তেইল্যা বোয়াল! : রেজা ঘটক

স্রেফ বোয়ালমাছের কারণেই আমাদের খালেক মাতবর পাগল হয়ে গেল। খালেক মাতবরের পাগল হতে কতদিন লাগল? না, হুট করেই খালেক মাতবর পাগল হয় নাই। খালেক মাতবরের পাগল হবার পেছনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে অনেকেই কারণ হিসেবে মনে করেন। কিন্তু খালেক মাতবরের পাগলামির পেছনে আরও অন্তত একাধিক কারণ আছে। আর সেই কারণের অন্তরালের কারণ-অকারণের ব্যাকরণ সংমিশ্রণে শরীরের হেডকোয়ার্টারের সার্কিটে স্রেফ ভারসাম্য হারিয়ে আমাদের চোখের সামনেই খালেক মাতবর ধীরে ধীরে পাগল হয়ে গেলেন। 

এমনিতে খালেক মাতবরের ঘাড়ের একটা রগ অন্তত ৪৫ ডিগ্রি ত্যারা। সহজ সরল ঘটনার মধ্যেও খালেক মাতবর মস্তবড় ঝামেলা আবিষ্কার করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র দুই মহান বিজ্ঞানী নিউটন ও আইনস্টাইনের পর আমাদের খালেক মাতবরের খুব বড় মাপের বিজ্ঞানী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, খালেক মাতবর বিজ্ঞানী না হয়ে সামান্য সৌখিন মাছ চাষি থেকেই কিনা শেষপর্যন্ত পাগল হয়ে গেলেন!

যদিও শুধুমাত্র গ্রামের হাটে তালিব চেয়ারম্যানের কাছে একবার বাজিতে হেরে খাসেরহাটের সবচেয়ে বড় বোয়ালমাছ কিনতে না পারার কঠিন বেদনা থেকেই অনেকটা হুট করেই পাটের ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে খালেক মাতবরের সৌখিন মাছ চাষি হিসেবে আবির্ভাব। যদিও সেই খুবই ঘটনা সামান্য। কোজাগরী পূর্ণিমায় সে বছর জেলেরা অনেক বোয়ালমাছ পেয়েছিল।

ভরা জোয়ারের পদ্মায় সেদিন যারাই মাছ ধরছিল, তারা কেউ আর একেবারে খালি হাতে ফেরেনি। প্রচুর পরিমাণে শৌলমাছ আর বোয়ালমাছ ধরা পরেছিল সেদিন। যথারীতি খাসেরহাটের বাজারও সেদিন মাছে মাছে সয়লাব। হাটের সবচেয়ে বড় মাছটি ছিল কদম আলির জাইলার আনা তেইল্যা বোয়াল। পাক্কা সাড়ে এগারো কেজি ওজনের বোয়ালমাছ। বোয়াল মাছটি কেনার জন্য খাসেরহাটের মেছোহাটে তখন একটা ডাক উঠল। এই ডাক মানে স্রেফ জুয়ার মতো ডাক। মাছের সবচেয়ে বেশি দাম যিনি হাঁকবেন, তিনিই মাছটি কিনতে পারবেন।

হয়তো আমাদের পাট ব্যবসায়ী খালেক মাতবরের সেদিন খুব গোপনে ওই তেইল্যা বোয়ালের ওপর একটা লালসা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তিন হাজার পাঁচশ টাকা হাঁকিয়েও খালেক মাতবর বোয়ালমাছ কিনতে পারলেন না। তালিব চেয়ারম্যান তখন পানহাটে কেনাকাটা করে কাসেমের চায়ের দোকানে বসে বসে চা খাচ্ছিলেন। বাতাসের বেগের চেয়েও গুজবের বেগ হাজারগুণ বেশি। মুহূর্তে কাসেমের চায়ের দোকানে তালিব চেয়ারম্যানকে ঘিরে যে জটলা ছিল, সেখানে খবর পৌঁছাল যে মেছোহাটে বিশাল এক তেইল্যা বোয়াল উঠছে। খালেক মাতবরের মতো তালিব চেয়ারম্যানের জিভ কী তখন সবার অজান্তে একবার লিকলিকিয়ে উঠেছিল?

নইলে খালেক মাতবর যখন আড়াই হাজার টাকার বোয়ালের ওপর সাড়ে তিন হাজার দাম হাঁকালেন, তখন তো তালিব চেয়ারম্যানের চুপসে যাবার কথা। এর আগে যেখানে খাসেরহাট বাজারে সবচেয়ে বেশি দামে যে বোয়াল মাছ বিক্রি হয়েছিল, সেটির দাম উঠেছিল দুই হাজার টাকা। এটা আগের রেকর্ড। দুই হাজার টাকার বোয়াল মাছ ছিল খাসেরহাট বাজারের এতদিনের ইতিহাস। তালিব চেয়ারম্যানের আড়াই হাজার হাঁকানোর পর খালেক মাতবর এককাঠি বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার হাঁকালেন। আর যায় কোথায়? তালিব চেয়ারম্যানের দুই-একজন চেলাচামুণ্ডা তাঁর কানে কানে কী কী যেন কইল, অমনি মাথা গরম করেই তালিব চেয়ারম্যান বোয়ালের দাম হাঁকালেন চার হাজার টাকা।

তালিব চেয়ারম্যানের মতিগতি বুঝতে পেরে আম-ছালা দুটো হারানোর ভয়ে খালেক মাতবর বাজিতে তখন ইস্তফা দিলেন। আর তেইল্যা বোয়ালমাছ কেনার হক দাবিদার হতে পারলেন তখন তালিব চেয়ারম্যান। খাসেরহাটের মেছোহাটের ওই ভিড়ের মধ্যে খালেক মাতবরের মুখটা কী তখন এক মুহূর্তের জন্যে হলেও আমচুরের মতো চুপসে যায়নি? খালেক মাতবর সেই মনোকষ্ট ভোলার জন্য পরের বছরই পাটের ব্যবসা গুটিয়ে শৌখিন মাছচাষে নেমে পড়লেন।

বাড়ির ঠিক দক্ষিণপাশে দেড়শো হাত লম্বা আর একশো হাত চওড়া বিশাল এক পুকুর কাটালেন খালেক মাতবর। প্রকৃত জনশ্রুতি হলো, পরের বছর নাকি ভেতরে ভেতরে খালেক মাতবরের চেয়ারমানি ইলেকশানে লড়াই করার খায়েসও তখন চাউর হয়েছিল। খাসেরহাটের মেছোহাটে তালিব চেয়ারম্যানকে ভোটের লড়াইয়ের আগেই একবার হারানোর উদ্যোগ ছিল সেটা! তাই আড়াই হাজার টাকার বোয়ালমাছের দাম সাড়ে তিন হাজার হাঁকিয়েছিলেন খালেক মাতবর।

তালিব চেয়ারম্যান দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের পুরনো ঘাগু চেয়ারম্যান। খালেক মাতবরকে তার পাত্তা দিলে চলে? তাই সাড়ে এগারো কেজি ওজনের বোয়াল মাছের দাম সেদিন চার হাজার টাকা হাঁকিয়ে খালেক মাতবরকে একটা উচিত শিক্ষা দিয়েছিলেন তালিব চেয়ারম্যান। যদিও সেই রাতে তালিব চেয়ারম্যান নিজের বাড়িতে খালেক মাতবরকে দাওয়াত দিয়ে সেই তেইল্যা বোয়ালের ঝোল খাইয়েছিলেন। কিন্তু ওই ঘটনার পর হঠাৎ পাটের ব্যবসা গুটিয়ে পুকুর কাটায় মন দিলে তালিব চেয়ারম্যান নিজে এসে একবার খালেক মতবরকে জিজ্ঞেস করেছিলেনÑ মাতবরের মাথা-টাথা ঠিক আছে তো?

কিন্তু পাগলে না শোনে মানুষের বুদ্ধি! তালিব চেয়ারম্যান কোন ছার! খালেক মাতবর নিজ উদ্যোগে বিশাল আকারের পুকুর কাটালেন। সেই পুকুরে দুই ইঞ্চি থেকে ছয় ইঞ্চি সাইজের সাড়ে চার হাজার বোয়াল মাছের পোনা ছাড়লেন। পুকুরের সবচেয়ে বড় বোয়ালের ওজন পনেরো কেজি হলেই তারে আর পায় কে? তালিব চেয়ারম্যানের রেকর্ড তো ভাঙা যাবেই। খাসেরহাটের বাজিতে হারার একটা উচিত জবাবও হবে। কোথায় সাড়ে এগারো কেজি আর কোথায় পনেরো কেজি।

দেখতে দেখতে চোখের পলকে খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়াল লাফিয়ে লাফিয়ে বড় হতে লাগল। পুকুরের পাড়ের নারকেল গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে বসে খালেক মাতবর তখন খুশিতে দাড়িতে হাত বোলান আর মিটমিট করে রহস্যময়ভাবে হাসেন। বোয়ালমাছ আর চেয়ারমানি ইলেকশান, দুটোতেই সে প্রকাশ্যে যেন তালিব চেয়ারম্যানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিয়েছেন! চারদিকে তখন একটাই আলোচনাÑ খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়ালমাছ!

ঠিক এক বছর আগে কোজাগরী পূর্ণিমায় খাসেরহাটে তেইল্যা বোয়ালমাছ কিনতে না পারার কারণে খালেক মাতবর বছর না ঘুরতেই তখন সত্যি সত্যিই বড় বড় বোয়ালমাছের মালিক। কিন্তু রেকর্ড না করে খালেক মাতবর কিছুতেই পিছু হাঁটবেন না। পূর্ণিমার জোগায় পদ্মায় তখন ভরা জোয়ার। বন্যার একটা আভাস দেখে খালেক মাতবর কিছুটা চিন্তিত। প্রাথমিকভাবে বাঁশের মাচা বানিয়ে প্রস্তুতি নিলেন। কোনো বোয়ালের সাধ্য নাই খালেক মাতবরের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথাও যায়!

বাঁশের মাচা বানিয়ে পুকুরের চারপাশ খুব ভালো করে বেড়া দিলেন। খালেক মাতবরের পুকুরে বাঁশের মাচা পোতার কাজে পাক্কা একশ টাকার কামলা ছিল সোনামিঞার দামরা পোলা আউয়াল। আউয়ালের মনে কী শয়তানি ছিল কে জানে! নাকি গোপনে তালিব চেয়ারম্যানের কাছের শিষ্য সাজতে গিয়ে অথবা কারও গোপন ইশারায় আউয়াল সেই অপকম্মটি সেদিন করেছিল, তা আর কেউ এখন বলতে পারে না। পুকুরের চারপাশে বাঁশের মাচা পোতার সময়ে কিছুদূর পরপর খুব কৌশলে ইচ্ছা করেই মাচার নিচে কিছু ফুটো রেখে দিয়েছিল হারামজাদা আউয়াল।

অবশ্য সেই রাতে বন্যার সত্যি সত্যিই যে তেজ ছিল, এমনিতেই ওই বাঁশের মাচা ভেসে যেত। আউয়ালের শয়তানি কোনো কাজে আসত না। বেড়িবাঁধ ভেঙে যেখানে পদ্মার পাড়ের বাইশ গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেখানে খালেক মাতবরের পুকুর কী আর পুকুর থাকে? স্রেফ বন্যার মাঠ হয়ে যাবার কথা। কয়েক ঘণ্টা পরে অবশ্য বাস্তবেও তাই হয়েছিল! দেখতে দেখতে বিকাল নাগাদ বাঁশের মাচা অর্ধেক ডুবে গেল! খালেক মাতবরের তখন সেকি উদ্বেগ, সেকি হায় হুতাশ, সেকি আহাজারি!

নগরে আগুন লাগলে যেমন মসজিদ-মন্দিরও রক্ষা পায় না, তেমনি বন্যার পানির তোড়ে খালেক মাতবরের সকল প্রস্তুতিকে ধ্বংস করে দিয়ে পুকুর, বাঁশের মাচা সবকিছু ছারখার করে সেখানে সুনামি বয়ে গেল। কারও পক্ষে আর তখন বলার জো নাই যে, আগে এখানে খালেক মাতবরের শৌখিন বোয়াল মাছের পুকুর ছিল!

কিছু বোয়ালমাছ তখন আশপাশে ছুটে গেল। আমাদের ক্লাসের রাতুল আর আমি মিলে দুই ছোকরা তখন বঁরশি নিয়ে সেই মাছ ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত। সূর্য তখন ডুবিডুবি। বঁরশি একা সামলাতে না পেরে রাতুল হঠাৎ চিৎকার দিলÑ শান্ত আমারে ধর!

দুইজন মিলে বহুত কষ্টে বঁরশি টেনে রাখলাম। কখনও আমরা কোমর পানিতে কখনও আমরা হাঁটু জলে। প্রায় আধাঘণ্টার চেষ্টায় আমরা বিশাল এক বোয়াল তুলে আনলাম। সেই রাতে রাতুলের মা সেই মাছ রান্না করল। সেই রাতে আমারও রাতুলের সাথে সেই মাছ খাওয়ার দাওয়াত রাতুলদের ঘরে। সাজুগুজু করে বড় বোয়াল মাছ খাওয়ার জন্য রাতুলদের উঠানে যেতেই দেখি সেখানে বিশাল কাইজা!

স্বয়ং খালেক মাতবর সেখানে উপস্থিত। তার পুকুরের মাছ রাতুল কেন ধরল? এই নিয়ে সেখানে বিচার-সালিশ! হৈ হট্টগোল! সবার কণ্ঠ ছাড়িয়ে কেবল খালেক মাতবরের গলা শোনাচ্ছিল। সেই কণ্ঠে তখন ইস্রাফিলের সিঙ্গার চেয়েও তেজ, হিটলারের হুঙ্কারের চেয়েও ভয়ালো ব্যাপার স্যাপার! অথচ বন্যায় ভেসে আসা বোয়ালের গায়ে কোথাও লেখা নাইÑ এটা খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়াল।

এমনকি পদ্মা নদী থেকে বন্যায় ভেসে আসা বড় বোয়ালও হতে পারে সেটা। খালেক মাতবরের পুকুরের বোয়ালই হবে এমন কোনো কথা নাই। কিন্তু কে শোনে কার কথা? শেষ পর্যন্ত খালেক মাতবর সেই রাতুলের মায়ের রান্না করা বোয়াল মাছ গামলায় ঢেলে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অসহায় রাতুলের মা-বাবা রাতুলরা তখন বোয়াল মাছ হারানোর পরেও আতঙ্কে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল উঠানে। ফলে রাতুল এবং আমার আর সেই রাতে আয়েশ করে বোয়াল মাছ খাওয়া হলো না। আফসোস!

কথায় বলে নাÑ ভগবানের মাইর দেখার বাইর। সেই রাতেই বন্যার তোপে খালেক মাতবরের বাঁশের মাচা ভেঙে সেখানে পুকুরে বাঁশের মাচার ওপরে প্রতিরক্ষা হিসেবে জাল দিয়ে যে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল, সবকিছুর নামচিহ্ন পর্যন্ত আর একটুও অবশিষ্ট রইল না। বরং খালেক মাতবরের বসতবাটির টিনের ঘরও তখন বন্যায় ভেসে যাওয়ার মতো দশা। পদ্মাপাড়ের বাইশ গ্রামের সাথে এক রাতেই খালেক মাতবরের সাধের পুকুরও একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল!

না। বন্যার পানি শুকানো পর্যন্ত আমাদের খালেক মাতবর দেরি করেন নাই। তার আগেই তিনি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর রাস্তা শুকালে আমরা যখন ইশকুলে যাওয়া শুরু করলাম, তখন উলঙ্গ খালেক মাতবর রাস্তায় একটা লাঠি হাতে খাড়ায়ে থাকেন। আর পাশ দিয়ে কেউ অতিক্রম করার সময় বাঁ হাতে লিঙ্গের গোড়ালি ধরে ডান হাতের লাঠি উঁচিয়ে মস্তবড় হুঙ্কার ছেড়ে কেবল একটাই ডায়লগ দিতেন- তেইল্যা বোয়াল!

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares