শেষ ভোর : স্মৃতি ভদ্র

তিনি জানালা বন্ধ করে দিলেন। বুঝতে পারলেন ভোর ফুরিয়ে আসছে। কারণ কার্নিশে বসা চড়ুই মিহি গলায় কিচিরমিচির করছে থেমে থেমে। 

বাড়ির পাশের বড় রাস্তায় একটি তিন চাকার যান্ত্রিক রিকশার আওয়াজ আর ঝিমিয়ে আসা ঝিঁ ঝিঁ-র ডাকে তিনি কিছু সময় আগে বুঝতে পেরেছিলেন দরজায় ভোর এসে দাঁড়িয়েছে। আর প্রতিদিনের অভ্যাসমতো ভোর দেখার জন্যই জানালা খুলেছিলেন। আর ঠিক তখনি বিশ্রী ও কর্কশ একটি শব্দ তাঁর মনোযোগ ভোর থেকে সরিয়ে নিল।

শব্দটি একটি ভোঁতা ব্যথা হয়ে মাথার ভেতর জায়গা করে নিতে চাইল। তিনি নিঃশব্দে জানালা বন্ধ করে সে যন্ত্রণা নিয়েই ফিরে এলেন লেখার টেবিলে।

চেয়ারে বসে মাথাটা ঝুলিয়ে দিলেন পেছনের দিকে। চোখ বন্ধ করতে গিয়েও আবার মেলে দিলেন। বিশ্রী শব্দটার সাথে আবছায়া মতোন ছবিটা ফিরে আসতে চাইছে। উনি টেবিলে রাখা কাঁসার গ্লাসের পানি এক ঢোক খেয়ে নিলেন। ছাতিম ফুলের কাল এখন। মনে আসতেই দু’বার শ্বাস টানলেন। ছাতিম ফুলের গন্ধ কামনা করে মনে মনে বললেন, আজকের সকাল খুব সুন্দর হবে। কারণ আজকের ভোরে অন্ধকার কম ছিল, বাতাসে শরতের ঘ্রাণ ছিল। কোনো বিশ্রী ও কর্কশ শব্দ ছিল না।

আজই পত্রিকায় একটি বিবৃতি লেখার কথা তাঁর। তরুণ এক প্রকাশকের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি।

তিনি গত কয়েকদিনের পত্রিকাগুলো নিয়ে বসলেন। খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলেন তা। তরুণ প্রকাশকের ওপর হামলার বৃত্তান্ত আবার পড়া জরুরি। অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল! তন্নতন্ন করে খুঁজেও এ সংক্রান্ত কোনো খবর তিনি পেলেন না।

ক্লান্তবোধ করলেন তিনি। টেবিল ছেড়ে উঠলেন। অর্ধেক লেখা বিবৃতি, লেখার টেবিল আর ছড়িয়ে থাকা পত্রিকাগুলোয় বিতৃষ্ণা এলো তাঁর। শুধু শুধু এতগুলো সময় তিনি বিবৃতিটার পেছনে দিলেন।

আর ঠিক তখনি বাতাসে ছাতিম ফুলের গন্ধ। বাড়ির পেছন উঠোনে ছাতিম গাছটায় কাল সন্ধ্যে অবধি একটাও ফুল ছিল না। আজ ভোরে সে গাছ হয়তো সাদা ফুলে ভরে গেছে। তিনি আবার গেলেন জানালার কাছে। থাই গ্লাসের জানালার লক খুলতে খুলতে ভাবলেন, এই জানালা দিয়ে তিনি শুধু ফুটে থাকা অজস্র সাদা ফুল দেখেন।

স্লাইডিং থাইগ্লাসের জানালা। তার এক পাল্লা সরিয়ে দিলেন তিনি।

সাথে সাথে সকালের বাতাস হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো ঘরের ভেতর। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বুকের খাঁচায় বিশুদ্ধ বাতাস ভরলেন।

হ্যাঁ, এই বাতাসের জন্যই তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেবার পরও এই শহর ছাড়েননি। এরপর চোখের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ করলেন জানালা থেকে হাত দেড়েক দূরে থাকা ছাতিম গাছটির দিকে। সাদা ফুলগুলো বাতাসে একটু আধটু দুলছে। কার্নিশে চড়ুইটা কিচিরমিচির করছে একইভাবে।

হ্যাঁ, শব্দ বলতে ওইটুকুনই।

কোনো বিশ্রী আর কর্কশ শব্দ নেই। কার্নিশ থেকে চোখ সরিয়ে নেবার প্রাক্কালে একবার ইচ্ছে হলো ওপাশের রেডিও সেন্টারের মাঠের দিকে একবার তাকাতে।

কী হবে ওই বিরান মাঠ দেখে? দরকার নেই।

আজ ছাতিম গাছ দেখতেই ভালো লাগছে তাঁর।

গুনগুন করে সুর ভাজলেন,

‘শুনি ম’লে পাবো বেহেস্তখানা

তা শুনে তো মন মানে না

বাকির লোভে নগদ পাওনা

কে ছাড়ে এই ভুবনে’

লালনের এই সুর তিনি শিখেছেন মজনু শাহের কাছ থেকে।

মজনু শাহ এ পাড়ার পুরাতন বাসিন্দা। তখনও এখানে পরিমার্জিত এই আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠেনি। রেডিও সেন্টারের মাঠটির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি ঘর ছিল।

হ্যাঁ, ঘরই বলা যায়। কারণ বাড়ি বলতে আমাদের সামনে যে ছবি ভেসে আসে তার সাথে এই বাড়িগুলোকে মেলানো যায় না। নদীভাঙা মানুষগুলো সব হারিয়ে কোনোরকমে এখানে ঘর বানিয়ে থাকত তখন।

বাবা আর বাড়ি হারানো বারো বছরের মজনু ছিল পরিবারের অভিভাবক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে একটি চায়ের স্টল দিয়ে শুরু হয়েছিল তার সংসারের জন্য উপার্জন। তবে সে চায়ের স্টল শুধু অর্থ জোগান দিয়েই থামেনি, জোগান দিত লালন-ভাবনাও।

এখানে বসেই প্রফেসর মতিন কথা বলতেন লালন দর্শন নিয়ে। চায়ের কাপে চিনি মেশাতে মেশাতে মজনু শাহ্ শুনত,

‘আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা

মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।

তাঁর উপরে সদর কোঠা

আয়নামহল তায়।’

শুনে শুনে আত্মস্থ করা সে সুর চিরস্থায়ী জায়গা করে নিল মজনু শাহ্‌-র কণ্ঠে। এরপর থেকে যত মানুষ না তার স্টলে চা খেতে আসত তা থেকেও বেশি মানুষ আসত লালনের গান শুনতে।

তবে সময়ের এই সরলতায় ব্যাঘাত এলো হঠাৎই। লালনের সুরে মত্ত মজনু শাহ্‌কে এই শহর এক সকালে আবিষ্কার করল বোধহীন হিসেবে। তার চায়ের স্টলের পাশে। স্টলটি ভাঙা। হাতে পায়ে অসংখ্য আঘাত। বাম পায়ের গোড়ালির রগের কাছে আঘাত ছিল গভীর।

সেদিনের পর থেকে মজনু শাহ্‌ খুঁড়িয়ে হাঁটত।

বোধহীন সে সকাল আর কখনই তাকে বোধে ফিরতে দেয়নি।

সে হয়ে পড়ল জাগতিক বোধহীন।

ব্যত্যয় ঘটল শুধু লালনের গানের সুরে। এরপর থেকে লালনের সুরই তার সকল বোধ। তার সকল মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়ে গেল এই সুরে।

আর ঠিক তখনই এই এলাকায় গড়ে ওঠে পরিশীলিত এই আবাসিক এলাকাটি। গড়ে ওঠে এ বাড়িটিও।

এরপর থেকেই প্রতি ভোরে মজনু শাহ্ লালনের গান গায় দরাজ গলায়। এ বাড়ির দেয়ালের ওপাশে বসে।

সে অর্থে মজনু শাহ্-র সুরও লোকটির ভোর দেখার অন্যতম একটি কারণ।

প্রতিদিন ভোর ফুরিয়ে সকাল হয় তাঁর সে সুরের সাথে।

লালনের গান মনে আসতেই আবার সেই কর্কশ শব্দটি মাথায় টোকা দিল।

না, এখন এই শব্দকে প্রশ্রয় দেবার সময় নেই তাঁর।

আজ একটি সম্মাননা অনুষ্ঠানে যেতে হবে তাঁকে। একটি ধন্যবাদ সূচক ভাষণ প্রস্তুত করতে হবে।

তিনি প্রিয় শিরীষ কাঠের টেবিলটার পাশে গেলেন।

এই টেবিলের সাথে তাঁর আত্মীয়তা সেই কবেকার। এই টেবিলে বসেই তিনি খুলেছিলেন প্রথম লেখা প্রকাশের খবর নিয়ে আসা সেই সম্পাদকের চিঠি। আবার এই টেবিলেই লিখেছিলেন তাঁর সেই সাহসী আর বিখ্যাত লেখাটি। যার জন্যই আজ তিনি এত সম্মানিত, সমাদৃত।

আর এই টেবিলেই তিনি পেয়েছিলেন মিলির লেখা শেষ চিরকুট। কাঁসার গ্লাসের নিচে চাপা দেওয়া অবস্থায় ছিল তা।

‘অনেক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিলাম। তোমার সাথে সে অর্থে কোনো মতবিরোধ নেই আমার। তবে তোমার অদমনীয় সাহস আর ন্যায়বোধ মাঝেমাঝেই আমার স্বাভাবিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। আতংকের এক একটি মুহূর্ত আমাকে বিবশ করে দেয়। চেনা এই শহরে আমি নিজেকে অচেনা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠি। আমার এই উদগ্রীবতায় অস্থির হয়ে ওঠে আমাদের সন্তান।

একটি স্বাভাবিক জীবনের আশায় আমি বাবুর কাছে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

কয়েক স্তূপ কালো অক্ষর। সেদিনটাকেও কালো করে দিয়েছিল। শব্দগুলো এক ঝটকায় অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছিল মিলিকে।

তিনি জানতেন প্রতিবাদী বাবার রহস্য মৃত্যুর ট্রমা থেকে মিলি কখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি।

বাবাকে হারিয়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল মিলি। মিলিকে স্বাভাবিক করতেই তার পাশে থাকবার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন তিনি।

কারণ মনে মনে তিনি তখন দীক্ষিত সেই প্রতিবাদী শিক্ষকের ন্যায়বোধের মন্ত্রে। দীক্ষা দান করা শিক্ষকের প্রতি দক্ষিণা স্বরূপই তিনি ঘরে তুলেছিলেন মিলিকে। কারণ মা-বাবা হারা মিলি তখন এই শহরে নিরাপত্তাহীন আর একা।

তবে শুধু এটুকু বললে অবিচার করা হয় তাঁদের সম্পর্কের প্রতি। চাকরি নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকেই যাতায়াত ছিল মিলিদের বাড়িতে। সেখানে যতটুকু আগ্রহ ছিল সিনিয়র শিক্ষকের সাথে সমাজের অসঙ্গতি আলোচনা, ততটুকুই আগ্রহ ছিল মিলি। দু’জনের সম্পর্কের একটা সূক্ষ্ম বুনন শুরু হয়ে গিয়েছিল ততদিনে।

আর এজন্যই বিয়ে করেছিলেন ডিপার্টমেন্টের সাহসী আর সদ্যমৃত সিনিয়র শিক্ষকের একমাত্র পাগলপ্রায় মেয়েটিকে।

তবে ভবিষ্যতের খাতায় লেখা ছিল অন্যকিছু।

শুরু থেকেই তাঁর সকল দ্রোহের লেখাতেই আপত্তি ছিল মিলির। তবে তা সীমাবদ্ধ থাকতো লেখাগুলোর প্রতি অনাগ্রহতে। বরং মিলির উৎসাহ থাকত প্রেমের কবিতায়।

‘দেখেছো, ছাতিম গাছটা সাদা ফুলে ছেয়ে গেছে। তুমি একটা কবিতা লিখতে পারো তো সে ফুল নিয়ে।’

অথবা,

‘আজ শরতের জ্যোৎস্নায় ছাতিম ফুলগুলো আরও উদ্ভাসিত হয়েছে। একটি কবিতা লেখো সে উদ্ভাস নিয়ে।’

না, মিলির এই আবদারগুলো কোনো দিনই রাখতে পারেননি তিনি।

একসময় সে আবদার বন্ধ হয়ে যায় মিলির। তবে পরিবর্তন হয় না দ্রোহের প্রতি অনাগ্রহে। বরং তা বিরক্তি থেকে ক্ষোভে পরিণত হলো যখন বিভিন্ন হুমকি-ধমকি আসতে শুরু হলো এ বাড়ির ঠিকানায় আর ফোনে।

আর অদ্ভুতভাবে মিলির সেই দ্রোহের প্রতি অনাগ্রহ হঠাৎই দিক পরিবর্তন করল। এবার অনাগ্রহ এলো তাঁর প্রতি।

মিলি চলে গেল ছেলের কাছে। আমেরিকার মিশিগানে।

সেদিনের পর থেকে তিনি এ বাড়িতে প্রায় একা। একটি অল্পবয়স্ক কাজের ছেলে দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য আসে।

মাথার সেই ভোঁতা ব্যথাটা এখন আর নেই তাঁর। মিলির কথা অনেকদিন পর মনে পড়ল তাঁর। খুব হালকা লাগছে।

অনেকদিন হতে চলল মিলির সাথে কথা হয়নি। শুরুতে মিলি নিয়ম করে ফোন দিত। সময়ের সাথে সাথে তা কমে এসেছে।

আজ মিলির সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

তিনি ফোনের ঘরে গেলেন।

আর ঠিক তখনি ফোনটা এলো। অজ্ঞাত নম্বর থেকে।

‘শরীর এখন কেমন? কেমন চলছে বিবৃতি আর অনিয়ম নিয়ে ভাষণ প্রদান? এবার নিজের ভালোর জন্য এগুলো বাদ দিন। পরিবর্তনের সময় এসে গেছে আপনার। তবে হ্যাঁ, ভোর দেখার অভ্যাসে পরিবর্তন আনার দরকার নেই আপনার।’

এ রকম ফোন আগেও বহু এসেছে। তিনি ভয় পাননি। কিন্তু আজ কিছু একটা হলো।

তিনি তাড়াহুড়ো করে মাঠের দিকের জানালাটা বন্ধ করে দিলেন।

ওই মাঠটাতে তিনি সবসময় হাঁটতে পছন্দ করতেন।

শহরের এক মাথায় নিরিবিলি এই আবাসিক এলাকা। একপাশে ব্যস্ত বড় রাস্তা আর অন্যপাশে এই বিরান মাঠটি। ব্যস্ত রাস্তার ওপাশটি খুব জমজমাট। তাই তো প্লট কেনার সময় যখন তিনি এই বিরান পাশ বাছাই করলেন তখন অনেকেই রে রে করে উঠেছিল।

‘কী দরকার ওই দিকটা নেবার। খুব একটা বসত নেই ওদিকে। এত নিরিবিলিতে থাকলে ডিপ্রেসড্ হয়ে পড়বেন।’

উঁহু, সকলে ঠিক বলেননি। বরং জানালার ওই মাঠের দিকে চোখ রেখেই তিনি ডুবতে পারেন বিভিন্ন ভাবনায়। কোনো এক শীতের সকালে মাঠের ওপরে কুয়াশা ভাসতে দেখেই তিনি দেশভাগে ভাসা উদ্বাস্তু এক পরিবার নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন। লেখাটি অনেক পুরস্কার জুটিয়েছিল।

আবার, এক দুপুরে একা পড়ে থাকা মাঠটি দেখেই তিনি লিখেছিলেন একা হয়ে যাওয়া পাহাড়ি সেই যুবকের গল্প। যার কাছ থেকে পাহাড় কেড়ে তাকে উদ্বাস্তু করে দিয়েছে সমতল।

এই মাঠ তাঁর বড় প্রিয়।

কিন্তু আজ দেখতে ইচ্ছে করছে না এই মাঠ। না ভুল হলো, শুধু দেখা নয় মাঠ নিয়ে ভাবাটাই তিনি বন্ধ করে দিতে চাইছেন। তাঁর জীবনে ওই মাঠের অস্তিত্ব আজ ভোরের পর থেকে অনস্তিত্ব করে দিতে চাইছেন প্রাণপণে।

এর চেয়ে বরং ফুলন্ত ছাতিম গাছ আর কার্নিশের চড়ুই দিয়েই আজকের ভোর তিনি পাজলের মতো সাজিয়ে ফেলতে চাইছেন।

ফোনটা আবার বেজে উঠল। এই প্রথম ফোনের রিং টোন ওনার হৃৎপিণ্ডে একটা মাঝারি ধাক্কা দিল। স্ক্রিনের নম্বরে চোখ রাখার আগে শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটদুটো জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে নিলেন। আবার কী সেই ফোন?

না, অচেনা নম্বর নয়।

এরকম কখনও হয় না। তবে আজ হলো। পরিচিত নম্বর থেকে ফোন পেয়েও কয়েক মুহূর্ত নিয়ে নিলেন রিসিভ করতে।

‘হ্যালো’

‘খবর পেয়েছেন?’

‘না, কোনো খবর পাইনি।’

‘এত বড় একটা ঘটনা আর আপনি কিছুই জানেন না? নাকি সব জেনেও এড়িয়ে যাচ্ছেন? আপনার বাসার পাশের মাঠেই তো…’

তিনি ফোনের লাইন কেটে দিলেন।

খুব অস্বস্তি শুরু হলো তাঁর। ওনার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মাঠের অস্তিত্ব স্ব জায়গাতেই বহাল।

উনি বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ভোরের মাঠ এখন খুব স্পষ্ট তাঁর সামনে।

বসন্তের ভোর। মাঠের ওপর কোনো কুয়াশা নেই। তাই মাঠ আর তাঁর মাঝে কোন অস্পষ্টতা নেই। একটা-দু’টা পাখির ঘুম ভেঙেছে। কোনো মানুষ নেই। মাঠটা খুব নিঃসঙ্গ এসময়। পুবদিক এখনও লাল হয়নি। ভোরের বাতাসে ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ। কার্নিশের চড়ুই এসে বসেই থেমে থেমে কিচিরমিচির শুরু করল।

ওনার প্রতিদিনের নিয়মমাফিক ভোর দর্শন।

হঠাৎ একটা অপরিচিত শব্দ ব্যত্যয় ঘটাল।

শব্দটি এলো মাঠের দিক থেকে। ওনার সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো মাঠে। একজন লোক মাঠের মধ্যে দৌড়াচ্ছে। কিছু একটায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন।

উনি জানালায় দাঁড়িয়ে অভ্যাসবশত ‘ইশ্’ বলে উঠলেন।

আর ঠিক তখনি পড়ে যাওয়া লোকটিকে ঘিরে চারজন লোক এসে দাঁড়াল। কী ঘটতে চলেছে উনি বুঝতে পারলেন অবলীলায়।

গত কয়েক মাস যাবৎ এ রকম বহু ঘটনার তিনি বিচার চেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন, নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন।

নিঃশ্বাস আটকে আসতে চাইছে তাঁর।

রাস্তার নিয়ন আলো আর পুবদিক থেকে আসা লাল আলোয় তখন মাঠের মানুষগুলো তাঁর কাছে পরিষ্কার। পড়ে থাকা মানুষটির সাথে আজই একটি সেমিনারে অংশ নেবার কথা তাঁর। লালনের দর্শন ও সুফিবাদ নিয়ে দু’দিন আগে বেশ কিছু সময় দু’জন আলোচনাও করেছেন।

প্রিয় মাঠটায় এবার উদ্যত হলো একটি চাপাতি। আর একই সাথে ভেসে আসে আতংকিত কর্কশ শব্দটি। মুহূর্তেই পাঁজরের ভেতর বসত গাড়ে ভয়। তিনি মাঠটা দূরে ঠেলে জানালা বন্ধ করে দিলেন।

বন্ধ জানালার ওপাশে যাই ঘটুক না কেন, তাতে কোনো দায় নেই তাঁর।

কিন্তু তা আর হলো কই? একটু আগে আসা ফোন বুঝিয়ে দিল এবার দায় অনেক বেশি। স্বচক্ষে দেখেছেন সবকিছু। তাঁর এড়িয়ে যাবার উপায় নেই।

তবে অদ্ভুতভাবে সব সাহস জড়ো করেও তিনি পাঁজরের ভয়টা অগ্রাহ্য করতে পারছেন না। তীব্র কর্কশ সেই শব্দটা বারবার ফিরে এসে তাঁকে অসার করে দিতে চাইছে।

হঠাৎ বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল।

একবার…

কিছুক্ষণ বিরতি।

দুইবার….

কয়েক মুহূর্ত বিরতি।

তিনবার, চারবার এরপর অনবরত।

পৃথিবীর সব ভয় এসে জড়ো হলো তাঁর কাছে।

তাঁর পা দু’টো পাথরের মতো ভারী হয়ে গেল। দরজার ওপাশে কে বা কারা হতে পারে ভেবে দম আটকে আসতে চাইল তাঁর।

না, তিনি ভোর দেখেননি, মাঠ দেখেননি, শুধু দেখেছেন উদ্যত চাপাতি।

কলিং বেলের শব্দের সাথে এবার শুরু হলো ফোনের চিৎকার। শব্দগুলো ওনার পাজরে গিয়ে আঘাত করতে লাগল। তিনি দু’কান চেপে ধরলেন। ঠিক তখনি তিনি খেয়াল করলেন তাঁর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ বন্ধ জানালা ভেদ করে আসা সকালের আলোটুকু দপ করে নিভে গেল। তিনি আত্মসমর্পণ করলেন অন্ধকারের কাছে।

কাজের ছেলের ডাকে সম্বিৎ ফিরল তাঁর।

‘মতিন চাচা এসেছেন।’

তিনি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন।

কাজের ছেলেটি কিছু বুঝতে না পেরে বলল,

‘আপনার শরীর খারাপ নাকি?’

তিনি উত্তরে সময় ক্ষেপণ করলেন না। প্রায় দৌড়ে গিয়ে জানালা খুললেন।

সামনে বিরান মাঠটি নির্বিকার পড়ে আছে শুধু।

বিহ্বল তিনি। ভোর থেকে সকাল অব্দি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখন তাঁর কাছে গোলক ধাঁধা।

হঠাৎ দেখলেন কাজের ছেলেটির পিছু পিছু প্রফেসর মতিনও এসে দাঁড়ালেন। গায়ের জামাটি ভেজা রক্তে।

চমকে উঠলেন তিনি। লক্ষ করলেন তাঁর পা দু’টি অসাড় হয়ে গেছে। আর চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারছেন না।

তবে কিছু শব্দ ছুটে এলো তাঁর দিকে। প্রফেসর মতিন ক্ষোভের সাথে বললেন,

‘আপনি তখন জানালা বন্ধ করে দিলেন কেন?’

তিনি স্বপক্ষে কিছু বলার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। শব্দগুলো গোঙানি হয়ে জিহ্বায় জড়িয়ে গেল।

‘কী বলতে চাইছেন আপনি? কেন জানালা বন্ধ করলেন স্পষ্ট করে বলুন।’

প্রায় শাসানোর সুরে বলে উঠলেন মতিন সাহেব।

তিনি এবার পালাবার চেষ্টা করলেন। আশ্চর্য তৎপরতায় হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়লেন। এরপর প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলেন সে ঘর থেকে। কিন্তু ঘরটা খুব বিস্তৃত। তার বেরোবার সুযোগ হলো না।

বরং মতিন সাহেব অবিশ্বাস্য নিকটে চলে এলেন। আর মুখে সূক্ষ্ম একটা হাসি এনে বললেন,

‘প্রাতঃদর্শন তাহলে ফুরিয়ে গেল আপনার? জানালা তো খুলতে পারবেন না আর!’

তিনি এবার পালানোর আশা ছেড়ে দিলেন। কাঁচাপাকা ভ্রুর নিচে ঝুলে থাকা তাঁর চোখদু’টো অসহায় তাকিয়ে রইল মতিন সাহেবের দিকে।

আর মতিন সাহেবের গা থেকে বের হওয়া রক্ত শোবার ঘর থেকে গড়িয়ে নিচে, নিচের বসার ঘর পেরিয়ে ছাতিম গাছের গোড়ায় আর ছাতিম গাছের গোড়া ছাড়িয়ে বেয়ে চলতে লাগল মাঠের দিকে।

তখনই একটা তুমুল ধাক্কা এলো।

ধাক্কাটি এলো কাজের ছেলের কাছ থেকে। চিৎকার করে বলছে,

‘আপনি এমন করছেন কেন?’

এই ধাক্কায় জাগলেন তিনি। তিনি পা দুটো নাড়ালেন। দেখলেন বিবশ নয়, বশেই আছে তা। তিনি মেঝের দিকে তাকালেন। দেখলেন তা পরিষ্কার, চকচকে। কোথাও রক্ত নেই। ঘর তখন মতিন সাহেব শূন্য।

বুঝতে পারলেন সব দুঃস্বপ্ন ছিল।

তিনি বুকের ভেতর ভারী হয়ে থাকা শ্বাসটুকু বাতাসে ভাসিয়ে দিলেন। নির্ভার হয়ে গেলেন তিনি।

আজ ভোরে রক্তাক্ত প্রফেসর মতিনকে তিনি দেখেছিলেন ওই মাঠে। কিন্তু এখন মাঠটাতে নির্বিকার সবুজ ছাড়া আর কিছু নেই।

সুতরাং, সব দুঃস্বপ্ন ছিল।

তিনি বিছানা ছেড়ে উঠলেন। গায়ে একটু সিলিং ফ্যানের হাওয়া মেখে নিচে আসলেন।

প্রফেসর মতিন বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করে আছেন তাঁর জন্য।

তিনি আসলেন প্রফেসর মতিনের সামনে।

সব ইতস্ততভাব ঢেকে নিলেন আলগা হাসির পরতে। বসলেন প্রফেসর মতিনের সামনে।

‘লালন উৎসব পিছিয়ে দেবার পরিকল্পনা করেছি।’

কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন প্রফেসর মতিন।

মনে মনে তিনি হাঁফ ছাড়লেন। ইদানীং উটকো ফোনগুলো প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে তাঁর ওপর। লালন উৎসব আপাতত বন্ধ রাখাই ভালো।

তবে প্রফেসর মতিনের কথার উত্তরে মুখে একটা অসন্তোষের ছবি এনে বললেন,

‘কেন? লালন উৎসব বন্ধ করবেন ওইসব ফোনের ভয়ে? ওরা প্রশ্রয় পাবে।’

‘না, না, ভয় নয়।’

তিনি এবার আরও সাহসের পরিচয় দেবার জন্য বললেন,

‘না, লালন উৎসব পেছানো ঠিক হবে না। আপনি আয়োজন করুন।’

প্রফেসর মতিন একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন,

‘আপনার বাসার পাশের মাঠেই…’

কথা শেষ করতে না দিয়েই তিনি বেশ বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন,

‘হ্যাঁ, মাঠটাতে আয়োজন করতে পারেন। বেশ বড়। অনেক মানুষের সমাগম হবে এবার দেখবেন।’

প্রফেসর মতিন মনে মনে ধৈর্য হারালেন। তবুও রাশ টেনে বললেন,

‘মজনু শাহ্কে ছাড়া এই উৎসব কীভাবে সম্ভব? আজ ভোরে কারা যেন ওকে ঐ মাঠে খুন করে ফেলে রেখে গেছে।’

তিনি আঁতকে উঠলেন। মনের ভেতর বেড়ে ওঠা সাহসী বাবলগুলো কেউ একজন আঙুল দিয়ে চুপসে দিল।

সত্যিই তো আজ ভোরে মজনু শাহের সুরটি অনুপস্থিত ছিল!

মতিন সাহেব বলে চলেছেন, ‘আমরা লালন উৎসব নয়, প্রতিবাদ সভা করব। আপনি হবেন মূল বক্তা।’

তিনি কয়েক মুহূর্ত নির্বিকার রইলেন। বিপন্ন একটি দীর্ঘশ্বাস তাঁর গলা বেয়ে উঠল।

কিছু মুহূর্ত নিহত পাখির মতো ঝুলে রইল।

এরপর তিনি খুব নিস্পৃহভাবে আর নিচু লয়ে বললেন,

‘না’

এই প্রথম এ ধরনের আমন্ত্রণ অস্বীকার করলেন তিনি।

মজনু শাহের মৃত্যু তাঁকে নির্বোধ করে দিয়েছে। ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে তাঁকে। তিনি কিছু সময় সভা আর বিবৃতি থেকে দূরে থাকতে চাইছেন।

মুখে বিস্ময়ের ছবি নিয়ে ফেরত গেলেন মতিন সাহেব।

মতিন সাহেবকে বিদায় দিয়ে ফিরে এলেন ঘরে। তাঁর প্রিয় কেরোসিন কাঠের টেবিলে বসলেন।

বেশ আগে লিখে রাখা আধা সমাপ্ত একটি প্রতিবাদসূচক বিবৃতি ছিঁড়ে ফেললেন কয়েক টুকরোতে।

তিনি লিখতে বসলেন নির্দ্বিধায়। আর লিখলেন জীবনের প্রথম একটি প্রেমের কবিতা ।

মিলির জন্য।

এরপর যতবার তিনি জানালা খুলে মাঠ দেখতে চেয়েছেন ততবারই ছাতিম গাছটা আড়ি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.