রাসু চোর : গৌতম বিশ্বাস

নিতাই মাস্টার প্রায়ই বলেন, ‘চুরি করা ভালো কাজ নয় রে রাসু। কবে কোন বিপদে পড়ে যাবি। তাছাড়া এতে বউ-ছেলেমেয়ের মান থাকে না। রাস্তায় বেরোলে পাঁচজনে ওদের পাঁচ কথা বলে। জীবনে খেয়ে পরে বেঁচে থাকাই কী সব? পরকাল বলেও তো একটা কথা আছে। কী জবাব দিবি সেখানে গিয়ে?’

এ কথা শুনে তামাটে রঙ ধরে যাওয়া দাঁতগুলো বের করে কেবল হাসে রাসু।

নিতাই মাস্টার বলেন, ‘হাসছিস কেন? আমি কী হাসির কথা বললাম?’

‘সে জন্যি হাসি নে ছার। হাসলি মন ভালো থায়ে। মাথাডা খোলতাই হয়। কাম কাজে মন দিতি পারি।’

‘কাজ তো তোর সেই একটাইÑ চুরি। হ্যাঁরে, চুরি ছাড়া কী আর কোনো কাজ নেই দুনিয়ায়?’

মুখের হাসি তে এতটুকু কমতি দেখা যায় না রাসুর। সে তেমনি হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ‘বাপ-দাদার পেশা। ইচ্ছে হলিও ছাড়তি পারিনে ছার।’

‘ইচ্ছে কী করে দেখেছিস কখনও?’

এ বারে হাসিটা ঈষৎ সামলে নেয় রাসু। হাজার হোক নিতাই সাহা একজন মাস্টার। পাঁচজনা মান্যি করে। গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুলে ‘টু কেলাস’ অব্দি এই মাস্টারের কাছেই পড়েছে সে। সেই মাস্টারের সব কথা হাসি হাসি ভাবে উড়িয়ে দিলে ব্যাপারটা ভালো দেখায় না মোটে।

অগত্যা রাসু বলে, ‘আপনেরে মিথ্যে কব না। সে ইচ্ছে আমি সত্যি সত্যিই কইরে দেহি নেই। কহন করব কন। সারাদিন ঘুমোয়ে ঘুমোয়ে কাটায়ে দেই। সন্ধ্যেবেলা হলিই গায়ের ভেতরডা ক্যামন ক্যামন করে। কী এট্টা য্যান পাও দু’ডো ধইরে টানতি টানতি বাইরে নে যায়।’

‘বুঝেছি।’

কী?

‘যে পথ ধরেছিস সে পথ থেকে ফেরার আর উপায় নেই তোর।’

ফের হাসে রাসু, ‘আমারও তাই মনে হয় ছার।’

ফেরার উপায় যে আর নেই তা রাসুর চেয়ে ভালো আর কে জানে। কারণ এই পেশাটার সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক। বাপ, তার বাপ, তার বাপও ছিল এই পেশারই মানুষ। আশপাশের দশ-বিশটা গাঁয়ে এক অন্যরকমের নাম ছিল তাদের। সেই নামের ধারা বজায় রাখতে গিয়ে পেশাটাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে রাসু। আজকাল আর অন্য পেশায় যাওয়ার কথা সে ভাবতেই পরে না। যদি কেউ চুরি ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার কথা বলে তখনই আৎকে উঠে জিব কাটে রাসু, ‘না গো খুড়ো, ওই ডি আমি পারব না।’

‘কেন? পারবি নে কেন?’

‘পেশাডারে যে বড্ড ভালোবেস্যে ফেলিচি।’

‘ভালোবাসার আর জিনিস পেলিনে? শেষে চুরি? লোকে শুনলে কী বলবে বল দেখি?’

লোকের কথা ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয় রাসু। বলে, ‘ওগের মুখ আছে ওরা বলতিই পারে। কিন্তুক খুড়ো জেবনে কোনো দিনও চুরি করে নাই এমন কথা কেউ বলতি পারে? নিদেনপক্ষে বাপের জামার পকেট, মা’র শাড়ির আঁচল থ্যিকে ট্যাকা নেয় নাই?’

‘সে তো নিজেরই বাবা-মা।’

‘চুরি চুরিই। তার আবার রকমফের কী?’

‘আছে রে রাসু, আছে।’

‘কী আছে কও দেহি?’

‘সে তুই বুঝবি নে। আমি বলি কী, এখনও সময় আছে। এ পেশা ছাড়। ছেলেমেয়ে বড়ো হচ্ছে। দু’দিন পরে রাস্তায় বেরোবে। লোকের কাছে তাদের কী পরিচয় হবে বল দেখি?’

‘কী?’

‘বলবে ওই দ্যাখো রাসু চোরের ছেলেমেয়ে। হ্যাঁরে,  কোন মুখে মানুষের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে ওরা?’

বড়ো আতান্তরে পড়ে যায় রাসু। এ পরিচয়টা খুব একটা যে ভালো নয় সেটা বেশ ভালোই বোঝে রাসু। সেই যে ছোটবেলায় এমন কথা শুনেই তো স্কুল ছেড়েছিল সে। স্কুলে পা রাখতে না রাখতে নিত্যদিন কেউ না কেউ তাকে জিজ্ঞেস করতো, ‘এই রাসু, তোর বাবা নাকি চোর?’

চোর যে কী এমন খারাপ জিনিস তা বোঝার মতো বয়স তখন তার নয়। সে তাই বলতো,‘হঃ।’

‘ছ্যা ছ্যা, তুই কী ছেলে রে রাসু? তোর বাবা চুরি করে আর তুই সেটা বড়ো মুখ করে বলিস?’

রাসু মাথা চুলকাতো। যা সত্যি সে তো তাই বলেছে। তাহলে এত দুয়ো দেওয়ার কী হল?

নিত্যদিন স্কুলের ছেলেমেয়েগুলোর এমন ছ্যা ছ্যা শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন বলেই বসলো, ‘আমি আর ইসকুলি যাবো না।’

মা অবাক, ‘ক্যান রে, হলো কী?’

রাসু বলল, ‘আচ্ছা মা, চুরি করা কী খারাপ?’

রাসুর প্রশ্ন শুনে মা তাকালো বাপের দিকে। বাপ তাকালো রাসুর দিকে। জিজ্ঞেস করলো, ‘কেউ কী কিছু কইছে বাপ?’

‘হঃ, কইছে?’

‘কী কইছে?’

‘এই যে তুমি চুরি করো। এই নে ‘ওরা দুয়ো দেয়।’

বাপ অনেক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইলো তার দিকে। মা-ও তাকিয়ে রইলো। শেষে বেশ বড়োসড়ো এক নিঃশ্বাস ফেলে বাপ বলল, “থাক, আর ইসকুলি গে ‘কাম নাই তোর। তার চে’ আমার পেশাডাই ভালো কইরে শিখ্যে নে।”

আঁতকে উঠে মা বলল, ‘কও কী? এই বয়াসেই চুরি?’

বাপ বলল, ‘মন্দ কী?’

‘ও না কত ছোট?’

‘আজ ছোট আছে। বড়ো হতি কদ্দিন? ছোট থ্যিকে শিখ্যে নিলি বড়ো হলি কাজ কত্তি সুবিধে হবে।’

অগত্যা পড়াশোনায় ইতি রাসুর। বাপ নিজে হাতে শেখাতে লাগলো নিয়ম কানুন। কী করে গৃহস্থের ঘরে ঢুকে পড়তে হয়। কী করে বেরোতে হয়। ধরা পড়ে গেলে কী করে বাঁচিয়ে আনতে হয় নিজেকে। শুনতে শুনতে বিস্ময়ে চোখ জোড়া যেন কপালে উঠে যেত রাসুর। চুরি করতে গেলে যে এতকিছু শিখতে হয় তা তো সে ভাবেনি কোনো দিন। কোনো কিছু না শিখেই সে কিনা দুখুর বইয়ের ফাঁক থেকে সেদিন পেন্সিলটা বের করে নিয়েছিল। ইস, যদি ধরা পড়ে যেত? বাপ তার কত কিছুই না জানে।

চুরি করার আটঘাট সেই থেকে শিখে নেওয়া শুরু রাসুর। আজ বাপ নেই। মা-ও মারা গেছে। তবে বাপের শেখানো বিদ্যেটা তার রয়ে গেছে। আর মাথার মধ্যে রয়ে গেছে বাপের সেই অমোঘ বাণী,‘বাপ রে, দুনিয়ায় চুরি সবাই করে। জেবনে কোনো দিন চুরি করে নাই, এমন মানুষ তুই এ সোংসারে পাবি নে। তাই মানষে যতই ‘চোর’ কইয়ে দুয়ো দিক তাতে নিজেরে ছোট ভাববি নে। বরং নিজির পেশাডারে ভালোবাসিস। দেহিস তাতেই তোর উন্নতি হবে।’

সেজন্যেই যে যা বলুক হেসে হেসেই শুনে যায় কেবল রাসু। শুনতে শুনতে সে আকাশ দ্যাখে। গাছপালা, ঝোপঝাড় দ্যাখে। ফুল-পাখি দ্যাখে। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ দ্যাখে।

কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁ রে রাসু, এই যে এত লোকে যে তোকে চোর বলে, তোর খারাপ লাগে না?’

রাসু অবাক হয়, ‘ক্যান? খারাপ লাগবে ক্যান?’

অবাক হয় তারাও, ‘তার মানে লাগে না বলছিস?’

মাথা নাড়ে রাসু, ‘না।’

‘এ জন্যেই কথায় বলে চোরেদের দু’কান কাটা হয়।’

রাসু হাসে, ‘তাহলি তো বাবু কারুরই কান নাই। এই জগতে কী খালি একা রাসুই চোর? কেডা চোর না খুঁজতি গেলি যে ঠগ বাছতি গাঁ উজোড় হইয়ে যাবে।’

তারা হার স্বীকার করে নেয় রাসুর কাছে। বলে,‘তুই কথাও জানিস বটে রাসু।’

রাসু ‘হেঃ হেঃ’ করে হাসে। তারপর তাকায় আকাশের দিকে। সেখানে দেখতে পায় বাপের মুখ। বাপ যেন বলে, ‘বেশ বলিছিস বাপ। যোগ্য জবাব দিছিস। ওরে এই দুনিয়ায় চোর ছাড়া মানুষ নাই রে। জগতের সবচাইয়ে বড়ো পেশা হলো চুরি। যে যত চুরি কত্তি পারে সে তত বড়ো হয়। দুনিয়াডা তো চোরেরাই চালায় রে বাপ।’

নিজের পেশাটা নিয়ে আজকাল তাই বেশ গর্ব হয় রাসুর। সে মনে করে চুরি কেবল তার পেশা নয়। এটা তার সাধনা। এই সাধনায় একবার সিদ্ধি লাভ করতে পারলেই সে অমর হয়ে যাবে। চুরিটা তাই মন দিয়ে করে সে। যেন এর মতো ভালো কাজ আর নেই এ দুনিয়ায়। সারাটা দিন শুয়ে, বসে, ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। সন্ধ্যে নামতেই শরীরের মধ্যে কেমন একটা হতে শুরু করে। দাওয়ায় চুপটি করে বসে তাকিয়ে থাকে বাইরের আঁধারঘেরা উঠোনটার দিকে। উঠোন পেরিয়ে কলাঝাড়টার দিকে। কলাঝাড় পেরিয়ে ওপাশের কানাই সামন্তর বাঁশবাগানের দিকে। একরাশ ঝুঝকো আঁধার সেখানে গা জড়াজড়ি করে বসে থাকে রোজ। গোটাকতক জোনাকি উড়ে বেড়ায় চারপাশে। মাটির গর্ত থেকে বেরিয়ে তারস্বরে ডাকতে থাকে ঝিঁঝিঁ পোকা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা ঘোর যেন পেয়ে বসে রাসুকে। রাসু তখন এক অন্য জগতের বাসিন্দা। সেখানে বউ নেই। সন্তান নেই। কেবল একা রাসু। আর চারপাশে ঘন হয়ে আসা আঁধার। এই আঁধার তার বড় প্রিয়। আঁধারের মধ্যে গা-টাকে আড়াল করে বেরিয়ে যায় সে। পাড়া ছাড়িয়ে অন্য পাড়া। গ্রাম ছাড়িয়ে অন্য গ্রাম। তারপর ঢুকে পড়ে কোনো গৃহস্থ বাড়ির অন্দরে।

নিত্যদিন এটাই রুটিন রাসুর। অন্যথা  হলো না আজও। বিকেলের আলোটা ফুরোতে ফুরোতে যখন সন্ধ্যের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিল তখন ঘুম থেকে উঠে চোখে মুখে জলের ঝাপটা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মোড়ের মাথায় সনাতনের চায়ের দোকানে। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের এই একটিই মাত্র জায়গা আছে রাসুর। এখানে এসে খানিক বসলে, পাঁচজনের সঙ্গে কথা বললে মাথাটা খানিক খোলতাই হয় তার। ভাবনারা ঝকঝক করে। ঠিক-বেঠিকের হিসাবটা পরিষ্কার হয়। গত দিনের সব স্মৃতি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে আবার ভাবতে পারে। আর তাই প্রতিদিনই নিয়ম করে একটিবার সে সনাতনের দোকানে যায়। অল্প করে চিনি দেওয়া এক কাপ চা নিয়ে চোখ বন্ধ করে মনের সুখে চুমুক দিতে দিতে ঠিক করে নেয় আজ কোন দিকে বেরোবে। আশপাশের অন্তত বিশখানি গ্রাম হাতের তালুর মতো চেনা রাসুর। প্রতিটা রাস্তা, রাস্তার মোড়, ঘরবাড়িÑ কোনোটাই তার অচেনা নয়। চোখ বন্ধ করলে সে সব যেন ছবির মতো ভেসে ওঠে তার চোখে। সেই ছবিরই কোনো একটা জায়গাকে বেছে নেয় সেদিনের জন্য।

   রাসুকে এমনি করে চা খেতে দেখে কেউ কেউ মজা পায় বেশ। জিজ্ঞেস করে,‘কী রে রাসু, চোখ বন্ধ করে কার কথা এত ভাবিস?’

এমন প্রশ্নে বেশ মজা পায় রাসু। সে হাসে। হাসতে হাসতে বলে,‘সে তুমরা বুঝবা না। ভাবার মানুষ কী কম আছে দুনিয়ায়?’

তারা বলে,‘না, তা অবশ্য নেই। তোর তো আবার নিত্যদিন নিত্যনতুন মানুষ নিয়ে কারবার। তোর কপালটা বড্ডো ভালো রে রাসু। নতুন মানুষ। নতুন মুখ। আর আমাদের কী পোড়া কপাল দ্যাখ। প্রতিদিন সেই একটাই মানুষ। একটাই মুখ। আর ভাল্লাগে না রে।’

চায়ের কাপে ফের একখানা বড়োসড়ো চুমুক দিতে দিতে রাসু হাসে। বলে,‘তাহলি চলো না ক্যান আমার সঙে।’

   ‘সঙ্গে নিবি আমাদের?’

‘তা নিতি পারি, যদি আমারে গুরু মানো।’

‘ওরে মানবো কীরে, তুই তো এমনিতেই গুরু।’

‘তাহলি গুরু দক্ষিণে দেও।’

সেদিন চা টা ফ্রি তেই খাওয়া হয়ে যায় রাসুর। সনাতন কৌতুক করে বলে,‘আর জনা কতক শিষ্য হলে তোর তো ভালোই হয় রে রাসু। চা আর কিনে খেতে হয় না।’

রাসু তেমনি হাসে। বলে,‘তুমি হবা নেকি সনা দা?’

সনাতন বলে,‘তা হলে তো মন্দ হত না রে রাসু। কিন্তু আমার যে অত সময় নেই রে।’

আজও এমন কথাই হয়েছিল দীনু সরখেলের ভাই ননির সঙ্গে। বেশ মজাদার মানুষ ননি। বলেছিল,‘বুঝলি রাসু, দুনিয়ায় এই যে এত এত পুরস্কার দেওয়া হয় অথচ দ্যাখ চুরির জন্যে কোনো পুরস্কার নেই। থাকলে কিন্তু সেটা তুই ই পেতিস।’

‘হেঃ হেঃ’ করে হেসেছিল রাসু। বলেছিল,‘কী যে কওনা তুমি ননি দা। আমার চাইয়ে কত বড় বড় চোর আছে দুনিয়ায়। পুরস্কার দিলি তো তারাই পাবে।’

‘ওরে না রে। চোর হলেই তো আর হবে না। সৎ অসৎ বলেও তো একটা কথা আছে।’

এমনি করে কথায় কথায় সন্ধে উতরে রাত নেমেছিল। চারপাশে গাঢ় হয়ে এসেছিল আঁধার। জোনাকিরা জ্বলতে শুরু করেছিল চারপাশে। অসংখ্য ঝিঁঝিঁর ডাকে কান পাতা দায় হয়ে পড়লে ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল রাসুর। সনাতনের দোকান থেকে ফিরে এসে বসেছিল দাওয়ায়।

সন্ধেটা উতরে গেছে অনেক আগেই। এখন গভীর রাত। পুরো পৃথিবী যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। চারপাশে কেবল আঁধার আর আঁধার। গ্রামে যদিও কারেন্ট ঢুকেছে অনেক আগেই। তবে মানুষগুলো এত বেশি হিসেবি যে খাওয়া সারতে যতক্ষণ। তারপরেই আলোটালো নিভিয়ে দিয়ে সোজা বিছানায়। এতে সুবিধেই হয় রাসুর। অন্ধকারে গা-টাকে আড়াল করে বেরোতে পারে সে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও কারও নজরে পড়ে না। আর আচমকা যদি কেউ সামনে এসেও পড়ে সট করে একবার পাশের ঝোপে ঢুকে পড়তে পারলেই হল। রাসুকে তখন দ্যাখে সাধ্য কার। সারা গ্রামে কারেন্ট থাকলেও রাসুর ঘরে তা নেই। এ জন্যে সন্ধ্যে নামতেই ঘুটঘুটে কালো একটা অন্ধকার এসে গিলে নেয় পুরো বাড়িটা। তেমনই একটা আঁধার আজও গিলে নিয়েছে বাড়িটাকে। কুপির আলায় ঘরের ভেতরেই কেবল যা একটু আলোছায়া। তাতেও আবার আঁধারেরই আধিক্য যেন। রাত বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা কেবল একা রাসুই জানে। গাঁয়ের একটি মানুষও জেগে থাকতে ঘর থেকে বেরোয় না সে। যদিও বা বেরোয় সে কেবল তার দাওয়া পর্যন্ত। অন্ধকার ঘেরা দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বাইরেটাকে একবার দেখে নিয়ে ফের ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়।

আজও বার কয়েক এমনি করে দেখে নেওয়ার পর অবশেষে যখন মনে হলো ‘না, আর কেউ জেগে নেই’ তখনই দরজার ঝাপটাকে সন্তর্পণে একপাশে ঠেলে সরিরে বেরিয়ে এলো রাসু। প্রথমে দাওয়া। দাওয়া থেকে উঠোন। উঠোনে নেমে চারপাশ ভালো করে একবার দেখে নিয়ে যখন আশ্বস্ত  হলো, তখনই উঠে এলো রাস্তায়। নিত্যদিন এমনটাই করে সে। এলাকার সবাই জানে রাসু চোর। রাত-বিরেতে এমনিতেও যদি পথে বেরোয় লোকে ধরে নেবে চুরি করতেই বেরিয়েছে রাসু। আর এই কারণেই অন্যদের থেকে একটু বেশিই সতর্ক থাকতে হয় তার। গাছ থেকে পাতা ঝরার শব্দ হলেও গা টাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে যেতে হয়।

গ্রামের রাস্তা। সন্ধ্যে নামতেই একরাশ ঘুটঘুটে কালো আঁধার এসে গিলে নিয়েছিল পুরো রাস্তাটা। আর এখন তো গভীর রাত। অন্ধকারটা আঠার  মতো চেপে বসে আছে চারপাশে। এই আঁধারে আর কারও দৃষ্টি না চললেও রাসুর দৃষ্টিটা ঠিক চলে। সে পরিষ্কারই দেখতে পায় চারপাশ। সবই অভ্যেসের গুণে। রাত বিরেতে কী করে পথে বেরোতে হয়, কী করে আরও একটু ভালো করে আঁধারটাকেও খুঁটিয়ে দেখা যায়, সবটাই শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল বাপ তাকে। সেই সঙ্গে এটাও বলেছিল,‘চুরি কত্তি গেলি চোখ কান সারাক্ষণ খুল্যে রাখপি। বেপদ কহন কোনদিক থ্যিকে আসে কিছুই কওয়া যায় না বাপ।’

বাপের কথাটা রাস্তায় বেরোলেই মনে রাখে রাসু। এই যে এখনই যেমন। অন্ধকারে সামনের ঝোপটা ঈষৎ নড়ে উঠতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে। শুধু দাঁড়িয়ে পড়া-ই নয়, সট্ করে সরে গিয়ে রাস্তার পাশের আমগাছটার আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে ফেলেছিল মুহূর্তে। কিন্তু যখন দেখলো বিপদের তেমন কিছুই নয় কেবল একটা শেয়াল খাবারের খোঁজে বেরিয়ে ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, তখন আলতো করে একবার হাসলো কেবল। তারপর ফের হাঁটতে শুরু করল।

রাত্রি এখন কত হবে? আকাশের দিকে তাকিয়ে একবার আন্দাজ করার চেষ্টা করল রাসু। দুইপাশের গাছপালা গুলোর ডাল এমন ভাবে রাস্তার ওপর ঝুঁকে পড়েছে যে তেমন করে কিছুই দেখা যায় না। তাও ফাঁকফোকর দিয়ে অল্প বিস্তর যা দেখা গেল তাতে এখন যে মাঝরাত সেটা বেশ বুঝতে পারলো রাসু। সন্ধেবেলায় পুব আকাশে বড়ো যে তারাটা উঠে এসেছিল সেটাই এখন খাড়াখাড়ি মাথার ওপরে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মানে ঘরে ঘরে ঘুম এখন বেশ গাঢ় হয়ে চেপে বসেছে। চারপাশে তাই বড়ো বেশি নিঃশব্দ। ঝিঁঝিঁর ডাক থেমে গেছে অনেক আগেই। জোনাকিরাও তার ওড়া থামিয়ে পাতার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে। এখন জেগে আছে বলতে গেলে একা রাসু। না, ঠিক একা রাসু নয়। এ গাঁয়ে আরও একজন সারারাত বলতে গেলে জেগেই থাকে। রাখোহরি হালদারের বুড়ো বাপটা হেঁপো রোগী। যখন তখন কাশি ওঠে তার। আর একবার তা উঠলে আর থামতে চায় না। যখন থামে তখন শুরু হয় হাঁপের টান। বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন কিছু একটা খামচে ধরে বের করে আনতে চায় তার। কতদিন এ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বুড়োর কাশির শব্দ পেয়েছে রাসু। আজও খানিক দূর থেকেই তার কাশির শব্দ শুনতে পেল সে। মনে মনে রাখোহরি হালদারকে গাল দিল সে, ‘শালা বুড়ো বাপের চিকিচ্ছে করবার ট্যাকা হয় না তোর আবার তো দেহি ও পাড়ার বিশু মিত্তিরের বেধবা বৌডারে এডা ওডা ঠিকই দিতি পারিস।’

গালটা দিয়ে বেশ খুশিই হল রাসু। হালদারকে সে দু’চোখে দেখতে পারে না। সেবার মিছেমিছি তার নামে এক বস্তা ধান চুরির বদনাম দিয়ে অতগুলো লোকের সামনে কী বেইজ্জতই না করল। রাসু যে এত করে বলল, ‘না গো বাবু ধান, পাট আমি চুরি করি নে।’ তো কে শোনে কার কথা। ঘাড়ের বাঁ পাশে বেশ জোরে  এক থাবড়া মেরে হালদার বলেছিল, ‘ফের মুখে মুখে কথা।  চোদানির পো তোর গুদেÑ। ‘বিশ্রী রকমের খারাপ একটা কথা বলেছিল হালদার। নিতাই মাস্টার মাঝখানে এসে না পড়লে কী যে হত সেদিন।

মাস্টারই সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন রাসুকে। রাখোহরি হালদারের সাঁড়াশির মতো হাতটা রাসুর ঘাড় থেকে সরিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, ‘করো কী হালদার, থামো, থামো। আরে তোমার  মতো একজন মান্যি গন্যি মানুষ সামান্য এক বস্তা ধানের জন্যÑ , লোকে বলবে কী?’

মাস্টারের কথায় খুশি হয়েছিল হালদার। মাস্টার যখন তাকে একজন মান্যি গন্যি লোক বলে মনে করে তখন গাঁয়ের আর পাঁচজনাও নির্ঘাতÑ

রাখোহরি হালদারের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাথার মধ্যে কী একটা যেন নড়ে ওঠে রাসুর। পা দু’টো তার দাঁড়িয়ে যায়। সোজা রাস্তায় না গিয়ে ঢুকে পড়তে ইচ্ছে হয় বাড়ির মধ্যে। যে মিথ্যে বদনাম সেদিন দিয়েছিল হালদার তা সত্যি করতে ইচ্ছে হয় তার।

আজও তেমন একটা ইচ্ছে হল। কিন্তু সাহসে কুলোলো না। হালদারের বুড়ো বাপ রাতজাগা মানুষ। আর রাতজাগা মানুষের চোখ আঁধারেই বেশি চলে। একটাবার যদি তার সামনে পড়ে যায় রাসু তাহলেই গেল। না, দো মনা ভাবটা একপাশে সরিয়ে রেখে ফের হাঁটতে লাগলো রাসু।

চারপাশে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। একটা নেশার  মতো ঘুম চারপাশ আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। কেমন যেন জনমানবহীন এক নিস্তব্ধ চরাচর। ফের একবার আকাশের দিকে তাকালো রাসু। এখানে রাস্তার ওপরে বেশ খানিকটা ফাঁকা। আকাশটা বেশ দেখা যায়। লক্ষ তারা সেখানে বেল কুঁড়ির মতো ফুটে আছে। দাঁড়িয়ে পড়ে আকাশটাকে খানিক খুঁটিয়ে দেখলো রাসু। এমন সুন্দর একখানি আকাশ  অনেক্ষণ ধরে তার দেখতে ইচ্ছে হয় খুব। কিন্তু অতটা সময় সে পায় না। শেষ রাত পড়ার আগেই কাজ সেরে নিত্যদিন তাকে ঘরে ফিরে আসতে হয়। গাঁ-গেরামের মানুষ  সকাল সকাল যেমন শুয়ে পড়ে তেমনি জেগেও ওঠে রাত থাকতেই। কতজনার কত কাজ। একবার কারও সামনে পড়ে গেলেইÑ  না, হাঁটা-ই দিল রাসু।

নগেন সাঁপুইয়ের পুকুরপাড় বরাবর কোনাকুনি নামলে নিশ্চিন্দিপুরের রাস্তাটা বেশ খানিক কাছেই হয়। নিত্যদিন এই পথটাই ধরে রাসু। আজও ধরল। একরাশ ঝুঝকো আঁধার চারপাশে গাঢ় হয়ে চেপে বসে আছে এখানে। পাড় দিয়ে এক সারি তালগাছ। যাদের ঝাঁকড়া মাথায় জমাট বাঁধা নৈঃশব্দ্য।

আচমকাই সামনের আঁধারটা নড়ে উঠলো বোধ করি। সট্ করে একটা কালো ছায়া যেন সামনের তালগাছটার আড়ালে গা ঢাকা দিল। রাসুও একটা গাছের আড়ালে নিয়ে ফেললো নিজেকে। আচমকা এমন একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে কিংকর্তব্য হারিয়ে ফেললো সে। তবে সে মুহূর্ত মাত্র সময়। বিমূঢ় ভাবটা কাটতে অল্পই সময় লাগলো তার। ততক্ষণে সামনের ছায়াটা ফের একবার তালগাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এক ছুটে সামনের আঁধারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

এক প্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো রাসু। না,আর কোনো ভয় তার নেই। উল্টো সেই মানুষটাই রাসুকে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। তার মানে রাসুর মতোই কেউ হবে। আর রাসুকেই সে ভয় পেয়েছে। কিন্তু কে হতে পারে ওটা? ভাবতে লাগলো রাসু। দিঘাড়ীর কানাই? নাকি চাঁপাডাঙার বিশু? অবশ্য বাঘমারার পাঁচুও হতে পারে। কিংবা অন্য কেউ। নতুন লাইনে নেমেছে হয়তো। হাসলো রাসু। যাক, তাকেও তাহলে কেউ ভয় পায়।

ফের একবার আকাশের দিকে তাকালো রাসু। রাত-বিরেতে পথে বেরোলেই এই তার এক সমস্যা। তারায় ভরা আকাশটা বড়োই ভালো লাগে তার। একরাশ আঁধারের মাঝে গুচ্ছের তারারা কেমন হলুদ হলুদ ফুলের মত ফুটে থাকে। এইসব তারাদের দিকে তাকালে নিতাই মাস্টারের কথাটা মনে পড়ে যায় তার। মনে আছে মাস্টার একদিন ক্লাসে পড়াতে পড়াতে বলেছিলেন, ‘এই যে রাতের বেলায় আমরা আকাশের দিকে তাকালে লক্ষ লক্ষ তারা দেখতে পাই, আসলে ওরা সকলেই এক একটা সূর্য। আমাদের এই সৌরজগতে যেমন অনেকগুলো গ্রহ আছে, তেমনি ওদেরও এমনি গ্রহ আছে। হয়তো আমাদের পৃথিবীর মতোইÑ ’

আচ্ছা, সত্যিই কী আমাদের পৃথিবীর মতোই কোনো গ্রহ আছে ওখানে? এমনই সাগর, পাহাড়, নদী, গাছপালা, মানুষজন, ঘর, উঠোন, তুলসিতলা? ভাবে রাসু। আর ভাবতে গেলেই খেই হারিয়ে ফ্যালে মাঝেমধ্যে। অনেকখানি সময় এতে নষ্ট হয়ে যায় তার। তবুও সে দ্যাখে। দ্যাখে আর ভাবে।

আকাশটাকে দেখতে দেখতেই গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো রাসু। আর একবার ভালো করে দেখে নিল চারপাশ। তারপর ফের হাঁটা দিল।

কিন্তু মাত্রই কয়েক পা। আচমকা হুমড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলো যেন রাসু। কোনোমতে সামলে নিল। পায়ে কিছু একটা বেঁধেছে তার। কী ওটা? খানিক ঝুঁকে পড়ে ভালো করে দেখে নিয়ে বুঝলো মুখ বাঁধা ছোট একটা পাটের বস্তা। ভেতরে কিছু একটা রয়েছে। খুলে দেখবে কী? না থাক, বাড়ি গিয়েই একবারেÑ  ভাবতে গিয়ে বেশ একটা খুশি খুশি লাগলো রাসুর। ভেতরে ভেতরে কীসের একটা বুজকুড়ি। যাক, কপালটা তার ভালোই। না হলে অন্যের চুরি করা জিনিস এমনি করে নিজের হয়ে যায়? হ্যাঁ, মনস্থির করেই ফেলেছে রাসু। আজ আর যাবে না কোথাও। যা পেয়েছে এই নিয়েই ফিরে যাবে। বস্তাটা একবার ধরে দেখলো রাসু। বেশ ভারী ভারী লাগছে। ভালো কিছুই আছে ভেতরে। চোখ ভরে চাঁদের আলো ফুটলো রাসুর।

পাড় থেকে একটা ব্যাঙ আচমকা লাফ দিয়ে পুকুরে নামতেই জলে ‘ঝুপ’ করে একটা শব্দ হল। অল্প কেঁপে উঠল রাসু। চারপাশ আরও একবার দেখে নিয়ে বস্তাটা মাথায় তুলে বাড়িমুখো হাঁটতে লাগলো দ্রুত।

সরলার ঘুম বেশ পাতলা। দরজায় বার দুই টোকা পড়তেই উঠে এসে দরজা খুলে সামনে দাঁড়ালো,‘কী হলো এত তাড়াতাড়ি চল্যে এলে যে?’

উত্তর না দিয়ে বস্তাটা নিয়ে বউকে একপ্রকার ঠেলে সরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লো রাসু। বস্তাটা এতক্ষণে নজরে পড়েছে সরলার। সে ফের একবার জিজ্ঞেস করলো রাসুকে, ‘কী হলো, কথা কও না ক্যান? কী আছে ওতে?’

রাসুর চোখ দুটো মুখ বাঁধা বস্তাটার দিকেই। সেদিকে তাকিয়েই সে বলল,‘আমিই কী ছাই জানি।’

 ‘ও মা, কও কী?’

‘কই পরে। আগে আলোডা আনো দেহি।’

ঘরের এক কোনে নিভু নিভু করে জ্বালিয়ে রাখা লণ্ঠনের আলোটা খানিক উসকে দিয়ে নিয়ে এলো সরলা। বস্তার মুখ থেকে বাঁধনের গিঁট টা ততক্ষণে খুলে ফেলেছে রাসু। আর ভেতরে কী আছে তা দেখার জন্য ঝুঁকেও পড়েছে অনেকখানি। কিন্তু আলো পড়তেই যে দৃশ্যটা দেখল তাতে প্রচণ্ড রকমের ভয় পেয়ে ছিটকে কয়েক পা পিছিয়ে এলো রাসু। মুখ দিয়ে বিচিত্র কী একটা শব্দ বেরিয়ে এলো তার।

রাসুর ভাব গতিক দেখে ভয় পেয়ে গেছে সরলাও। কাঁপা কাঁপা গলায় সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হলো?’

সবকিছু এলোমেলো হয়ে কেমন জড়িয়ে গেছে রাসুর।  সে বলল, ‘ল্লাশ।’

‘কও কী? লাশ? কার লাশ?’

বলতে বলতে সরলাও ঝুঁকে পড়ে দেখতে গেল বস্তার ভেতরে সত্যিই কী আছে। কিন্তু যা দেখল তাতে তার শরীরের রক্ত চলাচল যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে কেবল আতঙ্কের একটা চোরা স্রোত। হাত পা বাঁধা ছোট্ট শিশুর মৃত মুখখানি স্পষ্টই দেখতে পেল সে। আর মুহূর্তে ছিটকে সরে এলো সেও। রাসুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হায় হায় ইবার কী হবে?’

মুখ থেকে সমস্ত কথারা হারিয়ে গেছে রাসুর। কিছু একটা বলতে গিয়েও যখন পারল না তখন বস্তাটা ফের একবার মাথায় তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। তারপর পুকুর পাড়ের উদ্দেশ্য ছুটতে লাগল। আর কেউ পৌঁছানোর আগেই তাকে সেখানে পৌঁছাতে হবে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares