ছবি : গার্গী রায়চৌধুরী

যে  গল্পটি আজ বলতে চলেছি সেটা নিছক গল্প নয়, একটা অনুভব বলতে পারেন। আমি এই গল্পের কোন চরিত্র নই। সুজয় আমার বন্ধু, তাকে ঘিরেই গল্প। আমরা ছোটো থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি, একই স্কুলে পড়েছি। যেমন হয় সহপাঠীদের বন্ধুত্ব তেমনই ছিল আমাদের বন্ধুত্ব। একসঙ্গে খেলাধুলো করতাম। সুজয় একটু শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিল। সাতে পাঁচে থাকত না। ঝগড়াঝাটির ধার কাছ দিয়েও যেত না। আমার মতোই ও-ও সব কিছুতেই ছিল মাঝারি। আমরা বাদ পড়তাম না কোনো কিছু থেকে, তা সে ফুটবল খেলাই হোক, বা কোনো নাটকের মহড়া, কিন্তু কোথাও ‘রাজার পার্ট’ যাকে বলে সেটা আমাদের ভাগ্যে জোটেনি কোনোদিন। আমরা দুজনেই একটু ভীতু প্রকৃতির ছিলাম। খুব সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলাম। মনে হয় এই সামাজিক অবস্থানগত এবং চারিত্রিক গঠনগত মিলের কারণেই সুজয়ের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল। একটু বড় হওয়ার পর দুজনেই বুঝতে পেরেছিলাম একটা মোটামুটি ভালো সরকারি চাকরি জোগাড় করে ফেলাটাই আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ হওয়া উচিত। সেই মতো একসঙ্গেই চাকরি পাওয়ার পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করতে শুরু করলাম। সেই সময় রাত জেগে একে অপরের বাড়িতে থেকে পড়তাম। কিন্তু এত কাছাকাছি হলেও আমাদের মধ্যে ভালোবাসাটা দানা বাঁধেনি। পরস্পরের তাৎক্ষণিক লক্ষটা এক ছিল বলে আমরা সাময়িক একটা জোট তৈরি করেছিলাম এমনটা বলা যেতে পারে। চাকরি পেয়েও গিয়েছিলাম আমরা। তারপর থেকে যে যার কাজের জায়গায়। সুজয়ের সঙ্গে আমার আর একদিনের জন্যও দেখা হয়নি। আমাদের মধ্যে কোনোরকম যোগাযোগই ছিল না। মোবাইল  ফোনের যুগ শুরু হয়ে গেলেও আমরা কেউ কারও নম্বর জোগাড় করে কথা বলার তাগিদ অনুভব করিনি। দেশের বাড়ি গেলে অন্য বন্ধুদের থেকে সুজয়ের খবর পেয়েছি। শুনেছি ও আমার মতোই গ্রামে খুব কম আসে। আমারই মতো বিয়ে করে বৌ ছেলে মেয়ে নিয়ে চাকরি স্থলে থিতু হয়েছে। বাড়িও করেছে। আমারও একই অবস্থা। কাজের চাপে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

সেবার কি একটা কাজ উপলক্ষে গ্রামে গেছি। পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে বসেছি। শুনেছি সুজয় এলেও এখানে আসে। ওটা একটা গুলতানির জায়গার মতো দেখতে হলেও আসলে অনেক খবরাবর সংগ্রহের ঠেক। ওখানেই শুনলাম সুজয় নাকি মারা গেছে কিছুদিন আগে। কেউ বলল অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, কেউ বলল ওর নাকি বউয়ের সঙ্গে বনিবনা ছিল না, একাই আসত গ্রামে, কেউ বলল চাকরির জায়গার চাপ সামলাতে না পেরেই হয়তো আত্মহত্যা করেছে। আমার কোনোটাই ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছিল না। খবরটা আমাকে খুব বিচলিত এবং ভীত করে তুলল। এতটাই যে আমি একেবারে সুজয়ের বউয়ের ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোন করে বসলাম। ফোন করে বুঝলাম সুজয়ের বউ আমার কথা খুব বেশি জানে না। বুঝলাম বন্ধু হিসেবে আমার নাম সুজয় উল্লেখ করেনি ওর কাছে। আমার রাগ হলো না কারণ আমার বউ ও তো সুজয়ের নাম শোনেনি আমার মুখে। আমি সুজয়ের বাড়ির ঠিকানা নিলাম, ওর বউকে বললাম সামনের রবিবার দেখা করতে যাব। তারপর অধীর আগ্রহে রবিবারের অপেক্ষা করতে লাগলাম, আর নির্দিষ্ট দিনে ভোরবেলা সুজয়ের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

সুজয়ের বউ আমার সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহারই করলো। আমার ভয় ছিল আদৌ মৃত্যু সংক্রান্ত কথা ও আমার সঙ্গে আলোচনা করবে কিনা। আমি আমাদের ছোটবেলার নানা গল্প ওর বউকে বলতে লাগলাম যাতে ও বুঝতে পারে আমি সুজয়ের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। ব্যাপারটা কাজে দিল। সুজয়ের বউ সহজ হলো আমার কাছে। এটা সেটা কথার পর বলল, ‘জানেন ওর মৃত্যুটা একটা অঘটন যেটা ও নিজেই ঘটিয়েছিল’। আমি অস্ফুটে বললাম, ‘তবে কি আত্মহত্যা? আমি এরকম একটা কথা শুনেছিলাম গ্রামে’। ওর বউ আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘না না আত্মহত্যা করার মতো সাহস ওর ছিল না। ওর মৃত্যুটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট বলতে পারেন’।

আমার জিজ্ঞাসু চোখ দেখে মেয়েটি বলল, ‘আপনি ওর ছোটবেলার বন্ধু, আপনাকে খুলে বলতে আপত্তি নেই, ওকে একটা অদ্ভুত অসুখে ধরেছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম। শেষের দিকে আমার সঙ্গে সত্যি অশান্তি চরমে উঠেছিল’। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কি অসুখ? চিকিৎসা হয়েছিল? আর আমি যতদূর চিনি ও তো বেশ শান্ত স্বভাবের ছেলে, অশান্তি করা তো ওর ধাতে ছিল না’।

সুজয়ের বউ আমার কথা মেনে নিলো। ‘ঠিকই বলেছেন। কিন্তু ও পাল্টে গিয়েছিল’। দেখলাম সুজয়ের বউয়ের চোখ জানলা দিয়ে দূরে কোথায় হারিয়ে গেছে। ও যেন আমার কথা শুনতেই পায়নি এমন গলায় বলল, ‘একটা ছবি। একটা ছবির জন্য ও শেষ হয়ে গেল। আমাদের সংসারটাও ভেঙে গেল।’ দেখলাম ওর চোখ দুটো এই প্রথম জলে ভেসে যাচ্ছে। খানিকটা সামলে নিয়ে সুজয়ের বউ বলতে শুরু করল, ‘জানেন তো সরকারি অফিসাররা প্রায়ই ‘কলাটা-মূলোটা’ পেয়ে থাকেন ফাইল তাড়াতাড়ি ছাড়ার সুবাদে। সুজয়ও পেত। একদিন বাড়ি এসে ওর

পরিচিত একজন ফড়ে বেশ বড় একটা প্যাকেট দিয়ে গেল। আমি খুলেও দেখিনি। মোটা পিসবোর্ড দিয়ে বাঁধা ছিল। ও বাড়ি আসাতে আমি দেখালাম। অত বড় জিনিস দেখে ও সঙ্গে সঙ্গেই প্যাকেটটা খুলে ফেলল। একটা ছবি বেরোলো। বিশাল একটা ছবি’।

‘কার ছবি? কিসের ছবি’? আমি অধৈর্য হয়ে জানতে চাইলাম। ‘সুজয়ের ছবি। খুব সুন্দর আঁকার হাত শিল্পীর। একেবারে জীবন্ত সুজয়। আমরা দুজনেই অবাক হয়ে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলাম ছবিটার দিকে। শিল্পী যেন সুজয়ের ভিতরকার সুভদ্র, পরিশীলিত ব্যাক্তিত্বটাকে অদ্ভুত সুন্দর করে বার করে নিয়ে এসেছিল ছবিতে। ছবিটা সুন্দর ডিজাইন করা মেটালের ফ্রেমে বাঁধানো ছিল। এত বড় আর ভারী যে আমরা হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম ছবিটাকে আমার শোবার ঘরে নিয়ে আসতে গিয়ে। আমি টানতে পারছিলাম না, বলেছিলাম সুজয়কে থাক না ওটা বাইরের ঘরে, পরে মিস্তিরি ডেকে না হয় যেখানে টাঙ্গাবার সেখানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। সুজয় জেদ করে ওটা টেনে নিয়ে গেল শোবার ঘরে। বলল এত সুন্দর ছবিটা বাইরের ঘরে পরে থাকবে কেন?

সেই শুরু, আমাদের শোবার ঘরে অত বড় দেওয়াল ছিল না যেখানে ছবিটা টাঙ্গানো যেতে পারে। কিন্তু সে কথা ও শুনতে চাইল না। আমার সঙ্গে ঝগড়া করে আলমারি, অন্যান্য আসবাব সরিয়ে ঘরের সবচেয়ে বড় দেওয়ালটা ফাঁকা করল। অত বড় ছবি রাখবার মতো বড় বাড়ি তো নয় আমাদের। আমি সে কথা বলাতে ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছিল আমার ওপর। ছবি লাগানো হবে বলে দেওয়াল রং করাবে ঠিক করলো। তখন ছেলে মেয়েদের পরীক্ষার সময়, আমি বেঁকে বসলাম, সেই নিয়ে আর একপ্রস্থ অশান্তি শুরু করলো। যেন ছবিটা ক’দিন পরে লাগালে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। ধীরে ধীরে সংসারের সমস্ত বিষয় থেকে সরে গেল। ওই ছবি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখা, ওটা ঘরের কোন দেওয়ালে লাগাবে সেই দেওয়ালের রং কি করবে সেই নিয়ে পরিকল্পনা করা সেটাই ছিল ওর একমাত্র কাজ।

ছবিটা নিয়ে এত মাতামাতি আমার অসহ্য লাগতো।

তারপর বাড়িতে রঙের মিস্তিরি লাগল। সুজয় ঠিক করলো আমি এবার থেকে বাচ্চাদের ঘরে থাকবো কারণ ছবির জন্য আমার আলমারি আর অন্যান্য জিনিসপত্র শোবার ঘরে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। বুঝুন একবার ওর ছবিটার জন্য আমাকে ঘর ছাড়তে হলো। তাও মেনে নিয়েছিলাম। সেই সময় এক সপ্তাহের জন্য অফিসের কাজে সুজয়কে অন্য শহরে যেতে হলো। রঙের কাজ পুরোদমে চলছে। আমিই সামাল দিচ্ছি সব। তার মধ্যে বাচ্চাদের পরীক্ষাও চলছে। সুজয় নির্ধারিত দিনের দুদিন আগেই হঠাৎ ফিরে এলো। ওর ঘরটায় সবে সেই দিনই রং করা শেষ হয়েছে। আমি দোষের মধ্যে ছবিটাতে চাপা দিতে ভুলে গিয়েছিলাম আর সাদা আলগা চুনে ছবিটা ঢেকে গিয়েছিল। আপনি ভাবতে পারবেন না মিস্তিরিদের সামনে কি ভাষায় সুজয় অপমান করেছিল সেইদিন আমাকে। মারতে পর্যন্ত গিয়েছিল।

আমি ততক্ষণে ব্যস্ত হয়ে চুনের পরত ঝাড়তে শুরু করেছি। কিন্তু তাতে কি, সুজয় বারবার বলছিল, আমি একজন ব্যর্থ মানুষ আর ওই শিল্পীর আঁকা ছবিটা সফল সুজয়ের প্রতীক তাই নাকি আমি ওটাকে সহ্য করতে পারছি না। আচ্ছা বলুন তো আমি ওর স্ত্রী, ওর সন্তানদের মা, সারাদিন আগলে রাখি সংসার, আমার মূল্যায়ন কি এভাবে হয়? জানেন আমার রেজাল্ট কিন্তু সুজয়ের চেয়ে ভালো-স্কুলের, কলেজের সব মার্কশিট আছে’।

আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভদ্রমহিলার মুখে শুনলাম বাড়ি রং করে শোবার ঘরের দেওয়ালজুড়ে সুজয় ওর ছবিটা টাঙ্গিয়েছিল। যে বাড়িতে আসত তাকেই নাকি কোনো না কোনো ছুতো করে ছবিটা দেখাত। ওই ঘরে তারপর থেকে সুজয় একাই থাকত, বাড়ির আর কেউ ওর ঘরে ঢুকুক সেটাও নাকি ঠিক পছন্দ করতো না। ওর ভয় ছিল বাচ্চারা, এমনকি ওর বউও ছবিটা নষ্ট করে ফেলতে পারে। ওরা অনেকদিন দেখেছে সুজয় তন্ময় হয়ে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর একদিন ওই দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই ছবিটা খুলে পড়ে গিয়েছিল সুজয়ের ওপর। সুজয় পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে মারা যায়। সুজয়ের বউ বলছিল, ‘ভারী ছবিতো হুকটা ওজন ধরে রাখতে পারেনি’।

আমরা কথা বলছি এমন সময় সুজয়ের ছোট্ট মেয়েটা মিষ্টি আর জল নিয়ে এলো। বলল, ‘জানো কাকু, যেদিন বাবা মারা গেল সেদিন বাবার জন্মদিন ছিল। বাবা অফিস চলে গেলে মা অনেকদিন পর বাবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ঘর ঝেড়ে পরিষ্কার করেছিল। বিছানায় নতুন চাদর পেতেছিল, জানলায় নতুন পর্দা। ছবিটাকেও ঝেড়ে মুছে একেবারে ঝকঝকে করেছিল।’

হঠাৎ অনুভব করলাম আমার শরীরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে। বাচ্চাটা চলে যেতে যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় সুজয়ের বউকে বললাম, ‘আপনি যখন মুছেছেন তখন হুকটা আলগা হয়ে যাওয়ার কারণে পড়ে যায়নি তো ছবিটা’?

উত্তরে ও শুধু বলল, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালো লাগল। জল মিষ্টি খেয়ে নিন, অনেক বেলা হলো, ফিরতে হবে তো! যাওয়ার আগে আপনার বন্ধুর ছবিটা কিন্তু দেখে যাবেন। ওর আত্মা শান্তি পাবে’।

ততক্ষণে একঝাঁক বেয়াড়া ভাবনা কালোমেঘের মতো আমার মাথার ভিতরটা ছেয়ে ফেলেছে, কোনো কথা বলার অবস্থায় আমি আর ছিলাম না, সুজয়ের স্ত্রীকে, ওর বাচ্চাদের বিদায় না জানিয়েই ওদের ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলাম।

বাড়ি ফিরতে অনেকটা রাত হলো। বউ দরজা খুলেই আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে এলো বসার ঘরের একটা কোণে। দেখলাম হাতে আঁকা আমার একটা বিশাল ছবি। কি নিখুঁত, কি সুন্দর আমি। বউ বলল, ‘তোমার একজন ক্লায়েন্ট দিয়ে গেল, কি অপূর্ব তাই না? চোখ ফেরানো যায় না, বলো’।

ছবিটার চোখ বাঁচিয়ে আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, ‘এই ছোটো ফ্ল্যাটে অত বড় ছবি রাখবার মতো জায়গা নেই। কালই আমি ছেলেটাকে বলে দেবো ছবিটা যেন এসে নিয়ে যায়। ওটা যেমন ছিল তেমন মুড়ে রেখে দাও’। বউকে নির্দেশ দিয়ে ছবিটাকে উপেক্ষা করে আমি রোজকার মতো জামাকাপড় ছাড়তে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares