সদানন্দপুর প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক তোফাজ্জল মুন্সি খুব নির্ভারভাবে বললেন, ‘জি, ওর একমাত্র শাস্তি হলো চোখ তুলে ফেলা।’

‘আমিও আপনার সঙ্গে একমত।’ আঙ্গুল দিয়ে মাড়ির দাঁতের ফাঁক থেকে চাবানো পান বের করলেন স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ। আঙ্গুলসহ সেই চাবানো পান আবার মুখের ভেতর ঢুকিয়ে তিনি বললেন, ‘এ ছাড়া তো অন্য কোনো উপায় দেখছি না।’

‘চোখ কিন্তু দুটোই তুলতে হবে।’ পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারি কথাটা বলেই থু করে থুতু ফেললেন এক দলা, ‘হারামজাদার সাহস কত! এর আগে দু-দুবার একই কাজ করেছে। ওই দুইবারই মাফ চেয়েছে, মাফও করে দেওয়া হয়েছে। আর না। এবার দিয়ে তিন তিনবার কাফনের কাপড় চুরি করেছে। আরে চুরি করার জিনিসের কী কোনো অভাব আছে এ দুনিয়ায়! তা না, কবর খুঁড়ে মৃতের শরীর থেকে কাফনের কাপড় চুরি!’

‘আগের দুইবার না হয় কোনো রকম মাফ করা গেছে। আগের দুজন পুরুষ ছিল, এবার কিনা একটা মেয়ে মানুষের শরীর থেকে কাপড় খুলে এনেছে। ছিঃ, বেইজ্জতির একটা সীমা আছে!’ তোফাজ্জল মুন্সী নাক আর কপাল এক সঙ্গে কুঁচকে ফেললেন।

হারেস ব্যাপারি আবার থুতু ফেললেন এক দলা। গ্রামের অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছেন চারপাশে। তিনি তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আশা করি আমরা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা সবাই মেনে নিয়েছেন। তবু কারও যদি কোনো কথা থাকে, তিনি প্রথমে হাত তুলবেন। আমরা অনুমতি দিলে কথা বলতে পারবেন তিনি।’

সামনের দিক থেকে হাত তুললেন একজন। তার দিকে তাকিয়ে হারেস ব্যাপারি খ্যাক খ্যাক করে বললেন, ‘আপনাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে না। এর আগের দুইবার আপনার কথা শোনা হয়েছে, আপনার ছেলেকেও মাফ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাপ হিসেবে আপনি ব্যর্থ, আপনার ছেলেকে ঠিক করতে পারেননি আপনি। শাস্তি এবার তাকে পেতেই হবে।’ লোকটি তবু হাতটা উঁচু করে রইলেন। হারেস ব্যাপারি আগের চেয়ে বেশি শব্দে খ্যাক খ্যাক করে বললেন, ‘আমার কথা আপনার কানে যায় নাই? হাত নামান মিয়া।’

‘আজ জুমবার দিন, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।’ মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ তার পরনের সাদা লুঙ্গিটা পায়ের ভাঁজে ঢুকিয়ে বললেন, ‘সময় নষ্ট করে কোনো লাভ নাই।’

‘আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, আমার কথা আপনাদের শুনতেই হবে।’ লোকটা আগের মতোই  হাত তুলে বেশ চিৎকার করে বললেন। কিন্তু কেউ কোনো কথা শুনল না তার। তবে নামাজ সম্পর্কিত সময় স্বল্পতার কারণে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন জুমাবার নামাজের পর চোখ তোলা হবে ছেলেটার, কাফন চোর ছেলেটার।

২.

কাফন চোর ছেলেটার সঙ্গে আপনাদের পরিচয় নেই, এবার তাই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি তার সঙ্গে। ছেলেটার নাম মহিসুর, কেউ কেউ ডাকে মহিষ। কিন্তু এই গল্পে তাকে  মহিসুর, মহিষ কোনোটাই বলে ডাকব না, আমরা ডাকব মফিজ বলে। এই নামে ডাকার কারণ আছে। ইদানীং কোনো গোবেচারা মানুষকে অনেকেই মফিজ বলে ডাকে। ৫ ফুট সাড়ে ৫ ইঞ্চির এই তাকে আপাতদৃষ্টিতে এই মুহূর্তে গোবেচারাই মনে হচ্ছে। যদিও সে মোটেই গোবেচারা নয়। গোবেচারা টাইপের কোনো ছেলে গভীর রাতে কাফনের কাপড় চুরি করে না।    

মফিজের বয়স সতের বছর, কিন্তু তাকে দেখায় পঁচিশ বছরে যুবকের মতো। সে কেন কাফনের কাপড় চুরি করে তার মর্মস্পর্শী একটা কারণ আছে এবং এই কারণের পেছনে তার একটা অকাট্য যুক্তিও আছে।

৩.

‘মাও রে, এই শাড়িতে তোরে খুব সুন্দর লাইগছে রে মা।’

সিমেন্টের লাইটপোস্টের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে মফিজকে। তাকে জড়িয়ে ধরে কোনোরকম শব্দ না করে কেঁদে চলছেন ওর মা মরিয়ম বেগম, আর একটু ফাঁকে দু হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে মাটির একটা ঢিবির ওপর বসে আছেন ওর বাবা সামাদ জোয়ার্দার। 

‘ও মাও, শাড়িটা তোর পছন্দ হয় নাইকা?’

মা এবারও কোনো কথা বলেন না। আগের মতোই কেঁদে চলছেন তিনি। বাবা মাথা চেপে ধরে একা একা বিড়বিড় করছেন। কিছু একটা বলছেন তিনি, কিন্তু কী বলছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে না।  

ডান পায়ের হাঁটুর কাছে ভীষণ চুলকাচ্ছে মফিজের। হাত দুটো বাঁধা থাকায় বাম পা দিয়ে চুলকানোর চেষ্টা করছে সে, কিন্তু চুলকানোর আসল মজাটা পাওয়া যাচ্ছে না এভাবে। একটু পর তার পিঠটাও চুলকাতে শুরু করল। এক পা দিয়ে না হয় আরেক পা চুলকানো যায়, কিন্তু দু হাত বাঁধা অবস্থায় পিঠ চুলকাবে সে কীভাবে?

‘পিঠটা চুলকাইয়া দে তো মাও।’

মফিজকে ছেড়ে দেন মা। তারপর কিছুটা ক্রুদ্ধস্বরে বলেন, ‘তার আগে ক, তুই কাফনের কাপড় চুরি কইর‌্যা কী করস?’

‘ওইট্যা তোর না শুনলেও চইলবে। তুই আগে পিঠ চুলকাইয়া দে আমার।’

মফিজের দিকে তাকিয়ে আছেন মা, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তার, সম্ভবত নাক দিয়েও। আঁচল দিয়ে কিছুটা শব্দ করে নাক মুছলেন তিনি, ‘আগে ক, কাফনের কাপড় চুরি কইর‌্যা তুই কী করস?’

হেসে ফেলল মফিজ, ‘কিছু একটা তো করিই।’

‘কী কসস?’ মা এবার একটু রেগে বলেন।

‘কওয়া যাইব না।’

‘কওয়া যাইব না ক্যা?’

মফিজ এবার সারা মুখ ভরে হাসে। একটু পর হাসিটা আরও একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘শাড়িটা তোরে খুব মানাইছে রে মাও।’     

মা সেই প্রশংসায় বিগলিত না হয়ে বেশ শব্দ করে বলেন, ‘কস না ক্যা?’

‘কমু তো।’ মফিজ বেশ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তার আগে তুই ক তো দেহি, এই যে মানুষ মইর‌্যা যায়, তারে তো মাটির ভেতর রাইখ্যা আসতে হয়…’

‘ওইটাই নিয়ম।’

‘তাজা মানুষ কাপড়ের অভাবে ন্যাংটা অইয়্যা থাকে, আমার এইসব ভালো লাগে না রে মা।’ 

‘তোর ভালো লাগা দিয়া কী দরকার! এই যে তুই কাফনের কাপড় চুরি করস, তোর আজ চোখ তুইল্যা ফেলব…।’ কথাটা শেষ করে না মফিজের মা।

‘বালোই অইব।’

‘বালো অইব মানে?’

নিঃশব্দে মফিজ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমাদের খাওন জোটে না, আমরা একবেলা আধবেলা খাই। এটা সহ্য করা যায় রে মা। কিন্তু কাপড়ের অভাবে তুই প্রায় ন্যাংটা অইয়্যা থাকস, ঘর হইতে বাইর অইতে পারস না। এইটা সহ্য হয় না রে মাও। চোখ দুটো অন্ধ অইয়্যা গেলে তোর ন্যাংটা হয়ে থাকন আর দেখন লাগবে না আমার, তাই কাফনের কাপড়ও চুরি করতে হবে না, সেই কাপড় বেইচ্যা তোর শাড়িও কিনতে হবে না রে মাও।’ 

মফিজের মা মরিয়ম বেগম কান্না ভুলে যান হঠাৎ। পলকহীনভাবে তিনি তাকিয়ে থাকেন তার ছেলের দিকে, ছেলে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে সে খুব মনোযোগ দিয়ে। 

৪.

জুম্মাার নামাজ শেষে পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারিই প্রথম এলেন। তার নির্ধারিত চেয়ারে বসে মফিজের দিকে তাকালেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে এক দলা থুতু ফেলে বললেন, ‘বাজারে আজকাল ভালো  কোনো গরু ছাগল জবাই হয় না। সব বুড়া-দুড়া জবাই করে। মাংস খেয়ে কোনো মজা নাই।’

মাটির ঢিবির ওপর থেকে উঠে এসে হারেস ব্যাপারির পাশে এসে দাঁড়ালেন সামাদ জোয়ার্দার। ঠিক পাশে না, সম্মানজনক দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়েছেন তিনি। পকেট থেকে একটা কাঠি বের করে দাঁত খিলাল করতে করতে লোকটার দিকে তাকালেন হারেস ব্যাপারি। কাতর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন লোকটা। অবজ্ঞার চাহনিটা আরও বেশি অবজ্ঞাময় হলো হারেস ব্যাপারির। দাঁতের ফাঁক থেকে মাংসের একটা টুকরা বের করে তিনি জিহবার আগায় আনলেন, তারপর থুতু ফেলার মতো থু করে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘কিছু বলবে নাকি, জোয়ার্দার?’

‘আপনি আমার ছেলেরে এইবারের মতো মাফ করি দ্যান।’

‘আমি মাফ করার কেডা?’

‘আপনিই তো আমাদের সব। আপনি মাফ না কইরলে মাফ করবে কিডা।’

‘সেটাও ঠিক।’ দাঁতের ফাঁকে খিলালের উপর্যুপরি গমন-নিগর্মন করতে করতে তিনি আশপাশে তাকালেন। আশপাশে আপাতত কেউ নেই। উৎসুক পাবলিক সকল বেশ দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। দাঁতের ফাঁকে শেষবারের মতো খিলালটা ঢুকিয়ে সেটা আবার বের করে পকেটে ঢুকালেন তিনি। তারপর জোয়ার্দারের দিকে তাকালেন না ঠিক, কিন্তু গলাটা নিচু করে জোয়ার্দারকেই বললেন, ‘বেশ কয়েকবার তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম জোয়ার্দার।’

‘জি।’

‘কথাটা মনে আছে তোমার?’

জোয়ার্দার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘আমার তো তেমন কোনো জমি-জমা নাই ব্যাপারি সাব। সম্পত্তি বলেন আর যাই বলেন রাস্তার ধারের ওই জমিটাই। ভাবছি, ছেলেটা বড় অইলে ওরে একটা দোকান কইর‌্যা দিমু ওহানে।’

‘দোকান কইর‌্যা দিবা?’ জোয়ার্দারকে প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়ার আগেই ব্যাপারি বলেন, ‘ভালো কথা, কিন্তু চোখ না থাকলে দোকানদারি করবে কীভাবে?’

সামাদ জোয়ার্দার কাতর চোখে ব্যাপারির দিকে তাকান, ব্যাপারি তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে, যেদিকটায় জোয়ার্দারের জমি আছে, যে জমিতে জোয়ার্দার তার ছেলের জন্য দোকান করবে।

হাত দুটো কচলাতে থাকেন জোয়ার্দার। এভাবে সে অনেকক্ষণ কচলায়। তারপর একসময় খুব মিহি গলায় বললেন, ‘জমিটা দিলে কি আমার ছেলের চোখ দুটো বাঁচব?’

ডানে বায়ে আড়চোখে তাকালেন হারেস ব্যাপারি। সামনের দিকটা তো দেখতেই পাচ্ছেন, ঘাড় না ঘুরিয়ে পেছনের দিকটা দেখা যায় না, মানসচক্ষে পেছনের দিকটাও দেখে নিলেন। না, নিকটতম স্থানে আপাতত কেউ নেই। কিন্তু জমির বিনিময়ে চোখ রক্ষার মৌখিক ফয়সালাটা হওয়ার আগেই স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ গলা খাকারি দিয়ে এসে উপস্থিত হলেন। পান চিবাচ্ছেন তিনি। পানের শেষ রসটুকু চুষ করে চুষে নিয়ে তিনি বললেন, ‘একটা জিনিস খেয়াল করেছেন, ব্যাপারি সাহেব?’      

‘কি?’ হারেস চৌধুরীর গলায় বিরক্তি। কিন্তু ফয়জুল মাহমুদ সেটা টের পেলেন না। তিনি পানে লাল হওয়া দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আজকালকার পোলাপানরা একটু দেরি করেই বিয়ে শাদি করে। শরীরে রস আসার পর থেকে ফস্টি-নস্টি করে শেষে বিয়ে।’

‘হঠাৎ এ কথা?’

‘না, মানে, আমাদের মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাহেব তার ছেলেকে নাকি বিয়ে করাবেন।’ ফয়জুল মাহুমদ আশপাশে একবার তাকিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে বললেন, ‘ওনার ছেলের বয়স কত জানেন?’

‘কত?’

‘চল্লিশ তো হবেই।’

‘অসুবিধা কী?’

‘এত বুড়া ধামড়া হয়ে বিয়ে করা, অসুবিধা না?’

‘আপনিও তো কয়দিন আগে এই বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন, মাশাআল্লাহ একটা পোলার বাপও হয়েছেন। কোনো অসুবিধা হয়েছে নাকি আপনার?’

‘আপনি যে কার মধ্যে কী টেনে আনেন না!’ খুক করে একটু কেশে ফয়জুল মাহমুদ বলেন, ‘মাস্টার সাব আবার এত দেরি করছেন কেন?’

৫.

সকাল বেলার দিকে এলাকার অনেকেই ব্যাপারটা জানতেন না, এখন জেনেছেন। সারা এলাকার মানুষ এখন জড়ো হয়েছেন, তারা কোনোদিন কারও চোখ তোলা দেখেননি, চোখ তোলা দেখবেন আজ তারা।  সদানন্দপুর প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক তোফাজ্জল মুন্সির দুপুরের খাওয়াটা একটু বেশিই হয়েছে। তিনি ঘন ঘন হাই তুলছেন, সম্ভবত তার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও আছে। একটু পর পর তিনি ঢেঁকুরও তুলছেন। এরকম বড়-সড় একটা ঢেঁকুর তুলে তিনি বললেন, ‘তাহলে আর দেরি করা কেন, কাজটা শুরু করা যাক। আজ ছুটির দিন, আমাদের তো আরও কাজ-কাম আছে, নাকি।’

‘আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারি সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে সামাদ জোয়ার্দারের দিকে তাকালেন। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল সামাদ জোয়ার্দারের। মাথা নিচু করে ফেললেন তিনি। হারেস ব্যাপারি আরেক দলা থুতু ফেললেন। গলা খাকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করলেন। গলা পরিষ্কার হলো না। তিনি খ্যাক খ্যাক করে বললেন, ‘ওই বদমাস পোলা নিজের চোখ নিজে তুলবে না। ওর বাপ তুলবে চোখ দুটো।’ হারেস ব্যাপারি, ফয়জুল মাহমুদ আর  তোফাজ্জল মুন্সির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা কী বলেন?’

পান চাবানো বাদ দিয়ে কিছুক্ষণ মুখটা বন্ধ রাখলেন ফয়জুল মাহমুদ। ভাবছেন তিনি। কিন্তু খুব বেশি সময় নিলেন না, পান চাবানো শুরু করেই তিনি বললেন, ‘কথাটা খারাপ বলেননি আপনি। যেহেতু এর আগেও জোয়ার্দার মিয়া ছেলেকে ভালো করবে বলে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেনি, সুতরাং এবারের জন্য তাকেও দায়ী করা যায়। আর তিনি যেহেতু দায়ী তাই তারও একটা শাস্তি হওয়া উচিত।’

মাথা উপর নিচ করতে করতে তোফাজ্জল মুন্সি বললেন, ‘আপনারা যা বলবেন তার ওপর আমার  কোনো কথা নেই।’

সামাদ জোয়ার্দার চিৎকার করে উঠে বললেন, ‘আপনারা আমাকে এত বড় শাস্তি দেবেন না, আপনাদের আল্লার দোহাই এত বড় শাস্তি দেবেন না।’

সামাদ জোয়ার্দারের চোখের জল ঘাসের ওপর পড়ল, ঘাস কেঁপে উঠল, কিন্তু চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো একটা মানুষের প্রাণ কেঁপে উঠল না, এমন কি কোনো একজনের মনটাও খচ করে উঠল না একটু!

৬.

সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হলো-বুড়ো বেল গাছের বড় কাটা দিয়ে নয়, ময়নার লম্বা কাটা দিয়ে নয়, খেঁজুর গাছের পাতার কাটা দিয়েও নয়, মফিজের চোখ তোলা হবে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে। কাঁটা দিয়ে তুললে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলতে হবে, কঞ্চি দিয়ে তুললে এক খোঁচাতেই তোলা যাবে, এতে মফিজের কষ্ট একটু কম হবে। মফিজের বাবা আর মায়ের চিৎকারে এ মানবিক সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন বিচারকরা!

পঁচু সেখ এলাকার সবচেয়ে ভালো বাঁশের বেড়া বুনায়, বাঁশের কঞ্চির মাথা চোখা করার দায়িত্ব পড়েছে তার ওপর। খুব মনোযোগ আর দায়িত্বশীল হয়ে কাজটা করছেন তিনি। সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কাজটা শেষ হলেই ওই কঞ্চি দিয়ে চোখ তোলা হবে।

পাক্কা পঁচিশ মিনিট ব্যয় করে দুটো কঞ্চি চোখা করে বিচারকদের হাতে দিলেন পঁচু সেখ। সবার আগে হারেস ব্যাপারি হাতে নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে কঞ্চির চোখা পরীক্ষা করলেন। তার মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল। তারপর সেই কঞ্চি দুটো যথাক্রমে তোফাজ্জল মুন্সি আর ফয়জুল মাহমুদের হাতে যেতেই সামাদ জোয়ার্দার আবার চিৎকার করে উঠলেন। তার সেই চিৎকারে সবাই গম্ভীর হয়ে গেলেও মফিজ মিটিমিটি হাসতে লাগল, এক ধরনের সুখের আভাস পাওয়া গেল তার মুখে, চোখের কোনায় এবং ঠোঁটে।       

সবশেষে কঞ্চি দুটো সামাদ জোয়ার্দারের হাতে চলে এলো এবং নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো-যদি সামাদ জোয়ার্দার কাজটা ঠিকমতো না করেন তাহলে বিচারকদের সম্মতিক্রমে অন্য একজন কাজটা শেষ করবেন এবং তখন কেবল ছেলের চোখ না, বাপের চোখও তোলা হবে একসঙ্গে।

হাত কাঁপতে লাগল সামাদ জোয়ার্দারের, সঙ্গে শরীরটাও। সেই কাঁপা কাঁপা শরীর নিয়ে তিনি বাইশ তেইশ হাত দূরে বেঁধে রাখা ছেলের দিকে এগুতে লাগলেন। তিনি কাঁদছেন, কিন্তু ছেলে হাসছে। ওদিকে মরিয়ম বেগম চিৎকার করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন ঘাসের ওপর। কেউ সেদিকে খেয়াল করল না, সবাই তাকিয়ে আছে সামাদ জোয়ার্দারের দিকে, তার হাতের কঞ্চির দিকে।

হারেস ব্যাপারি থুতু ফেললেন এক দলা, ফয়জুল মাহমুদ দাঁত খোঁচাতে লাগলেন একটা কাঠি দিয়ে, তোফাজ্জল মুন্সি থুঁতনিতে হাত ঠেকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগলেন মনোযোগ দিয়ে। চারদিকে প্রকট নিস্তব্ধতা, কারও নিঃশ্বাস আটকে গেছে, কারও কারও চোখ বড় হয়ে গেছে। সামাদ জোয়ার্দার এগিয়ে যাচ্ছেন তার ছেলের দিকে, দু হাতে তার দুটো বাঁশের কঞ্চি, কঞ্চির আগাগুলো নিঁখুতভাবে চোখা করা।  

মরিয়ম বেগমের জ্ঞান ফিরেছে, তবে ভালো করে ফেরেনি। গোঙাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সে গোঙানির শব্দ কারও কানে যাচ্ছে না। এ মুহূর্তে সবাই যার যার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছে কেবল, কেউ কেউ তাও শুনছে না। নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে তারা সামনের দিকে, সামাদ জোয়ার্দারের দিকে, তার হাতের চোখাওয়ালা কঞ্চির দিকে।

খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন সামাদ জোয়ার্দার। কয়েক হাত এগিয়েও গেছেন। তার পা টলছে, অনেকেই টের পাচ্ছেন তা। সামাদ জোয়ার্দার টের পেলেন কেবল পা না, তার বুকের ভেতরটাও কাঁপছে। একটু পর তিনি খেয়াল করলেন, তার মাথার ভেতরটা কাঁপছে। দু চোখ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে তার।

 দাঁড়িয়ে পড়লেন সামাদ জোয়ার্দার। কিন্তু কোনোদিকে তাকালেন না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছেন তিনি। মরিয়ম বেগম আগের মতোই গোঙাচ্ছেন। মফিজের মুখ হাসি হাসি।

হারেস ব্যাপারি চিৎকার করে উঠলেন, ‘কী জোয়ার্দার, থামলা ক্যা?’

সামাদ জোয়ার্দার আবার এগুতে থাকেন। কিন্তু দু পা এগিয়ে গিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে হাতের কঞ্চি দুটো তার নিজের দু চোখের ভেতর সেধিয়ে দিলেন। কেউ একজন চিৎকার করে নিজের চোখ ঢাকল, কয়েকজন ফিসফিস শুরু করে দিল, কয়েকজন বোবার মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারা সবাই যখন একসঙ্গে আবার সামনের দিকে তাকাল, তখন দেখতে পেল সামাদ জোয়ার্দারের হাতের কঞ্চি দুটো চোখ থেকে বের হয়ে এসেছে, সঙ্গে আস্ত চোখ দুটোও।

দু চোখের নিচে লাল রঙের দুটো ধারা গড়িয়ে পড়ছে সামাদ জোয়ার্দারের। ডান গালের ধারাটা দু ভাগ হয়ে এক ভাগ থমকে দাঁড়িয়েছে, আরেক ভাগ নিচের দিকে চলে গেছে। এই প্রথম মফিজের মুখটা অন্ধকার হয়ে এলো, সে চিৎকার করে উঠল, তারপর আরও জোরে চিৎকার করতে করতে বলল, ‘এই শুয়োরের বাচ্চা…।’ চারপাশে দাঁড়ানো প্রত্যেকটা মানুষ মনে করল মফিজ গালিটা তাকে দিয়েছে, এই মনে করাটা হারেস ব্যাপারিও করলেন, তোফাজ্জল মুন্সি করলেন, ফয়জুল মাহমুদও করলেন। কিন্তু কেউই এর প্রতিবাদ করলেন না। কাণ্ডজ্ঞানহীন পশুর মতো তারা চুপ হয়ে রইলেন নির্বিকারভাবে। কেউ কেউ অবশ্য মাথা নিচু করে ফেললেন নীরবে।  

৭.

মাঝরাতে একদিন সদানন্দপুরের কে যেন চিৎকার করে উঠল হঠাৎ। সঙ্গে সঙ্গে এলাকার প্রায় সবাই লাঠি, দা, কোদাল নিয়ে বের হয়ে পড়লেন ঘর থেকে। তারা ভেবেছেন ডাকাত পড়েছে। কিন্তু স্কুলের মাঠে এসে থমকে দাঁড়ালেন সবাই। তারা দেখলেন, হাজার হাজার চোখ ভেসে বেড়াচ্ছে স্কুলের মাঠে। কোনো কোনো চোখ লাফাচ্ছে, কোনো কোনো চোখ ছুটোছুটি করছে, কোনো কোনোটা আবার পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে সবগুলো চোখ এক মহাআনন্দে মেতেছে, আনন্দ করছে তারা ইচ্ছেমতো। কেবল সদানন্দপুর প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক তোফাজ্জল মুন্সি, স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি ফয়জুল মাহমুদ আর পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান হারেস ব্যাপারি কিছু দেখতে পেলেন না। তারা দেখতে পেলেন অন্ধকার চরাচরে কেবল অন্ধকারই, অন্যকিছু নয়, কোনো কিছুই নয়।

 সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares