নতুন ভোর : মহি মুহাম্মদ

রাত না দিন বোঝার উপায় নেই। অন্ধকার ঢেকে আছে। বৃষ্টি ঝরছে। বিমানটি কয়েকপাক ঘুরে ঘুরে সুযোগ খুঁজছে কিন্তু ঝড়ো হাওয়ায় সুবিধা করতে পারছে না। অনেক সময় পার করে নেমে এলো। একটা ঝাঁকি খেতেই বিমানের যাত্রীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। এরপর এই ঝড়ো হাওয়া বৃষ্টির মধ্যেই রানওয়েতে থামলো। যাত্রীরা আস্তে আস্তে নেমে এলো।

একজন যাত্রী এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। বারবার ঘড়ি দেখছে। মনে হয় কারও প্রতীক্ষা করছে। অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেউ এলো না।

এরপর সে কয়েক জায়গায় ফোন করল। তারপর বেরিয়ে এলো এয়ারপোর্ট থেকে। দাঁড়িয়ে থাকা একটা ভাড়া গাড়িকে অনুরোধ করে উঠে বসল। ঝড় ও জলের রাত্রিতে কোনো গাড়িই যেতে চায় না। ব্যস্ত নগরীর একটা হোটেলে এসে উঠল যুবকটি। সঙ্গে থাকা ব্যাগটি টেনে নিয়ে চলল রিসেপশনের দিকে। আজকের রাতটা এখানেই কাটাতে হবে তাকে।

২.

সকাল। জানালার পর্দা গলে রোদ ঢুকেছে। মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে সোনালি রোদ। বহুদিন পর জন্মভূমির এই রোদটুকু ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে মন চাইছে। সে বিছানা থেকে লাফ মেরে উঠে বসল। ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হলো। যাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল, ওদের একজনকে পাঠাবে। সেই লোকই ওকে নিয়ে যাবে তাদের গ্রামে। তার স্মৃতিময় গ্রাম। যে গ্রামে তার বাবা-মা ছিল, ভাই-বোনেরা ছিল। এখন কে, কোথায় আছে সে কিছুই জানে না। বাবা-মা অনেক আগেই গত হয়েছেন। ভাই-বোনেরা কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। নিজেও বিদেশ থেকে কারও সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারেনি। ভেবে দেখল, টাকা-পয়সা জমিয়ে লাভ কী? নিজের জন্মভূমির জন্য যদি কিছু করতে না পারল! যে স্থানে সে জন্মেছিল, সেখানকার মানুষগুলোর যদি কোনো উপকারে না লাগল, তাহলে আর কি হবে, এত ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে! তাই সে নিজের জন্মস্থানে কিছু একটা করতে চায়। বিদেশে বসে ভেবে ভেবে সে সারা হয়েছে। কি করলে তার জন্মস্থানের লোকেরা উপকৃত হবে। ভেবে ভেবে যে দিকটা সে আবিষ্কার করল সেটা হলো একটা উন্নতমানের হাসপাতাল দরকার। চিকিৎসার জন্য যেন কাউকে বাইরে যেতে না হয়। তার টাকায় একটা আধুনিক হাসপাতাল হোক। যোগাযোগের উন্নত ব্যবস্থা থাকলে ডাক্তার আসবেই এখানে।

৩.

ফোনটা বাজছে। মনে হয় এটা সেই কনসালটেন্সি ফার্মের কেউ। ঠিকই ওদের একজন ফোন করেছে। জানাল তাদের লোক রওনা হয়ে গেছে। এই লোকই তাকে এ দেশে থাকাকালীন দেখাশোনা করবে। নিরাপত্তা দেবে। তার খোঁজখবর করবে। সে চটপট তৈরি হয়ে নিল। ছোট্ট একটা ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে বের হয়ে এলো রুম থেকে। আগে নাস্তা করা যাক। রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে পড়ল। খাওয়া যখন শেষ হলো তখন ফোনটা আবার বেজে উঠল। মেয়েলি গলা। সে বসে আছে হোটেল রিসেপশনে। বসতে বলে, সে নাস্তা শেষ করল। লোকটাকে নিয়ে এসেই চা-টা শেষ করবে ভাবল।

উঠে এলো সে। এসে দেখল কাউবয় মার্কা মেয়েলি চেহারার লোক। প্রথম দেখায় তেমন গুরুত্ব পেল না সে। তারপরেও সে হাত বাড়িয়ে দিলÑ আমি তালাত মাহমুদ।

‘আমি মণিকা।’

হ্যান্ডশেক করল। তালাত ভাবল, এ তো দেখছি আসলেই মেয়ে। একটা মেয়েকে দিল ওরা তার দায়িত্ব? না ব্যাটাদের আক্কেল-পছন্দ বলতে কিছু নেই মনে হচ্ছে! যা হোক, ফোন করে জানাতে হবে ব্যাপারটি। সবসময়ের জন্য একটা মেয়েকে নিয়ে ঘোরাটা কেমন দেখায়।

‘স্যার, কোনো সমস্যা?’

মণিকা বলল।

তালাত চমকে উঠল।

‘স্যার, আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি। সঙ্গে ড্রাইভারও আছে। চেয়ারম্যান স্যার বলেছেন, আপনার কোনো সমস্যা হলে ফোনে যোগাযোগ করতে।’

‘ঠিক আছে। চলুন আমরা আগে চা খেয়ে নিই।’

তালাত পা বাড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল, মেয়েটি ত্রস্ত হাতে সামাল দিল। তালাত অবাক হলো। এ সাধারণ নারী নয়! মনে হয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু মেয়েটি কি যেন বোঝাতে চাইল। চোখে কিসের ইঙ্গিত খেলে গেল। বুঝতে পারল না সে। চা খেয়ে বের হয়ে এলো। এতক্ষণ পাশে পাশে এক ষণ্ডা মতো লোক হাঁটছিল সে-ই গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়াল। গাড়িতে প্রথম তালাত উঠে বসল। তারপর মণিকা না টণিকা। মেয়েটির সারা চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। কি যেন বোঝাতে চাইছে তালাতকে। তালাত বুঝতে অপারগ। কিছুক্ষণ আগে মেয়েটিকে কেমন কেমন মনে হয়েছিল এখন দেখতে বেশ লাগছে। চোখের ধার আছে। নাকটাও বেশ। ভ্রুজোড়া রামধনুকের মতো। পথটুকু ফুরোতে বেগ পেতে হবে না। যা হোক আজ সাইট নির্বাচন। তারপর সব কাজ ওরাই সারবে। কিন্তু ড্রাইভার এমন তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেন?

৪.

তালাত বুঝতে পারেনি। দেশে পা রেখেই এমন বিপদে পড়বে। তার মোবাইলটা নিয়ে নিয়েছে। এখন যোগাযোগের কোনো মাধ্যম নেই। মেয়েটিকে দেখেই তার সংশয় জেগেছিল। কিন্তু মেয়েটি গাড়িতে কি বলতে চাইছিল সেটা বুঝতে পারেনি। তার মানে কি তার আগেই ওরা মেয়েটিকে কব্জা করেছে? আর মেয়েটির মাধ্যমে তাকে! হতে পারে। এ দেশের মানুষের মাথায়ও ক্রাইম করার নতুন নতুন বুদ্ধি আসে। কতদিন পর দেশে এসেছিল একরাশ নতুন স্বপ্ন নিয়ে। আর এখন?

যাক ভেঙে পড়লে চলবে না। এখন ওদের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় কী বের করতে হবে। নাকি কিছু দিতে না চাইলে লাশ করে দেবে? কি জানি ভাগ্যে কি আছে!

একটা রুমে তাকে আটকে রেখেছে। চুপচাপ বসে আছে সে। একটা জানালা। তাও আটকানো। ওপরে একটা ফ্যান ঝুলে আছে। একটা ছোট্ট খাট। একটা টেবিল চেয়ার। যে চেয়ারটাতে সে বসে আছে। কিছুক্ষণ পরেই ওরা এ রুমে মণিকাকে ঢুকিয়ে দিল।

মণিকা চিতাবাঘের মতো লাফ দিয়ে এসে ঢুকল রুমে। দরজা বন্ধ হলো পেছনে। চোখ তুলে তাকাল তালাত।

‘তা মণিকা, কিছুই তো বুঝলাম না! আপনাদের এমন প্ল্যান এলো কীভাবে?’

‘সরি স্যার। আমাদের এমন প্ল্যান ছিল না। কিন্তু সবকিছু ভণ্ডুল করে দিয়েছে আমাদের ড্রাইভার। আমাদের প্রতিষ্ঠানের চিরশত্রুরা আমাদের হাইজ্যাক করেছে। চিন্তা করবেন না স্যার। আমার জীবন থাকতে আপনার কোনো ক্ষতি হতে দেব না।’

তালাত একটু অবাকই হলো। একটা মেয়ে বলছে, সে তাকে রক্ষা করবে! যা হোক সময়কালেই দেখা যাবে, কীভাবে কি হয়! তালাতের হয়তো জানা নেই কোনো এক কবি লিখে গেছেনÑ ‘এদেশে শ্যামলরঙ্ রমণীর সুনাম শুনেছি’।

৮.

দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। কিছুতেই কিছু করা যাচ্ছে না। রুমের ভেতর অন্ধকার নেমে আসছে। শীতকালের বেলা। শীত শীত ভাব আছে। একটা পাহাড়ি রাস্তা ধরে কোথায় নিয়ে এসেছে ঠিক বুঝতে পারছে না। পালের গোদা যথাসময়ে এসে বলে গেছে। তার টাকা চাই। বিদেশ থেকে এসেছ টাকা দিতে হবে। এ দেশে ইনভেস্ট করবে অথচ টাকা খসাবে না, তা হয় না। ওই টাকার ওপর তাদেরও হক আছে।

তালাত চুপচাপ শুনে গেছে। সে বলেছে, সে কোনো টাকা নিয়ে আসেনি। কারণ সে শুধু জায়গা নির্বাচন করবে। তারপর সাইট ওকে হলে বিদেশ থেকে ওদের একাউন্টে টাকা আসবে। ওরা কিছুতেই এ কথা বিশ্বাস করেনি, যা হোক, মনে হয় এরপর কঠিন কিছু করার প্ল্যান করবে। কিন্তু রাতে মণিকা কিছু একটা উপায় বের করবে বলে মনে হলো। খাটের নিচে একটা লোহার রড পেল। রডটা লুকিয়ে রাখল। খেতে দিতে যখন লোক দুজন এলো। দুজনকেই ঘায়েল করল সে। তালাত হাঁ করে তাকিয়ে দেখল। মনে মনে বলল, বাপরে কি খণ্ডারানি মেয়েরে বাবা!

জায়গাটা তেমন ভালো চেনা যায় না। পাহাড় আর উঁচু নিচু। হঠাৎ মণিকা একটা মোবাইল টিপে কার সঙ্গে যেন কথা বলল। তালাত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

তুমি মোবাইল পেলে কোথায়? আর যদি তোমার কাছে মোবাইল থেকেই থাকে, তাহলে এত সময় চুপ ছিলে কেন?

মোবাইল ছিল না। ওদের কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।

তালাত মনে মনে মেয়েটির বুদ্ধির তারিফ না করে পারল না।

৯.

কনসালট্যান্সি ফার্ম তাদের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করল। তারা তালাতকে বোঝাতে পারল যে, ওরা এবার থেকে যথেষ্ট সিকিউরিটির ব্যবস্থা করবে। এবার গ্রামে যাওয়ার পালা। তার মানে যেখানে তালাত জন্ম নিয়েছিল। সেই গ্রামে গিয়ে তালাত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। গ্রামের মাটি শুকে শুকে দেখল। তার স্মৃতিভরা শৈশব কেমন করে এই মাটির ভেতর লুকিয়ে আছে। নদীর দিকে তাকিয়ে থাকল। যে নদীতে সে সাঁতরে পার হয়েছে। খেলার সাথীদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ দিয়েছে।

আশেপাশের অনেকেই তাকে চিনতে চাইল কিন্তু স্মৃতি খুঁড়ে তারা ঠিক চিনতে পারল না। আবার অনেকেই না চিনে চেনার ভান করল। তবে ঘুরে ঘুরে তালাত যে দাইয়ে তার মার প্রসব করিয়েছিল তার বাড়িতে এসে দাঁড়াল। সেই দাই আর বেঁচে নেই। তার মেয়ে রোজিনা কতগুলো কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। তালাত বলতে চাইল, আমি সেই তালাত যার জন্ম নেওয়ার সময় তার মা অনেক কষ্ট পেয়ে মারা গিয়ে ছিল। আর রহিমা দাই তার মাকে বাঁচানোর জন্য কি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে রাতে রহিমা দাই কিছুতেই তার মাকে বাঁচাতে পারে নি। শুধু সে বেঁচে ছিল। তার দাদি তাকে লালন-পালন করেছে। দাদির কষ্ট তার এখনও মনে পড়ে। চোখ বুজলেই সেলুলয়েডের ফিতার মতো দৃশ্যের পর দৃশ্য ভাসতে থাকে।

১০.

নানা রকম টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা। ছোট বেলায় সে দেখত লোকজন আয়-রোজগার বাড়াতে বিদেশ পাড়ি দিত। এই বিদেশ পাড়ি দেওয়ার জন্যই তার ভেতরে মোহ তৈরি হলো। সে ছোটকালে সে কতজনের কাছে কত গল্প শুনতো। বিশেষ করে যারা বিদেশফেরত তাদের কাছে কাছে থাকতেই অন্যরকম লাগতো। কিন্তু কি অদ্ভুত বিদেশফেরত কেউই কখনও কষ্টের গল্প করত না। ওরা করতো রঙিন এক দুনিয়ার গল্প। সে গল্প শুনে শুনে নদীতে সাঁতার কেটে গরু চড়িয়ে সে বড় হতে লাগল। গ্রামের ইশকুলে সে পাঁচ ক্লাস পড়েছেও। সেও আবার বাবা থাকা পর্যন্ত। তারপর একদিন বাবা কোথায় যে হারিয়ে গেল কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারল না। অনকেই বলল, তোর বাপে আরেকটা বিয়া করছে। তাই এই গ্রাম ছাইড়া ভাগছে। কথাগুলো বিষের মতোন লাগত। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। শেষ বিকেলে নদীর পাড়ে অস্তপারের সূর্যের কাছে তার মিনতি থাকত সে যদি বিদেশ চলে যেতে পারত! তাহলে অনেক টাকা নিয়ে এসে দাদিকে আর তার বাবাকে ভালো রাখত। মা তো তার নেই। মাকে সে চোখে দেখেনি। মায়ের গল্প শুনে শুনে সে বড় হয়েছে মাত্র। মায়ের একটা ছবি সে কল্পনায় এঁকে নিয়েছে। মাঝে মধ্যে কল্পনায় মায়ের সঙ্গে একটা খুনসুটি সে করে। আবার কল্পনায় নিজের জ¦র বাধিয়ে মায়ের আদর-স্নেহ কাড়ে। কিন্তু কল্পনা দিয়ে আর কতো!

১১.

গ্রামের রহমত মিয়া প্রবীণ লোক। এককালে বিদেশ ছিলেন। এখন তার ছেলেপেলেরা বিদেশ করে। তিনি বড় বাড়ি বানাইছেন। এখন সে বাড়িতে বসে গ্রামের জমিজমা দেখভাল করেন। সেই রহমত মিয়ার কাছেই সে আস্তে আস্তে ভিড়ল। বলল, চাচা আপনি যেমনে পারেন, আমারে এট্টু বিদেশ পাঠাইবার ব্যবস্থা কইরা দেন। রহমত মিয়া হাসতেন। বলতেন তুই বিদেশ যাবি কেমনে। বাড়িতে তর দাদি একলা। বুড়া মানুষটা তরে লইয়াই তো বাঁইচা রইছে।

হ, দাদি একলা। কিন্তু দাদি গেলে তো আমিও একলা। তহন আমি এইহানে কি করমু?

করার তো মেলা কিছুই আছেরে পাগল। জমিজিরাত যা আছে চাষবাস কর। ডাঙ্গর হইয়া বিয়া শাদি কর। ঘরভরা পোলাপান আর বউয়ের মুখের দিকে চাইয়া সব কষ্ট ভুইল্যা যাবি।

নাগো চাচা। আমার মার মুখখান আমি কোনো দিন দেহি নাই। মা আমারে জন্ম দিতে গিয়া মইরা গেছে। সে না দেখা মায় আমারে শান্তি দেয় না। এই গ্রামে আমি একদিন মাগো লাইগা একখান হাসপাতাল বানামু। হের লাইগাতো মেলা টেকা লাগব। বিদেশ যাইয়া হেই টেকা কামাই কইরা আবার ফিরা আমু। মা আমার বহুত কষ্ট পাইয়া মরছে। আর কোনো মারে আমি এমুন কইরা মরতে দিমু না।

রহমত মিয়ার চোখ সজল হয়ে আসে। তালাতের কথা তার হৃদয় স্পর্শ করে। তিনি আশ্বাস দেন, ঠিক আছে তরে আমি বিদেশ পাঠাইবার ব্যবস্থা করমু। তয় তুই কিন্তু তাড়াহুড়া করবি না।

১২.

জায়গাটা পছন্দ হয়েছে খুব তালাতের। ইতোমধ্যে গ্রামের লোকজন জেনে গেছে তাদের এ প্রত্যন্ত গ্রামে একটা বড় হাসপাতাল হতে যাচ্ছে। লোকজন বেশ আসা-যাওয়া করছে। কিছু মানুষ বাগড়া দেওয়ার জন্য ঘোট পাকাচ্ছে। কয়েকজন প্রভাবশালী গোপনে আতাত করছে।  এই গ্রামে যেন সহজে জায়গা তালাত না পায়। পদে পদে বাধা পেয়ে তালাত নিরাশ হয়ে যেন ওদেরই শরণাপন্ন হয়। আর সুযোগ পেয়ে তারাও এই বিশাল প্রজেক্ট থেকে কিছু উপরি কামাই করে নেয়। এই আশা নিয়ে কতিপয় দুষ্কৃতকারী সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তালাত জমি পছন্দ করে দিয়েছে তার দায়িত্ব শেষ। এখন কলসালটেন্সি ফার্ম যে করে হোক এই জমি হস্তগত করে তালাতের স্বপ্ন পূরণ করবে।

তালাত এ কয়দিন গ্রামে আসা অবধি মণিকা তার ভালোই খোঁজখবর রেখেছে। এমন দক্ষ একজন কর্মীকে পেয়ে সে নিজেও বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছে। মেয়েটা যখন চোখে কাজল আর টিপ দিয়ে এসে দাঁড়ায় তখন সে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। যে জাগাটা সে পছন্দ করেছে। তার পাশেই একটা নদী আছে। প্রতি বছর বন্যায় নাকি এপাশটা ডুবে যায়। তাছাড়াও বহু ঘরবাড়ি আর ফসলের ক্ষতি করে নদী। তাই তালাতের ইচ্ছে এ নদীর পাড় উঁচু করে বেঁধে দিয়ে গ্রাম বাঁচাবে আর ফসল বাঁচাবে। আর পাশেই হবে তার স্বপ্ন।

১৩.

তালাতের বয়স কত তখন? হবে হয়তো বারো/তেরো। একদিন হুট করেই দাদিটা মরে গেল। রাতে কিনা কি হলো বুঝতেই পারেনি সে। সকালে উঠে দাদিকে এত ডাকল, দাদি আর সাড়া দিল না। চিৎকার করে পাড়া মাথায় তুলল। সবাই এসে দাদির সৎকার করল। কবরে দাদিকে নামিয়ে দিয়ে এসে তালাতের আর সময় কাটে না। গোটা বাড়িটাকেই তার কবরের মতোন মনে হয়। রাতে ঠিকই বিছানায় গেল কিন্তু ঘুম হলো না। মনে হলো সে অন্ধকার কবরের মধ্যে শুয়ে আছে। মাথায় কত ভাবনা এলো। কিন্তুই গোছাল না।

মন খারাপ, এ পাড়া-ও পাড়া ঘুরে বেড়াল। বড় রাস্তার চায়ের দোকানে গিয়ে বসে থাকল। আর আকাশে প্লেন উড়তে দেখলে নিজেকে পাখি হয়ে উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখল।

একদিন সকালবেলা। ঘুম থেকে উঠে দাওয়ায় বসে আছে। এমন সময় রহমত মিয়ার কাজের ছেলেটি এসে জানাল রহমত চাচা তাকে দেখা করতে বলেছে। ওই সকালেই কি একটা আশায় তালাত রহমত চাচার বাড়িতে চলে এলো।

চাচা তাকে খুশির খবরটা দিলেন। একটা ভালো ভিসা আছে, যাবি? লাফিয়ে উঠল তালাত, কও কি চাচা! যামু মায়নে। পারলে অহনি উড়াল দেই।

না, না। উড়াল দেওন লাগব না। ধীর-স্বস্তিরে যা। নইলে তর স্বপ্ন পূরণ করবি ক্যামনে? হ্যাঁ সেই ধীর স্বস্তির ভাবেই তালাত একদিন সব জমিজমা আর ভিটা রহমত চাচাকে দিয়ে চলে গেল বিদেশে।

১৪.

জমির মালিকদের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। কথা বলতে মণিকার আরেক সহকর্মী তাবরিজ সাহেব এসেছেন। মণিকার সৌন্দর্য তালাতকে বিভোর করছে। গ্রামের পথে পথে চলতে গিয়ে তালাত বুঝতে পারে মেয়েটির আন্তরিকতা। মনে হচ্ছে একটা জাদু আছেÑ ওর ভেতর। যখন বিভোর হতে শুরু করেছে তালাত তখন এক সন্ধ্যায় দুজনের কথোপকথন থমকে গেল। ওরা বসে ছিল ঘরে। মুখোমুখি। তালাত ছিল বাইরে। উঠোনে। আকাশে শরতের চাঁদ। জোছনা ঢালছিল। সেদিকেই তাকিয়ে তালাত মণিকার মুখটা কল্পনায় আনছিল। ঠিকই তখনই তাবরিজ সাহেবের কথা তার কানে এলো।

আমার ভালোবাসাকে এভাবে পেন্ডিং করে রেখে লাভ কি তোমার?

পেন্ডিং করে রাখিনি তো। আমার ভেতর থেকে সাড়া না এলে কি করবো।

সাড়া আসছে না কেন? সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।

সাড়া আসছে না কেন, তা তো আমি বলতে পারব না।

তোমার হৃদয় তুমি বলতে পারবে না! আশ্চর্য তো!

আসলেই আশ্চর্য! আমিও আমি ভালোবাসার নামে অভিনয় করতে পারব না। যেদিন আসবে আপনাতেই তুমি দেখতে পাবে। বুঝতে পারবে।

সেদিনটা কবে?

অধৈর্য হলে কি করে চলবে! সবকিছুর জন্যই সময় লাগে মিস্টার।

সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু সময়ের তো একটা বাউন্ডারি থাকা প্রয়োজন। না হয় বুঝব কি করে।

সবুর করো, মেওয়া ফলতে পারে!

দুজনের কথা শুনে তালাতের মনের কোণে কোথায় যেন ক্ষীণ আশা দুলতে থাকে। কারণ মণিকা এখনও তালাতের হয়ে যায়নি!

১৫.

বিদেশে গিয়ে সে ভালোই করল। ভালো একটা কাজ পেল। ভালো কিছু মানুষ পেল। কিন্তু সারাক্ষণ তার দেশের মুখ ভেসে রইল মানসপটে। আর একটা অস্পষ্ট কল্পিত মায়ের মুখ তাকে আদরে-স্নেহে ডাকতে থাকল সারাক্ষণ আয় আয় বলে। বিদেশে যখন দু-একজন দেশের মানুষ পেত তখন মনে হতো কি যে একটা স্বর্গ হাতে পেয়েছে, কে জানে! আনন্দে বিহ্বল হয়ে জড়িয়ে ধরতে মন চাইতো।

বাসেত ভাই, ভালো মানুষ ছিলেন। খুব কষ্ট করেছেন। অপরিশোধ্য ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। নতুন বউয়ের মুখটা মনে মনেই ছিল। চোখে নতুন স্বপ্ন ভাসতো। স্ত্রীর সঙ্গে আলাপন করার পর কেমন টগবগ করে ফুটতেন আনন্দে। মা-বাবা আর স্ত্রীকে ঘিরে তার অন্যরকম স¦প্ন ছিল। একদিন কথা কথায় বলেছিল, জানেন তালাত ভাই আমাদের একটা বাবু আসছে। মেয়ে না ছেলে হবে কে জানে! যা-ই হবে হোক আমি বাবা হবÑ কি যে সুখ। কিন্তু এক বছরের আগে তো আমি কোম্পানি থেকে ছুটি পাবো না। আমার বাবু তো তার আগেই পৃথিবীর আলো দেখতে চলে আসবে।

তাতে কি! আমি ওকে দেখবই।

১৬.

সন্তানের আগমন বার্তা বাসেত ভাই পেয়েছিলেন। একদিন মোবাইলে তালাতকে সন্তানের ছবিও দেখিয়েছেন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই তালাত দেখল বাসেত ভাই মুখচোখ অন্ধকার করে রেখেছে। কি হয়েছে? জানা গেল বাসেত ভাইয়ের সন্তানের অসুখ। যেদিনই দেখা হয় বাসেত ভাইয়ের কাছে তালাত তার সন্তানের কথা জানতে চায়। আর যেদিন বাসেত ভাই ছুটি পেল সেদিন বাসেত ভাইয়ের কি যে খুশি। তার চোখ মুখ খুশিতে টগবগ করছিল। কিন্তু তারপরের ঘটনা খুবই করুণ। বাসেত ভাই এসে সন্তানকে আর পান নি। সন্তানের কবরে এসে তাকে মুখ বুঝে কান্না লুকাতে হয়েছে। এই বাসেত ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে সে যে কাজ শিখেছিল তা দিয়ে দেশেই নাকি আরও ভালো কাজ করা যায়। কিন্তু এখানে নাকি প্রতি পদে পদে বাধা। এই বাধা ডিঙিয়ে একজন বাসেত এগিয়ে যেতে পারে না। তাই স্ত্রী-বাবা-মা সব ফেলে বাসেত পড়ে থাকে রুক্ষ মরুর দেশে। আর দু’চোখে স্বপ্ন দ্যাখেন কখন দেশে ফিরে আসবেন। দেশে ফিরে সে একটা সুন্দর খামার করতে চায়। সেই খামারে সে নিজেই কাজ করবে। সবুজ ফসলে আর শাক-সবজিতে ভরে থাকবে তার খামার।

১৭.

গ্রামের অশুভ লোকগুলো আবারও জোট বাঁধে। এবার তারা তালাতের প্রাণ সংহার করতেও পিছপা হবে না বলে, যুক্তি করে। তারা সুযোগ খোঁজে। কিন্তু সতর্ক তাবরিজকে টেক্কা দিয়ে তালাতকে ফাঁদে আটকানো মুশকিল। যাদের কাছ থেকে জমি কেনা হয়েছে তাদের কাছ থেকে জমি বুঝে নেওয়ার আগেই তালাতকে ওরা বিপদে ফেলতে চায়।

১৮.

জোছনা রাত। পূর্ণিমা যেন গলে গলে পড়ছে। পূর্ণিমার রাতে নৌকায় বসে মণিকা তালাতের দুঃখের গল্প শোনে। কিন্তু পাড়েও একজন বসে সতর্ক শিকারির চোখে পাহারা দেয়। সে হল তাবরিজ। নৌকা ভেসে আসতে থাকে কূলের দিকে। কিন্তু তার আগেই হঠাৎ পানিতে তোলপাড়। দুজন কালো পোশাকে এসে অতর্কিতে আক্রমণ করে। নৌকা দুলে ওঠে। পড়ে যায় মণিকা। আর তালাতকে ওরা নৌকায় করে নিয়ে যায় অন্যখানে। কূলে দাঁড়িয়ে সবই খেয়াল করে তাবরিজ। কিন্তু কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। ওদিকে মণিকার কোনো খোঁজ নেই। গেল কোথায় মেয়েটি। তাবরিজের উৎকণ্ঠা হয়। নৌকাটি চলতেই থাকে। কিন্তু নৌকার এক পাশে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকে মণিকা। বহদূরে এসে যেখানে ওরা তালাতকে নিয়ে নামতে চায় সেখানে এলেই বিপত্তিটা বাধে। হঠাৎ ওরা দেখতে পায় সামনে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী মূর্তি। কিন্তু তার জিভটি এমনভাবে বেরিয়ে আছে কেন? কোমরে  ওড়নাটা পেঁচিয়ে বাঁধা। তাতে একটা শুকনো লাঠি। যারা তালাতকে নিয়ে নামছিল হঠাৎ তারা ভয় পেয়ে পেছনে সরতে থাকে। কিন্তু রাতের বেলা চণ্ডালিকা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। তালাত হাঁ করে তাকিয়ে দেখে নারী মূর্তিটি কেমন করে একের পর এক ঘা কষায় ও দুটো শয়তানের ঘাড়ে। তালাতকে উদ্ধার করে ফিরে আসে মণিকা। তালাত বলে, আমি ভয় পেয়েছি।

কেন? কিসের ভয়?

ওভাবে জিভ বের করে ছিলে কেন তুমি?

রাগে, ক্ষোভে। ওদের এত সাহস একজন মানুষ তার জন্মভূমির জন্য সর্বস্ব দিতে এসেছে আর ওরা তা ভন্ডুল করতে চায়। ওদের সবকটাকে আমি উচিত শিক্ষা দেব।

আমি প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছিলাম তখন বুঝিনি তুমি এত মারপিট জানো।

আজ কি বুঝলেন?

জানলাম তুমি মারপিট, সাঁতার কাটা এমন কি গোয়েন্দাগিরিও করতে জানো।

প্রথমত, আপনাকে সম্বোধন পরিবর্তন করার জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনাকে কোনো ধন্যবাদ আমি দিতে পারছি না।

১৯.

গুলিটা কোনদিক দিয়ে এসেছে ঠিক বুঝতে পারেনি। লেগেছে বুকের একপাশে। ওদের টার্গেট ছিল তালাত। কিন্তু লেগে গেছে তাবরিজের গায়ে। তারপর অন্ধকারেই লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। মেরেই ফেলত তালাতকে ওরা কিন্তু পারেনি। এর মধ্যে চলে আসে গ্রামের অন্য একটা দল। কুচক্রীরা পালিয়ে যায়। প্রাণে বেঁচে যায় তালাত। কিন্তু বেঁচে থাকে না তাবরিজ। হাসপাতালে নিতে নিতেই সে মারা যায়। আর তালাত গায়ে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পড়ে থাকে নিথর নিস্তব্ধ।

২০.

সারা গায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে শুয়ে আছে তালাত। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে নির্ঘুম মণিকা। চোখ দুটো ভাসা ভাসা। চোখ মেলে তাকিয়ে তালাত কি যেন বলতে চাইল। মণিকা তার বড় বড় চোখ দিয়ে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টিটা তালাতের হৃদয় ছুঁয়ে রইল। তালাত জানতে চাইল, তাবরিজ সাহেব…?

মণিকা অস্ফুট স্বরে বলল, উনি বেঁচে নেই।

তালাতের চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। মণিকা কাছে এসে তার পাশে বসল। হাত দুটো তুলে নিল হাতের মুঠোয়। তারপর ফিসফিস করে বলল, তাবরিজ সাহেব আমাকে আপনার দেখ-ভালোর দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। শ্বাস নিল তালাত। মণিকা হাত দুটো শক্ত করে ধরে আছে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares