ঝিঁঝিঁপোকারা যা বলে থাকে : ইশরাত তানিয়া

কিছু আংশিক সত্য, অর্ধ সত্য আর বাকিটা মিথ্যে মাথার ভেতর শব্দ করে। কুণ্ডলী পাকিয়ে আসা এসব শব্দ কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেকে। কানের ছিদ্র দিয়ে যে শব্দ ঢুকে যায় সেটা আসলে গান। এ গান পুরুষ ঝিঁঝিঁপোকা গায় স্ত্রী ঝিঁঝিঁপোকাকে কাছে ডাকতে।   

ফিকে আলোয় ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে বিস্মিত হয় কটেজের বাঁশ আর পাটখড়ির বেড়া। ভেতরে বেতের টেবিল-চেয়ার আর খাট-আয়নাও এ ডাক শুনতে পায় অথচ সকালে ঝিঁঝিঁ ডাকে না। শব্দের উৎস কোথায় সেটাও বোঝা যায় না।

পূবাইলের এক রিসোর্ট এই ‘রোদবেলা’। নিরিবিলি বলা যায়। ভিড়ভাট্টা নেই। রিসোর্টের সারি সারি কুঁড়েঘরের মাথায় ছনের ছাউনি। সঙ্গে ছাউনি দেওয়া খোলা বারান্দা। দুফালি বাঁশ দিয়ে রেলিং। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখ মেলে দিলেই দেখা যায় হিজল গাছ ঝুঁকে আছে শাপলা ভরা বিলের ওপর। যেন বিলের পানিতে নিজেকে দেখার চেষ্টায় সেই কবে থেকে ডালপালা নিয়ে অবনত। হঠাৎ বাউরি এলে বৃষ্টিভাসা এলোমেলো হাওয়ায় শিরশির করে ওঠে ঘাসের ডগা। কেঁপে ওঠা সজনে গাছের পাতা ফুল ঝরায় সেই ঘাসের বুকে। বাঁশের খুঁটিতে মাথা রেখে এসব দেখে আনীলা। দৃষ্টি উদাস।    

এই বিরহী যক্ষপ্রিয়াকে তখন একটি বহুজাতিক সংস্থার এইচআরডির সিনিয়ার এক্সিকিউটিভ হিসেবে অকল্পনীয় মনে হয়। ল্যাপটপে অবিরাম আঙুল ছোটানো হাত দুটো এগিয়ে যায় বৃষ্টি ছুঁতে। জলের ছাঁট এসে ভিজিয়ে দেয় হীরার আংটি। এবারের বিয়েবার্ষিকীতে রিয়াদের দেওয়া উপহার। হীরা শুধুই এক মামুলি পাথর। এর ঔজ্জ্বল্য আনীলাকে আলো দেয় না। সাপ হয়ে ছোবল দেয়। এমন হীরের আংটি কত জনের আঙুলেই পরিয়ে দিয়েছে রিয়াদ। এখন এ মুহূর্তে আনীলা এসব ভাবতে চায় না। বৃষ্টি ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ভেঙে পড়ছে বিলের জলে। সেদিকে তাকিয়ে শান্তি অনুভব করতে চায়। তার উদাস চোখে ছায়া ফেলে আকাশের ধূসরিমা। তাই চোখের কাজল আরও বিরহকাতর, আরও গাঢ় হয়ে মায়া বাড়ায়। এমন দমকা হাওয়ায় প্রেম ঘনিয়ে ওঠার কথা অথচ বিষণ্নতা ছড়ায় চারপাশে।    

সামনের দিকে তাকালে যা হয়, পেছনের দিকটা দেখা যায় না। সেখানে টেবিলের ওপর চিনামাটির ফ্লাওয়ার ভাস। চালের রুটি, নরম চিতই পিঠা, ডালভুনা আর সব্জির অবশিষ্টাংশ। টেবিলের পেছনে খাট। মোরশেদ আধশোয়া হয়ে ফোনে কথা বলছে। শেয়ার মার্কেটের দরপতন নিয়ে। হাতে হ্যানিকেন বিয়ারের ক্যান। বাকি তিনটা ক্যান ফ্রিজে। বারান্দা থেকে ঘরে ঢোকে আনীলা। শাড়ি ছেড়ে লুজ ফিটেড টপ আর টাইটস পরে। কালো টাইটস এর নিচে ফর্সা দুটো পা। নখের ডালিমদানা রঙের নেলপলিশ স্ফটিকের মতো উজ্জ্বলতা ছড়ায়। এক পায়ে রুপালি নূপুর। মাথার সামনে থেকে পেছনে চুল ঠেলে দেয় আনীলা। পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে এক গোছা চুল আটকায়। বাকিটা ঘাড়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে। মোরশেদ কথা বলতে বলতেই আনীলার মসৃণ ঘাড়ে নিঃশব্দে চুমু খায় মৃদু আবেশে। আনীলার ফোনও একবার ইমেইল নোটিফাই করে। চেক না করেই ডেটা অফ করে সে। ফোন ছুড়ে দেয় বালিশের ওপর।    

ফোন রেখে মোরশেদ গেয়ে ওঠেÑ এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না, আনীলা গলা  মেলায়Ñ মন উড়েছে  উড়ুক না রে মেলে দিয়ে গানের পাখনা… বছরে একবার কি দুবার মোরশেদের অস্তিত্বের সাথে মিশে যায় আনীলা। এই দু-একটি দিনের জন্যই সারা বছর সে বেঁচে থাকে। কোলাহলের নগরীতে ফিরে গেলে শূন্যঘর। এসব দৃশ্য তখন আনীলাকে সঙ্গ দেয়। শারীরিক সম্পর্কহীন দাম্পত্যে মোরশেদের আদরস্পর্শ অজাগতিক হয়ে ঘুরে ফিরে আসে। অদৃশ্য কুঁড়েঘর হিজলগাছ সজনেফুল দৃশ্যমান হয়। অপূরণ পূরণ করে। প্রতিবার আনীলা  ভেবেছে এবারই হয়তো শেষ দেখা। আ’ম গনা লাভ ইউ লাইক আ’ম গনা লুজ ইউ। মেগান ট্রেইনরের কথা মনে পড়ে তার। আ’ম গনা হোল্ড ইউ লাইক আ’ম সেয়িং গুডবাই। তবু এই সম্পর্কে সে দাঁড়িয়ে আছে। কেন যে এই সম্পর্ককে অতিক্রম করে যাওয়া যায় না, সে নিজেও জানে না। জীবন গভীর আর বিস্তৃত বলেই কোথাও কী যেন থেকে যায়। সময়ে হয়তো এর কিছু ওপরে ভেসে ওঠে অথচ যে অতল থেকে উঠে এলো সে পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছাতে পারে না।                 

বিশাল এই বিলের পানির মতো নিজের জীবনটাকে বইয়ে দিতে ইচ্ছে করে আনীলার। যেদিকে খুশি এপারে-ওপারে আছড়ে পড়বে, না হলে বাঁক বদলে চলে যাবে বহুদূরে। উজান-ভাটার অনিবার্য টানে। দেহমনের  জানলা খুলে রিয়াদের জন্য বসে ছিল কত বছর! একই ছাদের নিচে অথচ ঘর আর মন আলাদা হয়ে যায়। রাতের পর রাত সে কেঁদেছে রিয়াদের বন্ধ দরজার ওপাশে। দরজা খোলেনি। ফিরে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে। বালিশে মুখ ঠুসে ফুঁপিয়েছে। উষ্ণ নোনাজল শুষে ভারী হয়েছে শিমুল তুলা। আনীলা ঘুমিয়েছে কিংবা ঘুমায়নি অথচ পৃথিবী ঘুরে গেছে তাই রাতের পর দিন এসেছে, দিনের পর রাত। চুলটা স্ট্রেইট করতে পারো না? তোমার ভালোড্রেস নেই? চেঞ্জ ইয়োর ওয়ারড্রব! ভুলটা হয়তো সেখানেই। নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেনি এই সং নামক সার থেকে।   

হন্যে হয়ে তখন একটা চাকরি খুঁজছে সে। পেয়েও গেলো দুটো ইন্টারভিউ টপকে। কত টাকা ইনকাম করো? আমার অর্ধেকওতো না! মুখে কী মেখেছ? ভূতের মতো লাগছে! ভূতের মতো যে লাগছে না সেটা বুঝতে একটু সময় লেগেছে আনীলার। আত্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিত্বের দ্যুতি যতই তার মুখে প্রতিফলিত হয়েছে, গাঢ় ছায়া ঘনিয়েছে রিয়াদের  হীমন্যতায়। আনীলার অতি সংবেদনশীল মন যত গভীর হয়েছে, দুজনের মধ্যবর্তী দূরত্ব ততটা বেড়ে গেছে। রিয়াদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে কবে যে অপেক্ষার ঘর-মন-জানলা বন্ধ হয়ে গেছে টের পায়নি আনীলা। অনিচ্ছেরা ইচ্ছের জায়গা দখল করে নিয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি।                  

সকাল থেকেই কখনও ঝরঝর, কখনও টিপটিপ। খড়ের চালে বৃষ্টির আছড়ে পড়া তেমন শব্দ তুলতে পারে না। তবু অন্য এক শব্দে অবশ অবশ লাগে আনীলার। সে জানে ঝিঁঝিঁ নিশাচর। এই শব্দের উৎস বাহ্যিক হলে হয়তো ঠেকিয়ে দেওয়া যেত কিন্তু শব্দগুলো শরীরের ভেতর পাক খেয়ে রক্তের সঙ্গে মগজ পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। আটকানো যায় না। ঝিঁঝিঁর অর্থহীন ধ্বনি প্রতিধ্বনির আগমনে কান চেপে ধরে আনীলা। কোথায় যে ভুলটা করেছিল বুঝতে পারে না। তরুণ রিয়াদের সুদর্শন চেহারা  দেখে ভেবেই নিয়েছিল তার মনটাও বিশাল হবে। হয়তো হাসি আর উচ্ছলতায় সারাক্ষণ  মেতে থাকা মানুষটাকে দেখে ভুল বুঝেছিল।  ভেতরের লাম্পট্য দেখতে পায়নি। হতে পারে দাম্পত্যের মিঠেল স্বপ্ন আঠার মতো  লেগেছিল চোখে। দিবাস্বপ্নে রিয়াদের তাচ্ছিল্যভরা বাঁকা কথা ছিল না। তাই হয়তো আনীলার ভুল হয়ে গেছে। 

কেয়ারটেকার নুরুল করিমের সঙ্গে ফোনে কথা বলছে মোরশেদ। মোরশেদের গলা শুনে বাস্তবে ফিরল আনীলা। রুম অ্যাটেন্ডেন্ট ছেলেটা বিশাল ছাতা নিয়ে এসেছে। নুরুল করিম ছেলেটার হাতে করে ছাতা পাঠিয়ে  দিয়েছে। বৃষ্টিতে বেরুলে কাজে লাগবে। ছেলেটা নতুন। নাম সবুজ। পরিপাটি মায়াকাড়া চেহারা। বেশি বকশিশ পাওয়ার চাতুরী এখনও শেখেনি। তাই হাসিটা আরও সরল মিষ্টি। একটা কাচের বাটি বাদে বাকি এঁটো প্লেট-বাটি আর খাবার তুলে নিয়ে গেল। কাচের বাটি ফয়েল  পেপার দিয়ে মোড়ানো। আনীলার জন্য স্পেশাল ইলিশ রান্না করে এনেছে  মোরশেদ।  

গুটিসুটি হয়ে মোরশেদের বুকে লেপটে থাকে আনীলা। যেন এক তুলতুলে আদুরে মিনি। বেঁচে যে আছে এাঁ সে বুঝতে পারে মোরশেদকে স্পর্শ করলে। মোরশেদ ঝরাপাতার মতোই ক্ষণিকের। উড়তে উড়তে আসে আবার চলে যায়। বৃষ্টির জোর কমে এসেছে। বেড়েছে হাওয়ার দাপট। আনীলার গায়ে স্টোল জড়িয়ে দেয় মোরশেদ। সিগারেট পুড়ে পুড়ে ধোঁয়া হয়ে মিশে যায় বাদলা হাওয়ায়। 

কাঁটা গলানো ইলিশ আগে কখনও  খেয়েছিস?

নিচের ঠোঁট ওল্টায় আনীলা। ডানে বাঁয়ে মাথা নাড়ে। বলেÑ উঁহু!  

এটা প্রেসার কুকারে রান্না করতে হয়। মজার ব্যাপারটা হলো প্রেশার কুকারে এক ঘণ্টা বিফ রান্না করলে মাংস খুলে ঝুরি ঝুরি হয়ে যায়। কিন্তু ইলিশ মাছ আস্তই থাকবে। শুধু ভেতরের কাঁটা গলে যাবে। খাবার সময় একটা কাঁটাও পাবি না।   

ওয়াও! একটু টেস্ট করি? আনীলার আর তর সয় না।

একদম না। ভাত দিয়ে খেতে হবে।  

কপট রাগে আনীলা বাঁ দিকে সামান্য ঠোঁট বাঁকায়। তারপর হেসে ফেলে। মোরশেদের বুকে কাঁচা-পাকা পশমে নাক ডোবায়। প্রতিবার আনীলার জন্য কিছু না কিছু রান্না করে আনে মোরশেদ। নিজস্ব রেসিপিতে এঁচোড়ের তরকারি, আনারসি পাবদা, ডিম সর্ষে। নিজের হাতে যত্ন করে খাইয়ে দেয়। ওটুকুর জন্যই যেন আনীলার এত কাঙালপনা। রাতে ঠিক সময়ে টেক্সট এসে যায়Ñ বাবু, পানি খেয়ে ঘুমাবি। আনীলা চারটি শব্দের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। টেক্সট ডিলিট করে পানি খায়। ‘গুড নাইট’ এর সুইচ অন করে ঘুমাতে যায়।        

কটেজের ভেতর ঢুকে পড়া চড়ুই পাখি উড়ে যায় টেবিল থেকে। খুলে দেওয়া জানলার পাল্লার ওপর বসে। তারপর হারিয়ে যায় জাম্বুরা গাছের ভেতর। পাতার আড়ালে। ঝিঁঝিঁপোকার ব্যাপারটা কেন যেন মোরশেদকে বলা হয়ে ওঠে না অথচ আনীলা বলতেই চায়। মোরশেদ অনুভব করে আনীলা চিন্তিত আর বিষণ্ন। ওর মুখের নরম ত্বকের ওপর দুঃখের ছায়া। মৃদুস্বরে  মোরশেদ বলেÑ কেন যেন মনে হচ্ছে তুমি ভালো নেই। 

কেন এমন মনে হলো?

গাট ফিলিং বলতে পার।

আরে না না। বার্ন আউট হয়ে গেছি। কাল অফিসে গিয়ে অন-দ্যা-জব ট্রেনিং স্কেজুল বানাতে হবে। অ্যাপ্রুভালও নিতে হবে। এত চাপ!

বাদ দাও তো এখন এসব। মাথায় অফিস নিয়ে ঘুরতে হবে না।

কিছুক্ষণ আগেই ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছিল। ঘরে বসে বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগছিল মোরশেদের। ফেব্রুয়ারির শেষে শুকনো মাটি বৃষ্টি শুষে সরস হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির ঘ্রাণের সঙ্গে মিশেছে মাটির মন কেমন করা সোঁদা গন্ধ। এই কোমলতায় আবিষ্ট না হয়ে পারা যায় না। দূর থেকে উড়ে আসছে বাউলের গান। ঢোলের শব্দ। আনীলার কপালে চুমু খেয়ে মোরশেদ বলে, ‘গান শুনবে?’   

একটার সময় লাঞ্চ রেডি হবে। আনীলা ঘড়ি দেখে। অনেকটা সময় আছে। শরীর মনজুড়ে সুখজনিত ক্লান্তি আর আলস্য। স্টোলটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। আস্তে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। প্রায় খুলে আসা পাঞ্চ ক্লিপ টাইট করে। সবুজ এসে এর মধ্যে আরেকবার চা দিয়ে গেছে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দূরের জঙ্গল, বিলের জন্য মন খারাপ হয়ে যায় আনীলার। মোরশেদের জন্যও। আজ রাতেই ফিরে যেতে হবে। এমনই হয়। ভালো লাগার জায়গায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না।

কটেজ থেকে বেরিয়ে মিনিট দশেক হাঁটলে বাঁ দিকে ঘন পাতার বিশাল সেগুন, বট, অশত্থের জঙ্গল। ডানে কিছুদূর গেলেই বাউলের কুঁড়ে। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল টিয়া পাখির ঝাঁক। ঝোপঝাড়ের বুনো বুনো গন্ধ ভাসে বাতাসে। ঘাসে ঢেকে আছে মেঠো পথ। কাদামাটি লেগে যাচ্ছে পায়ে। সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপই নেই দুজনের। এক ছাতার নিচে যা হয়! দূরে সুবিধা মতো পা ফেলা যায় না। ছাতায় টান পড়ে। ছপাৎ করে কাদায় পা ডুবে যায় মোরশেদের।

এই যাহ্!

হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসে আনীলার। ডান হাতে চোখ মুছে বলেÑ সরি। হাসিটাকে বাগে আনতে দু হাতে ঠোঁট  চেপে ধরে। ততক্ষণে ঘাসের আড়ালে থাকা তরল মাটি থেকে পা তুলে নিয়েছে  মোরশেদ।

সামনে টয়লেট আছে। পা ধোও। ঠোঁট আর আঙুলের ফাঁকফোকর দিয়ে তখনও আনীলার হাসি উপচে পড়ছে। 

খুব হাসি! তাই না? দাঁড়াও মজাটা বুঝাবো!       

ধূসর মেঘে বেলা বোঝা যায় না। গানের আসর থেকে বেরিয়ে দুজন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে। গতবার আনীলাই বেশি বলছিল। একটু যেন প্রগলভ। নারকেল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক প্রশ্ন করেছিল, পিঁপড়া কি অন্ধ হতে পারে?  মোরশেদ এসব খাপছাড়া প্রশ্নে অবাক হয় না। নারকেল গাছের গোড়ায় কাঁটাঝোপ আর ঘাসপাতার ওপর পিঁপড়ার সারি হেঁটে যাচ্ছিল। সেটা দেখেই এ প্রশ্নের আবির্ভাব। আনীলার ভেতর একটা অন্যরকম কেউ আছে। সে-ই মাঝে মাঝে মাথা ঝাঁকায়। এসব প্রশ্নে আত্মপ্রকাশ করতে চায়।   

রাস্তা থেকে নেমে ঢালু বেয়ে বিলের পাশে বসে থাকে দুজন। বাঁশ ফেলে ঘাটলা বানানো হয়েছে। ছাতাটা বন্ধ করে দেয় মোরশেদ। আকাশের দিকে তাকালে ধূসরের মাঝে সামান্য সাদা রেখার আভা দেখা যায়। বৃষ্টির ধোঁয়াশা বাতাসের নিঃশ্বাস তাদের মুখে ঝাপটা মেরে আরও গতিশীল হয়। বিলের জলে ঢেউ আঁকে। আকাশের ধূসরতার সঙ্গে মিলিয়ে পানির রঙ ধূসর। এমন ঘোলাটে পানির দিকেও আচ্ছন্ন হয়ে তাকিয়ে থাকে আনীলা আর মোরশেদ তাকিয়ে থাকে আনীলার দিকে। আনমনা আনীলা। মোরশেদ সরে বসতে বলল, কথাটা খেয়ালই করল না। ফোনটা বাঁশের ফাঁক দিয়ে পড়ে গেল। সেদিকে হুঁশ নেই। পশ্চিম দিক থেকে বাতাস বইছে, পুব থেকেও। উত্তরে, দক্ষিণেও বাতাস ছুটছে। ফোন তুলে হাতের পাতায় মুছে নেয় মোরশেদ। আনীলার হাতে দেয়।

বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলা আর ফিরে পাওয়ায় অভ্যস্ত আনীলা লাজুক হাসি হেসে বলেÑ থ্যাংকস!     

আকাশে আলো প্রায় নিভন্ত। বৃষ্টি-সন্ধ্যা নেমে আসে কটেজের বারান্দায়। বিষাদের ভেজা ভেজা ঘ্রাণ বাতাসে। আনীলার গলায় অভিমানী স্বর, ‘শহরে এই বৃষ্টি পাই না, জানো? বৃষ্টি হয়…’ জ্যাক ড্যানিয়েল’সের বড় পেগে বরফের টুকরা ভাসছে। সিপ করে আনীলা, ‘অফিসে এসি রুমে বোঝা যায় না। বাসার বারান্দায় দাঁড়ালে বৃষ্টির গন্ধ পাই।’ রোদটাও তোমার গায়ে লাগে না।  

তা ঠিক… আমার তো ক্যালসিয়াম ডিফিশিয়েন্সি আছে। ভিটামিন ডি না পেলে শরীর নাকি ক্যালসিয়াম অ্যাবজর্ব করতে পারে না।   

ডাক্তারের কাছে যাচ্ছো না কেন? বয়স বাড়ছে। ইগনোর কোরো না।

ধন্যবাদ। তাহলে বুঝেছ আমার বয়স ৩৪। ২৪ না।

মানে? আমি তোমার বয়স জানি না?  

জানো। কিন্তু ভাব দেখাও তুমি দাদুর বয়সী! আমার বয়স ২৫ আর তোমার বয়স ৬৫ ছুঁই ছুঁই।  মোরশেদ সশব্দে হেসে ওঠে, ‘৬৫ না হোক। ৪৩ তো!’ একটু থেমে বলে, ‘কেন যেন মনে হয় আমি ছাড়া তোমার কেউ নেই। খুব দুশ্চিন্তা হয়।’    

আনীলার চোখে তরলতা বাড়ে। ভাষাহারা হয়ে তাকিয়ে থাকে মোরশেদের দিকে।  নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়েই কত কি যে বলে, আবার বলেও না। শান্তভাবে আনীলার চুলে হাত বুলিয়ে দেয় মোরশেদ। স্পর্শজনিত রেশমি অনুভবে দুজনের শরীর মন কী আশ্চর্য নির্লজ্জ উন্মুখ। একটু একটু করে  জেগে ওঠে আনীলা। একটা ঝাঁকুনি আসে জরায়ুর ভেতর থেকে। তারপর সমস্ত শরীরে জোর ঝাঁকি খায় সে। হাজারো জন্মের সব অপ্রাপ্তির শামুকখোলস ভেঙে যায় জোয়ারের উন্মত্ততায় আর আনীলার ভেতরে আরেক আনীলা জেগে ওঠে। মাখনের মতো গলে যেতে চায়। হঠাৎ ঝিঁঝিঁর ডাকে চমকে ওঠে  সে। কোনো ঘাসের ঝোপ আর জলাভূমি  থেকে যে এরা উড়ে আসে! মাথার ভেতর ঢুকে যায় আর ডাকে। কথা বলে। গান গায়। বাদামী ধূসর সবুজ রঙের ঝিঁঝিঁগুলো ডাকতে ডাকতে এক সময় লুকিয়ে যায়। তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে আনীলা। স্বস্তির শ্বাস নেয় বুক ভরে।

দিন দিন এই ঝিঁঝিঁর ডাক তীব্র হচ্ছে। এখন  যেমন প্রবল মাথাব্যথায় বমি আসে আনীলার। ঝিঁঝিঁদের কথা বুঝতে চায়। পারে না। এই অক্ষমতা ঝিঁঝিঁপোকার ডাককে তীব্রতর করে। আনীলার রক্তিমাভ মুখের ওপর মোরশেদের মুখ। দুহাতে ওর গাল দুটো আলতো করে চেপে ধরে আনীলা। কারও পাঠানো স্ক্রিনশটে সে দেখেছিল মোরশেদের উত্থিত গোপন অঙ্গ। মদের আবেগে নেশাগ্রস্ত বিভ্রমে স্মিতহাসি ঠোঁটে নিয়ে যেন স্বগতোক্তিই করেÑ নাজিয়াকে তুমি চেনো?   

আজ দিনটা বড় উথাল-পাথাল হাওয়ায়। রাতটাও। বৃষ্টি শেষে আকাশে একলা চাঁদ। নক্ষত্রগুলো মৃদু কাঁপছে। কটেজের বাইরে জাম্বুরা গাছে সাদা ফুল জোছনা মেখে আরও স্নিগ্ধশুভ্র হয়ে উঠেছে। ভেতরে বিরোধিতায় নাকি বিহ্বলতায় কী যেন পিছলে যায়। আনীলার স্তনে হাত রাখতেই দুটো স্তন খুলে আসে শরীর থেকে। বিছানা থেকে গড়িয়ে  মেঝেতে পড়ে ঘুরতে থাকে লাটিমের মতো। জিভ ছোঁয়াতেই নাভি খসে পড়ে লাফিয়ে নেমে যায়। ব্যথার অতল কালো জল থেকে আনীলা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো নিজের রক্তাক্ত বিকলাঙ্গ শরীরটাকে বালিশে চাদওে টেনে হিঁচড়ে মোরশেদের শরীরে উঠে আসে। তখনই অসংখ্য ঝিঁঝিঁপোকা মোরশেদের হাড় মজ্জা মগজ ফুড়ে উড়ে যায়। দৃশ্যপটে মোরশেদ ক্রমাগত আবছা হয়ে আসে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ   

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares