়ারে বসার মুহূর্তে রহমতের মনে হলো, এই লোকটির মধ্যে ব্যস্ততা বা তাড়াহুড়ো আছে। সোফায় বসা লোক দু’জনের মধ্যে তা নেই। তাড়াহুড়ো নেই, উদ্বেগ নেই। বাদল দিনের অলস দুপুরে তারা যেন খোসগল্প করছে। হাঁ করে, শব্দ করে হাই তুলছে। তাদের একজন উঠে দাঁড়াল, আমি তাহলে যাই।

হায় হায় করে উঠলেন রিপোর্ট-লিখিয়ে ভদ্রলোক, যাই মানে, আপনি চলে গেলে তো আমরা এতিম হয়ে যাব। কাজের কাজি তো আপনি।

কাজি! রহমত আওড়ায় মনে মনে। এই অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার আগে কোনো কাজি, বা বিয়ে রেজিস্ট্রির সাইনবোর্ড তার চোখে পড়েনি।

সোফা থেকে উঠে পড়া ভদ্রলোক আড়মোড়া ভেঙে মুখ খুলল,

কাজ জমে আছে। তাছাড়া ফার্স্ট ট্রায়াল! আপনারাই সেরে ফেলুন না। নিরীহ কণ্ঠ ভদ্রলোকের। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো চেহারা। দরজার দিকে এগিয়ে বললেন, আমার তো রিউমার ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না, ফিল্ড রিপোর্ট থেকে যাই আসুক। সব স্ববিরোধী তথ্য। হেসে যোগ করলেন, এসবকে তথ্য বলবেন আপনি!

আপনি রিপোর্ট দেখেছেন স্যার? স্যার একটু বসুন।

খসড়া দেখেছি। ওটাই তো ফাইনাল করলেন!

হ্যাঁ স্যার একটু বসুন। রিপোর্টের সফট কপি পেলেই ওপরে চলে যাবে!

ওপরে? রহমত থতমত। ওপরে মানে কী ছাদে নাকি ছাদের ওপরে আকাশে।

দয়া করে আমাকে কপি পাঠাবেন না। কিসসু নেই বোগাস। আপনারা কেস হ্যান্ডেল করুন। নিরীহ ভদ্রলোক একটু বিরক্ত এখন। বিরক্তি নিয়েই বেরিয়ে গেলেন।

কেস। ট্রায়াল। রহমত কী মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে!

সোফায় বসা দ্বিতীয় ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন লেখক ভদ্রলোক।

স্যার আপনাদের সাহায্য না পেলেÑ

সদাপ্রস্তুত। কী সাহায্য চান বলুন। লম্বা হাঁই তুলে উঠে দাঁড়ালেন তিনিও, ছোট ছেলেটার জ্বর। ডেঙ্গু কিনা, কে জানে। রিপোর্ট দেখতে হবে। ডাক্তারের সাথে কথা বলতে হবে।

স্যার আমার রিপোর্ট!

রহমত তো আছেই। ওর সাথে সরাসরি কথা বলুন। মাঠের আবর্জনা ফাইলবন্দি করে বেড়াল তো বাঘ হয়ে যাবে। তা না করে রহমতের সাথে কথা বলুন।

‘রহমত’ শব্দটি এমনভাবে লোকটির মুখ থেকে বের হলো, যেন তার বাপ-কাকার মতোই রহমতকে তিনি চেনেন।

সোফার দ্বিতীয় ভদ্রলোক টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন, রহমতের পিঠে আদরের হাত রেখে একটু ঝুঁকে পড়লেন রিপোর্ট-ভদ্রলোকের দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এই চাকরি চাকরি করেই তো সর্বনাশ ঘরে ঢোকাচ্ছেন। তা জানেন তো?

কপালে হাত দিয়ে হতাশায় মাথা নাড়লেন রিপোর্ট-ভদ্রলোক।

রহমতের পিঠ চাপড়ে দিলেন সোফার ভদ্রলোক, মোহরের ঘড়াটি কোন আমলের রহমত! কলোনিয়াল পিরিয়ডের,  গ্রেট মুঘলস নাকি তারও আগের। অ্যারিয়ান পিরিয়ডের নয়তো, বলে হাসতে লাগলেন। প্রাণখোলা হাসি।

রহমতও হাসতেই চেয়েছিল, না হেসে হাসির ভান করল। আসলে ভদ্রলোকের কথায় তার হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা, অজানা আশঙ্কা তাকে হাসতে বারণ করল।

তুমি তো আর্কিওলজিরই ছাত্র, তাই না!

হ্যাঁ স্যার।

সমাজবিজ্ঞান মানে সোশ্যাল সায়েন্স নাড়াচাড়া করা একটু প্রয়োজনীয় মনে হয় না!

রহমত চুপ করে রইল।

দীর্ঘ সময় পর একটা প্লেটে বিস্কুটের প্যাকেট আর কয়েক কাপ চা টেবিলে এলো।

স্যার একটু চা-বিস্কুট মুখে দিয়ে যান! হাঁফ ছেড়ে টেবিলের ওপাশ থেকে কাতরোক্তি করলেন রিপোর্ট-ভদ্রলোক। গলা খাকারি দিয়ে দেওয়ার পরও তার কণ্ঠ থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ বের হয়, আসলে এক্সপার্ট ছাড়া কী করে সামলাই!

ভিক্টিম নিজেই এক্সপার্ট।

কী বলছেন স্যার! ওকে তো ভিক্টিম বলিনি!

বলেননি কিন্তু কাজটা করে ফেলেছেন।

মানে স্যার বুঝতেÑ

মানে-টানে কিছু নয়। ওর সিকিউরিটির ব্যবস্থা করুন। রিপোর্টে অন্তত দুটো শব্দ হাইলাইট করুন। প্রোপাগান্ডা আর কালচারাল অ্যাক্টিভিস্ট। তারপর ‘যত্তোসব’ শব্দটি বিরক্তি আর থুতু মিশিয়ে উচ্চারণ করে সোফার দ্বিতীয় ভদ্রলোকটি বেরিয়ে গেলেন।

স্যার গুজবটি কারা ছড়াচ্ছে, মটিফ কি, আর মহলটিকেও দ্রুত স্পট করতে পারব স্যার। আমরা তৎপর।

সোফার দ্বিতীয় ভদ্রলোকটি ততক্ষণে বেরিয়ে গেছেন। শুনতে পাননি।

মুষড়ে পড়লেন রিপোর্ট লিখিয়ে ভদ্রলোক। নিজের জন্য এক কাপ চায়ের অর্ডার দিতে যাবেন, তখন রহমতের দিকে তাকালেন, আর এক কাপ চা চলবে তো রহমত!

রহমত সায় দেয়।

ফাইলপত্র গোছাতে গোছাতে ভদ্রলোক বলেন, যেন কথার কথা তাই বলা, তেমন করেই বললেন,

তোমার কবিগানের দল কেমন চলছে রহমত!

কবিগান নয় মুক্তির গান। আমার সংগঠনের নাম ‘প্রতিস্বর’।

দ্বিতীয় কথাটি কানে যায়নি। প্রথম কথাটি ধরে বসলেন ভদ্রলোক, অ্যা কিসের গান!

মুক্তির গান, রহমতের উচ্চারণ শান্ত অথচ শক্তপোক্ত।

ও ও মুক্তি। মুক্তির গান। মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মুক্তি, এসব আমাদের আদর্শ হতে হবে তাই না রহমতÑ কবিগানের ধাক্কা সামলে কয়েকটি ভালো শব্দ উগরে দিতে পেরেছেন বলে ভদ্রলোক আত্মতৃপ্তি ও স্বস্তিবোধ করছেন। আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, নাও নাও চা খাও, ঠান্ডা হয়ে যাবে।

রহমতের গলা একটু শুকিয়ে এসেছিল, আগ্রহ অথবা তেষ্টা নিয়েই সে চটজলদি চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে তুলল।

সেদিন ‘ভিক্টিম’ আর ‘সিকিউরিটি’ শব্দ মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল রহমত। রাতে ছোট ছোট ট্যাংরা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়েছিল মায়ের হাতে। বেসন দিয়ে দেশি বেগুনে কামড় বসিয়ে কি জানি কেন হেসে উঠেছিল। মায়ের রান্না অমৃতের মতো। বাবা নেই। বাবা চলে যেতেই অভাব সুড়সুড় করে ঘরে ঢুকেছে। এক ঘড়া সোনার মোহর রূপকথা হয়ে ঘরে ঢুকলে সত্যি বেঁচে যেত রহমত। বিদেশে পড়ার ইচ্ছে তার। টাকা নেই। স্কলারশিপ একমাত্র ভরসা। ভার্সিটিতে তার সংগঠন ‘প্রতিস্বর’ খুব জনপ্রিয়। ‘প্রতিস্বর’ সকল অন্ধত্ব থেকে মুক্তির গান গায়। মানুষের মুক্তির গান। এখনও দুটো গানের খসড়া সম্পূর্ণ করার অপেক্ষায়। সুরারোপ করতে হবে। এসব চিন্তা পাক খাচ্ছিল রহমতের মাথায়। এক ঘড়া মোহর পাওয়ার রটনা, আর ওই রহস্যময় অফিসে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রস্তুত ছিল না সে।

ও রহমত। মায়ের ডাক। কণ্ঠ অন্যরকম শোনায়।

একটু চমকেই মায়ের দিকে তাকায় সে।

তোমার বাবা আমার কাছে কখনও মিথ্যে কথা বলেনি। তুমিও আমাকে একটা সত্য কথা বলো! মায়ের আকুতি।

মায়ের মনের ভাষা বুঝতে পারে রহমত। না বোঝার কিছুই নেই। নীরবতার মধ্যেই এতক্ষণ দু’জনের মনেই এক ঘড়া মোহর ঘুরছিল। রহমত এখন জীবিত অথচ মৃত চোখে মাকে দেখে। অনেকটা সময় নিয়ে দেখে। তারপর উঠে যায়।

বাইরে রাতের পোকা ডাকছে। তাছাড়া নীরবতা। হাত ধুয়ে ফিরে আসে রহমত মায়ের পাশে বসে তার করতলে হাত রেখে বলে, সত্য কথা বলব। সত্য ছাড়া মিথ্যা বলব না।

সোনার মোহরÑ উচ্চারণ করতে যাচ্ছিল মা। তার আগেই রহমত মায়ের ঠোঁট চেপে ধরে, আমাকে বাবার কাছে নিয়ে চলো।

স্তম্ভিত মা ছেলেকে হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে।

বাবার কবর।

চারপাশে বাঁশের বেড়া পুরোনো, ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। নতুন বেড়া দিতে হবে, রহমত ভাবে।

হারিকেনের কৃপন আলো। সেই আলো রহমতের মস্তিষ্কে এক হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে ওঠে। সব দেখতে পায় সে। আজ সারাদিন যা দেখেনি তাও দেখতে পায়।

অফিস ঘরের কথোপকথন, রিপোর্ট, এক ঘড়া মোহরের গুজবÑ সব সরল-সূত্রে গেঁথে ফেলে সে। ‘ভিক্টিম’ আর ‘সিকিউরিটি’ শব্দটি আবার মনে চড়াও হয়। মাত্র দু’দিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসেছে রহমত। এর মধ্যেই জল এতটা গড়িয়ে গেছে। ভার্সিটিতে তার সংগঠনটির নাম ‘প্রতিস্বর’ সে মানুষের মুক্তির গান লেখে ও গায়। তার সংগঠনে এখন অনেক টগবগে তরুণ ছেলেমেয়ে। সবাই মুক্তি ও মুঠো খুলে আলো দেখতে চায়। রহমত অন্ধকারেই মাথা ঝাঁকায়, যার অর্থ তার কাছে অধরা দৃশ্যগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বাবার কবরে আবার চোখ রাখে সে, এই মুহূর্তে একটি গর্ব শতগুণ শক্তিশালী হয়ে মনে ফিরে আসে। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

 তার কবরের পাশে ঘাস আছে। বুনোফুল আছে। মাকে তা দেখিয়ে বলে, এখানে। এখানে এক ঘড়া মোহর আছে। আমি বলছি, আছে। যদি আজ নাও থাকে, কাল ঠিক থাকবে।

ময়নাতদন্ত শেষে দু’দিন পর সেখানেই মাটির বিছানায় ঘুমানোর ব্যবস্থা হয়েছিল মোহরের। নির্বাক মা দেখেছিল, বাবার পাশেই মোহর ঘুমায়। এক ঘড়া মোহর নয়, তার গর্ভের মোহর মাটির গর্ভে ঘুমায়। তার আগে তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল ভোরবেলা। বাড়ির পাশের জঙ্গলে। বুকে বড়সড় আঘাত। হৃৎপিণ্ড এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে গিয়েছিল ধারালো অস্ত্র। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা রহমতের হাতে কয়েকটি মোহর ছিল। জিওলজিক্যাল টেস্টের পর ডিপার্টমেন্ট জানিয়ে দিয়েছিল, ওগুলো মোহর নয়।

নকল মুদ্রা।

দেশীয় উপকরণে তৈরি।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares