নদীর পাড়ে বসে থাকি শুধু : মাহবুব আজীজ

নদীর পাড়ে, সন্ধ্যা হয় ততক্ষণে- সন্ধ্যার লালাভ আলো বুনো বেড়ালের মতো অস্পষ্ট অন্ধকারে লাফিয়ে মিশে যেতে শুরু করে; গুটিকয় নৌকামাত্র, এদিক ওদিক ছড়ানো কয়েকজন মানুষ, আকস্মিক চিৎকার ভেসে আসে ‘লাফ দিছেরে রে লাফ দিছে! মরব, মরব! আছুইন কেউ! তাত্তাড়ি… আইউন… আইউন যে!’- বোঝা যায় নৌকার মাঝি-মাল্লার স্বর; মুহূর্ত কয়েকের মধ্যে আরেকজনের আর্তচিৎকার; এবারের ধ্বনিস্বর শহুরে; কণ্ঠে-বুকে যত শক্তি আছে তা নিয়ে লোকটির সুতীব্র আর্তধ্বনি বয়ে যায় নদী বরাবরÑ ‘বাঁচান! বাঁচান!’

আমরা বসে আছি বানাড় নদীর পাশে, প্রাচীন বটগাছের নিচে; আজকাল সন্ধ্যার ঠিক আগে আমরা বাদিহাটির মোড় ছেড়ে নদীর পাড়ে বসে যাই শতবর্ষী বটগাছের নিচে ইট বিছিয়ে; আমরা কয়েকজন; এদের অনেকে এখানে নিয়মিত, কেউ কেউ অনিয়মিতÑ নানা বয়সের তরুণÑ দু’চারজন আইএ/বিএ পাস দিয়ে চাকরির খোঁজ করি, কেউবা পাস-টাসের আশা ছেড়ে ব্যবসার চেষ্টায় রত; দু’-একজন কী করব ঠিক করে উঠতে পারিনি তখনও; আমরা কয়েকজন বসে নানা প্রসঙ্গে কথা বলতে থাকি; এর মধ্যে ‘বাঁচান’ ‘বাঁচান’ চিৎকারে আমরা আমূল চমকে উঠি ও নদী বরাবর দৌড় দিই।

ততক্ষণে লোকটিও ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীর জলে, নৌকা নিয়ে এগোয় কয়েকজন মাঝি; আমরা বুঝতে পারিÑ তরুণী আত্মহত্যার চেষ্টায় ঝাঁপ দিয়েছে জলে, তাকে বাঁচাতে নদীতে লাফ দেয় লোকটি।

নৌকার মাঝিরা তাদের উদ্ধারের চেষ্টায় রত; আমরা কালবিলম্ব না করে চার থেকে পাঁচজন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি ও দু’জনকে উদ্ধারের চেষ্টায় নিয়োজিত হই। আষাঢ় মাস শুরু হলেও নদীতে জল খুব বেশি নয়; ১০/১২ ফুট গভীর হবে, নদীপাড়ের মানুষ আমরাÑ সাঁতারে পটু; পরস্পর একযোগে হাত লাগাই ও তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার করে নৌকায় তুলি; আমরা সাঁতরে, নৌকা ঠেলে পাড়ের দিকে নিয়ে যাই- আমাদের মধ্যে ততক্ষণে নেতৃত্বে চলে আসে রতন- আবদুল কাদির রতন দুই/তিনবারের বিএ ফেল, স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ও রাইস মিলের মালিক। নদীর পাড়ের আড্ডাধারীদের মধ্যে রতন সবচেয়ে চতুর, মাঝারি উচ্চতার ছোট করে ছাঁটা চুলে মুখে ব্রণের দাগসহ ছোট চোখ দুটো অস্থির, সবসময় তিরতির করে যেন কাঁপে; আজকাল কমই আসে সে এই আড্ডায়, নানান ধান্দাফিকিরে তার দিন যায়; তরুণীকে নদীর পাড়ে মাটিতে শুইয়ে রীতিমতো সিনেমায় দেখা দৃশ্যের মতো রতন তরুণীর বুকে চাপ দিয়ে ও উপুড় করে ভেতরে ঢোকা পানি বের করার চেষ্টা করে এবং আমাদের বলতে থাকে, ‘ডাক্তার লাগব। ডাক্তার। দুইজনরে তুইলা গেস্ট হাউসের রিসিপশনে লয়া চল, আমার লগে’। আমরা তাই করি, লোকটি আমাদের দুইজনের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটলেও তরুণী হাঁটার মতো অবস্থায় নেই; আমাদের বডিবিল্ডার বন্ধু মিঠু তরুণীকে পাঁজাকোলে নিয়ে রওনা দিতে চায়। রতন বাধা দিয়ে বলে- ‘একলা নিস না। পইড়া যাইব; আমি ধরি লগে’Ñ বলে মিঠু ও রতন নদীর পাড় থেকে গেস্ট হাউস ১০/১২ মিনিটের হাঁটাপথ দু’জনে মিলে তরুণীকে পাঁজাকোলে নিয়ে রিসিপশনের সোফায় শুইয়ে রাখে।

নীল ও হলুদের মিশ্রণে ফুল-ফুল ছবিওলা জামা পরা তরুণীটির নাম মনিকা- সঙ্গের লোকটি এ তথ্য জানিয়ে বলে, তার নিজের নাম এমদাদ- গার্মেন্টসের মার্চেন্ডাইজারের চাকরি করে; মনিকা তার বন্ধু, তারা ঢাকা থেকে আজই বেড়াতে এসেছিল নদীর পাড়ে; ফিরে যাবে; সন্ধ্যার পরপর, সামান্য রাগারাগি হয়- মনিকা ঝাঁপ দেয় নদীর জলে! আমি সোফায় চোখ বন্ধ করে রাখা তরুণীটির মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হই; লোকটির তুলনায় অল্প বয়সী তরুণী, মুখের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, মেয়েটির বয়স কোনোভাবেই ১৮/১৯ পার হয়নি; মুখের গড়ন অসম্ভব সুন্দর, সরল; মনে হয়, তুলি দিয়ে এঁকে রেখেছে কেউ ওই মুখ; শুশ্রুষা করার পর অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে তার নিঃশ্বাস; মায়াময় দুই চোখে অন্তহীন গভীরতা, যথেষ্ট লম্বা- ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি তো হবেই; বেঁটে বলে চিরকালই আমার মনে দুঃখের শেষ নেই; মনে মনে লজ্জা পাই। এই মেয়ে দেখি আমার চাইতে কমপক্ষে ১ ফুট বেশি লম্বা! এমদাদ মেয়েটির চেয়ে অনেক বড় হবে; ৩৫/৩৬ বছর বয়স, শক্ত-পেটা শরীর, ডান চোখের ওপর তেরছা কাটা দাগ, ফর্সা মুখ, লম্বায় এমদাদ মেয়েটির সমান হবে।

রতন জনসংযোগে যথেষ্ট কৃতী, ম্যানেজারকে বলে অতিথি ভবনের নিচতলার ১০৩ নম্বর কক্ষ খুলে পাশাপাশি দুই খাটে অসুস্থ মনিকা ও এমদাদকে শুইয়ে দেয়; পুরো ফুলবাড়িয়াতেই বেসরকারি সাহায্য সংস্থার এই অতিথি ভবনের আলাদা খ্যাতি আছে; সুরম্য ও ছিমছাম বলে, সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলেÑ আমাদের গ্রামে বানাড় নদীর কোলঘেঁষে বাগানবিলাসে ছাওয়া দারুণ নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে এই অতিথিশালায় নানা প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি ঊর্ধ্বতনেরা অতিথি হিসেবে থাকেন। এখানে আগে থেকে বুকিং দেওয়া না থাকলে শূন্য কক্ষ পাওয়া মুশকিল বলে আমরা সবসময় জেনে এসেছি।

রতন আমাদের বলে, ‘তোরা ২/১ জন যা। দৌড়ায়া ডাক্তার নিয়া আয়। মোড়ের ফার্মেসিতে পাইবি। যা…!… শেষ ‘যা!…’টি রতন আমাকে বলে, মৃদু ধাক্কা দেয় ও বলে, ‘ডাক্তারকে স্যালাইন নিয়া আসতে বলিস। স্যালাইন না দিলে নেতাইয়া যাইব।’ রতনের মতো আমি ডাকাবুকো নই; ফুলবাড়িয়া কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় বারদুয়েক ফেল আমিও করেছি; আমি নিরীহ গোছের, অচঞ্চল কর্মহীন; অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষকের ঘাড়ে বসে বেশ আছি, আড্ডাই মুখ্য কাজ আপাতত; রতনের দেখা অবশ্য নিয়মিত পাই না আমরাÑ আজ পাকেচক্রে তারই কথার তোড়ে ভেজা কাপড়ে আমি আর বডিবিল্ডার মিঠু পলাশিহাটা মোড়ের দিকে রওনা দিই ডাক্তার লুৎফরকে নিয়ে আসতে।

রতন আমার স্কুল-বন্ধু হলেও স্কুলের উঁচু ক্লাসে উঠেই তার হাবভাব অন্যরকম হয়ে যায়, মিশতে শুরু করে তার চেয়ে বয়সে বড়দের সঙ্গে; কলেজে উঠে সে রাজনীতিতে জড়ায়, নানারকম টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়ালেও খুব যে সুবিধা করতে পারে তা নয়; তবে বিএ ফেল করেই সে রাইস মিলের ব্যবসা শুরু করে। মনে আছে, একবার আমাকে ডেকেছিল রতনÑ ‘বইসাই তো থাকস সারাদিন, আমার লগে ঘুরতে ফিরতে তো পারস্’Ñ আহ্বানে দু’চারদিন ঘুরে দেখেছি, রতন যে কোনো কাজে নিজের লাভ খোঁজে সবার আগে; এতটা খাই-খাই ভালো লাগে না আমার; আমি ফিরে এসে নদীর পাড়ে আবার নিয়মিত বসতে শুরু করি।

ডাক্তার লুৎফর ফুলবাড়িয়ার সবচেয়ে তুখোড় ডাক্তার বলে আমরা জানি। আমি ও বডিবিল্ডার মিঠু দৌড়ে যাই তার কাছে; মিঠুও আমাদের- মানে রতন আর আমার সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে, উচ্চ মাধ্যমিকে বারকয়েক অনুত্তীর্ণ হয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে শরীরচর্চাকেই ধ্যানজ্ঞান করে ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির মজবুত শরীরটা নিয়ে কয়েক বছরে মিঠু রীতিমতো কুস্তিগিরের অবয়বে আবির্ভূত হয়, সকালে-বিকালে বাজারের ওষুধের দোকানে মিঠু অ্যাটেনডেন্টের কাজ করে; তবে তার অধিকাংশ সময় কাটে শরীরচর্চায়। বডিবিল্ডার মিঠুকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার লুৎফরকে বৃত্তান্ত বলতে থাকি। ডাক্তার সহাস্যে বলেন- ‘ডেটিং করতে আইসা কাইজা? সেখান থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা? আবার কইতাছ মেয়েটার বয়স কম। চলো… চলো…।’ আমি ও মিঠু ডাক্তার লুৎফরের মোটরসাইকেলে তিনজনে আধ ঘণ্টার মধ্যে অতিথি ভবনে পৌঁছি।

ফিসফাস, গুঞ্জন ওঠে নদীর পাড়ে; ‘এক মাইয়া নিকি ধরা পড়ছে আকাম করতে গিয়া’- শোনা কথা বাতাসের আগে ধায়, বেশ কয়েকজন ভিড় করে অতিথিশালার গেটে; ব্যস্ততা বাড়ে আবদুল কাদির রতনের; সে রীতিমতো ধমকে জড়ো হওয়া মানুষদের সরিয়ে দেয়; মিঠুর নেতৃত্বে কয়েকজনকে মূল গেটে দাঁড় করায়, অনাহূত কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হবে না।

এদিকে ডাক্তার এনে বসে আছি টিভি রুমে, রতনের দেখা নাই; ওর সাঙ্গপাঙ্গরা এরই মধ্যে নিচতলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে; জিজ্ঞেস করি- ‘১০৩ নম্বর কক্ষে তালা কেন? ডাক্তার নিয়া আসছি? রোগী কই!’ গোঁফওলা এক সাঙ্গ আমাকে হাত ইশারায় চুপ করে টিভি দেখতে বলে ও জানায়, ‘উস্তাদ আসতাছে।’ কিছুই বুঝে উঠতে পারি না- কেমন গা ছমছমে ও অচেনা মনে হয় চারপাশ; একতলার মূল দরজায় পাহারা বসিয়ে রতন যেন অদৃশ্য হয়ে যায়; আধঘণ্টা পর ফিরে হন্তদন্ত রতন টেলিফোন করে তার রাজনৈতিক বড় ভাইÑ বাবুভাইকেÑ এলাকার যুব সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। ফোন পেয়ে বাবুভাই ৩/৪টি মোটরসাইকেল ও সংগঠনের সঙ্গীসাথী ৮ থেকে ১০ জনকে নিয়ে অতিথিশালায় পৌঁছে।

নিচতলায় ১০৩ নম্বর কক্ষে তালা কেন?- রতনকে জিজ্ঞেস করতেই সে ধমকে ওঠেÑ ‘এমদাদ এহন কয়, সে এই মাইয়ারে চিনে না! আতকা পানিত লাফ দিছে দেইখা আমাগোর মতোই সে তারে বাঁচাইতে নদীতে ঝাঁপ দিছিল। সে একলা পলাইতে চাইছিল। তার গাড়ি আটকাইছি গ্যারেজে, আর তারে ১০৩-এ রাইখা তালা মাইরা থুইছি।’

‘আর মনিকা?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘মনিকা?’ চুপ করে থাকে রতনÑ ‘আছে। শ্বাসকষ্ট হইছিল দিখা দোতলার এসি রুমে নিয়া রাখছি।…ডাক্তার সাব ট্রিটমেন্ট দিলেই পুরা সুস্থ হইব। ঘরটর সব ঠিক করতে সময় লাগল।’ রতন আমার চোখের দিকে তাকায় না, অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলে।

ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলের নেতৃত্ব রতনের হাত থেকে বাবুভাই ও তার ক্যাডারদের হাতে চলে যায়; রতন ও তার ক্যাডাররা দৃশ্যপটে পিছু হটে যায়; বাবুভাই বলে, ‘রতন ঘাবড়ায়ো না। আমি দেখতাছি! আর, ডাক্তাররে চা দিতে বল। আমি আগে দেখি কি ব্যাপার? এত লোক তো রোগীর কাছে নেওয়া যাবে না।’ রতনকে উদ্দেশ করে বলতে থাকে বাবুভাই- ‘আমারে খবর দিছ। এইটুক ঠিক ছিল। আবার পুলিশরে ফোন দিলা কেন? এত বেশি বুঝ তুমরা? আমি তো আছি এইখানে? নাকি!’

বাবুভাই পুলিশের ওসিকে ফোন করে- ‘না, না; ফোর্স পাঠানোর কিছু নাই। সামান্য ঘটনা; ট্যাকল দিয়া দিছি অলরেডি। প্রবলেম হলে আপনি তো জানবেনই। আমরা আছি কেন?’ ফোন শেষে বাবুভাই রতনকে মূল গেটের দায়িত্ব দিয়ে বলে, ‘এক পাও নড়বা না। কাউরে কুনো ফোনের দরকার নাই। ১ ঘণ্টা পরে জলিল সাব মেম্বর ভাই আসতাছে। দরকার পড়লে প্রশাসন সে ট্যাকল দিব।’

আমার সামান্য বুদ্ধিতে কুলোয় না; পানিতে ডুবতে বসা মেয়েটা ইতিমধ্যে উদ্ধারকৃত; যদি আজ ঢাকায় যাওয়ার মতো অবস্থা না থাকে, তো রাতটি গেস্ট হাউসে ঘুমিয়ে সকালে রওনা দিলেই ল্যাঠা চুকে গেল!…তা না, বাবুভাই, জলিল সাব মেম্বার…সব গুচ্ছের বস্ কেন এখানে এনে ভিড় করাতে শুরু করল রতন; বুঝে উঠতে পারি না। ‘তুই জম্মের গাধা! দুই তলার ঘরে কিছু একটা হইতাছে..। আতকা মনিকার কন্ডিশন খারাপ হয়া গেছে! লোক-লস্কর লয়া আইতাছে তাই। এইডা তো একটা আন্ধাও বোঝে আর তুই বোঝস না!’- বডিবিল্ডার মিঠুর কথা শুনে থমকে যাই; কী বলে মিঠু এইসব!

কক্ষের তালার চাবি রতনের হাতে তখনও, রতন দ্রুত হাতে ১০৩ নম্বর কক্ষের তালা খোলে ও আমাকে ডাক দেয়; কক্ষের অভ্যন্তরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি আটকে দেয়; আমাদের দেখে ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে বসে এমদাদ বলতে থাকে, ‘রতন ভাই। আপনি আমার বড় ভাই। জানাজানি হয়া গেলে বিপদ; ঢাকায় আমার সংসার আছে; সমাজ আছেÑসবাই আমারে চেনে। মানসম্মান আর কিছু থাকবে না! আপনের যা লাগে আমি দিব, আমারে ছেড়ে দেন।’

রতন কর্কশ স্বরে এমদাদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘মনিকার মোবাইল আপনের কাছে না?’

‘পানিতে লাফ দেওয়ার সময় মনিকার হাতে মোবাইল ছিল; ওইটা কি আর আছে নাকি!’

‘আপনার ফোন থেকে মনিকার বাপরে একটা ফোন দেন।’

‘আমার কাছে নম্বর নাই।’

‘আরেকবার চালাকি করলে মুগুর দিয়া মাথা ভাঙুম। মনিকারে রেপ করছে কে?’- রতনের চোখ খুনির মতো টকটকে লাল; সে চোখ-মুখ শক্ত করে এমদাদকে বলতে থাকে।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকায় এমদাদ, যেন সে নিজের কানকে বিশ^াস করে না; নির্বাক কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সে বলতে থাকে- ‘এইসব আপনি কী বলেন?’

‘শালা বজ্জাত। রেপ কইরা নদীতে ফালায়া, কও আত্মহত্যা করছে। ফোন নম্বর দে শালা…।’ বলতে থাকে রতন।

আমি কিছুই বুঝতে পারি না, নিজের চোখ আর কান কি অকেজো হয়ে গেল! আমি রতনের দিকে তাকাই, ‘রতন, রেপের ব্যাপারটা কী? এইসব কী কস্?’

‘তুই চুপ থাক’ রতন বলে আর এই সময় ঘরের দরজায় বাবুভাইর মুহুর্মুহু করাঘাত; ‘বাইর হয়া আয় রতন! জলিল সাব মেম্বর আসতেছেন। তাড়াতাড়ি বাইর হ।’

রতন দরজা খোলে, বাইরে গাড়ির আওয়াজ শুনে বুঝি- রতন আর বাবুভাইর লিডার জলিল সাব মেম্বর ৫/৭ জন সহযোগীসহ ভেতরে আসে, জলিল মেম্বর আর বাবুভাই রতনকে হাত ধরে টানতে টানতে বারান্দার অন্ধকার কোণে নিয়ে যেতে থাকেন; আর আমি আবার এমদাদের ঘরে ঢুকে পড়ি-

‘আচ্ছা ভাই, সত্যি করে বলেন তো ব্যাপারটা কী?’

লোকটি আমাকে অবাক করে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে-

‘ভাই আপনারা কি মানুষ! পানিতে পড়া একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে কী শুরু করলেন?’ কাঁদতে থাকে লোকটিÑ ‘আমার বউ আছে, বাচ্চা আছে। আমারে ছেড়ে দেন আপনারা। আপনারা ওই মেয়েকে নিয়ে যা খুশি করেন।’

এমদাদের কান্নাকাটির মধ্যেই জলিল সাব মেম্বর, রতন আর বাবুভাই ঘরে ঢোকে। বুঝতে পারি, নেতৃত্ব এখন বাবুভাইর হাত থেকে জলিল সাব মেম্বরের হাতে চলে গেছে; বুঝতে পারিÑ রিলে রেসের মতো এক নেতা থেকে আরেক নেতার হাতে এখন মনিকার নিয়তি যেতে শুরু করেছে; আর আমরা কতিপয় বিদূষক- যেমন আমি কখনও রতনের, রতন কখনও বাবুভাইর; আবার বাবুভাই কখনও জলিল সাব মেম্বরের পিছু পিছু চক্রাকারে ঘুরছি আর এর মধ্যে একের পর এক- বাটন যার হাতে, যাচ্ছে মনিকার ঘরে, ফিরে আসছে আহত মেয়েটিকে আরও রক্তাক্ত করে; পুরো বিষয়টি আমার কাছে অবিশ^াস্য ও ভীতিকর মনে হতে থাকে; আমি ম্লান মুখে শুনতে থাকি জলিল সাব মেম্বর গর্জন করতে থাকে এমদাদের সাথে, ‘আপনেরা দুইজনে ঢাকা থিকা প্রাইভেট কারে দুপুর ১২টায় মোমেনসিং প্রেস ক্লাবে থামছেন। ক্যান্টিনে খাইয়া হোটেল ইউসুফে মেয়েটারে নিয়া উঠছেন। সাড়ে বারোটা থেকে চারটা পর্যন্ত হোটেলে ছিলেন….রুম নম্বর…!’ জলিল সাব মেম্বরের কথা শেষ হবার আগে বলতে শুরু করে এমদাদ, এবার সে মরিয়া; এতক্ষণ নানাভাবে তার সমাজ- পরিবার-পরিচিতির কথা বলে এমদাদ সমঝোতা ও পরিত্রাণ পেতে চাইলেও এবার এমদাদ সত্যিই মরিয়া; বলতে থাকে- ‘ভাই, আপনারা আসলে কী চান, বলেন তো! আমার সাথে মনিকা আসছে, আমাদের ঝগড়া হয়েছে, ও রাগ করে পানিতে লাফিয়ে পড়েছে। আপনারা কয়েকজন আমাদের উদ্ধার করে একি তামাশা শুরু করলেন? মনিকাকে আলাদা রুমে রেখে আপনারা কী করছেন, ভাবছেনÑ আমি কিছু বুঝি না!’

জলিল সাব মেম্বরও রেগে ওঠে, ‘এই ব্যাটা বলে কী! এইখানে কে আবার কী করল? চোরের মায়ের বড় গলা দেখি…! এই, এরে ধইরা রামপিটা দে তো তোরা কয়েকজন…।’

জলিল সাব মেম্বরের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে রতন হামলে পড়ে এমদাদের দিকে, ‘ মনিকার বাপের ফোন নম্বর এক্ষণ দিবি। আরেকটা কথা কইলে দাঁত খুইলা দিয়াম।’ বলে আর সজোর এক থাপ্পড় বসায় এমদাদের ডান কান বরাবর, নাক বরাবর কয়েকটা তীব্র ঘুসি!

এমদাদ উল্টে পড়ে; রক্ত ঝরতে থাকে। হৈচৈ, চিৎকারে বাবুভাই আর জলিল সাব মেম্বরের কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ ছুটে আসে- আরও গোটা কয়, বিক্ষিপ্ত কয়েক কিল-ঘুসির পর জলিল সাব মেম্বর থামায় সাঙ্গদের; বলে, ‘পুলিশ আইলে আমি কথা কমু। তোরা চুপ থাকবি।’

১০৩ নম্বর কক্ষ যখন রণক্ষেত্র, ব্যতিব্যস্ত ভঙ্গিতে ডাক্তার লুৎফর এসে কান্নামেশা কণ্ঠে বলতে থাকেÑ ‘তোমাদের এইখানে নরক নাইমা আসছে! এইখানে একজনও মানুষ নাই!’ সাঙ্গপাঙ্গসহ আমরা কয়েকজন মাথা নিচু করে থাকি, ডা. লুৎফর বলে, ‘পানিতে পড়া রোগীর কথা বলে নিয়ে আসলা তোমরা। আমারে টিভি রুমেই আটকায়া রাখলা ২ ঘণ্টা! আমি রোগীর মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারলাম না! যখন আমারে নিয়া গেল ততক্ষণে সব শেষ!’

বুঝতে পারি, আমাদের অলক্ষ্যে অঘটন ঘটে চলে দোতলায়; মিঠুকে বলিÑ ‘কী? পুতুলের মতো খাড়য় রইছস? চল তো মেয়েটাকে দেখে আসি?’

মিঠুর হাসিকে আমার অশালীন মনে হয়, সে অশ্লীল হাসি দিয়ে বলে, ‘এইবার বুঝি তোর টার্ন’! আমি কথা না বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাই; দেখি সিঁড়ির নিচে জলিল সাব মেম্বর, বাবুভাই ও রতন পরস্পর তীব্র বচসায় লিপ্ত; প্রত্যেকেই একে অপরকে দোষ দিচ্ছে; এদের মধ্যে রতনের কণ্ঠ সবচেয়ে উঁঁচু, ‘আমার বয়স কম। আমি ভুল করতেই পারি! আপনারা মুরব্বি। সবদিক সামলানোর জন্য আপনাদের ডাকলাম। আপনেরা এইটা কী করলেন? মেয়েটারে মাইরা ফেলাইলেন এক্কেবারে।’

জলিল সাব মেম্বর বজ্রকঠিন স্বরে বলে, ‘বাবু, তোমার এই ট্যান্ডলরে মুখ সামলায়া কথা কইতে কও! জিভ টান দিয়া ছিঁড়ুম কইলাম!’

রতন বলে, ‘আয়নায় নিজের মুখটা দেইখা পরে অন্যের জিভ টান দিবার যায়েন জলিল সাব!’

বাবুভাই গম্ভীর কণ্ঠে বলে, ‘কাদা ছোড়াছুড়ি বাদ দে। আমরা সবাই তো মেয়েটারে বাঁচাইতেই চাইছি। তোরা কয়েকজন মিলা ওরে পানি থিকা উদ্ধার কইরা আনলি…! এখন সবার নাম জড়ায় যাইব। তুই কইবি জলিল সাবের নাম; জলিল সাব কইব তোর নাম; আরেকজন কইব আমার নাম!… এহন মাথা গরম করার সময় না। ডাক্তারকে জিগাÑ এহন এরে বাঁচামু কেমনে! হাসপাতালে নিয়া যামু? অ্যাম্বুলেন্স ডাকুম?’

‘ডাক্তারকে তো দুই ঘণ্টা ওই রুমেই ঢুকতে দেন নাই আপনারা। এখন মইরা যাওনের পর ডাক্তার কী করব?’- রতন ফুঁসতে থাকে। তিনজনের এই বাহাসের মধ্যেই ডাক্তার লুৎফর এগিয়ে যায় সিঁড়ির নিচে, তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘মেয়েটা আর নাই। মৃত! ওর ফ্যামিলিরে খবর দেন, পুলিশ ডাকেন।’

ততক্ষণে প্রশাসনে খবর চলে যায়, তৎপর হয় থানা-পুলিশ; আর তার পরের ঘটনাটি খুবই সংক্ষিপ্তÑ মনিকার লাশ কীভাবে যেন পাওয়া যায় বানাড় নদীর ধারে, যেখান থেকে  মনিকাকে নদীতে লাফ দিতে দেখি আমরা কয়েকজন সন্ধ্যার ঠিক পরপর; ঠিক সেখানেই! তবে মনিকা লাশ হয়ে ওখানে রাত ১২টার আগে কী করে পৌঁছুল এটা অবশ্য আমরা কেউই জানি না।

আমরা বুঝতে পারি না বা বোঝার চেষ্টা করতেই ভুলে যাই, আসল ঘটনা কী? ঘটনা আদৌ কি কিছু ঘটেছিল? নাকিÑ আমরা, বিদূষকরা- নদীর পাড়ে বসে থাকি শুধু।

সচিত্রকরণ : ইমরান হোসেন পিপলু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares