পরদেশি জরায়ু : চন্দন আনোয়ার

কৃষ্ণপক্ষের নিশুতিরাত, বাইরে নিবিড় আঁধার, মাঝারি ঝড় এবং সঙ্গে ছাট-বৃষ্টিও হয়েছে। এলোপাতাড়ি দমকা হাওয়া সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উজানÑ ভাটি খেলছে; একবার শ শ শব্দের সুরতরঙ্গ তুলে ছুটে আসে তো মিনিট দশ-বারো লাপাত্তা। এই বিরতির কালে দমবন্ধ নিস্তব্ধতা তৈরি হয়। সম্ভবত ফিরবে না, এ রকম একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়; দেখা যায়, দমকা হাওয়া ঠিকই ফেরে; কখনও দ্বিগুণ বেগে ফেরে। দৌড়বিদ যেমন আকস্মিক পা পিছলে পড়লে পাক খেয়ে উঠে দ্বিগুণ শক্তিতে দৌড়ায়, শেষ দমকা হওয়াটার ক্ষেত্রে তাই ঘটে। এই বাড়িতে এসে কয়েক মুহূর্তের জন্য আছড়ে পড়েছিল। দ্বিগুণ উদ্যমে উঠে দাঁড়ানোর সময় শক্তিশালী একটি ঘূর্ণিপাক তৈরি করে; বাড়ির চৌহদ্দিকেই রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করে তিন পাক খায়। এই বাড়ির গাছ-পালার ঘুমন্ত শেকড় পর্যন্ত আতঙ্কে জেগে ওঠে এবং ঘূর্ণিপাকটি তার চরম শক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে যখন ছুটে বেরিয়ে যায় তখন রাত তিনটা। এই সময় আশীতিপর বৃদ্ধা আলেয়া বেগম আটকে পড়ে আশ্চর্য এক স্বপ্নের ফাঁদে কি জালে। তার পেটের নেতানো রক্ত-নাড়ি জেগে ওঠে এবং তলপেটে মৃদু ব্যথার আবির্ভাব ঘটে। তার অবস্থান ঘুম-নিদ্রার সন্ধিক্ষণে বলে মৃদু ব্যথার স্বরূপ বা চরিত্র নির্ণয় সরল হয়। অবশ্য তিনটি সন্তান প্রসবের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে বড় অনুঘটক।

ব্যথা ক্রমশ তীব্র ও প্রসারিত হয়ে চন্দ্রগ্রহণের মতো ধীরে ধীরে অধিগ্রহণ করে ফেলেছে আলেয়া বেগমের জরতি শরীর। এ সময় চাঁদের মতোই থরকম্পন তৈরি হয় শরীরে। প্রচণ্ড ব্যথায় চুরমার আলেয়া বেগমের জরতি শরীরের প্রতিটি অংশ দ্রুত নিথর-নিস্তব্ধ হয়ে আসে এই মাত্র শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে পড়া লাশের মতো। মৃত্যুদূত আজরাইলের এক পা চৌকাঠে. আরেক পা ঘরে। আলেয়া বেগমের ঘুম-তন্দ্রা দুটোই ভেঙে গেলে অবিশ্বাস্য একটি কাজ করে বসে। ধানক্ষেতের চারদিকে উঁচু আল তুলে বৃষ্টির পানি আটকানোর মতো ভেঙে যাওয়া ঘুমের চারদিকে মজবুত আল তুলে শরীরকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলে। একই সঙ্গে শরীরবন্দি করে ফেলে প্রস্ফুটিত অস্থির ব্যথাটাকে। নিথর নিস্তব্ধ ব্যথার্ত শরীরকে গুটিয়ে গুটিয়ে  গুটিপোকা বানিয়ে ফেলে, যেন কিছুতেই ব্যথামুক্ত না হয় শরীর। আলেয়া বেগমের পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার শরীরের ৩ ইঞ্চি খেয়ে ফেলেছে জরা-বার্ধক্য। একজন জ্যান্ত মানুষের অবয়বকে এভাবে গুটিপোকা বানিয়ে ফেলতে পারে একমাত্র যাদুকর। দুনিয়াটাই বিরাট এক যাদুরবাক্স, এখানে প্রতিটি মানুষ কম-বেশি যাদুকর। অশীতিপর বৃদ্ধা আলেয়া বেগম নির্ঘাত নিজের যাদুশক্তির প্রয়োগ করেছে।

আলেয়া বেগমের ব্যথার্ত শরীর যেন সোনার মহর ভর্তি কলস, তার মধ্য থেকে একটি মহরও খোয়া যেতে দিতে নারাজ। বিষাক্ত সাপের ছোবল খেয়েও সাপুড়ে যেমন সাপের মণির লোভ ছাড়ে না, ব্যথার মরণ কামড়ে জরতি শরীর নীল হয়ে আসে, হাড়ের জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথার বিষদাঁত ভয়ঙ্কর কামড় বসিয়েছে, ঝুলে পড়া চামড়া কাঁপছে হাঁপরের মতো, ফুসফুস ব্যথার তালুবন্দি, শ্বাস-প্রশ্বাস লকডাউন প্রায়, তবু আলেয়া বেগম নাছাড়Ñ ব্যথার রূপ ধরে আসা জীবনের পরম দুর্লভ সুখানন্দ কিছুতেই ছাড়বে না, ছাড়বে না।

আড়াই কুড়ি বছর আগে- তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যেই আঙুলের কর গুণে আলেয়া বেগমÑ আড়াই কুড়ি কত বছর? দু-বার গুণে দেখে গরমিলের ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে, তাই ধরে নেয়, বহু বছর আগে এমনি এক কৃষ্ণপক্ষের নিশুতিরাত, বাইরে ঘন অন্ধকার ছিল, যেন কেয়ামতের দুনিয়া। তিন দিন ধরে তুমুল বর্ষণ শেষে প্রকৃতি শান্ত; কেবল নির্দিষ্ট বিরতিতে দূর থেকে ছুটে আসে দমকা হাওয়া এবং মুহূর্তের মধ্যে শক্তি হারিয়ে ফেলে। পাতা ঝরা পানির ফোঁটা টিনের চালার ওপরে পড়ছে দারুণ ছন্দে। জানালার ধারে কদম গাছের ডালে ডালে কদম ফুল ফুটেছে। বৃষ্টির শব্দছন্দে ও ফুলের গন্ধে আলেয়া বেগমের ঘুম ভেঙে যায়।  টেবিলে মিটমিট করে জ্বলছে হারিকেন, পাশের মানুষটা বেঘোর ঘুমে। বৃষ্টির শব্দছন্দ ও কদম ফুলের গন্ধের লোভে ভরা শরীর ধীরে ধীরে উত্তোলন করে খাটের ওপরে হেলান দিয়ে বসেছিল আলেয়া বেগম। জানালা খুলতেই মিষ্টি একটি দমকা হাওয়া মুখের ওপরে ঝাপটা মারে, কদম ফুলের গন্ধ পুরনো বন্ধুর মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমÑ শ্রান্ত শরীর।

নিশুতিরাতের অপূর্ব এক প্রাকৃতিক পরিবেশে আলেয়া বেগমের প্রথম মৃদু ব্যথা জেগে উঠেছিল।

নারীজন্মের আরাধ্য এই ব্যথার অপেক্ষা আলেয়া বেগমের জন্য দীর্ঘই ছিলÑ সাত বছর। শরীরে কত রকমের ব্যথা জন্মায় কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন এই ব্যথাটা ঠিক কী রকমের ব্যথা; দুই ভাবি ও দাদির কাছে জিজ্ঞেস করে ধাঁধায় পড়েছিল। তিনজনের ব্যথার চরিত্র তিন রকম। মানুষ আলাদা, ব্যথাও আলাদা। ভেবেছিল, উঠে বসাটাই হয়তো এই মৃদু ব্যথার কারণ। ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে, কিন্তু ব্যথা আরও তীব্র হয়। মুখ থেকে ওহ শব্দটি বেরিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি, ঘুমন্ত মানুষটি এক লাফে উঠে লুফে নিল, দ্বিতীয় লাফে খাট থেকে নেমে হারিকেনের আলো বড় করে তৃতীয় লাফে খাটে উঠে আলেয়া বেগমের হাত ধরে, আমাকে ডাকোনি কেন! আমাকে ডাকোনি কেন!! মুখে ঝড় তুলে দিল। আমাকে ডাকোনি কেন! কী মরার ঘুম দিলাম!

বৃষ্টি-বর্ষার নিশুতিরাত, তার ওপরে গাঢ় অন্ধকার। গোটা গ্রামে একজন-ই দাই, তার বাড়ি হেঁটে যেতে-আসতে বিশ বিশ চল্লিশ মিনিট। ব্যথা-ওঠা পোয়াতি নারীকে এতক্ষণ একা রাখা যায় না। কাকে ডাকবে? বাবা-মা দুজনেই মারা গেছে তরুণ বয়সে, একমাত্র বোনের বাড়ি ঢাকায়, নিকট-দূর সম্পর্কের আর কারও সাথেই ওঠাবসা নেই।

গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। গ্রামের ছোট-বড় সবাই তাকে মন থেকে সম্মান করে। তার সাইকেলের চাকার শব্দটি পর্যন্ত তাদের জানা, দূর থেকে সংকেত দেয়, তখন ছোট-বড় নেই, জোয়ান-বুড়ো নেই সবাই সম্ভ্রম নিয়ে হাঁটে না হয় দাঁড়ায়। এই মানুষটার বিপদ জানলে গ্রাম ভেঙে আসবে। নিজের যত বড় বিপদই হোক, মধ্যরাতে কারও ঘুম ভাঙিয়ে কাউকে ডাকবে না এই মানুষ। শিশুর মতো সরল ও বোবা চোখ দুটোতে ভেসে উঠেছে করুণ অসহায়ত্ব। চোখের কোণায় বিন্দু বিন্দু জল।

ব্যথার তীব্রতা ঊর্ধ্বমুখী। এবার আলেয়া বেগমের মনে হানা দেয় ভয়। এত সাধ-সাধনার পাকা ফল যদি গাছ থেকে পারতে গিয়ে নষ্ট হয়, এই কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বরং এখনি মরে যাওয়া ভালো। ভয়ানক অস্থির মানুষটি কেবলি ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে। বাধ্য হয়ে আলেয়া বেগম মুখ খুলে, দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমার ব্যথা বেড়ে যাচ্ছে। দাঁতে খিল লেগে আসছে।

মানুষটার দিশেহারা অস্থিরতা আর জেগে ওঠা ব্যথার গতিবিধি নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যস্ততার কারণেই আলেয়া বেগম ভুলে গিয়েছিল বরুণার কথা। এই বাড়িতে খুব কম মানুষ-ই আসে। প্রধান শিক্ষকের বাড়ি, তার উপরে মানুষটা রাশভারী স্বভাবের, গল্প-আড্ডা-বন্ধু-বান্ধব এসবে নেই। বরুণাদের বাড়ি আট কি নয় মিনিটের দূরত্বে। বিধবা বরুণা আলেয়া বেগমের দুই বছরের বড়, তুমি’র সম্পর্ক, অবসর-আড্ডার সম্পর্ক, এমনকি বরুণা সময় হাতে নিয়ে এলে সাপ-লুডো খেলে দু’জনে। মাত্র ১৪ বছরে বরুণার বিয়ে হয়েছিল সুস্থ সামর্থ্য যুবকের সঙ্গেই, বড় গেরস্থবাড়ির একমাত্র ছেলে, কিন্তু মাত্র দেড় বছরের মাথায় মানুষটার দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু ঘটে পাকা ধানক্ষেতে, মাথায় বাজ পড়ে। পেটে দুই মাসের সন্তান ছিল, সেই ছেলের বয়স এখন সাড়ে চার বছর। এখন বরুণার কাঁধেই স্বামীর সংসার। শ্বাসরুদ্ধ ব্যস্ততা বরুণার। এরমধ্যেই ছুটে আসবে, শরীরের গতি-প্রকৃতি দেখে-শুনে-জেনে বিদায়ান্তে প্রতিদিনই বলে যাবে, আলেয়া, সামান্য এদিক ওদিক বুঝলেই খবর দিবে।

যথেষ্ট দ্বিধা ও সংকোচ নিয়ে বরুণাদের বাড়ির উঠানে পা ফেলা মাত্রই ঘরের দরজা খুলে উঠোনে নেমে আসে বরুণা, দাদা, জানালা দিয়ে দেখেছি আপনি আসছেন। এবার শাশুড়ির ঘরের হারিকেন জ্বলে ওঠে, খোলা জানালায় কপালে ঠেকিয়ে শাশুড়ি বলে, দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করছ কেন? বরুণার পা নড়ে ওঠে, হাঁটেন দাদা। শ্বশুরের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, তুমিও উঠে যাও। বাড়িতে কেউ নেই। বরুণা একা পারবে?

ফুটবলের মতো শূন্যে লাফিয়ে ওঠে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভয়ার্ত আলেয়া বেগমের ব্যথামন্থন করা শরীর। দাই নাড়ি কাটতে ভুল করে যদি? আজরাইলের সাথে ছয় ঘণ্টার কঠিন লড়াই! এ যুদ্ধ কী কম বড় যুদ্ধ? ছেলেকে পারেনি, মাকে নিয়ে জিতবেই। দাই নাড়ি কেটে বড় ছেলেকে হাতে নিয়েছে, আলেয়া বেগমের নিথর শরীরে তখনও যমথাবা; চোখের ওপরে অন্ধকার পর্দা ফেলার আগে একটি মুহূর্ত সময় পেয়েছিল। সন্তান কই? সবই দেখি রক্ত! রক্তের গালিচার ওপরে শরীর। বানের জলের মতো ঘরময় থইথই করছে রক্তে।

রক্তের অনিরুদ্ধ স্রোত দেখে বরুণা ভয় পায়। দশমাস সাতদিন মা’র পেটে রক্ত খেয়ে বাঁচল, আবার দেখো, দুনিয়া আসার সময় মা’র শরীরের সব রক্ত সঙ্গে নিয়ে আসছে। নতুন দুনিয়ায় খাবারের অভাব হবে, ছেলে কী এই ভয় পেয়েছিল!

আলেয়া বেগমের চোখে যখন আলো ফেরে তখন দ্বিতীয় রাতের দুপুর। চৌকাঠে বরুণাদের গরুর গাড়ি, গাড়িতে বিছানা পাতা, মাথায় ঝুলছে হারিকেন, গাড়োয়ান বসে আছে। বরুণা ধরেছে মাথা-পিঠ, মানুষটা ধরেছে কোমর-ঠ্যাং। গাড়িতে তুলে আলগোছে শুয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ বিকল হয়ে পড়া গাড়ির যন্ত্রপাতির মতো আলেয়া বেগমের শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রাণহীন, শুধুমাত্র চোখ দুটো সচল। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে মানুষটার হাঁটু থেকে পা পর্যন্ত ভিজে সয়লাব, যেন আলতা মেখেছে।

মেঠোপথ জুড়ে মণি-মুক্তার মতো রক্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আলেয়া বেগম হাসপাতালে পৌঁছায় সূর্য-ওঠা ভোরে।

সিঁথানে মানুষটা, তার কোলে ছেলে। ঘাড় বাঁকা করে একসঙ্গে ছেলের মুখ বাবার মুখ এক পলক দেখে বরুণাকে খামচে ধরে সে কী মরণ চিৎকার! আমি আর বাঁচব না বরুণা! আমার ছেলে আমার…বরুণা ধমক মারে, বাজে কথা বন্ধ কর। এই রক্ত সুখের রক্ত। তোমার মুখে হাসি কই? ছেলের মুখের দিকে তাক ও, কী ফুটফুটে শিশু! তুমি এখন মা। এই ছেলেকে বড় করবে, লেখাপড়া শিখিয়ে নামী মানুষ করবে, বিয়ে দেবে, তারপর নাতি-নাতনি কোলে নেবে, তাদের বিয়ে দেবে, তারপর তোমার ছুটি। মেয়েমানুষের ছুটি এত সোজা জিনিস না। তুমি ওপারে যাচ্ছ, তোমার খাটিয়া কাঁধে নিয়েছে তোমার ছেলেরা তোমার নাতিরা; কী অপূর্ব দৃশ্য! ভাবো আলেয়া, ছায়াছবি দেখো, একবার ভাবো।  ভগবান নারাজ হবেন কিন্তু। যদিও বরুণা ঠিকই জানে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষটা। যম কাজ ছাড়েনি। এই গরুর গাড়িতেই আছে।

সাত দিনের লড়াই শেষে আজরাইল হাল ছাড়ে। বাড়ি ফিরে তিন মাস টানা বিছানায় আলেয়া বেগম। তার তিন বছর পরে আসে ছোট ছেলে। সন্ধ্যায় ব্যথা ওঠে, মাঘ-শীতের একটা পূর্ণ রাত ব্যথায় গড়াগড়ি খেয়ে সকালে চৈতন্য হারিয়ে ফেলে, আজরাইল ছায়া হয়ে শরীরের আশপাশে ঘোরে, প্রাণপাখি নেবার জন্য খাঁচা ভাঙার সাহস পায় না, পূর্বের পরাজয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে অপেক্ষা করে, কিন্তু এবার লড়াই না করে ফিরে যেতে হয়। চৈতন্য ফিরলে দেখে বরুণার কোলে চুপচাপ শুয়ে আছে ছেলে, দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ। মা’র চোখে চোখ পড়তেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে হাত-পা ছোড়ে। বরুণা হেসে ওঠে, দেখো, মা’র জন্য কী দরদ! ও ছেলে তোমার কোল-নেউটা হবে দেখো। তোমার আঁচল শূন্য হবে না। ছ’বছর পরে মেয়ে দুনিয়ায় আসে যমের রূপ ধরে। ব্যথা ওঠার পরেই শরীরে সে কী খিঁচুনি! দম দেওয়া পুতুলের মতো ব্যথাতুর পোয়াতি শরীর ঝাঁকুনি খেয়ে ভয়ঙ্কর খিঁচুনি ওঠে। মনে হয় এই বুঝি জোয়ান শক্তিশালী ষাঁড় দুটি ছেড়ে দেবে হাল; গাড়িসহ ভাগাড়ে পড়বে। হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবে না। এই বিশেষ দিনের জন্য বরুণার শরীরে হাঙর-ধরার শক্তির দিয়েছিল বিধাতা।

যুবক ডাক্তার, সুতনু শরীর. ফর্সা টকটকে মুখ, গলায় মেশিন চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, এক নজর দেখেছে আলেয়া বেগম। এখনও কানে বাজে ডাক্তারের কথা, দেখি, বাচ্চাটা বাঁচানো যায় কি না। 

অ্যা! আলেয়া? বাচ্চার মা? হাত ধরে থাকা বরুণার হাত-কণ্ঠ একসেঙ্গ কেঁপে ওঠে।

ব্যস্ততার ফাঁকে ডাক্তারের নির্বিকার প্রত্যুত্তর, বাচ্চা-ই ফিফটি ফিফটি…

চাকা খসে পড়া চলন্ত প্রাইভেট কারের মতো বাতাসে পাল্টি খেয়ে ও আল্লা রে বলে একবারই হামলে ওঠে মানুষটা। পাশে দণ্ডায়মান নার্স ধরে ফেলায় দুর্ঘটনা ঘটেনি।

পানকৌড়ির মতো জীবন এই ভাসে তো এই ডোবে। এই করে, পনের দিন বাঁচা-মরার সাপ-লুডো খেলে পরাজিত যম বিদায় নিয়েছিল সে যাত্রায়।

সুখের আগুনে দগ্ধ আলেয়া বেগমের শরীরে এক বালতি জল ঢেলে দিল গাড়ির হর্ন। তন্দ্রাচ্ছন্ন শরীর কাঁপিয়ে ব্যথাটা কোথায় হারিয়ে গেল! শরীরে ব্যথার লেশমাত্র নেই। এত ব্যথা কোথায় হারাল! শুয়েই ভাবছে।

ষাঁড়ের মতো গুতিয়ে শহরটা গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ছে।

গেট খুলেই নির্বাক আলেয়া বেগম। লায়েক আলি একা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি নেই, চ্যালাচামড়া নেই, শুধু গোঁয়ারটা আছে। পরিচিত হাসিটা নেই, মুখের ভেতরে কিছু একটা আছে, চিবোচ্ছে, চাচি, ঘুমাচ্ছিলেন বুঝি? রাতেই এসেছি। ডায়াবেটিক-প্রেসারে কাহিল শরীর, শরীর গরম হবে, গ্রামটাও দেখা হবে। ভাবলাম, রাতের দমকা হাওয়ায় বাড়ির গাছপালার কিছু ক্ষয়-ক্ষতি হলো কি না দেখে যাই।

লায়েক আলির চোখ দুটো যেন যেন ঘুঘুর ফাঁদ; সারাক্ষণ জ্বলজ্বল করে ফাঁদ। আলেয়া বেগমের খোঁজ-খবর নেবার আড়ালে মূলত এই বাড়িটার তদারকি করে। বাড়ির অসংখ্য গাছের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ গাছে হেলান দিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে নির্বিকার চোখে দেখে যায় আলেয়া বেগম।

চালাক শ্বাপদের মতো নিঃশব্দে পা ফেলে লায়েক আলি বিচরণ করে বাড়ির আনাচে-কানাচে। আলেয়া বেগম  কেন, বাড়ির মধ্যে যে ঘুরে বেড়ায় বোবা কুকুরটা, সেও জানে দু’বছর ধরে বাড়িটার খোঁজ-খবর কেন নিচ্ছে লায়েক আলি।

বিষাদে অভিমানে কিছুকাল ছটফট করে আলেয়া বেগম কঠিন সত্যটা মেনে নেয়। নিউইয়র্ক, বোস্টন, অকল্যান্ড ছেড়ে কেন আসবে আমার সন্তানরা? এই বাড়িটা কতকাল পরিত্যক্ত থাকবে? প্রতিবার যাবার মুহূর্তে লায়েক আলির একই কথা, চাচির তো ডায়াবেটিক-প্রেসার নেই, হার্টের শ্বাসের বড় কোনো রোগবালাই নেই। তাই না চাচি? এই বয়সে অসুখ-বিসুখ নেই, অথচ দেখেন, আপনার ছেলে মাত্র আমার দুই বছরের ছোট, কিন্তু আমার শরীর রোগের গুদাম। গোঁয়ারটার হাতে ওষুধের কৌটা, এই দেখেন,এই হচ্ছে আমার জীবন। লম্বা একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

নির্বিকার দাঁড়িয়ে লায়েক আলির কথা শোনা ছাড়া আলেয়া বেগমের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে না। আজ কী ভেবে মুখ খুলেছে, আমার মা আটানব্বই বছর বেঁচে ছিল। কোনো অসুখ ছিল না। সবই আল্লার ইচ্ছা।

মুহূর্তের মধ্যে লায়েক আলির শরীর দাবড়িয়ে ঘাম ছোটে। গোঁয়ারটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, প্রেসারের ওষুধটা দে। মুখের গাম্ভীর্য সরিয়ে স্থায়ী হাসিটা ফিরিয়ে আনে, হেঁটে আসছি তো চাচি। 

বাড়িরটার উত্তর-দক্ষিণে লায়েক আলির জমি, পশ্চিমে মিয়াদের বিরাট বড় বাড়ির সীমানা প্রাচীর, আর পূর্বে অর্থাৎ সম্মুখে পাকা রাস্তা, যে রাস্তা জেলা শহরমুখি। বছর দুই পূর্বে পড়ন্ত এক বিকেলে বাড়ির গেটে গাড়ির হর্ন বাজার শব্দ শুনে আলেয়া বেগম পুলকিত হয়েছিল এ ভেবে, ছেলেরা কেউ এলো? মা’কে সারপ্রাইজ দিতে পারে। প্রায় দৌড়ে আসে গেটে। দেখে, লায়েক আলি গাড়ি থেকে নামছে মাড়ির বত্রিশ দাঁত প্রদর্শিত হাসিমুখে। সাথে সরকারি আমিন, তার হাতে জমির নকশা। গ্রামের সাত-আট যুবক মোটরবাইকে। শুয়োরের মতো কালো ঘাড়মোটা এক গোঁয়ার যুবকের চোখে চোখ পড়তেই আলেয়া বেগমের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। এত সমারোহ করে লায়েক আলি এ বাড়ি কেন? শহরে বিরাট মাছের আড়ৎ, চাল-ধান-পিঁয়াজ-রসুনের গুদামÑ অক্টোপাসের হাত-পা’র মতো চতুর্দিকে ছড়ানো লায়েক আলির বেসাতি। তবে ওর বড় ব্যবসা জমি। জমি কিনে গাছ-গাছালি লাগিয়ে তিনগুণ দামের অপেক্ষায় দশ বছর পর্যন্ত ফেলে রাখবে।

লায়েক আলি মুখ খুললেই হাসি। একটি দাঁত-কেলানো হাসি মুখে সেট করে নিয়েছে স্থায়ীভাবে। চাচি, গত মাসে নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম ছোট ভাই-এর বাড়ি। আমি জানতাম না, একই এপার্টমেন্টে থাকে আপনার বড় ছেলে আর আমার ভাই। স্থায়ী হাসিটা ক্ষুরধার করে, আমি ছিলাম দিন পনের। প্রতিদিনই রাতে গল্প-আড্ডা জমেছে। আপনার ছেলের চোখে তো পানি আর পানি। মা’র হাতের রান্না কতদিন খায় না! আপনার হাতের গরুর দুধের পায়েস আর পাকান-পিঠার জন্য ছেলের মন কাঁদে। কিন্তু আসবে কী করে? চাকরি, সংসার, ছেলে পড়ে ভার্সিটি, মেয়ে কলেজে। আপনার সৌভাগ্যের কপাল চাচি। আপনার নাতি-নাতনি দু’জনেই পোশাকে ভাষায় খাঁটি আমেরিকান। চামড়াটাই ওদের ঝামেলা। তোতাপাখির মতো ইংরেজি বলে ভাই-বোন। ওদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে গিয়ে লজ্জায় পড়ি! মূর্খ-ই ভাবল কিনা। আপনার ছেলে বলেছিল, বাড়িটা মাপজোখ করে দেখতে, সব ঠিক-ঠাক আছে কি না।

মানুষের দেহ নাকি মাটির তৈরি, মাটির ঘরের মতোই ফাটল ধরেছে আলেয়া বেগমের মনে, বিশ্বাসে। রক্তের তৈরি সেতুও কী ভেঙে পড়ে! আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস না করে ভিটেবাড়ি মাপজোখের অর্থ কী?  শক্তিশালী অভিমান এবং যুক্তির ফাঁদে পড়ে প্রশ্নটির অপমৃত্যু ঘটে। এই বাড়ির মালিক তো ওরা-ই। এই বাড়িতে, ঐ লেবুগাছ তলে ওদের দুই ভাইয়ের নাড়িপোতা। পাশের কাঁঠাল গাছটির নিচে ওদের বাবার কবর। এই কবরটিই আলেয়া বেগমের আশা প্রদীপ, বিশ্বাসের শেষ আশ্রয়।

জীবনের সূর্যাস্তের মুহূর্তে সবকিছুই ভুলে যায় মানুষ। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফিরে যায় নারীকাটা শৈশবে। মোহের পৃথিবী আর মায়ার জীবনের সাথে সব বন্ধন ছিন্ন করে তবেই প্রবেশ করতে হয় নতুন জীবনে। আলেয়া বেগমের ক্ষেত্রে সবকিছুই উল্টো ঘটছে। স্বপ্নের ব্যথাটা দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন স্বেচ্ছাবন্দি হয়। চতুর্থ দিন আলেয়া বেগম হাঁটু দ-করে গুটিয়ে হাত-পা মুড়িয়ে নিজেই ব্যথাটাকে শরীরে ডাকে। ঘুম গাঢ় করার জন্য একটি জায়গায় প্রথমে দেড়টা, এখন দুটো খায় ঘুমের ওষুধ। আলেয়া বেগমের নৈঃসঙ্গ্য শরীরে লোভনীয় এক বন্ধু হয়ে উঠেছে ব্যথা। সরল চিন্তাহীন নির্ভার মস্তিষ্কে কত রকমের চিন্তা আর কল্পনার চিত্রকল্প ভাঙা-গড়া চলে! এসবের কিছু ছায়া কিছু মূর্তিমান হয়ে ভাসে চোখে। আশীতিরপর শরীর কী উর্বর হয়ে গেল! মন কী প্রকৃতি হয়ে গেল! নিদারুণ নৈঃসঙ্গ্য জীবন এখন কোলাহল মুখর। স্বপ্ন-জাগরণে মানুষটার বিচরণ বেড়ে গেছে। বড় একটি বাজারের ব্যাগের মুখ খুলে দিলে বিচিত্র রকমের শাক-সবজি-মাছ-মাংস যেমন মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে, আলেয়া বেগমের হয়েছে তাই। কে যেন বাড়িতে বহন করে এনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে গেছে আশি বছরের দীর্ঘ জীবন। এত বড় জীবন। স্মৃতির পাহাড়। কোনটা রেখে কোনটার দিকে তাকাবে।

পৃথিবীর সাথে সম্পর্কহীন জীবন আলেয়া বেগমের কাছে লাশের মতো ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। এই ভারী হয়ে ওঠা সন্তানদের প্রতি অবিচার হয়ে যাচ্ছে কিনা, এ কথাও ভাবে। নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো দামি একটি মোবাইল সর্বক্ষণ হাতে, তিন-সন্তান টাকা-পয়সা পাঠায় প্রতিযোগিতা করে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন, শব্দ করে একটি হাঁচি দিলেও বোস্টন-নিউইয়র্ক- অকল্যান্ড পৌঁছায় আর অস্থির হয়ে কত রকমের প্রশ্ন। তিনটি সন্তান-ই মা-পাগল। একটি সন্তানও নির্দয় না।

অশীতিপর জরতি শরীর ক্ষয় আর নিঃশেষের শেষ প্রান্তে, সূর্যাস্তের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত এখন, অন্তহীন এক অন্ধকারে ঢুকে পড়া মানব জীবনের অনিবার্য নিয়তির মুখোমুখি, অথচ এই সময় কিনা শরীরে ক্ষয়-নির্মাণের খেলা শুরু হয়ে গেল! এই ভয়াল নেশার লক্ষ্য কী? তেল ফুরিয়ে যাওয়া প্রদীপ শেষে একবার জ্বলে ওঠে। এই জ্বলে ওঠা তার শেষ মরণ চিৎকার। বনের বাঘে ধরলে তবু মানুষ বাঁচে মনের বাঘে ধরলে মরণ! মনে কী লোভ ঢুকেছে? এই লোভেই কী মরণ! মেয়ে জন্মের সময় ব্যর্থ হয়ে সেই যে গেল, আর এদিকে মুখ ফেরায়নি আজরাইল। আলেয়া বেগমের অশীতিপর শরীরে বার্ধক্যই এখন বড় রোগ। অভিমান করে শ্বশুরের বাড়ি ছাড়া জমাইয়ের মতো অনুরোধ করে না ডাকলে আজরাইল আর এদিকে আসবে মনে হয় না।

মানুষটার দেহ-প্রাণ এ বাড়ি ছেড়ে যায়নি। আলেয়া বেগমের স্বপ্নে দৃশ্যমান হয়, নিজের হাতে গড়া বাড়িটার দেখভাল করে। দো-চালা টিনের ঘরে বউ হয়ে এসেছিল আলেয়া বেগম, এখন পাঁচ-ঘরের পাকা বাড়ি। নিজের ঘর এবং মেহমান অতিথির ঘর খোলা, ভাই-বোনের তিন ঘরে-ই তালা। তিন মাস অন্তর ঘরগুলো খোলে ছাপ-ছোপ করে। উড়াল শিখে নিজের স্বাধীন আকাশ চেনার আগে সন্তানকে পাখি যেমন পালকছাড়া করে না, মানুষটা তাই করেছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটিকেও মুঠোছাড়া করেনি। প্রত্যেকের ব্যবহারের সবকিছুই জাদুঘরের মতো গুছিয়ে রেখেছে ওদের নিজেদের ঘরে। ওদের খেলনা, কত যে টুকরো টুকরো কাঠপেন্সিল, ফাউন্টেন কলম, বলপেন, স্কুলব্যাগ, শ্রেণিভিত্তিক সাজানো বইপত্র, খেলার সামগ্রী, পুরস্কার, পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল, ছবির অ্যালবাম অর্থাৎ দোলনা থেকে শুরু করে যদ্দূর সম্ভব যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে রেখেছে, ফেলতে দেয়নি। বাড়িটা কী যাদুঘর বানিয়ে ফেলবে! ওরা তো আর আসবে না। এসব রেখে আর কী হবে? আলেয়া বেগমের বিরক্তি ও অস্বস্তির প্রত্যুত্তরে মানুষটার জবাব, শুনো, সন্তান বড় হয়েছে তোমার-আমার হাতের উপরে, চোখে চোখে। কত ছোট্ট ছিল ওরা! এক হাতের তালুর ওপরে কোলের ওপরে কাঁধের ওপরে ফেলে রাখা যেত, আর এখন? ওদের হাঁটতে শেখা, ভাষা শেখা, লেখাপড়ার প্রতিটি স্তর, জীবনের প্রতিটি ধাপ, আমার কাছে একেকটি দিগন্ত আবিষ্কারÑবিস্ময়। যদি লেখার শক্তি থাকত, হাজার পৃষ্ঠার একটি বই লিখে ফেলতাম; এত বিস্ময়, এত স্মৃতি, এত আবেগ-অনুভূতি জমা হয়ে আছে এই মনসিন্দুকে।  

বছরান্তে বিছানার চাদর, দরজা-জানালার পর্দা পাল্টায় আলেয়া বেগম। একদিন একটি ঘর-ই ঝাড় দিতে পারে। ইচ্ছে করলে কাউকে ডেকে ঘরগুলো পরিষ্কার করতে পারে। কী ফেলে কী নষ্ট করে ফেলবে, তার চেয়ে বরং নিজেই করে। তাছাড়া প্রতিটি ঘরের তালা খুলে ঢোকার অর্থই হলো ঐ সন্তানের কাছে যাওয়া। যতক্ষণ ঘরে থাকে, বিছানা-পত্র ঝাড়ে, কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো জিনিসপত্রের ধুলোমায়লা পরিষ্কার করে ততক্ষণ মনে হয়, ছেলে কি মেয়ে ঘরেই আছে। পড়ার টেবিলে না হয় বিছানায়। কত ধরনের স্মৃতি যে জড়িয়ে ধরে! উত্তর পায় না, তবু নিজের অজান্তেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলে ছেলে কি মেয়েকে। মেয়ের সাপ-লুডোর ঘরটি পরিষ্কার করতে গিয়ে বড় সাপটির হাঁ-মুখ চোখে পড়ে এবং তাৎক্ষণিক আশ্চর্য এক ইচ্ছের বীজ বোনে মনে, ওদের তিন ভাই-বোন নিয়ে সাপ-লুডো খেলব একদিন। এই ইচ্ছে থেকেই তৈরি হয় বাসনা। এই বাসনা বুকের মধ্যে প্রবল শক্তিধর একটি ঘূর্ণিপাক তৈরি করে দু’দিনে এবং তৃতীয় দিন সন্তানদের ফোন করতে বাধ্য হয়।

অন্তত দু’দিনের জন্য হলেও তোমরা বাড়ি আসো। তোমাদের ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আছে।  প্রথম দিন এই দু’টি বাক্যই ছিল।

দ্বিতীয় দিন আলেয়া বেগম ভুলে গিয়েছিল সময়ের পার্থক্য। নিউইয়র্কে তখন রাত দেড়টা। স্বতন্ত্র রিংটোন সেট করা বলে তিন সন্তানই ফোন ধরে, দু’দিনের জন্য হলেও তোমরা তিন ভাই-বোন একসাথে বাড়ি আসো। তোমাদের ঘর পরিষ্কার আছে, ফ্যান চালু আছে, লাইট জ্বলে। গতমাসেই কিনেছি তোমাদের পছন্দের আকাশি খয়েরি বেগুনি রঙের বিছানার চাদর দরজা-জানালার পর্দা। গরুর দুধের পায়েস আর পাকান পিঠার সব যোগাড়যান্তি সম্পূর্ণ। তোমরা আসবে, যার যার ঘরে শোবে, আমি আর তোমার বাবা… এ পর্যন্ত বলেই ফোন কেটে দিয়েছে।

মা’র কথাগুলে স্বপ্নের কথার মতো অস্পষ্ট ও ছায়া হয়ে যায় সকালে। মা রাতে ঠিক কী বলছে জানার জন্য প্রত্যেকেই ফোনে আলাপ করে। কিন্তু কেউ অবিকল বলতে পারে না। কাটা-ছেঁড়া টাকার নোট মেলানোর মতো তিনজনের ছেঁড়া ছেঁড়া কথাংশ একত্রে মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, মা জেদ ধরেছে। গোঁয়ার জেদ! ছলে-কৌশলে যে করেই হোক সন্তানদের বাড়ি নিয়ে-ই ছাড়বে।

তৃতীয় দিন আলেয়া বেগম ভুল করেনি, বোস্টনে রাত ১১টা। আজ মেয়েকে ফোন দিয়ে শুরু। ফোন ধরেই মেয়ে বলে, মা, একটু ধৈর্য ধরো, ছয় মাসের মধ্যে যেভাবেই হোক সময় বের করে আসব। ছেলেটার পড়ালেখার চাপ খুব, এখন ছুটি মিলবে না। আলেয়া বেগম মোবাইল রেখে দিয়ে ভাবল, গত সপ্তাহেই বলল, ছেলের পরীক্ষা শেষ, আজ বলছে পড়ালেখার চাপ খুবÑ এভাবে নির্জলা মিথ্যাটা অকপটে মা’র সাথে বলে ফেলল পেটের মেয়ে! ভেবেছে নিশ্চয়, অশীতিপর বৃদ্ধ মা, স্মৃতি দুর্বল, সবকিছু ভুলে যায়। নাকি মেয়ে নিজেই ভুলে গেছে! একবার আসো দেখি, সাপ-লুডো খেলায় এখনও আমাকে হারাতে পারবে না।

ছোট ছেলে ফোন ধরেই বলে, মা, একটু ধৈর্য ধরো, ঈদে আসার চেষ্টা করছি।

ঈদ তো বাবা আরও তিন মাস।

তিন মাস কয়দিন মা?

ছেলে কি রেগে গেল? এই বয়সে ছেলের কাছে অঙ্কের পরীক্ষা দিতে হবে!

এই ছেলেটা অঙ্কের কাঁচা ছিল বলে বিজ্ঞান পড়তে পারেনি, ইংরেজি পড়েছে। ওদের বাবা বলত, মানুষের বড় ছেলে মাথা মোটা হয়, আমার হয়েছে ছোটটা। তোমার এই ছেলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিছুই হতে পারবে না। একদিনের স্মৃতি মনে পড়ায় আলেয়া বেগমের ঠোঁটে হাসি উজিয়ে ওঠে বর্ষার মাছের মতো। স্কুলে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। দুই শ্রেণির অধিনায়ক দুই ভাই। বড় ভাই ব্যাটসম্যান, ছোট ভাই বোলার। বড় ভাইকে আউট করে বাড়ি এসে ছোট’র কী উল্লাস! সন্ধ্যায় দুই ভাই পড়তে বসেছে। বড় ইচ্ছে করেই লাভ-ক্ষতির কঠিন অঙ্ক দিয়েছে, ছোট পারেনি। ছোট’র চিৎকার শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখে, বড় টেবিলের ওপরে উঠে ছোট’র চুলের মুঠি ধরে পিঠের ওপরে কিল-ঘুষি মারছে, লাভ-ক্ষতির অঙ্ক পারিস না, এদিকে মাঠে বল তো ভালোই জোরে করতে পারিস, অ্যা!  

বড় ছেলে, প্রথম নাড়ি কাটা ছেলে, মা’র বাসনাটাকে সম্মান করে, কিন্তু বৈরী বাস্তবতায় অসহায়। ছেলেটার বিয়ের প্রস্তুতি চলছে, কত আয়োজন, ব্যস্ততার পাহাড় ডিঙিয়ে এ জন্য দু’দিন বের করা কঠিন। তারপরেও মা’র অনুরোধ, কোনোভাবেই পারা যায় না? মাত্র তো দুটো দিন, র্ধ (বড় ছেলেকেই তুই করে ডাকে) আমেরিকা থেকে বিমানে উঠলি আর নামলি ঢাকায়। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া। তারপর স্বস্তিপুর কদ্দুর আরÑ চল্লিশ মিনিটের পথ।  বাপ, হ্যাঁ বল তুই, দুদিন পরেই না হয় চলে যাবি সবাই। আমি কাঁদবও না, আটকাবও না, দেখিস এবার, হাসি মুখে তোদের বিদায় দেব। তুই বড়, তোর মুখের কথা ছোটরা ফেলতে পারবে না। আয় না বাবা, আয়, তোর মা অনুরোধ করছি, তারপর র্ধ, দেশ তোর মা’র মতোই, দেশেই তো আসবি, আয় বাবা, তোর দুটি…জিভ কামড়ে ধরে আলেয়া বেগম। এ কী কেলেঙ্কারি? লোভের এ কী ভয়ঙ্কর ফাঁদ! শেষ পর্যন্ত কি না নিজের নাড়িকাটা সন্তানের পা…এ কী ভয়ঙ্কর বাসনা!

তড়িঘড়ি করে মোবাইল রেখে দেবে তখনি ছেলে কথা বলে, মা, ডু ইউ নো হাউ  ফার নিউইয়র্ক ইজ?

ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল মা। এক ছেলে অঙ্ক শেখায়, আরেক ছেলে শেখায় ইংরেজি! অশীতিপর বয়সে কী স্কুলে ভর্তি হব! মানুষটা বেঁচে থাকলে না হয় গোপনে অঙ্ক-ইংরেজি শেখার চেষ্টা করত। সন্তানদের জন্য এ জীবনে কিনা করেছে। এটুকু পারবে না?

সরি মা, বলছি, নিউইয়র্ক কতো দূর তুমি জানো? 

আলেয়া বেগম আলগোছে মোবাইল রেখে দিল বিছানায়। ছেলে আরও কিছু বলেছে, কিন্তু শোনার ইচ্ছে হয়নি। জানালা দিয়ে কদম ডালে বসা শালিখ পাখিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। জীবনের গূঢ়ার্থ বোঝার শিক্ষাদীক্ষা নেই, কিন্তু এটুকু বুঝেছে, চারা গাছ যেমন বড় হলে আলাদা গাছ হয়, সন্তানরা বড় হলে আলাদা মানুষ হয়ে যায়। ওরা কী ভুলে গেল এই সত্য, এই বাড়িতেই এই ছোট্ট পেটেইÑ পেটের ওপরে হাত রাখে আলেয়া বেগমÑ এই ছোট্ট জরায়ু-ই ওদের প্রথম ঠিকানা। এই বাড়ির মাটি, এই বাড়ির চৌহদ্দি, এই গরিব দেশই খাদ্য-খাবার আলো বাতাস শিক্ষা দিয়েছে ওদের। বোস্টন নিউইয়র্ক অকল্যান্ডের পথগুলো যত মসৃণ আর প্রশস্তই হোক, যে রক্তাক্ত পিচ্ছিল পথ দিয়ে পৃথিবীতে এলো সেই পথের চেয়ে কী বড়? সন্তানরা ভুল পথে হাঁটলে মা’র ওপরে কর্তব্য বর্তায় সঠিক সত্যের পথে আনা। ওরা তো ভুল করবেই। সত্য ওদের জানানো উচিত ভেবেই মোবাইল তুলেছিল হাতে কিন্তু মুঠোবদ্ধ হয়নি, হামাগুড়ি দেওয়া শিশুর মতো হাত থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল। সময় কখনও নির্জলা সত্যকে প্রতারক বানিয়ে ফেলে। তখন মিথ্যাই হয়ে যায় নির্জলা সত্য। তখন প্রকৃত সত্য উচ্চারণও সংকীর্ণতা এবং ধৃষ্টতা, এবং কখনও অপরাধ। সম্ভ্রম রক্ষার্থে সত্য নিজেকে গুটিয়ে নেয়, মিথ্যা তখন আরও দাম্ভিক এবং শক্তিশালী হয়, এবং তার অভিনয়ও সত্যের বড় সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন সে আর মাটি বা ভিত্তির দিকে তাকায় না, কারণ মাটি তো সত্য। নিজেকেই প্রশ্ন করে আলেয়া বেগম, বোস্টন নিউইয়র্ক অকল্যান্ড এসব জায়গায় কি মাটি আছে? আমার সন্তানরা মাটি দেখে? মাটিতে পা ফেলে? থাকলে, সে মাটি নিশ্চয় আমার বাড়ির মাটির রঙের মাটি না, সোনা রঙের মাটি। এ ভাবনার মধ্যে ওঠোনে চাপকলে পানি পড়ার শব্দ শোনে। উঠে এসে দেখে মাটিকাটা শ্রমিক, আঠার-উনিশ বছর বয়স, সর্বশরীরে মাটি, লুঙি নেংটি দেওয়া, দুই হাতে মাটি তাই চাতক পাখির বৃষ্টির পানি খাওয়ার মতো কল চিপে পানি খাওয়ার চেষ্টা করছে। একটি গ্লাস হাতে দিলে কৃতজ্ঞতার চোখে তাকায় আলেয়া বেগমের দিকে।

গ্রামের ছেলে, মুখ চেনা। গ্লাস ফেরত দেবার সময় ছেলেটি বলে, এই বাড়ির উত্তর-দক্ষিণের জমি মাটি ফেলে উঁচু করছে লায়েক আলি। দূর থেকে মাটি আনছে ট্রাকে।

এবার ছেলেটি আলেয়া বেগমের ঘোলাটে চোখে চোখ ফেলে বলে, এই বাড়িটাও উঁচু করবে। আপনি মরার পরের দিন-ই কাজ ধরবে।

ছেলেটির শেষ বাক্য শুনে আলেয়া বেগমের শরীরই শুধু কেঁপে ওঠেনি; এ বাড়ির মাটি, মাটির ওপরে গাছ-পালা, গাছ-পালার ওপরে পশু-পাখি সবাই একসঙ্গে কেঁপে ওঠে। কাঁঠাল গাছের নিচে ঘুমিয়ে থাকা মানুষটার কী হাল দেখতে হলে এখনি ঘুমাতে হবে।

বাড়ি কি ছেলেরা বিক্রি করে দিয়েছে? আমি কি লায়েক আলির বাড়িতে আছি? ওদের বাবার কবরের কথা ভাবল না? আর ওদের মা’র কবর? কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপরে শৈল্পিক হরফে মুদ্রিত প্রশ্ন চারটি  দেয়াল ঘেঁষে দেয়াল তোলার মতো আলেয়া বেগমের চোখের সামনে স্থায়ীভাবে তুলে দিয়েছে কেউ। চোখে আর কিছুই নেই, সবই অন্ধকার। রাত নেমে এসেছে কি? অবশ্য চোখে এখন রাত-দিন এক। মানুষটার সাথে কথা বলা খুব প্রয়োজন। দেয়াল ধরে এক সময় কাঁঠাল গাছের কাছবর্তী হয়, গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ মনে পড়ে, এখানে খামাখা এসেছি। সে তো ঘরেই যাবে, এক বিছানায়।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের পৃথিবী এখন। আলো জ্বালিয়ে লাভ নেই। দুনিয়ার সব আলো দিয়েও আলেয়া বেগমের দু’চোখে আর আলো আসবে না। একমাত্র মানুষটাই পারে। বড় ছেলে আর মেয়েটার জন্মের সময় আজরাইলের সঙ্গে লড়াই কী আমি একা করেছি? মানুষটার হাত ধরেছিলাম বলেই কিনা আজরাইল হার মানল। এখন এই মানুষটা-ই ভরসা। বিছানায় গুটিপোকা হয়ে শুয়ে পড়েছে। শরীর কাঁপছে, তার দ্বিগুণ জোরে কাঁপছে বিছানা, ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা, মাটিসহ সমগ্র বাড়ি। ঘুম, এখনি গভীর ঘুম প্রয়োজন। মানুষটার হাত না ধরলে আমি বাঁচব না। টেবিলের ওপরে ঘুমের বড়ি, দুইটা, চারটা, পাঁচটা, দশটা গুণে লাভ নেই, যে কয়টা আছে দুই পাতায় সবগুলো বড়ি অভিজ্ঞ হাতে ক্ষিপ্রতার সাথে খোলে মুঠোভর্তি মুড়ির মতো মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে মাটিকাটা শ্রমিক ছেলেটির মতো তৃষ্ণার্ত বুক ভরে অর্ধেক জগ পানি খেয়ে শুয়ে পড়ল আলেয়া বেগম। হাতড়ে মাছ ধরার মতো উপুড় হয়ে বিছনা হাতড়ায়। ক্ষিপ্রহাতের ধাক্কায় খাট থেকে লাফিয়ে ফ্লোরে পড়ে দুই খণ্ড হয়ে গেল মোবাইল। আলেয়া বেগমের কণ্ঠে আফসোস, আ হা রে! আমার সন্তানরা ফোন করে হয়রান হয়ে কী কষ্টটাই না পাবে!

আলেয়া বেগমের চোখের সামনে অদ্ভুত এক ছায়াচক্র নড়ে ওঠে।  উত্তাল অন্ধকার সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো একের পর এক আছড়ে পড়ছে  চোখের ওপরে। প্রথমে আলেয়া বেগমের জরায়ুতে মৃদু কম্পন তৈরি হয়, তারপরই সমগ্র শরীর কাঁটা কম্পাসের মতো কেঁপে ওঠে। ধারাবাহিকভাবে কেঁপে ওঠে সন্তানদের রুমগুলো, ওদের ঘরে কাঁচ ভাঙার শব্দ হয় ঝনাৎঝনাৎ, অতঃপর ভেঙে পরে পঞ্চাশোর্ধ বয়সী নিজের ঘরের বড় আরশি। বাতাস নয়, অন্ধকারের ঘূর্ণিঝড় মোচড় দিয়ে উঠলে আলেয়া বেগমসহ সমগ্র বাড়িটা সশরীরে ঢুকে প্রবেশ করে অন্ধকারের আদিম গর্ভে। ঠিক এসময় ছুটে ঘরে ঢোকে মানুষটা। ঢুকেই মোবাইলের দুই টুকরো কুড়িয়ে জানালা দিয়ে ছুড়ে মারল লেবুগাছ তলে। এই অসময়ে ঘুমায় কেউ! চলো, ওঠো, বাইরে চলো।

এত সুবিধার কথা ভাবেনি গোঁয়ার। ঘরের দরজা খোলা, আলো বন্ধ। খুব স্বাচ্ছন্দ্যে লাফিয়ে ওঠে খাটের ওপরে। মনে হয় মানবী না, বিড়ালি। তার ধনুক বাঁকা পিঠ, শুয়ে আছে অপূর্ব শৈলীতে। চৌকাঠে পড়ে থাকা মরা শালিখের মতো দুটো ঠ্যাং উপরের দিকে তুলে দিয়ে সিঁটকি হয়ে শুয়ে আছে। অশীতিপর বৃদ্ধার শরীরে দিনের আলোতেই পোশাক বাহুল্য, এখন তো রাতদুপুর, নিজের বিছানা, কয়লাকালো আঁধার। উপগত হওয়ার পূর্বে গোঁয়ারটা একবার আঁতকে উঠে, অশীতিপর বৃদ্ধার চামড়া ঝোলানো কোঁচকানো শরীর, বিশেষ করে তার ঘোলাটে চোখের চাহনি জলে ভাসা পদ্মের মতো আঁধারজলে ভেসে ওঠে। দিনের আলোয় দেখা এই ছবি গোঁয়ারের চোখে ভেসে ওঠায়  রক্তের উষ্ণতায় ভাটা পড়ে। এরমধ্যে আবার গেরস্থবাড়ির দড়ি ছেঁড়া বেয়াড়া ষাঁড়ের মতো সম্পূর্ণ নিজের অজান্তে ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে দুই বছর আগে মরে মাটির সাথে মিশে সার হয়ে যাওয়া গোঁয়ারের অশীতিপর মা’র ঘোলাটে চোখ দুটো টর্চ লাইটের মতো আলো ফেলে অন্ধকার গহ্বরে। গোঁয়ারের শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে, মা’র ঘোলাটে চোখে এত আলো ছিল! ছেলের সুখেই মা’র সুখ বলে কী এই সময় এইখানে চলে আসবে! মা নির্বোধের মতো কাজ করছে। কিন্তু রক্তের উষ্ণতা শূন্যে নামার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মদ খাওয়াটা দ্বিগুণ হয়ে গেছে, চাচা সাহেব আজ দিল দরিয়া। মরা শালিখটাকে যেভাবে লাথি মেরে দূরে ফেলে দিয়ে এসেছে, বৃদ্ধার চামড়া ঝোলানো শরীর, ঘোলাটে চোখ, নিজের মৃত মা’র নির্বোধ চোখ, সব দূরে সরিয়ে দিল এক লাথিতে। রক্তের উষ্ণতা এখন লাফিয়ে উর্ধ্বমুখী। আঁধার দুনিয়া, এখানে আশি কুড়ির হিসেব কষে লাভ নেই, জিন্দা-মরা ব্যাপার নেই, ভাগাড়ে নামাটাই বড় কথা। মদোমাতাল শরীরের নেশাটা মরা-ই সার্থকতা।

মহাবিশ্বের সেই আদিঅন্তহীন কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করে গোঁয়ার।

প্রায় মিনিট বিশেকের জন্য গোঁয়ারটা মানুষ থেকে শুয়োর হয় যায়। শুয়োরের মতো মুখে শব্দ করে শুকনো খটখটে মাটি খুঁড়ে হুগলে মরা কচুগাছ তোলার মতো ভাগাড় হুগলে শরীর সম্পূর্ণ বিষমুক্ত করে যখন উঠে দাঁড়ায় তখন সে আবার শুয়োর থেকে গোঁয়ার হয়। ভয়ানক জোরে ধাক্কা খেয়ে শরীর পেছনে হেলে পতিতমুখী হয় কিন্তু সুদক্ষ খেলোয়াড়ের মতো শরীরের ব্যালেন্স ফিরিয়ে আনে, ভাবে, বুড়ি কী লাথি মারল! কিন্তু মৃত মানুষ কীভাবে লাথি দেবে? যে সাঁড়াশি শক্তিতে গলা টিপে ধরেছে এবং বিষ নিঃসরণের উত্তাল মুহূর্তের শুকনো চামড়াসহ কণ্ঠনালিতে হায়েনার মতো দাঁত বসিয়ে কামড় দিয়ে ধরেছে, অশীতিপর বুড়ি কেন, এই অ্যাকশানে বাইশ বছরের তাগড়া যুবতীও বাঁচবে না। ধাক্কার সাথে আরেকটি বিষয় গোঁয়ারকে ভয়ার্ত করে; বুড়ির নাড়াচড়া নেই, বাধা নেই, এমন কি নিঃশ্বাস ফেলার শব্দটিও শুনেছে বলে মনে পড়ে না। আবার নিজের শরীরের যেখানেই হাত দেয়, লুঙ্গি-গেঞ্জি, সর্বত্র আটালোÑ বুড়ি কী আগেই মরেছিল! আমি কী মরা মানুষের সাথে…বুড়ি কী বিষ ফিরিয়ে দিল! নিজের রক্তের বিষ শেষে নিজের শরীরে …ওহ! শরীর নাড়াতে গিয়ে মনে হয় মুগুড় দিয়ে পিটিয়ে শরীরের হাড় মাংস এক ফেলেছে; সর্বাঙ্গে বিষব্যথা। ঢোঁড়া সাপের মতো মরার পরে বুড়ির কী বিষদর্ঁাত গজাল! 

ঘরের চৌকাঠে পা ফেলেই মরা শালিখের দেহের উষ্ণ কোমল করস্পর্শ অনুভব করে গোঁয়ার। ভয়ার্ত শরীর কেঁপে ওঠে, শালিখটাকে তো লাথি মেরে দূরে ফেলেছিলাম, চৌকাঠে এলো কী করে! মরা শালিখটা প্রাণ ফিরে পেয়েছিল? হতে  পারে, শালিখটি মরেনি, মৃতের ভান করে আছে। এই শালিখ আবার কথা বলতে পারে কিনা কে বলবে।

অদূরের অন্ধকারে টর্চের লাইট একবার জ্বলে উঠেই নিভে গেল। এক দৌড়ে টর্চের কাছে পৌঁছে গোঁয়ার হাত-পা ছেড়ে বসে পড়েছে একটি সুপারি গাছে হেলান দিয়ে। দুই বার মাত্র তার শরীরের ওপরে টর্চের আলো পড়ে। প্রথম আলোয় নিজের দিকে তাকায়, রক্ত-বিষ-ঘাম মিলেমিশে একাকার; তার মহিষকালো শরীর আর মানুষের শরীর নেই, শুয়োরের শরীর।

দ্বিতীয় আলোয় মাথা উঁচু করে অ্যা বলে লাফিয়ে ওঠে গোঁয়ার, চাচা সাহেব নেই…

গোঁয়ারের গলা-মুখ চেপে ধরেছে অবাঞ্ছিত ও উন্মত্ত কুকুর নিধনের সাঁড়াশি দিয়ে; কণ্ঠ অবরুদ্ধ, মাথা স্থির, তবে চোখ দুটো খোলা এবং হাত-পা স্বাধীন।

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares