হাবু গান ও পিঠে একটি কালো দাগ : রাজকুমার শেখ

সকালটা কেমন ঝিম মেরে ছিল। কয়েকদিন থেকে এমনিই মনে হচ্ছে জগুর। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনও ভারী লাগছে। কেমন এক বিষণ্নতা তার চোখে মুখে ছড়িয়ে থাকে। পেটের অসুখটা তাকে অকেজো করে দিয়েছে। প্রায় এক মাস সে বিছানাগত। বুকের কাছে অভাব ভাবটা চিনচিন ধরায়। বাচ্চা দুটো যখন খিদেতে কান্না করে, তখন সে আর  বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না। উঠে বসতে চায়।

সাগু বলে, তুমি কি করছ গো! পারবে না উঠতে। তুমি শুয়ে থাকো।

জগু আবার শুয়ে পড়ে। চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। মুখে কিছু বলতে পারে না। সাগু ওর চোখের জল মুছিয়ে দেয়। তারপর ও পাড়ায় চলে যায় পরের বাড়িতে কাজ করতে। ঘরে হাতড়ে যা পায় বাচ্চাদের দেয় আর জগুকে খাইয়ে চলে যায়। সেই দুপুরে বাড়ি ফেরে। কর্তামা যা পারেন সাগুর আঁচলে দিয়ে দেন। কোনো রকমে দিন গুজরান হয়ে যায় তাদের।

যখন সাগু কাজে বেরিয়ে যায় তখন জগু একদৃষ্টিতে শুয়ে শুয়ে ওর বাপ-দাদার যে পুরোনো লাঠিটা দেয়ালে টাঙানো আছে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ওই লাঠি দিয়ে হাবু গাইতো পিঠে লাঠির ঘা মারতে মারতে। গোটা গ্রাম ঘুরে যা আয়  হতো তা দিয়ে চলত সংসার। রাতে প্রচণ্ড ব্যথা হতো ওর বাবার পিঠে। ওর মা সেঁক দিয়ে দিত রাতে। কতদিন জগু দেখেছে সে দৃশ্য। ওর বাবা যখন দুপুরে কোনো কোনো দিন বাড়িতে থাকত তখন স্নান করার সময় গা থেকে জামাটা খুলতÑ, দেখত পিঠে কালসিটা পড়ে। জগুর ভেতরটা কেমন করে উঠত। মনে মনে সে ভাবত এভাবে ছাড়া কি অন্যভাবে সংসার চালানো যায় না? ওর বাবা কত কষ্ট করে সংসার চালাত। যখন গাঁ-গ্রামে যেতে পারত না তখন সংসারে অনটন দেখা দিত। ওর মা পাশের বাড়ি থেকে চাল ধার করে এনে কোনো রকমে সংসার চালাত। একমাত্র ওই লাঠিটা ওদের জীবনের সবকিছু।

শুধু পিঠ পেতে মার খেয়ে যাও। রক্ত না পড়ুক কিন্তু ভেতরে  ক্ষত থেকে যায়। শুধুই কি ক্ষত? জীবনের অনেক কিছুই চলে যায় জল হয়ে। ওর বাবার শরীরে যে ঘাম ঝরে পড়তো তা ঘাম নয়, তা আসলে রক্ত। মানুষকে আনন্দ দিয়ে নিজের দুঃখটাকে চেপে দু’পয়সা রোজগার করত। আর সেই অন্ন খেয়ে জগু মানুষ হয়েছে। ভুলতে পারে না তার বাবার কথা। আজ বাবা নেই কিন্তু লাঠিটা দেয়ালে টাঙানো থেকে গেছে। কেমন এক মায়া জড়িয়ে আছে ওই লাঠিতে।

বিছানায় শুয়ে চেয়ে থাকে সারা দুপুর। ওর চোখে ঘুম আসে না। বাচ্চার খিদের কান্না ওকে কেমন পাগল করে দেয়। মনে মনে ভাবে এখুনিই বেরিয়ে পড়ি গাঁ-গ্রামে ওই লাঠি নিয়ে। দু’পয়সা এনে তুলে দিই অন্ন ওদের মুখে। কিন্তু সে পারে না। তার শরীর সায় দেয় না। যন্ত্রণায় কেমন কুঁকড়ে থাকে। ঠিকমতো ওষুধ না খেলে অসুখ সারবে না। পয়সা নেই বলেই ওষুধ খেতে পায় না। গাছ-গাছরাতে কি অসুখ সারে? ও পাড়ার হরি ডাক্তার বলেছিল ওকে দেখে।

প্রথম প্রথম কিছু ওষুধ খেয়ে একটু সুস্থ হয়েছিল। পয়সা না থাকায় আর ওষুধ কিনে খেতে পারেনি। তারপর থেকেই সে পড়ে বিছানায়। আর বাইরে কোথাও যেতে পারে না। শহরের কাজটাও গেল। বেশ রোজগার পাতি হচ্ছিল। মনের সুখটাও পেয়েছিল সাগুর স্পর্শে। রাতে ওর শরীরের উষ্ণতা জগুর সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিত। সকালে উঠে চনমনে হয়ে দুটো খেয়ে কাজে চলে যেত। সারাদিন কাজ করত। সন্ধ্যায় চাল-ডাল তরিতরকারি বাজার থেকে কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরত।

রাতের খাবার খেয়ে ওরা মাটির দাওয়ায় বিছানা পেতে ঘুমাতো। সাগু ওর বুকে মাথা রেখে শুয়ে নানান রকম বায়নাক্কা করত। নিজের ভারী বুক ওর বুকে ঠেকতেই যেন রক্তের ভেতর কেমন করে উঠত। জগু ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করত আর বলত, সবই তো তোমার।

ওরা এক সময় গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যেত। রাত বাড়ত আপন নিয়মে। দুটি প্রাণী গভীর ভালোলাগায় ডুবে থাকত দুজন দুজনকে ধরে। এক নিবিড় ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকত  দুজনের মন। এমন উষ্ণতায় জড়িয়ে থাকত যে রাতের শীতও ওদের কাবু করতে পারত না। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়? যাঁরা তেমনভাবে ভালোবেসেছেন একমাত্র তাঁরাই জানেন।

সারারাত ধরে শিয়াল ডাকে পাঠকের মাঠে। শরীরী খেলা শেষ হতেই ভোরের আলো ফুটতে থাকে এক সময়।

দুই

আজ ঘুম ভাঙতে একটু দেরিই হয়েছে তার। শরীরের মধ্যে ক্লান্তিটা যেন চেপে বসে আছে। আজকাল ঘুমটাও তেমন হয় না। পেটের মধ্যে অসুখটা বড়ই কষ্ট দেয়। যেদিন অসুখটা বাড়ে সেদিন মনে হয় আর বুঝি প্রাণটা থাকবে না। এই বুঝি বেরিয়ে যাবে।

আস্তে আস্তে সংসারটা অচল হয়ে যাচ্ছে। সাগু আর কতটুকু টেনে নিয়ে যাবে। সেও যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সারা দিন পরের ঘরে কাজ করে এসে ঢলে পড়ে বিছানায়। তারপর একসময় ঘুমিয়ে যায়। ছেলে দুটোকে কিছু খাইয়ে দিয়েই ও বিছানায় চলে যায়। জগু শুয়ে শুয়ে এসব দেখে। সাগুর মুখটার দিকে তাকানো যায় না। কেমন মায়া লাগে। একটু সুখ দিতে পারল না জগু। তার যে অনেক কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে।  সে আজকাল আর কিছুই  বলে না। শুধু মুখ বন্ধ করে  সব করে যায়।

যদি সাগু না থাকত তাহলে জগুর কি হত? তার এই ব্যাধি কে দেখত? সাগু আছে বলেই সে বাঁচতে চায়। বাঁচাতে চায় সংসারটাকে। সে একটু ভালো হলেই ও-বাড়িতে সাগুকে কাজ করতে পাঠাবে না। তাকে আগের মতোই দেখবে। ভালবাসবে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাবে সব। ওর শরীর দু’মুঠোয় ভরে আদর করবে। চোখের পাতায় হাত বুলিয়ে দেবে। ছেলে দুটোকে স্কুলে পাঠাবে। ওদের ও মানুষের মতো মানুষ করবে।

জগু এই কথা মনে ভেবে বেশ সুখ পায়। চোখ দুটো যেন হেসে ওঠে। ওর মনের ভেতরে একটা সুখী সংসারের ছবি ফুটে ওঠে। পেটের ব্যথাটার কথা ও ভুলে যায়। মনটা আজ বেশ হালকা লাগছে। তার মনে যেন আজ কোনো চাপ নেই।

মাথার কাছে রেখে যাওয়া মুড়ির বাটিটা হাত বাড়িয়ে টেনে নেয়।  তারপর সে মুড়ি খেতে লাগল। মুড়িটা আজ মুখে নোনতা লাগছে না। বেশ মিষ্টি মিষ্টি লাগছে। স্বাদটা আজ বদলে গেছে। ওর মনের ভেতর স্বপ্নের ডালপালা মেলছে আকাশে। ফুল এবার ফুটবেই। ও ভাবে মনে মনে। শহরে সে আবার খাটবে আর ছেলে দুটোকে পড়াবে। তার বাবা পারেনি তাকে পড়াতে। সংসারটাই ঠিকমতো চলত না। অভাব থেকেই যেত। জগু ওর মায়ের কষ্ট দেখেছে। পেট ভরে সে কখনও খেতে পায়নি। খিদেতে ছটফট করত। বারবার রাস্তায় যেত কখন বাবা ফিরবে বাজারের থলেটা হাতে নিয়ে। ওর নজর থাকত বাজারের থলের দিকে। সব স্বপ্ন ওই থলের মধ্যে থাকত। জগু রাস্তায় বসে থাকত। অনেক বেলা করে ওর বাবা ফিরলে তখন বাড়ি আসত ও। যা দুটো ফুটিয়ে দিত তাই ও মুখে দিত। একবারের বেশি দুবার চাওয়া যেত না ভাত। আধপেটা খেয়েই উঠে পড়তে হত। পেটের খিদে পেটেই থাকত। এ জীবনের কোনো মানে নেই। ওর বাবা মাটির দাওয়ায় এলিয়ে পড়ে থাকত। পিঠটাতে কালো দাগ। লাঠির চিহ্ন। ওই পিঠে যত দাগ পড়বে ততবেশি বাজার আসবে ঘরে। পেটপুরে খেতে পাবে। আর যে দিন দাগ পিঠে পড়বে না সেদিন বাজারও বাড়িতে আসবে না। খিদে পেটেই সবাই ঘুমিয়ে পড়বে মাটির দাওয়ায়। ওদের দুঃখগুলো ভাগ করে নেওয়ার কোনো মানুষ নেই। রাস্তায় চলতে চলতে একদিন শেষ হয়ে যাবে ওদের কথা। কেউ জানবে না ওদের ইতিহাস। এসব কথা লেখা থাকবে না কোন জায়গায়। এখনও বহু মানুষ আছে যারা দু’বেলা পেট ভরে খেতে পায় না। যারা কোনোদিন ভালো খাবার পায়নি। এসব মানুষগুলো  না খেয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে একদিন। এদের ব্যথার কথা কেউ শুনবে না।

জগু মুড়ি খেতে খেতে ভাবছিল এই সব কথা। তার মাথায় কত না কথা ঘুরপাক খায়। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। চোখে জল এসে পড়ে। মুখে কিছু বলতে পারে না। ছোটবেলার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়ে। কোন বাধা মানে না চোখ।

দেওয়ালে টাঙানো বাবার লাঠিটা দেখে বারবার। এই লাঠি ওদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। ওর বাবার স্মৃতি। ও ফেলে দিতে পারেনি। বড়ই যত্নে রেখেছে লাঠিটাকে। বাবার রক্তের স্পর্শ এখনও লেগে আছে। হাত দিয়ে ছুঁলেই মনে হয় তার বাবার স্পর্শ পাচ্ছে। পরম যত্নে ও হাত বুলিয়ে দেয়। আর মনে মনে বিড়বিড় করে বলে, তুমি আশীর্বাদ করো যেন আমার সন্তানদের মুখে দুধ ভাত তুলে দিতে পারি।

তারপর লাঠিটাকে মাথাতে ঠেকাই। যেন তার ভগবান প্রসন্ন হলো। কী মমতায় হাত বুলিয়ে দেয় জগু। যেন ও ভগবানের চোখে মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আজ মুড়ি খেতে খেতে একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। মুড়ি খেতে ভুলে গেল। তাকিয়ে থাকল লাঠিটার দিকে। যেন আজও বাবা ওর দিকে তাকিয়ে আছে পরম মমতায়।

তিন

সাগু আজ সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে গেছে। কর্তামার ছেলে শহর থেকে এসেছে। তাই বাড়িতে কাজের একটু চাপ আছে। রান্নাবান্না থেকে ঘরদোর পরিষ্কার করা, কাপড় কাচা সবই করতে হবে তাকে। সবই মুখ বুজে করে যায় ও। দুটো ভাতের আশায়। মাসকাবারি যা দেয় তাতে ওদের সংসারে কিছুই হয় না। প্রতিদিন যা অবশিষ্ট খাবার থাকে তা দিয়ে দেয় সাগুকে। ওরা রাতে ভাগ করে খায়।

জগুর জন্য ওর মনটা ভীষণ খারাপ করে। মানুষটা কবে সেরে উঠবে? ওর মুখের দিকে তাকানো যায় না যখন পেটের ব্যথা বাড়ে। যন্ত্রণায় ও কুঁকড়ে যায়। মুখ দিয়ে লালা ঝরে পড়ে। সারা রাত ঘুমাতে পারে না। কবিরাজি ওষুধ যা থাকে তাই ওর মুখে ঢেলে দেয়। পাশে বসে অসহায় হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো নাড়ে। তারপর এক সময় জগু ঘুমিয়ে যায়।

ভোর আসে জুগি পাড়ায়। এখানে কোনো সরকারি সাহায্য নেই। ওষুধ নেই। জল নেই। তবু জগুদের মতো মানুষ বেঁচে আছে কোনো রকমে।

সাগু মাথার কাছে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। বাচ্চার কান্নাতে ও উঠে-পড়ে। বাচ্চাটাকে কাছে টেনে নিয়ে দুধ খাওয়ায়। তার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে কাজে যায়। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে বাড়িতে। বাচ্চার জন্য একটও দুধ রেখে আসে। জগু সময়মতো বাচ্চাকে খাওয়ায়।

আজ সকাল সকাল এসেই, কর্তামার নির্দেশমতো কাজ করতে থাকে। কর্তামার ছেলে তখন ঘরে শুয়ে। ও ঘরে কাজ আছে। গতকাল দুপুরে যখন কাজ করছিল  তখন খাটে বসে কর্তামার ছেলে। মেঝে মুছতে মুছতে ওর ভরাট বুকের কাপড় খসে পড়ে হঠাৎ। এমন সময় কেমন লোভী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সাগু তাড়াতাড়ি কাপড় গায়ে জড়িয়ে নেয়। বড় বড় চোখ করে দেখে ওকে। সাগুর গা-টা কেমন শিরশির করে ওঠে।

হাতের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে ও বেরিয়ে আসে। ওর বুকের ভেতর কেমন যেন করতে থাকে। কর্তামার ডাকেও ওর মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। একটু ধাতস্থ হয়ে তারপর কথা বলে। এই ছোবল থেকে তাকে বাঁচতে হবে। তার সংসার আছে। জগু আছে। মনটা হঠাৎই খারাপ হয়ে যায়। কেমন ঝিম মেরে থাকে। সারাটা বেলা সে সাবধানে কাজ করে গেছে। দুপুরে খেতে দেওয়ার সময়ও ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে কেমন জাদু আছে। যে তাকাবে সে আটকে  যাবে।

সাগুর মনে কেমন পাপবোধ কাজ করে। ওর কর্তামার ছেলের চোখের সামনে থেকে সরে যায়। যতটা পারা যায় নিজেকে আড়াল করে রাখে।

আজ কাজ করতে করতে যতটা পারছে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। কাজটা না হলে ওর চলবে না। যার দয়ায় দিনপাত হচ্ছে। তার হুকুম পালন করতে হবে। এক অদৃশ্য বেড়ি দিয়ে যেন সে বাঁধা। সে সুতো ছিঁড়লেই ও বিপাকে পড়ে যাবে। এই গণ্ডির মধ্যে থেকেও সে নিজেকে বাঁচাবে। কাউকে কোনো দিনই সে ছুঁতে দেবে না। জগুর অবর্তমানেও না। এ শরীর শুধু জগুর।

মনে মনে সে দৃঢ প্রতিজ্ঞ। তার  সমস্ত মান সম্মান সে রক্ষা করবে। সাগু আপন মনে কাজ করে থাকে। বেলা বাড়ছে। কর্তামা ওকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে রান্না ঘরে ঢুকেছে। সকালের জল খাবার হবে। হাতের কাজ শেষ হলেই ময়দা মাখতে হবে। সকালের জল খাবার পরই দুপুরের রান্না শুরু হয়ে যাবে। আজ অনেকগুলো পদ রান্না হবে।  কর্তামা নিজ হাতেই আজ রাঁধবেন। ছেলে এসেছে অনেক দিন পর। তাই সকাল সকাল স্নান সেরে আজ রান্নাঘরে ঢুকেছেন। বাজার একটু পরেই এসে যাবে। আজ কর্তামাকে বেশ চনমনে মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে কোমরের ব্যথায় কাবু হয়ে যান। তখন সাগু মালিশ করে দেয়। কর্তামা সাগুকে স্নেহ করেন। বাল-বাচ্চার মা বলে ওকে সামনে বসিয়ে কখনও কখনও খাওয়ান। সাগু কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মাও এমন করে খেতে দিত। আজ তার মা নেই। কেউ নেই।

তার যাওয়ার জায়গার গণ্ডি ছোট হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বাতাস কমে যায় তার পৃথিবীর। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। জগু না সারলে তার যে কোনো উপায় থাকবে না। কেমন করে চালাবে সংসার? ও ভেবে পায় না। কেমন এক অন্ধকারে তলিয়ে যায়। পাড়া-প্রতিবেশী তার শরীরটাই দেখে কিন্তু তার পেটের খিদে কেউ বোঝে না। জগু পড়ে থাকাতে অনেকের যাওয়া আসা শুরু হয়েছে তার বাড়িতে। তাদের লোভী চোখ দিয়ে শুধু গিলে খায়। সে বোঝে তাদের চোখের ভাষা। তবু চুপ করে থাকে। নিজেকে যতটা পারা যায় আড়াল করে রাখে।

ঝাঁট দিতে দিতে হঠাৎ কর্তামার  ছেলের জানালার দিকে চোখ চলে যায়। কর্তামার ছেলে জানলা খুলে তার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। সাগুর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। ও তাড়াতাড়ি ঝাঁটা নিয়ে চলে আসে এদিকে। কর্তামা ওকে দেখেই বলে, সাগু, তোর হাতের কাজ শেষ  হলো? এদিকে আয়। ময়দাটা মাখ।

সাগু হাত ধুয়ে এসে ময়দা মাখতে থাকে। সকালের জল খাবার পর্ব শেষ হলে দুপুরে রান্না করতে বসবে কর্তামা। সাগুও ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ফিরতে তার আজ একটু দেরিই হয়েছে। জগুর পাশে বাচ্চারা ঘুমিয়ে। জগুর আধবোজা চোখ। সাগু ওদের খাইয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। চাঁদটা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে সাগুর দিকে। যেন কর্তামার বড় ছেলে। সাগু চাঁদকে  আড়াল করে পাশ ফিরে শোয়। তারপর একসময় ঘুমিয়ে যায়।

চার

সাগুর সারাটা দিন আজ বড় ধকল গেছে। গোটা শরীরজুড়ে ব্যথা। অথচ তার চোখে ঘুম নেই। ঘুম তার চলে গেছে দু’চোখ থেকে। এমন একটা খারাপ খবর সে শুনবে সে ভাবতেও পারেনি।

কাল সবই তো ঠিকঠাক ছিল। কর্তামা হঠাৎ এমন অসুস্থ হবে কে জানত!

সে খবর পেয়েই ছুটে যায় ও বাড়িতে। গিয়ে দেখছে গাড়িতে ধরে তুলছে কর্তামাকে।  বড় ছেলের চোখে জল।

সাগু অবাক হয়ে যায়। ওর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। ও কাঁদতে থাকে। তারপর একসময় গাড়ি চলে যায় শহরে। হাসপাতালে ভর্তি করবে কর্তামাকে। বাড়িতে তালা দিয়ে ওরা চলে যায়। সাগু কেমন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ওর এবার কী হবে? কর্তামাকে ঘিরে সে  বাঁচতে চেয়েছিল। যা দুটো জুটতো।

এক সময় ক্লান্ত পায়ে সে বাড়ি ফেরে। গায়ের কাপড় এলোমেলো। আজ কোনো দিকে নজর নেই। সে কেমন পাথর হয়ে গেছে। কর্তামার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে সে আর বাঁচতে পারবে না। সারা বিছানায় যেন কাঁটা বিছানো। সে ঘুমাতে পারে না। চোখ দুটো জ্বালা জ্বালা করছে। জগু এসব শুনে ভীষণ গম্ভীর হয়ে আছে। শুধু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বাধা দেয় না। জগুরও মনে কেমন কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে। ওরও চোখে ঘুম নেই। সকালে উঠে বাচ্চাগুলোকে কী খেতে দেবে? এ কথা ভাবতেই জগুর মন হু হু করে ওঠে। সারা রাত দু’জনে ঘুমাতে পারে না। খোলা আকাশের চাঁদটা আজ কেমন তেতো মনে হয়।

ওরা দু’জনে খোলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওখানে নাকি ভগবান বসে আছেন। ওদের মনের কথা শুনবেন।

জগু ভাবে মনে মনে।

তার মনের জ্বালা মিটবে তার কথায়। সে মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকতে থাকে। চোখের জলে ভিজে যায় রাত।

পাঁচ

বাচ্চার কান্না ওকে আর স্থির থাকতে দিল না। বিছানা থেকে কষ্ট করে উঠে বসে। আজ তাকে কিছু একটা করতেই হবে। হঠাৎ চোখ চলে যায় দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা লাঠিটার দিকে। তার পূর্ব পুরুষের বেঁচে থাকা শেষ সম্বল। জগু উঠে গিয়ে লাঠিটাকে কষ্ট করে নামায়। হাত দিতেই কেমন এক গন্ধ ওর নাকে পায়। যে গন্ধ ছোট বেলায় তার বাবার গা থেকে পেত সে। কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। যেন তার বাবা আজও আছে তার পাশে। লাঠিটা নিয়ে একসময় উঠোনে নেমে আসে। পেটের ব্যথাটা হঠাৎ চাড়া দিয়ে ওঠে। ও আজ কুঁকড়ে যাবে না। আজ যায়-ই ঘটুক। মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। ওর কষ্ট হয়। তবু সে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। এমন সময় সাগু ঘাট থেকে উঠে এসে বলে, ওগো… তুমি এ কি করছ? বসো গো… বসো!

ও কেমন পাগলের মতো করতে থাকে। কোনো কথা শোনে না। এক সময় বাড়ি থেকে লাঠিটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। মোল্লা পাড়ার খামারে এসে দাঁড়ায়। ও ডাকতে থাকে মানুষজন। হারিয়ে যাওয়া হাবু গান শোনা যাবে।

এক সময় অনেক মানুষ জড়ো হয়। ছেলে- ছোকরারা চেঁচামেচি করতে থাকে তাকে ঘিরে। অনেকে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে। তারপর এক সময় জগু শুরু করে তার গান। মুখে শব্দ করে আর মারতে থাকে পিঠে লাঠি। মানুষজন মজা পেয়ে হাততালি দিতে থাকে। কেউ কেউ কয়েন ছুড়ে দেয় তাকে লক্ষ্য করে। তার দুর্বল পিঠে দাগ পড়তে থাকে। এক সময় সে ঢলে পড়ে, পড়ে থাকা কয়েনের ওপর। তার জ্ঞান ফেরে না। লাঠি তার হাত থেকে খসে পড়ে মাটিতে। সে যেন চিরনিদ্রায় যেতে চায়। তারও ঘুম পেয়েছে। চির ঘুম।

জগু আর জাগে না। জমায়েত মানুষ হাত তালি দেয়। পয়সা ঝরে পড়ে তার ওপর। যেন ঈশ্বর আকাশ থেকে অন্নদানা ফেলছে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares