বাঙাল-২ : স্বকৃত নোমান

শরাখালিতে সেদিন হাটবার। আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন আসছে, হাটবাজার করছে, দোকানপাটে বসে টিভি দেখছে, গল্পগুজব করছে। তখন তো গল্পগুজবের একমাত্র বিষয় করোনা ভাইরাস। চীনের উহানে তাণ্ডব চালিয়ে করোনা তখন ইরান, ইতালি ও স্পেনে দাপাচ্ছে। বাংলাদেশেও চৌদ্দজন আক্রান্ত। করোনা প্রতিরোধে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ঢাকার মানুষজন গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রবাসীরাও আসছে নানা দেশ থেকে। বেশি আসছে ইতালি আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কে রোগটা বয়ে আনছে বলা মুশকিল। এয়ারপোর্টে অবশ্য স্ক্যানার বসেছে। যাদের শরীরে রোগটার উপসর্গ ধরা পড়ছে, তাদের রাখা হচ্ছে কোয়ারেন্টিন সেন্টারে। কেউ কেউ নাকি ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। পলায়নকারীদের মধ্যে লালমোহনেরও নাকি একজন আছে। কোন গ্রামের কে জানে। লালমোহনে তো বিস্তর প্রবাসী। করোনার প্রকোপে অনেকে ফিরে আসছে।

ভোলায় রোগটা তখনও ঢোকেনি। ঢুকলেও শনাক্ত করা যায়নি। এই রোগ নিয়ে তেঁতুলিয়া পাড়ের জনপদ শরাখালির মানুষজনের অত দুশ্চিন্তা নেই। রেডিও-টেলিভিশনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলছে, হ্যান্ডশেক-কোলাকুলি করতে বারণ করছে, সাবান দিয়ে বারবার হাত ধুতে বলছে, কিন্তু কেউ মানছে না। কেন মানবে? হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। সময় হলে করোনা লাগবে না, সামান্য মাথাব্যথাতেই জীবনবাতিটা নিভে যাবে। তাছাড়া মুফতি সেরাজউদ্দিন তো সেদিন বাবুরহাটের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে বলেছেন, করোনা আল্লাহর সৈনিক। ইহুদি-নাসারাদের শায়েস্তা করার জন্য আল্লাহ এই সৈনিক পাঠিয়েছেন। নাস্তিকদের দেশ চীনে প্রথম এই রোগ ধরা পড়েছে। পড়বে না? উইঘুর মুসলমানদের যেভাবে নির্যাতন করছে চীনারা, আল্লাহ আর কত সইবে? চীনের নাস্তিকরা দলে দলে এখন মুসলমান হয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছে। একেই বলে আল্লাহর মাইর জগতের বাইর। আমরা মুসলমান, আল্লাহর পেয়ারা বান্দাহ, আমাদের ভয়ের কিছু নাই। যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে তাদের ধারেকাছেও ভিড়তে পারবে না করোনা। কেয়ামতের আগে কানা দাজ্জাল যেমন ইমানদারদের দেখে দৌড়ে পালাবে তেমনি করোনাও দৌড়ে পালাবে। করোনা প্রতিরোধে সৌদি সরকার কাবা শরিফ বন্ধ করে গুরুতর গুনাহ করেছে। একেই বলে খোদার ওপর খোদাগিরি। সৌদি বাদশা তো ইহুদি-নাসারার দালাল। যুবরাজ মুহম্মদ বিন সালমান তো আমেরিকার গোলাম। তার ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের সীমা নাই। আল্লাহর গজব নাজেল হবে তার ওপর। নাস্তিকরা বাংলাদেশের মসজিদ বন্ধের দাবি তুলছে। আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, শরীরে এক বিন্দু রক্ত থাকতে এই নব্বই পার্সেন্ট মুসলমানের দেশের কোনো মসজিদ বন্ধ করতে দেওয়া হবে না।

গত জুমার বয়ানে শরাখালি জামে মসজিদের ইমামও প্রায় একই কথা বলেছেন, ইসলামে সংক্রামক বেধি বইলা কিছু নাই। য্যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ে হ্যাগো করোনা অইবে না। ফলে ছ-মাস ন-মাসেও যারা মসজিদে যেত না তারাও এখন মসজিদে ভিড়ছে। পাঁচ ওয়াক্ত না হলেও অন্তত তিন ওয়াক্ত জামায়াতে আদায় করছে। মাগরিব ও এশার ওয়াক্তে তো মসজিদের ভেতরে জায়গা হয় না। তালপাতার চাটাই পেতে বারান্দায় কাতার করতে হয়। নামাজ শেষে দোকানপাটে বসে চা-নাস্তা খাচ্ছে, টিভি দেখছে, গল্পগুজব করছে, উজির-নাজির মারছে।

তখন বিকেল চারটা। শরাখালি হাট জমে উঠেছে। নদীর পাড়ে এক চা-দোকানে বসে বুট-পেঁয়াজু খেতে খেতে টিভির খবর দেখছিল মনসুর। তার বাড়ি লালমোহন সদরে। লালমোহন সরকারি কলেজের ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। শরাখালি বাজারের উত্তরে তার নানাবাড়ি। কলেজ বন্ধ হওয়ায় বেড়াতে এসেছে। মেধাবী ছাত্র। দেশ-দুনিয়ার খবরাখবর রাখে। ফেসবুকে নানা বিষয়ে টুকটাক লেখে। টিভির খবরের দিকে দোকানের মানুষজনের খেয়াল নেই। তারা আলাপ করছে তেঁতুলিয়ায় নৌকাডুবি নিয়ে। কচুখালির ওদিকে নৌকা ডুবে তিন জেলে মারা গেছে। এখনও একজনের লাশ পাওয়া যায়নি। টিভির খবরে বলছে, করোনা উপসর্গ নিয়ে এক রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পালিয়েছে। মনসুরের মনে পড়ে গেল ঢাকার কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে পালানো লালমোহনের নুরালমের কথা। ফেসবুকে তাকে নিয়ে ট্রল চলছে। লোকটার বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ, গোলগাল মুখ, চ্যাপ্টা গোঁফ, মাথায় হালকা টাক। তার বাড়ি লালমোহনের কোথায়? সে কি এখন হোম কোয়ারেন্টিনে আছে? না থাকলে তো সর্বনাশ। বাড়ির সবাই করোনায় আক্রান্ত হবে। সে কি নামাজ পড়ে? মসজিদে গেলে তো মুসল্লিরাও আক্রান্ত হবে। মৌলবি-মাওলানারা যতই বলুক, মনসুর বেশ ভালো করেই জানে, করোনা রোগটা মুসলিম-অমুসলিম মসজিদ-মন্দির মানে না। মানলে কি কাবা শরিফ বন্ধ থাকত? মসজিদে নববি বন্ধ থাকত? ইরানে এই ম্যাসাকার চলত? অনেক মুসলিমপ্রধান দেশের মসজিদগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আজানে ‘হাইয়া লাস সালাহ’র পরিবর্তে বলা হচ্ছে ‘আসসালাতু ফি বুয়ুতিকুম’। অর্থাৎ আপনারা ঘরে বসে নামাজ পড়ুন।

বুট-পেঁয়াজু শেষ করে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল মনসুর। মানুষজনের মনোযোগ এবার খবরের দিকে গেল। খবরে বলছে, ইতালির অবস্থা ভয়াবহ। হাসপাতালগুলোতে রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না। কাকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে আর কাকে ফেলে রাখবে, ডাক্তাররা বুঝে উঠতে পারছে না। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা গড়ে একশ জন করে বাড়ছে। এই বিপুল পরিমাণ রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়া কোনো দেশের এমন পরিস্থিতি ভাবা যায় না। স্পেনেও প্রায় একই অবস্থা। রাস্তাঘাটে লাশ পড়ে আছে। গোটা দেশ লকডাউন। এরপর আমেরিকা হয়ে উঠবে করোনার ভরকেন্দ্র। কঠোর সতর্কতা জারি হয়েছে দেশটিতে। ভারতে লকডাউন ঘোষণার কথা ভাবছেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশেও এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। অল্প কদিনের মধ্যেই ঘোষণা হতে পারে।

দোকানের কোণার দিকে বসা এক বুড়ো বলল, লকডাউন আবার কি জিনিস?

আরেকজন বলল, লকডাউন বোজো না মেয়া? লকডাউন মানি হইলো দ্যাশের দুয়ারে তালা দিয়া আটকাইয়া দেওয়া। যেমন ধরো এয়ারপোর্ট হইলো একটা দুয়ার, চিটাগাং পোর্ট হইলো আরেউক্কা দুয়ার। এইরহম যতগুলান দুয়ার আছে সবগুলানে তালা লাগাইয়া লক কইরা দেবে।

বুড়ো বলল, কেডা জানে বাবা! আখেরি জামানার এইসব ব্যাপার-স্যাপার মাতায় ধরে না।

দোকান থেকে বেরিয়ে বাবাকে ফোন দিল মনসুর। লকডাউন শুরু হলে তো বাস-ট্রাক-লঞ্চ-ট্রেন কিছুই চলবে না। ঢাকা থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আসবে না। এলেও দাম হবে চড়া। কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন তেল, নুন, চিনি, আটা, ডাল ইত্যাদি বেশি করে কিনে রাখতে বলল বাবাকে। তারপর গেল মাছবাজারে। গলির মুখে মানুষের জটলা। তেঁতুলিয়ায় জেলেদের জালে মস্ত এক পাখিমাছ ধরা পড়েছে। বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। পথ ভুল করে নদীতে ঢুকে পড়েছিল। পিঠের দিকে পাখির মতো পাখনা। ওজন প্রায় সত্তুর কেজি। কেটে কেজি দরে বিক্রি করা হবে। প্রতি কেজি পাঁচশ টাকা হাঁকছে মাছওয়ালা। কেউ চারশ’র ওপরে উঠছে না।

মাছটার ছবি তুলে ‘বিরল প্রজাতির মাছ’ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করল মনসুর। তারপর গেল মাঝবাজারের পাকুড়তলায়। সেখানে একিন আলি ক্যানভাসার ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি করছে। বেঁটেখাটো হ্যাংলা-পাতলা একটা লোক। বাড়ি লালমোহন সদরে। নানা হাটবাজারে ঘুরে এই ওষুধ বিক্রি করে। একটা ক্যাসেট প্লেয়ারে অবিরাম বেজে চলেছে, ইঁদুর মারেন, তেলাপোকা মারেন, ছারপোকা মারেন, পিপড়াগুলো মারেন। জাদুর কাঠি ম্যাজিক ডন, দাগ দিলে মরে, ঘষা দিলে মরে, তেইল্লাচোরা মরে। চোরার ঘরে চোরা তেইল্লা চোরা, জায়গায় খায় জায়গায় ব্রেক, ইঁদুরগুলা ব্রেক, লাইনে খায় দেয়ালে মরে। কাইৎ হইয়া খায় চিৎ হইয়া মরে, লাফাইয়া খায় দাপাইয়া মরে, ইঁদুরগুলা মরে। ইঁদুর-চিকা মারামারি, নষ্ট করে বাসাবাড়ি, ওষুধ কিনেন তাড়াতাড়ি। ময়নার মার ঘুম নাই, ইঁদুর তোর বাঁচন নাই, ধরা পড়লে জামিন নাই।

বাঁ-দিকের রাস্তার ধারে কোরা ভরতি চাল নিয়ে বসেছে তিনজন লোক। পোলাউ আর বিন্নি চাল। একটা লোক পোলাউর চালের দরদাম করছে। দেখেই মনে হচ্ছে বিদেশফেরত। বিদেশফেরতদের দেখলেই চেনা যায়। গায়ে থাকে নতুন শার্ট-প্যান্ট, পায়ে চামড়ার স্যু-স্যান্ডেল, মাথার চুল সুন্দর করে ছাঁটা এবং গায়ে ভুর ভুর করে স্যান্টের ঘ্রাণ। লোকটার পোশাক-আশাকও তাই। প্যান্টে ইস্ত্রির ভাঁজ, চেক শার্ট, পায়ে বিদেশি জুতা, ক্লিনসেভ গোলগাল মুখ, চ্যাপ্টা গোঁফ, মাথায় হালকা টাক। পঁয়তাল্লিশের মতো বয়স। লোকটাকে মনসুরের চেনা চেনা মনে হচ্ছে। হয়তো আশপাশের কোনো গ্রামের মানুষ। হয়তো ঢাকা-চট্টগ্রাম বা বরিশালে চাকরি করে। ছুটিতে বাড়ি এসেছে।

ফেসবুক দেখছিল মনসুর। মাছের পোস্টটায় কুড়িটা লাইক পড়েছে। কমেন্টও করেছে দুজন। হঠাৎ তার মনে হলো ঢাকার কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে পালানো ইতালিফেরত নুরালমের চেহারার সঙ্গে এই লোকটার চেহারার যেন মিল আছে। ফেসবুকে সে নুরালমের ছবিটা খুঁজতে লাগল। কার আইডিতে থাকতে পারে? মনে করার চেষ্টা করল সে। সহসা মনে পড়ে গেল। বরিশাল শহরের এক কবি, জুনায়েদ মাহমুদ, শেয়ার নিয়েছিল। তার ওয়ালে ঢুকল সে। কয়েকটা পোস্টের পরেই ছবিটা পেল। হুবহু এক। মাথা তুলে তাকাতেই দেখল লোকটা দক্ষিণ বাজারের দিকে হাঁটা ধরেছে। মনসুরও হাঁটা ধরল সেদিকে।

এক মুদিখানায় ঢুকল লোকটা। পেছনে মনসুরও। লোকটা সদাইপাতির একটা স্লিপ দিল দোকানির হাতে। ঘুরে তাকাতেই মনসুর চমকে উঠল। এ তো কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে পালানো সেই লোকটাই! দ্রুত পকেট থেকে মাস্কটা বের করে সে মুখে লাগাল। তারপর বলল, আঙ্কেল, আপনার নাম কি নুরালম?

জে। আপনে?

আমার বাড়ি লালমোহন।

এহানে কোম্মে?

ইদ্রিস মাস্টার মোর নানা।

তুমি ইদ্রিস কাকার নাতি? কাকা কেমন আছে?

নানায় তো গত বছর মারা গ্যাছে।

কী কও! ইন্নালিল্লাহ।

আপনি ইতালি থেকে ফেরছেন, তাই না?

হাতের ব্যাগটা চালের বস্তার ওপর রেখে নুরালম বলল, হ্যাঁ, দুইদিন আগে  ফেরলাম। তুমি ক্যামনে জানলা?

প্রশ্নটা এড়িয়ে মনসুর বলল, ইতালিতে নাহি করোনায় বিস্তর মানুষ মইরা যাইতাছে?

আর কইও না! হেইল্লাগ্যাই তো চইলা আইলাম। ভয়াবহ অবস্তা। হুহু কইরা বাড়তে আছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাঙালিরা পড়ছে মহাবিপদে। শয়ে শয়ে বাঙালির চাকরি যাইতে আছে। আক্রান্তও অইছে অনেক।

আহা রে! আচ্ছা আঙ্কেল, আমনেরে কোয়ারেন্টিন সেন্টারে রাখছেলে, হেইয়া না?

ননুরালম বিব্রত। উত্তর খুঁজে পায় না।

মনসুর বলল, আমনে পলাইয়া আইছেন।

নুরালম এবার খেপে উঠল, কেডা কয় এইরহম আউল-ফাউল কতা? পলামু ক্যা? মুই কি চোর?

মনসুর ফেসবুক ওপেন করে ছবিটা দেখিয়ে বলল, এই দ্যাহেন, ফেসবুকে আমনেরে লইয়া কী কী চলতেছে। ট্রলের পর ট্রল। বেবাক্কে ভোলা জেলার বদনাম করতাছে।

নুরালম বিস্মিত চোখে ছবিটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ভুয়া কতা, সব ভুয়া কতা। এয়ারপোর্টে কী বালের একখান স্ক্যানার বওয়াইছে, ভালো মানষেরেও করোনা রোগী বানাইয়া দেতে আছে। মোর কোনো করোনা-মরোনা অয় নাই, সব বাজে কতা।

মোবাইলটা পকেটে রেখে মনসুর বলল, আপনের কতা মানতে পারলাম না আঙ্কেল। আপনের নিশ্চই করোনা অইছে। বুজলাম বাড়ির টানে পলাইয়া আইছেন, কিন্তু আপনের হোম কোয়ারেন্টিনে থাহন উচিত। এইরহম প্রকাইশ্যে হাটেবাজারে ঘোরাফেরা কি ঠিক অইতাছে?

চুপ থাহো। এহনো তো ঠিকমতো মোছও ওডে নাই, এত ফাল পাড়ো ক্যান? বেয়াদব কোম্মের জানি!

দোকানি এতক্ষণ দুজনের কথা শুনছিল। তার চেহারায় ভয়ের ছাপ ভাসছে। সে হোম কোয়ারেন্টিন কী বুঝল না। শুধু বুঝল লোকটা যে করোনায় আক্রান্ত। সে খানিকটা দূরে সরে বলল, এ রাম! দ্যাহো কি কাণ্ড! আপনে করোনা রোগী আগে কইবেন না? আপনের স্লিপটা থেকে আমার হাতে লাগলো না তো!

মনসুরকে ছেড়ে নুরালম এবার দোকানির সঙ্গে তর্ক শুরু করল। উচ্চবাচ্য শুনে কয়েকজন হাটুরে ভেতরে ঢুকে দাঁড়াল। নুরালমের কথাবার্তায় বিরক্ত হয়ে দোকানি স্লিপটা ফেরত দিয়ে বলল, যান, আমনের ধারে খরচ বেচমু না।

নুরালমকে আর থামায় কে? পারলে তো দোকানির গায়ে হাত তুলে বসে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, খরচ বেচবেন না মানি কি? আমনের গায়ের জোর নাহি? আমারে চেনেন আপনে?

এবার দোকানিও খেপে গেল, আরে যান তো মেয়া। চিনি আমনেরে, আমনে নবাব সলিমুল্লা। চ্যাডের বাল কোম্মের জানি।

নুরালম একেবারে বোগদা বনে গেল। কড়কড়ে চোখে দোকানির দিকে তাকিয়ে রইল। ক্রমে লোকজন বাড়ছে। বাইরে ঠেকেছে ভিড়। বাইরে থেকে চকিদার মুকতাসের বলে উঠল, ও তো জাগলপুরের নুরু।

আরেকজন বলল, কোন নুরু?

আরে তালুকদারবাড়ির নুরালম।

ও আচ্ছা। কিন্তু কাজটা তো সে ঠিক করল না। এই খারাপ রোগডা নিয়া এইরহম ঘুইরা বেড়াইতাছে ক্যান? তারে তো পুলিশে দেওন উচিত।

পুলিশের কথা শুনে নুরালম বুঝি ঘাবড়ে গেল। সে কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে পালিয়েছে জানলে পুলিশ ঝামেলা করবে। টাকা চেয়ে বসবে। বলা যায় না, ধরে আবার কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠিয়ে দিতে পারে। স্লিপটা পকেটে ঢুকিয়ে ব্যাগটা নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। ভিড়ের একজন বলে উঠল, লোকটা তো চইলা যাইতাছে। তারে এইরহম ছাইড়া দেওন কি ঠিক অইতাছে?

কথাটা শুনে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল নুরালম। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরে দেখল কয়েকজন লোক এগিয়ে আসছে। জোর পায়ে হেঁটে বাজারের সীমানা পেরিয়ে একটা রিকশায় চড়ে বসল সে। কিন্তু রিকশাওয়ালা জাগলপুর যাবে না। ওদিকের রাস্তা খারাপ। নুরালম টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলার পরও রাজি হলো না। অগত্যা নেমে পড়ল সে। মানুষজন তখন ধর ধর বলে চিৎকার করে উঠল। বেগতিক বুঝে রাস্তা ছেড়ে জমিনে নেমে পড়ল সে। মাইলখানেক বিস্তৃত প্রান্তরটার ওপারেই জাগলপুর। সে ছুট দিল সেদিকে। ধর ধর বলে আবার চিৎকার করে উঠল মানুষজন। কিন্তু চিৎকারেই সারা, কেউ ধরতে যাচ্ছে না। রিকশাওয়ালা ভাবল লোকটা বুঝি চোর, চুরি করে বুঝি পালাচ্ছে। রিকশাটা সাইড করে রেখে সে দিল দৌড়। তার দেখাদেখি মুকতাসেরও। দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিল নুরালম। আর তখন একিন ক্যানভাসারও ছুট দিল। রিকশাওয়ালা ও মুকতাসেরকে পেছনে ফেলে সে নুরালমের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ধরে ধরে এমন সময় নুরালম থমকে দাঁড়িয়ে চট করে দক্ষিণে বাঁক নিল। একিন গোত্তা খেয়ে আবার ছুটল তার পেছনে। খানিকের মধ্যেই চিলের মতো ঝাপটে ধরল তাকে। ছিটকে পড়ল নুরালমের ব্যাগটা। শুরু হলো দুজনের ধস্তাধস্তি। নুরালমের রাগ একেবারে মাথার তালুতে চড়ে বসল। একিনের গালে মারল প্রচণ্ড একটা ঘুষি। মেরেই আবার ছুট। ব্যথাটা সামলে একিনও। মুহূর্তে আবার ঝাপটে ধরল তাকে। ধস্তাধস্তি করতে করতে দুজনেই চিৎপটাং। যেন সাপে-নেউলের লড়াই শুরু হলো। নুরালমের বুকে চড়ে বসেছিল একিন। এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে উঠে বসল নুরালম। একিনের লুঙ্গিটা খুলে গেছে। কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। চট করে সে নুরালমের একটা ঠ্যাং চেপে ধরে বলল, হালার পুত হালা, তুই যাবি কোম্মে! কয়েকবার টানাটানি করেও ছাড়াতে পারল না নুরালম। যেন কুমিরের কামড়। ততক্ষণে ছুটে গেল রিকশাওয়ালা ও মুকতাসের। একিন ধরল নুরালমের কলার, মুকতাসের ধরল কোমরের বেল্ট। বেয়াড়া পাঁঠার মতো টানতে টানতে নিয়ে গেল পাকুড়তলায়। মুকতাসের একটা দড়ি এনে গাছটার সঙ্গে তাকে শক্ত করে বাঁধল।

গোটা বাজারের মানুষ ভিড় করল পাকুড়তলায়। নুরালম যেন চিড়িয়াখানার কোনো জন্তু, সবাই তাকে অবাক চোখে দেখছে। দেখবে না? এতদিন তারা করোনা রোগের কথা শুনেছে, কিন্তু কখনও রোগী দেখেনি। কেউ কেউ তাকে ছুঁয়ে দেখছে। একদল ছোকরা কতক্ষণ পরপর এসে তার হাতে চিমটি কাটছে। নুরালম বারবার একিনকে হুমকি দিচ্ছে, মুইও তালুকদারবাড়ির পোলা। তোরে আমি দেইখ্যা নিমু হালা। এত বড় অপমান! কী ভাবজো তুই?

লোকজন তখন নুরালমকে পুলিশে সোপর্দ করার কথা বলাবলি করছিল। টিপু মেম্বার বাজারে আসেনি। এলে তার কাছ থেকে দারোগার ফোন নম্বরটা নেওয়া যেত। মুকতাসের বলল যে দারোগার নম্বর তার কাছেই আছে, কিন্তু ফোন নেই। একিন যেই না তার মোবাইলটা বাড়িয়ে ধরল অমনি পাকুড়তলায় এসে থামল পুলিশের জিপ। নদীর ঘাট থেকে ফিরছে। ভেতরে তিন কনস্টেবল ও এসআই জয়নাল। পুলিশ দেখে মুকতাসের দ্রুত নুরালমের বাঁধনটা খুলে দিল। জয়নাল দারোগাকে ঘটনার আদ্যান্ত খুলে বলল সে। জয়নাল দারোগা বললেন, সর্বনাশ! করলেন কী আপনারা! এখন তো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হবে!

কমিউনিটি ট্রান্সমিশন কী জিনিস কেউ বুঝল না। মুকতাসের বলল, হেইডা যাতে না অয় হেইলইগ্যা তো তারে ধইরা আনলাম। অনেক কষ্ট কইরা ধরছি স্যার।

নুরালম ফুঁপিয়ে উঠে বলল, দ্যাখলেন স্যার, এরা আমারে কি অপমানডাই না করল। মানলাম আমি করোনা রোগী, তাই বইলা এমন অপমান-অপদস্থ হরবে?

জয়নাল দারোগা বললেন, আপনি কোয়ারেন্টিন সেন্টার থেকে পালালেন কেন?

হেইডা আমি ভুল করছি।

একই ভুল মানুষ বারবার করে? হোম কোয়ারেন্টিনে না থেকে হাটেবাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?

নুরালম মাথা নোয়াল। দারোগা বললেন, যান, জিপে ওঠেন। আপনাকে শেরে বাংলা মেডিকেলের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠানোর নির্দেশ আছে।

শার্ট-প্যান্টের ধুলোবালি ঝেড়ে নিল নুরালম। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে বাড়িতে ফোন দিয়ে ঘটনাটা সংক্ষেপে জানাল। তারপর চুপচাপ উঠে বসল জিপে। হর্ন বাজাতে বাজাতে চলে গেল জিপ। আর তখন হৈহৈ করে সবাই ঘিরে ধরল একিন, মুকতাসের ও রিকশাওয়ালাকে। একটা কাজের কাজ করেছে তারা। সাহস করে তারা না ধরলে নিশ্চিত পালিয়ে যেত নুরালম। এক বুড়ো একিনের পিঠ চাপড়ে বলল, শাব্বাস ব্যাডা! এইয়ারেই কয় বীর-বাহাদুর। সঙ্গে সঙ্গে দশ-বারোজন মিলে তিন বীর-বাহাদুরকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিল কাঁধে। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ছুটল উত্তরবাজারের দিকে। পেছনে ছুটল কয়েকশ হাটুরে। মানুষজনের কাঁধে কাঁধে ঘুরতে থাকে তিন বাহাদুর। গোটা বাজারের অলিগলি চক্কর দিয়ে পাকুড়তলায় এসে থামল আনন্দ মিছিল। মনসুর তখনও পাকুড়তলায় বোগদার মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঘটনা যে এতদূর গড়াবে সে কল্পনাও করতে পারেনি। নিজের গালে এখন জুতা মারতে ইচ্ছে করছে। কী কুক্ষণে যে নুরালমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল!

কেটে গেল প্রায় এক মাস। দেশে তখন করোনা পরিস্থিতি জটিল আকার। আক্রান্ত ছাড়িয়েছে চার হাজার এবং প্রাণহানি শতাধিক। সারাদেশ স্থবির। অফিস-আদালত, মিল-কারখানা, বাস-ট্রেন-লঞ্চ সব বন্ধ। মসজিদ-মন্দির-গির্জাও। মসজিদে পাঞ্জেগানায় পাঁচজন আর জুমায় দশজনের বেশি যাওয়া বারণ। রোজার দেরি নেই। ইফতার মাহফিল করা যাবে না। তারাবির জামাতে ইমামসহ বারোজনের বেশি অংশ নিতে পারবে না। আইন ভাঙলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। সরকারি হিসাবে ভোলায় করোনা ভাইরাসে মারা গেছে চারজন, শনাক্ত ৩৭২ জন। গোটা শহর অচল। লালমোহনও তাই। দোকানপাট সব বন্ধ। শুধু মুদিখানা আর ডিসপেন্সারিগুলো খোলা। তাও সকাল থেকে দুটা পর্যন্ত। কেউ খোলা রাখলেই পুলিশ এসে বন্ধ করে দিচ্ছে। দুই দোকানদারকে জরিমানাও করেছে।

একটা মাস বাড়িতেই ছিল মনসুর। খুব একটা বেরোয়নি। সেদিন দুপুরে বাবার ওষুধ আনতে পৌর মার্কেটের এক ডিসপেন্সারিতে গিয়েছিল। রাস্তার ওপর চার-পাঁচজন লোক দাঁড়িয়ে। তারা বলাবলি করছে ভোলা জেলার করোনা পরিস্থিতি নিয়ে। মনসুরের কান সেদিকে। একজন বলল, গতকাইল লালমোহন সদর হাসপাতালে করোনায় একিন আলী ক্যানভাসার মইর‌্যা গেছে। আরেকজন বলল, বেচারা নুরালমও গেল। বাঁচার লইগ্যা ইতালি থাইক্যা দেশে আইছিল, আজরাইল ছাড়ল না। ডিসেপেন্সারির মালিক হাঁক দিয়ে বলল, শরাখালির অবস্থা তো ভয়াবহ। করোনা উপসর্গ নিয়া পুরুষ-মেয়েলোক-বাচ্চাসহ ৫৭ জন মইর‌্যা গেছে। কয়েক হাজার মানুষ করোনা উপসর্গে ধুঁকতেছ। মনে অয় আরও মরবে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares