আজ অনেকদিন পর বাপের বাড়ি যাচ্ছে। গনে গনে চৌদ্দ মাস। একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে, না হলে ওমুখো হতো না শাকিলা। তার মনের অবস্থা যাই হোক,  না গেলে দশজনে দশকথা বলতে ছাড়বে না। বাপ-মা যা বলবে তার অধিক বলবে পাড়া-পড়শি। তা ছাড়া বড় জামাই মূল নায়ক হবে সেখানে। আমারটা হবে ভিলেন। আমারটা চাকরি করে না, বড় জামাই চাকরি করে। আমারটা পানের বরে মাটি খোঁটরায়, বড়টা কলম খোঁটরায় অপিসে। আয় রোজগার যতই আমারটার বেশি হোক, পাড়ার লোক তাকেই মহান করে তুলবে। আমারটা না গেলে তো পাড়ার মেগি বড় জামাইকে মাথায় তুলে নাচবে। অথচ আমার জ্বালা কেউ বুঝল না। বুঝবেও না কোনো দিন। না পারি বলতে, না পারি সইতে। কিন্তু নিজের জায়গাটা ঠিক রাখতে হলেও যেতে হবে। ভ্যানে বসে এসবই ভাবছে শাকিলা। বাড়ি থেকে বের হয়ে মাঝ রাস্তা-অব্দি চলে এলেও গুম্মু হয়ে বসে আছে। ভ্যানের উল্টোপার পা ঝুলিয়ে বসে আছে স্বামী নেকবর। মধ্যিখানে পা তুলে বসে আছে দুই ছেলে। একটা আট আর অন্যটা সাত।

শাকিলারা তিন ভাইবোন। দুই বোন পিঠাপিঠি। এক বছরের ছোট-বড়। ভাই দশ বছরের ছোট। রাজশাহী শহরে বাড়ি। মূল শহরের পৈথানে। শহরের পুব মাথায় বিশ্ববিদ্যালয় আর পশ্চিম মাথায় আদালত। আদালতে উকিল-মোক্তার-বিচারক থাকে বলে সেটা শহরের শিথান। আর সেটা শিথান হলে উল্টোদিক পৈথান হবারই কথা। আবার কেউ যদি যুক্তি ধরে বলে, ঐ উকিল-মোক্তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েই তো আদালতে গেছে। তাহলে পুবদিক শিথান নয় কেন? এবার তাহলে চায়ের স্টল কাঁপানো যুক্তিবিদও লাফ দিয়ে বলবে, উত্তর আর দক্ষিণই বা বাদ যাবে কেন। দু’ধারেই তো প্রাইমারি স্কুল আছে। প্রফেসরই বল আর উকিল মোক্তারই বল, তারা সবাই কিন্তু প্রাইমারি টপকেই এসেছেন। সেদিক থেকে শিথান কিন্তু উত্তর দক্ষিণও বলা চলে। সেই ঝামেলা এড়িয়ে বরং বলা চলে তারা থাকে শহরের পুব মাথায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীরঘেঁষা পাড়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের গা ঘেঁষা হলে কী হবে, এ পাড়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে এক ক্রোশ দূরের পাড়া থেকেও পিছিয়ে থাকা পাড়া। এ পাড়ার কেউ এখন অব্দি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। মানে ভর্তি হতে পারেনি। বাতির নিচের অবস্থা যেমন, এ পাড়াও তেমন। ঘন বসতি। তবে বস্তি নয়। খানিক দূরে অলি বাবার মাজার। বছরে একবার ওরশ বেশ জমকালোভাবে হলেও, প্রতিদিন কিন্তু ভক্তকুলের আনাগোনা কম হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোকছটা না পড়লেও দূর থেকে মাজারের রোশনি কিছুটা হলেও পড়েছে এই পাড়াতে।

বড় বোন উচ্চ মাধ্যমিক টপকালেও শাকিলা মাধ্যমিক পাস দিয়ে আটকে গেল। ভালো সম্বন্ধ আসাতে দু’জনেরই বিয়ে হলো এক সাথে। বড়টার জামাই স্কুলমাস্টার। শাকিলারটাও শিক্ষিত, তবে চাকরি করে না। এক বাপের এক ছেলে। জমিজমা মন্দ নয়। নিজের সংসারেই সে খাটে। বাপ-মা দু’জনেই গত হয়েছেন। একার সংসার। বোনদের বিয়ে হয়ে তারা এখন পাকা সংসারী। দু’টো পানের বরজ আছে। কথায় আছে, যে খাটে বরে, তাকে কে ধরে। বিশ বিঘা জমিওয়ালাও এর সাথে পারবার কথা নয়। কাঁচা টাকা দু’হাতে সব সময়। আর এই কাঁচা টাকার গন্ধ যে বেশ ঝাঁঝালো তা আর পাঁচজনের চেয়ে নেকবর, মানে শাকিলার স্বামী ভালো করেই জানে। ঝাঁঝে ভুলভাল কাজও করে বসে অনেক সময়। কয়েক বরজ-বন্ধু মিলে লাল পানির ব্যবস্থা করে। হাঁস জবাই করে পিকনিক করে। তবে সব সময় নয়। মাঝে মাঝে। এসব এখন শাকিলার গা-সহা বা মন-সহা হয়ে গেছে। শুধু সহ্য করতে পারে না লবঙ্গকে। তা সে মানুষই হোক আর মসলাই হোক।

শাকিলার বাপ-চাচা দুই ভাই। একই ভিটেতে দুই বাড়ি। অবশ্য দূর থেকে দেখলে মনে হবে একবাড়ি। কাছে গেলে চোখে পড়ে, মাঝে প্রাচীর দিয়ে দুই করা হয়েছে। সেই চাচার বাড়িতে ভাড়া থাকে লবঙ্গ। লবঙ্গলতা। লবঙ্গর স্বামী অধীর মাহান্ত ছেঁড়া টাকার ব্যাপারি। নাম অধীর হলেও চাল চলনে ঠিক তার উল্টো। গতি তার নিজস্ব। কোনো তাড়াহুড়া নেই আবার কোনো থামাও নেই। বলা চলে এ গতি লবঙ্গলতারই বেঁধে দেওয়া। থামলেও ঠোকা পড়ে, গতি কিঞ্চিৎ বাড়ালেও লাগামে টান পড়ে। একটা ছায়া অধীরের সাথে সব সময় থাকে। লবঙ্গ-ছায়া। তাদের সংসার মাচা হলে অধীর নিশ্চয় তার খুঁটি। লবঙ্গলতা তবে সেই খুঁটি পেঁচিয়ে মাচাতে ওঠা সার্থক গুল্ম। খুঁটিতে ঘুণ ধরুক আর মচকে বা ভেঙে যাক, এই গুল্ম ঠিক তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে।

বেচারা অধীর সারাদিন বাহিরেই থাকে। বিভিন্ন ব্যাংকে বাজারে ঘুরে বেড়ায় ছেঁড়া টাকার তালাশে। ফিরে সন্ধ্যায়। মাঝরাতভর চলে দু’জনের টাকা জোড়া দেওয়ার কাজ। আবার সকাল হতেই দু’টো নাকে-মুখে গুঁজে ছোটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা বদল করতে। সেখান থেকে আবার পুনরায় ছেঁড়া টাকার খোঁজ। দিন তামান লবঙ্গর লতা লতিয়ে ওঠে সারা পাড়া। অধীর বাড়ি থেকে বাহির হতেই হাতের টুকটাক কাজ সেরে সাজতে বসে লবঙ্গ। সাজ-আয়নার সামনে বসে পরিপাটি করে সিঁদুর দিয়ে, বেশ কুঁচি দিয়ে ডুরে শাড়ি পরে পাড়ায় বের হওয়া নিত্য কাজ। নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। সন্তান নেই। আর হবেও না। প্রথমে একটা এসেছিল। হওয়ার সময় মরল। মরলেও একা মরেনি। পরের, তার পরের, তার পরের এবং পরের পরের সন্তানকে নিয়েই মরল। লবঙ্গকে বাঁচাতে নাড়িসুদ্ধ কাটতে হলো। বেভাগে একটা টিউমার হয়েছিল নাড়িতে। তার সাথে সন্তান-নাড়িও কাটা পড়ল। সন্তান ধারণের ক্ষমতা চিরতরে হারাল লবঙ্গ। এতে দুঃখ যে তারা পায়নি, তা নয়। অধীরের চেয়ে লবঙ্গর দুঃখটাই বেশি। দুঃখ তার নিজের জন্য যতটুকু, তার অধিক অধীরের জন্য। অবশ্য এতদিনে সেই কষ্টের নদীতে ভাটা পড়েছে। কষ্ট নেই অধীরেরও। তার এক কথা, লবঙ্গতুই তো আছিস। তুই থাকলেই হবে, আর তোর সুবাস থাকলেই হবে। এ নিয়েই টিকে থাকব আমি। লবঙ্গ সুবাস ছড়িয়েই টিকে আছে বটে। ঘরে বাহিরে, পাড়ায়; সবখানে।

প্রথম যখন পাড়াতে নতুন এলো, বেশ কানাঘুষা শুরু হয়েছিল। নির্ঘাত পাড়াটা নষ্ট করে ছাড়বে। শুরুতে কেউ কেউ বিগড়েও গিয়েছিল। ছেলে ও ছেলের বাপ; দু’টোই। তবে পাত্তা পায়নি কেউ-ই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পাড়ার মা ও বউরা। অল্পদিনেই বেশ আপন হয়ে উঠল। মনেই হবে না ক’দিন হলো এসেছে। পাড়ার ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে একই ঝাঁকের কবুতর হয়ে লাফায়। মার্বেল খেলে। আবার কখনও কোমরে ফাঁসার বেঁধে কানামাছি। যারা ছোটদের ক’দিন আগেও তাড়াত, কান মাথা খাবার জন্য, তারাই এখন দাঁড়িয়ে দেখে। মায়েরা দেখে আঁচলে মুখ ঢেকে। আর বাবারা মায়েদের চোখ বাঁচিয়ে দূর থেকে দেখে লবঙ্গর লাফানো।

টাঙ্গাইলের কোনো এক গ্রাম থেকে এসেছে তারা। এর আগেও কোথাও হয়তো ছিল। এখন রাজশাহী। ছেঁড়াটাকার ব্যবসা বলতে অধীর একচেটিয়া করে। তার কোন ক্লান্তি নেই; নেই কোনো বিরক্তি। রানারের মতো। হয়তো কোনো এক গন্তব্য আছে ওদের। পৌঁছাতেই হবে। লবঙ্গ তার সহযাত্রী। বলা যেতে পারে অধীরের উদ্দীপক। লবঙ্গর বয়স আর কতটুকুই হবে। ত্রিশের কাছাকাছি। মানুষ তাকে বিশের ওপারে ফেলে না। যেমন লম্বা তেমন নিভাঁজ। মাথাভর্তি চুল, লম্বা বেণি। কুঁচি দিয়ে শাড়ি প’রে  তার আঁচলে চাবিটা বেঁধে তা যখন পিঠের দিকে ফেলে হাঁটে, ঠিক ঢেউ তোলে। দীঘল চোখে কাজল পরাতে তার চাহনি আরও ছোঁ পাগল লাগে। তোলা নাক, একটু বেশিই তোলা। তবে ফোলা গালের সাথে তা মানিয়ে যায়। ঠোঁটে পালিশ লাগায় না। এমনিতেই তেলাকোঁচার পাকা ফলের মতো। হাসলে মনে হয় ঠোঁটের আগুন টপকে ভুরভুর করে খই ফুটছে। সামনের ডানপাশের উঁচু দাঁত হাসিকে ভিন্নমাত্রা দেয়। পায়ের নূপুর খোলার বালাই নেই। হাঁটলেও মানুষ তাকায়, হাসলেও মানুষ তাকায়। যারা তাকানোর জন্যই শুধু তাকায়, তারাও চোখ ফিরানোর আগে বাড়ির কথা ভেবে লম্বা বাতাস বুকের মধ্যে নেয়। বউয়ের সাথে পাশ-বালিশকে গুলিয়ে ফেলে। আর যারা দেখার জন্য তাকায়, তারা তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ধারে কাছে কেউ না থাকলে পাট পাট করে দেখতে থাকে। পুরোট শরীর আটিল বাকলের মধ্যে হিমশিম করে মরে। গায়ের রং ফর্সা। যদিও ধবধবে সাদা নয়। মাটির দেয়াল সাদা বালুকা মাটিতে লেপলে যেমন দেখায়, তেমন। তবে পালিশ আছে। দুই একজন নিজে থেকেই একটা পছন্দের নাম দিয়ে বসে। মনে মনে লবঙ্গকে ওই নামেই ডাকে। কেউ আবার ডাকে টাঙ্গাইলের চমচম বলে। তখনও সবার হাতে মোবাইল আসেনি। বোতাম মোবাইল যে দু’একজন কিনেছে, তাদের বেশিরভাগই তা পকেটে না রেখে হাতে নিয়ে ঘোরে। এমন না থাকার দিনেও তার মোবাইল আছে; এটাই জানান দেওয়া। তখনও লবঙ্গর কাঁকালে মোবাইল। হাতে সেলাই করে একটা পকেটের সমান ছোট ঝোলা বানিয়েছে লবঙ্গ। তাতে লাল সুতার ফুল তোলা । গলায় ঝোলাবার জন্য লাগানো হয়েছে লাল ডোরের লম্বা ফিতে। সেই পকেট-ঝোলাতে মোবাইল রেখে গলাতে কোণাকোণিভাবে ঝুলিয়ে দেয়। মোবাইল পড়ে থাকে কাঁকাল বরাবর। লবঙ্গ হাঁটে আর মোবাইল হাঁসফাঁস করে মরে কোমরের দুলনিতে। কেউ আবার দূর থেকে আফসোস করে, আহারে মোবাইল। মোট কথা এই পাড়াটা যদি হয় কোনো ঝিল বা বদ্ধ জলাশয়ের কোন ছোট বিল, তাতে হাজারও শাপলার মধ্যে এ একমাত্র পদ্ম। শ্বেতপদ্ম। সবার থেকে আলাদা করা যায়। মাথা তুলে থাকে।

পাড়ার মধ্যে তিন গলির মাথায় একটা চায়ের স্টল আছে। সেখানেও তাকে নিয়ে কথা ওঠে। প্রথম দিকে এ বেঞ্চির লোক ওবেঞ্চির সাথে গলা তুলে বললেও এখন ইশারায় বলে। তবে নতুন এক ফিকির যোগ হয়েছে এই স্টলে। লবঙ্গ চা। আগে লাল চা, আদা চা, বড়জোর লেবুর সস্তা মৌসুমে লেবু চা। এখন যোগ হয়েছে লবঙ্গ চা। অবশ্য তার সাথে তেজপাতা, দারুচিনিও থাকে। কাপে এক টাকা বেশি। তবুও সবার লবঙ্গ চায়েই ঝোঁক বেশি। প্রতি চুমুকে লবঙ্গকে দেখা যায়, অনুভব করা যায়। খুশবুর সাথে একটা ঝাঁঝও টের পাওয়া যায়।

এই লবঙ্গলতা এখন সবার মাচাতেই দাপিয়ে বেড়ায়। বাড়ির মাচা মনের মাচা। প্রথমে যতটা ভয়ের ছিল, এখন ততটাই ভরসার। প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠান, বারান্দা কিংবা হেঁসেল; সব তার জন্য খোলা। কেউ শাক বাছছে, লবঙ্গ ঠিক যেয়ে বসে যাবে দু’পা মেলে। নিখুঁতভাবে শাক বাছবে। কেউ তরকারি কাটছে, লবঙ্গ হাজির। কারও কোলের শিশু কাঁদছে, সে গিয়ে বুকে তুলে নিয়ে রান্নাঘরে মাকে দিয়ে বলবে, দিদি তুমি ছেলে সামলাও, আমি রান্নাঘর দেখছি। আবার কোনো কাজ না থাকলে কারও বারান্দায় গিয়ে বসে যাবে পা দুলিয়ে। কাপড় গুটিয়ে বসাতে পায়ের নূপুর বেশ দেখা যায়। হাসে লবঙ্গ হাসে নূপুর। গুছিয়ে গল্প করতে পারে। পাড়ার বউ-বেটিও জোটে। কেউ দাঁড়িয়ে শুনতে শুনতে জোগান দেয়। দু’একজন পুরুষও এসে দাঁড়াতে চায়, বউ-বেটিদের চোখ রাঙানিতে টিকতে পারে না। শুধু বারান্দা বা রান্নাঘরই নয়। যে কোনো বিপদে লবঙ্গকে ডাকলে পাওয়া যায়। কাউকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে, ডাক লবঙ্গকে। কারও প্রসব ব্যথা উঠেছে, ডাক লবঙ্গকে। এমনকি কারও বাচ্চা জ্বরচমক লেগে ফিট হয়েছে, সেখানেও ডাক লবঙ্গকে। লবঙ্গ না করে না। না করতে জানে না। পাড়ার ছোট-বড় নিয়েই তার জগৎ। তাদের সুখে সুখ পায় লবঙ্গ। দুঃখে দুঃখ। সে জানে, তার ঘরে খেলার মতো ছোট কাউকে পাবে না কোনো দিন। তাই বাইরের ছোট বড় নিয়েই তার জগৎ। সে ভুলিয়ে রাখে নিজেকে। আবার অনেকেই ভুলে থাকে অনেক কিছু, তার হাসিমাখা মুখ আর চপলতা দেখে।

দুই

প্রায় দেড় বছর আগে এর সূচনা। শাকিলা  এলো বাপের বাড়ি; নেকবরকে সাথে নিয়ে বেড়াতে। লবঙ্গলতার কথা আগেই শুনেছে। বাপের বাড়ি এসে শুনলো পুরোটা। শুনে হিংসে হলো শাকিলার। এত রূপ, এত ঢঙ, আবার সবার নাকি ভালোবাসার পাত্রী। একদিন কোনো এক কথা প্রসঙ্গে নেকবর লবঙ্গর উদাহরণ টেনেছিল। যাতে শাকিলা খাটো হয়েছিল। রাতে মায়ের মুখে কথাগুলো শুনে একবার দেখতে ইচ্ছা হলো লবঙ্গকে। সকালের নাস্তা সেরে মসলার ডালা থেকে মুখে একটা লবঙ্গ ফেলে দিল। এটা শাকিলার নতুন নয়। দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে গালের ফাঁকে একটা লবঙ্গ রাখে। কথা বলতে সুবিধে হয়। একটা সুবাস থাকে বাতাসে। তার ডান মাড়ির এক দাঁতে বড় ছিদ্র। নেকবর বলে পোকালাগা দাঁত। বছরে অন্তত দু’তিনবার ব্যথাও ওঠে। চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে তখন। কয়েকবার দাঁতটা তুলবে তুলবে করেও  তোলেনি। গালে এমনিতেই মাংস কম। দাঁত তুললে আরও বসে যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিউরে ওঠে শাকিলা। কিন্তু মাছ খাও, মাংস খাও কিংবা সবজিই খাওনা কেন, ঠিক ঘাপটি মারবে সেখানে গিয়ে। গন্ধ হয় মুখে। একদিন নিজেই বিশ্রি গন্ধটা পেয়েছিল। পরিপাটি করে ব্রাশ করে, তবুও মনের সন্দেহ যায় না। তাই বাইরে গেলে লবঙ্গ গোঁজা। আজ না গুঁজলেও চলত। প্রাচীর টপকালেই ওবাড়ি। তবুও লবঙ্গ মুখে তুলে নেকবরের হাত ধরে বলল- ‘চলো যাই।’

‘নানা, আমি কেন? তোমার যেতে হয় তুমি যাও।’ নেকবর জানে, শাকিলা কোথায় যাবার কথা বলছে। রাতে এ নিয়ে কথা হয়েছে দু’জনে।

‘আরে চলই না। পরে কিন্তু পসতাবে।’ আবারও হাত ধরে টান দিল। এবার আর আপত্তি করল না। আপত্তি করেও লাভ হবে না, নেকবর জানে। টানটা তেমনই ছিল। তাছাড়া নেকবরের আপত্তি কোনো দিনই টেকেনি শাকিলার কাছে। নেকবর উঠে দাঁড়াল।

ঘরে ঢুকতেই দেখতে পেল লবঙ্গলতা মেঝেতে লতিয়ে এক পা মেলে ডুমুর কাটছে। হাতের কাটা ডুমুর ক’টা মাটির সানকিতে রেখেই লাফ দিয়ে উঠল লবঙ্গ।Ñ ‘ওমা দিনের বেলা চাঁদ উঠল যে। কী ভাগ্য আমার। বরজ আর বর যে একসাথে। তা আপনি যে এলেন, পান তো শুকিয়ে মরবে। তবে এভাবে আসা কিন্তু আপনার ঠিক হয়নি।’

‘সরি ভুল হয়েছে।’ লজ্জা পেল নেকবর। একটা গলা খেঁকারি অন্তত দেওয়া উচিত ছিল। তবে যতটা গোছানোর কথা ততটা নিজেকে গোছাল না লবঙ্গ।

‘ভুল তো হয়েই ছে। একটা খবর দিয়ে আসলে, ক’টা ছাঁচি পান আনতে বলতাম।’ হাফ ছেড়ে বাঁচল নেকবর। অপরাধ হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়াতে নয়।

‘পান খান বুঝি?’

‘না, খাই না। তবে নন্দাইয়ের বরজের পানে কে না ঠোঁট লাল করতে চায়, বলুন?’ বেড়দাঁত বের করে খিলখিল করে হেসে উঠল লবঙ্গ। এতে গা জ্বলল শাকিলার। তা জ্বলবারই কথা। লবঙ্গর এমন ভাব, যেন শাকিলাকে দেখতেই পায়নি। তার ওপর নেকবরকে নন্দাই বলছে। মানে সম্বন্ধ বেধেছে আগেই। শাকিলা তার ননদ। আবার বরজের খবর, পানের খবরও জানে। টের পেল, স্বামীকে ধরে এনে কতটা ভুল করেছে। নেকবর আসতে চায়নি, সে-ই বরং জোর করে টেনে আনল। আবার ভাবল, এটা বোধহয় নেকবরের ভান ছিল। তার থেকে ওর তাড়াটাই মনে মনে বেশি ছিল। সবকিছু সামাল দিয়ে নিজে থেকেই কথা বলল শাকিলা। বরং লবঙ্গর তালে তাল দিয়ে বৌদি সম্বোধন করতেও ভুল করল না।Ñ ‘বৌদি আমিও কিন্তু সাথে আছি। আমাকে যে দেখতেই পাচ্ছেন না?

‘কেন দেখব না ভাই, আপনি তো বরেরও বর।’ প্লাস্টিকের দু’টো চেয়ার এগিয়ে দিতে দিতে বলল লবঙ্গ।

‘মানে?’ বসতে বসতে প্রশ্ন করল শাকিলা।

‘নন্দাই আমার বরজের বর, আর আপনি হলেন বরের বর। বুঝলেন? অত মানে টানে বুঝতে হবে না। ঘরে চিড়ার মোয়া আছে দিই, আপনারা বসে বসে খান আর গল্প করি।’ খোঁচাটা শাকিলা না বুঝলেও নেকবর বুঝল। হাসল মনে মনে; বউয়ের চোখ বাঁচিয়ে।

সামনে একটা টুল রেখে তাতে মোয়ার প্লেটটা রেখে খেতে বলল লবঙ্গ। সেও একটা মুখে দিয়ে ডুমুর কাটতে বসল। মেয়ে মানুষের যা কাজ। শাকিলা ঘরের চারদিকে খুঁটেখুঁটে দেখতে লাগল। টিনশেডের ঘর হলে কী হবে, পরিপাটি করে সাজানো ঘর-বারান্দা। টিনের নিচ দিয়ে ঝালর দেওয়া চাঁদোয়া টানা। ঘরে সুন্দর একটা খাট। বেশ নকশা-কাটা। নকশার ধরনে বোঝা যায়, বেশ পুরোনো। তবে চকচকে ভাব জানান দেয়, অল্পদিন হলো নতুন করে বার্নিশ করা হয়েছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা কুরুস-কাঁটার কাজ করা লেস লাগানো কাপড়ে ঢাকা। বালিশের কভারেও কাজ করা।  খাটের পেছনে ছোট টেবিলে চৌদ্দ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন। তাতে এখন জুহি চাওলার একটা ছবি চলছে। ভলিউম বেশ কম দেওয়া; গল্পের ব্যাঘাত ঘটাবে না। ঘরের সবকিছু তার ভালো লাগল। বেশি লাগল বালিশের কভারের কাজ। সেটাই হয়তো জিজ্ঞাসা করবে লবঙ্গকে, এ কাজ তার নিজের হাতের কি না। লবঙ্গর দিকে মাথা  ঘোরালেও প্রশ্নটা আর করা হলো না। নেকবরের চোখ পলকহীন লবঙ্গর দিকে। তড়িৎ চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। অমন হ্যাংলার মতো দেখার কী আছে? আর ডুমুর কাটা সে দেখেইবা করবে কী? লবঙ্গর হাতের দিক থেকে চোখটা সরিয়ে স্বামীর চোখের দিকে আনতেই  মাথায় রক্ত উঠল। মরণ! এর চোখ যে বটির দিকে নেই। চোখ লবঙ্গর কোথাও গিয়ে আটকে আছে। স্বামীকে ধাক্কা বা গলা খেঁকারিও দিল না। নিজের গালে নিজেই একটা থাপ্পড় মারতে চাইল। দোষটা তার। দুই মাড়িতে মাড়ি ঠেকিয়ে একটা পেষণ দিল, মটর-ডলা করে। মটর থাকলে নির্ঘাত ছাতু হতো। মুখে লবঙ্গ থাকাতে দাঁতে শব্দ হলো না। তবে বেশ ছোবড়া হলো লবঙ্গটা। এতেও হলো না। আরও কয়েকবার মুখের লবঙ্গ পিষতে পিষতে সামনে বসা লবঙ্গর দিকে তাকাল। কি বেহায়া মাগিরে বাবা। বাড়িতে একা থাকিস, ঠিক আছে। আমরা এলাম তবুও কী ঢিলেঢালা শাড়ি। গতরের গড়ন হলোই বা সুন্দর, তাই বলে বিলাতে হবে? অন্যের মরদকে বিগড়াতে হবে? পেটির ভাঁজ দেখ মাগির। আরও অনেক কথাই মনে মনে আওড়াল শাকিলা। বলতে গেলে সেও দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। অতিথিদের নীরবতা দেখে লবঙ্গলতা মাথা তুলল। এতে চমকাল দু’জন। তাড়াহুড়ো করে দু’জনেই মোয়ার প্লেটের দিকে হাত বাড়াল।Ñ ‘কিগো আপনারা যে এখনও কিছুই মুখে  তোলেননি। মোয়া খান না বুঝি? কী করব ভাই। মিষ্টি-মিঠাই বা ফলমূল তো বাসায় নেই।’ কিছুটা আফসোস প্রকাশ পেল লবঙ্গর কথাতে। সাথে খোঁচাও ছিল।

‘না না, তা কেন। চিড়ার মোয়া, এটাই কম কিসে। এ মোয়া আমাদের দিকে পাওয়া যায় না।’ নেকবর এতক্ষণ না খাবার অপরাধ ঢাকতে চাইল।

‘আপনার দাদা গতকাল নাটোর থেকে এনেছে। সেখানের চিড়ার মোয়ার সুনাম আছে।’

‘তাই নাকি? আমি জানতাম সেখানে শুধু কাঁচা গোল্লার সুনাম। তা গোল্লা নেই?’ টিপ্পনি কাটল শাকিলা। টিপ্পনিটা বেশ বুঝল নেকবর। লবঙ্গ কিছু বলল না। মুচকি হেসে মাথা ঝোঁকাল। এমন সময় মৃদু চিল্লিয়ে উঠল নেকবর।Ñ ‘ও বাপ, কি শক্ত!’ মোয়াটা তখন দাঁতের ফাঁক থেকে এসে নেকবরের হাতে। শাকিলা ও লবঙ্গর চোখ তখন মোয়ার দিকে। নেকবরের চোখ লবঙ্গর দিকে।- ‘ও মা তাই নাকি। খুব শক্ত? এমন তো হবার কথা নয়।’ লবঙ্গ যেন বড় অপরাধ করে ফেলেছে তা খেতে দিয়ে।

‘আমিও তো তাই বলি। নাটোরের মোয়া এর আগেও খেয়েছি, এত শক্ত ছিল না।’

‘তাহলে বুঝি আমার ছোঁয়া পেয়েই শক্ত হয়ে উঠল। আমার পোড়া কপাল, বুঝলেন নন্দাই। নরম জিনিস কেন যে শক্ত হয়!’ হাতের ডুমুর তাদের সামনে তুলে আনমনে কয়েকবার টিপল। যেন ডুমুুরটাও তার ছোঁয়াতে আগের থেকে এখন বেশ শক্ত। শেষের কথার ঢঙে এমনটাই প্রকাশ পেল। আর কথাগুলো নেকবরকে বললেও শাকিলার দিকে তাকিয়ে হাসল লবঙ্গ। শাকিলা তাকাল নেকবরের দিকে। ‘তা দাঁতে চোট লাগেনি তো। আপনি কিছু না বললেও ননদ কিন্তু পরে ঠিকই গালি পাড়বেন।’ খোঁচা দিল শাকিলাকে।

‘না লাগেনি।’ আবার মোয়াটা মুখে তুলল নেকবর।

‘আমি কি নরম করে দিব?’ এবার খোঁচা নেকবরকে মারলেও লাগল শাকিলাকে।

‘না থাক। বুড়ো তো হইনি। এ আর এমন কী শক্ত। আপনি লোহার মোয়া দিলেও ঠিক ভাঙব।’ হেসে উঠল নেকবর। লবঙ্গও হাসল। তৃতীয়জন হাসল না।

‘নন্দাই আমার মিনিমুখো হলে কি হবে, কথায় যে খুব রস।’ নেকবর এর উত্তর দেবার সুযোগ পেল না। শাকিলা নেকবরের বগলের মধ্যে হাত ভরে উঠে দাঁড়াল। বললÑ ‘চল যাই। বাজারে যেতে হবে ভুলে গেলে নাকি? কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবে বললেও স্বাভাবিক ছিল না। নেকবর তা টের পেল। সেও আপত্তি না তুলে লবঙ্গকে বললÑ ‘বৌদি চলি। আমাদের ওখানে বেড়াতে যাবেন।’

‘নিশ্চয় যাব। তবে আপনার গিন্নি তো কিছুই বললেন না। না বলুক, আমি বেহায়া। ঠিক একদিন চলে যাব’

‘তা আমি জানি’। মাড়ি পিষে বলল শাকিলা। এ কথা শুধু নেকবর শুনল। তারা দু’জন তখন বাহির দরজার কাছে। এমন সময় লবঙ্গ কিছুটা চিল্লিয়ে বলল- ‘নন্দাই, এবার আসবার সময় আমার জন্য ছাঁচি পান আনতে ভুলবেন না কিন্তু; মোটা আর মটমটে দেখে।’ নেকবরের উত্তর দেবার অবকাশ ছিল না। শাকিলা তার বাহু ধরে বেশ টানছে।

সেই প্রথম বিষ ঢুকল শাকিলার মনে। লবঙ্গ-বিষ। দিনে দিনে সংসারটাই নীল হয়ে উঠল ওই বিষে। এখন লবঙ্গও মুখে পুরে না শাকিলা। মুখের গন্ধ হলে হোক। মানুষের মধ্যে বেশি না গেলেই হলো। লবঙ্গর গন্ধ আরও বেশি। তা ছাড়া লবঙ্গকে নিয়ে বাড়িতে কম অশান্তি হচ্ছে না। এমন দিনে মুখে লবঙ্গ নিলে অন্যজন ছাড়বে কেন? শাকিলা জানে, নেকবর তার কাছে যতই মিনমিনে হোক, খোঁচা মারতে ছাড়বে না। এই পর্যন্ত ঘটনাটা এলে ঠিক ছিল। গড়াল অনেক দূর। যে লোক সময়ের ঘাটতিতে ভুগছিল, তার হঠাৎ অঢেল সময় চলে এল। সুযোগ পেলেই সে শ্বশুরবাড়ি যায়। পান বেচার নাম করে মোকাম হয়ে রাজশাহী যায়। হঠাৎ শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি দরদ উথলে উঠল নেকবরের। দেখা হয় লবঙ্গর সাথে। নেকবরের যাবার খবর পেলে লবঙ্গ নাকি নিজেই আসে দেখা করতে। কখনও নেকবর নিজেও যায়। দুই দুইবার নাকি এক বিড়া করে ছাঁচি পানও লুকিয়ে দিয়েছে। খবরগুলো দেবার লোকেরও অভাব নেই। শাকিলা এ খবরও পেয়েছে, একদিন আড়াইশ গ্রাম বাদামও নেকবর নিয়ে গিয়েছিল।

সুখ গেল শাকিলার। প্রায়শ গণ্ডগোল হতে লাগল দু’জনার। শাকিলা আর নেকবর। বেশকিছু দিন চাপা থাকলেও একদিন তা চরমে পৌঁছাল। আট নয় বছরের সংসারে শাকিলার ওপর প্রথম হাত তুলল নেকবর। অবশ্য একটাই থাপ্পড় মেরেছে। এতে শাকিলা যেভাবে ঝড় তুলেছিল, ঠিক সেভাবেই থেমে গেল। নেকবর ভাবল ওষুধে কাজ হয়েছে। কিন্তু নেকবর ভুলে গেল, বড় ওষুধের কাজ শুরু হয় দেরিতে। তাই হলো। সবকিছু বেঁধে ছেলে দু’টোকে সাথে নিয়ে চলল বাপের বাড়ি। ফলে এই বিবাদের খবর বাপের বাড়ি পর্যন্ত এলো। জানল ভাই-ভাগিরাও। তবে কেউ দোষ দিল না লবঙ্গকে, উল্টো ছিছি করল শাকিলাকেই। তারা জানে, লবঙ্গ আর যাই হোক, সে মনে জেনে কারও ক্ষতি করবে না। ঘর ভাঙা তো দূরের কথা।

শাকিলার বাপও জানে, মেয়ে তার কেমন। মেয়ে ঠিক তার দাদির স্বভাব পেয়েছে। কাকও বাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় ভাবত, পাছে ফতে বুড়ির সাথে দেখা না হয়ে যায়। ফতেজান শাকিলার দাদির নাম। মানুষ ডাকে ফতে বুড়ি বলে। কাউকে ছেড়ে কথা বলত না বুড়ি। সবাই তার কাছে বিড়াল। তাকে রাগালে, তার ঝগড়াতে গাছের পাতাও নাকি ঝরে। সে অবশ্য মারা গেছে দশ বছর হলো। অনেকে বলে, ফতে মরলেও ঝাঁঝটা দিয়ে গেছে শাকিলাকে। কেউ রেগে বলে, এক ফতে গেছে আর এক ফতেকে রেখে। বাপ শাকিলাকে আদর করে মা বলে ডাকতে ভয় পায়। শাকিলা না ভেবে বসে, তাকে তার দাদির সাথে তুলনা করছে। শাকিলার বাপ অবশ্য মেয়ের আসাতে অবাক হয়নি। সে বরং অবাক হয়েছে এত বছর পরে প্রথম এলো বলে। আর ভাবল, ক’দিন থাক মাথা একটু ঠান্ডা হলে নিজে থেকেই চলে যাবে।

শাকিলার মাথা অবশ্য সহসা ঠান্ডা হলো না। বরং আরও গরম হলো। ঘটনাটা লবঙ্গ জানবার পর সে উল্টো কাজ করল। যে মানুষ দিনে একবার সিঁদুর পরত, সে এখন দু’বার পরে। তুলে রাখা শাড়িও বেছে বেছে পরে। সুন্দর কুঁচি তোলে। ঘুরে বেড়ায় এ গলি ও গলি। হাঁটে শাকিলার সামনে দিয়ে; নূপুরে ঝড় তোলে। পাড়ার লোক এতে হাসে। পিত্তি জ্বলে শাকিলার।

এক মাসের মাথায় কিছুটা নরম হলো শাকিলা। চাচি-ফুপু, বাপ-মা সবাই মিলে নরম করল। আর এই সবুজ সংকেত পেয়েই এক মাস একদিনের মাথায় শ্বশুরবাড়ি এলো নেকবর। শাকিলার এক কথাÑ নেকবরকে শ্বশুরবাড়িমুখো হওয়া যাবে না। আমিও আসব না। আমার বাপ-মাকে না দেখে আমি যদি থাকতে পারি, তবে পরের বেটা কেন থাকতে পারবে না। এ তার সাফ কথা। এতেই রাজি হলো নেকবর। ছেলে দু’টোর মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি না হয়ে পারল না। আব্বা ডাক যেন কত যুগ ধরে শোনেনি।

তিন

গনে গনে চৌদ্দ মাস পর আজ বাপের বাড়ি যাচ্ছে শাকিলা। শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে নেকবর। তাদের দুই সন্তান যাচ্ছে নানার বাড়ি। একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে। শালার বিয়ে। মামার বিয়ে। গত চৌদ্দ মাস খুব একটা খারাপ কাটেনি তাদের। যা একটু খোঁচা দিয়েছে তা নেকবর। শাকিলা চা বানালে নেকবর ইচ্ছা করে বলে- দু’টো লবঙ্গ দিও। শাকিলা দেয় না। এ চল অবশ্য শাকিলাই এ বাড়িতে শুরু করেছিল। চায়ে লবঙ্গ দিলে ঝাঁঝ বাড়ে। এ ছাড়া চা নাকি বেশ পানসে লাগে। গলার খুশখুশানিও ভালো হয়। এখন গলার খুশখুশানি ভালো হলেও মনের খুশখুশানি বাড়ে। এখন লবঙ্গ ছাড়াই খায়। ভালোও লাগে। লবঙ্গ কোনো তরকারিতেও দেয় না সে। কিনতেও মানা। চৌদ্দ মাস পরে আবার মনের মধ্যে শুরু হলো সেই খুশখুশানি। জেনেশুনেই যেন আগুনের দিকে যাচ্ছে। উপায় নেই। একমাত্র ভাই। আর সে জন্যই কয়েকদিন ধরে নেকবরকে ভাড়া করা সাক্ষীর  মতো করে শিখিয়েছে, বিয়ে বাড়িতে তার কী ভূমিকা হবে। কীভাবে থাকবে, কীভাবে চলবে। বলা চলে কোনো বড় ম্যাচে নামবার আগে নেট প্র্যাকটিস। নেকবর অবশ্য এতে কোনো আপত্তি তোলেনি। সে বরং মুচকি মুচকি হেসে মাথা দুলিয়েছে। এই হাসিটাও সহ্য হয়নি শাকিলার। না জানি কী ফন্দি এঁটে আছে মনে মনে। গুঁচি মাছকে বিশ্বাস করা যায়, বিন্তু ওকে নয়। ছুঁতছুঁত করবে  সব সময়, পিছলাবার জন্য।

রাস্তাটা অনেক দিন ধরেই মেরামত হয়নি। ভ্যান লাফিয়ে উঠছে থেকে থেকে।  ছেলে দুটো এতে বারবার সরে যায় পেছনের দিকে। একটার এক হাত ধরে আছে নেকবর, অন্যটার শাকিলা। এমন সময় চিল্লিয়ে উঠল ছোট ছেলে।- ‘আব্বা দেখ দেখ গরুর শিঙে পাখি।’ সবাই সেদিকেই তাকাল। বড়টা বলল- ‘ওটা কী পাখি মা?’ মা উত্তর দিল না। সে যে নাম জানে না, তাও বলল না। বলল নেকবর। তবে পাখির নাম নয়, কথা বলে শাকিলাকে ধাক্কা দিল।Ñ ‘তাহলেই হয়েছে, পাখির নাম বলবে তোর মা। তোর বাপের নামটা বলতে বলত, পারে কি?’ শাকিলা কোনো উত্তর দিল না। তবে তার ভেতরটা এখন কত ডিগ্রিতে পৌঁছেছে তা নেকবরই ভালো করে বুঝল। সামনে একটা বড় ইটভাটা। ভাটার বেশিরভাগ কর্মীই মহিলা। রোদে শুকানো কাঁচা ইট তারা মাথায় করে সার বেঁধে ভাটার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেদিকেই তাকিয়ে আছে নেকবর। সমান খাটুনি, তবুও পুরুষের থেকে তাদের মজুরি কম। অথচ কীভাবে শরীরটা মাটি করছে মাটি টেনে। এমনটাই ভাবছিল নেকবর। তাকিয়ে আছে এক ধেয়ানে। এটা শুরু থেকেই খেয়াল করছিল শাকিলা। আর থামতে পারল না। আগের রাগটা এখন বের হলো।Ñ ‘চোখ তো নয়, যেন শকুনের চোখ। গিলে খাবে মনে হয়।’

নেকবর চোখ ফিরিয়ে হাসল।- ‘শোন, নেকবর যা দেখে তা নেক নজরেই দেখে। অবশ্য তুমি তা বুঝবে না। যার মনটাই পরিষ্কার নয়।’ শেষের কথাটা বাতাসে ছাড়লেও তা দমকা হয়ে লাগল শাকিলার গায়ে।- ‘হ্যাঁ, তাই-ই তো, তোমার চোখ যে কত ভালো তা আমার থেকে কে আর জানে। গাছের কুমড়াজালির দিকে তাকালেও তাতে পোকা ধরবে।’

‘কেন মা, আব্বার চোখে কী হয়েছে? ছোট ছেলে প্রশ্ন করল।

‘চোখে ঢেলা হয়েছে। সব কথার মধ্যে ঢুকিস কেন, হ্যাঁ?’ খেঁকিয়ে উঠল শাকিলা। ছেলে মায়ের রাগ বুঝে চুপ মারল। কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল নেকবর। এতে কথা বাড়বে। তাছাড়া ছেলে দু’জন গা ঠেকিয়ে বসে। সারা রাস্তা আর কথা হলো না।

বেশ গানবাজনা চলছে বিয়ে বাড়িতে। এখন প্রায় মাঝরাত। তবু শোরগোলে কমতি নেই। দুটো ডেগ ভাড়া করা হয়েছে। বড় বড় বক্সে গান বাজছে, দুই জায়গায়। বাড়ির মধ্যে আর বাড়ির বাহিরে। এক জায়গায় হলেই চলত। নাচন-কুদনে আরও মাত্রা যোগ হতো। এটা অবশ্য শাকিলার পরিকল্পনা। ছেলেরা বাহিরে নাচগান করবে আর মেয়েরা করবে বাড়ির মধ্যে। দিনভর অনেক সহ্য করেছে। রাতে তা বাড়বে নিশ্চয়। কেলেংকারি হবে একটা। হইচই পড়বে বিয়ে বাড়িতে। সে নিজেই বাড়ি মাথায় তুলবে। তার চেয়ে এই ভালো।

দুপুরেই গণ্ডগোল হতে হতে হলো না। বিষ হজম করেছে শাকিলা। তিন দিন ধরে বয়াত পড়িয়েও লাভ হলো না। গু-খাওয়া গরুর মুখে যতই ঠুসি পরাও, ঠিক মুখ ঘুষটাবে। ভাইকে গোসল করাবার সময় আদা-গুড় খাওয়া নিয়ে তারা কী কাণ্ডটাই না ঘটাল। লবঙ্গলতা খাবার সময় তাকে আমপাতা দিয়ে পিটাল নেকবর। আবার নেকবর খাবার সময় পিটাল লবঙ্গ। এরপর রং খেলল সবাই। যেন বিয়ে বাড়ি নয়, বসন্ত উৎসব। হোলিখেলায় মেতেছিল সবাই। কে কার কোথায় রং মাখাল, কেউ খেয়াল করল না। সবাই হেসে গড়াগড়ি। খেয়াল করল একজন। শাকিলা। শেষ পর্যন্ত সেখানে থাকতে পারেনি সে। ঘরে এসে দরজা দিয়ে গোখরো হয়ে ফুপিয়েছে। তার ফলেই রাতে এই ব্যবস্থা। সে জানে বক্সে গান বাজলে লবঙ্গকে থামান যাবে না। সে ঠিকই নাচবে। সে নাচতে না চাইলেও পাড়ার মাগিরা টেনে নামাবে। তার নাচের সুনাম এর আগেই শুনেছে। তারটাও কম যায় না। দেখা যাবে দু’জনেই নেমে পড়বে এক সময়। সবাই হাততালি দেবে। আর তা লাগবে শাকিলার বুকে। এতকিছু ভেবেই শাকিলা নিজেই এই ব্যবস্থা করেছে। ডবল ডেগ ভাড়া করার খরচাও সে নিজেই দিয়েছে।

নাচ-গান চলল রাত ১টা পর্যন্ত। মেয়েদের নাচগান তালের মধ্যে থাকলেও ছেলেদেরটা গেল বেতালে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন ধরনের সেবা নেওয়াতে টালমাটাল হয়েছে। নেকবরও খেয়েছে। পুরো এক বোতল গিলেছে একলাই। এখন বেসামাল। অথচ তার নাচই ছিল সবার থেকে আলাদা। হাততালি পড়েছে তারটাতেই বেশি। পর্ব শেষ হলে নেকবরকে একজন হাত ধরে বাড়ির মধ্যে নিয়ে এলো। শরীরটা তখনও বেসামাল। দু’চারজন ছিছি করলও বটে। তারা বলল- শ্বশুরবাড়িতে জামায়ের এমন করা ঠিক হলো না। কেউ বললÑ আমরা কত ভালো জানতাম, সে কিনা এই। অনেকে অনেক কথা বললেও শাকিলা কিছু বলল না। সে বরং খুশিই হয়েছে। আজ রাতটা অন্তত তাকে ভাবতে হবে না। মরার মত ঘুমাবে। নেকবর তখনও নেশার ঘোরে গুনগুন করে গাইছে।

বাড়িতে ঘর বলতে দু’টো। আড়াইটা বললেও চলে। তবে ছোট ঘরে কেউ থাকে না। সে ঘরে এখন গিজগিজ করছে বিয়ের বাজার। চাল, ডাল, তেল-মসলা। সেই ঘরের ছোট চৌকিতে শুতে দিল নেকবরকে। ছোট চৌকি। দু’জনে ঠাসাঠাসি হবে। শাকিলা ঘুমাতে গেল অন্য ঘরে; খালা, ফুপু, মায়ের সাথে।

এক ঘণ্টা একাত ওকাত করে কাটাল শাকিলা। ঘুম আসে না। চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে লবঙ্গর নাচ। কত চমৎকার নাচে মেয়েটি। সত্য কথা বলতে কি, তারও ভালো লেগেছিল লবঙ্গ-নাচ। হিংসা হয়েছিল লবঙ্গর টানটান শরীরকে। মাথা নষ্ট করার মতো শরীর বটে। চোখের সামনে থেকে সরে না লবঙ্গ। চোখ বুজলেও সামনে থাকে। চোখ বুঁজলে আরও একটা জিনিস চোখে পড়ে, লবঙ্গর সাথে কে যেন দ্বৈত নৃত্য করছে। সে আর কেউ নয়, নেকবর। নেকবর লবঙ্গর কোমরের ওপরের খালি অংশে হাত দিয়ে নাচে। লবঙ্গর হাত নেকবরের কোমরে। দু’জনের অন্য হাত দু’টো একে অপরের খামচানির মধ্যে। চোখ খুলে দেখতে পায় শুধু লবঙ্গকে। তখন নেকবর ভাড়ারের ঘরে। না, ঘুম আসে না শাকিলার। এর মধ্যে দুইবার গিয়ে দেখে এসেছে নেকবরকে। সে বেঘোরে পড়ে আছে। তবুও তার বিশ্বাসে কুলায় না। সে কি সত্যিই ঘুমিয়েছে, নাকি ঘুমের ভান করছে? নাকি নেশা না করে নেশার ভান? সে সব পারে। শিকারি বিড়াল হার মানে তার কাছে।

ঘরে ছোট আলো জ্বলছে। বাল্বের ঘোলা আলো এখন কিছুটা পরিষ্কার। ঝাপসা হলেও ঘরের সবকিছু দেখা যায়। চালের বস্তা, তেলের টিন, মসলার ডালা। এ ঘরে যেন সবাই জেগে আছে। শুধু কেমন মাতালের মতো ঘুমুচ্ছে নেকবর। মাতালের মত কি, মাতালই তো। বেহুঁশ-ঘুম।

ফজরের আযান তখনও কোনো দিকে হয়নি। নেকবরের নেশা কেটে এসেছে। তবে পুরো নয়। নেকবর পাশ ফিরতে চাইল। ঠিক তখনই বুঝল, কে যেন তাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে; বাম হাতকে আঁকশি করে। তবুও জোর করে ঘুরল নেকবর। তার ডান হাত গিয়ে পড়ল বাঁ পাঁজর টপকে অন্যের খোলা পিঠে। তখনও তাকে জড়িয়ে থাকা হাত বেশ আটিল। হাতের উল্টো পিঠে চোখ ঘঁষে নতুন করে তাকাল নেকবর। চোখ তখনও খানিকটা ঝাপসা। তবুও চমকে উঠল। পার্শ্ববর্তিনী চিত হতেই আরও একবার চমকে উঠল। কে শুয়ে আছে তার পাশে। এ তো অন্য কেউ। ঝিমঝিম ভাব মাথাতে থাকলেও, সেই মাথা কাজে লাগাল। গতকাল দুপুরে যা ঘটেছে, শাকিলা অন্তত পাঁচ দিন তার ছায়া মাড়াবার কথা নয়। পাশে ঘুমানো তো দূরে কথা; কথাও বলবে না। কিন্তু এটা কে? আরও একবার ভালো করে দেখে চমকাল- এ যে লবঙ্গ। ‘লবঙ্গ তুমি?’ লবঙ্গ কথা বলল না। বিদ্যুৎ লাগার মত চমকে উঠল যেন। কিন্তু উঠল না। সে ওভাবেই পড়ে রইল। যত অস্থিরতা, তা এখন নেকবরের। এই তো সেই মুখ। সিঁথিতে সিঁদুর। হাতে শাঁখা। সেই নাক সেই গাল। লাল হয়ে উঠেছে মুখ। পাল্লা দেয় কপালের সিঁদুরের সাথে। কোন সুখে কাঁপছে সমস্ত শরীর। লম্বা সময় ভোল্টেজের ঘাটতিতে চলা মেশিন হঠাৎ পুরো ভোল্টেজ পেলে নিজের সামর্থ্য জানান দিতে যেভাবে কাঁপে; তেমনি।Ñ ‘লবঙ্গ তুমি কখন এলে। ডাকনি কেন? আমি জানতাম তুমি আসবে। শালাবাবুকে গোসল করানোর সময় তোমার ইশারা আমি ঠিক ধরেছিলাম। আদা-গুড় মুখে নেবার সময় তোমার হাতের আমপাতার আঘাতে এমন ইঙ্গিতই ছিল। আহা কি গাল, কি ঠোঁট। পাকা তেলাকুঁচা লজ্জা পাবে। অথচ শাকিলার ঠোঁট দেখলেই কেমন জানি রক্ত গেলা জোঁকের মতো লাগে।’ ঠোঁটে হাত বুলাল নেকবর। যাকে বলা হলো সে আলগা না হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হলো। যেন জোর করে নিজেকে সামলিয়ে রাখতে চায়। পরীক্ষা নিতে চায় নেকবরের। যেন আদরের, সোহাগের শেষ দেখতে চায়। কতদূর আগাতে পারে তা দেখতে চায়। দেখতে চায় নেকবরের ক্লান্ত হয়ে পড়া। পাগলের মতো আদর করে চলে নেকবর। তবে আদরিনী উল্টো দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। এতে নিঃশ্বাসের তোলা-ফেলার শব্দ বাড়ে। ঘনঘন নিঃশ্বাসে আগুন। নিঃশ্বাস না বলে ফোঁপানি বলা ভালো। কোনো বিষধর সাপিনীর লেজটা শুধু মাটিতে এখন। তার সাপাকে কে যেন সদ্য মেরে ফেলেছে। হন্তাকে খুঁজে মরে সাপিনী। নেকবরও শুনতে পায় ফোঁপানির শব্দ। বুকে লাগে নিঃশ্বাসের ভাপ। তবে নেকবর এ ভাপে সিদ্ধ হয় না; সুখ পায়। সেও হয়ে ওঠে হারিয়ে থাকা সাপিনীকে হঠাৎ ফিরে পাওয়া সাপা। তারও লেজ শুধু মাটি ছোঁয়া। তবে বিষের থলিটা বিষ-শূন্য। তা এখন পূর্ণ অমিয় সুধায়।Ñ ‘সত্যই লবঙ্গ তোমাকে আর পাঁচজন থেকে সব সময় আলাদা করা যায়। আদর করেই সুখ। তোমাকে পাটপাট করে আদর করা যায়। তুমি সব সময় নতুন। তুমি প্রথম ভাঁজভাঙা কাপড়ের মতো। সারা শরীরে মাড়। সব সময় মটমট কর। আর আমার শাকিলাকে দেখ; তেনা। একটুতেই নেতিয়ে পড়ে।’ নেকবর এখন পাকা যন্ত্রী। তার হাত পাগলের মতো বাজিয়ে চলে সেতার। তবু সুর ওঠে না নেকবরের হাতে। সুর ছাড়ে না সেতার। সেতার শুধু ফুঁপিয়ে মরে। এবারের ফোঁপানির শব্দ একটু আলাদা। চোখ দুটো ভিজে এসেছে।Ñ ‘লবঙ্গ তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন। এতে মুখ ঢাকবার আছেই বা কী? তুমি কি কাঁদছ? জানি এ তোমার অভিমান। এভাবে কেউ কখনই তোমাকে আদর করেনি। আর অধীর আদর করবেই বা কী। ও শালা টাকার কারবারি আদরের কী বুঝে? ও শালা বুঝে টাকার কত অংশ থাকলে কত টাকা বাটা কাটতে হবে। তোমাকে আর ভাবতে হবে না; আজ থেকে আমি আছি তোমার সঙ্গে। বিশ্বাস কর জান, তোমার প্রত্যেক অঙ্গের জন্য আমার প্রত্যেক অঙ্গ কাঁদে। না না, তুমি যতই গুটাও আর গুচি মাছ হও, পিছলাতে আজ দেব না। হাতভর্তি ছাই নিয়েই নেমেছি।’ আদরিনী নিজেকে আর আটকাতে পারল না। তার শরীরেও রক্তমাংশ। ছোট লাল পিঁপড়ে হাঁটলেও সে টের পায়। শিউরে ওঠে শরীর। নেকবরের আদরিনী লাফ দিয়ে বসল। শরীরের এলোমেলো কাপড় গুছিয়ে সটান দাঁড়াল দরজার দিকে মুখ করে। পেছন দিকটা নেকবরের দিকে।Ñ ‘ওকি জান, তুমি চলে যাচ্ছ? থাক আরও কিছুক্ষণ। কেবল তো দূরের এক মসজিদে আযান হলো। তা ছাড়া সবাই দেরিতে ঘুমিয়েছে। উঠবেও দেরিতে।’ না, সে বাহির হলো না। সোজা গেল সুইচ-বোডের কাছে। দেরি না করে বড় আলোর সুইচটা টিপে দিল। মুখটা ঘোরানোর প্রস্তুতির জন্য খানিকটা দেরি হলো বোধ হয়। সেই সুযোগেই উঠে দাঁড়াল নেকবর।Ñ ‘ও বুঝেছি, তুমি আলোর মধ্যেই আলো ছড়াতে চাও। পাল্লা দিতে চাও বড় বাল্বের সাথে। ঠিক আছে, আমি জানালাটা লাগিয়ে দিই। কাথাটা আমার মাথাতেই আসেনি। লাইট জ্বালানো আমারই উচিত ছিল। ইস! কত কি মিস করলাম। সত্যিই আমি একটা গর্ধব। আসলে কি জান লবঙ্গ, অসুন্দরের সাথে থাকতে থাকতে সুন্দর কীভাবে দেখতে হয় ভুলেই গেছি।’ জানালার পাল্লা দু’টো লাগিয়ে পেছন ফিরেই থমকালো নেকবর। অসার হলো দেহ। পাথর মূর্তি তবুও তো দাঁড়িয়ে থাকে, নেকবর তাও বুঝি পারছে না। সাপের রক্তের চেয়েও বুঝি হিম হলো তার ভেতর। শাকিলা এখন তার দিকেই তাকিয়ে। বুকটা বেশ ওঠা-নামা করছে। চোখ দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঝরছে গলিত আগুন। যতটুকু সময় পেল, তার মাঝেই নেকবর চোখে হাত ঘষে স্পষ্ট দেখল- শাকিলার কপালে সিঁদুর নেই, আছে গতকাল দুপুরে রং খেলতে গিয়ে লাগা লাল রং। হাতে শাঁখা নেই, আছে পানিপলা। ফুল তোলা চওড়া পলা দু’টো গত পরশু নেকবর নিজেই কিনে দিয়েছিল ফেরিওয়ালার কাছ থেকে। সেটাই ডিম লাইটের আলোতে বেশ সাদা দেখাচ্ছিল। নেকবর আর তাকাতে পারল না। ভাষাও এলো না মুখে। ঘামে সমস্ত শরীর ভিজে একাকার। ধপ করে বসে পড়ল। আসন নির্দিষ্ট না করেই বসল। হুড়মুড়িয়ে পড়ল চৌকি আর দেয়ালের মাঝের ফাঁকে। নেকবরের মনে হলো পাঁচ বছর আগের সেই ব্যথাটা আবারও বুকের বাঁ দিকে জেঁকে উঠছে। সেদিন হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। আজকে কোথায় নিতে হবে সে ভাবতে পারল না। নিচের দিকে মুখ রেখে তবুও বেশ জোর করে ভাঙা স্বরে বললÑ ‘আমি বাড়ি যাব।’ শাকিলা বারবার কথা গুছিয়েও যুতসই কিছু পায় না। বুকের মধ্যেই তা ঘুরপাক খায়। কথা মুখে আসে, কথা হাতে আসে। কথা হাতে আসে, কথা মুখে আসে। কথা প্রকাশ হয় না কথার ভারে। উপযুক্ত হয় না নেকবরে জন্য।

এরপরে কী হলো তা কেউ জানল না। শুধু জানল নেকবর আর শাকিলা। খানিক পরে পাশের ঘর থেকে ঘুম ভেঙে শাকিলার মা বলল-‘ ঘরে কী হয়েছেরে, শব্দ কিসের?’ শাকিলার কিছু না বললেও চলত। বলার শক্তি তেমন ছিল না। তবুও বললÑ ‘বিড়াল ঢুকেছে।’ মা আর কিছু বলল না। চোখ বুঁজল। শাকিলার হাতের সিলভারের পাতিলটা ততক্ষণে দুমড়ে অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে।

নেকবরের জ্ঞান তখনও ছিল। সে দেখতে পেল শৈশবের হুলো বিড়ালটাকে। যে দুধের ঘটিতে মুখ ঢুকিয়ে আর বের করতে পেরেছিল না। বেচারার সামনে পুকুর, নদী, কিংবা আগুন, সব সমানে রাস্তা। হুলো মরল পুকুরে ডুবে। হুলোর মাথাটা তখনও ঘটির মধ্যেই ছিল। 

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares