আগামীর ইশতেহার : জয়দীপ দে

জায়গাটা রেলস্টেশন থেকে বেশ দূরে। ঘোড়ার গাড়িতে ঘণ্টা আধেক লেগে যায়। চারদিকে পুরোনো সব দর-দালান। মনে হয় ঘড়ির কাঁটা এখানে এসে থমকে গেছে অনেককাল হলো।

লোকজন এখানে আসে ঘুরতে। ঘোরার মতো জায়গা বটে। সম্রাট আকবরের আমলের তৈরি বিশাল এক দুর্গকে ঘিরে শহরটা। শহরের নাম ওয়ালেদা। দুর্গের নাম লাহোর ফোর্ট। পরে সেটা রঞ্জিত সিং-এর বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই রঞ্জিত সিং ছিলেন পাঞ্জাব-কাশ্মীরের অধিপতি। দুর্গের পাশেই তাঁর সমাধি। দুর্গ আর সমাধির মধ্যে হাজারিবাগ বাগান। বাগানের আরেক পাশে আওরঙ্গজেবের আমলে তৈরি বাদশাহি মসজিদ। রাজস্থানের লাল পাথর দিয়ে গড়া অনিন্দ্যসুন্দর কারুকাজের এক দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। ভেতরে ঝাড়বাতি, ফোয়ারা, পাথর বিছানো বিশাল চাতাল। দুর্গের পাশে একটা খোলা প্রান্তর। লোকে বলে গুড্ডি মাঠ। ব্রিটিশরা এখানে পার্ক করেছে। এক সময়কার বড়লাট লর্ড মিন্টোর নামে নাম রেখেছে মিন্টো পার্ক। একসময় এ মাঠে রঞ্জিত সিং-এর সৈন্যরা ভিড় জমাত। জমজমাট থাকত। এখন এমনটা হয় না। কিন্তু গতকাল থেকে মাঠে প্রচুর মানুষ। অনেক তাঁবু ফেলা হয়েছে।

মাঠটার তিনদিক সাপের মতো পেঁচিয়ে রেখেছে রাস্তা। তবে রাস্তা আর পার্কের বিভাজন রেখাটা প্রায় মুছে গেছে। মানুষের ঢল নেমেছে। ৬০ হাজার মানুষ পার্কের ভেতরে। তারা আমন্ত্রিত। বাইরে আরও হাজার চল্লিশ। মূল অনুষ্ঠানের চারপাশে ছোট ছোট তাঁবু। সেখানে গিজগিজ করছে মানুষ। মঞ্চ থেকে কেবল মানুষের মাথা আর মুসলিম লীগের সবুজ সবুজ পতাকা দেখা যায়। আর কিছু নয়। পার্কের ঘাস সবুজ গুল্মের ঝোপ তরুলতা সব যেন ডেকোরেটার্সের চেয়ারের মতো কোথাও গুটিয়ে রাখা হয়েছে। বড় বড় ব্যানারে উর্দুতে লেখা পাকিস্তান জিন্দাবাদ। গম্বুজঅলা তোরণের নিচ দিয়ে লোকজন মাঠে ঢুকছে। ঢুকেই মুগ্ধনয়নে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছে। মঞ্চে তাদের ভাগ্যবিধাতারা বসে আছেন। যাদের নেতৃত্বে সারা ভারতের মুসলমানরা আজ জেগেছে। যুক্তপ্রদেশের চৌধুরী খালিকুজ্জামান, পাঞ্জাবের জাফর আলি খান, উত্তর পশ্চিম প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধুর স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী মাহমুদসহ আরও অনেকে।

মনুষের চোখে মুখে উদ্দীপনা। কিন্তু কে বলবে চারদিন আগে এ শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। আঞ্জুমানে খাকসারের সঙ্গে পুলিশের দিনভর খণ্ডযুদ্ধ চলেছে। পুলিশ সুপারের মাথায় কোদাল দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ডিএসপি গুরুতর আহত। সরকার খাকসার দলকে নিষিদ্ধ করেছে। জারি করা হয়েছে সান্ধ্য আইন । সরকারি হিসেবে ২৩ জন খাকসার ও ২ জন পুলিশ মারা গেছে। খাকসারদের প্রধান আল্লামা এনায়েতুল্লাহ খান আল মাশরেকি মূলত একজন গণিতজ্ঞ। ক্যাম্ব্রিজ থেকে লেখাপড়া করে এসে সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। ‘বিজ্ঞানের আলোকে কোরআন’ বইটি লেখার জন্য নাকি নবেল পুরস্কারের তালিকায় তার নাম উঠেছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারপর এ উগ্রপন্থি দল গড়ে তোলেন। খাক মানে ধুলা, সার মানে জীবন। তাদের কাছে পার্থিব জীবন ধুলার জীবন। তিনি মদিনার খেলাফায়ে রাশেদিনের মতো ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। মাশরেকি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাই পুরো লাহোর শহর উত্তাল। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। জিন্নাহ বা তাঁর সংগঠনকে তিনি পছন্দ করেন না। তাঁর মতে নবাব নাইটদের নিয়ে গঠিত জিন্নাহর দলটির মূল কাজ ইংরেজের তোষামোদি করা। এদের দিয়ে মুসলমানদের কিছু হবে না। ব্রিটিশরা এ বিরোধের কথা জানত। তাই এত কিছুর মধ্যেও মুসলিম লীগকে সম্মেলনের তারিখ পিছাতে হয়নি। বাতিল হয়েছে শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা ছাড়াই মুসলিম লীগের ২৭তম বার্ষিক সম্মেলন শুরু হবে।

কিন্তু এ জনসমুদ্র দেখে বোঝার উপায় নেই আগুনের চুলোয় ফুটছে লাহোর শহর। লোকজনের মধ্যে দারুণ উৎসাহ। মুখে মুখে রটে গেছে আজ মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা আসবে। অবশ্য কাল উদ্বোধনী সেশনে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ সে ঘোষণা দিয়ে গেছেন। তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে টানা দু’ঘণ্টা ভাষণ দিয়েছেন। চোস্ত ইংরেজির ভাষণ। বেশিরভাগ দর্শকই বোঝেনি। কিন্তু তাঁর কথার উত্তেজনা, চেহারায় দৃঢ়তা, কিছুক্ষণ পর পর আঙুল উত্তোলন দেখে বুঝে নিয়েছে দারুণ কিছু হতে যাচ্ছে। অবশ্য মাঝে মাঝে কিছু ব্যক্তি চিৎকার করে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ বলে স্লোগান দিয়েছে। লোকজন সেটার অপেক্ষায় ছিল। তারা কণ্ঠ মিলিয়েছে। মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলেছে। মনে মনে তৃপ্তি পেয়েছে, কিছুটা হলেও অবদান রাখলাম কওমের জন্য। অধিবেশন শেষে বেশিরভাগ শ্রোতা জেনেছেন জিন্নাহ সাহেবের বক্তব্যের সারমর্ম। তিনি বলেছেন, ‘সর্বদাই ভুলভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে মুসলমানরা সংখ্যালঘু। এতদিন ধরে এই ধারণা চালু আছে যে তা এখন দূর করাও কঠিন। মুসলমানরা সংখ্যালঘু নয়। যে কোনো মাপকাঠিতেই বিচার করা হোক না কেন, মুসলমানরা একটি পৃথক জাতি। … ব্রিটিশ সরকার যদি সত্যিই আন্তরিকভাবে এই উপমহাদেশের মানুষের শান্তি ও সুখ চায় তবে আমাদের সকলের সামনে একটিই পথ খোলা আছে, তা হলো ভারতকে বিভিন্ন স্বয়ংশাসিত জাতীয় রাষ্ট্রে বিভক্ত করে বিভিন্ন প্রধান জাতির জন্য স্বতন্ত্র বাসভূমির ব্যবস্থা করা।’

ঢোকার গেট থেকে বেশ কিছুটা দূরে এক পেল্লাই মঞ্চ বানানো হয়েছে। আড়ম্বরতা দেখার মতো। ঝালরের কাপড় দিয়ে মঞ্চটি সাজানো। তার ওপর রাজকীয় কিছু চেয়ার সাজানো। মধ্যের চেয়ারটি সবগুলোর চেয়ে বড় এবং নকশাময়। কোনো এক দেশীয় রাজার বাড়ি থেকে আনা হয়েছে। অশক্ত শরীর নিয়ে জিন্নাহ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন মঞ্চের দিকে। তার ফুসফুসে পানি জমেছে। রোগের নাম প্লিউরিসিস। বুকের বাম দিকে তাই খুব ব্যথা। ডাক্তার আসতে বারণ করেছিল। তারপরও দিল্লি থেকে জোর করে লাহোর এসেছেন। পথে একবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তাই কাল সম্মেলনে পৌঁছাতে একটু দেরি হয়েছে। এ অসুস্থ শরীর নিয়ে সব দিকে তাঁর নজর। সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছোটবোন ফাতেমা। ও-ই এখন তাঁর অভিভাবক। সেও বাদ সেধেছিল। জিন্নাহ হেসে বলেছিলেন, ‘এত বেঁচে থেকে কি হবে। রতী চলে গেল আল্লার কাছে, মেয়েটাও একটা বিধর্মীকে বিয়ে করে দূরে সরে গেছে, এত বেঁচে কি হবে?’

‘তোমাকে আরও অনেকদিন বাঁচতে হবে দাদা। আমাদের কওমের জন্য বাঁচতে হবে। বহুদিন পর ভারতের কোণঠাসা মুসলমানরা একটা সত্যিকারের নেতা পেয়েছে।’

ফাতেমা শক্ত করে তাঁর হাত চেপে ধরে। বাদামি রঙের একটা চাপকান আর মাথায় কারাকুল টুপি। ফাতেমার পিঠে ভর করে মঞ্চে উঠলেন জিন্নাহ। মঞ্চে উপবিষ্টরা তাঁকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। উৎফুল্ল জনগণ হাততালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাল। স্লোগান উঠল: ‘কায়েদে আজম জিন্দাবাদ মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’।

চেয়ারে বসতেই মনে হলো তাঁর সামনে রহমত আলি এসে দাঁড়িয়েছে, ‘স্লামালাইকুম স্যার। শেষমেশ আমার অলীক স্বপ্ন বাস্তব হতে যাচ্ছে তাহলে।’

বিব্রত হোন জিন্নাহ। পরে বুঝলেন এটা তাঁর মনের ভুল। রহমত এখানে আসবে কোত্থেকে? যদিও এটা রহমতেরই শহর। কিন্তু সে তো লন্ডনে। টিকে থাকার জীবনযুদ্ধ করছে প্রতিদিন।

একটু পরেই সাদা শেরওয়ানি মাথায় ফেজ টুপি পরে বাংলার প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। বিশাল শরীর। হাটার ভঙ্গিতেও একটা আভিজাত্যের ছাপ। দূর থেকে ঠিক বাঘের মতোই লাগছিল। তাঁকে দেখে লক্ষ মানুষ যেন ব্যাকুল হয়ে উঠল। তাঁর কাছে যেন মুক্তির মন্ত্র আছে, যত তাড়াতাড়ি বলবেন তত তাড়াতাড়ি তাদের মুক্তি। চতুর্দিকে জয়ধ্বনি উঠল। ‘বাঙাল কো শের জিন্দাবাদ’ ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত চারদিক। ফজলুল হক আসন গ্রহণ করলেন। কিন্তু স্লোগান থামে না। অগত্যা সভাপতি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ উঠে গিয়ে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন, ‘থামুন থামুন, বাঘকে এবার খাঁচায় তোলা হয়েছে।’

একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। স্লোগান থামল। ধীরে স্থিরে ফজলুল হক ডায়েসের সামনে এলেন। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন। কাগজটা না দেখে বক্তৃতা শুরু করলেন।

১৯৩৯ এ মুসলিম লীগের সম্মেলনে প্রস্তাবিত মুসলমানদের জন্য পৃথক বাসভূমির জন্য সংবিধান প্রণয়নের প্রস্তাব আসে। সে মোতাবেক জিন্নাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সর্বসম্মত কিছু দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়। তারপর এ কে ফজলুল হক যেচে দায়িত্বটা নেন। তাই প্রতিটি বর্ণ শব্দ তাঁর মায়ায় গড়া। তিনি অন্তর থেকে ৫০০ শব্দের প্রস্তাবটি বলতে থাকেন, ‘… ভৌগোলিকভাবে পার্শ্ববর্তী ইউনিটগুলোকে এক একটি অঞ্চল হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এমনভাবে গঠন করিতে হইবে যাতে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা যেমন ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলগুলোকে সংঘবদ্ধ করিয়া এক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত করা, যার শাসনতন্ত্র হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম। এ সমস্ত ইউনিট ও অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের পর্যাপ্ত কার্যকর এবং আইনানুগ নিরাপত্তার ব্যবস্থা সংবিধানে রাখিতে হইবে যাতে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য অধিকারও তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় …’

এ কে ফজলুল হক একেকটি প্রস্তাব রাখছেন আর তুমুল হাততালিতে তা স্বাগত জানাচ্ছে জনতা। কিন্তু জনতা তো এই কঠিন ইংলিশ বোঝার কথা নয়। হয়তো ইংরেজি বোঝা কেউ একজন বলে রেখেছে আমি হাততালি দেওয়ামাত্র তোমরাও দিয়ে উঠবে। তাই হচ্ছে হয়তো।

‘আমরা জানি এবং বিশ^াস করি যে জাতিত্বের যেকোনো সংজ্ঞা বা বিচারে মুসলমান ও হিন্দুরা হচ্ছে দুটি ভিন্ন প্রধান জাতি। আমরা হচ্ছি দশকোটি লোকের একটি জাতি এবং অধিকন্তু আমাদের জাতিত্ব দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বাতন্ত্র্যসূচক কৃষ্টি, সভ্যতা, ভাষা আর সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্য, নাম ও নামকরণের পদ্ধতি, মূল্যবোধ ও অনুপাতজ্ঞান, বিধিসম্মত ও নৈতিক আইন, পঞ্জিকা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, স্বাভাবিক প্রবণতা আর উচ্চাকাক্সক্সক্ষার ওপরÑ মোটকথা, জীবনের প্রতি এবং জীবন সম্বন্ধে আমাদের আছে একটি বৈশিষ্ট্যসূচক দৃষ্টিভঙ্গি। আন্তর্জাতিক আইনের সব অনুশাসনমতে আমরা হচ্ছি একটি জাতি।’ শেরে বাংলা বলে যাচ্ছেন।

জিন্নাহ একবার জনগণের দিকে তাকান, একবার ফজলুল হকের দিকে। তিনি মনে মনে এমন একজন মানুষকেই চাইছেন। কিন্তু তিনি ঠিক যেভাবে চলতে যান, লোকটা সেভাবে চলবার নন। ১৯৩৬-এর আগস্টে তিনি নিজে কলকাতা গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে। উঠেছিলেন ইস্পাহানিদের ক্যামাক স্ট্রিটের বাড়িতে। তখন মুসলিম লীগের তথৈবচ অবস্থা। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডন থাকায় নেতৃত্বের শূন্যতায় দলটি মিলিয়ে যাওয়ার অবস্থা। উনি টুকটুক করে দল গোছাতে লাগলেন। দেখলেন পাঞ্জাব ও বাংলা এ দুটো অঞ্চলের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কারণ এ দুটো অঞ্চল যেমন অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর, ঠিক সেভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। মোটামুটি সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। কৃষক প্রজা পার্টির মুসলিম লীগের সঙ্গে মিশে যেতে আপত্তি নেই। কিন্তু ফজলুল হক হিন্দুদের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থানে যেতে রাজি নন। তিনি সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের বিপক্ষে। তিনি আনুপাতিক হারে হিন্দুরা কম আসন পেয়েছে সে কথাই বলেন বারবার। অথচ জিন্নার রাজনীতিই এখন বিভেদের ওপর দাঁড়িয়ে। যখন তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে মিশে কাজ করতে চেয়েছিলেন কেউ তাঁর পাশে ছিল না। এমনকি কংগ্রেসও। এখন যখন তিনি বিরোধিতার ময়দানে নেমেছেন হুহু করে দলের সদস্য বাড়ছে। কয়েক হাজার সদস্য থেকে চার লাখে নিয়ে গেছেন। তার ওপর নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে টানাপোড়েন। ফজলুল হক চান নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ এবং বিনা বেতনে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা চালু হোক। কিন্তু এটা মেনে নেয়া জিন্নাহ’র পক্ষে দুষ্কর। কারণ তাঁর দলের পৃষ্ঠপোষকদের বড় একটা অংশ জমিদার। এর ওপর তিনি বাংলার আরেকটি দলের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। সেটা হলো ঢাকার নবাব হাবিবুল্লাহ’র নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি। এ দলটি নবাব জমিদারদের দল। এমন দাবি মেনে নিলে এরা লেজ তুলে পালাবে। যাই হোক, শেষমেশ ঘরে তোলা গেল না বাঘকে। কিন্তু এরকম একটা তাগড়া বাঘ তাঁর চোখে লেগে গিয়েছিল। পরে যখন কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হওয়া নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়, মাছের মুড়োটা দিয়ে বাঘকে ঘরে তুলে নেন জিন্নাহ। কিন্তু বাঘ তো, কতক্ষণ যে পোষ মানে তার ঠিক নেই। অসম্ভব সম্মোহনী শক্তি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে খেপিয়ে তুলতে পারে। সবই ঠিকঠাক আছে, সমস্যা একটাই। ভীষণ আবেগ বিহ্বল লোক। আবেগ মানুষকে ভুল পথে ধাবিত করে। ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বুদ্ধ করে। নেতা হবে তাই নিরাবেগ কৌশলী ঠান্ডা মাথার। কখনও চোখে পানি আনা যাবে না। ঝাপসা চোখের সিদ্ধান্ত সর্বদা ভুল হয়।

শেরের ভাষণ শেষ হয়েছে। তার ভেতরে অন্যরকম এক পুলক কাজ করছে। লক্ষ মানুষের করতালি আর হর্ষধ্বনিতে মুহূর্তে নিজেকে দিগি¦জয়ী অধিপতি মনে হচ্ছে তাঁর। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, তাঁর সবুজ শ্যামল নদীধোয়া বাংলা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পেয়েছে। তিনি সে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছেন কীর্তনখোলার ওপর দিয়ে প্যাডেল ঘোরানো স্টিমারে। দুপারে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তারা চিৎকার দিয়ে বলছে, ‘হক সাহেব জিন্দাবাদ ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। কেউ এসেছে পটুয়াখালী থেকে কেউ গৌরনদী, কেউ বরগুনা, কেউ পিরোজপুর, কেউ পাথরঘাটা থেকে। সব তার আপন মানুষ। বরিশালের মানুষ।

জিন্নাহ দেখলেন পাহাড়ের মতো বড় একটা মানুষ শিশুর মতো উচ্ছলতা নিয়ে আসনে ফিরে এসেছে। চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ পর পর চোখ মুছছে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares