কাঞ্চনজঙ্ঘা : মঈনুল হাসান

পাহাড়ি ঢাল বেয়ে আঁকাবাঁকা বসানো পিচ রাস্তা। টিবি মনেস্ট্রির পাশ থেকে বাঁক খেয়েছে। তারপর নেমে গেছে নিচের গিরিখাতের দিকে। কোনো কোনোটি ঢেউশীর্ষের মতো আবার হয়তো গিয়ে উঠেছে কোথাও। শুধু চড়াই আর উতরাই। শৈলশহরের রাস্তার যেমন ধর্ম। পাহাড়ের খাঁজে সার সার দাঁড়িয়ে হোটেল-দোকান-বাড়ি। ঠিক দাঁড়িয়ে নয় বরং ঝুলে আছে দোলনার মতো। ওদিকে পায়রার ছোট্ট খোপের মতো হোটেলের ব্যালকনিগুলো সব রাস্তার দিকে মুখ করে ঝোলানো। এমন একটি ব্যালকনিতে ঠায় দাঁড়িয়ে সুমিত। মুগ্ধ হয়ে দেখছিল আর ভাবছিল।

সামনের রাস্তা দিয়ে লামাদের পোশাকে হেঁটে যাচ্ছে কয়েকজন কিশোর। গায়ে হলুদ কোর্তার ওপর খয়েরি আলখাল্লা। ওদের সকলের মুণ্ডিত মস্তক, খালি পা। কাঁধের একপাশে ঝোলানো চটের রঙিন ব্যাগ। দলবেঁধে কোথায় গিয়েছিল কে জানে! মুখে সবার একরকম হাসির সারল্য। সকলের চেহারা যেন এক, অভিব্যক্তি প্রায় অভিন্ন। ওদের দেখলে সুমিতের মনে আলাদা ভক্তি জাগে। গতকাল বিকেলে মনেস্ট্রিতে গিয়েও এমন মনে হয়েছিল তার। তাদের পায়ে পায়ে অদ্ভুত তাড়া। কাছের মনেস্ট্রির দিকেই যাচ্ছে হয় তো।

ভোরের আলো ঠিকঠাক না ফুটতেই ঘুম থেকে জেগেছে সুমিত। রাতে একটা খাপছাড়া ঘুম হয়েছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার। শুয়ে শুয়ে ক্লান্তি লাগছিল। তাই উঠে পড়া। ভ্রমণক্লান্তির কারণে ভেবেছিল নিñিদ্র গভীর ঘুম হবে। হয়নি। হাওয়াবদল বা ছুটিতে এলে ঘুম বা শরীরের আলসেমি কোনো বিলাসিতা নয়। ভ্রমণ যাপনেরই অংশ। তবু সুমিতের অন্যরকম লাগে। বিষণ্ন ক্লান্তির কাছে নিজেকে পূর্ণ সমর্পণ করে দিতে কোথায় যেন বাধে। শরীর সায় দিলেও মনটা হয়তো সেভাবে প্রস্তুত ছিল না। মনের কোথাও আস্তে আস্তে ধসে যাচ্ছে। ধারাবাহিক অস্বস্তির একটা গোপন ছাপ হয়তো রয়ে গেছে। সেখানে অবিরাম শুশ্রƒষা দরকার।

সুমিত আগে কখনও আসেনি। তবে মনে মনে এ শহরের জীবনযাত্রার শুদ্ধতম ছবি খোদাই করে রেখেছিল অনেকদিন ধরে। সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা কিংবা কিছু ডকুমেন্টারি আগেই দেখে রেখেছিল। তখন থেকেই মনে মনে প্রস্তুত। কল্পনা আর বাস্তবের খুব হেরফের নেই শহরটাতে। মানুষ, প্রকৃতি আর চারপাশের সবকিছু সত্যিই বড় নির্মল, পরিশুদ্ধÑ দেখতে দেখতে এমনটাই ভাবছিল সে।

আগেরদিন বিকেলে হোটেলের কাছে যখন ট্যাক্সি থামে চোখে অপ্রস্তুতভাব এনে বলেছিল, আমরা এসে গেছি?

মণিকা চুপ করে ছিল। ড্রাইভার মাথা ঝুঁকিয়ে জানায়, ইয়ে আপকা হোটেল স্যার।

বেশ অবাক আর বিরক্তি নিয়েই ট্যাক্সি থেকে নেমেছিল সুমিত। দুজনের লাগেজপত্র তাড়াহুড়ো করে টেনে ঘাড় উঁচিয়ে হোটেলের আপাদমস্তক দেখে। ড্রাইভারকে দুশো রুপি হাতে ধরিয়ে খানিকক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকে সে। নিজের কানও যেন না শোনে এমন বিড়বিড় করে বলে, সব ঠিক আছে তো? এটাই বুঝি হোটেল? এখানেই থাকতে হবে এ কদিন?

আসলে প্রথম দেখায় সুমিতের একটু মন খারাপ লেগেছিল। সরু ও ঘিঞ্জি গলিপথের মাঝে এ কোথায় এনে নামালো? আশ্চর্য, হোটেলের কোনো ফ্রন্ট ভিউ নেই। পাশ থেকে দেখা গেল পাঁচতলা একটা ভবন। সাদা ধবধবে। কার্নিশগুলো লাল। মাথায় টালির ছাদ ছাউনির মতো। সেও সিঁদুরে লাল। এদিকে নামটাও কোথাও লেখা নেই ঠিকঠাকমতো। সবমিলে দর্শন-দৃশ্যের খামতিতে ভালো লাগেনি সুমিতের। ততক্ষণে গাঢ় বিকেল নেমে গেছে। রিসিপশনের দিকে যেতে যেতে ভাবছিল, মণিকাকে সবকিছুর দায়িত্ব দিয়ে তবে কি ভুলই হলো?

ছিমছাম মাঝারি মানের হোটেল ‘দ্য পার্কলেন’। রাস্তার ঢালে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। বুকিং থেকে শুরু করে সবকিছু মণিকার ঠিক করা। ওর রুচি ও পছন্দের ওপর প্রচণ্ড বিশ্বাস আছে সুমিতের। তবু কেন জানি ঠিক মনঃপুত হয়নি। একটা খিঁচ খিঁচ ভাব অপ্রকাশ্যে রয়েই গেল। ট্রলি আর হাতব্যাগ দ্রুত রুমে ছেড়ে চোখেমুখে জলের ছিটা দিয়ে দুজন আবার লবিতে। রিসিপশনে কুঁদে চোখের চেয়ারে বসা লোকটি হোটেল ম্যানেজার। নাম অজেয় মুখিয়া। মুখটায় সর্বদা হাসি হাসি ভাব, মাথায় কড়া গোলাপি রঙের নেপালি টুপি। নতুন অভ্যাগতদের আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে হাসিমুখের চোখগুলো প্রায় অদৃশ্য। তার হাতে রুমের চাবি গছিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিল দুজনে। মুখে কারও কথা নেই। ভিনদেশে একটা অন্য শহরে নিজেদের আবিষ্কারের বদলে হঠাৎ যেন আরও অপরিচিত হয়ে গিয়েছিল দুজন।

হাঁটতে হাঁটতে সুমিত বিস্ময় নিয়ে দেখছিল সবকিছু। কত দেশ সে ঘুরেছে! কত শহর চষে বেড়িয়েছে বিরামহীন। কেন জানি এখানে আসার একটা প্রবল ইচ্ছে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল অনেকদিন। আর সেবার মণিকার বেড়িয়ে যাবার পর থেকে ইচ্ছেটায় দুটো বিশাল ডানা লেগেছিল। সুযোগ পেলে বা ভ্রমণের কথা উঠলেই সে ডানা দুটো শুধু ঝাপটাতো। শেষমেশ মণিকার কল্যাণেই বাকিটা হলো।

মণিকা শুধু চুপচাপ হাঁটছিল। ওদিকে সুমিত ভাবছে, হোটেলগুলোর অন্যরকম একটা বিশেষত্ব আছে। হাঁটতে হাঁটতে তারা মাল রোডের চড়াই পেরিয়ে খোলা চত্বরের কাছে। অদ্ভুত আভিজাত্য আর জৌলুস নিয়ে হোটেল-বিতান-বাড়িগুলো গাঘেঁষে দাঁড়ানো। অভিজাত কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলো খুব জাঁকজমকের নয়। তবে পরিপাটি গোছানো। পাশ্চাত্যের মনকাড়া শৈলী আর বাইরের বারান্দা ঝেঁপে অজস্র ফুলের সম্ভার চোখে পড়ার মতো। এগুলো ওদের মুখাবরণ। মুখ বা মুখোশ যা-ই বলি না কেন দারুণ প্রশান্তি দেয় মনে। ততক্ষণে পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমে গেছে। এক এক করে জ্বলে উঠছিল সাঁঝবাতির আলো। আসলে বাইরে বেরিয়ে গুমোট ভাবটা কাটানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল সুমিত। হয়তো মণিকাও যুদ্ধ করে যাচ্ছিল মনে-প্রাণে। ওর ভাবলেশহীন চেহারা অকপটে সে কথা বলছে কি? মলের একটা বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে থেকে মনের জড়তা ভাঙছিল দুজনে। সুমিত সহজ হতে চেয়েও মণিকার মুখজুড়ে নামা অকারণ অপরিচিত পর্দা লেপ্টে থেকেছিল রাত পর্যন্ত।

বারান্দার রেলিঙে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে একমনে ভেবে যাচ্ছিল সুমিত। শহরটি তো মণিকার অল্প-স্বল্প চেনা। আগেও একবার এসেছিল। কয়েকদিন কাটিয়ে গিয়েছিল নিজের মতো করে। শহরের আলো-জল-হাওয়ায় ওর নিঃশ্বাস লুকিয়ে আছে। রাস্তার আঁকাবাঁকা ঢালে, পাথুরে ইট-খোয়ায় ওর জোড়া পদচিহ্ন আঁকা আছে। ওর স্পর্শ, শরীরের গন্ধও মিশে আছে কোথাও কোথাও। এইসব অনুমান সুমিতকে একা করে দিচ্ছিল বারবার। মণিকার ভাবনায়ও হয়তো ভাগ বসিয়েছে সেইসব মানসিক জড়তা। তাই বুঝি সে এমন নিশ্চল, প্রাণহীন! মনে মনে সুমিত নিজেকে আবারও জিজ্ঞেস করে, সে কারণেই কি সে এমন নির্বাক, উচ্ছ্বাসহীন? সে কি ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু মেলাবার চেষ্টা করছিল? মনের দর্পণে ভেসে উঠছিল পূর্বের স্থির কোনো স্মৃতি, প্রবল কোনো অনুতাপ? তবু চুপচাপ পথ নির্দেশ করে মণিকাই এগিয়ে নিয়েছিল হোটেলের দিকে।

সবকিছু পাশ কাটিয়ে ভোরের হাওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সুমিত। যত ভাববে সম্পর্কের অনাকাক্সিক্ষত জটিল সমীকরণ তত তাকে বিধ্বস্ত করবে। ডঙ ডঙ করে ঘণ্টা বাজছে কাছের মনেস্ট্রি থেকে। গতকাল সন্ধ্যায় এমন আওয়াজ শুনে একবার ঢুঁ দিয়েছিল। ঠিকমতো দেখা হয়নি ভেতরটা। ফেরার সময় মণিকা শুধু বলেছিল, জানো, এটা শতাব্দীপ্রাচীন তাশি দার্গেলিং মনেস্ট্রি। আমাদের বারান্দা থেকেই দেখা যায় এর চূড়া। সময় সুযোগ পেলে আবার না হয় ঢুঁ দেবো আমরা।

ঘণ্টার আওয়াজ শুনে সুমিতেরও ইচ্ছে করছে ওদিকে ছুটে যেতে। সকালের প্রার্থনাসভা আছে বোধহয়। মণিকা ঘুমাচ্ছে। ওকে রেখে সুমিত একবার যাবে নাকি? বিক্ষিপ্ত মনটা শান্ত ও শীতল করার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে! ঘণ্টাটা আবারও বেজে উঠল ডঙ-ডঙ-ডঙ। আরও তীব্র করে বেজে উঠলো। একটানা অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ।

সুমিতের ভাবনা থামিয়ে দিয়ে মুহূর্তেই একদল পায়রার অস্থির পাখা ঝাপটানির শব্দ। রাস্তার ওধারের বিমলা লজের ওপর দিয়ে ঝটপট উড়ে গেল। ভোরের মেঘ ঘন কুয়াশা কেটে কাছের কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে। তারপর সাদা গা বেয়ে আকাশের ওপারের আকাশে মিশে গেল। পায়রাগুলোর ঘূর্ণায়মান গতিবিধিতে সুমিতের চোখ। ওরা কি ফিরবে আবারও? ওদের পরিচিত ডেরায়? ওরা তো সুমিতের মতো আগন্তুক নয়।

সোনাগলা নরম রোদ উঠছে বাইরে। অথচ সুমিতের ভেতরের পৃথিবীতে কত ওলট-পালট ঘটে গেল। বাইরের পৃথিবীটাও ঘুম ভেঙে কত অচেনা হয়ে উঠল। মণিকা তখনও ওঠেনি। ওর ঘুম কি আজ ভাঙবে না? সুমিতের মন বড় অনুসন্ধিৎসু। ওদিকে ঘণ্টার আওয়াজ থেমে আসে। তবে তা সুমিতের বুকের ভেতর এখনও বাজছে। বেজেই চলেছে।

দুই.

সুমিত ও মণিকা ছুটি কাটাতে এসেছে দার্জিলিং। একসময়কার ল্যাপচা ট্রাইবের ছোট্ট গ্রাম এখন অগণ্য পর্যটকের পদভারে মুখরিত। কত চেহারা, কত রঙ-দৈর্ঘ্যরে মানুষের বিরামহীন ছোটাছুটি। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে খেলনার মতো ছোট বাড়ি, টয় ট্রেনের বিহ্বল আওয়াজ… ঝিক-ঝিক, ঝিক-ঝিক, পোঁওওও…। পাহাড়ি প্রশান্তির সাথে নিবিড় গাঁটছড়া বেঁধেছে সহজ-সরল মানুষগুলোর দিনযাপনের পরিমিতি। আদি অকৃত্রিম শান্তির খোঁজে সকলের তাই আগমন এখানে। দেরিতে হলেও নিজেদের মতো করে আনন্দে অবগাহনের একটা সুযোগ তবু পাওয়া গেল।

হাওয়া বদলের খুব তোড়জোড় ছিল না। তবু বদলের চেষ্টা করতে হলো। হঠাৎ করে মণিকারই হয়ে উঠল খুব বেশি করে। বিশ্বাসের বিষ শ্বাসে একটু একটু করে হাঁপিয়ে উঠেছিল দুজনের জীবন। বাইরে থেকে মনে হবে সবকিছু ঠিকঠাক। তবু রোদন আসে না জানিয়ে। অকারণ ঝড়ের মতো অপ্রত্যাশিত তার গতিবিধি। তাতেই ছিন্ন হতে চায় সম্পর্কের সুতো।

বছরখানেক আগে একদিন রাতের বেলা মণিকার খুব কাছে মাথা রেখে শুয়ে ছিল সুমিত। ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগে বুকে মুখ ঘষে আদর করছিল অনেকক্ষণ। তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, চল, দেশের বাইরে এবার কোথাও বেড়িয়ে আসি। খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে নিয়ে দার্জিলিং যাবার। আমার ভীষণ পছন্দের জায়গা।

সুমিতের মাথায় বিলি কেটে আহ্লাদের সুরে মণিকা বলেছিল, উঁহু… সমুদ্র দেখব। আমার যে খুব ইচ্ছে…

সমুদ্রে তো গেলাম গতবার… তোমার মনে নেই? সটান উঠে বসে সুমিত।

না, দেশের ভেতরে নয়। বাইরে কোথাও। এই ধর পাতায়া বা লঙ্কাবি। বালিও যাওয়া যায়! আবেগমথিত কণ্ঠে মণিকার আবদার।

কিন্তু, আমি যে চাই পাহাড়ের দেশে কোনো মেঘমুলুকে যেতে। গোঁ ধরে সুমিত আবার বলে, সুবির নন্দীর গানটা শোননি? পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্না বলো… অমন কান্না সৃষ্টিকারী বস্তু না দেখলে কি চলে!

মণিকা মন দিয়ে শোনে। রাতদুপুরে সুমিত তার মতো বলে যায়।

দেখো, সমুদ্রের কান্না একসময় বাষ্পরুদ্ধ হয়। বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে। বিশাল পর্বতের কান্না আমরা কিন্তু সেভাবে দেখি না। জমাট হিম হয়ে ওরা মেঘের মধ্যে মুখ লুকিয়ে থাকে। বেদনার প্রকাণ্ড ভার বহন করে… কাঞ্চনজঙ্ঘা… হিমালয়…

আমি অতকিছু ভাবিনি। মণিকার আলসেমিভরা উত্তর।

হুম, তাই। সুর করে সুমিত গায়… ওই পাহাড়টা বোবা বলে কিছু বলে না। তারপর মণিকাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ঠিক আমার মতো…বুঝলে?

আহ, ছাড়ো এখন… রাতদুপুরে কী হেঁয়ালি করছ! স্পষ্ট বিরক্তি মণিকার চোখে-মুখে, শরীরের ভাষায়।

ব্যস, কথা অতটুকুই। পাহাড়ের দেশ। যদি সুযোগ হয় কখনও…

দুজন দুজনকে ঠিকঠাকমতো জানা-বোঝার সময় গড়িয়েছে অনেকদিন। তবু কত ঝড়-ঝঞ্ঝা, মান-অভিমানের পাহাড়। স্মৃতি-বিস্মৃতি ডিঙিয়ে বাধা পেরোনোর চেষ্টা। সুমিত তবু এগোতে চায় বারবার। হয়তো মণিকাও। মাঝে মাঝে অচেনা কিছু মানুষ আর অযাচিত সম্পর্কের সূত্রে হোঁচট খায় দৈনিক যাপনকাল। সম্পর্কের উত্থান-পতন, অবিরত টানাপড়েনের মধ্যেই তো ভালোবাসার অমূল্য বীজমন্ত্র। দেহ ও মনের গহিনে ডুবসাঁতার দিয়ে একে অপরকে আবিষ্কারের যে নেশা সেটাই তো আসল। তবু জানা হয় কি? একসাথে সাত বছরের সংসার। সবকিছু জানা হয়ে উঠেছে কি? উপলব্ধি তো আরও অনেক দূরের ব্যাপার, কখনও দুরূহ। ভাবনাগুলোকে এভাবে ওলট-পালট করে নতুন করে সাজাতে চায় সুমিত।

বাইরে ঝকঝকে রোদ পায়চারি করছে পাহাড়ের গা বেয়ে উপত্যকার খাদে। মণিকার ওঠার অপেক্ষায় সুমিত বসে আছে বারান্দায়। অপেক্ষায় থেকে থেকে খিদেও লেগেছে বেশ। পর্দা ঠেলে উঁকি দিয়েছিল একবার। বিছানায় নেই। ওয়াশ রুম থেকে জলের আওয়াজ আসছে। এদিকে রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় চোখ জ্বালা করছে, মাথার ভেতর কী যেন ঘুরছে ভোঁ ভোঁ। আজ একটু প্রশান্তি আর পরিকল্পনামাফিক দিন শুরুর ইচ্ছে ছিল। আদৌ কি হলো তাই? পাশের একটা লজ থেকে রাতভর ধাতব গড়গড়ানির আওয়াজ দুজনের ভ্রমণক্লান্তিকে আরও উসকে দিয়েছিল। বিছানাবদল হলে এমনিতেই ঘুম আসে না সুমিতের। চোখের পাতা বারবার খুলে আলোকবিন্দুর মতো শহর দেখেছে। তাই দেখে দেখে বোধহয় শেষে চোখ লেগে এসেছিল। ওদিকে ভোরের কিছু আগে মণিকার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলে পা টিপে টিপে সুমিত বিছানা ছাড়ে।

সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আকাশপাতাল ভাবছিল মণিকাকে নিয়ে। ইভানের সাথে ওর পরিচয়টা কখন থেকে শুরু কে জানে? বলতে গেলে খুব আকস্মিক, একদম রহস্যমোড়া। গানের একটা অনুষ্ঠানে প্রথম পরিচয়। সুমিত তখন অফিসের কাজ নিয়ে দেশের বাইরে। আলাপের সূত্র ধরে পার্কে-বাগানে ডেটিং, একসাথে ঘোরাঘুরি, কাছাকাছি রেস্তোরাঁয় বসে কফিপান। মাস ছয়েকের গভীর সম্পর্ক। এমনকি শহরের চেনা পরিবেশের বাইরে গিয়ে দূরে কোথাও একান্তে হারিয়ে যাওয়ারও সুযোগ নিয়েছিল তারা। সুমিত এসবের কিছুই বুঝতে পারেনি। মণিকার সতর্ক সাবধানতা কিছুই জানতে দেয়নি তাকে।

মণিকা পুরো বিষয়টি প্রথমে এড়িয়ে গিয়েছিল কৌশলে। এ নিয়ে চাপা অস্বস্তি। সন্দেহের তির। অশান্তির পর্বগুলো উল্টো পাল্টা করে চলছিল মণিকার দিক থেকেই। খুব সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি সুমিত। এত বড় ঘটনা সে কখনও ভুলতে পারবে কিনা কে জানে!

ঘটনার পরম্পরায় একদিন অফিস টুরের কথা বলেছিল মণিকা। একাই যাবে নাকি দার্জিলিং। সুমিতের প্রাণপাত হবার জোগাড়। ওর এতদিনের ইচ্ছে সব ভেস্তে গেল। যা নিয়ে সে স্বপ্ন দেখেছিল এতদিন অথচ তাকে রেখেই কিনা একা ঘুরতে যাবে সেখানে? সুমিত হলে কখনও এমনটা ভাবতে পারত না। দিনের পর দিন এ নিয়ে মনোমালিন্য বেড়েই চলছিল। অফিস থেকে ফিরে মণিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ নিয়ে হাজারো প্রশ্ন সুমিতের।

শেষ পর্যন্ত কী ডিসাইড করলে?

কোন বিষয়ে?

তুমি কি সত্যি একাই যাবে? মানা করে দিলে হয় না! প্রথমবার দার্জিলিং যাচ্ছ অথচ আমাকে ছাড়া।

আদিখ্যেতা করো না। একা হবে কেন? অফিসের কাজ। পুরো টিম থাকবে সাথে।

আমার ইচ্ছেগাছে এভাবে জল ঢেলে দিলে! একসাথে ওখানে বেড়াতে যাবÑ আমাদের দুজনের কতদিনের প্ল্যান। আর তুমি কিনা…

তাতে কী? আবার যাওয়া যাবে। শহর তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। আমিও নিশ্চয়ই…

থাক থাক, হয়েছে। সুমিত হতোদ্যম হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি হালকা করতে ফোড়ন কাটে। অমন রোমান্টিক জায়গায় গিয়ে শেষে কোনো প্রেম ট্রেম…

কী আজগুবি কথা বলছ? স্যাডিস্ট একটা।

তোমার টিমে সুদর্শন কেউ নেই তো? যাকে কিনা অনায়াসে…

ডোন্ট বি ইনকুইজিটিভ। মণিকা অকারণেই খেপে ওঠে।

কেন? এতে দোষ কোথায়? চোখ বড় করে সুমিতের প্রশ্ন।

লিমিট ক্রস করা আমার পছন্দ নয়।

সুমিত নয়, মণিকাই শেষে লিমিট ক্রস করেছিল। সে কথা মনে করে বোকার মতো খুব হাসছে সুমিত। ওর সামনে আজ কাঞ্চনজঙ্ঘা দাঁড়িয়ে। অচল ওই পর্বতটার কাছে অসহায়ের মতো হেসে হেসে আরজি জানালো, জানো, আমার মনের দেবালয় ছাই হয়ে গেছে।

প্রায় মাস তিনেক পরে জানাজানি হলো পুরো ব্যাপারটা। আসলে অফিসের প্রোগ্রাম ক্যানসেলড হয়েছিল আগেই। হোটেলে যেহেতু বুকিং দেওয়া ছিল সে সুযোগটাই লুফে নিয়েছিল মণিকা আর ইভান। ইভানই সব ঠিকঠাক করে রেখেছিল দুজনার জন্যে। উঠেছিল মাল রোডের কাছে রাজকীয় এক হোটেলে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অফিসের কাজের ছুতোয় দুজন দুজনকে চিনেছে, জেনেছে, সময়ও দিয়েছে একান্তে।

ঢাকায় ফেরার পর বিষয়টি নিয়ে মণিকা একদম চুপচাপ। মুখে কোনো টুঁ শব্দটি নেই। একদিন হঠাৎ ইভানের কল। তাও আবার সুমিতের কাছে। সবকিছু জানাজানি। অদৃশ্য টাগ অব ওয়ারের সূত্রপাত। সুমিত মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইলেও আপাত দৃশ্যমানতা যেন চারপাশজুড়ে। মণিকার ঘর ও মনের অন্দরজুড়ে অন্য উপস্থিতি। যন্ত্রণাকাতর একেকটা দিন দুঃস্বপ্নের মতো জেঁকে বসেছিল সুমিতের জীবনে।

এমন দুঃসাহস দেখানোর পর সুমিতের দিক থেকে প্রতিক্রিয়া ওঠাটাই স্বাভাবিক। সে তেমন কিছু বলেনি। দুজনের মাঝখানে অনুপস্থিত এক প্রতিপক্ষকে বর্তমান রেখে দিন কাটিয়ে গেছে। সময়ের সমীকরণ মিলিয়েছে। জীবনের পরিসীমাকে ছেড়ে দিয়েছে ভবিতব্যের কাছে। অবশেষে ছয় মাসের একটা শীতল বিরতিশেষে মণিকা আবার ফিরেও এলো। কিন্তু সে ফিরে আসার প্রাবল্য কতখানি? এলেও তার স্থায়িত্ব কতটুকু? নাকি বারবার পিছু ফিরে দেখা? এসব ভাবলে সুমিতের মাথা তালগোল পাকিয়ে যায়। চোখের সামনে দাঁড়ানো ওই যে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সে আস্ত পাহাড়খানা বুকে এসে বসবাস শুরু করে।

আজ এতদিন বাদে মণিকার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে সুমিত নাকি নিজেকে নিজের কাছে? নাকি দুজন মিলে তৃতীয় কোনো অদৃশ্য শত্রুর ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে? কোন সত্যকে বেছে নেবে? আজকাল তাই সুমিতের সাথে মণিকার মানসিক দূরত্ব ঘটে গেছে অনেক। সে সূত্র ধরে স্পর্শের দূরত্বও অনেকখানি। রাস্তার ওধারে বিমলা লজ। তার ওপর ডানা ঝাপ্টাচ্ছে অগুনতি পায়রা। তারও ওপর দিয়ে মেঘের গুঁড়ো ভেসে যাচ্ছিল উপত্যকার বৃক্ষ-প্রান্তরজুড়ে। কুয়াশাভেজা কয়েকটা পায়রা জবুথবু বসে ছিল ছাদের রেলিঙে। ওদিকে তাকিয়ে আরও উন্মনা হয় সুমিত।

বেলা গড়িয়ে চলে। রাস্তা দিয়ে মানুষের ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। নতুন জায়গায় বেড়াতে এসে নতুনভাবে দিন শুরুর যে পরিকল্পনা ছিল সুমিত তা এগিয়ে নেবেই। কথা আছে আজ ‘টাইগার পয়েন্ট’ গিয়ে প্রথমে কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন হবে। তারপর বাকি সব। আগেরদিন রাতে এমনটাই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। অবশ্য সব নির্ভর করবে কুয়াশার মেজাজের ওপর। মণিকার মর্জির ওপর।

রাতে হোটেলে ফিরে খুব বিষণ্ন থেকেছিল মণিকা। পরদিনের পরিকল্পনা জানাতেই অনাগ্রহ নিয়ে দু একটা কথা বলেছিল শুধু। জবাব শুনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিল সুমিত। চাপা গলায় একবার বলেছিল, শোনো তুমি না হয় একা একা ঘুরে আসো। আমার অনেক কেনাকাটা আছে। সেগুলো বরং সেরে নিই। সময়ও বেঁচে যাবে। আমি তো আগেই দেখেছি। নতুন করে আর দেখার কী আছে?

ওমা, সে কী? আমি তো আর আগে আসিনি। হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন?

ঠিক তা নয়, বলে কথা আর বাড়ায়নি মণিকা।

উপত্যকার খোলা প্রান্তর থেকে ফুরফুরে শীতল হাওয়া ঢুকছে বারান্দা হয়ে ঘরের ভেতরে। সুমিতের শরীরটা চনমনে হয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়ানো মণিকার চুল উড়ছে তিরতির করে। একমনে তৈরি হচ্ছে সে। খুব সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে। গোলাপি রঙের। সুমিত আগে দেখেনি। হয়তো নিজে কিনেছে কিংবা উপহার পাওয়া। তবু আশ্চর্য সুন্দর লাগছে তাকিয়ে থাকতে। সুমিতের দিকে চোখ পড়তেই অবাক তাকিয়ে বলে, ওমা, তুমি রেডি হওনি? আমি বোধহয় দেরি করে ফেললাম। শোনো, তুমি রাতের কথায় কিছু মনে করো না। আমি কিছু মিন করে বলিনি কথাগুলো। আজ কুয়াশা দেখেছ বাইরে? আমি নিশ্চিত কুয়াশার রহস্য ভেদ করে তোমার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেবে না। ‘টাইগার পয়েন্ট’-এ গিয়েও খুব একটা লাভ হবে না। আমাদের বারান্দা থেকেই তো দেখতে পাবার কথা।

সুমিত মাথা ঝাঁকিয়ে জানায়, অমন বিশালত্ব নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে, সকালে একবার তার মুখদর্শন করেছি।

দুজনের কথোপকথন বেশিদূর এগোয় না। হালকা অস্বস্তির একটা বীজ প্রোথিত হয় সুমিতের বুকের গভীরে। ভেজা নরম মাটির আশ্বাস পেয়ে একটু একটু শেকড়-বাকড়, নরম শাখা-প্রশাখা, পাতার দুলুনি। তারপর?

হিমবেদনার সফেদ আবরণে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার শরীরটা যদি একবার খুঁড়ে দেখা যেত! ভেতরে ভেতরে নিশ্চয়ই কী গভীর ক্ষতই না জমা করে রেখেছে! সুমিত তো ওই কাঞ্চনজঙ্ঘারই প্রতিরূপ। একদিন হয়তো আবিষ্কার করা যাবে কোনো ক্ষত দগদগে হয়ে উঠলো কিনা! সুমিত এবার নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে। ওর অনুভূতিশূন্য মুখের দিকে তাকিয়ে মণিকার আবারও মনে হলো, রাতে ওভাবে বলা ঠিক হয়নি। অন্তসারশূন্য অনুভূতির দোদুল্যমানতা নিয়ে রুম বন্ধ করে হেঁটে ওপরে উঠে যায় দুজন।

চারদিকে এক অপরিসীম গোলকধাঁধা। মনের গুপ্ত রহস্যের মতো। দার্জিলিং বেড়াতে এসে তারা দুজন আরও অপরিচিত হয়ে উঠলো যেন। মণিকা নিজেও কোনো অজানা অপরাধবোধে ভুগছে কিনা সুমিত আবিষ্কার করতে পারলো না। সেও যে কেন এত তোড়জোড় করে ছুটে এলো এখানে কে জানে? হৃদয়ের কথা উৎখননে তাদের বড় ক্লান্তিবোধ হয়, অচেনা দ্বিধা জাগে। স্পর্শের দূরত্বের বাইরে অকারণ কুণ্ঠা রেখে তারা দিনের পরিকল্পনায় এগিয়ে যায়।

তিন.

সকাল থেকে জমাট মেঘের মতো ভারী কুয়াশা আটকে আছে শহরের শরীরে-বুকে-চিবুকে। সাদা সাদা মেঘের রুমাল ঢেকে দিয়েছে অদূরের অচল পাহাড়গুলো। দূরের দিগন্ত আর নিচে পাহাড়ের উপত্যকা সবখানেই ঘোলাটে মেঘের ভেসে বেড়ানো। এই তো ছিল দল বেঁধে, এখন আবার নেই। এর মধ্যেই সকালের রোদ পড়ে কেমন জ্বলজ্বল করে উঠেছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষ। সুমিত শিহরিত হয় দেখে।

‘টাইগার পয়েন্ট’ এসে তারা পুরোপুরি হতাশ। কেউ কোনোদিন বলবে না এদিক থেকে বিশালদর্শন সৌম্যকান্তি পর্বতের কখনও দেখা মেলে। এমনটাই মেঘের রাজত্ব দৃষ্টিসীমানার সবদিকে। রঙিন পতাকার ঝালর উড়ছে পতপত করে। ঘোলাটে চারপাশে একমাত্র চোখের শান্তি ওটাই। কিছুক্ষণ কাটিয়ে এবার তারা ছুটল পিস প্যাগোডার দিকে। অনন্ত শান্তির খোঁজে।

সুমিত জানে, কুয়াশা গভীর রহস্য এনে দেয়, মায়া বুনে দেয়, আড়াল করে বেদনা। সে অবগুণ্ঠন সাহস বাড়িয়ে দেয় প্রবল। আহা, কাঞ্চনজঙ্ঘা! সেও যে তার ব্যথা নিয়ে নিরেট দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। কিছু বলার ভাষা নেই, বোবা পাথরের ফাঁকে ফাঁকে শুধু নিঃশব্দ আর্তনাদ। বেদনার মুখরতা। একসময় বেদনা গলে আসে ঝর্না হয়ে। বয়ে যায় নিঃশব্দে অচেনা দুঃখবোধ নিয়ে। কখনও আবার কুয়াশা তার বেদনা টেনে আনে। ভাসিয়ে নেয় এখান থেকে ওখানে। সে ভাষা বোঝার অনুভূতি বা সামর্থ্য সবার মধ্যে থাকে না। মণিকার মধ্যেও নেই। সুমিত তো তার কাছে অমন অচল বাস্তবতা হয়েই থেকে গেছে এতদিন। এর বেশি কিছু নয়।

মেঘ না থাকলে বারান্দা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার আবক্ষচূড়ার খানিকটা দেখা যায় স্পষ্ট। কিন্তু আক্ষেপ থেকে যায়। তবু ওর ইচ্ছেপূরণের কথা ভেবে আজ সকালে একবার উঁকি দিয়েছিল প্রিয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। দেখেছিল পাহাড়ের বুকে বিষাদের মতো আটকে থাকা ভাসমান মেঘদল। এসব দেখে প্রশান্তি লাগে ভেতরে। নিজেকে অন্তত কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিরূপ মনে হয়। ওর বিষাদের কাছাকাছি ভাবা যায়। আজ ভোরের পর থেকে কুয়াশা যে হিমবেদনা তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিল, তার কিছুটা ভাগ সুমিতকে দিয়ে গেছে। আর বাকি কিছুটা তার কাছ থেকে নিয়ে আবার ফিরে গেছে ওখানে। ভেবে হঠাৎ কেমন হালকা লাগছে নিজেকে। মনটাও ঝরঝরে। দূরের সুবিশাল পর্বতটি নিজেও মনে হয় তার কষ্ট কিছুটা ঢেলে দিয়ে হালকা হলো আজ। পিস প্যাগোডার প্রশস্ত চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে আত্মঅহংকারের অন্যরকম সুখানুভূতি কাজ করছিল সুমিতের মনে। নিজের ভেতরে জমা হওয়া হাজারো প্রশ্ন বোধহয় উত্তর খুঁজে পেয়েছিল।

অদেখা এক শহরের গায়ে তাড়িতবেদনা বুকে চেপে এ হিমশৈল তার সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধি নিয়ে অপেক্ষা করে ছিল এতদিন সুমিতের জন্য। ওটাও তো নিরেট বেদনার ভার নিজেই বহন করে চলেছে একা। কত অগণিত পদভারÑ তবু টলে না, বলে না, আশ্চর্যরকম নিশ্চুপ। সুমিত আজ শিক্ষা নিয়েছে সেখান থেকে। এতেই তার গৌরব। মণিকা কি এমন হতে পারতো না? সবটুকু ব্যথার ভার ওই কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো একাই ধারণ করে উঠতে পারত না? সে ভার কি এতটাই দুর্বহ? আর যদি তা অসম্ভব হয়েই ওঠে, তবে অন্তত ওই বিশাল পাহাড়ের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সমস্ত ক্লেদ-গ্লানি-দীর্ঘশ্বাস উগরে দিতে পারত। যাপনের একঘেঁয়ে ক্লান্তি রেখে দিতে পারত ওর পায়ের কাছে। সে সুযোগটাও হাতছাড়া করল আজ। মনে মনে কী দ্বিধা বা শঙ্কা বহন করে চলেছে কে জানে?

দুপুরের আহারশেষে দুজনে ফেরে হোটেলে। সুমিতের শরীরটা ভালো লাগছিল না। তাই তাড়াতাড়ি ফেরা। আরও যেহেতু দুদিন থাকা হবে একদিন একবেলা নিজের মতো কাটালে খুব ক্ষতি হবে না। ওদিকে সামান্য বিশ্রামশেষে মণিকা আবারও তৈরি হচ্ছে। এখনই বের হবে মাল রোডের দিকে। কেনাকাটার ঝামেলা আজই শেষ করতে চাইছে। ফর্দ ধরে সকলের বায়না মেটাবে ও।

অনেকদিন পর সুমিত বুঝল, সম্পর্ক আর সম্পর্কহীনতায় পার্থক্য সামান্যই। স্মৃতির পুঁজি বাড়িয়ে লাভ নেই। ফিরে যেতে হবে আস্ত এক পাহাড় বুকে নিয়ে। গভীর এক রহস্য সাথে নিয়ে। তাই বিকেলটা শুধু ভাববে নিজের মতো। আজ অনেকদিন পর এমনটাই চায় সুমিত। একটু মুক্ত জল-হাওয়ায় প্রাণভরে বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নেওয়ার দাবিটুকু সে করতেই পারে। সেখানে আর কেউ থাকবে না। না মণিকা, না অন্য কেউ। হোটেলবারান্দায় দাঁড়িয়ে সুমিত ভাবছে আর দূর থেকে বলছে, আমার সবটুকু ভার তোমার কাছে রেখে গেলাম, তুমিই বহন করো হে প্রিয় কাঞ্চন… আমার কাঞ্চনজঙ্ঘা।

বিকেলের দিকে মনেস্ট্রির ঘণ্টাগুলো আবারও বেজে উঠেছে একসাথে। ডঙ, ডঙ, ডঙ…

মনের অবিমিশ্র অনুভূতি সাথে নিয়ে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সুমিত। অদ্ভুত উদ্দেশ্যহীনতা পেয়ে বসেছে হঠাৎ। বিকেল বেড়িয়ে একা একা সন্ধ্যা কাটানো তার মনের ভেতর উঁকি দিয়ে যায়। এমন অস্থির সময়ে চিরচেনা পরিবেশও পাল্টে যায় আমূল। যা কখনও ঘটেনি, যা কখনও পাওয়া হয়ে ওঠেনি সেটাও অনধিকারে আবিষ্কৃত হয়ে ওঠে।

শহরের অচেনা গলিপথ ধরে সুমিত হাঁটছে… কেবল হাঁটছে। বিকেল উজিয়ে সন্ধ্যার কাছে যায়, সন্ধ্যা থেকে রাত। মায়াছড়ানো রাতের কুহকে ভেসে ওঠে অচেনা এক মানুষের শরীর। ভালোবাসার বিচিত্র গতিপথে কিছুটা উত্তাপ তবু ছড়ানো-জমানো। সে উত্তাপে সীমাহীন আনুগত্য সুমিতের।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares