সরস্বতী কিংবা সখিনার গল্প : রাশেদ রহমান

শুরুতেই বলে রাখিÑ আমি বোবা, বই-পুস্তকের ভাষায় যাকে বলে বাকপ্রতিবন্ধী। আমি যে কথা বলতে পারি না, তা আর ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না…।

এখন আমার বয়স, তা প্রায় তিনকুড়ি হবে; বহুদিন ধরে, সকালে ভগবানকে ডাকি তো রাতে আল্লাহকে ডাকি, তোমাদের যম কিংবা আজরাইল-বেটাকে পাঠাও; ওই বেটা এসে আমাকে নিয়ে যাক, আমার আর এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সাধ নাই; দেখলাম তো কম না, মানুষের আকাম-কুকাম দেখতে দেখতে চোখে ছানি পড়ে গেছে; কিন্তু ভগবান কিংবা আল্লাহÑ কারও কানেই আমার ডাক পৌঁছে না, যম কিংবা আজরাইল কেউ আমাকে নিতে আসে না; তো, ঘারিন্দা রেলস্টেশনে পড়ে আছি তো আছিই, সেই স্টেশন চালুর শুরু থেকেই…।

ঘারিন্দা এসেছি, তাও তো প্রায় ২০ বছর। এখানে এসে অবধি কোনোদিন নিজের গ্রামে যাইনি। গ্রামে যাওয়ার কথা মাথায় এলেই মনে পড়েÑ ওখানে তো আমার কেউ নাই। এতদিন পরে এই ছিটগ্রস্ত মহিলাকে গ্রামের কেউ চিনবে না। উন্মাদিনী ভেবে হয়তো দূরছাই করবে কেউ। তারচে’ রেলস্টেশনে উঠুলি হিসেবে বেঁচে থাকাটাই ভালো…।

তবে আপনাদের বলি, এখনও বেঁচে আছি, তা ঠিক, কিন্তু বেঁচে থাকাটা এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে। কেউ যেহেতু, যম কি আজরাইল; আমাকে নিতে আসে না, রেললাইনে বসে থাকি; দেব একদিন সুন্দরবন কি সিল্কসিটির নিচে মাথা পেতে…!

স্টেশনে দু’টো ঘর। মুখোমুখি পাকা দালান। একটি দক্ষিণমুখো, একটি উত্তরমুখো। দক্ষিণমুখো ঘরটি দোতলা। নিচতলায় অফিস, টিকিট কাউন্টার; দোতলায় স্টেশন মাস্টারের বাসা। উত্তরমুখো একতলা দালানে ওয়েটিং রুম। যাত্রীরা বিশ্রাম নেয়, ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকে। ট্রেনের তো টাইম ঠিক নাই, সকাল ৭টার ট্রেন দুপুর ১টায়ও আসে। যাত্রীদের বসে থাকতেই হয়। যাই হোক, দক্ষিণমুখো দোতলা ঘরের পেছনে আমি ডেরা বেঁধেছি। ছয় ফুট দীর্ঘ, চার ফুট প্রশস্ত ডেরা। ঠিক কবরের মতো! আমার মৃত্যুর পর চিতা হবে কি কবর হবে, জানি না; কোনোটাই নাও পেতে পারি, হয়তো শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে আমার লাশ; তারপরও কবরের মতো ছোট জায়গায় বসবাসের অভ্যাস গড়ে তুলেছি…।

আমার ডেরার একপাশে স্টেশন-ঘরের দেয়াল, বাকি তিনপাশ খোলা। এই খোলা তিনপাশে একফুটের মতো উঁচু করে ইটের বেড়া দিয়েছি, যাতে বৃষ্টির পানি ঢুকতে না পারে। ওপরে পলিথিন। বছরে কি দু’বছরে পলিথিন বদলাতে হয়…।

স্টেশনঘরের পুবদিক দিয়ে রেললাইন। আমি পুবদিকেই পা রেখে শুই। ছালার বিছানা পেতেছি। ইটের বালিশ। গরমকালে কোনো সমস্যা হয় না, শীত নামলে কষ্টে পড়ি। কম্বল আছে দু’টো। একটা ছেঁড়া, একটা মোটামুটি ভালো। এই দিয়েই শীত পারি দিই। আসল কথাটা কি, শীত-গরম আমি গ্রাহ্যই করি না। শীত-গরমের মতো ফালতু বিষয়কে গুরুত্ব দিলে কি আমার চলে, আপনারাই বলুন…!

আমার কোনো কাজ নাই। দিনের বেশিরভাগ সময় রেললাইনে বসে কাটাই। ঝিকঝিক শব্দ তুলে ট্রেন আসে, ট্রেন যায়; আমি ট্রেনের যাওয়া-আসা দেখি। ট্রেনের জানালায় মানুষের মুখ দেখি। দেখতে না দেখতে এইসব মানুষের মুখ কোথায় যে হারিয়ে যায়! কোত্থেকে আসে এত মানুষ! রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, খুলনা…! আমার করোটির ভেতর ট্রেনের যাত্রীরা লাফালাফি করে। তবে এই লাফালাফি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কে যেন আমার করোটিতে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো শুরু করেÑ ট্রেনযাত্রী নিয়ে খেলা করার তুমি কে…?

তাই তো! ট্রেন যেখান থেকে আসছে, আসুক; ট্রেনের যাত্রীরা যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাক, আমি বলার কে? আমি কেন বলতে যাবো…!

আমি ট্রেনযাত্রীদের ফেলে রেখে আমার মধ্যে ফিরে এলেই খিদে পেতে শুরু করে। আমার রান্নাবান্নার কোনো আয়োজন নাই। দরকারও পড়ে না কখনও। সেই শুরুর দিকে, যখন ঘারিন্দা স্টেশনে আসি, স্টেশন তখনও জমজমাট হয়নি; হাতেগোনা দু’তিনটি দোকান, সারাদিনে ট্রেন চলে চারটি, সুন্দরবন আর সিল্কসিটিই যা নামকরা ট্রেন, বাকি দু’টোর নামই জানে না কেউ; তখনও আমি পাগল হইনি, মানেÑ আমাকে দেখলে পাগল বা মাথা খারাপ মনে হয় না; বিনা পয়সায় কারও কাছে খাবার বা যাত্রীদের কাছে দু’টো টাকার জন্য হাত পাততে নিজের কাছেও বাধে, কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে, এ জন্য টাকা-পয়সার দরকার; যাত্রীদের কাছে হাত পাততে হবে, আমি ধীরে ধীরে পাগল হতে শুরু করি; তখন কিছু হাঁড়ি-পাতিল জোগাড় করেছিলাম। সকালে কি দুপুরে সারাদিন একবেলা রেঁধে, সেই খাবার দিয়ে দিন কাটিয়ে দিতাম। এখন আর রান্নাবান্না করতে হয় না। সবুর কি হেলালের ভাতের হোটেল, বাদল বা নূরবানু খালার চা-রুটির দোকান কিংবা স্টেশন মাস্টার কি টিকিট চেকার; এমনকি সোল পার্কের কোনো যুগলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই ওরা বুঝে ফেলেÑ আমাকে খেতে দিতে হবে। দেয়ও ওরা। কারণ, ওরা সবাই এখন জানে, সুন্দরবন কি পদ্মার অনেক নিয়মিত যাত্রীও জানেÑ আমি এখন বদ্ধ পাগল। ক্ষতি তো নাই, বরঞ্চ আখেরে লাভ হবেÑ পাগলকে কিছু খেতে দিলে…।

আমি পাগল হতে শুরু করছিলাম, এই ভেবে, যাত্রীদের কাছে হাত পাততে সুবিধা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি পাগল না-হয়ে আমার কোনো উপায় ছিল না…।

ঘারিন্দা স্টেশনে আসার আগে অন্তত ১০ বছর, সান্তাহার, চাটমোহর, ঈশ্বরদীÑ নানা স্টেশনে ছিলাম। সর্বশেষ ঠিকানা ছিল ঈশ্বরদী। ঈশ্বরদী বিশাল বড়ো স্টেশনÑ জংশন। সবখানেই ভাতের হোটেলে কাজ করেছি। তখন বয়স কম ছিল। শরীর কলাগাছের মতো সুডৌল। আর রূপ! নিজের রূপের কথা নিজে কী আর বলব। রাতে, সুযোগ পেলে আয়নায় নিজের মুখ বহুক্ষণ ধরে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতাম। নিজের মুখ দেখেও আশ মিটতো না। এই যখন অবস্থা, হোটেলের বয়-বেয়ারা-ম্যানেজারদের কথা আর কী বলব! সান্তাহারের হোটেল হামজার মালিক আমির হামজা তো আমাকে বিয়ের প্রস্তাবই দিয়েছিল। বলেছিলÑ আমি তাকে বিয়ে করলে সে তার চার পুত্র-কন্যার জননী সালেহা বেগমকে তালাক দেবে। আমি তার প্রস্তাব শুনে মুচকি হেসেছি,  ফুরুত করে পানের পিক ফেলেছি; আমির হামজার লোভ তাতে বাড়ত, রোদ-মাখা মার্বেলের মতো চকচক করত তার চোখ; পুলকিত মনে ভাবত আমি তাকে বিয়ে করতে রাজি। এতে আমার ভীষণ একটা লাভ হয়েছিল। হোটেলের রান্নাঘরে রাতে ঘুমাতাম। বয়-বেয়ারা কি ম্যানেজার, রাতের একেক প্রহরে একেকজন ঘরের দরজা টোকাতো। আমি মাথার কাছে মাছকাটার বঁটি রাখতাম। দরজায় টোকার শব্দ পেলেই দরজা খুলতাম। হাতে বঁটি। বয়-বেয়ারা কেউ হলে আমার হাতের বঁটি দেখেই মাথা নিচু করে চলে যেতো। কিছু বলার সাহস পেতো না। ম্যানেজার হলে, সে বলতোÑ কী ঢং যে করে মাগি! বঁটি হাতে দরজা খোলে। মাগির শরীরটা যেন মক্কা-মদিনার মাটি দিয়ে তৈরি, কিছু করলে অপবিত্র হয়ে যাবে! কিন্তু ওই পর্যন্তই। শরীরে হাত দেওয়ার সাহস পেত না। বঁটির ভয় কার না আছে! যাই হোকÑ হোটেলের মালিক আমির হামজা কোনোদিন রাতে রান্নাঘরের দরজা টোকায়নি। লোকটার জন্য আমার খুব মায়া হতো। মায়া নাকি করুণা! হোটেলের রাঁধুনিকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়েছিল…।

ঈশ্বরদীতেও, শুরুতে একই যন্ত্রণার মুখোমুখি হই। রাতে ঘরের দরজায় টোকা পড়ে। পড়ুক। টোকা পড়ুক। আমি ভয় পাই না। দাওয়াই তো আমার কাছে আছে। বঁটি-দাওয়াই। আসলে কথা কিÑ মেয়েমানুষের এই এক যন্ত্রণা, সান্তাহার কী ঈশ্বরদী, কী ঘারিন্দায় সীমাবদ্ধ নয়Ñ দেশের সর্বত্র এই যন্ত্রণা ছড়িয়ে আছে। তখনও দেখেছি, এখনও দেখছিÑ পথেঘাটে কোথাও একাকী কোনো মেয়ে-মানুষ দেখলে, হোক নাবালিকা কি মা-খালার বয়সীÑ কিছু মানুষ ভাদ্র মাসের কুকুর হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি এখন এ রকম যেÑ নির্জনতার দরকার পড়ে না, ঝোপঝাড় কি আড়াবনের দরকার হয় না; প্রকাশ্য রাস্তায়, বাসে-ট্রাকে, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে, শহরের নামি-দামি হোটেলে আকছার ঘটছে ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা। দেখছি তোÑ এই তো সেদিনের ঘটনা, ঘারিন্দা থেকে খুব বেশি দূরের পথ নয়, শ্রীপুরে দুর্বৃত্তের হাত থেকে কিশোরী মেয়ে আয়েশার সম্ভ্রম বাঁচাতে না-পেরে মেয়েকে নিয়ে ঠা-ঠা রোদেলা দুপুরে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন হযরত আলী। আহারে! মেয়ে-বাবার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে টুকরো টুকরো মাংসের খণ্ড, রক্তের দলা ছড়িয়ে পড়লো রেললাইনের ওপর! খবর পেয়ে উন্মাদের মতো ছুটে এলো এক নারী, এই নারী মাত্র কিছুক্ষণ আগেই স্বামীহারা হয়েছে, কন্যাহারা হয়েছে। এই নারীর জন্য আমাদের দু’ফোঁটা চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই, কারণ ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না, সব আপনাদের জানা; ধর্ষক ফারুকের বাবার অঢেল টাকা আছে। রাজনৈতিক শক্তি আছে। এইসব থাকলে, কে আর কাকে পরোয়া করে, কে কার হাতে আইনের হাতকড়া পরায়Ñ আপনারাই বলুন দেখি? দেখছি তোÑ সেই কিশোরীকাল থেকে; কুকুরেরও একদিন ভাদ্র মাস কাটে, তাদের জীবনে আশ্বিন আসে, কার্তিক আসে, কিন্তু কিছু কিছু পুরুষলিঙ্গধারী মানুষ আছে, যাদের ভাদ্র মাস কখনওই আর কাটে না…।

ঘারিন্দা স্টেশনে যখন আসি, বয়স চল্লিশ, শরীর আর কলাগাছের মতো সুডৌল নাইÑ কলার ফেতরার মতো হতে শুরু করেছে, ভেবেছিলাম কুকুরের উপদ্রবের মধ্যে আর পড়তে হবে না। কিন্তু দু’দিন যেতে না যেতেই আমার ভুল ভাঙে। রাত বাড়লেই আমার ডেরার কাছে কুকুরের পদশব্দ পাই। কোনো রাতে কুলিসর্দার রতনের পায়ের শব্দ, কোনো রাতে টিকিট চেকার ওদুদ কিংবা কাউন্টারের সালামের পায়ের শব্দ শুনি। এক রাতে তো স্টেশন মাস্টারের পায়ের আওয়াজও কানে আসে। অজগরের মুখের সামনে পড়লে হরিণশাবক যে-রকম আতঙ্কগ্রস্ত হয়, আমিও সেরকম আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যাই। বঁটি যে ঈশ্বরদীতেই রেখে এসেছি! বঁটি একখানা জোগাড় করতেই হবে…।

তারপর থেকেই আমি পুরোপুরি উন্মাদ। তদুপরি হাতের কাছে বঁটি থাকে। সুতরাং কুকুর-সম্প্রদায় আর আমার কাছে ঘেঁষে না। ঘেউ ঘেউ যা করার, দূরে দূরেই করে…।

শুরুর দিকে, ঘারিন্দা স্টেশনে ডেরা বাঁধার পর, কেউ কেউ আমাকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার চেষ্টা করত। ছেনে-ছুঁয়ে দেখতে চাইতÑ আমি কে, বাড়ি কোথায়? স্বামী-সংসার নেই? মাথা খারাপ লোকের মতো রেলস্টেশনে ডেরা বেঁধেছি কেন? কত যে প্রশ্ন! কিন্তু আমি তো বোবা। বাকপ্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারি না। সুতরাং কারও কথার কোনো জবাব দিই না। সবাইকে হতাশ হতে হয়। এই করতে করতেই তো ২০ বছর গেল। এখন আমি ষাটের বুড়ি। ঘাটের মড়া। অনেকদিন ধরেই কেউ আর আমাকে নিয়ে, সদর্থ কি কদর্থÑ কোনো অর্থেই ঘাঁটাঘাঁটি করছিল না। আমি আমার মতো ছিলাম। কিন্তু ক’দিন ধরে এক মহাত্যাঁদর লোকের পাল্লায় পড়েছি। লোকটি নাকি লেখক। গল্প-উপন্যাস লেখে। নামÑ সুমিত জহির। লোকটি প্রায় প্রত্যেকদিন, বিকেল হলেই স্টেশনে আসে। আমাকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেললাইনে বসে থাকে। লোকটি নাকি আমাকে নিয়ে গল্প লিখবে! আমার মুখে আমার কথা শুনতে চায়। কিন্তু আমি তো বোবা-মানুষ, নাছোড়বান্দা লেখককে কী করে বোঝাই যে আমি কথা বলতে পারি না; আমার কথা তাকে কী করে শোনাই, আপনারাই বলুন…!

দুই.

ঘারিন্দা স্টেশন থেকে পুব-উত্তর দিকে তাকালে প্রথমেই যে গ্রামটি চোখে পড়ে, ব্রহ্মকুশি; এটিই আমাদের গ্রাম। অর্থাৎ ঘারিন্দা-ব্রহ্মকুশি পাশাপাশি দুই গ্রাম। এখন যেখানে রেলস্টেশন, একদা এখানে বিশাল বিল ছিলÑ আমরা দেখেছি। বিলের ওপারেই আমাদের গ্রাম। বিলে প্রচুর পদ্মফুল ফুটে থাকত, সেই ফুল তুলতে আমরা গাঁয়ের কিশোরীরা ঝাঁক ধরে বিলে নামতাম। সেই বিলের ওপর দিয়েই রেললাইন গেছে। অজপাড়া গাঁ ঘারিন্দা বলতে গেলে এখন শহর! কিন্তু কথা সেটা না, মোদ্দা কথা হচ্ছেÑ কোথায় ঘারিন্দা আর কোথায় পাবনা জেলার চাটমোহর! দেশের দুই প্রান্তের দুই গ্রামÑ আমি সেখানে গেলাম কী করে…!

তখন দেশে যুদ্ধ চলছে, আমার বয়স তেরো কি চৌদ্দ। একে তো মেয়ে-মানুষ, বয়সও কম, তারপরও বাবা-চাচার মুখে যা শুনি, তাতেই বুঝি যুদ্ধ কী ভয়াবহ জিনিস! পাকিস্তানের সৈনিকরা নাকি পশুর চেয়েও অধম। মেয়ে-মানুষ দেখলে তাদের হুঁশ জ্ঞান থাকে না। কিশোরী-বালিকা কি মা-খালারও ধার ধারে না তারা। হামলে পড়ে বাঘের মতো। তাই তো আমাদের মতো মেয়েদের নিয়ে গাঁয়ের কোনো মা-বাবার চোখে ঘুম ছিল না। সুযোগ পেলেই, রাতের অন্ধকারে যে যেভাবে পারছিলÑ পালাচ্ছিল। আমরাও পালাব, শুনেছিলাম মার মুখে, কিন্তু পালানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই একদিন দুপুরবেলা, সবে বাড়ির সবাই খেতে বসেছি, তখনই খবর আসে গ্রামে হানাদার ঢুকেছে। সব বাড়িতে ঘরের বেড়ায় কেরোসিন ঢেলে আগুন দিচ্ছে। যাকে যেখানে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে মারছে। পাতের ভাত দূরে ঠেলে হাহাকার করে মাÑ হায় আল্লাহ, কী হবে এখন! মনুকে কোথায় লুকাইÑ বাবাকে জিজ্ঞেস করে…।

আমার নাম মনু, মনিরা আক্তার; মা-বাবা মনু বলেই ডাকে। এখানে বলে রাখি, এই যে আমার নাম মনু, মনিরা আক্তার, আপনারা খেয়াল রাখুন, দেখবেন, আমি যখন চাটমোহরে আবিষ্কৃত হব, তখন, আমি আর নিজের নামটি বলতে পারবো না; শুধু নিজের নামটি কেনÑ মা-বাবার নাম, গ্রামের নাম, এমনকি আমি হিন্দু না মুসলমান, অর্থাৎ আমার জাত-ধর্মের নামও তখন মনে পড়বে না…।

গাঁয়ে হানাদার বাহিনী ঢুকেছে, তখন জুলাই মাস, চারদিকে থইথই পানি, হানাদাররা নৌকায় এসেছে। যুদ্ধ শুরু হয়েছে এপ্রিলে, এই চার মাসে গাঁয়ের বেশিরভাগ লোকই যে যেভাবে পারে পালিয়েছে, আমরা গরিব-গুবরো ক’ঘর জোলা সম্প্রদায়ের মানুষ আছি; বাবা-চাচা ভেবেছিলÑ পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু হানাদাররা গাঁয়ে ঢুকলে বাবা-চাচা বুঝতেই পারল না যে, তাদের হিসাবে ভুল ছিল; পাকিস্তানি হানাদাররা, তারা যে মনুষ্যপ্রজাতির কেউ না, জানোয়ার গোত্রের জীব, সেই প্রমাণ রেখে আমার মা-বাবা, আমার পাঁচ বছরের ছোট ভাই আহাদ, চাচা-চাচি, চাচাতো চার ভাই-বোন সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারল। আমাকেও লাইনে দাঁড় করানো হয়েছিল, গুলি করার আগ-মুহূর্তে অফিসার গোছের এক হানাদারের চোখ পড়ে আমার ওপর। লোকটি, যে হানাদার গুলি করতে উদ্যত, তাকে বলেÑ উর্দুতেÑ যার অর্থ দাঁড়ায়Ñ তোমার কি চোখ নাই মিয়া? কাকে গুলি করে মারছ। এ লেড়কি তো জান্নাতুল ফেরদাউস থেকে নেমে এসেছে…।

আমি প্রাণে বেঁচে যাই। আমার শরীর আর রূপ আমাকে বেঁচে থাকার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। আপনাদের বলিÑ বয়স তেরো-চৌদ্দ হলে কী হবে, তখনই আমি বেশ ডাঙ্গর হয়ে উঠেছিলাম। আর রূপ! আমার শরীরে যেন সোনালুফুল ফুটে থাকতো। মা বলতÑ গরিব ঘরের মেয়ের এত রূপ থাকা ভালো না। এই রূপই একদিন কাল হতে পারে…!

পরে বুঝেছি, লোকটি ক্যাপ্টেন। নাম সাবেত খান। সার্কিট হাউজে এই লোকটির ঘরে আমি প্রায় চার মাস ছিলাম। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টায় লোকটি অন্তত চারবার আমার ওপর চড়াও হতো। আমি অজ্ঞান হয়ে যেতাম। মড়ার মতো পড়ে থাকতাম। লোকটি কোনো কিছুরই পরোয়া করত না। অপারেশন কি কোনো কাজে বাইরে যাওয়ার সময় ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে যেত। আমি পালানোর অনেক পথ খুঁজেছি। কিন্তু পালানোর মতো কোনো পথ ছিল না…।

তাহলে…?

যদ্দুর মনে পড়ে, পালানোর অভিলাষ ছিল, পথ খুঁজেছি; কিন্তু সার্কিট হাউজ থেকে পালাইনি। বলা ভালো, পালাতে পারিনি। তাহলে আমি চাটমোহর কেন? লোকটিকে কি এদিকে কোথাও, পাবনা কি কুষ্টিয়া কি যশোরÑ কোথাও বদলি করা হয়েছিল? হতে পারে। লোকটি হয়তো জিপে তুলে আমাকে নিয়ে এসেছিল, বাতিল মাল মনে করে এখানে রাস্তার ধারে ফেলে গেছে…!

সেদিন রাতে, তখন প্রায় মধ্যরাত; আধখানা চাঁদ ঝুলছিল আকাশে, বরফকুচির মতো নরম জোছনা পড়েছে পথে, ঘাসের ডগায়; ধলপুরের গোসাই-দম্পতি গাঁ ছেড়ে পালাচ্ছিল, ধলপুর চাটমোহর থেকে অনেক ভেতরের একটি গ্রাম, মাথাভাঙা নদীর কাছে, তারপরও গাঁ এখন প্রায় খালি, হিন্দুদের মধ্যে এই গোসাই-দম্পতি ছিল, আর আছে ক’ঘর গরিব শ্রেণির মুসলমান; সামনে পাবনা-যশোর পাকা সড়ক, এই সড়ক পার হতে পারলেই মাথার দুশ্চিন্তা নামে। সড়কের ওপার হানাদারদের উৎপাত কম। ভোর নাগাদ নিরাপদ একটা আশ্রয় খুঁজে নিতে হবে। পরের রাতে একেবারে সীমান্তের ওপার…।

রমলা গোসাই আগে, সুবল গোসাই পেছনে। সড়কে উঠেই রমা চিৎকার করে ওঠেÑ ও মা গো, এটা কী…?

এটা কী মানে? সুবল গোসাই সামনে আসে। আরে! এত দেখছি একটা মেয়ে-মানুষ পড়ে আছে। অল্প বয়স। জীবিত না মৃত কে জানে…!

ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো না। কি না কী জাত! এই রাতে ছোঁবে…?

এখনও জাতের বিচার করছ রমলা! দেশে যুদ্ধ চলছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ। এখন কে হিন্দু কে মুসলমান, কে বৈশ্য কে ব্রাহ্মণÑ এটা বিচার করার সুযোগ নেই। মোটেই নেই। শোন রমলাÑ মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোই ধর্ম। তা ছাড়া শরৎবাবু সেই কবে বলে গেছেন, শ্রীকান্ত উপন্যাসে পড়েছিÑ ‘মড়ার আবার জাত কী রে…?’ কথা সঠিক রমলা। মড়ার কোনো জাত নেই…।

আমি জীবিত ছিলাম। সুবল গোসাই স্ত্রীকে বললোÑ রমলা, আমরা তো নিঃসন্তান। চলো, মেয়েটিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাই। ভগবান ললাটে যা লিখেছেÑ তাই হবে। এর বেশি কিছু হবে না…।

গোসাই দম্পতি আমার মা-বাবা হয়ে গেল। আমি হলাম তাদের মেয়েÑ সরস্বতী। আমার পূর্বস্মৃতি যেহেতু কিছুই মনে পড়ে নাÑ ‘সরস্বতী’কে আমি মেনে নিলাম…।

তখনও যুদ্ধ চলছে। কার্তিক মাস। কৃষকের ক্ষেতে ধান পাকতে শুরু করেছে। আধপাকা ধানের শীষে রাতে শিশির পড়ে। সকালে রোদ পড়লে কাঁচাসোনার মতো জ্বলজ্বল করে সেই ধানের শীষ। আমাদেরও এক টুকরো ধানক্ষেত আছে চকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান-আহ্নিক সেরেই বাবা ধানক্ষেত দেখতে যায়। আধাপাকা ধানের শীষ কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে। একদিন ধানক্ষেত দেখে এসে বাবা বললÑ কোথাও শুনে এসেছে হয়তোÑ ‘সতী মা, যুদ্ধ শেষ হতে আর বেশি দেরি নেই। পাবনা, ঈশ্বরদী, চাটমোহরÑ হানাদাররা সবখানে মার খেতে শুরু করেছে। ঢাকার দিকে পিছু হটছে…।’

মা-বাবা আমার নাম রেখেছে ‘সরস্বতী’, কিন্তু দু’জনের একজনেও আমাকে ‘সরস্বতী’ নামে ডাকে না। ডাকে ‘সতী’ বলে। আমি তাদের এই ‘সতী’ ডাক শুনে মনে মনে হাসি। জানি তোÑ ক্যাপ্টেন সাবেত খান আমার সতীত্ব কীভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে…!

বাবার কথামতো স্বাধীনতা যত এগিয়ে আসছে, আমার খাওয়া-দাওয়াও তত কমছে। খাবার দেখলেই বমি আসে। মা বুঝে ফেলেছেÑ শূকরছানা বাড়ছে আমার পেটে। বাবার ওপর হম্বিতম্বি করেÑ কেন কাঁধে বয়ে এই বিপদ-যন্ত্রণা বাড়িতে নিয়ে এলে? কী উপায় হবে এখন। লোক সমাজে মুখ দেখাব কী করে…?

বাবা কোনো কথা বলে না। ভগবানের ওপর বিশ্বাস রেখে চুপচাপ গুরুবাড়ির পথ ধরে। কোনো না কোনো সমাধান গুরু দেবেই…।

কিছু শেকড়-বাকড়, বাবা নিজের হাতে বেঁটে, রাতে আমাকে খাইয়ে দিলো। মাকে বললোÑ সতীর কাছে থাকো। পেটে খুব ব্যথা হবে। মা’র আমার অল্প বয়সÑ সহ্য করতে পারবে কিনা ভগবান জানে…।

আমি সারারাত তিরবেঁধা হরিণের মতো চিৎকার করলাম। ভগবানকে ডাকলামÑ এর চেয়ে মৃত্যু ভালো। তুমি আমাকে নিয়ে যাও। মা কাঁদল আমার পাশে বসে। ভোরের দিকে আমার জরায়ু ছিঁড়ে একটা মৃত শূকরছানা বেরিয়ে এলো। আহা কী শান্তি! কী যে শান্তি! আমি নিমিষে ঘুমিয়ে পড়লাম। দুপুরে ঘুম থেকে জেগে শুনিÑ দেশ স্বাধীন হয়েছে। চারদিক থেকে কানে আসে মেঘের মতো গর্জনÑ জয় বাংলা…।

তিন.

গোসাইবাড়িতে সরস্বতীর দিন ভালোই কাটছিল…।

তখন নতুন দেশ। ঘরবাড়ি; ঘরের ঘটিবাটি, থালাবাসন, কাঁথাবালিশÑ সবকিছুই নতুন। নতুন ধানের দিনে দেশ স্বাধীন হয়েছেÑ ভাতও নতুন। খোলস ছেড়ে সাপের নতুন শরীর-ধারণের মতো আমিও নতুন শরীর ধারণ করেছি। আমি যে কখনও মনু বা মনিরা ছিলাম, মুসলমান ছিলাম, বাবা আজগর আলী, মা আমিনা বেগম; ঘারিন্দা বিল ঘেঁষে আমাদের গ্রামÑ ব্রহ্মকুশি; হিন্দুপ্রধান গ্রাম, আমরা ক’ঘর জোলা সম্প্রদায়ের মানুষ গ্রামে ছিলাম; এইসব কখনওই আমার মনে পড়ে না। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান-আহ্নিক সেরে তুলসীতলা পূজা দিই। বাবাকেও পূজার উপাচার সাজিয়ে দিই। পূজা আমি ভালোই দিতে পারি। আমার জন্ম যে মুসলমান ঘরেÑ আমার পূজা-অর্চনা দেখে কেউ তা কল্পনাও করতে পারবে না। পূজার মন্ত্রাদি এতদিনে শিখে ফেলেছি, ব্রাহ্মণকন্যার মতোই পূজা করি। চাটমোহর বড়ো সড়কে আমি যখন আবিষ্কৃত হই, মড়ার মতো পড়ে ছিলাম, বাবা আমার দিকে ঝুঁকে পড়তেই মা যে বলেছিলÑ ছুঁয়ো না, ছুঁয়ো নাÑ কে জানে, কি না কী জাত; মা যদি জানত আমি মুসলমান ঘরের মেয়ে, জাতে জোলা; তাহলে কি আর আমার ঠাঁই হতো এই গোসাইবাড়িতে! কস্মিনকালেও হতো না। বাবার মুরোদও ছিল না আমাকে বাড়িতে তোলে! এখন পরিস্থিতি অন্যরকম, এটা আমিই তৈরি করেছি। যেহেতু আমি কখনও মুসলমানঘরের মেয়ে মনু কিংবা মনিরা ছিলামÑ তা কখনওই মনে পড়ে না, আমি হিন্দুঘরের মেয়ে সরস্বতীকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছি, সেই মতোই চলছি; মার মনে হয়তো বিশ্বাস জন্মেছেÑ আমি কোনো ব্রাহ্মণঘরের সন্তানই ছিলাম…!

আমার আদর-যত্নের কোনো ত্রুটি ছিল না। গোসাই-দম্পতি যেহেতু নিঃসন্তান ছিল; তারা আমাকে, বাবা তার ঔরসজাত, মা তার গর্ভজাত সন্তানই মনে করত। সেই রাতের দুর্বিষহ পরিস্থিতি কেটে যাবার পর, যে-রাতে আমার পেট থেকে শূকরছানা বেরিয়ে গেলÑ বাবা আমাকে আরও বেশকিছু দিন কী-সব গাছ-গাছড়ার শেকড়-বাকড় বেটে খাইয়েছে, তাতেই আমার শরীর, সে-রাতে শরীর যে-ঝাঁকুনি খেয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠে। শেকড়-বাকড়ের যে কী গুণ, পেটের ভেতর থেকে শূকরছানা টেনে বের করে, ভাঙা শরীর ক’দিনেই সুগঠিত করে; সেদিন টের পেয়েছিলাম। তারপর থেকে সারাজীবন তো বনবাদাড়ের গাছ-গাছালির শেকড়-বাকড় খেয়েই কাটিয়েছি। যাই হোক, ওই ঘটনার মাসখানেক পর থেকেই আমার শরীরে আবার সোনালু ফুল ফুটতে শুরু করে…।

সরস্বতীর দিন ভালোই কাটছিলÑ ধলপুরের কেউ তা অস্বীকার করবে নাÑ আমি নিজেও করি না। মা-বাবার প্রভূত আদর পাই। মা আমাকে সারাদিন চোখে-চোখেই রাখে, যাতে কারও নজর না-লাগে; বাবা যজমান বাড়ি থেকে ফেরার পথে মিঠাই-মণ্ডা নিয়ে আসে; গ্রামে স্কুল আছেÑ আমি বোবা না-হলে আমাকে নিশ্চয়ই স্কুলে ভর্তি করে দিত বাবা; সবই ঠিক আছে, তারপরও কখনও কখনও আমার মন যেন কেমন করে! আমার মনে হয়Ñ এই পৃথিবীতে আমি একা। গোসাইবাড়ির মেয়ে সরস্বতী একা। পৃথিবীতে তার কেউ নাই। সুবল গোসাই, রমলা গোসাই তার কেউ নয়…!

রোগ কঠিন। সরস্বতী কেন এই রোগে আক্রান্ত হতে যাবে, আমার মাথায় ধরে না…।

মনে করার চেষ্টা করিÑ কবে থেকে এই প্রসঙ্গটি আমার মাথায় ঢুকেছে যে, এই পৃথিবীতে আমি একা। সুবল গোসাই, রমলা গোসাই আমার কেউ না! মনে পড়ে, হ্যাঁ, কিছুটা মনে পড়ে; মনের ভেতরে একটা ঘটনা বলের মতো ধীরে ধীরে আকৃতি পেতে শুরু করে; সেদিন সকালে বারবাড়ি রাস্তার ধারে বকুলতলা দাঁড়িয়ে ছিলাম, সকালে প্রতিনিদই এখানে দাঁড়িয়ে থাকি; এই পথ দিয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে যায়, অনেকেই আমার বয়সী; ওদের দেখলে আমার খুব ভালো লাগে; সেদিনও দাঁড়িয়ে আছিÑ দু’টি বয়স্ক লোক যাচ্ছিল পথ দিয়ে, আমার কাছাকাছি এসেÑ একজন আরেকজনকে বললÑ দেখুন জেঠামশাই, মেয়েটিকে দেখুন, সুবল গোসাইর মেয়ে; তা বলি, সুবল গোসাই হঠাৎ এই সোমত্ত মেয়ে পেল কোথায়? গোসাই-গিন্নি তো আঁটকুড়ে। তাদের কোনো ছেলে-পুলে নেই। এখন দেখছি ডাঙ্গর মেয়ে…!

যাকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলা, অর্থাৎ দ্বিতীয় ব্যক্তি; প্রথমজনের কথার সূত্র ধরে যা বললÑ তা শুনে তো রাগে-দুঃখে আমার চোখ ফেটে জল এসে গেল। লোকটি বললÑ কেন শ্রীপতি, মনে নেই তোমার? এখনই ভুলে গেলেÑ যুদ্ধের সময় হানাদাররা এ রকম অনেক মেয়েকেই বাড়ি থেকে তুলে এনে চেটেপুটে খেয়ে রাস্তার ধারে ফেলে রাখত। বেশিরভাগ সেখানেই মারা যেত। তাদের দু’চারজন, ভগবানের কৃপায় যারা বেঁচে যেত গাঁ-ঘরের কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দিতো। এই মেয়েটিও হবে হয়তো সে-রকম কেউ…।

তাই বলে জাতপাত না দেখে! প্রথম লোকটি বলল…।

আবার জাতপাত! আমাকে প্রথম দেখেই মা যেমন জাতপাতের প্রশ্ন তুলেছিল। যা দেখছিÑ হিন্দুরা কেউ জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। মা যেমন, এই লোক দু’টোও তেমন…!

লোকদু’টো ধলপুরের না। আমাদের গাঁয়ের কেউ হলে, তা যে পাড়ারই হোক না কেনÑ তিন বছর তো হলোই, ধলপুর গোসাইবাড়িতে আছি, লোক দু’টোকে চিনতাম। কিন্তু চিনলাম না। পাশের কোনো গাঁয়ের হবে হয়তো…।

মনে পড়ে, লোক দু’টোর এই কথা শোনার পর থেকেই আমার মনে হতে থাকে, পৃথিবীতে আমার কেউ নেই। মা-বাবা, তাদের অকৃত্রিম আদর-স্নেহÑ সবকিছু থাকার পরও আমি নিঃসঙ্গ, আকাশের শুকতারার মতো একা…!

এরই মধ্যে বাবা আমার জন্য বর খুঁজতে শুরু করেছে। দেশের পরিস্থিতি নাকি ভালো না। যে-লোকটির ডাকে দেশের মানুষ খালি হাতে যুদ্ধে নামলো, দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দিল; দেশ স্বাধীন করলÑ সেই লোকটিকে, মানে বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসুদ্ধ মেরে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা; একের পর এক ক্ষমতার পালাবদলের পর এখন ক্ষমতায় বসেছেন এক জেনারেল; লোকটি নাকি রাতের বেলায়ও কালো চশমা পরেন, তার মতিগতি বোঝা ভার; দেশের ভবিষ্যৎ কীÑ বলা যাচ্ছে না; হিন্দুদের নাকি একেবারে নিরাপত্তা নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে হানাদাররা যেভাবে বেছে বেছে হিন্দুদের আগে ধরেছে, হিন্দুদেরই আগে গুলি করে মেরেছে; হিন্দুবাড়িতেই আগে আগুন দিয়েছে, পরিস্থিতি নাকি এখন আবার সে-রকমই হয়ে উঠছে; দেশের ভবিষ্যৎ কী, হিন্দুদের ললাটে কী আছে, কেউ জানে না, ভগবানও না; সুতরাং এই মুহূর্তে, মেয়ের বয়স ষোলো; তাকে আর ঘরে রাখা ঠিক না, যত তাড়াতাড়ি শ্বশুরবাড়ি পাঠানো যায়, ততই মঙ্গল…।

দেখুন, সরস্বতীর শরীরে সোনালুফুল ফোটে, তাকে দেখে বরপক্ষের পছন্দ হবে না, মুখ ফিরিয়ে নেবে, তাতো হয় না; তারপরও তার বিয়ে হচ্ছে না। বরপক্ষ আসে, আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমার হাত দেখে, পা দেখে, চুল দেখে, দাঁত দেখে, বুক দেখে, কোমর দেখে; তারপর ঘিয়ে-ভাজা লুচি-সন্দেশ খায়, রুই মাছের ব্যঞ্জন দিয়ে ভূরিভোজ করে; তারপর মুখে পান পুরে খেতে খেতে বাবাকে বলেÑ মেয়ে নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না মশাইÑ সরস্বতী মাকে আমাদের ভারি পছন্দ হয়েছে, মায়ের নামটি সরস্বতী, গুণেতে মা নিশ্চয়ই লক্ষ্মী হবে; আমরা বাড়িতে গিয়ে, বাড়িতে গিন্নিবান্নি আছে, তাদের সাথে শলাপরামর্শ করে পাকা খবর জানাব…।

সেই পাকা খবর কিন্তু আর আসে না। খবর যে আর আসবে না, আমি কিন্তু তা জানি, হয়তো আপনারাও অনুমান করতে পারেনÑ বরপক্ষ আমাদের বাড়িতে ঢোকার আগেই পথে শুনে আসেÑ সরস্বতীর মা-বাবা কে, ধলপুরবাসী কেউ জানে না; বোবা এই মেয়েটিকে সুবল গোসাই গণ্ডগোলের বছর কুড়িয়ে পেয়েছিল…।

যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ‘গণ্ডগোল’ বলে, দেখুন, কী দুর্ভাগ্য আমাদের, তাদের সাথেই, যতবার বরপক্ষ সরস্বতীকে দেখতে আসে, দেখা হয় পথে…!

বাবা আমার বিয়ে নিয়ে উতলা হচ্ছিল, মা কাঁদছিল গোপনে গোপনে; আমি তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল সব দোষ আমার, আমি একটা অপয়া মেয়ে, আমার জন্যই মা-বাবা কষ্ট পাচ্ছে। আমার কিছু একটা করা উচিত। কিন্তু কী করব! আমার জন্য কোন্ পথ খোলা? ভাবছিলামÑ গলায় কলসি বেঁধে মাথাভাঙা নদীতে নেমে পড়লে কেমন হয়…!

দু’দিন ভাবার পর, মনোস্থির করেছি, মধ্যরাতে কলসি নিয়ে, একটা পিতলের ভারী কলসি আমার ঘরে এনেও রেখেছি, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ব। যে-রাতে বের হবো ঠিক করেছি, সেই রাতে, আমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই বাড়িতে ডাকাত পড়লো…।

গোসাইবাড়িতে ডাকাত! লুট করে নেওয়ার মতো কী আছে এ-বাড়িতে? ঘরে একটা নগদ টাকা নেই; মা’র সোনাদানা, ঘটিবাটি যা ছিল গত দুর্ভিক্ষ সামলাতেই শেষ হয়েছে। বুঝে উঠতে বাকি থাকে নাÑ ডাকাতদের টাকা-পয়সা নয়, সোনাদানা নয়; টার্গেট সরস্বতী…।

ডাকাতরা বাবাকে ‘সুবল কাকা, সুবল কাকা’ বলে দু’তিনটি ডাক দিয়েছিল। ঘুমের ঘোরে বাবা উত্তর করছিলÑ কে? এত রাতে কে ডাকে? ডাকাতরা বাবার প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি, তাকে দরজা খোলারও সুযোগ দেয়নি; দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকেছে। ঘরে ঢুকেই ক্ষুধার্ত চিতার মতো গর্জন শুরু করেছেÑ এই মালাউনের বাচ্চা, তোর মেয়ে কই? মেয়ে বের কর। জলদি। টাইম নাই…।

ঘরের মাঝখানে তড়জার বেড়া। একপাশে মা-বাবা থাকে, একপাশে আমি। বেড়ার একদিকে কিছুটা অংশ কাটা, আমরা দরজা হিসেবে ব্যবহার করি। এক ডাকাত, ডাকাতের সর্দার হবে হয়তো, সে যেন জানে, জেনেই এসেছে; আমি ভেতরের ঘরে আছি, সে ওই দরজা দিয়ে আমার ঘরে ঢোকে, আমাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে; আমি ডাকাতটাকে চিনতে পারি…।

বাবার রোগদীর্ণ শরীর। হাঁপানির টান আছে। কথা বলতে গেলেই বুকে টান শুরু হয়। ভালো করে কথা বলতে পারে না। সেই বাবা গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠেÑ খবরদার বলছি, আমার মেয়েকে ছেড়ে দে। এখনি ছেড়ে দে। নইলে আমি অভিশাপ দিব। সুবল গোসাই অভিশাপ দিলে বজ্রাঘাতে মৃত্যু হবে তোর…।

ডাকাতটিকে অভিশাপ দেওয়ার সুযোগ পেল না বাবা। তার আগেই ডাকাতটি বাঁ-হাতে আমার গলা চেপে ধরে, ডান গাতে গুলি করলো বাবার বুকে। পিস্তলের গুলির শব্দে বাবার চিৎকারের শব্দ চোখের পলকে কোথায় যে উবে গেল, আমি না বাবার চিৎকারের শব্দ, না বাবার বুকটানের শব্দ; কিছুই আর খুঁজে পেলাম না। ডাকাতটি আমার গলা এত জোরে চেপে ধরেছিল, মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আমি মারা যাচ্ছি, মা ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, মাকে উদ্দেশ করে আমি একটা চিৎকারও দিতে পারলাম না, আমাকে এক ঝটকায়, সিনেমায় যে-রকম হয়; কাঁধে তুলে ডাকাত-সর্দার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল…।

চার.

সরস্বতী এখন সখিনা, নলপুরের নূরু মোল্লার ষোড়শী কন্যা…।

আমি বিলের ধারে মড়ার মতো পড়েছিলাম, চিৎ হয়ে; শরীরে একটুকরো কাপড় ছিল না, কোমরে কালো সুতো পর্যন্ত না; যৌনাঙ্গ ছেঁড়াখোঁড়া, রক্তে একাকার; হঠাৎ দেখলে মনে হবে নিষ্কিন্ধা; নিষ্কিন্ধার মুণ্ডু থাকে না; আমার আছে, এইটুকু তফাৎ। তখন কেবল ভোর হচ্ছে, পাখির ঝাপটানি শোনা যাচ্ছে বিলে, বাবা আমাকে দেখেÑ যেন হঠাৎ সাপের মাথায় পা পড়েছে, লাফ দিয়ে পিছিয়ে আসে। সুস্থির হতে কিছুটা সময় লাগে তার। ভয় কেটে গেলে বাবা বোঝেÑ তার বোধে আসেÑ তার সামনে কোনো নিষ্কিন্ধা পড়ে নাই, এখানে নিষ্কিন্ধা আসবে কোত্থেকে, নলপুরে হিন্দু-বসতি নাই, পূজা-অর্চনা নাই; সামনে যা পড়ে আছে, নিশ্চয়ই কারও লাশ! বাবা এগিয়ে আসে, গামছা দিয়ে আমার শরীর ঢেকে দেয়; আমার বুকের ওপর মাথা রেখে পরখ করে শ্বাস-প্রশ্বাস আছে কি নাই, আমি জীবিত নাকি মৃত? আমি জীবিত ছিলাম…।

বাবা ঝাঁকিজাল নিয়ে মাছ ধরতে এসেছিল। বিলপারের মানুষ তো, মুসলমান হলেও মাছ ধরাই বাবার পেশা। নলপুরের আরও অনেকেই বিলের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। বাবা অনেকটা রাত থাকতেই ধলপহরের আগেই মাছ ধরতে আসে। সেদিন আর মাছ ধরা হয় না। তখনও বাদশা, মজু, নশেরÑ অন্য কেউ মাছ ধরতে আসেনি। বাবা আমাকে কাঁধে তুলে বাড়ির পথ ধরে…।

ডাকাতরা আমাকে নৌকায় তুলেছিলÑ বুঝেছিলাম। সারারাত, যতক্ষণ জ্ঞান ছিল, বুঝতে পারছিলাম; সমুদ্রে নিম্নচাপ শুরু হলে পানি যেভাবে চরকির মতো ঘোরে, আমিও তেমনি ঘুরছিলাম। কখন জ্ঞান হারিয়েছি, কখন ওরা আমাকে বিলের কাছাড়ে ফেলে রেখে গেছে, কিচ্ছু জানি না…।

সেদিন দুপুরের পরপর আমার জ্ঞান ফিরে আসে, তখন টের পাইÑ আমার তলপেটে, যৌনাঙ্গে যেন দোযখের আগুন জ্বলছে। স্তনদু’টোতেও পোড়া-যন্ত্রণা। দশ-বারোদিন অসুস্থ ছিলাম। এই ক’দিন আমাদের বাড়িতে গাঁয়ের কেউ আসেনি। আমাদের বাড়িটা বিলঘেঁষা। গাঁয়ের মূল-বসতি থেকে কিছুটা দূরে, দ্বীপবাড়ির মতো নিঃসঙ্গ একটা বাড়ি। আমাদের বাড়িতে এমনিতেই গাঁয়ের কারও তেমন যাতায়াত নেই। এই ক’দিন, বাবা আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসার পরদিন থেকেই আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ ছিল, বৃষ্টি ছাড়ছিলই না। এমনিতেই এ-বাড়িতে কেউ কদাচিৎ আসে; দুর্যোগ মাথায় নিয়ে এই ক’দিন কেউ আসেই নি। মা’র টোটকা ওষুধ খেয়ে আমি সুস্থ হয়ে উঠি। সুস্থ হয়ে বাড়ি থেকে বের হতেই মা ঘোষণা করলÑ সখিনা আমার বোনঝি। এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে। হঠাৎ বাড়িতে কলেরা এসেছিল, আমার বোন-বোনজামাই দু’জনেই মারা গেছে। সখিনা একাই ছিল,  তাই ওকে আমরা নিয়ে এসেছি…।

মা, বাবা, ছোট দুই ভাই-বোন, গোটা বিশেক হাঁস-মুরগি, কয়েকগাছি ঝাঁকিজাল-ধর্মজাল, জুতি-পলোÑ এই নিয়ে আমাদের সংসার। বাবা বিলে মাছ ধরে হাটবাজারে বিক্রি করে, মা আর আমি হাঁস-মুরগি সামলাই। হাঁসগুলো আগে মা বিলে নিয়ে যেত। এখন আমি নিয়ে যাই। পালানের মতো আছে একটু জায়গা, ডাঁটা-মুলা-ঢেঁড়স-পুঁইশাক; যখন যেটার মৌসুম, লাগাই সেখানে। ছোট ভাই-বোন দু’টো স্কুলে যায়। আমার কোনো অভাব-অভিযোগ নাই। বলতে হবেÑ সুখের সংসার আমাদের। আমার কখনওই মনে পড়ে না, আমি কোনোদিন সরস্বতী কি মনিরা ছিলাম! সেদিন জ্ঞান ফেরার পর, তারপর কিছুটা সুস্থ হলে মা-বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেÑ তোমার নাম কী মা? বাড়ি কোথায়? আমি তো বোবা, কথা বলতে পারি না; কী বলব তাদের! সখিনা হিসেবেই নূরু মোল্লা আর সোনাভানুর মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকি, বড়ো হই…।

তখন আমি ষোড়শীকাল পার করছি, মা-বাবার ফিসফিসানি শুনি, কানে আসে; মা বাবাকে বলেÑ সখিনার জন্য একটা ছেলে দেখো, বয়স তো কম হলো না! বাবা কোনো কথা বলে না। মা বুঝে ফেলেÑ বাবা কেন কথা বলছে না। তখন মা বলেÑ মেয়ে আমার রূপে-গুণে অদ্বিতীয়া, সামান্য খুঁতÑ বোবা, কথা বলতে পারে না। আল্লাহতায়ালা কি বোবা মেয়ের জুটি বানায় নাই, বলো…।

এই যে মনিরা থেকে সরস্বতী, সরস্বতী থেকে সখিনা; এতটা পথ পারি দিলাম, কখনও ক্যাপ্টেন সাবেত খানের জিপে, কখনও ডাকাতের নৌকায়; কই, আমি কখনও কেঁদেছি কিনা, মনে পড়ে না তো! আসলে এইসব কথাবার্তা শুনলে, বুঝি তোÑ বোবা মেয়েটাকে নিয়ে কী বিপদেই না তারা পড়েছে! আমার চোখ ফেটে পানি আসে…।

কিন্তু এরই মধ্যে, হঠাৎ কি থেকে কী হয়ে গেল, বিয়ে ঠিক হয়ে গেল আমার। বাবা কিন্তু কিছু লুকায়নি, বরপক্ষকে বলেছে, মেয়ে আমাদের বোবা, কথা বলতে পারে না; তারপরও বরপক্ষ রাজি হয়েছে। রাজি হওয়ার কারণ, যে লোকটি আমার বর হয়েছে, সিরাজ; ওই লোকটি আমাকে দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছিল, আমি বোবা কি কালাÑ এইসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চায়নি সে। অতঃপর সিরাজের জেদের কারণেই আমাদের বিয়েটা হয়ে যায়…।

আমি বোবা বলে আমার বিয়ে হচ্ছিল না, এই নিয়ে কষ্টের শেষ ছিল না মা-বাবার; বলেছি আগেÑ তাদের কষ্ট দেখে আমার চোখ ফেটে পানি আসত; কিন্তু আমি তখন কাঁদতাম না। বহু কষ্টে সংবরণ করতাম চোখের পানি। শ্বশুরবাড়ি যেতে, সেদিন কাঁদলাম, চোখে যত পানি ছিল, সব পানি ফেলে…।

সিরাজ ঘরামি। পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোরÑ দেশে দেশে ঘরের কাজ করে। পনেরো দিন কি মাসে একবার বাড়িতে আসে। দু’তিন দিন থাকে বাড়িতে। বছরখানেক পর, একবার বাড়িতে এসে বললÑ সখী, লোকটা আমাকে সখী বলেই ডাকে; সখিনা বলে না; যাই হোক, বললÑ সখী, পাবনা শহরে ঘরভাড়া করেছি, তোকে নিয়ে যাবো। তোকে ছেড়ে থাকতে আমার খুব কষ্ট হয়। কষ্ট যে লোকটার হয় তা আমি বুঝি; কারণ, বাড়িতে যে ক’দিন থাকেÑ লোকটার আদরে-আদরে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠি। তারপরও আমার ভালো লাগে। সুখ পাই। কখনও-সখনও মনে হয়, এইবার বুঝি বোল ফোটা শুরু হবে আমার মুখে। আমি কথা বলতে পারব…!

শহরে এসেছি, বছর ঘোরেনি তখনও, এ যেন এক নতুন জগৎ; রাতে রাস্তার খুঁটিতে খুঁটিতে বাতি জ্বলেÑ রাতের শহর দেখতে খুব সুন্দর! দুনিয়ার তাজ্জব ব্যাপার সিনেমা। তিন-চারবার রূপকথা হলে সিনেমা দেখেছি। পর্দার মধ্যে মানুষ কীভাবে কথা বলে, ঘোড়া দৌড়ায়, মেয়েরা নাচে, গান গায়, পুকুরে সাঁতার কাটে, আমার মাথায় ঢোকে না। রাতে শুয়ে শুয়ে সিরাজকে বলি। সিরাজ আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেÑ সখী আমার কিছুই বোঝে না গো, একেবারেই কচি খুকি…।

মানুষ রাতে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে, আমি তখন দিনেÑ জেগে থেকেও স্বপ্ন দেখতামÑ ফুটফুটে একটা শিশুর স্বপ্ন। সিরাজ আমার বউ-সোহাগী স্বামী, আদর-যত্নে আমাকে ভরিয়ে রাখে; তারপরও আমার ঘরসংসার কেমন খালি খালি ঠেকে। বুকটা টনটন করে। আমি রাতে সিরাজকে আমার স্বপ্নের কথা বলি। সিরাজ আমাকে উদ্লা করতে করতে বলেÑ হবে বউ, সবই হবে। আর ক’টা দিন ধৈর্য ধরো…।

আমাদের বিয়ে হয়েছে, তখন, দু’বছর; সন্তান নেবোÑ সিরাজ এত গাইগুই করে কেন আমার মাথায় ধরে না। নলপুর গেলে মা আকারে-ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেÑ কীরে সখিনা, আমার নাতি আসবে কবে? মাকে কিছু বলতে পারি না। চুপচাপ থাকি। কিন্তু লোকটি কেন সন্তান নিতে চায় নাÑ এই রহস্য উন্মোচন করতে পারি না। আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করি…।

খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। ক’দিন পরই সিরাজ মিয়া কেন সন্তান নিতে চায় নাÑ এই রহস্য আমার কাছে উন্মোচিত হয়ে গেল। আর এই রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আমি আবিষ্কার করলামÑ একটা মানুষ, যে-কিনা আমার পরমপুরুষ, আমার স্বামী; আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে, সে কতটা হারামি, কতটা অমানুষ! তার এই ভালোবাসা যে লোক দেখানো ছিল তা আমি আগে বুঝতে পারিনি…।

সেদিন রাতে সাথে একটা লোক নিয়ে এসেছিল সিরাজ। বললÑ আমার বন্ধু। কাদের। আমরা একসাথে কাজ করি। কাদের আজ রাতে এখানে থাকবে…।

এখানে থাকবে! বলো কী? একটাই ঘর। একটাই বিছানা…।

আমি বাইরে থাকব। কাদের তোর সাথে থাকবে…।

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপমা এখন খুব সেকেলে। তবুও মনে হয়, সিরাজ মিয়ার কথা শুনে আমার যে পরিস্থিতি হয়েছিল, তাতে, এরচেয়ে ভালো কোনো উপমা আমার জন্য যুতসই ছিল না। মনে হচ্ছিলÑ সত্যি সত্যিই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে। বলে কী লোকটা? এই লোকটা আমার স্বামী…?

এক রাতের জন্য দু’শো টাকা দেবে কাদের। আমার সাত দিনের কামাই। ভেবে দ্যাখ সখিনা, দুর্ভিক্ষের রেশ এখনও কাটে নাই, আমার ঠিকমতো কামাই নাই, আমরা ঘরে-বাইরে দুটি মাত্র মানুষ তবুও ঠিকমতো খেতে পাই না; মা-বাবা না-খেয়ে মরছে, তাদের জন্য একটা টাকা পাঠাতে পারি না; মাসে দু’তিনজন লোক ঘরে নিলে, কোনো চিহ্ন থাকবে না সখী, আমাদের অভাব কেটে যাবে…।

হাতের কাছেই, ঘরের বেড়ায় বঁটি গোঁজা ছিল। আমি বঁটি দিয়ে সিরাজ মিয়াকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করিÑ ‘হারামিরপুত, তুই আমাকে বাজারের মেয়ে পেয়েছিস…।’

পাদটীকা :

আমার হাতে বঁটি দেখেই কাদের মিয়া সোনাব্যাঙের মতো লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিল, বঁটির কোপ খেয়ে সিরাজ মারা গেছিল কি বেঁচে ছিল আমার জানা নাই; আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। তারপর চাটমোহর, সান্তাহার, ঈশ্বরদীÑ একটা বঁটিকে আশ্রয় করে কীভাবে বেঁচে ছিলাম তার কিছু কিছু তো বলেছি; বিশদ বর্ণনার প্রয়োজন পড়ে না। তারপর যেদিন কানে এলো ঘারিন্দা রেলস্টেশন হয়েছে, কীভাবে যেন আমার পুনর্জন্ম ঘটে গেল, মনে পড়ে গেল অতীতের সবকিছু; মনে পড়লোÑ আমার নাম ছিল মনিরা, মা-বাবা… সবাইকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী গুলি করে মেরেছিল; ঘারিন্দার পাশেই ছিল আমাদের গ্রামÑ ব্রহ্মকুশি…।

একদিন চেপে বসলাম  সুন্দরবন এক্সেপ্রেসে…।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares