বিশ হাজার টাকার হাসি : সাঈদ আজাদ

রাজিয়ারা চলে যাচ্ছে আজ। দেখে, দীর্ঘ একটা শ^াস ফেলে সাফিয়া। গতকাল গেল মনজুরারা। তারও আগের দিন গেল আলেয়া আর হাজেরারা। একে একে সবাই বস্তি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। নিজেদের কথা ভেবে একটু আনমনা হয় সে। জয়নাল কবে যে কাজে যেতে পারবে ঠিক নেই। এদিকে দু-বাসার কাজ চলে গেল। সামনের দিনে কী আছে খোদাই জানে। 

রাস্তার ধারে ফুটপাতে বসে আছে সাফিয়া। আগে এই ফুটপাথ ধরে কত কত লোক যেত। এখন লোকজনের চলাচল নেই বললেই হয়। করোনার ভয়ে লোকজন এখন বাড়ি-ঘর থেকে বেরই হয় না বলতে গেলে। শূন্য পথটা একবার দেখে চোখ ফিরায় সে।

        রাজিয়াদের টুকটাক যা মালপত্র ছিল, সব একটা ভ্যানে উঠানো হয়েছে। রাজিয়ার স্বামী আলাউদ্দিন দু-ছেলেকে নিয়ে ভ্যানের এক কোনায় উঠে বসেছে। রাজিয়া এখনও ওঠেনি ভ্যানে। সে এই ঘর অই ঘর ঘুরছে। বোধহয় বিদায়ই নিচ্ছে সবার কাছ থেকে। এক সময় সে নিজেদের ফেলে যাওয়া থাকার ঘরটার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। ঘর ঠিক না, ওটাকে ঝুপড়ি বলাই ভালো। এখানে যে ঘরগুলোতে তারা থাকে ওগুলোকে ঠিক ঘর বলা যায় না। উপরে বাঁশ আর পলিথিনের, বড়জোর টিনের ছাউনি। উঁচু হয়ে দাঁড়ালে মাথায় ঠেকে সেই চাল। ছোট দরজা দিয়ে নিচু হয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। কোনো জানালা নেই। বেড়ার অপর পাড়েই আরেকজনের সংসার। অই সংসারে নিঃশ^াস ফেললেও শোনা যায়।  

 স্বামী ডাকছে, কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই রাজিয়ার। কিছুক্ষণ ফেলে যাওয়া ঝুপড়ির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে  সে সাফিয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ পানিতে চকচক করছে।

রাজিয়া পাশে বসে সাফিয়ার হাত ধরে বলে, বইনগোÑ আর থাকতে পারলাম না। যাই। বিদায় দেও। কাইজ্যা ঝগড়া লাগছে কারণে অকারণে। কত মন্দ কতা কইছি তোমারে। মনের মধ্যে কষ্ট রাইখ্যে না। মাফ কইরা দিও আমারে।

সাফিয়ার চোখও জলে ভরে ওঠে। ঠিক যে, রাজিয়াদের সাথে খুব একটা সদ্ভাব ছিল না। বলতে কী, দুয়েকবার পানি সংগ্রহ করা নিয়ে ঝগড়াই বরং হয়েছে। কিন্তু আজ সাফিয়ার বুক টনটন করে। প্রিয় না হলেও চোখের দেখায় মায়া একটা ঠিকই জন্মায় মানুষের ওপর। সে বলে, মন্দ কতা আমিও কম কই নাই তোমারে। যাওয়ার সময় সেইসব কতা কী মনে থাকে বইন? তোমরা আইজ যাইতাছ, দুই দিন পরে হয়তো আমগও যাইতে অইব। তোমার ভাইয়ের রোজগার তো পুরাই বন্ধ। তার উপ্রে পায়ে কী অইল। জমানো কিছু টাকা আছিলো, সেসব তার চিকিৎসায় শেষ হইছে। আমারও  রোজগার কমছে।

হগো বইন। বুঝিতো সবই। রোজগার নাই বইল্যাইতো গেরামে ফিরা যাইতাছি। কী এক গজব যে দিলো আল্লায়! যাইগো বইন। দেরি হইয়া যাইতাছে। সাবধানে থাইক্যে। আর মুখোশ ছাড়া চইল্যে না। নিজের মুখোশ ঠিক করতে করতে রাজিয়া ভ্যানের দিকে এগোয়।

রাজিয়া চলে গেলে সাফিয়া ফের একটা দীর্ঘশ^াস ফেলে। তাদেরও হয়তো শীঘ্রই/এই বস্তি ছাড়তে হবে। কিন্তু গ্রামে গিয়ে থাকবে কোথায়? পেটের ভাত জুটবে কী করে? তাদের দুজনের শিকড়ই যে গ্রাম থেকে উপড়ে গেছে। গ্রাম ছেড়ে আসার সময় যে দুঃখ ছিল মনে, আজ এই বস্তি ছাড়ার কথা ভাবতেই তেমন দুঃখ মনে তোলপাড় করছে।

 তিনটা বাসার দুটো বাসাতেই কাজে যেতে না করে দিয়েছে। এক বাসার লোকেরা নিজেরাই গ্রামে চলে গেছে। বাকি যে বাসাটা আছে, সে বাসার কাজও বোধহয় বেশি দিন করা যাবে না। অই বাসার আপার স্কুল বন্ধ। উনি ঘরের কাজ নিজেই করতে শুরু করেছেন। কথায় কথায় গত পরশু সাফিয়াকে উনি বলেছেন, বাসার কাজ নিজের হাতে করলে কেমন শান্তি শান্তি লাগে। শরীরটাও স্লিম থাকে। তোমরা এই বাসা অই বাসা দৌড়াদৌড়ি করে সারা দিন কাজ করো, সেজন্যই তোমাদের শরীর অমন স্লিম থাকে। স্লিম মানে যে চিকন সেটা পরে আন্দাজে বুঝেছে সে।

নূপুর সেজেগুঁজে বের হয়েছে। সকালবেলাতেই আজ কই যাচ্ছে কে জানে। সাফিয়া মেয়েটাকে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নেয়। তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে নূপুর। সাফিয়া বিরক্তি নিয়ে তাকায়। মেয়েটা ভালো না। বস্তির সবাই জানে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেজেগুঁজে বের হয়। দিনভর পড়ে পড়ে ঘুমায়। আজ আগেভাগেই বের হয়েছে। এখন মোটে দশটা সাড়ে দশটা বাজে। কী মতলবে আবার তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে কে জানে! মাসখানেক আগে কী বাজে প্রস্তাবটা দিলো তাকে মাগি। সাফিয়াকে নাকি কোন বদলোকের খুব পছন্দ হয়েছে, রাতে গেলে ভালো টাকা দিবে। তিন বাসার কাজের মধ্যে দু-বাসার কাজই চলে গেছে। স্বামী আর কোলের মেয়েটাকে নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তাই বলে সেও নূপুরের মতো শরীর বেচবে? মাগি নিজের মতোই ভাবে সবাইকে। লজ্জা শরম বলতে কিছু নেই। ঢং করে আবার মুখ ঢেকেছে মুখোশে। তর বেশি টাকার ওপর আমি মুতি। সাফিয়া মনে মনে বলে।

নূপুর আচমকা রাস্তার ওপর, সাফিয়ার পায়ের কাছে বসে পড়ে বলেÑ ভাবি কয়টা টেকা ধার দিতে পারবেন? গতকাইল সারাদিন কিছু খাই নাই। টাকা পাইলে কিছু একটা কিন্যা খাইতাম। পঞ্চাশ একশ হইলেও অইব।

মেয়েটা কথা বলছে ম্লান সুরেই। অবাক হয় সাফিয়া। এমন তো হওয়ার কথা না। বরং ঠেকলে সবাই নূপুরের কাছ থেকেই টাকা নেয়। সবাই জানে নূপুরের হাতে কাঁচা পয়সা থাকে। বলতে কী, সে নিজেও ক’দিন ধরে ভাবছিল, নূপুরের কাছে টাকা ধার চাইবে। সংকোচের কারণেই চাওয়া হয়নি।

আশ্চর্য হইলেন ভাবি? টেকা ধার চাওয়াতে? কত দিন ধইরা আমার রোজগার নাই আপনি তো জানেন না। জমানো টেকা সব শেষ। করোনার ভয়ে কেউ কাছেই ঘেষে না। রিকশাওয়ালারা পর্যন্ত ভয় পায়। রেট কমাইয়া কই, তাও কাছে ঘেঁষে না।  

সাফিয়া অবাক হয়ে তাকিয়েই থাকে নূপুরের দিকে। কোনো কথা বলে না।

আমারে আপনে ঘিন্না করেন, না ভাবি?

সাফিয়া ইতস্তত করে বলে, না ঠিক ঘিন্না করি না। তই তোমারে আমি পছন্দও করি না।

নূপুর দীর্ঘ একটা শ^াস ফেলে বলে, আমি নিজেই আমারে পছন্দ করি না। আপনে পছন্দ করবেন কী!

সাফিয়া অবাক স্বরে বলে, নিজেরে কি কেউ অপছন্দ করতে পারে? আর তুমি দেখতে কত সুন্দর। আয়নার সামনে দাঁড়াইলেই তো মন ভালা অইয়্যা যাওয়ার কথা।

সাইজ্যাগুইজ্যা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখনই আমার নিজেরে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে। নিজের লাইগ্যাতো আর সাজি না ভাবি। সাজি আরেকজনের মন জোগাইতে। আমি যাই ভাবি। এক বেডায় কইছিল দুপুরের দিকে বাসায় যাইতে। গেলে কিছু টাকা পাইতে পারি।

হঠাৎ বৃষ্টিটা শুরু হয়। সকাল থেকে বন্ধ ছিল। আবার পড়তে শুরু করেছে। তিন দিন ধরে বড় কষ্ট দিচ্ছে মরার বৃষ্টিটা। মালিবাগ থেকে সবুজবাগ রাস্তা বড় কম নয়। তাও বাসাটা গলির শেষ মাথায়। বিকালের দিকেও বৃষ্টি হলে ভিজে ভিজেই যেতে হবে। আবার না জ¦রজারি হয়। দুই বাসার কাজ গেছে। যা-ও একটা বাসার কাজ আছে, জ¦র হলে সেটাও যাবে। এখন জ¦র-জারি বা কাশি হলে কোনো মানুষই কাছে ঘেঁষতে চায় না।

মেয়েটা কাঁদছে। গায়ে পানিই পড়ল কিনা? জয়নাল বোধহয় ঘুমায়। না হলে মেয়েকে কাঁদতে দেখে কোলে নিয়ে শান্ত করতই।

সাফিয়া দ্রুত ঝুপড়ির ভেতরে ঢুকে ফিরে তাকায় একবার। নূপুর বৃষ্টির মধ্যেই হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। ভিজে যাবে এখনি। ভিজলে মুখের মেকাপ সব যাবে ধুয়ে। হঠাৎ মেয়েটার জন্য খারাপ লাগে তার। পাশের ঘরেই থাকে বলতে গেলে। কোনো দিন মেয়েটার সাথে ভালোমতো কথা বলা হয়নি। কোনো দিন জানতে চাওয়া হয়নি, কেমন আছে সে। জানতে চাওয়া হয়নি, কেন এমন পেশায় নামলো। খালি ঘৃণা করে দূরে দূরেই থেকেছে সাফিয়া, আর সবার মতো।

এই যে এত বৃষ্টির মধ্যেও কোনো পুরুষের কাছে যাচ্ছে নূপুর, সে তো পেটের দায়েÑ তয় মেয়েটাকে কেন ঘৃণা করে সে? নিজেকে কি ধোয়া তুলসিপাতা? তা তো না।

মেয়েটা কেঁদেই যাচ্ছে। জয়নাল জেগেছে। মেয়েকে কোলে নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। বুকের দুধ খেয়ে মেয়ের অর্ধেক পেটও ভরে না। ঘুম ভাঙলেই কাঁদে। নিজে ঠিকমতো না খেলে বুকে আর দুধ আসবে কোত্থেকে? একটা ছোট নিঃশ^াস ফেলে সাফিয়া। কাকের ঘরে বড় হচ্ছে কোকিলের ছা। নূপুর যদি খারাপ হয় তাহলে সে আরও খারাপ।  

অভাবের কারণেই জয়নালের হাত ধরে গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিল সাফিয়া। গরিব বাপ নিজের সংসারের স্বার্থে নিজের বয়সী চেয়ারম্যানের সাথে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিল। সাফিয়া কোনোভাবেই সে বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। জয়নালকে সে পছন্দ করতো ছোট থেকেই। কিন্তু মুখ ফুটে কখনও বলেনি। জয়নালও বোধহয় তাকে পছন্দ করত। চাল-চুলোহীন বলেই হয়তো সেও ভালো লাগাটা জানায়নি সাফিয়াকে। কিন্তু আগ-পিছ না ভেবে সাফিয়া যখন মোরগ ডাকা ভোরে পরের বাড়িতে আশ্রিত জয়নালের কাছে গিয়ে বলেছিল, তাকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে- এক মুহূর্ত দেরি করেনি জয়নাল। তখনই ভ্যানে চেপে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে ঢাকার বাসে উঠে পড়েছিল।

ছয় সাত দিন এদিক ওদিক ঘুরে শেষ পর্যন্ত তাদের ঠাঁই হয়েছে মালিবাগের এই ছোট বস্তিটায়। রিকশা চালিয়ে জয়নাল ভালোই রোজগার করত। একদিন হঠাৎ ট্রাক ধাক্কা দেয় তার রিকশাকে। যাত্রী দুজন মারা গেছে। আর জয়নালের এক পা কাটা গেছে। তা এক পা নিয়েই সে একটা জুতার কারখানায় কাজ করত। বেতন খুব একটা খারাপ পেত না। সেই কারখানা করোনার জন্য তিন মাস বন্ধ। মালিক জানিয়েছে, যতদিন করোনা না যায় দেশ থেকে, ততদিন কারখানা বন্ধ থাকবে। আরও কয়েক জায়গায় খুঁজেও কাজ পায়নি জয়নাল। নতুন লোক নেবে কী, ছোটখাটো কারখানাগুলো লোক আরও ছাঁটাই করছে।

এদিকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মত, কী কারণে জয়নালের কাটা পায়ে হঠাৎ পচন ধরেছে। ডাক্তার দেখিয়েও কাজ হচ্ছে না। পচন বাড়ছেই। চিকিৎসায় টাকা খরচ হচ্ছে পানির মতো। পচনের কারণেই কিনা, শরীর থেকে জ¦রটা যাচ্ছেই না। 

২.

বৃষ্টিটা ধরে আসতে আসতে বিকেল হয়ে যায়। ঘরে এক দানা চাল নেই যে রান্না করবে। সকাল থেকে কারও খাওয়া হয়নি। ক্ষুধায় পেট জ¦লছে। বোধহয় জয়নালের জ¦রটা বেড়েছে। দশ বারো দিন ধরেই জ¦রটা আসে যায়। আসে যায়। কাশেও খুব। মনে মনে ভয় পায় সাফিয়া। কোনো দিন যা করেনি, আজ তাই করে। হয়তো পায়ের পচনের কারণে শরীর বিষিয়ে উঠেছে বলেই জ¦রটা আসছে, তাহলেও সাবধান হতে তো দোষ নেই কোনো। অসুখ আপন-পর দেখে না। 

বেড়ার গা থেকে মুখোশটা নিয়ে পরে, তারপর জয়নালের পাশে বসে সাফিয়া। কপালে হাত রাখে। সর্বনাশ জ¦রে গা পুড়ে যাচ্ছে। লোকটা এত চাপা স্বভাবের। জ¦রে মরতে রাজি তবু মুখ ফুটে একবার বলবে না, খারাপ লাগছে, একটু মাথায় পানি দিতে হবে। পানির অভাব নেই। ঘরের বাইরে বালতিটা পড়ে আছে। বৃষ্টির পানিতে ভরে আছে। মেয়েকে শুইয়ে রেখে, বালতিভর্তি পানি এনে সাফিয়া জয়নালের মাথায় ঢালতে থাকে। মেয়েটা আবার কাঁদতে শুরু করেছে। কাঁদতে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সিদ্ধান্তটা নেয় সাফিয়া। আগে তো নিজের জীবন। বেঁচে থাকলে সন্তান তো পাওয়া যাবেই।

সন্তান পাওয়া যাবে? প্রশ্নটা মনে আসতেই সাফিয়ার হাত থেমে যায়। এই মেয়েকে পেতে কত বড় অন্যায় করেছে সে, যদি জানতো জয়নাল। মেয়ের জন্মের রহস্য জানলে লোকটা হয়তো মরেই যাবে। কিন্তু, মেয়েকে ছাড়া কি বেঁচে থাকতে পারবে মানুষটা?

জয়নালের রোজগার বন্ধ। তার পায়ের চিকিৎসায় জমানো টাকা খরচ হয়ে গেল। ভালো হয়ে কবে জয়নাল কাজে যেতে পারবে তার ঠিক নেই। কারখানা-ই-বা কবে খুলবে কে জানে। এক বাসার কাজে আঠারোশ টাকা পায় সাফিয়া। সাতশ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে বাকি টাকায় মাস আর চলছে না। ভয়ের কথা অই বাসার কাজও চলে যেতে পারে। আফরোজার স্কুল বন্ধ বলে নিজেই বাসার কাজ-কাম করা শুরু করেছেন তিনি। কোন দিন গিয়ে হয়তো শুনবে সে, আফরোজা বলবেন- কাল থেকে তোমার আর আসতে হবে না সাফিয়া। টাকার  সংস্থান না হলে রাজিয়াদের মতোই বস্তি ছাড়তে হবে।

 কোনো পথই খোলা দেখছে না সাফিয়া। যে বাসায় কাজ করে, সেই বাসার আপার নিঃসন্তান চাচাতো বোনের জন্য, তিনি একবার একটা বাচ্চা চেয়েছিলেন। তাদের চাওয়া, বাচ্চাটার বয়স যেন এক বছরের মধ্যে হয় আর যেন বাচ্চা ফরসা হয়। কারণ আপার চাচাতো বোন আর তার স্বামী, দুজনেই ফরসা। আপা বলেছেন, বাচ্চা জোগাড় করে দিতে পারলে বিশ হাজার টাকা দিবেন।  

কত ত্যাগ করেই না মেয়েটা পেয়েছিল সাফিয়া। মনে করতে চায় না সে। তবু মনে পড়ে যায়ই। সেদিনও বৃষ্টি ছিল। বৃষ্টির ঝাপসায় চারপাশ কেমন আবছা আবছা হয়ে গিয়েছিল। দুপুর বেলাতেও ঝুপড়ির ভেতর ঝঁঝুকো আঁধার।

জয়নালের কাটা পা তখন ঠিক হয়ে এসেছে, সে ক্রাচে ভর করে চলাফেরা করতে পারে। জুতার কারখানায় কাজ করছে। বেশ ভালো টাকাই পাচ্ছে। রাতে ছেঁড়া চাদরে শুয়ে শুয়ে সাফিয়ার সাথে গল্প করে, আরও ক-বছর কাজ করে টাকা জমিয়ে গ্রামে গিয়ে জমি কিনবে। সেই জমিতে ঘর তুলবে। ঘরের চারপাশে গাছ লাগাবে।

সাফিয়া যোগ করে, সে দুটো ছাগল পালবে। জানালা ঘেঁষে একটা হাসনাহেনা ফুলের গাছ লাগাবে। যেদিন আকাশে চাঁদ উঠবে, সেদিন দুজনে জানালার কাছে বসে চাঁদ দেখবে।    

জয়নাল বলে, তাদের ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে।

কথা বলতে বলতে সাফিয়া ভয় পায়। তার কি মেয়ে হবে? সন্তান আদৌ হবে? হলে এত দিন কেন হচ্ছে না? তিন বছর তো কম সময় না। সে নিজেই বন্ধ্যা না তো? নাকি দোষ জয়নালের? সাফিয়া জানে পুরুষেরও দোষ থাকে। স্বামীর বুকের কাছে শুয়েও সাফিয়া সেদিন ভয় পাচ্ছিল।

 সেদিন দুপুরে বৃষ্টি সারতে দেরি হবে ভেবে সাফিয়া একটু কাত হয়েছিল। চাল চুঁইয়ে দুই জায়গায় পানি পড়ছে। চাল বরাবর নিচে প্লাস্টিকের গামলা পাতা। পানি পড়াতে গামলায় শব্দ হচ্ছে টুপ টুপ। সেই শব্দ শুনতে শুনতে সাফিয়ার তন্দ্রা এসে যায়। তখনই ঘরে ঢোকে জয়নাল। আবছা আঁধারে তার মুখ দেখা যায় না। তবে বলিষ্ঠ দেহ আন্দাজ করা যায়। জয়নাল বিছানায় শুয়ে সাফিয়াকে জড়িয়ে ধরতেই সিগারেটের গন্ধটা টের পায় সে। এবং বুঝতে পারে স্বামী বলে যাকে মনে করেছে সে আসলে নাজিম। দু ঘর পরেই থাকে লোকটা। তার নতুন বিয়ে করা বউ চলে গেছে তিন মাসও হয়নি। কাজ-কাম কিছু করে না, সারাদিন তাস খেলে আর বউয়ের রোজগার খায়Ñ এমন পুরুষের ঘর কোন মেয়ে মানুষ করবে?

ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে সাফিয়া। চিৎকার করতে গিয়েও করে না। চাপা স্বরে বলে, আপনে কার ঘরে ঢুকছেন? আমার জামাই জানতে পারলে দাও দিয়া কাইট্যা লাইবো আপনেরে।

নাজিমও চাপা স্বরেই বলে, আরে তোমার স্বামী এখন আছেনি বস্তিতে? আর তুমি না কইলে কেউ-ই জানত না।  কেউ আমারে ঘরে ঢুকতে দেখে নাই। বিয়াইত্তা অইলেও তোমার শইডা বড় সোন্দর। সোন্দর শইল আর কয়দিন। বাচ্চা অইলেই সব শেষ। তোমারে আমার ভালা লাগে, ফিরাইয়্যা দিও না। পায়ে ধরি। বলতে বলতে নাজিম সত্যি সাফিয়ার পায়ে হাত দেয়। সাফিয়ার শরীর কেঁপে ওঠে। কামের তাড়নায় নয়। অন্য কারণে।

বাচ্চা! শব্দটার মধ্যে কী যেন ছিল। বড় লোভ হয় সাফিয়ার। তার শরীর শিথিল হয়ে যায়। আর মনে হতে থাকে, একবারই তো। যদি বাচ্চা হয়। এবং হয়েছেও। আশ্চর্য যে, সেই বাচ্চারটার চেহারা অনেকটা যেন হয়েছে জয়নালের মতোই। বস্তির লোকেরা কী জয়নাল- কেউ কিছু সন্দেহ করেনি। তবে সাফিয়া জানে, মেয়ে জয়নালের না। সাফিয়া বা জয়নাল কেউই অত ফরসা না, যতটা ফরসা তিন মাসের মেয়েটা। অমন ফরসা হলো নাজিম। বোধহয় নাজিমও জানে, মেয়েটা তার। না হলে, মেয়েকে সাফিয়ার কোলে দেখলেই কেন হাসে সে? 

 বৃষ্টিটা থেমেছে। আবার হয়তো শুরু হবে যে কোনো সময়। শ্রাবণ মাসের বৃষ্টির আসার সময়-অসময় নেই। গেলে এখনই যেতে হবে। প্রতিদিন অবশ্য সন্ধ্যার সময়ই কাজে যায় সাফিয়া। আজ না হয় একটু আগেই গেল। জয়নাল বোধহয় ঘুমিয়েছে। মেয়েটাও কাঁদতে কাঁদতে জয়নালের পিঠের কাছে ঘুমিয়ে গেছে। মেয়েকে সাবধানে কোলে নিয়ে বের হয়ে দরজা টেনে দেয় সে। মেয়েকে না দেখে কী করবে জয়নাল কে জানে! তাকে কী বুঝ দিবে সাফিয়া? ভাবতে গিয়ে বুক কেঁপে ওঠে তার। কিন্তু বেশি ভাবে না সে। মুখোশটা ভালো মতো নাকের ওপর টেনে, বাচ্চাটাকে আঁচলে ঢেকে হাঁটা শুরু করে। যেতে যেতে দেখে নাজিম রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি সারতে না সারতেই কোত্থেকে এলো শনিটা?

সাফিয়াকে দেখে হাসে নাজিম। জিজ্ঞেস করে, আঁচলের তলে কী? মাইয়্যা নাকি? 

সাফিয়া জবাব না দিয়ে জোরে জোরে হাঁটতে থাকে। নাজিম কী বুঝে কে জানে, জোরে হেসে ওঠে।

৩.

দারোয়ান গেট খোলার আগে গেটের ফাঁক দিকে দেখে। জিজ্ঞেস করে কে?

আমি সাফিয়া, চাইর তলার দক্ষিণ দিকের ফেলাটে কাজ করি।

তোমার মুখে মাস্ক আছেনি?

হ আছে। গেট খোলেন ভাই। যে কোনো সময় বৃষ্টি আইবো।

দারোয়ান গেট খুলে দিলে সাফিয়া দ্রুত দারোয়ানকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির কাছে চলে যায়। ওঠার আগে একবার জোরে শ^াস নেয় সে।

এখন তো আমার চাচাতো বোন বাচ্চা নিতে পারবে না সাফিয়া। ওর হাসবেন্ডের চাকরি চলে গেছে গত মাসে। নতুন চাকরি খুঁজছে। লকডাউন তো সহজে যাবে না মনে হচ্ছে, কবে আবার নতুন চাকরি পায় ওর বরটা তার ঠিক নেই।

আমার জামাইর কারখানাও বন্ধ। রোজগার নাই। পায়ের চিকিৎসায় জমানো টাকা সব শেষ। আমার আরও দুই বাসায় কাজ আছিল আফা। হেই কাজডিও গেছেগা। গেরামে ফিরা গেলেও না খাইয়্যা মরতে অইব। উপায় নাই দেইখ্যাই পেটের সন্তানডারে লইয়্যা আইছি। আপনে একবার জিজ্ঞাস করেন না আপারে। বাচ্চা কিন্তু খুব সোন্দর। ঠিক মতন দুধ পায় না বইল্যা শইলডা একটু নরম। তাগ কাছে গেলে শইল ফিরতে মাসও লাগব না। বুঝতেই তো পারতাছেন আপা, কী বিপদে পইড়া পেটের সন্তানরে বেচার লাইগ্যা আনছি। বলতে বলতে ঢুকরে কেঁদে ওঠে সাফিয়া।

আমি জানি তারা বাচ্চা এখন চায় না। তবু তুমি যখন বলছ, তখন আমি ফোন করে জেনে নিচ্ছি।

আফরোজা ফোন করতে ভেতরের ঘরে চলে গেলে সাফিয়া মেয়েকে বুকের সাথে চেপে ধরে। আর ফিসফিস করে বলে, মারে আমারে ক্ষমা করিস। তুই বড় ঘরেই যাবি। সেইখানে কোনো অভাব নাই। আদর যত্নও পাবি রে মা। এই অভাগীর ঘরে থাকলে না পাবি খাওন, না পাবি আদর যত্ন। বড় অইলে বুঝবিরে মা, পেটের খিদার চেয়ে বড় আর কিছু নাই।

খানিক পরই ফিরে আসেন আফরোজা। বলেন, বললাম না সাফিয়া, ওরা এখন বাচ্চা নিতে চায় না।… তুমি ঘর-টর ঝাড়ু দিয়েই চলে যাও। বাচ্চাটা একা থাকলে কাঁদবে। আজ আর রান্না টান্না করতে হবে না। রাতের রান্নটা ভাবছি আমিই করব।

আপা, যদি কিছু মনে না করেন, কিছু টাকা দিতে পারলে ভালা অইতো। হাত একেবারে খালি। ঘরে চাউল নাই একটাও। অসুইখ্যা মানুষটা না খাইয়্যা আছে।

আরে আজকে মাসের সাতাশ তারিখ। এখন হাতে টাকা পয়সা থাকে নাকি? তোমার দুলাভাই আবার আজকে গেছে আগামী মাসের বাজার করতে। করোনার কারণে নাকি জিনিসপত্র পেতে সমস্যা হবে। তাই সব কিছুই বেশি বেশি এনেছে। তাতেই আগামী মাসের টাকাও অগ্রিম খরচ হয়ে গেল। আর তো কয়টা দিন। কষ্ট করে চালিয়ে নাও সাফিয়া। তোমার বেতনটা এক তারিখই দিয়ে দিতে চেষ্টা করবো।

সাফিয়া আর কথা বাড়ায় না। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। রান্নাঘরের এক কোনায় মেয়েকে শুইয়ে সে কাজে নেমে পড়ে। 

আফরোজা আজ দুজনের মতো ভাত তরকারি দিয়েছেন। গত রাতে খাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া ভাত-তরকারি। রাতের খাবার জোগাড় কীভাবে হবে, কাজ করতে করতে সেই চিন্তা করছিল সাফিয়া। চিন্তাটা কমল।

মেয়ে কোলে নিয়ে চারতলা থেকে নামতে গিয়ে আজ যেন পা চলে না সাফিয়ার। অন্য সময় উঠতে কষ্ট হলেও নামতে কষ্ট হয় না। আজ কেন জানি নামতে বেশ কষ্টই হচ্ছে। এক একতলা নামতেই যেন এক যুগ লাগছে। 

মেয়েটা জেগেছে, কিন্তু কাঁদছে না কেন জানি। কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। ভয়ে পেল নাকি? নাকি বুঝে গেল মা হয়েও সাফিয়া তাকে বেচে নিজে বাঁচতে চাইছে? নামতে নামতে সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে থেমে যায় সাফিয়া। সন্ধ্যা নেমেছে বাইরে। রাস্তার লাইটগুলো জ¦লে উঠেছে। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির। সেকি আসলে মানুষ? মা হয়ে পেটের সন্তানকে বেচতে বের হয়েছে! শরীর কেঁপে ওঠে তার। খাবারের পোটলাটা শক্ত করে ধরে, দ্রুতপদে সিঁড়ির বাকি ধাপটা নেমে, গেট পার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares