বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন : বাদল সৈয়দ

সেদিন প্রবল উত্তেজনায় ঘুম ভাঙল।

মাত্র ভোরের আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে। আকাশ লাল মরিচের মতো। পাখিরা ডানা ঝাপটে বের হয়ে আসছে।

কিছুই আকর্ষণ করছে না। বুকের ভেতর চাপা অস্থিরতা।

পেয়ালায় কফি ঢালতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেললাম।

আজ পলিন আসবে। সকাল এগারোটায়।

পুরো নাম পলিন এমারসন।

একটি আন্তর্জাতিক চ্যারেটির অ্যাম্বাসেডর। দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারটা দেখে।

গত কয়েক মাস থেকে তার সাথে বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে মেইল আর ভিডিও কনফারেন্সে যোগাযোগ হয়েছে। সে কাজ করবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে। তাদের ওপর বিস্তারিত রিপোর্ট, কী কী সাহায্য করা যায়, বিশেষ করে শিশু শিক্ষা, এগুলোই তার অ্যাজেন্ডা।

আমাকে অফিস থেকে তার সাথে কো-অর্ডিনেট করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ যোগাযোগ আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছে গভীর বন্ধুত্ব।

ব্যাপারটা নিয়ে অফিসে গুঞ্জনও শুরু হয়েছে।

কারণ পলিন এমারসন সাধারণ কেউ নয়। আমেরিকার বিখ্যাত টিভি অ্যাংকর ছিল।

অস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান পরিচালনায় তাকে প্রতিবছর দেখা যেত।

হলিউডের একটি মিষ্টি ছবি ‘আ লোনলি উইম্যান অন দ্য বিচ’ ছবিতে অভিনয়ও করেছিল। কিন্তু কেন যেন অসম্ভব ভালো ছবিটি তেমন হিট করেনি।

তারপর সব ছেড়েছুড়ে সে চ্যারেটিতে নাম লেখায়।

কিন্তু তার চেহারা বিলিয়ন লোকের মগজ থেকে মুছে যায়নি।

সব মিলিয়ে পলি এমারসন অতি বিখ্যাত মানুষ।

আ ভেরি হাই স্টেইক টু হ্যান্ডেল।

আজ তার সাথে দেখা হবে! উত্তেজনাটা গরম কফিতে হাত পুড়িয়ে ফেলার মতোই।

এমিরেটসের স্লোগান হচ্ছে ‘জাস্ট অন টাইম‘। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ঠিক কাঁটায় কাঁটায় সকাল এগারোটায় তাদের ফ্লাইট ঢাকার মাটি স্পর্শ করল।

কিন্তু সব ফরমালিটি শেষ করে পলিন বেরিয়ে এলো বেলা প্রায় বারোটায়।

ইন্টারনেটের কারণে এখন আর আগের মতো অপরিচিত কারও জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে এয়ারপোর্টে অ্যারাইভাল লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে হয় না। আগেই চেহারা চেনা হয়ে যায়।

পলিন যখন অ্যারাইভালে এসে পৌঁছাল তখন মনে হলো নাম না জানা কোন অসম্ভব সুন্দর ফুল হেঁটে আসছে। তবে ফুলটি জংলি ফুল, এক ধরনের বুনো সৌন্দর্য উপচে পড়ছে, ঠিক গোলাপের মতো স্নিগ্ধ নয়, গভীর জঙ্গলে ফোটা বেপরোয়া এক ফুল।

সে সোজা হেঁটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি একটু অস্বস্তি অনুভব করছি। কোন মহিলা প্রকাশ্যে হাগ দিচ্ছে, এটা আমাদের কালচারের সাথে খুব বেশি যায় না। সবাই একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

পলিনের গা থেকেও ভেসে আসছে জংলি ফুলের সুবাস। মনে হচ্ছে সে ‘ক্রিড’ মেখেছে। গত আড়াইশ বছর ধরে এ পারফিউমটি ব্রিটেনের রাজদরবারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মাত্র ষাট মিলিগ্রামের দাম আমার এক মাসের বেতনের চাইতেও বেশি। কিন্তু সে পরেছে সাধারণ ফতুয়া আর জিন্স। ফতুয়াটা আমিই পাঠিয়েছিলাম। ও বলেছিল, বাংলাদেশি পোশাক পরে আসতে চায়।

‘সৈয়দ, হাউ আর ইউ, লুকিং ফ্রেশ।’

‘ফাইন অ্যান্ড ইউ লুক গর্জিয়াস।’

‘হাহাহাহা। তবে সত্যি বলতে কী তুমি আরেকটু হ্যান্ডসাম হবে আশা করেছিলাম। হাহাহাহা।’

‘আই আম স্যরি, অ্যাট দা টাইম অফ মাই বার্থ গড হ্যাড থ্রোন মি ইন দা ব্ল্যাক সী। জন্মের সময় উপরওয়ালা আমাকে কৃষ্ণসাগরে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাই গায়ের রঙের উপর আমার হাত নেই। হাহাহা।’

‘ইউ আর নটি, ভেরি নটি।’

ঠিক সে মুহূর্তে আমরা আরও অনেক গভীর বন্ধু হয়ে গেলাম। এটা ইন্টারনেটের বন্ধুত্ব নয়, নিঃশ্বাসের দূরত্বের বন্ধুত্ব।

যে মেয়ে প্রথম দেখায় ‘তুমি হ্যান্ডসাম নও’ বলার সরলতা ধারণ করে তার সাথে বন্ধুত্ব না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কক্সবাজারের কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল দেড়টায়। মোটামুটি তিনটার দিকে আমরা উখিয়ায় আমাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছালাম।

সমুদ্র মুখে রেখে মাঝারি সাইজের ডুপ্লেক্স বাংলো।

পেছনে পাহাড়, সেখানে প্রাচীন জঙ্গল। বাড়িটি মাঝারি হলেও এলাকা বিশাল। প্রায় বিশ একর। মালিক খুব শখ করে বানিয়েছিলেন। এখন ভাড়া দিয়েছেন। চমৎকার বাগান, আবার বুনো অরণ্যও চারপাশ ঘিরে আছে। সবচেয়ে সুন্দর হলো সমুদ্রের তীরেই কাচের ডাইনিং হল। খেতে খেতে উপচে আসা ঢেউ দেখা যায়। লাল সূর্য যখন ডুব মারে মনে হয় সে নিজের বুকে টুপ করে ঘুমানোর জন্য ঢুকে গেল।

বাড়িতে শুধু আমি আর পলিন। এ ছাড়া কেয়ারটেকার আর বাবুর্চি। অবশ্য নিরাপত্তার জন্য চারজন আর্মড পুলিশ আছে। তারা দুজন থাকে গেটে, দুজন টহল দেয়। বোঝাই যায় সরকার ব্যাপারটি সিরিয়াসলি নিয়েছেন।

পলিন এমারসন বলে কথা।

বাড়িতে ঢুকেই পলিন প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘ওহ! এত সুন্দর! সো বিউটিফুল। ধন্যবাদ, সৈয়দ’।

আমি হেসে বললাম, আমাকে নয়, আমার অর্গানাইজেশনকে ধন্যবাদ দাও। তারাই এটার জন্য পে করবেন। আমি শুধু খুঁজে বের করেছি। তুমি শর্ত দিয়েছিলে প্রাইভেসি চাও’।

‘ওয়ান্ডারফুল! আমি কি এক্ষুনি সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে পারি?’

‘খিদে না থাকলে পারো। তবেÑ’

পলিন হেসে বলল, ‘ভয় পেয়ো না, আমি তোমার দেশের কালচার জানি। আমার সুইমিং স্যুট যথেষ্ট ভদ্র’।

‘ধন্যবাদ, পলিন।’

‘তুমি বিশ্রাম নাও, সৈয়দ, আমি এক ঘণ্টা সাঁতার কাটব। তারপর হালকা খাবার দিতে বলো, প্লিজ।

অ্যান্ড মে আই হাগ ইউ অ্যাগেইন? আই মাস্ট থ্যাংক ইউ।’

আবার জংলি বুনো গন্ধ আমার গাল ছুঁয়ে গেল।

ঘণ্টাখানেক পর খেতে বসেছি। আমি ভেতো বাঙালি, তাই ভাতই ভরসা, পলিন কার্ব দুচোখে দেখতে পারে না, তাই সে নিয়েছে সালাদ আর কফি।

খেতে খেতে বললাম, ‘যদিও তোমার প্ল্যান মেইল করেছ, তারপরও আরেকবার বললে ভালো হয়। কারণ কয়েকটা পারমিশন নেওয়া লাগবে, আবার তোমার জন্য নির্দিষ্ট ‘বারকোড নিতে হবে। ওটা ছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে  ঢোকা যাবে না। আমি মোটামুটি সব গুছিয়ে রেখেছি। তারপরও স্থানীয় প্রশাসনকে পুরো ব্যাপারটা আমার আবার জানানোর কথা। সিকিউরিটির ব্যাপারটাও দেখতে হবে’।

পলিন প্লেটে চামচ রেখে বলল, ‘আগের প্ল্যানই ঠিক আছে। আমি স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলব। সব মেগা ক্যাম্পে যাব। স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও কথা বলব। এখানে বাইরের যেসব সংস্থা কাজ করছে তাদের সাথেও বসব। তবে আমার মেইন ফোকাস হচ্ছে শিশুদের শিক্ষা। এসব ক্যাম্পে যেসব শিশু আছে তাদের শিক্ষা না দিলে বিশাল একটি অন্ধ জেনারেশন তৈরি হবে, যার চাপ শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীই নিতে অক্ষম। আমার আগের প্ল্যান অনুযায়ী সব মিটিং কিন্তু তোমার ঠিক করে রাখার কথা’।

‘তা করা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে আগামী সাতদিন তুমি নিজেও ঘুমাবে না, আমাকেও ঘুমাতে দেবে না। তবে আমি আজই তোমার ‘বারকোড’ এর ব্যবস্থা করে ফেলছি। লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে মেইল করে দিচ্ছি। আশা করি রাত নটার মধ্যেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ওরা সন্ধ্যার পরও জরুরি কাজ করে।’

পলিন সালাদ মুখে দিতে দিতে বলল, ‘হ্যাঁ, ঘুমানোর সময় পাব না, এটা ঠিক। তবে সকাল বিকাল দুঘণ্টা সাঁতার না কেটে আমি কোথাও যাচ্ছি না। এমন ভার্জিন বিচ আমি আর দেখিনি। চাইলে তুমি আমার সাথে যোগ দিতে পার। হোপ ইউ আর নট দ্যাট মাচ কনজারভেটিভ। বন্ধুর সাথে সাঁতার কাটাই যায়। নাকি সমস্যা আছে?’

‘না কাটাই ভালো। স্থানীয়রা ভালোভাবে নেবে না।’

‘আই সি। তাহলে আমি একাই সমুদ্র স্নান করব। কী আর করা?’

পলিন খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছছে। তার বাম হাতের অনামিকায় শেষ বিকেলের আলোয় অসম্ভব সুন্দর একটি আঙটি ঝকমক করে উঠল। বোঝাই যায় এনগেজমেন্ট রিং। কারণ এ আঙুলেই একমাত্র এনগেজমেন্ট রিং পরা হয়। একটু অবাক হলাম। মাত্র কমাস আগেই পত্রিকায় দেখেছিলাম পলিনের বিয়ে ভেঙে গেছে। গুজব ছিল নাম করা এক ফটো জার্নালিস্টের সাথে তার অ্যাফেয়ার চলছিল, তার সূত্র ধরেই বিবাহ বিচ্ছেদ। মনে হয় নতুন বন্ধুর সাথে এনগেজমেন্ট হয়েছে। ভদ্রতা করে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। তবে অবাক হয়ে আঙটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এত বড় হীরে আমি আর আগে দেখিনি। সমুদ্রের ওপর আকাশে ভাসতে থাকা মরা সূর্যের আলোও তাতে প্রতিফলিত হয়ে সহস্র আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছে।

পলিন যেন আমার বিস্মিতভাব উপভোগ করছে, ‘সৈয়দ, তোমাকে বলা হয়নি, জেফরির সাথে পরশু আমার এনগেজমেন্ট হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চয় ওর সাথে অ্যাফেয়ারের কথা জেনে গেছ। মিডিয়ার তো আর কাজ নেই, আমার মতো হলিউডের ফ্লপ নায়িকার অ্যাফেয়ার নিয়েও ওরা ফ্রন্টলাইন নিউজ করে, কিন্তু এখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে যে রোহিঙ্গা বাচ্চারা মারা যাচ্ছে তারা হেডলাইন হয় না। সো স্যাড’।

ওর কণ্ঠে বেদনার আভাস।

আমি প্রসঙ্গ কাটানোর জন্যই তাড়াতাড়ি বললাম, ‘কনগ্রাটস, অ্যান্ড আই জেলাস অব জেফরি। ভদ্রলোক দুনিয়ার সবচে সুন্দরী মেয়েটিকে অন্যদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন?’

পলিন হো হো করে হেসে উঠলো, ‘ইজ ইট?’

‘ইয়েস, আগেই বিয়েটা না করে ফেললে আমিও জেলাস হতাম। হাহাহাহা।’

বলেই থতমত খেয়ে গেলাম। আজই দেখা হওয়া একটি মেয়ের সাথে এ রসিকতা করাটা কি ঠিক হয়েছে? মৃদু কণ্ঠে বললাম, ‘প্লিজ পারডন।’

‘কেন?’ ওর গলায় বিস্ময়।

‘আমি বোধহয় লিমিট ক্রস করে ফেলেছি, কথাটা ঐভাবে বলা উচিত হয়নি।’

পলিন আবার হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘তোমরা এশিয়ানরা একটু লাজুক। সহজ হতে সময় নাও। তোমার সাথে আমার আজ দেখা হয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব তো ছ’মাসের পুরনো। আমরা পশ্চিমারা কিন্তু বন্ধুত্বের ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিই। এয়ারপোর্টে হাগ করার সময় দেখলাম তুমি কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছ। এটা ঠিক না। দেয়ার ইজ নো ফিজিক্যাল কেমেস্ট্রি। অনলি মেন্টাল কেমেস্ট্রি। ভালো বন্ধুত্ব এরকমই হয়, হওয়া উচিত। রিল্যাক্স সৈয়দ, আমরা সাতদিন একসাথে থাকব। এত রিজিড হয়ে থাকলে ব্যাপারটা জমবে না। ওহ! সরি, জেফরির সাথে এনগেজমেন্টের কথাটা তোমাকে বলিনি বলে। সময়ই ছিল না। কাজটা সেরেই এয়ারপোর্টে দৌড়াতে হয়েছে। আমার ইচ্ছে ছিল ফিরে গিয়ে করার, কিন্তু পাগলটা মানল না’। এখন ওর মুখে সলজ্জ হাসি।

আমার মনে হলো এত সুন্দর হাসি কি আমি আগে দেখেছি? মনে হয় না।

হাসতে হাসতে ও ব্যাগ থেকে বের করে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগালো। মেয়েটার মনে হয় এটা মুদ্রাদোষ।

প্রতি পাঁচ/সাত মিনিট পরপর লিপস্টিক লাগায়।

মনে হচ্ছে পাঁচ হাজার বছর আগে সুমেরীয় রানি পুরবীর আবিষ্কার করা এ জিনিসটি পলিনের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। ইরাকের ‘উর’ শহরে বসে অসাধারণ রূপসি এ রানি ভেবে রেখেছিলেন কয়েক হাজার বছর পরে তার কাছাকাছি সুন্দরী এক টেক্সান রমণীর ঠোঁট রাঙানোর জন্য জিনিসটি দরকার হবে।

আবার বনি ডাউনিং এর ‘পিকিউলিয়ার বিউটি’ নামের একটি বইতে পড়েছিলাম, কোনো কোনো মহিলা বিশ্বাস করেন, ঠোঁটে লিপস্টিক দিলে মুখ দিয়ে অশুভ আত্মা শরীরে প্রবেশ করতে পারে না। পলিন কি সে দলে পড়ে কি না আল্লাহ জানে। নয়তো এত ঘন ঘন লিপস্টিক দেয় কেন? ওই জিনিস আছেও মনে হয় ডজন ডজন! রীতিমতো ছোট্ট একটি কসমেটিকস বাক্সে থরে থরে সাজানো।

মেয়েটি মনে হয় থট রিডিং জানে। আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘বুঝলে, ছোটোবেলায় মা শুধু ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে দিতেন। তার ধারণা ছিল, এটা দিলে তার কন্যাকে পরির মতো লাগে। তারপর আমার নিজেরই এটা নিয়ে অবসেশন তৈরি হলো। ২০১৬ সালের অস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আমার লিপস্টিক খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে পনেরো মিনিট পরে শুরু হয়েছিল, হাহাহাহা। ফিফটিন মিনিটস মাইনাস জাস্ট ফর দিস কালারড পেন্সিল, হাহাহাহা।

আয়োজকদের ফোঁসফোঁস যদি দেখতে’।

এখন পরিষ্কার হলো, পলিন আসলেই লিপস্টিক অবসেশনে ভুগছে।

অতি সুন্দরীদের এ রকম অনেক সমস্যা থাকে। তাই ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না।

লাঞ্চ শেষ করে আমি বের হলাম ডিসি অফিসের উদ্দেশে। কিছু বাকি অফিসিয়াল ফরমালিটি সারতে হবে। পলিনকে বললাম, ‘তুমি রেস্ট নাও। আমার ফিরতে রাত হবে। তুমি ডিনার করে নিও’। ও মিষ্টি হেসে উত্তর দিল, ‘তুমি ভাবছ শুধু তুমিই কাজের, আমার অখণ্ড অবসর? মোটেও তা না। এখন হেড অফিসে রাজ্যের মেইল করতে হবে। ঠিক আছে, তুমি ঘুরে এসো, একসাথেই ডিনার করব। এত বেলা করে খেয়ে এখন আর সন্ধ্যা রাতে ডিনার পোষাবে না। তাছাড়া রোমে গেলে রোমান হতে হয়। তোমরা নাকি লেইট নাইট ডিনার করো, আমাকেও তাই করতে হবে। হোয়েন ইউ আর ইন রোম, বি আ রোমান। হাহাহাহা’।

সব কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে আমার প্রায় রাত ন’টা বেজে গেল।

বাংলোয় দেখি পলিন নেই।

অবাক হয়ে কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিল, ‘মেমসাব সাগরে ডুব দিতাছে’।

আমি দ্রুত বিচে গিয়ে দেখি মাঝ শুক্লপক্ষের দুর্বল চাঁদের আলোয় মেয়েটি পানিতে ভাসছে। ভঙ্গিতেই বোঝা যায় ওস্তাদ সাঁতারু।

দূরে দাঁড়িয়ে দুজন পুলিশ তার ওপর চোখ রাখছে।

আমি চিৎকার করে ডাকলাম, ‘পলিন, উঠে এসো। এ জায়গাটায় সমুদ্র পুরো সেইফ না। চোরা গর্ত থাকতে পারে। প্লিজÑ’

পলিন একবার হাত নেড়ে সাঁতরে দূরে চলে গেল, একটু পর ভাসতে ভাসতে আবার তীরে এসে ঠেকলো। এবার আমি জোর দিয়ে বললাম, ‘প্লিজ উঠে এসো। ভোরে নামতে পারবে। তাছাড়া নতুন জায়গা, ঠাণ্ডা লেগে যাবে’।

অপূর্ব এক জলপরির ভঙ্গিতে পানি মাড়িয়ে হেঁটে আসতে আসতে ও বলল, ‘আলাস্কায় স্কি করা আমার শখ। আর যাই হোক ঠান্ডা আমাকে কাবু করতে পারে না। বরং আমার চামড়ায় ধাক্কা খেয়ে নিজেই ঠান্ডা বাধায়। হাহাহাহা। চলো যাই, লেটস হ্যাভ ডিনার’।

মরা চাঁদের আলোয় তার চেহারায় আনন্দের আভা নাচছে। সে আভায় যে কোনো পুরুষ খুন হয়ে যেতে পারে।

বাংলোয় পৌঁছে পলিন রুম থেকে বেরুতে অনেকক্ষণ সময় নিল। তারপর নিচে ডাইনিং এ এসে বলল, ‘স্যরি, জেফরি ফোন করেছিল। এমন পাগল ছাড়তেই চায় না, তোমাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখলাম’।

আমি হেসে বললাম, ‘ইটস ওকে। আমার বরং বেচারার জন্যই খারাপ লাগছে। কোথায় বাগ‌দত্তাকে নিয়ে ম্যানহাটনের ‘ফোর সিজন’ এ ডিনার করবে তা না, বেচারা বাড়িতে একা সিলিং এর দিকে মন খারাপ করে তাকিয়ে আছে। হাহাহাহা’।

পলিন চোখ পাকিয়ে বলল, ‘ইউ নটি বয়। তোমার ওয়াইফও তাই করছে নিশ্চয়’।

আমি হাসতে হাসতে জবাব দিলাম, ‘বাড়িতে বাচ্চা সামলাতে সামলাতে আমাকে মিস করার সময় পাবে না, বাট স্টিল উই ডু হ্যাভ ভেরি গুড কেমেস্ট্রি। হাহাহাহা’।

‘তোমাদের এ ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগে’।

‘কোন ব্যাপার?’

বন্ডেজের ব্যাপারটা। আমাদের ওখানে কত ছোটখাটো ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যায়। বিশ্বাস করতে পারো, শুধু শীতে বাড়িতে আঁকা পড়ে ‘কেবিন ফিভার’ নামে তীব্র হতাশায় আক্রান্ত হয়ে অনেক বিয়ে ভেঙে যায়’।

‘মাঝে মাঝে কী এ স্বাধীনতা ভালো না? ভালোবাসা উবে গেলে এক ছাদের নিচে থাকা কি কষ্টকর নয়?’

আমি স্যুপের বাটি টেনে নিতে নিতে বললাম।

‘হয়তো কষ্টকর। কিন্তু আমার বাচ্চাদের জন্য খুব খারাপ লাগে। ব্রোকেন ফ্যামিলির বাচ্চাদের অনেক বেদনার মধ্যে যেতে হয়। আমি নিজেই তার সাক্ষী। আমার মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবা আলাদা হয়ে যান। তারপর কত ঝামেলা। মা চাইল্ড কেয়ারের জন্য কেইস করলেন। কোর্টে ছোটাছুটি। কী অনিশ্চয়তা! ভেরি ড্যামেজিং ফর চাইল্ড সাইকোলজি’।

আমি তাড়াতাড়ি কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, ‘ইউ আর লুকিং ভেরি বিউটিফুল।’

‘থ্যাংকস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট’।

ডিনার শেষে পলিন জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কী করবে?’

‘ঘুমাব, ক্লান্তিতে চোখ মুদে আসছে।’

‘বলো কী! নাইট ইজ স্টিল ইয়াং। আমি বারান্দায় বসে সমুদ্রের ভাষা শুনব। মাঝরাতে সমুদ্র অন্য ভাষায় কথা বলে। মনে হয় গান গাইছে।’

এ মেয়ে বলে কী! প্রায় ছাব্বিশ ঘণ্টা জার্নি করে বাংলাদেশে এসেছে। তারপর প্রায় দু’ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে। এখন বলছে রাত জেগে সাগরের ভাষা শুনবে!

আমি বললাম, ‘না, স্যরি, আমাকে ঘুমাতে হবে। তুমি একাই যাও।’

‘ওকে, তবে গ্যারান্টি দিচ্ছি এত সুন্দর কোন মেয়ের সাথে মধ্যরাতে সাগর তীরে বসে থাকার সুযোগ আর কখনও পাবে না।’

আমি হাসতে হাসতে দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম।

পরদিন ঘুম ভাঙল সকাল আটটায়। সর্বনাশ! ন’টায় মিটিং! এর মধ্যে ফ্রেশ হওয়া, নাস্তা, সব করতে হবে! কোনো রকমে গোসল করে নিচে নামলাম। আমার টেনশন পলিন উঠেছে কিনা? ও তো মাঝরাত অব্দি জেগেছিল।

ডাইনিংয়ে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি ও বিশাল এক মগ কফি নিয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে বলল, ‘মর্নিং, সৈয়দ’।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তুমি কখন উঠেছ?’

সে হাসতে হাসতে বলল, ‘সমুদ্রের তীরে বাস করে ভোরের ভার্জিন সূর্য না দেখা এক ধরনের অপরাধ মিস্টার। এখন তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করো। আমি করে ফেলেছি, তোমাকে লেফটওভার খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। হাহাহা’।

মেয়েটা এত সরল! মুহূর্তেই আপন মনে হয়।

এরপর সারাদিন বিভিন্ন সরকারি অফিসে মিটিং। পলিন কোথায় কোথায় যাবে, কার সাথে কথা বলবে সব ঠিক করা হলো। ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ নিয়ে আলোচনা করা হলো। আমার একটু অবাক লাগছিল, এগুলো তো সব আগেই ঠিক করা, তাহলে আবার এত কথা আবার বলার কী দরকার? কেউ কেউ আবার কার কত বড় দায়িত্ব, কত বড় এলাকা তাকে দেখতে হয় তার ফিরস্তি ফেঁদে কয়েক ঘণ্টা খেয়ে দিলেন। এরপর সবার ছবি তোলার আবদার।

আফটার পলিন এমারসন, হলিউডের অভিনেত্রী তার সাথে একটি সেলফি ফেসবুকে দিতে হবে না!

তবে পলিন বিরক্ত হলেও প্রকাশ করছে না, মুখে হাসি ধরে রেখেছে।

দিনভর এসব করে ঠিক হলো, পরদিন আমরা যাব কুতুবপালং ক্যাম্পে। এরপর বাকি চারটি মেগা ক্যাম্পেও যাওয়া হবে। সাথে প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। সিকিউরিটি থাকবে। পলিন সব মেনে নিল, শুধু শর্ত দিল, প্রতিটা ক্যাম্পে সে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সাথে কিছুক্ষণ একা কথা বলবে। প্রশাসন এতে প্রথমে তীব্র প্রতিবাদ করল। একা মিটিং করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। পলিন হাসিমুখে আপত্তি শুনল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সৈয়দ, ইমার্জেন্সি হেলিকপ্টার রাইড পাওয়া যাবে? রেন্টেড হেলিকপ্টার?’

আমি এবং অন্যরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’

‘না, আমি তো তোমাদের সব শর্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সাথে আমার একা কথা বলতেই হবে।

দুনিয়ার কোথাও শরণার্থীরা আশ্রয়দাতাদের সামনে সবকিছু বলে না। তাদের একান্ত কিছু কথা থাকে তা অন্যদের সামনে বলার সাহস তাদের থাকে না। তাই আমার একাকী তাদের কথা শুনতেই হবে। এটা আমরা আগেই বলে দিয়েছিলাম। তা যখন হচ্ছে না, তখন দ্রুত ফিরে যাওয়াই ভালো। সমস্যা হচ্ছে আমার সাথে মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবও ফিরে যাবে। কী আর করা।

তবে টাকাটা ফেরত যাওয়ার জন্য কিন্তু তোমরা দায়ী, আমি নই’।

হঠাৎ করেই তার চেহারায় বুনো কাঠিন্য ফুটে উঠেছে।

এরপর স্থানীয়দের আপত্তি উবে গেল। আপত্তিটা করাই উচিত হয়নি। আসলেই পলিনের টার্মস অব রেফারেন্সে এটা বলা ছিল। শুধু শুধু ক্ষমতা দেখানোর জন্যই ঝামেলা করা হয়েছিল। যেমন ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে আমরা চেয়ারের পিঠে ময়লা তোয়ালে ঝুলিয়ে রাখি অনেকটা সেরকম।

অবশেষে পলিনের শর্তই মেনে নেওয়া হলো।

গাড়িতে উঠে বললাম, ‘তুমি যে এত জেদি তা কিন্তু আগে বুঝিনি’।

ও হাসতে হাসতে বলল, ‘টাফ না হলে মেয়েরা দুনিয়ায় কোথাও কাজ করে শান্তি পায় না’। তারপর কিছুটা রহস্যমাখা হাসি হেসে বলল, ‘সবাই রাতের নির্জনতায় একটি মেয়ের সাথে সাঁতার না কাটার মতো ব্রহ্মচারী নয়’।

আমি কিছু না বোঝার ভান করে চুপ করে রইলাম।

পরদিন আমরা গেলাম কুতুবপালং ক্যাম্পে। ওখানে গিয়ে দেশহারা মানুষগুলোর চেহারা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। আহ! কী অবস্থায় পড়লে কিছু মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে আরেক দেশের ক্যাম্পে আশ্রয় নেন তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।

পলিন ঘুরে ঘুরে ক্যাম্পের অনেকের সাথে কথা বলল। আমি করছি অনুবাদকের কাজ। কারণ রোহিঙ্গাদের ভাষার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অনেক মিল। আমাদের সাথে স্থানীয় চেয়ারম্যান সাহেব আছে। তিনিও সাহায্য করছেন। শফিক নামের প্রশাসনের তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটও দেখলাম খুবই নিবেদিত।

ক্যাম্পের বাচ্চারা আমাদের পেছন পেছন ঘুরছে। কারণ চকোলেট। পলিন তার ব্যাকপ্যাক ভর্তি ও জিনিস এনেছে। সেগুলো বাচ্চাদের মাঝে মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। একটু পর দেখি ওর কাঁধে তিন চার বছরের একটি শিশু খিলখিল করে হাসছে। এরপর শুরু হল বাচ্চাদের কোল বদল। সবাই মেম সাহেবের কোলে উঠতে চায়। মাঝখানে ম্যাজিস্ট্রেট ছেলেটি একবার আমতা আমতা করে বলল, ‘বাচ্চাগুলো বিভিন্ন রোগে ভুগছে, ওদের কোলে নেওয়াটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না’। আমিও তাই ভাবছিলাম।

পলিনকে ব্যাপারটি বলতেই ও হেসে উত্তর দিল, ‘যার কথা বলছি আমি তার পায়ের নখেরও যোগ্য নই। কিন্তু বলো তো, সারাজীবন কুষ্ঠরোগীদের সেবা করে মাদার তেরেসার কি ঐ রোগ হয়েছিল? হয়নি। ভালোবাসতে হলে ঝুঁকি নিতে হয়, তুমি যদি ফুলের আসল গন্ধ নিতে চাও, তবে কাদা মাড়িয়ে বাগানে নামতে হবে। দোতলার বারান্দায় বসে ঐ গন্ধ তুমি পাবে না। লাভ ম্যাটারস হিয়ার, ডিয়ার ফ্রেন্ড’।

বলেই সে আরেকটি বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে উঁচু স্বরে গান ধরল,

‘ওল্ড ম্যাকডোনাল্ড হ্যাড আ ফার্মÑ’

দেশহারা, ঘুমানোর সময় মায়ের মধুর কণ্ঠে ছেলে ভুলানো ছড়া যারা কোনদিন শোনেনি, সেসব বাচ্চারা অতি পরিচিত এ গানের পরের লাইন জানে না। তাই আমিই হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে উঠলাম ‘ইয়া ইয়া ও’।

বাচ্চাগুলো কী বুঝল কে জানে, তারা লাফাতে লাফাতে গলা ফাটাল, ‘ও ও ও’।

আহা! জীবনের সকল আনন্দ-বঞ্চিত শিশুর দল!

পৃথিবীর সকল যুদ্ধ, জাতি নিধনের প্রথম শিকার হয় নারী আর শিশু। অথচ এসবে তাদের কোন ভূমিকাই থাকে না।

মজার ব্যাপার হল বাচ্চা কাঁধে নাচতে নাচতেই পলিন ব্যাগ থেকে লিপস্টিক বের করে ঠোঁটে বুলাচ্ছে। আশ্চর্য!

হঠাৎ লিপস্টিকটি হড়কে গিয়ে হাত থেকে ছুটে গেল, কিন্তু তা মাটিতে পড়ার আগেই আমি দ্রুত হাত বাড়িয়ে তা লুফে নিলাম। তারপর তা ইচ্ছে করে কয়েকবার উপরে ছুড়ে দিয়ে আবার খপ করে ক্যাচ ধরে তা পলিনকে ফেরত দিলাম।

সে হাসতে হাসতে বলল, ‘গুড গ্রাব’। তারপর আমার কাছ থেকে হালকা স্ট্রবেরি রঙের জিনিসটি আবার ঠোঁটে বুলাতে বুলাতে বলল, ‘ভাগ্যিস মাটিতে পড়েনি, তাহলে বরবাদ হয়ে যেত, তাই বলে ভেব না আমার ঠোঁটের রং মোছার সুযোগ তোমাকে দেওয়া হবে। দ্যাট ইজ ওনলি ফর জেফরি। হাহাহা’।

আমার মনে হল হাসলে তার গালে যে টোল পড়ে তার বিনিময়ে একটি সমুদ্রের অধিকার অনায়াসে ছেড়ে দেওয়া যায়।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক এসব করার পর পলিন বলল, ‘এবার আমি এ ক্যাম্পের যারা ওদের মুরব্বি তাদের সাথে কথা বলব। তবে অবশ্যই কয়েকজন মহিলা থাকতে হবে’।

এভাবে পরপর তিন দিন কেটে গেল। এর মধ্যে আরও তিনটি ক্যাম্পও আমাদের ঘুরে দেখা হলো। বাকি রইল আরেকটি। প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পের একই অবস্থা। লক্ষ লক্ষ দেশান্তরীর নির্লিপ্ত চোখ। মানুষের নির্মমতায় এদের চোখের ভাষা হারিয়ে গেছে। পলিন সব জায়গায় যাদের সাথে দেখা হয়েছে তাদের সবার সাথে কথা বলেছে। নেতাদের সাথে একা মিটিং করেছে। বাচ্চাদের কাঁধে নিয়ে ‘ওল্ড ম্যাকডোনাল্ড হ্যাড আ ফার্ম, ইয়া ইয়া ও’ গেয়ে আনন্দ করেছে। আবার ফিরে আসার সময় গাড়িতে দেখেছি তার তীব্র বিষণ্ন চোখ।

সে চোখে বঙ্গোপসাগরের রুদ্র ঝড় খেলা করছে। যে ঝড় গ্রামের সবচেয়ে বড়ো বটগাছটিকেও উপড়ে ফেলতে পারে। মনে হচ্ছে, ক্যাম্পের মানুষগুলোকে যারা আশ্রয়হীন করেছে তাদের সে উন্মত্ত ক্রোধে ভাসিয়ে নেবে। এ সময় সে কোনো কথা বলেনি, মাঝে মাঝে অন্যদিকে তাকিয়ে কান্না লুকিয়েছে। শুধু একদিন মৃদু স্বরে বলল, ‘আই উইশ আই কিল দেম, বার্মিজ বাস্টার্ডসÑ’। তারপর আবার চুপ।

প্রতিদিন তার এ বিষণ্নতা কাটতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। প্রথম দিনের সেই বুনো উদ্দাম ভাব কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এসেই রুমে ঢুকে গেছে। বের হয়েছে সন্ধ্যায়। শুধু এসময় সাঁতার কাটার সময় তার মধ্যে কিছুটা প্রাণ ফিরে এসেছে। কিন্তু দ্বিতীয় দিনেই দেখলাম মেয়েটি ভয়াবহ অ্যালকোহলিক। সাথে এনেছে প্রায় আট দশটি মদের বোতল। সবগুলোই ‘রয়েল ব্লু’ হুইস্কি। অভিজ্ঞতা থেকে জানি এগুলোর এক বোতলের দাম দিয়ে আমাদের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় এক মাসের বাজেট হয়ে যায়। ওর সবকিছুর মধ্যে এটা আমার ভালো লাগে না। তবে মেয়েটা মাতাল তেমন হয় না। শুধু মাঝে মাঝে খিল খিল করে হাসে, গান গায়। তার প্রিয় গান হচ্ছে ‘বনি এম‘ এর ‘বাই দ্য রিভারস অফ ব্যাবিলন’। প্রায় মৃদু স্বরে গায় ‘বাই দ্য রিভারস অফ ব্যাবিলন, দেয়ার উই স্যাট ডাউন, ইয়ে ইয়া উই ওয়েপ্ট হোয়েন উই রিমেমবার জায়ন’।

ওর গলায় কাজ আছে, যখন ‘ওয়েপ্ট হোয়েন উই রিমেমবার জায়ন’ লাইনটা গায় তখন মনে হয় ভেতর থেকে কান্না ছিটকে আসছে। কিছুটা মূল সুর থেকে ভিন্ন। তার কণ্ঠে বেদনার ভাব অনেক বেশি প্রবল। আমার মনে হয় মাত্র মাইলখানেকের হাঁটা দূরত্বে লক্ষ লক্ষ দেশান্তরী রোহিঙ্গার বেদনা বুকে ধারণ করে গাওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত গান আর হয় না।

আহা! কী সুন্দর ফুটে ওঠে মাতৃভূমি হারানোর কষ্ট।

‘হোয়েন দ্য উইকড

ক্যারিড আস এয়ো ইন ক্যাপটিভিটি,

রিকোয়ার্ড ফ্রম আস আ সং।

নাউ হাউ শ্যাল উই সিং

দা লর্ড’স সঙ

ইন আ স্ট্রেঞ্জ ল্যান্ড?’

‘যখন দু’আত্মা আমাদের বেঁধেছে শিকলে,

আর শুনতে চাইছে আমাদের গান,

আমরা কীভাবে এ অপরিচিত দেশে ঈশ্বরের গান গাই?’

পলিন যখন রাতের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে একমনে গায় তখন মনে হয় ১৯৭০ সালে ব্রেন্ট ডো আর ট্রেভর ম্যাকনাটন রোহিঙ্গাদের নিয়েই গানটি লিখেছিলেন।

চতুর্থ দিন আমার শরীর খারাপ করল। জ্বর জ্বর ভাব। মনে হয় দীর্ঘ সময় রাতে সমুদ্রের তীরে নভেম্বরের ঠান্ডায় বসে থাকার ফল। আমি পলিনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজ যদি আমি না যাই তোমার কী সমস্যা হবে? অবশ্য তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন, আর স্থানীয় চেয়ারম্যান তো আছেনই’।

পলিন জানালো তার কোন সমস্যাই হবে না, বরং আমার রেস্ট নেওয়াই উচিত। তবে পরিচিত দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, ‘তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত জ্বরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো। তারপর তাকে বিদায় দেবে। রাতে পুরুষ মানুষের অসুস্থতা মানায় না। হাহাহাহা। ক্লিয়ার, মিস্টার ড্যানিয়েল ক্রেইগ’।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ড্যানিয়েল ক্রেইগ?’

‘হাহাহাহা। গায়ের রঙ মিলালে তোমাকে বরং ড্যানজেল ওয়াশিংটন ডাকা উচিত। কিন্তু আমার যে ক্রেইগকে ভালো লাগে। জেমস বন্ডের চরিত্রে ওর চাইতে বেশি আর কাউকে মানিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। আমরা ভালো বন্ধু অ্যান্ড আই গ্যারান্টি ছবিতে তোমরা ওকে যেরকম দেখ বাস্তবে তার চেয়ে সে অনেক বেশি এমেইজিং অ্যান্ড হি নোজ দা আর্টÑ হাহাহাহাহা। সেদিক দিয়ে তুমি হচ্ছো নিরামিষ। গেরুয়া পরা হিউস্টন মেমোরিয়াল পার্কে কীর্তন গাওয়া সন্ন্যাসী। হাহাহাহা।’

‘তুমি কীর্তন শুনেছ?’

‘আমি একজন অভিনেত্রী। ফ্লপ মারলেও অভিনেত্রী। বলা যায় না আবার পর্দা ফাটিয়ে ফেরতও আসতে পারি। আমাদের সব জানতে হয় মিস্টার ড্যানিয়েলÑ’ কথা শেষ না করেই সে লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।

সেদিন ফিরে আসার পরও একই চেহারা। সকালের উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে। চোখের তারায় ঘন কান্না। নিঃশ্বাসে বেদনা।

রাতে ডিনারের আগে ‘রয়্যাল ব্লু’ নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকা। বনি এম এর বিষণ্ন গান।

এভাবেই কেটে গেল ছয়টি দিন। পরদিন ও চলে যাবে।

আগের দিন সন্ধ্যায় আমরা খোলা বিচে বসলাম। একদম সমুদ্রের কাছে। ঢেউ এসে মাঝে মাঝে পা ছুঁয়ে যাওয়ার অবস্থা। সেখানে আলাদা টেবিল বসানো হয়েছে। তার উপর জ্বলছে দুটো হারিকেন। বাতাসের ধাক্কায় মাঝে মাঝে চিমনির ভেতরের শিখা কাঁপছে। মাথার ওপর পূর্ণ চাঁদ। তার আলোয় পুরো বঙ্গোপসাগর চকচক করছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন সাগরের জলে পারদ ছড়িয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে ফসফরাস।

খাবার মেনু কিন্তু সিম্পল। আমি পড়েছি এক ‘ফুড ফোবিয়াক’ এর কবলে। সালাদ, রূপচাঁদা ভাজা, আর আমার জোরাজুরিতে দুটো মাঝারি সাইজের লবস্টার। পলিন এর মধ্যে যোগ করেছে ভিন্টেজ পোর্ট ওয়াইন ‘টেইলর’। বিশ বছরের পুরানো। ওপেনার দিয়ে কর্ক খুলতে খুলতে সে বলল, ‘টু সেলিব্রেইট আওয়ার ফ্রেন্ডশিপ’।

তারপর বোতলের কর্ক হুশ করে ওপরে উড়ে গেল, ফোঁস করে ভেতরের তরল বুদবুদ হয়ে লাফ দিল।

পলিন দুটো গ্লাসে তা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘ভয় নেই, মাতাল হবে না। এটাকে ‘ডেজার্ট’ ওয়াইনও বলা হয়। অ্যালকোহল নেই বললেই চলে। ব্রিটেনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট এটা আর্থাইটিসের চিকিৎসার জন্য খেতেন। সো ডোন্ট ওরি, ডিয়ার হ্যান্ডসাম’।

আজ তাকে উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। সম্ভবত সাতদিনের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চাপ শেষ হতে যাচ্ছে বলে।

‘বনি এম’ এর ‘বাই দা রিভার অব ব্যাবিলন’ এর বদলে আজ নিজের মনে গাইছে ‘ডরিস বে’ এর গান,

We were sailing along on Moonlight Bay

We could hear the voices ringing

They seemed to say,  You have stolen her heart

‘আমরা উড়িয়েছি পাল জ্যোৎস্নার স্রোতে

আমরা শুনছি রিনিঝিনি নূপুর ধ্বনি।

এ ঝংকার বলছে,

তুমি তার হৃদয় লুটে নিয়েছো’

আমার পুরো দৃশ্যটা অপার্থিব মনে হচ্ছে। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সমুদ্রের তীরে হারিকেনের আলোয় দুনিয়ার সেরা সুন্দরী একটি মেয়ে কী আকুল কণ্ঠে শতাব্দী সেরা একটি প্রেমের গান গাইছে!

মনে হচ্ছে, এ দৃশ্য এ গ্রহের নয়, অন্য কোথাও এটা অভিনীত হচ্ছে।

গান গাইতে গাইতেই পলিন ব্যাগ থেকে লিপস্টিক নিয়ে ঠোঁটে বুলাতে লাগল। আমি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই রাতেও লিপস্টিক! বোঝা যাবে?’

‘যারা বোঝে তারা ঠিকই বোঝে, কীর্তন গাওয়া গেরুয়া সন্ন্যাসীই শুধু বোঝে না।’

‘এ লিপস্টিক নিয়ে কিছু কথা ছিল পলিন, বলব?’

‘এটা নিয়ে কী কথা?’ অবাক কণ্ঠে ও জিজ্ঞেস করল।

‘তোমার মনে আছে, প্রথম যেদিন তুমি কুতুবপালং ক্যাম্পে গেলে তোমার হাত থেকে লিপস্টিক ছুটে গিয়েছিল। আমি তা লুফে নিয়েছিলাম?’

‘কেন থাকবে না? ইট ওয়াজ আ গুড ক্যাচ।’

‘তারপর আমি তা তোমার হাতে না দিয়ে কয়েকবার ওপরে ছুড়ে আবার লুফে নিয়েছিলাম?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?’

‘সেটা করার কারণ ছিল।’

‘কী কারণ?’

‘নরমালি ক্যাপ ছাড়া একটি লিপস্টিকের ওজন হয় সর্বোচ্চ চার দশমিক তিন গ্রাম। কিন্তু তোমারটা প্রথম হাতে নিয়েই মনে হলো এর ওজন বেশি। কমপক্ষে আট গ্রাম। কিন্তু তা তো হওয়ার কথা না। দুনিয়ার কোনো কোম্পানিই এত বেশি ওজনের লিপস্টিক বানায় না। তাই তা তোমাকে না দিয়ে আরও তিনবার ওপরে ছুড়ে ট্রাই করলাম। প্রতিবারই কনফার্ম হলাম সেটার ওজন নরমাল লিপস্টিকের চেয়ে বেশি। বাট হোয়াই?

উত্তরটা আমিই দেই পলিন, কারণ তোমার লিপস্টিকের কনটেইনারে রঙ ছাড়া আরও কিছু আছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমরা শান্তিতে নেই। অনেকগুলো দেশি বিদেশি চক্র এটা নিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। আমরা পাল্টা মাথা খাটাচ্ছি তা ঠেকানোর। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম তোমার ঠোঁট রাঙানোর ওই বস্তুটি আমার পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সেজন্যই সেদিন আমি জ্বরের ভান করে তোমার সাথে না গিয়ে এখানে রয়ে গিয়েছিলাম। আই অ্যাম স্যরি, পলিন, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ডুপ্লিকেট চাবি ব্যবহার করে তোমার রুমে ঢুকেছি। তারপর তোমার কসমেটিক বাক্সের প্রতিটা লিপস্টিক পরীক্ষা করেছি। মোট এগারোটি। আরেকটি পরীক্ষা করতে পারিনি কারণ সেটা তোমার সাথে ছিল। আমি সেগুলোতে কী পেয়েছি জানতে চাও?’

‘রঙ ছাড়া আর কিছু পাওয়ার কথা না। তবে তুমি যে গোপনে মেয়েদের রুমে ঢুকার মতো পারভার্ট তা আগে বুঝিনি।’ তার কণ্ঠে শ্লে­ষ।

আমি তা এড়িয়ে গিয়ে বললাম, ‘এগারোটি লিপস্টিকে এগারোটি ট্রপেল ক্যামেরা। সত্তর দশকে আমেরিকানরা, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে স্পাইরা ব্যবহার করার জন্য আধা ইঞ্চির মতো ছোটো সাইজের এ ক্যামেরা বানিয়েছিল। এ ছোট্ট জায়গার মধ্যেই জায়গা করে নিয়েছিল লেন্স, ফিল্ম এবং শাটার। মাত্র এগারো ইঞ্চি দূর থেকে এ ক্যামেরা অটোমেটিকভাবে একশটি পর্যন্ত ছবি তুলতে পারত। এর স্ট্যান্ডার্ড ‘অপারেশন মেথড’ ছিল ছেলেরা তাদের ফাউন্টেইন কলম আর মেয়েরা তাদের লিপস্টিক কনটেইনারে লুকিয়ে রাখবে। রেগুলার সাইজের তিন ইঞ্চি লম্বা লিপস্টিকের মধ্যে এটি লুকিয়ে রাখা কোনো ব্যাপার না। ছবি তুলতে হলে কলম বা লিপস্টিকটি এগারো ইঞ্চি দূর থেকে তাক করলেই হল। সি আই এ’র বিখ্যাত রাশিয়ান এজেন্ট ‘তোলকাচেভ’ এ ক্যামেরা ব্যবহার করেই নিজের দেশের সব সামরিক সিক্রেট আমেরিকানদের কাছে পাচার করেছিলেন। এজন্যই তাকে বলা হয় ‘বিলিয়ন ডলার স্পাই’। তোমার ক্যামেরাগুলো অবশ্য তোলকাচেভের চাইতে অনেক অ্যাডভান্সড। অনেক বেশি অ্যাফিশিয়েন্ট। এসব ক্যামেরার ফিল্মে আমি কী পেয়েছি তুমি শুনতে চাও?’

পলিন কোন কথা বলছে না। একমনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে অসীম শূন্যতা।

আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম, ‘কেন? পলিন, কেন?’

পলিন চুপ করে আছে। তার চোখ নিচের দিকে, যেন পায়ের নখ দেখছে।

আমার গলা বেয়ে উঠে আসছে তীব্র হতাশা, ‘আমি তোমার সব মাইক্রোফিল্ম দেখেছি। আমার কাছে ওগুলো পড়ার জন্য রিডার আছে। রোহিঙ্গা নেতাদের সাথে তোমার একাকী মিটিং এ তাদের দেওয়া প্ল্যান এবং ম্যাপও আমার কাছে আছে’। বলতে বলতে আমি তার দিকে ঝুঁকে তীব্র কণ্ঠে বললাম, ‘পলিন, আমার এ ছোট্ট দেশের আর্থিক সঙ্গতি নেই, তারপরও পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো শরণার্থী দলকে আমরা পরম মায়ায় আশ্রয় দিয়েছি। সেটা কি আমাদের অপরাধ? নয়তো কেন তোমরা তাদের দিয়ে আমার মাতৃভূমিকে খণ্ড খণ্ড করে আলাদা ‘আরাকান রাষ্ট্র’ করতে চাও? কেন?

তুমি কি জানো এ দেশটিকে মুক্ত করার জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশ হচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কবর পলিন। তিন মিলিয়ন মানুষের কবর। তাহলে কেন তোমরা এ গণকবরকে নিয়ে লেগেছ? ‘বনি এম’ এর গাওয়া তোমার প্রিয় গানে বর্ণিত ‘ব্যাবিলন’ শহর যেমন পবিত্র, ঠিক তেমনি এই ‘বাংলাদেশ’ আমাদের কাছে অতি পবিত্র। এই যে বঙ্গোপসাগর দেখছ, তা ব্যাবিলনের নদী কিংবা সমুদ্রের চাইতে কম পবিত্র নয়। অ্যান্ড নাউ উই আর সিটিং বাই অ্যানাদার রিভার অব ব্যাবিলন, পলিন। তাহলে কেন তোমরা রোহিঙ্গাদের আমাদের পেছনে লাগিয়ে দিচ্ছ? তাদের যে মায়া আমরা দেখিয়েছি, তার বিনিময়ে এটা কি আমাদের প্রাপ্য ছিল? বলো ছিল? তাহলে কেন, কেন?’

পলিন কোন কথা বলছে না। সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।

অনেকক্ষণ পর সে মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘আসলে তুমি কে সৈয়দ?’

‘উই আর ইন দা দ্য সেইম বোট পলিন। এসপিওনাজ।’

‘ও বুঝেছি, ড্যানিয়েল ক্রেইগ। জেমস বন্ড, জিরো জিরো সেভেন। তা তোমাদের দেশে স্পাইং এর শাস্তি কী? ফায়ারিং স্কোয়াড না ফাঁসি।’

তার কণ্ঠে ভেজা বেদনা।

‘সে সিদ্ধান্ত আদালতের। তবে তুমি অভিনেত্রী হিসেবে খুব ভালো। রোহিঙ্গাদের জন্য বেদনার ছাপটা আসলেই সত্যি মনে হচ্ছিল। হয়তো সুযোগ পেলে আবার পর্দা ফাটিয়ে হলিউডে ফেরত আসতে পারতে।’

‘এসপিওনাজে ‘বেদনা’ নিষিদ্ধ নয়, সৈয়দ। তুমি ভালো করেই জানো এজেন্টরা রিমোট কন্ট্রোলে চলে এবং সে রিমোট থাকে তার হ্যান্ডলারের হাতে। কিন্তু সেটি সব নিয়ন্ত্রণ করলেও বুকের চাপা কষ্টকে নিয়ন্ত্রণ কর‍তে পারে না।’

‘সমস্যা হচ্ছে, সে বেদনা আমাদের প্রায় একশ ষাট মিলিয়ন মানুষের বিপক্ষে গেছে। দে ডোন্ট ডিজার্ভ ইট, পলিন।’

আবার চুপচাপ। সমুদ্র মাঝে মাঝে জলের গন্ধ নিয়ে আছড়ে পড়ছে। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় হ্যারিকেনের আলো দপ করে উঠছে, তাতে ঝলসে উঠছে পলিনের হীরের আংটি।

হঠাৎ সে হাতটি এগিয়ে এলো আমার ঠোঁটের দিকে, সেখানে আঙুল বুলানোর ভঙ্গিতে, তারপর তা এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে নিল, প্রায় আর্তস্বরে বলল, নো আই কান্ট ডু দ্যাট, নোওওÑ বলতে বলতে ঝট করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনামিকায় পরা হীরের আংটি নিজের ঠোঁটে নিয়ে তা চুষতে লাগল।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

তারপরই পলিন নামের মেয়েটি চেয়ার থেকে ধড়াম করে মাটিতে পড়ে গেল। তার গাল বেয়ে ফেনা বেরুচ্ছে।

সায়ানাইড।

ধরা পড়ার পর স্পাইদের আত্মহত্যার অতি প্রাচীন পদ্ধতি।

আমি চমকে উঠে লুটিয়ে পড়া মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। যে ব্যাপারটা প্রথম মাথায় ধাক্কা দিল, তা হলো, মেয়েটি শেষ মুহূর্তে আমার ঠোঁট থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে আমাকে এক ইঞ্চির জন্য মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে গেছে। আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত কেন সে বদলাল সে প্রশ্ন মগজে নিয়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। তার চোখগুলো বিস্ফারিত। যেন অবাক চোখে উন্মত্ত যৌবনে ফেটে পড়া চাঁদ দেখছে। বাতাসে ঝাপটা মারছে তার পারফিউমের বুনো সুবাস।

আমি হাঁটু গেড়ে বসে ওর চোখের পাতা বুঁজিয়ে দিলাম।

তারপর বাংলোর দিকে ফিরতি পথ ধরলাম। দ্রুত হেড অফিসকে সব জানাতে হবে। এরপরের কাজ তাদের।

কিছুদূর এসে আবার পেছন ফিরে তাকালাম।

সমুদ্রের ব্যাকগ্রাউন্ডে শুয়ে আছে পলিন।

‘আ লোনলি উইম্যান অন দ্য বিচ।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares