অন্ধ সময়ের গল্প এবং একজন আহাদ সাহেব : নাহার তৃণা

আস্তাগফিরুল্লাহ!

শব্দটা উচ্চারণ করে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেন আহাদ সাহেব। খোদার নাম নিয়ে দিন শুরুর মুখে এসব ভালো লাগে নাকি! যত্তসব। শুধু যে দিনের আলোতেই  জিনিসটা চোখে পড়ে তাও তো নয়। রাতে ঘুম ভেঙে বার দুয়েক তাঁকে বাথরুমে যেতে হয়। অজান্তেই চোখ জানালা গলে বাইরে যায়। এবং অবধারিতভাবে সদ্য নির্মিত বিল্ডিংটার মাথা ফুঁড়ে বুক টান করে দাঁড়ানো কংক্রিটের ক্রুশটা নজর কাড়ে। জিনিসটা ঘিরে আলো জ্বলে বলে রাতেরবেলাতেও সেটা দিব্যি দৃশ্যমান। মনে মনে বারকয়েক ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়েও অস্বস্তি কাটে না যেন। বিড়বিড় করে আরও পড়েন, ‘আল্লাহুমা লা তাইরা ইল্লা তাইরুকা ওয়ালা খাইরা ইল্লা খাইরুকা ওয়ালা ইলাহা গাইরুকা।’ গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো ঘণ্টায় ঘণ্টায় চার্চের ঘড়িটার ঢং ঢং শোনাটাও যন্ত্রণা বিশেষ। শাহেদ বাবাকে প্রবোধ দিয়েছে, ওতে তো সুবিধাই বরং। নামাজের সময়টা মিলিয়ে নেওয়া সহজ হবে তোমার। গত বছরও এ বালাই ছিল না।  এবার আসার প্রথমদিনে বাবার বিরক্তি দেখে শাহেদ খুব হেসেছিল। বাবা তুমি পারোও! দেশটাই তো ওদের। ঘর পালটে তাঁর থাকার ব্যবস্থা স্টাডিতে করতে চেয়েছিল শাহেদ। বৌমা রাজি হয়নি। ও ঘরটা ছোট্ট, বাবার হাঁসফাঁস লাগবে। তাঁরচে’ বরং খাটটা ঘুরিয়ে দেওয়া ভালো। তাতে লাভের লাভ কিস্যু হয়নি। যত দিন যাচ্ছে আহাদ সাহেবের মধ্যে কেমন একটা কাঠমোল্লা ভাব জেঁকে বসছে যেন। এ নিয়ে ছেলে শাহেদের অস্বস্তির শেষ নেই। শাহেদ কোনো বাঁধাধরা ধর্ম পালনে বিশ্বাসী না। মানবধর্মকেই সে ধর্ম বলে মানতে পছন্দ করে।

প্রতি বছর একবার করে ছেলের কাছে এসে কিছুদিন কাটিয়ে যান আহাদ সাহেব। খুব যে আনন্দ নিয়ে বেড়াতে আসেন তাও না। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একাকিত্বের বেড়াজাল কেটে খানিকটা হাঁফ নেবার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও আসেন। নাতনি সিন্থিয়ার মায়ায়ও একটা কারণ অবশ্য। কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। দেশে পাঁচ ওয়াক্ত আজান শুনে অভ্যস্ত কান এই পোড়ার দেশে আজান শুনতে পায় না। মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের শতেক ঝামেলা। তাঁর কষ্ট হয়। কেমন ছটফট করেন। আগে বৌমা তাঁকে ড্রাইভ করে মসজিদে নামিয়ে আসত। আবার গিয়ে নিয়ে আসত। এখন বেচারি আড়াই বছরের নাতনিটাকে নিয়ে হিমশিম খায় সব দিক সামাল দিতে। তিনিও মুখ ফুটে বলেন না কিছু। ছেলের বাড়ি থেকে মসজিদ বেশ দূরে। শুক্রবার ছাড়া মসজিদে যাওয়া হয় না। সব মিলিয়ে এই ইহুদি নাসারাদের দেশে তাঁর মন টিকতে চায় না। মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন, ছেলে-বৌমার শত অনুরোধেও সামনের বছর থেকে তিনি আর আসবেন না। অনেক হয়েছে আমেরিকা দেখা। আর কত!

এবার অবশ্য বিশেষ আরেকটা কারণেও তাঁর আমেরিকা আসা। তাঁদের মনসাতলার পুরনো এক প্রতিবেশী, যিনি মন্ট্রিলে বহু বছর ধরে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। যদিও আহাদ সাহেব অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারেনি ভদ্রলোকেরা মনসাতলার কোন বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। কিন্তু ফোনে যতটুকু কথা হয়েছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি, তাদের পাড়াটিকে ভদ্রলোক নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন। ভদ্রলোকের এক আত্মীয়ের ছেলে শাহেদের সাথে একই কোম্পানিতে কাজ করে। সেই সূত্রে অদ্ভুতভাবে একে অন্যের খোঁজ পাওয়া। সুশান্ত রায়চৌধুরী নামের ওই ভদ্রলোক, বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন একটা দিনের জন্য হলেও যেন আহাদ সাহেব মন্ট্রিলে এসে তাঁর সাথে দেখা করেন। বর্তমানে চলাফেরা করা তাঁর পক্ষে কষ্টকর। যে কারণে তিনি সশরীরে আহাদ সাহেবের সাথে সাক্ষাতে অপরাগ। তিনি এমন কিছু বলতে চান, যা টেলিফোনে বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া তাঁর কাছে আহাদ সাহেবের মায়ের কিছু জিনিস নাকি গচ্ছিত আছে। সম্ভবত সে কারণেই আহাদ সাহেবের আগ্রহ জন্মেছে অজানা-অচেনা সুশান্ত রায়চৌধুরী নামের লোকটার সাথে সাক্ষাতের। নইলে মেলামেশায় তিনি বড়োই খুঁতখুঁতে। মনসাতলার প্রতিবেশীদের সাথেও তাঁর খুব একটা ঘনিষ্ঠতা নেই। অথচ ছেলে শাহেদ হয়েছে একেবারেই তাঁর উল্টো। দাদির স্বভাব পেয়েছে।

আহাদ সাহেবের মাও খুব মিশুকে মানুষ ছিলেন। বাবা শান্ত স্বভাবের হলেও গাম্ভীর্যের আলগা গণ্ডিতে নিজেকে কখনও বেঁধে রাখেননি। আহাদ সাহেব তাঁর মা-বাবা কারও চেহারাÑ স্বভাবের কিচ্ছু পাননি। তাঁর স্বভাবের এই গণ্ডিবদ্ধতা হয়তো একটা নিদারুণ সময়ের চাপিয়ে দেয়া ঘৃণা, তুচ্ছতাচ্ছিল্যেরেই বহিঃপ্রকাশ।

পরবাসী এক জীবন কাটানো মা-বাবার ওপর তাঁর ক্ষোভ ছিল এ নিয়ে। দেশ যদি ছাড়লেনই তখন মুসলমানের দেশ পাকিস্তান রেখে, হিন্দু অধ্যুষিত ভারতকেই কেন বেছে নিতে হয়েছিল! এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি পাননি আজ পর্যন্ত। যে মাটিতে জন্ম সেখান থেকে  শেকড় উপড়ে অনাত্মীয় একটা দেশের মাটিতে এসে কী সুখই বা তাঁরা পেয়েছিলেন? গাছের শিকড় জানে জমির মাটি তার কতটা আপন। কতটা গভীরে জড়ানো তাদের আত্মীয়তা। টবের মাটিতে সেই আত্মীয়তা কোথায়! সে কারণেই হয়তো জীবন যাপনের তৃপ্তি তাঁদের কপালে জোটেনি। ওঁদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের বাইরে থেকেও এই সত্যিটা বুঝে নিতে তাঁর সমস্যা হয়নি। জন্মের অধিকারে ভারত নামের দেশটার ওপর আহাদ সাহেবের কিছু অধিকার জন্মালেও, নাড়ির টানটুকু ছাড়া আর কোনো টান যেন তিনি বোধ করেননি। পাকিস্তান নামের দেশটার প্রতি বরং একটা মমত্ব অনুভব করেন। হয়ত এটা তাঁর মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাদীক্ষার ফলাফল। নিজের সত্যিকার দেশ যে কোনটি এটা নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তাঁকে নিরন্তর প্রশ্নবিদ্ধ রাখে। মাটি হারানো শিকড়ের হাহাকার যেন পুষে বেড়ান তিনি। দেশ বলতে আহাদ সাহেব বিমূর্ত কোনো অস্তিত্ব বোঝেন না। দেশ তাঁর কাছে মূর্ত কিছু। যার গভীরে মনুষ্য শরীরের শিকড় প্রোথিত।

আহাদ সাহেব কিছুতেই একটা হিসাব মিলাতে পারছেন না, তাঁর মায়ের জিনিস কীভাবে একজন অনাত্মীয়, ভিন্নধর্মীর কাছে গচ্ছিত থাকে! এই রহস্যের মীমাংসা করাটা তাঁর জরুরি মনে হয়েছে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সুশান্ত রায়চৌধুরীর সাথে দেখা করবেন। যত দ্রুত সম্ভব সেখানে গিয়ে বিষয়টার একটা সুরাহা করতে ইচ্ছুক তিনি। আহাদ সাহেবের অস্থিরতা দেখে শাহেদ ঠিক করে একদিনের জন্য বাবাকে নিয়ে সে কানাডা যাবে। সেটা নিয়ে বাবার সাথে আলাপও করে। সিন্থিয়াকে নিয়ে বৌমাও সঙ্গে যাবার বায়না ধরে। প্রথমত তারা বাই রোডে যাচ্ছে না, আর তাছাড়া অপরিচিত লোকের বাড়িতে সবাই গিয়ে উপস্থিত হওয়াটাই বা কেমন দেখায়! এই অজুহাতে শাহেদ তাকে ক্ষান্ত করেছে। এ তো আর কোনো আনন্দ ভ্রমণ নয়। কাজ সেরেই তারা চলে আসবে।

বৌমা বুদ্ধিমতি মেয়ে। আর গাঁইগুঁয়ে যায়নি। শ্বশুর এলে প্রতি বছরেরই তারা নানা জায়গাতে ঘুরতে যায়।

এই কাজটা সেরে ফিরে এলে ডিজনি যাওয়ার ডিউ প্ল্যানটা এবার সেরে ফেলা হবে, স্বামীর পরিকল্পনা জেনে বৌমা বেজায় খুশি। আহাদ সাহেব চুপচাপ শোনেন। মনে মনে ঠিকও করে ফেলেন ওপথ তিনি মাড়াচ্ছেন না। কাজটা সেরে যত জলদি সম্ভব দেশে ফিরতে চান তিনি।

যথেষ্ট বয়স হয়েছে তাঁর। তেয়াত্তর পূর্ণ হলো এ বছর। অনেকটা দেরিই হয়েছিল আহাদ সাহেবের বিয়ে করতে। শাহেদ তাঁর বেশি বয়সের সন্তান। তবে বয়সের তুলনায় তিনি যথেষ্ট ফিট। এই বয়সেও নিয়মিত ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাঁটি করেন, খাওয়া দাওয়াতেও অত্যন্ত সচেতন। তাঁর ধারণা পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়েন বলেই তিনি এতটা ফিট আছেন। নিয়ম নিষ্ঠা মতো নামাজ কায়েম করাটাও এক রকম শরীর চর্চা বৈকি। এখন পযর্ন্ত তাঁর তেমন শারীরিক অসুস্থতা নেই। রক্তে সামান্য যা শর্করা আছে কঠোরভাবেই সেটা  নিয়ন্ত্রণে। তাঁর বয়সী অনেকের মতো তিনি অল্পেই কাহিল হন না। প্রতিবছর নিয়মিত ইজতেমা, ইসলামি সম্মেলনগুলোতে হাজির হতে ভোলেন না। চিল্লাতেও চলে যান হুটহাট। দুবার হজ্বব্রত পালন করে এসেছেন। সামনের বছর আরেকবার খোদার ঘর আর নবিজির রওজা মোবারক দেখে আসবার ইচ্ছা আছে।

তারপরও হায়াত মউতের কথা তো আর বলা যায় না। কখন মৃত্যু এসে বলবে, চলো সময় হয়েছে।

তিনি মনে মনে খোদার কাছে এই আর্জি জানিয়ে রেখেছেন। মৃত্যুটা যেন তাঁর জন্ম মাটিতেই হয়। ইহুদি নাসারার এই দেশে কিছুতেই তিনি মরতে চান না। এখানে কবরে শুয়ে তিনি একবেলার জন্যও আজান শুনতে পাবেন না। কোনো নামাজি তাঁর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে একটু দোয়াও বকশাবে না। নাহ্ এমনভাবে তিনি কিছুতেই মরতে চান না। সে এখনকার কবরস্থান যতই পরিপাটি গোছানো হোক। একবার ঘুরতে ঘুরতে ছেলে-বৌমা তাকে এক কবরস্থান দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। ফুলে ফুলে সাজানো প্রতিটি কবর। কবরস্থান বলতে দেশে যেমনটা, এ দেশের করবস্থান সেরকম নয় মোটেও। কয়েক গজের মধ্যে আরেকটা কবরস্থান ছিল। একটি মানুষের জন্য অন্যটি নাকি কুকুরের। এই তথ্য জেনে তিনি বুকে দারুণ আঘাত পেয়েছিলেন। সেদিন তাদের আরও কোথাও যাওয়ার ছিল। সেখানে না গিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। রাতে খেতে বসে ঠিকমত খেতেও পারেননি।

বার বার মনে প্রশ্ন জেগেছে, ইয়া পাক পরওয়ার দেগার একি শোনালে! কুকুরের পাশে মানুষের কবর! এটাও সম্ভব! সেদিনই প্রথম তিনি ছেলে আর বৌমার সামনে আবেগাল্পুত হয়েছিলেন। নিজের মনের কথাটা স্পষ্ট করে জানিয়ে রেখেছেন, তাঁর মৃত্যু যদি এই দেশে কপাল দোষে ঘটেও থাকে। লাশটা যেন দেশের মাটিতেই দফন করা হয়। বয়স হয়েছে বলেই মৃত্যু চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করছে এমন ভাবেন না তিনি। একজন খাঁটি মুসলমান মাত্রই প্রতিনিয়ত মৃত্যু চিন্তাটা মনে রাখবে। সেই নিয়ম মেনেই আহাদ সাহেব প্রায় নিজের মৃত্যু নিয়ে ভাবিত হন। তবে আপাতত তাঁর একটাই চিন্তা, সুশান্ত রায়চৌধুরী তাকে কী এমন তথ্য দেবার জন্য জরুরি তলব দিচ্ছেন?

কৌতূহলের পর্দা সরিয়ে সত্যিটা জানার অদম্য আগ্রহে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আহাদ সাহেব কানাডায় গিয়ে উপস্থিত হন।

সাক্ষাতের শুরুতেই জানা যায় সুশান্ত রায়চৌধুরী কোনোকালেই মনসাতলার বাসিন্দা ছিলেন না। ভদ্রলোক বক্তব্য শুরুর আগে সোজাসাপ্টাভাবে বলে নিয়েছেন তাঁর কাছে গচ্ছিত জিনিসগুলো পুরো কাহিনি শেষ না করে হস্তান্তর করবেন না। পুরো বিষয়টা নিয়ে আহাদ সাহেব চরম ক্ষুব্ধ। আচরণের মাধ্যমে সেটা প্রকাশে কাপর্ণ্য করেন না তিনি। পারলে আহাদ সাহেব তখনই ফিরে আসেন। বিব্রত ছেলে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করে বাবাকে।

বিরক্তি চেপে ভদ্রলোক কি বলতে চান শোনার জন্য সুশান্ত রায়ের বিছানার পাশের সোফায় শাহেদ এবং আহাদ সাহেব পাশাপাশি বসেন।

কাঞ্চনপুরের রায়চৌধুরীদের নামডাক ছিল যথেষ্ট। সেই রায়চৌধুরী বাড়ির চার ছেলেমেয়ের মধ্যে সুশান্ত সবার ছোটো। ছিচল্লিশে তিনি তেরো কি চোদ্দ বছরের বালক। তাঁর চেয়ে চার বছরের বড় দিদি আশালতা, মেজো জন চারুলতাদিদি, সবার বড়ো প্রশান্ত দাদা। এবাড়ির মেয়েরা কেবল নয় পুরুষরাও দারুণ রূপবান। আশালতাদিদি ছিল সবার সেরা। কাছাকাছি বয়সী বিধায় দুই ভাইবোনের মধ্যে ভাবও ছিল প্রচণ্ড। গ্রামের হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাবে প্রকাশ্য রূঢ়তা দেখেননি ওরা কখনও। এরমধ্যে মুন্সি বাড়ির সাথে চৌধুরীদের সম্পর্কটা ছিল সবচে’ নিবিড়। মুন্সিদের ছোটো ছেলে বেলাল ভাই আর বড়োদা প্রশান্ত, হরিহর আত্মা। এ বাড়ির পালাপার্বণে যেমন বেলাল ভাইদের উপস্থিতি বাঁধা ছিল, ওদের নানা উৎসবেও প্রশান্ত- সুশান্তদের ছিল অবাধ অংশ গ্রহণ। বেলালদের কোনো বোন না থাকায় ওদের মা আশা আর চারু’দিকে মেয়ের মতো ভালোবাসতেন।

প্রতি ঈদে ওদের দু’বোনের জন্য হাট থেকে মুন্সিচাচা নিজে পছন্দ করে ‘শাড়ি চুড়ি’ কিনে আনতেন। মুন্সিচাচার মতো ওরকম সাদা মনের মানুষ কাঞ্চনপুরে দ্বিতীয়টি ছিল না। গ্রামের অন্যরাও সরল সোজাই ছিলেন। অথচ রাজনীতির বিষ এক সময় এইসব সরল সহজ মানুষগুলোর মনেও দাঁত বসাতে ছাড়ে না।

কলিকাতার দাঙ্গার খবর এই অঞ্চলে আসবার পরপর তাদের এলাকায় প্রকাশ্যে খুব উচ্চবাচ্য না হলেও, আগের সেই অনায়াস আবহে একটা ‘কিন্তু’ আসনপিঁড়ি হয়ে বসে বুঝি। গেল ঈদে একবার গ্রামের হাওয়া গরম করার নানা ফন্দি ফিকিরে অনেকের মনই বিষিয়ে ছিল। এই সুযোগে সেটা যেন নড়েচড়ে বসল। ওই দাঙ্গার খবরে তাদের আত্মীয়তায় হয়তো ছায়া ফেলেনি। কিন্তু গ্রামটা ভেতরে ভেতরে বদলে যাচ্ছিল। 

কলিকাতাবাসী বড় মামু কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন কয়েক আগে হুট করে উপস্থিত হলেন। অনেকের অগোচরে এপার ছেড়ে ওপারে চলে যাওয়া তাঁর পরিচিত দু-একটি ব্যবসায়ী পরিবারের কাছ থেকে তিনি পাকা খবর পেয়েছেন, কাঞ্চনপুরে খুব শীঘ্রই নাকি কিছু একটা ঘটতে চলেছে।  তলে তলে ঘোঁট পাকছে কুমতলব। তিনি তাঁর একমাত্র বোন এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছেন। যে কারণে  এখান থেকে তিনি কলিকাতায় ওদের সরিয়ে নিতে চান। প্রথমটায় বড়ো মামুর আশঙ্কাকে বাবা, বড়োদা কেউই গ্রাহ্যে নিতে চায়নি। কিন্তু ওই সন্ধ্যার আলোচনায় উপস্থিত থাকা মুন্সিচাচা যখন গাম্ভীর্য ভেঙে বড়ো মামুর আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে না দেবার আবেদন রাখেন, তখন বাড়ির ভেতর কেমন এক আতঙ্ক ছেয়ে গিয়েছিল। ঠিক হয় বড়োমামু বাড়ির মেয়েদের আগেভাগে সরিয়ে নেবেন। বাবা, ছোটকা, বড়োদা এবং অন্যান্য পুরুষরা লক্ষ্মীপুজোর পরদিন ওপারে যাত্রা করবেন।

পরিকল্পনা শুনে আশাদি বেঁকে বসে। তার জেদ ছিল সুবিখ্যাত। একবার কিছু মাথায় ঢুকলে নড়ায় কার সাধ্যি! বাবার অতি আদরের কন্যা  বাবার কথাও কানে তুলল না। তার এক কথা, প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজায় সে, মীরামাসি, চারুদি, ছবিপিসি কত ঘটা করে আলপনা আঁকে। মা, ঠাকুমা কাঁড়ি কাঁড়ি মুড়ির মোয়া, নাড়িকেল, তিলের নাড়ু বানায়। এ বছরের জন্যও ইতিমধ্যে সব জোগাড় যন্ত্র হয়ে গেছে। পুজোর চোদ্দ উপাচারের সব জোগাড়ও প্রায় শেষের দিকে। বশির জেলেকে জোড়া ইলিশের বায়না দিয়ে রেখেছে মা।  ছবিপিসির সাথে বসে আলপনার জন্য আতপ চাল গুঁড়ো করেছে, প্রদীপ আনিয়েছে কবিরহাট থেকে। এখন এসব ফেলে চলে যাবে খামোখাই ভয়ের কারণে? কক্ষনো না। বড়োমামু মিছেই ভয় পেয়েছেন। অনেক সাধ্য সাধনার পর আশাদি শর্ত দিল জন্মভিটেতে এবারের মতো লক্ষ্মীপূজোটা দিয়ে পরদিন খুব ভোরেই তারা রওনা দেবে। তার আগে নয়। ছবিপিসিও আশাদির কথায় সায় দিলো।

অগত্যা বড়োমামু  মা, ঠাকুমা, মীরামাসি, বড়োদিকে নিয়ে কলিকাতায় চলে যান। যাবার সময় বাড়ির সব সোনাদানাসহ মূল্যবান কিছু জিনিস সঙ্গে নিতেও ভোলেন না। তবে অনেক চেষ্টা করেও সুশান্তকে সঙ্গে নিতে পারেনি। তাঁর এক কথা, আশাদি না গেলে আমিও যাব না। কাজেই বাধ্য হয়ে আশাদি আর ছবিপিসির হাতে ছোটো ছেলে আর সংসারের ভার দিয়ে ওঁরা ভিন দেশে রওনা দেন। বেলাল ভাই আর বড়োদা দুজনে বিশ্বস্ত এক নৌকার মাঝির মাধ্যমে বাকিদের কলিকাতা যাওয়ার সব ব্যবস্থা পাকা করে রাখে। ঠিক হয় লক্ষ্মীপূজার পরদিন ভোরে বাড়ির চাবি মুন্সিচাচার হাতে তুলে দিয়ে ওরা রওনা দেবে।

কিন্তু কোথা দিয়ে যে কী হয়ে গেল। সাহাপুর বাজারের আগুন ধেয়ে এলো রায়চৌধুরী বাড়ির দিকে। সন্ধ্যার মুখেই বাড়িতে পুজোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গড়িয়েছিল। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মিহি আবেশ তখনও বাড়িটা ঘিরে ‘-নমামি সর্বভূতানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে যা গতিস্ত্বৎপ্রপন্নানাং সা মে ভূয়াৎ ত্বদর্চনাৎ।’ আচমকাই একটা সম্মিলিত আল্লাহু আকবর ধ্বনির ধাক্কায় মন্ত্রের আবেশ ছিঁড়েখুঁড়ে যায়। আঙিনাজুড়ে আঁকা লক্ষ্মীর  পায়ের ছাপ, ধানের ছড়ার আলপনা মাড়িয়ে একদল লোক অসহ্য এক আক্রোশ নিয়ে উপস্থিত হয়। ওদের প্রত্যেকের হাতেই ধারালো অস্ত্র, মশাল। চোখে খুনের নেশা। লোকগুলো প্রথমেই পুজোমণ্ডপে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওইটুকু ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন বালক সুশান্ত।  আতঙ্ক আর ছুটোছুটির মাঝ থেকে ছোটকা তাকে প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নেয়। মুখে হাতচাপা দিয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে লুকায়। তাকে সেখানে রেখে, পরে আশাদি, ছবিপিসি অন্যদের আনতে গিয়েছিল। কত যুগ পর ঠিক মনে নেই, ছোটকা কাঁপতে কাঁপতে ফিরে এসে শুধু বলতে পেরেছিল, ‘সব শেষ রে শান্ত!’

‘মানুষ যেখানে শেষ হলো ভাবে, বিধাতা সেখান থেকেই বুঝি শুরু করেন। নিয়তি ভারী রগড় করে মাঝে মাঝেÑ এই যেমন…।’ মাঝ পথে থেমে গিয়ে তীক্ষè চোখে আহাদ সাহেবের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেন যেন অশীতিপর, কিন্তু এখনও স্মৃতিতে-কণ্ঠস্বরে ঋজু বৃদ্ধ সুশান্ত রায়চৌধুরী।

একটা হিন্দু পরিবারের এই কাহিনির সাথে তাঁর কী সম্পর্ক সেটা নিয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকা আহাদ সাহেব নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। রূঢ়স্বরে বলে ওঠেন…কিন্তু আপনার পরিবারের এসব কেচ্ছা-কাহিনির সাথে আমার সম্পর্ক কী? বেফজুল কাহিনি শুনতে কেন আমাদের ডাকা হলো সেটা বোধগম্য হচ্ছে না। সরাসরি যা বলার বলুন। আমাদের ফিরতে হবে।

সুশান্ত রায়চৌধুরী হাত তুলে অধৈর্য ছেলেকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলে ওঠেনÑ ‘এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেও না, সবটা শুনে ফয়সালা করো। খানিক ধৈর্য না ধরলে চলে!’  বলেই তিনি বিছানার পাশের একটা সুইচে চাপ দেন।

ওপাশের ঘর থেকে আবারও হাস্যময়ী মহিলাটি বেরিয়ে আসেন। ওঁরা এখানে আসা অবধি ইনিই তাঁদের অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া সবের ব্যবস্থা করে চলেছেন। এ বাড়ির পানিটুকুও যেন স্পর্শ করতে না হয়, তার নিষ্পত্তি হিসেবে আজ আহাদ সাহেব রোজা রেখেছেন। মহিলা সেটা নিয়েও তাঁকে মৃদু কথা শুনিয়েছেন। শাহেদরা হোটেলে উঠেছে শুনে আন্তরিকভাবে রাগও দেখিয়েছেন। সম্পর্কে ইনি সুশান্ত রায়ের ছেলের বৌ। মহিলা এসে দাঁড়াতেই আহাদ সাহেবের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘বাক্সটা অরে দাও’। মহিলা যেন তৈরিই ছিলেন, চট করে ওপাশের ঘরে গিয়ে একটা বড়োসড়ো নকশাদার কাঠের বাক্স এনে আহাদ সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরেন। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকেন শুধু। হাত বাড়িয়ে বাক্স নেবার কোনো আগ্রহ দেখান না। বৃদ্ধ তখন বলে ওঠেন, ‘বাক্সটা নাও, কাহিনি শেষ হোক তারপর খোলো’। যন্ত্রের ভঙ্গিতে বাক্সটা কোলের ওপর নামিয়ে রেখে বাকি কাহিনি শোনোর অপেক্ষায় বৃদ্ধের দিকে তাকান আহাদ সাহেব। কিছু প্রশ্ন তাঁকে যেন খানিক বেচয়ন করে তোলে।

হিন্দু ঘরের মেয়ে আশালতা কোথায় গেল, কী হলো তার পরিণতি? সেই জট খুব দ্রুতই খুলে বাকি কাহিনি শেষ করেন সুশান্ত রায়চৌধুরী।

সেদিন সন্ধ্যায় কাশুমিয়া ফৌজের লোকজন রায়চৌধুরী বাড়িতে হামলা চালিয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়।

সে রক্তগঙ্গায় বাবা, ছবিপিসি, বড়োদা, পুরুতঠাকুর, বাড়ির বহুদিনের পুরনো কাজের লোক রমেশকাকু, মালি পরেশদা, নলিনীদির  প্রাণহীন দেহগুলো খুঁজে পাওয়া গেলেও আশাদিকে সারা বাড়ির কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেদিন সকাল থেকে পুজোর সাজসজ্জায়  উপস্থিত থাকলেও বিকেলের দিকে মুন্সি চাচির পুরনো শূলপীড়াটা বেড়ে যাওয়ায় বেলাল ভাই সন্ধ্যার পুজোয় আর থাকতে পারেনি।

সন্ধ্যায় রায়চৌধুরী বাড়িতে হামলার খবরটা মুন্সি বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায় বেশ রাতের দিকে। চেষ্টা করেও এদিকে আসা সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে। দিনের আলো ফোটা মাত্রই ওরা ছুটে আসে। দু’দিন ধরে  বেলাল আর হেলাল ভাই পাগলের মতো খোঁজাখুঁজি চালান।  তিন দিনের মাথায়  আশাদির খোঁজ পাওয়া যায়। ততক্ষণে তাকে শুধু শারীরিকভাবেই লাঞ্ছিত করা হয়নি, একই সাথে তাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষার কাজটাও করা হয়ে গেছে। আশাদির খোঁজ পাওয়ার পর পরই ছোটকা আর দেরি করেনি। আমাকে নিয়ে কলিকাতায় রওনা দেবার তোড়জোড় শুরু করে। বার কয়েক আশাদি যাবে না জিজ্ঞেস করার পর ছোটকা একটা কথাই বলেছিলÑ ‘শান্ত, মনে কর বাকিদের মতো আশাও মরে গেছেÑ’

অবস্থার চাপে তখন সেটা মেনে নিলেও মনে মনে কখনও ছোটকার সিদ্ধান্তটা মানতে পারিনি। পুরো ঘটনার ধকল কাটাতে  মা বড়োদির কয়েক মাস লেগে যায়। আমি শুধু দিন গুনতে থাকি, কবে নিজের পায়ে দাঁড়াব। আশাদি কে ঠিক ফিরিয়ে আনব। ঘটনার তিন বছরের মাথায় কাউকে কিছু না জানিয়ে আশাদির খোঁজে পূর্ববঙ্গে চলে গিয়েছিলাম।  গিয়ে জানতে পারি, বহুদিনের চেনাজানা মানুষগুলো মুন্সি চাচার বাড়িতে আশাদির আশ্রয় নেওয়াটাকে মোটেও ভালো মনে নেয়নি। তারা জোর আপত্তি তোলে। নানা অনাসৃষ্টি শুরু করে।

ভেবেচিন্তে আশাদিকে নিয়ে ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বেলাল ভাই। তিনি ভেবেছিলেন কলিকাতায় বড়ো মামুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আশাদিকে তাঁদের হাতে তুলে দিয়ে ফিরে আসবেন। কিন্ত সেটা সম্ভব হয়নি। ওখানে পৌঁছানোর পর আশাদি বেলাল ভাইয়ের আচরণে কিছু আঁচ করেছিল হয়তো। বেলাল ভাইকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল তিনি কোনোদিন কলিকাতায় বড়োমামু বা অন্য কারও সাথেই যোগাযোগের কোনো চেষ্টায় যাবেন না। পরে বাধ্য হয়েই তাকে নিয়ে বেলাল ভাই হুগলিতে তাদের এক আত্মীয়ের কাছে স্বামী স্ত্রীর পরিচয়ে গিয়ে ওঠে। আশাদি তখন গর্ভবতী। হুগলীর সেই আত্মীয়ের কাছেই আশাদির ছেলে মানুষ হয়। হাসিখুশি আশাদি দুনিয়ার সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করলেও নিজের সন্তানটাকে কিছুতেই সহ্য করতে পারত না। নানা পাগলামি করত। অবস্থা বেগতিক দেখে বেলাল ভাইয়ের নিঃসন্তান আত্মীয় ছেলেকে বড়ো করার ভার নেন। বাইরের পৃথিবী তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে জানলেও বেলাল আর আশালতা নিজেদের ভাইবোনের সম্পর্কের সীমারেখায় কোনো দাগ লাগতে দেননি। এমন কী লোকচোখের আড়ালে আশালতা তাঁর স্বধর্মই পালন করে গেছেন। বড়োদা চলে গেলেও তাঁর সুহৃদ, বোনের সম্মানে ছায়ার মতো আগলে রেখেছিল আশাদিকে। এসব খবর আমি বেলাল ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারি। আশাদির অজান্তে গোপনে তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। অবশ্য ওখানে তিনি তাঁর ভালো নামেই পরিচিত ছিলেন, বেলাল ডাক নামটা আমিই ডাকতাম শুধু।

ততদিনে এটা বুঝে গিয়েছি আশাদি বেঁচে আছে এখবরটা মা দিদি, কেউই সহজভাবে নেবে না। কারণ তাদের মেয়েটাকে, বোনটাকে বিধর্মী কিছু খেয়োকুকুর এঁটো করেছে। ধর্মেও ছিটিয়ে দিয়েছে সন্দেহের বিষ। আশাদি ভেতরে ভেতরে যে নরকযন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছিল, তাকে আর না খোঁচানোই ভালো। বেলাল ভাইয়ের পরামর্শকে সম্মান জানিয়ে আমি নিয়মিত তাঁদের খোঁজ খবর রাখলেও কখনও মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টায় যাইনি। তারপর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিদেশ চলে আসি। বিদেশে বসেই  আপনজনদের পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার খবর পাই একে একে। এখন শুধুই অপেক্ষা, দেশ দেশ করে হেদিয়া মরার যন্ত্রণা থেকে চির মুক্তির।

এই পুরো কাহিনি বয়ানকালে শাহেদ টুঁ শব্দটিও করেনি। ভীষণ মনোগ্রাহী কোনো গল্প শোনার আগ্রহ নিয়ে শুনে গেছে চুপচাপ। কাহিনি শেষে কেমন মরিয়া হয়ে জানতে চাইল। আপনার আশাদি আর ওই বেলাল নামের ভদ্রলোক এখন কোথায়?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুশান্ত রায়চৌধুরী উত্তর দিলেন, দশ বছর হয়ে গেল আশাদি বেলাল ভাই মরে বেঁচেছেন। ওঁদের কথা মনে হলে নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়, সবার অগোচরে দুটো জীবন নষ্ট হলো। আমি সাক্ষী হয়েও তাঁদের জন্য কিচ্ছু করিনি, অন্তত চেষ্টা তো করা যেত। স্বার্থপরের মতো পালিয়ে এসেছি।

বৃদ্ধের গলাটা কেবল কেঁপে ওঠা ছাড়া বাহ্যিক আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। গলাটা পরিষ্কার করে প্রায় আদেশের ভঙ্গিতে আহাদ সাহেবের দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন- বাক্সটা এবার খুলে দেখো কি আছে ওতে!

হতোদ্যম আহাদ সাহেব বাক্সটা খোলার কোনো আগ্রহ দেখান না। আজ তাঁর দুই ওয়াক্তের নামাজ কাজা গেছে। সেটা নিয়ে তিনি বড়োই পীড়িত আছেন মনে মনে। তাছাড়া এ বাড়ির পরিবেশে তিনি মোটেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। এখানে আসা অবধি লক্ষাধিক বার তিনি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জপ করেছেন। এদের বাড়িতে আজ কি এক পুজোর ঘটা চলছে। পুজোর আনুষ্ঠানিকতা নিচতলায় চললেও মন্ত্র ও স্তবস্তুতি পাঠের আওয়াজ মাঝে মাঝেই ছিটকে এসে আহাদ সাহেবের কানে শেলের মতো বিঁধেছে। বাতাসে ভেসে বেড়ানো ধুপধুনোর বিজাতীয় গন্ধে তাঁর কেমন গা গুলাচ্ছে। শাখ আর পুজোর ঘণ্টা শুনে তিনি বার কয়েক ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন দারুণ রোষে। চোখের ভাষায় যেন বলতে চেয়েছেন এই নরকে আর কতক্ষণ! আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চান না তিনি। কিন্তু উঠে যে দাঁড়াবেন সে শক্তিও যেন ছিল না শরীরে। সামনের বিছানায় শুয়ে থাকা বুড়োটার ভেতর কেমন এক সম্মোহনী ক্ষমতা আছে যেন, যা তাঁকে পুরোটা কাহিনি একঠাই বসে শুনতে বাধ্য করে। অথচ এই কাহিনির কোথাও তাঁর মা বেগম আশেকুন্নেসা, বাবা আব্দুল খালেক কিংবা তিনি নেই! তবুও বসে বসে শুনতে হলো কোথাকার কে, তার পারিবারিক কেচ্ছা! যদিও কাহিনি বড়োই মর্মান্তিক। কিন্তু তাতে তাঁর কি যায় আসে!  বাবাকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে দেখে শাহেদ হাত বাড়িয়ে বাবার কাছ থেকে বাক্সটা নেবার চেষ্টায় গেলে মাঝপথেই তাকে থেমে যেতে হয়। সুশান্ত রায়চৌধুরী বেশ জোরেই বলে ওঠেন, তুমি নও, ওকেই খুলতে দাও।

নকশাদার বাক্সের ডালাটা খুলতেই তার ভেতরে আরেকটা নকশাদার বাক্স দেখা যায়। মনে মনে বিরক্ত আর অধৈর্য আহাদ সাহেব। ভেতরের বাক্সটা টেনে বের করেন দ্রুত হাতে। যত জলদি বাক্স খোলার নাটকটা শেষ হবে, ততদ্রুত তিনি এই নরক থেকে বের হতে পারবেন। ভাবনাটা ওকে দিয়ে কাজটা দ্রুত করিয়ে নিতে চায় যেন। তাছাড়া তাঁর রোজা ভাঙার সময় সমাগত। ভেতরের ছোটো বাক্সের ডালা খুলে থমকে যান তিনি। বেশ কিছু গহনা ভেতরে। বাবার গা ঘেঁষে বসবার কারণে শাহেদ বাবার বুকের দ্রুতলয়ের ঢিপঢিপ শব্দটা টের পায়। আহাদ সাহেব আলতো করে আঙুল রাখেন গহনাগুলোর ওপর। প্রশ্নভরা চোখ তুলে তাকান বিছানায় শুয়ে থাকা সুশান্ত রায়চৌধুরীর দিকে। তাঁর প্রশ্নটা তিনি বুঝে নেন। কোমল স্বরে বলেন, হ্যাঁ এগুলো তোমার মায়েরই। অনেক কায়দা করে নিজের কাছে নিয়ে রেখেছিলাম। হয়তো এই আশায়, এসবের যে ভাগীদার একদিন তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দেব। অনেক সময় ক্ষয় করে সে দায়িত্বটা পালন করা  হলো। দেখো, ভালো করে দেখো, আরও কিছু আছে কিনা গহনার তলায়।

যেন কোনো পাজল মেলানোর খেলা চলছে..আর দু’একটা টুকরোজুড়ে দিলেই পাজলটা একটা গোটা জীবনকে সামনে এনে দাঁড় করাবে। কাহিনি কিংবা অন্যের জীবন নিয়ে আহাদ সাহেবের আপাত কোনো আগ্রহ নেই। গহনার নিচে আর কী এমন জিনিস থাকতে পারে সেটা আবিষ্কারের কৌতূহলে তিনি গহনা গুলো তুলে বড় বাক্সে আলতো হাতে রাখতে থাকেন। একদম নিচে তাকিয়ে তিনি থমকে যান। তাঁর মুখ জুড়ে সেঁটে থাকা বিরক্তির পলেস্তরা সরে গিয়ে সেখানে মিহি কোমলতা জায়গা করে নেয় দ্রুত। অনেকটা বিস্ময়ও ঝুলে থাকে। আহাদ সাহেব পরম মমতায় তুলে আনেন বাদামি হয়ে আসা একটি পুরনো  সাদা-কালো ফটো।

সতেরো আঠারো বছরের এক অপরূপা তরুণী ঘাড়টা সামান্য কাত করে দাঁড়িয়ে আছেন। পেছনে বিশাল দালানের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। আহাদ সাহেব কেমন পলকহীন চোখে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। শাহেদও বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে। মুখটা তারও খুব চেনা।

‘ছবির পেছনে তোমার মায়ের নাম লেখা আছে।’ ওদের বিহ্বলতার চটকা ভাঙে সুশান্ত রায়চৌধুরীর গমগমে গলায়।

ছবিটা উলটাতেই চোখে পড়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটা নাম – আশালতা রায়চৌধুরী!

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares