জানি না কোথা থেকে শুরু করব। নতুন আমার নতুন ডায়রি। লাল টুকটুকে ডায়রিটা হাতে পেতেই মনে হলো, আমার নাম ঊর্মি। ঊর্মি মানে ঢেউ। জীবনটা আসলে একের পর এক তরঙ্গের আসা-যাওয়ার মতোই। ভাবতেই টের পেলাম সমুদ্র-তীরের ঊষর বালুর মতোই আমার গায়ে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে; ছোটো ঢেউ, বড়ো ঢেউ। রাতের অন্ধকারে সমুদ্রের পানিতে ছিটেফোঁটা ফসফরাসের ঝিলিক আর ঊর্ধ্বলোকে তার চেয়েও বেশি আলো, কোনো ঊর্ধ্বগামী তারা হবে হয়তো, চারদিকে আরও অনেক কিছু… সেসব কথা ঊহ্য থাক। হয়েছে কী, ডায়রিটা টেবিলের ওপরে দেখার পরপরই আমার হঠাৎ মনে হলো দেখি তো ‘ঊ’ দিয়ে কী কী শব্দ জানি! আরও জানি, ঊরু। ঊরুর কথাটা যে আমার কেন মনে হলো! আচ্ছা, আমার ঊরুর দাগটা মুছল না কেন? লম্বালম্বি দাগটা যত দিন গেল চওড়ায়ও বেড়ে গিয়ে আরও বেশি স্পষ্ট হলো। এই কথাটা মনে হলেই আমার আর কিছু ভালো লাগে না। মন বেশি খারাপ হলে আমি নানান সংখ্যার কথা ভাবতে থাকি, ঊনআশি, ঊনচল্লিশ, ঊনত্রিশ, ঊননব্বই…

মাথার চুল দশ আঙুলে আঁকড়ে ধরে মাথাটাকে হাঁটুতে ঠেকিয়ে তখন বিছানার শেষ মাথায় বসে সংখ্যাগুলো উচ্চারণ করতে থাকি আমি। তরী তখন হয়ত বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে আমার কাছে আসে। আস্তে আস্তে আমার এলোমেলো চুলের ওপরে হাত বোলায়। আমি ধীরে ধীরে মাথা ওঠাই। তরী ভয় পায়, দুশ্চিন্তায় এত বেশি ডুবে গেলে আমার খিঁচুনি উঠে যাবে। সে তখন আমাকে নিয়ে বিপদে পড়বে। প্রায়ই তরী তাই প্রথমে ‘আপু, আপু’ বলে খানিক কাঁদে, কেঁদে নিয়ে বলে, ‘ডাক্তারের কাছে চলো।’ আমি তার কথা শুনি না। এই সমস্ত সমস্যায় আবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া কেন! আমার তো জ্বর আসেনি, সর্দি কী ভয়ানক কোনো কাশিও হয়নি। পাঁচ বছর আগে কি তেরো বছর আগে কী হয়েছিল, তার জন্য কেমন ভুগছি, এই সমস্ত গল্প ডাক্তারকে কেন শোনাতে যাব? তাই যাই না। আর ওসব আসলে গল্পই বটে। মাঝেমধ্যে আমি নিজেও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, ওই কাহিনিগুলো আমার, মানে ঊর্মির, নাকি টুম্পার, নাকি পপির। তরীকে, বলতে গেলে, অনেক কিছুই বলেছি। সে জানে কাহিনিগুলো তার আপুর। আবার অনেক কিছু বলিওনি; তরী ভয় পাবে, তাই বলিনি। এই জায়গাটাতে, মানে, এই পৃথিবীতে, এই বিষণ্ন শহরটাতে ওকেও তো ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে হবে, মানুষ হতে হবে।

ঊনিশ, ঊনআশি, ঊনচল্লিশ, ঊনত্রিশ, ঊননব্বই… অনমনস্ক থাকলে হাতটা প্রায়ই ডানদিকের ঊরুর ওপরে চলে যায়। বাইন মাছের মতো উঁচু হয়ে থাকা বাঁকানো দাগটায় হাত বোলাই। আঙুল বোলালে মনে হয় ভিতরে লম্বালম্বি দড়ির মতো হয়ে থাকা মাংসপেশি নড়েচড়ে, যেন কোনো কথা বলে। কোনো গোপন কষ্ট হুট করে বলার মতো কাউকে পেয়ে হড়বড় করে বলতে চায়। আমি, ঊর্মি, তখন তার সঙ্গে কথা বলি, ‘তোমার ঊরুতে এই ভয়ানক দাগটা কী করে হলো, বলো তো?’

‘হ্যাঁ, দেখ না, আমার ঊরু না শুধু, পুরো শরীরটাকেই লম্বা দাগটা দুটো ভাগ করে দিয়েছে। তারপর থেকে আর কিছুতেই আমি আস্ত একটা মানুষ হতে পারলাম না,’ আমার ভিতর থেকে পপি উত্তর দেয়।

পপি, আমি জন্মানোর পরে মা এই নাম রেখেছিল। ফুলের নামে নাম, ডাকতেও সহজ। আমি তখন ফুলের মতোই ছিলাম। ঝড়ের কবলে পড়ার আগে ছোট্ট একটা ফুল যেমন সূর্যের আলোয় ঝলমল করে। কিন্তু দাগটা কী করে হলো তা বলতে গিয়ে পপি কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেঁদে-টেদে নিয়ে নাক মোছে ওড়নায়। তারপর বলে, ‘আমি না এত সরল ছিলাম, তেমনি ছিল আমার মা-ও। আর সরলরা আসলে বোকা, বোকা বলেই জটিলতা তাদেরকে চট করে ঘায়েল করতে পারে না। দাগটার কথা বলতে গেলে তোমাকে বলতে হয়, আমার বয়স যখন এগারো প্রায়, তখন হলো কী একদিন…’ বলতে বলতে কী যেন ভেবে পপি থেমে যায়।

‘একদিন কী হলো?’ আমি চোখ মুছতে মুছতে তার কাছে জানতে চাই।

‘বাবার এক বন্ধু বহু বছর বাদে বাবাকে দেখতে আসে। শরিফুল চাচা। বাবা খুব খুশি, দিন-রাত আড্ডা চলতে থাকে। শরিফুল চাচা অন্তত দুই মাস থাকে আমাদের বাসায়। আমার মা তখন এমনিতেই খুব ব্যস্ত। আমি জন্মানোর দশ বছরেরও বেশি পরে তরী সবে জন্মেছে। তার বয়স তখন ছয় মাস। দিনভর মা ঘুরে ঘুরে সংসারের কাজ করে, বিছানায় পড়ে থাকা বাচ্চা একটু পরে পরে ট্যাঁ ট্যাঁ করে, সেটা সামলে মা মেহমানের জন্য ভালোমন্দ রান্নাও করে।’

‘তারপর?’

‘বাবা অফিস থেকে ফিরলে যখন শরিফুল চাচা আর বাবা আড্ডা দিতে বসে আর গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেয়। প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় মাকে উঠে গিয়ে চা বানিয়ে আনতে হয় তখন। ছোট্ট সংসারটাতে আমার জগৎ আরও বেশি গুটিয়ে যায়। আমার অস্তিত্ব মায়ের তেমন মনে থাকে না। আমি যে ঘরটাতে থাকতাম, সেখানে তখন শরিফুল চাচা থাকে। রাতে ঘুমানোর সময়ে আমার ঠাঁই হয় তোষক বিছিয়ে মা-বাবার ঘরের মেঝেতে। কিন্তু তারা যখন ওই ঘরে আড্ডা দেয়, আমি আমার নিজের ঘরের এক কোণে বসে স্কুলের হোমওয়ার্ক করি। তখন মাঝেমধ্যে শরিফুল চাচা কী করত জানো?’

‘কী করত?’

‘ঘর থেকে সিগারেট নেওয়ার কিংবা তার স্যুটকেসে কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করার নামে কয়েক মুহূর্তের জন্য ওই ঘরে আসত। অল্প সময়ের মধ্যে আমার বুক আর সারা শরীরে হাতিয়ে চলে যেত।’

‘কিছু বলতে না তুমি!’

‘আমি জানতাম না কী বলতে হয়। কাঠ হয়ে থাকতাম। শুধু শরীরটা কুঁকড়ে দুই দেয়ালের কোণের মধ্যে নিজেকে ঠেসে ধরতাম। আমি জানতাম না চাচা আমার সাথে কী করে আর এই কথাটা কাউকে কীভাবে বলা যায়। কিছু বোঝার আগেই ঘটনাটা ঘটে যেত। তারপর শরিফুল চাচা সিগারেট নিয়ে পাশের ঘরে চলে যেতেন, পরমুহূর্তে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার হাসিঠাট্টা শোনা যেত, যেন খানিক আগে কিছুই হয়নি।’

‘না না, তুমি বলতে পারতে কাউকে…’

‘ঘুমানোর আগে যখন আমি ওই ঘরে যেতাম, মা-বাবার সামনে চাচা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলত যে আমি কত মনোযোগ দিয়ে পড়ি, কত লক্ষ্মী একটা মেয়ে, এটা-সেটা কত কী। মা-বাবা খুব খুশি হতো। আমি আগের মতোই কাঠ হয়ে থাকতাম। যদিওবা কোনোদিন ভাবতাম মাকে বলব শরিফুল চাচা আমার গায়ের কোথায় কোথায় হাত দিয়েছে, কিন্তু তখন তার নিরীহ মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হতো, আমার কথা কে বিশ্বাস করবে! এমনিতেও মা প্রায়ই বলত আমি নাকি বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলি। আসলে আমি প্রায়ই স্বপ্নের কথা বলতাম, আমি স্বপ্ন আর বাস্তবের পার্থক্য বুঝতাম না। স্বপ্নে কিছু দেখলে আমার মনে হতো এই ঘটনাটা কখনও ঘটেছে।’

পপির কথা শুনে আমি চুপ মেরে যাই। এই পপিটা এত ঝামেলা সহ্য করত তবু বলত না কেন তা নিয়ে আমার কিছু ক্ষোভও হয়। কিন্তু পপি তো তার অপারগতার কথা বলেছেই তাই চাইলেও তার সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিতে পারি না। আমার মৌনতায় পপি হঠাৎ বলে, ‘তখন জানো, আমার কেমন যেন মনে হতো আমি পপি নই। আমি অন্য কেউ। বিশেষ করে যখন শরিফুল চাচার বড়ো বড়ো দুটো হাত আমার দিকে এগিয়ে আসত, আমি আমার ছোটো হাত দিয়ে তার হাতের কোঁকড়ানো লোমগুলো মুঠি করে ধরে হাত দুটোকে থামাতে চেষ্টা করতাম, মনে হতো আমি যেন অন্য কেউ। অন্য কারও শক্তি ভর করত আমার গায়ে কিন্তু তাতে অবশ্য কোনো লাভ হতো না। শরিফুল চাচার শক্তির কাছে সেটা কিছুই নয়।’

‘আহা রে…’ আমি বলি। পপি বলে, ‘তরীকে প্রথম যখন আমি শরিফুল চাচার গল্পটা এ পর্যন্ত শুনিয়েছিলাম, সেও ঠিক এভাবেই বলেছিল, আহা রে, ইস্!’ সে কথাটা আমারও মনে পড়ল। তবে তরীকে যখন বাধ্য হয়ে শরিফুল চাচা সম্পর্কে শেষ কথাটা বলতে হয়েছিল, সে প্রথমে রেগে গিয়ে চিৎকার করেছিল, তারপর গুনগুনিয়ে কাঁদতে লেগে গেল।

‘কেন বলেছিলে তবে তাকে? কী দরকার ছিল বলার?’ আমি পপির কাছে বিরক্তিভরা গলায় জানতে চাই।

‘দরকার ছিল। না হলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে কী করে আনতাম আমার কাছে?’ আমার কথার উত্তরে পপির পাল্টা প্রশ্ন শুনে আমি হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ি। কাঁদতেই থাকি আর লালায় জড়ানো উচ্চারণে বলতে থাকি, ‘কী হলো এনে, কী হলো এনে!’

‘না আনলে কী হতো তুমি জানো?’ পপি রেগে যায় আমার ওপরে। আমি চুপ করে থাকি আর সে বলতে থাকে, ‘একদিন সন্ধ্যায় তরীর জ্বর এলো। মায়ের ঘরে বাবা আর শরিফুল চাচার আড্ডা জমল না। তারা আমার ঘরে বসল। কিন্তু রাত বাড়তে থাকলে তরীর জ্বরও বাড়তে থাকল। শেষে মা এসে বলল ডাক্তারের কাছে নিতে হবে, মনে হয় নিউমোনিয়া। বাবা আর মা তরীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে চলে গেল। আমি মায়ের ঘরে গিয়ে ঘুমালাম। ঘুমের মধ্যে দেখলাম লোমশ ভারী শরীর আমাকে চেপে ধরেছে। হ্যাঁ, স্বপ্নে যা দেখতাম তা অনেক সময় সত্য বলে ধরে নিতাম বটে, কিন্তু বিশ্বাস করো, সব স্বপ্নের গল্প আমার বানানো না। সত্যি সত্যি শরিফুল চাচা আমার গায়ের উপরে ছিল, আমাকে পিষে মেরে ফেলতে চাচ্ছিল। পরে দেখলাম মেরেছে, তবে অন্যভাবে।’

‘তারপর? অনেক রাতে মা-বাবা এলো। অনেক কাঁথা-কম্বল মোড়ানো তরীকে কোলে নিয়ে মা বসে ছিল। আমি মায়ের কাছে গিয়ে কিছু না বলে শুধু প্যান্টটা খুলে তার হাতে দিলাম, ভেজা ছিল, কিছু রক্ত কিছু থকথকে তরল, মা দেখে আঁতকে উঠল। তবে চিৎকার দেওয়ার বদলে মা কোলের মধ্যে তরীকে এক হাতে চেপে ধরে আরেক হাতে আমার মুখটা চেপে ধরল। ভয়ার্ত গলায় বলল, খবরদার কাউকে বলিস না কিন্তু! মা নির্লিপ্তভাবে কাঁথার পুটলির মধ্যে তরীকে বিছানায় রেখে আমার প্যান্টটা ধুতে গেল। আমি তার পিছনে পিছনে গোসলখানা অব্দি গেলাম, ফ্রক উঠিয়ে আমার উরুটা দেখালাম। লম্বালম্বি এঁকেবেঁকে চিরে গেছে, ভিতরের সাদা মাংস দেখা যাচ্ছিল, রক্ত গড়িয়ে হাঁটু বেয়ে নিচে পড়ছিল। মা একই রকমের নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাত দিয়ে রক্ত মুছে নিল, সামান্য চিন্তিত মুখে বলল, ইস্! হারামজাদার প্যান্টের চেন দিয়ে তোর গা ছিঁড়ে গেছে!’

পপির কথা শুনে আমি আমার ঊরুর বাইন মাছটার ওপরে হাত রাখি। ভিতরের দড়িটা নড়েচড়ে ওঠে। পপি বলে চলে, ‘শরিফুল চাচা আরও এক সপ্তাহ ছিল। কিন্তু তরীর জ্বরের কারণে আড্ডা বসত আমার ঘরে আর আমি থাকতাম মায়ের কাছে।’

‘বেঁচে গেছ তাহলে তার পর থেকে,’ ধীরে ধীরে বলি আমি।

‘বাঁচলাম কোথায়, পপি তো মরে গেল। ওভাবে আত্মসম্মান গুঁড়িয়ে দিলে আর কেউ বাঁচে নাকি! পরদিন থেকে তাই আমার মনে হতে লাগল আমি মৃত, আমি অদৃশ্য, আমার কোনো অস্তিত্ব নেই, কেউ আমাকে হালুম করে খেয়ে চলে গেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমাকে আবার থাকতেও হচ্ছে। তাই মায়ের বিছানায় দিনরাত গড়াগড়ি করতে করতে বুঝতে পারলাম আমি আসলে আর পপি নেই, টুম্পা নামের একটা মেয়ে হয়ে গেছি। পপি খানিকটা মরে গিয়ে ছিঁচ কাঁদুনে হয়ে গেছিল, দিনভর পড়ে পড়ে শুধু কাঁদত। কান্নায় কান্নায় ধীরে ধীরে আরও মরতে লাগল। আমার মনে হলো, তার চেয়ে বরং টুম্পা হয়ে ভালোই হয়েছে। টুম্পা ঠিকঠাকমতো স্কুলে যাবে, হোমওয়ার্ক করবে আর নিজেকে সামলে বরাবর বেঁচে থাকবে।’

‘তারপর?’ টুম্পার কাছে জানতে চাই।

‘আমি কারও সঙ্গে কথা বলতাম না। আমি আসলে কথাই বলতাম না। শুধু মন খারাপ বা রাগ হলে বিড়বিড় করে সংখ্যা বলা শুরু করতাম। তাতে খানিকটা আরাম হতো। ভেবে দেখ, ভিতরে ভিতরে পপির লাশ বয়ে বেড়ানো একটা মেয়ে কী করে কথা বলবে? কিছু বলতে গেলেই লাশের স্মৃতি উগরে আসত। বুকের ওপরে পপির লাশের ভার নিয়ে আমি একসময় বাবা-মা আর আদরের ছোট্ট তরীকে ফেলে এই শহরে চলে এসেছিলাম।’

‘হ্যাঁ, তারপর থেকে কী হয়েছে তা আমার কিছুটা মনে আছে,’ মাথা দুলিয়ে টুম্পাকে বলি আমি।

‘কী আর, আমি তখন কলেজে পড়ি আর তরী ক্লাস টু-তে। মায়ের ওপরে রাগ আর ক্ষোভ দিনে দিনে এত বেড়েছিল যে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতাম না। বাবার সঙ্গে করতাম টাকার দরকার পড়লে আর কোনো ছুটিতে বাড়িতে দু’দিনের জন্য যেতাম শুধু তরীকে দেখতে। কিন্তু তারপরে একদিন হলো কী, ছুটিতে বাড়ি গিয়ে দেখি শরিফুল চাচা এসেছে। আমাকে একা পেতেই ঠিক আগের মতো পিছন থেকে পিঠের ওপরে আলতো ছুঁয়ে হাতটাকে পিছলে আমার বুকের ওপরে নামিয়ে দিল। শরিফুল চাচা জানত না যে আমি পপি নই, আমি টুম্পা। বুকে হাতের চাপ শক্ত হতেই আমি এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালাম। আমার প্রমাণ আকৃতির দুই হাত তার বুকে ঠেকিয়ে দিলাম এক ধাক্কা। অপ্রত্যাশিত ধাক্কার টাল সামলাতে না-পেরে সে মেঝেতে পড়ে গেল, মাথাটা লাগল খাটের কোণে। পাশের ঘরে বাবা-মা ছিল, খাটে বাড়ি খাওয়ার শব্দ হতেই বাবার গলা শুনলাম। বাবা জানতে চাইল কীসের শব্দ হয়েছে। আমি টু-শব্দ করলাম না। শরিফুল চাচা মাথায় মালিশ করতে করতে কোনোরকমে উঠে দাঁড়াল, ধীরে ধীরে বলল হাঁটতে গিয়ে ধাক্কা লেগে চেয়ার উল্টে গেছে। তারপর আমার দিকে চোরা দৃষ্টিতে তাকিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য তৈরি হলো। আমার উদ্যত হাত টেবিলের ওপর থেকে অ্যালুমিনিয়ামের পাতের স্কেল আর ধারালো কম্পাস খুঁজে নিয়ে ততক্ষণে তৈরি। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে দ্বিতীয়বার তাকিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। তার খানিক পরে বাবা বা মা, কাউকে না-বলে আমি তরীকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে এলাম। বাবা খুব অবাক হয়েছিল। পরে এসেছিল দেখতে, বারবার জানতে চাচ্ছিল কেন তরীকে চুরি করে এনেছি। আমি দৃঢ় গলায় বারবার উচ্চারণ করেছি, তরী এখন থেকে আমার কাছে থাকবে। মা কোনো প্রশ্ন করেনি। নির্বাক চোখে তরীকে দেখেই চলে গেছে।’   

আমি টুম্পার কথা শুনে হু হু করে কাঁদি। টুম্পা বলে, ‘অ্যাই বোকা মেয়ে, কাঁদছ কেন বলো তো? তখন যদি তরীকে না আনতাম তাহলে সুযোগমতো ওর সঙ্গেও শরিফুল চাচা তাই করত যা তোমার সঙ্গে করেছিল।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি জানি কিন্তু এনে কী লাভ হলো বলো তো? এখন কী করি আমি? ওই ঘরে গিয়ে দেখ, তরীর রক্তে সারা ঘর মাখামাখি। বাবা-মা এই এসে পৌঁছল বলে। কী জবাব দেব আমি? আমার তরীর এই হাল হলো কী করে, কী করে বলব বলো তো?’

টুম্পার সঙ্গে কথা আর চালিয়ে নিতে পারি না। কাঁদতে কাঁদতে বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে বসি। বিছানার উপরে মাথা রেখে আমি, ঊর্মি, চিৎকার করে কাঁদতে থাকি, একা একাই ঊর্মি, টুম্পা আর পপির সমস্ত কান্না কেঁদে যাই। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে দুর্বোধ্য উচ্চারণে তরীকে বলি, ‘তরী, এই দেখ, আমি এসে গেছি। তোর আর কোনো ভয় নেই। আমার চোখের সামনে দিয়ে পৃথিবীর কোনো শকুন তোকে ছুঁতে পারবে না।’

দুই.

আমি শেষ পর্যন্ত মরেই গেলাম রে, আপু!

তুই আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলি, আমিও অনেক চেষ্টা করেছিলাম, বিশ্বাস কর। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে গেলাম। আমি মরে গেলে তুই যে খুব একা হয়ে যাবি, তাই মোটেও মরতে চাইনি। কিন্তু কী করব, যেখানে আমাকে বাঁচানোর জন্য এনে রাখলি তা তো এই পৃথিবীর বাইরের কোনো জায়গা নয়। তাই এই পৃথিবীর নিয়মই সেখানে চলে। সেখানেও সুযোগ পেলে কোনো শকুন ছোঁ মারতে ছাড়ে না। আমার শুধু কষ্ট লাগছে এই ভেবে যে আমার এই অবস্থা আর তারপর মরে যাওয়ার ধাক্কা তুই কীভাবে সহ্য করবি! তুই হয়তো আবারও আরেকজন হয়ে যাবি যে এই শোক কাটিয়ে নোংরা পৃথিবীতে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নতুন ফন্দিফিকির করতে পারে। নিজেকে শান্ত রাখার জন্য তুই তা করতে পারিস বটে। কিন্তু শেষপর্যন্ত বাঁচা কি আসলেই যায়, আপু? রাস্তায়, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিসে, বাজারে, বাসে, এমনকি নিজের ঘরে, এই আমার মতো, কোথায় কে বেঁচে থাকে বল তো? কেউ রক্তারক্তি করে মরে আর কেউ তোর মতো শরীরের ভিতরে লাশ বয়ে বেড়ায়, পার্থক্য এটুকুই।

যা হোক, তুই আমাকে খুব ভালো রেখেছিলি রে, আপু। ব্যস্ত শহরের ঘিঞ্জি এই জায়গাটাতে একটা মাত্র ঘর-বারান্দা, ছোট্ট একটু ওঠাবসার জায়গা আর রান্নাঘর, যেখানে দুটো চেয়ার পেতে তুই আর আমি আরাম করে খেয়ে নিতে পারতাম, সব মিলিয়ে দারুণ সংসার ছিল আমাদের। ক্লাস শেষ করে তারপর অফিসও শেষ করে ক্লান্ত তুই যখন বাড়ি ফিরে দেখলি দরজাটা সামান্য ফাঁক রেখে ভেজানো, তুই নিশ্চয় মনে মনে আমাকে বকা দিয়েছিস যে আমি দরজা আটকে রাখি না, আমার বরাবরের বদভ্যাস। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি দরজা আটকেই রেখেছিলাম। আর তোর কথামতো, বেল শুনে ফুটো দিয়ে বাইরে দাঁড়ানো মানুষটার মুখ না দেখা পর্যন্ত খুলিনি। তুই নিশ্চয় বুঝতে পারছিস, দরজার ওপারে কাকে কাকে দেখলে আমি দরজা খুলি? পুলিশ এসে দেখবি ঠিকই বের করে ফেলবে; দরজা ভাঙেনি, বাইরে থেকে কেউ একটা শব্দ পর্যন্ত শোনেনি, এটা চেনা মানুষ ছাড়া আর কে, বল? নীচের দারোয়ান কি আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলেও জানা যাবে নতুন কেউ ঢোকেনি বাড়িতে। আমি ছোটো হলে কী হবে, ঠিকই জানি, পৃথিবীতে সমস্ত খুনের বেশিরভাগ করে চেনা লোক, খুব আপন কেউ।

তুই নিশ্চয় এতক্ষণে মাথার মধ্যে ঝড় তুলে দিচ্ছিস যে আমার এই হাল কে করল। নাকি তুই এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছিস? তোর তো অনেক বুদ্ধি। না হলে এই অপরিচিত শহরে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সংগ্রামের মধ্যে যাবার কথা ভাবতে পারিস! কিন্তু আপু, তার নামটা তোর সামনে মুখে আনতে পারছি না। কী করে তোর বুকটা ভেঙে দিই বল তো? আমাকে যা করেছে, করেছে, তা নিশ্চয় সবাই দেখবেও এখানে এলে বা খবরে, পত্রিকায়। কিন্তু তোর ভাঙা বুকটা কে দেখবে আমি ছাড়া? আমি তো আর নেই যে জড়িয়ে ধরে সান্ত¦না দেব, নিষ্ঠুর পৃথিবীর প্রতি তোর অজস্র নালিশ চুপচাপ শুনে যাব। আমার নিজের জন্য না রে, শুধু তোর জন্যই কষ্টে মরে যাচ্ছি। মরে গিয়ে কেউ আবারও মরে নাকি? মরে হয়তো, না হলে আমার এত খারাপ লাগছে কেন?

আমি জানি তুই ছোটোবেলার সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি অনেকটা ভুলে যেতে পেরেছিস। কিছুটা সময়ের স্রোতে, কিছুটা প্রেমে। তুই জানিস, প্রেম তোর জীবনে খুব দরকার ছিল। আমি নিজেও প্রায়ই ভাবতাম তোর একটা প্রেম হোক। তোকে বলিনি, কান মলে দিয়ে পাকামি বলে উড়িয়ে দিবি। আমি সত্যি চেয়েছিলাম প্রেমে পড়ে তুই একেবারে অন্য মানুষ হয়ে ওঠ, শুধু দুর্ঘটনাই কেন বদলাবে তোকে, ভালো কিছু কেন নয়? আর কেউ জানুক না-জানুক, আমি তো জানি ছোটোবেলার অপমানের স্মৃতি কখনও তোর পিছু ছাড়েনি। তুই আমাকে বলিসনি কিন্তু আমি জানি যে বছর দুয়েক আগে শরিফুল চাচার সঙ্গে তুই ফোনে কথা বলেছিলি। আমি খুশি হয়েছিলাম ভেবে যে অনেক বছর পরে হলেও তুই তোর মনের ঝাল কিছুটা মেটাতে পেরেছিলি। তোর জন্য ওটার বড় প্রয়োজন ছিল। আমি বাথরুমে ছিলাম তখন, এ বাড়িটা আসলে এতই ছোটো, সবখানের কথা সবখান থেকে শোনা যায়। বাবা সম্ভবত তোর ফোন নম্বর দিয়ে শরিফুল চাচাকে বলেছিল যে এই বিশাল শহরে আমাদের কেউ নেই, তিনি যেন মাঝেমধ্যে এসে আমাদের খোঁজখবর করেন। আমার খুব ভালো লেগেছিল, ফোনে তুই তার পরিচয় পাওয়া মাত্রই চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলি, ‘হারামজাদা, তুই আমাদের বাড়ির সীমানায় এলে আমি পুলিশ ডাকব। তারপরও যদি বাড়িতে ঢুকিস তাহলে আমরা দুইজন মিলে তোকে কুচি কুচি করে কাটব, তোর ওইটা কাটব সবচেয়ে আগে…’

তুই জানিস, তুই আমার বোন আর মা হয়ে এসেছিস পৃথিবীতে। কারণ মায়ের আদরের চেয়ে তোর আদরই বেশি স্মরণীয় আমার কাছে। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে তুই আমাকে আগলে রেখেছিস। মা-বাবাকে কাছে ভিড়তে দিসনি। তোর কাছে থাকার নয় বছরের কাছে আমার বাবা-মায়ের কাছে থাকার সাত বছর অনেক আগে হেরে গেছে। আমি ধীরে ধীরে তোকে জেনেছি, চিনেছি। রাতে ঘর অন্ধকার করে যখন তুই আমাকে রূপকথার গল্প শুনিয়েছিলি তখন জানালা দিয়ে আসা আবছা আলোয় আমি তোর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছি, তোর গল্পের রাক্ষসের যেমন প্রাণভোমরা থাকে, আমি তোর সেই প্রাণভোমরা। তাই তো তোকে নিয়ে এত ভাবছি, ভোমরা মরে যে গেল, কী করে বাঁচবি তুই!

মনে আছে তোর, যেদিন এসে বলেছিলি রাশেদ ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম হয়েছে তোর, আমি কত খুশি হয়েছিলাম। তুই জানতে চাচ্ছিলি আমার হিংসা হচ্ছে কি না। আমি বলেছিলাম হচ্ছে না। আসলে হয়েছিল, আমি গোপন করেছি। ঠিক যেমন তুই গোপন করেছিলি যে আমার হিংসাটা তুই সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলতে পেরেছিস। আমরা কেউ কাউকে দুঃখ দিতে চাইনি। এটা বললাম দেখে পাকামি মনে করছিস? আমি তো আর তত ছোটো নই রে। এই ডিসেম্বরে ষোলো হতাম। যা হোক, খুব হিংসা হয়েছিল যে তুই বুঝি এখন থেকে রাশেদ ভাইকে বেশি ভালোবাসবি, আমাকে কম। এমনকি বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাঝরাতে তুই যখন ফিসফিস করে রাশেদ ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতি, পাশ ফিরতে গিয়ে ঘুম ভেঙে আমার মনে হতো, এই এখনই আমার তোকে জড়িয়ে ধরে চোখ বোজার দরকার, না-হলে কিছুতেই ঘুম আসবে না। আমি না পেয়ে কেন ওই রাশেদ ভাই পাবে আমার আপুকে? বললে তুই হাসতি নিশ্চয়, তাই বলিনি। কিন্তু অন্ধকারে হাতড়ে বিছানায় ফিরে আসার পরে তোকে যে চেপে ধরেছিলাম, তাতেই তুই নিশ্চয় আমার মনোভাব জেনে গেছিস? কখনও আমিও চেয়েছিলাম না যে তুই জেনে যা, এত যে হিংসা হচ্ছে, একটু-আধটু না জানালে চলে?

ধীরে ধীরে রাশেদ ভাই আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া শুরু করল। অফিস থেকে তোর সঙ্গে প্রায়ই সোজা আমাদের বাড়ি। এ বাড়িতে আসার পর থেকে রাশেদ ভাই ছিল আমাদের বাড়ির একমাত্র অতিথি। তার জন্যই শেষে আমরা ট্রে কিনলাম, চায়ের নতুন মগ কিনলাম। তবে এটা ঠিক যে পরে আর তাকে হিংসা করতাম না, তুই একদিন বলেছিলি মনে আছে, বলেছিলি, ‘শোন, তোকে বোনের মতো আদর করি আর ওকে প্রেমিকের মতো। তুই তো আমার বোনও আবার বাচ্চাও, তুই আর অন্য কেউ এক হলো?’ আমি হেসেছিলাম কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝেছি, কথা ঠিক। তুই বারান্দায় বসে তার সঙ্গে চায়ের কাপ হাতে হাসাহাসি করতি, আমার ভালোই লাগত। আমার পরিষ্কার মনে আছে, রাশেদ ভাইয়ের আসা-যাওয়ার পর থেকে তোর ভিতরের ‘পপি’ আর দুঃখের কথা বলত না।

তবু একটা কথা জানতে না-চেয়ে পারছি না, একদিন চা বানিয়ে এনে তুই বারান্দায় ঢুকতে গিয়ে দেখলি যে রাশেদ ভাই আমার ঘাড় থেকে হাতটা সরিয়ে নিল। আধা সেকেন্ডের জন্য সেদিকে চোখ পড়তেই তোর মুখটা বদলে গিয়েছিল, আমার স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু পরমুহূর্তে ভাবনাটা উড়িয়ে দিয়ে চায়ের মগ এগিয়ে দিয়েছিলি তার দিকে। এটাই শুধু একটা অভিযোগ তোর বিরুদ্ধে আমার, কেন বুঝতে চাইলি না সে আমার গায়ে কী উদ্দেশ্যে হাত দিয়েছিল? তোর ভালোবাসা হারিয়ে যাবে বলে নাকি অন্ধ বিশ্বাস ছিল তোর? তোর মতো মানুষেরও অন্ধ বিশ্বাস থাকে? আমি ছোটো তো তাই বুঝিনি হয়তো, ভালোবাসা আসলে অন্ধই। 

কিন্তু  এ তো সেই একই অভিযোগ যা তোর ছিল মায়ের বিরুদ্ধে? কেন যুগ যুগ ধরে আমরা যা মনে আসে তা মুখ ফুটে উচ্চারণ করি না, বলতে পারিস? কেন ভেবে নিই নিজের মতো কিছু, চোখে যা অন্যায় ঠেকে তা কেন মেনে নিই?                

তিন.

‘নেব না নেব না, দেখে নিস,’ আমি হঠাৎ চিৎকার করে উঠি। ও ঘর থেকে সবাই আমার চিৎকার শুনে কী ভাবছে তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। আমি তরীর কথার জবাব দিচ্ছিলাম, উত্তেজনায় চিৎকার করে ফেলেছি। ওই ঘরে পুলিশ সবকিছু খতিয়ে দেখছে। কয়েক সেকেন্ড পরে পরে ক্যমেরার সাটারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমার তরীর এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা রক্তমাখা নিথর শরীরের ছবি উঠছে বিভিন্ন কোণ থেকে। ওদের ওই সমস্ত তামাশা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না বলে রান্নাঘরে এসে বসে আছি। ছোট্ট একটা কাঠের টেবিল আর দুটো চেয়ার। টেবিলটা এত ছোটো যে আমার আর তরীর দুটো প্লেট আর ভাত তরকারির দু-তিনটা বাটি রাখলে পুরোটা লেগে যায়। সকালে আমি নাস্তা খাওয়ার সময়ে তরী এই লাল ডায়রিটা এনে হাতে দিয়েছিল। আমার জন্য উপহার, স্কুলের কাছের কোনো দোকান থেকে কিনেছে। সুন্দর ডায়রিটা দেখে আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, ‘তুই আবার টিফিন না খেয়ে…’ সে তাড়াতাড়ি বলেছিল, ‘না রে বাবা, খাওয়ার পরেও টাকা বাঁচে অনেক সময়।’ সকাল থেকে ডায়রিটা ওই টেবিলেই পড়ে ছিল। তরী কি জানত আজ ঊর্মি এই ডায়রিটাতে লেখা শুরু করবে? টেবিলের ওপরে ডায়রি মেলে আমি তাতে হাত বোলাই, ‘তরী, তরী’ বলে কাঁদতে থাকি।

রাশেদের সঙ্গে আমার চার বছরের সম্পর্ক। এই নির্মম পৃথিবীতে, যেখানে নিজের মায়ের ওপরেও ভরসা করা যায় না সেখানে রাশেদকে আশ্রয় হিসেবে পাই আমি। দুই বছর হলো রাশেদ আমাদের এই বাসায় যাওয়া-আসা করছে। বাড়ি ফিরে তরীকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাইরের দরজার পাশে পড়ে থাকতে দেখে আমি কেবল দুটো ফোন করেছি। প্রথমটা রাশেদকে, দ্বিতীয়টা বাবাকে। বাবা-মা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রেনে উঠেছে, পেঁৗঁছতে হয়তো আরও ঘণ্টা তিনেক লাগবে। রাশেদ ফোন ধরেনি। তারপর থেকে দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে রাশেদ কল ব্যাক করেনি। আর এখন ফোন সুইচ্ড অফের রেকর্ড করা মেসেজ শোনা যাচ্ছে। ‘এই সমস্ত কিছু কী ইঙ্গিত করে?’ আমি টুম্পাকে জিজ্ঞাসা করি।

‘আমি রাশেদকে অনেক ভালোবাসি,’ টুম্পা কাঁদতে থাকে।

‘কিন্তু যুক্তি কী বলে, এই বাসার দরজা দিয়ে রাশেদ ছাড়া আর কেউ সহজে ঢুকতে পারবে না। বেল শুনে  তরী নিজে দরজা খুলেছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে,’ আমি তাকে বলি।

‘আর তরী স্কুল থেকে এসে দরজা খুলতেই কেউ যদি তাকে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয়? ধরো আগে থেকেই কেউ ওত পেতে ছিল?’ আমি পালটা যুক্তি দেখাই।

‘আশ্চর্য তো, তরীর গায়ে স্কুলের পোশাক আছে? কিংবা আশপাশে কোথাও? গায়ে যেটুকু ছিঁড়ে ফেলা কাপড় আছে তা তো ঘরের। সে এসে পোশাক বদলে ফেলার পরে ঘটনাটা… আসলে আমি জানি তুমি এটা রাশেদের কাজ বলে ভাবতেই পারছ না। আমি বুঝি, কিছুদিন পরে রাশেদকে বিয়ে করার কথা তোমার। কিন্তু তোমার মন কী বলে? নিজের মনকে ঠকিয়ে পারবে সংসার পাততে ওরকম একটা অপরাধীর সঙ্গে যে কিনা তোমার তরীকে নিজের হাতে…? টুম্পার কথা যেন থামতেই চায় না। আমি কানের ওপরে দু’হাত চেপে ধরে টেবিলে মাথা ঠেকাই, ঊনিশ, ঊনচল্লিশ, ঊননব্বই, ঊনআশি…

‘তুমি আগেও দেখেছ না রাশেদ তরীর গায়ে-টায়ে একটু হাত-টাত দেয়? তুমি দেখেও চুপ করে ছিলে। বলো, কেন ভেবেছ ওটা বোনসুলভ আচরণ? তোমার সন্দেহ হয়নি কেন? জীবনে একটা আশ্রয় কি তোমার এতই দরকার পড়েছিল? তুমি না সেই মেয়ে যে সাহস করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে, নিজের বোনকেও ছিনিয়ে এনেছিলে। তুমি না সেই মেয়ে যে তাকে নিরাপদ রাখার প্রতিজ্ঞা করেছিলে, তুমি না…’ টুম্পার কথা কখন ফুরাবে জানি না। না শুনেও কোনো উপায় নেই। কান চেপে ধরলে কী হবে, কথা আসে ভিতর থেকে। তরীর লাশের সঙ্গে যখন টুম্পাও লাশ হলো, আমার ভিতরে ঢুকে গেল। একের পর এক লাশের ভারে আমি আর চেয়ার থেকে উঠতে পারি না, বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস নিতে পারি না। আমি হাঁফাতে থাকি, ওদিকে টুম্পার মনের ঝাল মেটে না, সে বকবক করে যায়, ‘অচেনা মানুষ হলে তরীকে মেরে ফেলার কোনো দরকার ছিল? চেনা বলেই তো মেরেছে, তরী নিশ্চয় তোমাকে বলে দেবে বলে তাকে ভয় দেখিয়েছে। এটা রাশেদ ছাড়া আর কে হতে পারে, বলো?’

‘জানি না, জানি না,’ চিৎকার করে উঠি আমি। আমার চিৎকারে দুজন পুলিশ রান্নাঘরের দরজা খুলে ভিতরে আসে। নির্লিপ্ত গলায় একজন বলে, ‘আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?’

‘হ্যাঁ, তার নাম রাশেদ। কিছুদিন পরে আমার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা ছিল তার।’

‘বলে দিয়ে একদম ঠিক করেছ,’ টুম্পা ভিতর থেকে বলে। পুলিশ টুম্পার কথা শুনতে পায় না, বলে, ‘রাশেদের ফোন নম্বর দেন। আর বলেন তাকে কী কারণে সন্দেহ হয়, আমরা নোট করব।’

একজন পুলিশ পাশের চেয়ার টেনে বসে। খাতা খুলে টেবিলে রাখে, ‘আপনি তো ভিক্টিমের বড়ো বোন, তাই না? আপনার নাম বলেন।’

‘আমার নাম ঊর্মি।’

‘ওনার নাম তো শুনলাম টুম্পা। পাশের বাড়ির মহিলা বললেন, মানে, যিনি ফোন করে আমাদের খবর দিছেন,’ পাশে দাঁড়ানো পুলিশ বলেন।

‘আপনার নাম টুম্পা না ঊর্মি?’

‘আমার নাম ঊর্মি। টুম্পা মরে গেছে, কিন্তু তার সব স্মৃতি আছে এখনও,’ আমি দুর্বল গলায় বলি।

‘বুঝতে পারতেছি না, মনে হয় কোনো ঘাপলা। আচ্ছা, রাশেদের ফোন নম্বরটা দেন তো আগে,’ পুলিশ তাড়াতাড়ি বলেন। নম্বর দিতেই পাশের পুলিশ ডায়াল করা শুরু করেন। স্পিকার ফোনে রিং বাজতে শোনা যায়।

‘রাশেদ বলছেন?’

‘জি, কে বলছেন?’ রাশেদের গলা আমি চিনতে পারি টুম্পার স্মৃতি থেকে।

‘রমনা এলাকার একটা ক্রাইম সিন থেকে বলছি, ঊর্মি নামে যার সঙ্গে আপনার বিয়ে হবার কথা ছিল তার বোন, তরী, তাকে ব্রুটালি রেপ অ্যান্ড মার্ডার করা হয়েছে।’

‘ঊর্মি নামে কাউকে আমি চিনি না,’ রাসেল বলে।

‘আচ্ছা, টুম্পা নামে কাউকে চেনেন?’

‘কী বলছেন বুঝতে পারছি না। ঊর্মি, টুম্পা বা তরী, কাউকে চিনি না আমি।’

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ           

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares