হৃদয় এখন : মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

ফোনের ওপার থেকে যোজনগন্ধা বলল, তোর গলাটা এমন খসখসে শোনাচ্ছে কেন রে? কী হয়েছে তোর?

আমি বসা-গলায় বললাম, ও কিছু না। সেদিন তোর বিয়েতে অনেকগুলো কেশব কুলফি খেয়ে নিয়েছিলাম লোভে পড়ে। তুই তো জানিসই আমার ঠান্ডার ধাত। তাতেই…।

আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে যোজনগন্ধা সন্দিগ্ধা স্বরে বলল, উহু আমার গাট ফিলিং বলছে সেদিন বাড়ি ফিরে বালিশে মুখ গুঁজে ভেউ করে কেঁদেছিস, তাতে গলাটা বসেছে। কী, ঠিক বলেছি না?

আমি বললাম, আরে ধুর তুইও পারিস, সেসব কিছু নয়, আইসক্রিম খেয়ে গলাটা একটু বসে গেছে।

যোজনগন্ধা বলল, ডাক্তার দেখিয়েছিস?

আমাকে কলা দেখিয়ে অন্য ছেলের গলায় মালা দিয়ে যোজনগন্ধা চলে গেলেও গার্জেনসুলভ স্বভাবটা দেখছি এখনও যায়নি। আমি ঘড়ঘড়ে স্বরে বললাম, ডাক্তারের দরকার নেই। নুন-গরম জলে দু’বেলা গার্গল করেছি। এমনিই ঠিক হয়ে যাবে। কেন ফোন করেছিস সেটা বল।

যোজনগন্ধা কেজে গলায় বলল, অষ্টমঙ্গলায় দু’দিনের জন্য বাড়িতে এসছি। জিনা, শায়েরি আর আহেলিকে ফোন করেছিলাম। ওরা বিকেলে আসবে। তুই ফ্রি আছিস? আসবি একবার?

 যোজনগন্ধার বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছি এক হপ্তা হতে চলল, আমার মগজের মধ্যে ফাটা গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো প্যাঁপোঁওও শব্দে করুণ সুরে সানাই বেজে চলেছে এখনও। প্রেমিকার বিয়ের ভোজ খাওয়াটা যে কোনো পুরুষের পক্ষেই বিড়ম্বনার, তার মধ্যে সেদিন শুভদৃষ্টির সময় বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত ধরতে হয়েছিল আমাকে। সেই ছবি শয়তানি করে ফেসবুকে আপলোড করে দিয়েছিল জিনা। আমার নরম মনের ওপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়ে সে কি হাসি সকলের! এখন কপালে সিঁদুর দেওয়া যোজনগন্ধাকে একবার দেখার জন্য মনটা আকুলিবিকুলি করেছিল ঠিকই, তবুও নিরাসক্ত সন্ন্যাসীর গলায় বললাম, আমার হবে না রে জুজু, সন্ধেবেলা পড়ানো আছে।

যোজনগন্ধা খেঁকিয়ে উঠে বলল, ওসব টিউশন-ফিউশনের অজুহাত আমাকে দেখাস না। ছাত্র ঠেঙিয়ে বড়লোক হয়নি কেউ। তোদের সঙ্গে আমার জরুরি কিছু কথা আছে। তার পর গলাটা ঝট করে নামিয়ে বলল,  কথাগুলো আমার বরের সামনে বলা যাবে না। সমস্যা আছে।

কথাটা শুনে একটু থমকালাম। কী এমন কথা যা বরের সামনে বলা যাবে না! তবে অতিরিক্ত কৌতূহল না দেখিয়ে স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইলাম, কী কথা?

যোজনগন্ধা বলল, সেটা ফোনে বলা যাবে না, সাক্ষাতেই বলব। আজ সন্ধেবেলা বাংলাদেশের নাটক আছে আর্ট গ্যালারিতে। ঢাকা বটতলা গ্রুপ জলপাইগুড়িতে এসেছে ‘ক্রাচের কর্নেল’ নাটক নিয়ে। আমার বর নাটকের পোকা। ওর মুখেই শুনলাম দুই নামী অভিনেত্রী কাজি রুকসানা আর শামিমা লুৎফা নেত্রা অভিনয় করবেন। ও আমার বাবার সঙ্গে যাবে নাটক দেখতে। আমি মাথাব্যথা বলে কাটিয়ে দিয়েছি। তুই প্লিজ আয়। মাকে মাংসের শিঙাড়া বলেছি বানাতে। আঁচ করার চেষ্টা করেছিলাম, কী হলো কেসটা? তবে কি যোজনগন্ধার বর ওকে টর্চার-ফর্চার করে? লোকটা ইমপোটেন্ট নয়তো? নাকি গো? কোনো ক্লু পাচ্ছিলাম না। এই সেদিনও গদগদ ভালোবাসায় কথা বলতে বলতে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ঘাস উপড়েছি আমরা। কিন্তু সুসময় বেশিদিন ভাগ্যে সইল না। যোজনগন্ধার একটা মারকাটারি অ্যালায়েন্স নিয়ে এলো ওর রাঙামসি। ছেলে গোল্ড মেডেলিস্ট ইঞ্জিনিয়ার। কলকাতায় নিজেদের বাড়ি। কয়েক মাস বাদে সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাবে। ব্যস আর কী, আমাকে ল্যাং মেরে ড্যাংড্যাং করে সেই ছেলের গলায় ঝুলে পড়ল যোজনগন্ধা। বিয়ের আগে শেষবার যখন দেখা করি সেদিন ছলছল চোখে বলেছিল, পারলে  আমাকে ভুলে যাস রে। আমিও ঢঙ করে ঘাড় কাত করে মিনমিনে গলায় বলেছিলাম, ভালো থাকিস রে জুজু, সুখে থাকিস।

আমি খাওয়াদাওয়ার একটু ইয়ে, মাংসের শিঙাড়ার ওপর আমার দুর্বলতা বরাবরের। আগেও কয়েকবার খেয়েছি ওদের বাড়িতে। যোজনগন্ধার মায়ের হাতের রান্না এমনিতেই অসামান্য, তার মধ্যে জিনিসটা দুর্ধর্ষ বানায়, কিন্তু প্রাক্তন প্রেমিকার ওপর থেকে আমার কষকষে রাগটা যাচ্ছিল না। ঘং ঘং করে একটু কেশে নিয়ে বললাম, ঠিক আছে দেখছি।

আমি, যোজনগন্ধা, জিনা, শায়েরি আর আহেলিÑ একই স্ট্রিম নিয়ে পড়তাম বলে ইউনিভার্সিটিতে আমাদের পাঁচজনের একটা গ্রুপ ছিল। আমি আর যোজনগন্ধা ডাকটিকিটের মতো একে অন্যের সঙ্গে সেঁটে ছিলাম পাক্কা দু’বছর। ওদিকে শায়েরিরা বয়ফ্রেন্ড বদলাতো ঘনঘন। ওরা আমাদের দেখলেই আওয়াজ দিত, ধন্যি জুটি তোরা! দিনের পর দিন একই মানুষের সঙ্গে কি করে প্রেম করিস রে তোরা? দম আটকে আসে না? আমি আর যোজনগন্ধা হেসে বলতাম, একেবারেই না, আমাদের সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের! আমাদের থিয়েটারি সংলাপ শুনে অন্তরীক্ষ থেকে ওপরালা নির্ঘাৎ মুচকি হেসেছিলেন।

বন্ধুদের গ্রুপে প্রথম কারও বিয়ে বলে কথা, জিনা, শায়েরি আর আহেলিদের মনে লাড্ডু ফুটছিল গাবগুবাগুব করে। বিয়ের কেনাকাটা, তত্ত্ব সাজানো, সাজের ডিটেল লিস্টি, বউদি-ছোটমাসিদের থেকে ব্লাউজ জোগাড় করে দু’পাশে টাক সেলাই করে বিয়ের দিনে ত্রিমূর্তি দেখি এক একজন গাঢ় লিপস্টিকের ম্যানিকিন ঝকমকে গয়নার সাজা মভ রঙের বেনারসি পরা যোজনগন্ধাকে দেখে শায়েরি তো বলেই ফেলল, ইস এ রকম সেজেগুজে আমার যে কবে বিয়ে হবে!

করলা নদীর ধারে গ্রেটার কৈলাস নামে একটা আলিশান বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল রিসেপশনে। রকমারি মকটেলের ব্যবস্থা ছিল। ফ্রুটজুস হাতে ব্যাজার মুখে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম আমি। বর এলো, বরপক্ষের দু’একজন হ্যান্ডু টাইপের ছেলের সঙ্গে ওদের দিনমূর্তির চোখাচোখি আর হাসাহাসি হল, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এক কোণে। যোজনগন্ধার ছোটমামা হন্তদন্ত হয়ে এসে আমাকে বললেন, এই তো তোমাকেই খুঁজছিলাম। জুজুর বিয়ের পিঁড়িটা ধরতে হবে একটু এসো তো আমার সঙ্গে। কী আর করা, ব্যাজার মুখ করে গেলাম ভদ্রলোকের পেছন পেছন। যা-ই হোক, বিয়ে হলো। তার পর এলো খেতে বসার পালা। আহেলিদের বললাম, আমি কিছু খাব না রে, আামার খিদে নেই।

আহেলি খেতে ভালোবাসে। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, তুই কি গাড়োল, নাকি গবেট! শিলিগুড়ির সেরা কেটারার এসেছে। ভেটকি, চিতল, চিংড়ি, ইলিশ কী নেই মেনুতে! তার ওপর দু’রকম মাটনের প্রিপারেশন। এসব আইটেম কখনও চেখে দেখিসনি, চোখেও দেখিসনি। চল খেতে বসবি চল।

জিনা ধমক দিয়ে বলেছিল, তুই এমন মুখ করে ঘুরছিস যেন তোর গরু হারিয়ে গেছে! এটা হলো সেলিব্রেশনের যুগ। প্রেমে পড়লে যেমন সেটা ধুমধাম করে উদ্যাপন করা উচিত তেমনি প্রেমের ছানা কেটে গেলে সেটাও সেলিব্রেট করার নিয়ম। তুই আর কবে মানুষ হবি বল তো!

আহেলি জ্ঞান দিল, মেরিলিন মনরো কী বলেছিলেন জানিস? স্মার্ট মেয়ে সে-ই, ছেলেটি তাকে ছেড়ে যাওয়ার আগেই যে ছেলেটিকে ছেড়ে যায়। যোজনগন্ধা একদম ঠিক কাজ করেছে। এমন নোবেল লরিয়েট ছেলে জুটে গেলে আমিও কি আর অপেক্ষা করতাম? স্ট্রেট পাত্রের গলা ধরে ঝুলে পড়তাম।

আমাকে ভর্ৎসনা করে শায়েরি বলল, তোর জন্মানো উচিত ছিল শরৎচন্দ্রের দেবদাসের সময়। বোতল বোতল মাল খেয়ে লিভার পচিয়ে মরাটাই তোর স্বভাবের সঙ্গে যায়। ভুল করে জন্মে গিছিস এত যুগ পড়ে, আমি ঠোঁট উল্টে বলেছিলাম, তোদের হৃদয় বলে কিছু নেই, এসব সূক্ষ্ম আবেগের ব্যাপারে তোরা বুঝবি না।

শায়েরি আমার দিকে ভুরু উঁচিয়ে তাকিয়ে বলল, বটে? সূক্ষ্ম আবেগের ব্যাপারে বোঝার পেটেন্ট কি তুই একাই নিয়ে রেখেছিস?

মহাভারতে সত্যবতীকে শুনেছি বলা হতো যোজনগন্ধা। এক যোজন দূর থেকে তাঁর গায়ের সুগন্ধ পাওয়া যেত বরে নাকি এমন নাম। আমি অবশ্য সিনেমা দেখতে গিয়ে পাশাপাশি বসে পপকর্ন খাবার সময় যোজনগন্ধার শরীরের নিজস্ব ঘ্রাণ নয়, পারফ্যুমের গন্ধই পেয়ে এসেছি বারবার। ওর একটু বাতিকও আছে। হ্যান্ডব্যাগে সবসময় স্যানিটাইজার ক্যারি করে। বাদামের খোলা ভেঙে বাদাম খাওয়ার সময় পর্যন্ত ওকে দেখেছি স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিত। একবার এসেছিল আমাদের বাড়িতে। সঙ্গে হ্যান্ডব্যাগ ছিল না-বলে ছুরিকাঁটা দিয়ে ইলিশ মাছ খেয়ে বাড়িসুদ্ধ আমাদের অবাক করে দিয়েছিল। আমি স্বভাবে ওর উল্টো। শীতে স্নান করি কালেভদ্রে। এক জিনস দু’সপ্তাহ ধরে পরার অভ্যেস। দাড়ি কাটি সপ্তাহে একদিন। ফলে হেলদি হ্যাবিট নিয়ে যোজনগন্ধা সুযোগ পেলেই বিস্তার জ্ঞান দিত আমাকে।

সেদিন বিয়েবাড়িতে জিনা, শায়েরি আর আহেলি ঠোঁট বেঁকিয়ে পাউট করে মোবাইলে অনর্গল সেলফি, ডুয়েলফি আর গ্রুপফি তুলে যাচ্ছিল। আমি ঝিম ধরা মুরগির মতো স্ন্যাক্সের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে চিকেন পকোড়া খেতে খেতে ওদের আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখছিলাম। শায়েরি এক সময় আমার পাশে এসে চাপা গলায় বলেছিল, এটা স্মার্টফোন, স্মার্টকার্ড আর স্মার্টটিভির যুগ। তুই দেখছি এখনও সেই ক্যাবলাই রয়ে গেলি। স্মার্ট আর হাতে পারলি না। মুখটাকে হাঁড়ি চাচার মতো করে রেখেছিস কেন?

আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, রিসিভিং এন্ডে থাকলে বোঝা যায় কত ধানে কত চাল। আমার মতো প্রেমে বাঁশ খেলে বুঝতিস। বড় বড় কথা জাস্ট বেরিয়ে যেত তখন।

শায়েরি বলেছিল, তোর মতো আমার শেষ প্রেমটাও কেঁচে গেছে এই  সেদিন। তা বলে আমি কি তোর মতো আনন্যাচারাল বিহেভ করছি? এই তো দিব্যি হাসছি ফটো তুলছি জীবনটাকে উপভোগ করছি। এদিকে আয়, হাসি না পেলেও একটু হাস। তোর জন্য আমদের ফটোগুলো মাঠে মারা যাচ্ছে যে!

আহেলি কথায় কথায় কোটেশন ঝাড়ে। ফুট কেটে বলেছিল, সলোমন শর্ট কী বলেছিলেন জানিশ, স্মার্ট হওয়ার অর্ধেক উপাদান তুমি কোন ব্যাপারে হদ্দ বোকা তা জানা। তুই একটা কাজ কর। নিজের বোকামির জায়গাগুলো অ্যাড্রেস করে নে আগে, তারপর সেসব মেরামত কর। নইলে এমন চলতেই থাকব সারাজীবন।

তিনজনের লেকচারবাজি শুনে রাগের মাথায় গুনে গুনে একুশটা কেশর কুলফি খেয়েছিলাম সেদিন। বাড়ি ফিরে ঠাকুরঘরে গিয়ে বিড়বিড় করে বলেছিলাম, হে প্রভু তুমি তো সবই দেখছ। কিছু একটা করো প্লিজ। জুজু যেন আমার জন্য ভবিষ্যতে এক ড্রপ হলেও চোখের জল ফেলে। এখন যোজনগন্ধার ফোন পেয়ে মনে মনে ভাবছিলাম যাব্বাবা আমার সেই প্রার্থনা কি তবে সত্যি সত্যিই ফলে গেল!

শায়েরির সঙ্গে কথা হলো ফোনে। টাইস সেট করা হলো। আমি শায়েরিকে আমার বাইকে তুলে এসে পৌঁঁছলাম যথাস্থানে। ততক্ষণে একটা রিকশা নিয়ে জিনা আর আহেলিও এসে উপস্থিত। ঘরে ঢুকে উলোঝুলো চুলের যোজনগন্ধাকে দেখে আমরা সকলে হতবাক। এ কী! কথায় কথায় স্বভাবহাসি হাসত যে মেয়ে তার মুখে না আছে চকমকে স্মাইল, না আছে চোখের তারায় ঝলমলানি। ব্যাপারটা কী!

শায়েরি আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, আসলে বিয়ের পর জুজু প্রথম বাপের বাড়ি এসেছে তো, তাই মন খারাপ। কিন্তু আমার কেমন খটকা লাগল, দু’বছর একসঙ্গে ঘাস উপড়েছি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। এই মেয়ের ধাত আমি জানি। আমার মন বলছিল এটা রোজকার  কোনো ছোটখাটো ব্যাপার নয়, আরও বড় কিছু।

যোজনগন্ধা উঠে গেল ওর মাকে মাংসের শিঙাড়ার কথা বলতে। ফেরার সময় টাইলস বসানো শুকনো মেঝেতে হোঁচট খেল একবার। কেমন যেন অন্যমনস্ক। আমার দ্বিধা-টিধা ঝেড়ে ফেলে চেপে ধরলাম ওকে। আমি বললাম, অ্যাই তোর কী হয়েছে রে জুজু? তোর চোখদুটো এমন ছলছল দেখাচ্ছে কেন?

এতক্ষণ তবুও চুপ করে ছিল। এবার ফোঁপাতে শুরু করল যোজনগন্ধা। যেন প্রতারিত হয়েছে। যেন ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে। জিনা দ্যেড়ে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এলো। আহেলি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে। তোকে মেরেছে? ওরা খারাপ? তোর বর নেশা করে?

শায়েরি জানতে চাইল, হ্যাঁ রে ওর কি অন্য সম্পর্ক আছে?

জিনা নরম গলার বলল, কী হয়েছে বলবি তুই খোলাসা করে?

যোজনগন্ধা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিল একবার। তারপর চাপা গলায় বলর, জানিস, ওদের বাড়ির লোক শব্দ করে নাক ঝাড়ে। রেলিং, কার্নিশ, রাস্তা কোনো মানামানি নেই, না ঢেকেচেপে ঝাড়ে না। এমনকি, নাক ঝেড়ে হাত ধোয় না পর্যন্ত।

আমরা একসঙ্গে আঁতকে উঠে বললাম, সে কী!

যোজনগন্ধা অন্ধকার মুখ করে বলল, ওদের খাবার টেবিলের পাশেই ওয়াশবেসিন। ওই বাড়িতে একসঙ্গে ডিনার করার চল। বিয়ের পরদিনের কথা বলি। আমরা খাচ্ছিলাম একসঙ্গে। আমার শ্বশুরের খাওয়া হয়ে গেল আগে। তিনি উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে, জোরে আওয়াজ করে কুলকুচি করে, নাক ঝেড়ে চলে গেলেন। এবার উঠল আমার বর। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে গয়ের তুলে মুখ ধুলো। পাশে যে আমি খাচ্ছি কোনো হেলদোল নেই। ওর হাতের জল খানিকটা ছিটকে এলো আমার গায়ে সেদিকেও হুঁশ নেই। এমনকি, ওর এঁটো হাতে লেপ্টে থাকা মাছের একটা কাঁটা অবধি এসে পড়ল আমার গায়ে। আমার নাড়িভুঁড়ি গুলিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। ভাবতে পারিস!

আমি হাঁ হাঁ করে উঠলাম, তুই প্রোটেস্ট করিসনি?

যোজনগন্ধা চাপা গলায় বলল, নতুন বউ বলে কথা, লাউডলি বলা ঠিক হবে না, তাই মিনমিন করে বলতে গিয়েছিলাম। তা নিয়ে বেদম অশান্তি হয়েছে। আমার শাশুড়ি আমাকে দাবড়ে দিয়ে বললেন, বউমা, আমরা কিছু কম লেখাপড়া জানি না। তুমি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছ। কোনো কিছু লুকিয়ে চুরিয়ে করার অভ্যেস আমাদের নেই। তাছাড়া যেটা স্বাভাবিক সেটা শুধু শুধু লুকোতে যাবে কেন?

আহেলি হাঁ হাঁ করে উঠল, কিন্তু হাইজিনের ব্যাপারটাও তো মাথায় রাখতে হবে। সেই  পয়েন্টটা তুলিসনি?

যোজনগন্ধা ফ্যাকাসে মুখ করে বলল, বলতে গিয়েছিলাম, তাতে শাশুড়ি এমন স্ট্যাটিসটিকস শুনিয়েছে যে, ওদের বাড়িতে কেউ নাকি অসুস্থ হয় না, ডাক্তার-বাদ্যির সঙ্গে ওদের ফ্যামিলির কোনো কানেকশন নেই। তাছাড়া সভ্যতা ভব্যতা শুধু নাকঝাড়া দিয়ে ডিফাইন্ড হয় না, সে জন্য পড়তে হয়, গোল্ড মেডেল পেতে হয়।

আমি মাথা-টাথা চুলকে একটু ভেবে বললাম, অত টেনশন নিস না জুজু। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে তোকে বেশিদিন এক ছাদের তলে থাকতে হবে না। তুই আর তোর বর তো এর মধ্যেই সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাবি। এই ক’টা দিন একটু অ্যাডজাস্ট করে নে।

যোজনগন্ধা ঝামরে উঠে বলল, আমার বরের কথা বলছিস? সে-ও তো ওদের গ্রুপের। এর মধ্যে একদিন সিনেমায় গিয়েছিলাম দু’জন। হলভর্তি লোক, ও সারাক্ষণ রুমালে নাক ঝাড়ে। শুধু তাই-নয়, বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় বার বার হোয়াক হোয়াক করে গলা খাকতে থুতু ফেলল। আমাকে তো তোরা জানিস, আমি এ দৃশ্য  জাস্ট নিতে পারছিলাম না। আমার মুখচোখ দেখে সেটা বুঝতে পেরে আমাকে গোটা রাস্তা ও বোঝাতে বোঝাতে এলো যে, আমি নাকি ওভার রিয়্যাক্ট করছি।

যোজনগন্ধার মা মাংসের শিঙাড়া আর কফি নিয়ে ঢোকায় আমরা চুপ করে গেলাম। সুস্বাদু শিঙাড়া খাওয়া হলো গরম গরম কফি দিয়ে। ফেরার সময় আমাদের গেট অবধি এগিয়ে দিল যোজনগন্ধা। জিনা, আহেলি আর শায়ের নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে একটু এগিয়ে গেছিল। আমার কাছে ঘেঁষে এলো যোজনগন্ধা। ডুকরে উঠে বলল, ওদের সামনে বলতে লজ্জা করল, তোকেই বলছি আলাদা করে। সেদিন আর কী হয়েছে জানিস?

আমি ভুরু জড়ো করে বললাম, কী?

যোজনগন্ধা বলল, সিনেমা দেখে ফিরে রাত্রে আমার বর সিকনির রুমাল আর অন্তর্বাস ফেলে দিয়ে খুব ক্যাজুয়ালি বলেছিল, কেচে দিয়ো তো! আমার যায়গায় অন্য কেউ হলে নির্ঘাৎ সুইসাউড করত। করত কি না, বল তুই? গড প্রমিস, আগে জানলে এমন অসভ্য লোকের গলায় আমি মালা দিতাম না!

দু’বছর কাছ থেকে মিশে দেখিছি সবসময় নিজেকে টিপটপ রাখে যোজনগন্ধা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মাসিপিসিদের মতো একটু বেশিই বাতিকগ্রস্ত। ওর মুখেই শুনেছি গরমকাল তো বটেই শীতের সময়ও নাকি ও রোজ দু’বেলা স্নান করে। সেই ম্যানিয়াক মেয়ের পক্ষে এই ধরনের ব্যাপারস্যাপার মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়া কার্যত অসম্ভব।

আমার মধ্যে যে এতখানি ব্রহ্মতেজের পাওয়ার আছে সেটা আগে বুঝিনি কখনও, তবে নিজের প্রতি বেশ একটা শ্রদ্ধা হলো। প্রাচীনকালে সাধুসন্তদের মতো আমার অভিশাপ যে এভাবে ফলে যাবে সেটা সত্যিই ভাবিনি। আমি পেটের ভেতর বগবগিয়ে ওঠা হাসিটা ঠেলে নিচে নামিয়ে দিতে দিতে বললাম, শধু যোজনগন্ধা নয় মহাভারতে সত্যবতীর আরও একটা নাম ছিল, তা হলো মৎস্যগন্ধা। এবার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এফিডেভিট করে নিজের নাম বদলে মৎস্যগন্ধা রাখিস।

যোজনগন্ধা চোখ গোল গোল করে বলল, মৎস্যগন্ধা? খামোখা ওই নাম রাখতে যাব কেন?

আমি মুখটা করুণ করে বললাম, দ্রৌপদীর শরীর থেকে মাছের মতো আঁশটে গন্ধ বেরুত কি না জানি না, তবে একটা কথা বলতে পারি, যেই বাউন্সি পিচে তুই ব্যাট করতে নেমেছিস তাতে তোর কপালে দুঃখ আছে। অবিরত পারফ্যুম আর স্যানিটাইজার ইউজ করতে করতে পাগল হয়ে যাবি তুই। শুধু তা-ই নয়, এই লোকটার চুমুই তোকে আজীবন সহ্য করতে হবে। ওই পরিবারটায় এটিকেট-হীনতাকে সাড়স্বরে উদ্যাপন করা হয় বলে তোকেও তার অংশ হতে হবে। তুই যেভাবে বড় হয়েছিস তাতে এসব তোর পক্ষে হজম করা মুশকিল শুধু নয়, বলতে পারিস না-মুমকিন।

 যোজনগন্ধা বলল, কী আর করব, ইচ্ছে না করলেও এসব মানিয়ে নিতে হবে। বাই দ্য ওয়ে তুই আর কতদিন একা থাকবি। এবার ভালো একটা মেয়ে দেখে প্রেম কর।

আমি হেসে বললাম, থ্যাংকস রে। তারপর গলাটা তুলে ডাকলাম, শায়েরি! একটু আয় তো সোনা এদিকে।

জিনার ফোন এসেছে। কথা বলছে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। আহেলি ঝুঁকে পড়েছে হাতের মোবাইলে। নির্ঘাৎ ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ব্যস্ত। হাসিহাসি মুখ করে র‌্যাম্পে হাঁটা মডেলদের মতো করে শায়েরি হেঁটে এলো এদিকে। আমি শায়েরির কাঁধে আলতো হাত রাখলাম। যোজনগন্ধার দিকে তাকিয়ে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললাম, কথাটা বলব বলব করে তোকে বলা হয়নি, আসলে ইয়ে মানে আমি আর শায়েরি একটা প্রেমসম্পর্কের মধ্যে ঢুকেছি। উই আর ইন লাভ।

 যোজনগন্ধা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে পুরো। বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, সে কী! কবে হলো এসব? আমাকে বলিসনি তো?

আমি আমতা আমতা করছিলাম। আমার হয়ে শায়েরি কাঁধ নাচিয়ে লাজুক গলায় উত্তরটা দিল, তোর বিয়ের জাস্ট পরদিন থেকে। জিনা অবশ্য গোড়া থেকেই সব জানে।

যোজনগন্ধা আমাদের দিকে ভ্যাবাগঙ্গারামের মতো একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। আর্তস্বরে বলল, অ্যাঁ?

শায়েরি একগাল হেসে বলল, আর বলিস না, ফ্রিকোয়োন্সি ঠিক ম্যাচ করছিল না, আমার লাস্ট অ্যাফেয়ারটা আনফরচুনেটলি লাস্ট করল না। তেমন কড়া কোনো ইস্যু ছিল না যদিও, তবুও ব্রেক-আপ হয়ে গেল। এদিকে আমার আবার প্রেমের মধ্যে না থাকলে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। টেনশনে মুখে পিম্পল ওঠে। এমনকি, চোখের নিচে ডার্ক সার্কল অবধি পড়ে যায়, তাই ভাবলাম এবার তোর এক্স-কে আমার প্রেজেন্ট করে নিই। ভালো করেছি না, বল জুজু?

 যোজনগন্ধা আমাদের দু’জনের দিকে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল। ঠিক আমি যেভাবে ওকে সেদিন বলেছিলাম তেমনি করে মিনমিনে গলায় বলল, কনগ্র্যাটস রে। ভালো থাকিস তোরা, সুখে থাকিস।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares