মেনি : রাবেয়া রব্বানী

কালো মেনি : এ কি দেকে এলুম গো! এই ছোট গেরামে ম্লেছ এসে ভিড়লে।

রাঙ্গা মেনি : তবে বলরাম শকুন্তলার সাতে মিছে কতা কয়নি! ভেবেছিলেম মুকের কতায় চিড়ে ভিজোচ্ছে ঠুটোটা।                                                                 

কালো মেনি : না না, এক রত্তি মিথ্যে নয়, গা। জাহাজ, না রাবনের রত! কত মোটা কোল ! নাল নাল হনুগুলো নাফিয়ে বেড়াচ্চে। ছে ছে ছে!

রাঙ্গা মেনি : এই জনমে শেষমেশ ম্লেছ দেকে মরব, বলচ?

কালো মেনি : সুকের কতা নয়, গা। কালিকট দাবিয়ে এয়েচে। ভূ-ভারতের আরও কত জায়গায় যে ধন্না মেরেচে, নারায়ণ জানে। তারপর পার পেতেচে সাত গাঁ।

রাঙ্গা মেনি : হ্যাঁ গা, সাত গাঁ। সেকানেই তো যেতে চেয়েছিলুম। একানে মানুষ কম, খাবারের কষ্ট। সাতগাঁ গঞ্জ আচে! কত এঁটো কুটো। একানের মোতন কুড়ে-দেড়ে হবে নে গাওড়াগুলো। (গাওড়া- বেড়াল)

কালো মেনি : তাহলেই হয়েচে, কী উৎপাত করেই না বেড়িয়েচে ম্লেছগুলো ওকানে, শুনতে পাসনি? মাজে সাজে অগ্নিবাণও মেরেচে! ঘাট শুকিয়ে যাচ্চে বলে নাকি এবার এইকানে এয়েচে। আসল কেচ্চা একটা তো আচেই। ঘাটে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনে এলুম, নোকজন হা হা কচ্চে।

রাঙ্গা মেনি : খুব খিদে নেগেচে, গা কিন্তু এত বড় কাণ্ড বেঁধে গেল, চল দেকে আসি গে একবার।

সরু গায়ের পথ। কুচকুচে কালো মেনি বিড়ালটা এক পা এক পা করে এগুচ্ছে। লালচে-কমলা রঙের বেড়ালটা যাকে আমরা রাঙ্গা মেনি বলে ডাকছি, তার গতি শ্লথ। নারকেলের পাতাগুলো স্থির।পাখিরাও দমে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। সূর্য চুইয়ে চুইয়ে পৃথিবীতে পড়ছে বলেই হয়ত পথে লোকজন কম। রাঙ্গা মেনি একটু থেমে থেমে শেয়ালের মতো একদিকে তাকিয়ে বলল, কালি দি, নড়েনের গেরস্ত দেক! গাই, ছাগ, হাঁসী কি নেই! পুকুরে মাঁচও আচে ম্যালা।

কালো মেনি : হলে কি হবে, কেপনের কেপন। ধানের খোসাটুকুও চিড়ে চেলে খায়। গিয়ে দেক না, ঝেঙ্গিয়ে বিদেয় করে দিবে। রমেনের বাড়িতেই একন পড়ে থাকি, গা। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, কটা দানা আর পেটে ধরবে?

রাঙ্গা মেনি : ঠিক কয়েচ, নড়েনের ওকানে নাভ হয় নে। কুন্তির ভিটেতে গেলে অবশ্য দুটো খেতে পাই। গ’লী মেয়েটা বড় গোপাল ভক্ত, নুকিয়ে দুধও খেতে দেয়। কিন্তু বুড়ো গাওড়া আচে না একটা?

কালো মেনি : আচে তো, তাতে হয়েচেটা কি?

রাঙ্গা মেনি : ছাল নেই কুকুরের বাগের মতো ফাল গা। দেখলেই নাফিয়ে গাঁয়ের ওপর পড়ে। এই পোয়াতি শরীরে ওসব ধকল আর সইবে?

কালো মেনি : তা একটা ভিটেতে মন নাগিয়ে থাকিস না কেন বাছা? এভাবে টিরটির করে বেড়াস। বুড়ো গাওড়া আর কতদূর যাবে, নাপ-ঝাপ একটু সয়ে নিলেই হয়।

রাঙ্গা মেনি : পেত্তম পেত্তম চেষ্টা করেছিলুম। কুন্তিও চেয়েছিল আমি থেকে যাই। একদিন একটা গেচো গাওড়া এসে হাঁসির ছানাগুগুলো তুলে নিয়ে গেলে, কুন্তির বর না জেনে, না বুঝে কি নাথি গুতোই মারলে! আর ভালো নাগেনি।

কালো মেনি : যাই বলিস, তুতিয়ে বাতিয়ে থেকে গেলেই পাত্তি। পেটে সইলে পিঠেও সইয়ে নিতে হয়, বাছা।

রাঙ্গা মেনি : অত পারব নে। কানাই রামের ভিটেই ভালো। বৌ খান মরে গেচে, ছাপোষা মানুষ। পাঁচ ভূতের দকল নেই, একা রেধে বেড়ে খাঁয়। এটোটা, কাঁটাটা, মুড়োটা ছুড়ে দেয়ই দেয়। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই, কোতায় যে চলে যায়, কে জানে! ভিটেটা নক্কিছাড়া, খাঁ খাঁ কচ্চে।

কালো মেনি : হ্যারে, শুনেচি কানাই রাম ঠগী। মাঝ নদীতে লৌকা থামিয়ে ডাকাতি করে। মা চন্ডি কালির পুজো করে তারপর ডাকাতি কত্তে যায়।

রাঙ্গা মেনি : সত্যি কতা কইচ গা? তাই বুঝি চেহারাটা এমন অসুরের মতো হয়েচে!

একটা ধবধবে সাদা হুলো বেড়াল পতিত ফসলের ক্ষেতটা থেকে নিঃশব্দে পথে উঠে এলো তারপর রাঙ্গা মেনির গা ঘেঁষে সাবধানে দাঁড়াল।

সাদা হুলো : এই রাঙ্গা, দাঁড়া দেকিনি।

কালো মেনি : আমি এগুলাম, তরা দুটিতে কতা কয়ে নে।

রাঙ্গা মেনি : ও ডোমুরের ফুল, ও ছত্রিশ জাতের এঠু, তোমার আবার আমার সাথে কতা কিসের গা, তাও এই সব্বোনাশের দিনে ।

সাদা হুলো : কি হয়েচে আবার?

রাঙ্গা মেনি : ওই দ্যাখো! ঘাটে জাহাজ ভিড়েছে শুনতে পাওনি।মিছিমিছি মুখ মেরে বেড়াও।

সাদা হুলো : আহ সেই কতাই তো কইতে এয়েচি, মুখপুড়ি। মনটা বাঁধা ছাদা করে নে খন। আমার সাথে যাবি ওকানে।

রাঙ্গা মেনি : আমাকে কি ভাগীরথীর কোলে ফেলে মেরে ফেলার বুদ্ধি এটেছ অ্যা? ছানা পোনা আসছে, সহ্যি হচ্চে না বুঝি?

সাদা হুলো : ঘাট হয়েছে আমার। এবার কতা শুন। মানে বলছি কি, ছুঁচো আছে মেলা। ম্লেচ্ছদের জাহাজে গাওড়াগুলো মরে গেচে। ওরা একন একান থেকে নতুন গাওড়া নিচ্চে । চ, অন্তত উপোস থাকতে হবে নে।

রাঙ্গা মেনি : ঔ দ্যাখো! ম্লেচ্ছদের জাহাজের ছুঁচো! ও আমি মুখেও দিব নে। আর তোমার, আমাকে নিয়ে এত চিন্তে কিসের গা? পেটে বাচ্চা দিয়েই ভেগে গেচ আর একন এয়েচ সঙ্গে বাতি দিতে? কোন গোপিনী পাচ্ছ না তাই বলবে তো।

সাদা হুলো : তুই হইলি গিয়ে রাঁধা, গোপিনী শ্রেষ্ঠা।

রাঙ্গা মেনি : উউউ! মূলে মাগ নেই, ফুলশয্যা! এইসব থুতু দিয়ে আর ছাতু ভিজবে নে,এই আমি বলে দিলুম।

সাদা হুলো : বলে দিলেই হলো? ভগবান হুলোদের বানিয়েছেন কেষ্ট ঠাকুর করে। এটা তো তোর না বুঝার কতা না।

রাঙ্গা মেনি : অ্যাঁ, ভুসকুমড়ো, ভোগের পায়েস, বাসি ফ্যান, গঞ্জের পচা মাকন, গোরুর লাদ, ভাগ দেকি নি।

লাল মেনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আক্রমণাত্মক শব্দ করল। সাদা হুলোটা কিছুক্ষণ তার সামনের পা দিয়ে মুখ চুলকে লাল মেনির ভাব গতিক বুঝে নিল তারপর হরহর করে পিছলিয়ে আবার ক্ষেতের আলে নেমে গেল। কালো মেনি বিড়ালটা একটু থেমে এবার লাল মেনির সঙ্গ নিল। হেঁটে হেঁটে এক সময় তারা দাঁড়ালো ঘাটের সামনে।

একটা ছোট গ্রাম। (যার নাম এক শতক পর হুগলি হয়ে উঠবে।যে গ্রামকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠবে বর্তমান হুগলি জেলা।) মানুষ জন কম। মোচড় খাওয়া নদীটা ভাগীরথী নদীর একটি শাখা।একটা যাত্রী আর মালামাল পারাপারের ঘাট। তাও বেশ বিস্তৃত না। এখানে ওখানে হোগলা গাছের ঘন ঝোপের কারণে নৌকা রাখা যায় না। খড়ের ছাউনি দেওয়া দরিদ্র চেহারার, দু-একটা দোকান কেবল ঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমনিতে খুব বেশি মানুষের ভিড় দেখা যায় না এখানে কিন্তু আজ মানুষ প্রচুর । নানান ধরনের মানুষের পা ঠেলে সামনে দিয়ে দাঁড়াতে বেগ পেতে হলো দুই মেনির। পর্তুগিজদের একটা বড়সড় জাহাজ তুমুল প্রতাপে দাঁড়িয়ে আছে ঘাটে। মাথা বেশ কিছুটা উঁচু করে রাঙ্গা মেনি দেখল জাহাজটাকে। কালো মেনি কৌতূহলে বার বার মাথা ঘুরাল, লেজ নাড়ল, ঠোঁট চাটল। কিন্তু মানুষের চেঁচামেচি, জাহাজের পাটাতনে ধুপ ধাপ শব্দ রাঙ্গা মেনির সহ্য হলো না। সে শরীর গোল করে পেঁচিয়ে চোখ বুজল। 

২.

পাঁচুনি মেনি : রাঙ্গা, তোর বিয়োনের খন এসে গেছে গা, এই অসময়ে পুকুর পাড়ে ঝিমোচ্ছিস?

লাল মেনি : হ্যাঁ, সামনের মাসেই তো। শরীরটা ছ্যাক ছ্যাক কচ্চিল। একানে ভালো নাগচে।

পড়ন্ত বিকেলের মিঠে আলো, বাঁশমহালের পাতাগুলোর ভেতর থেকে নকশা কেটে বের হচ্ছে। সেই রোদে রাঙ্গা মেনি চিত হয়ে নিজের শরীর চাটছে, সাবধানে কাত হচ্ছে। একটা পাথরের টুকরো সামনের পায়ের তালু দিয়ে ধরতে চাইছে। এমন সুন্দর আলোয় খুব সুখ সুখ ভাব হচ্ছে তার মনে তাই পাঁচুনি মেনির সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষণ রাঙ্গা মেনির সারা শব্দের অপেক্ষায় থেকে পাঁচুনি মেনি আবার জিজ্ঞেস করল, তা একন থাকিস কোতায়?

রাঙ্গা মেনি : কানাই রামের বাড়িতেই আচি। দু’মাস ধরে তো ভিটেতেই আচে। তা না হলে দড়ি কলসি জোটাতে হতো, গা।

পাঁচুনি মেনি : তোর তো তাহলে সোনায় স’গা রে। আমাকেই দেক না, না পাচ্চি ভালো খাবার না পাচ্চি ভালো গাওড়া। বিয়োনেরও খেমতা নেই, শুধু শুধু নরকের তুলো দিয়ে সুতো বানিয়ে বেড়াচ্চি। তা বাচ্চাগুলার বাপ এয়েচিল খবর নিতে?

রাঙ্গা মেনি : এয়েচিল এক দু’বার। তার তো একন শাককে শাক, পোদে মুলো। ম্লেছদের পায়ে পায়ে ঘুরচে আর এদুরের গুষ্ঠির ষষ্ঠিপুজো করচে।

পাঁচুনি মেনি একটু হেসে নিয়ে বলল, যাক গে এ নিয়ে আর ভাবিস নে। একন ম্লেছরা যেভাবে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্চে, গেরস্তের ধন নুটে নিচ্চে, গ্রামটার কী হবে ভগবান জানে। সাতে আচে আবার ঠগিগুলো। আচ্চা বল দেকিনি কানাই রাম কি সত্যি ঠগি?

রাঙ্গা মেনি : কানাই রামের জন্য আমার মতো অভাগীর হাড়ে বাতাস নেগেচে, তাকে নিয়ে এত বাচ বিচের কিসের গা?

পাঁচুনি মেনি : আচে আচে কারণ আচে। সাতগার মোতোন এই গ্রামেও ম্লেছরা ঠগিদের নিয়ে ঝামেলা করবে, সবাই বলাবলি কচ্চে।

 পাঁচুনি মেনি সব সময়ই এমন বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তার কথা বলে তাই রাঙ্গা মেনি তার কথায় গা করল না। বাঁশ ফুল ঝরে পড়ে আছে পায়ে চলা পথটায়। ঝোপের উল্টো পাশ থেকে তিতিরদের কিচকিচ শব্দ ভেসে আসছে। ইন্দ্রনাথের মোটা মোটা হাঁসগুলো আজ সন্ধ্যের আগেই শরীরের পানি ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পাড়ে উঠে এসেছে, সার বেঁধে ঘরের দিকে ফিরে যাচ্ছে। হঠাৎ বৃষ্টির মতো শব্দ হওয়ায় কান খাড়া করল রাঙ্গা আর পাঁচুনি। ঝট ঝট করে তারা মাথা নেড়ে নেড়ে আকাশের দিকে কিছু খুঁজতে লাগল। যা ভেবেছিল তাই, পড়ন্ত বিকেল বলে ঝাঁক বেঁধে সারসার মহাচ বিলের দিকে যাচ্ছে। ওদের ডানা থেকে চুইয়ে পড়ছে ঝিরিঝিরি পানি। পাখির পালকের লোভনীয় গন্ধ দুই মেনির পেট পর্যন্ত পৌঁছে গেল। হাঁ করে দলটার দিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল পাঁচুনি মেনি।

৩.

কানাই রাম উনুন ধরিয়েছে। লাল মেনি একটা ভাঙ্গা মাটির কুঁজোর পাশে ঘুমে অসার বোধ করছে। তার চার পাশে চারটা ছানা মৃদু স্বরে মিউ মিউ করছে। দুটোর চোখ ফোঁটা এখনও বাকি তাই নিশ্চিন্ত ঘুমুতেও পারছে না রাঙ্গা। এর মধ্যে বাজ পাখিটার কান্না আত্মা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কানাই রামের বাড়ির পেছনে বেশ কিছু রাজ শিরিষ, হরীতকী, আমলকি গাছ। নিজের ঘন ঝোপসহ জায়গাটা জঙ্গলের মতোই লাগে। সেখানেই জায়গা করে নিয়েছে সঙ্গী হারানো একটা বাজপাখি।

কানাই রাম হঠাৎ উনুন রেখে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে এখন বাড়ির পেছনের গাছগুলোর দিকে কি যেন খুঁজছে। তার হাতে এখন একটা কাঠের তক্তা আর একটা দড়ি। রাঙ্গা মেনি ভাবছে কানাই রাম ঈগলটার অবস্থান বুঝে নিতে চাইছে হয়তো সেটা ধরার জন্য। রাঙ্গা মেনির মনে হলো ধরতে পারলে ভালোই হবে। রাতের বেলা কানাই রাম নৌকা করে ডাকাতি করতে গেলে বিশাল পাখিটা তার কাঁধে থাকবে এবং তাকে তখন ভাগীরথীর রাজা বলেই তো মনে হবে। বাকি ডাকাতরাও তাকে নিশ্চয়ই সমীহ করবে।

হঠাৎ উঠোনে শব্দ পেয়ে কানাই রাম ফিরে তাকালো, রাঙ্গা মেনি আঁতকে লাফিয়ে উঠল। নবাবদের মতো পোশাক পরে, গাধার পিঠে চড়ে একটা পর্তুগিজ নাবিক এসেছে কানাই রামের উঠোনে। তার আশপাশে বেশ কিছু স্থানীয় লাঠিয়াল দাঁড়িয়ে আছে। রাঙ্গা মেনি বুঝতে পারল এখনি এখান থেকে সরে পড়া দরকার। এরা এলেই খুব চেঁচামেচি করে কানাই রাম। আরও দু-একবার দেখেছে লোকগুলোকে এখানে কিন্তু কৌতূহল সামলাতে পারছে না বলে রাঙ্গা মেনি সরি সরি করেও সরতে পারল না।

হঠাৎ করেই সবাই তর্কাতর্কি শুরু করে দিল। কানাই রাম ঘন ঘন মাথা নাড়ল, থুতু ছিটাল হাতে কাঠের তক্তাটা শক্ত করে বর্শার মতো তাক করে ধরে রইল। পর্তুগিজ লোকটা দু-একটা বাংলার সাথে অপরিচিত শব্দে চেঁচিয়ে উঠল। লোকগুলো কানার রামকে পিছমোরা করে বাঁধার আগেই রাঙ্গা মেনি বিপদের গন্ধ পেয়ে গেল। সে তার চোখ না ফোটা বাচ্চা দুটোকে খড়ের গাদার পিছে রেখে আসতে আসতেই কান ফাটানো শব্দে স্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ। কাকগুলো কা কা করে উড়ে গেল। কুঁজোর পাশে ফেলে রেখে আসা ছানা দুটো ভয় পেয়ে ছুটতে চাইল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকগুলোর পায়ের নিচে পড়ে গেল। চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া শরীর দুটো দূর থেকে দেখে নিশ্চল হয়ে গেল রাঙ্গা মেনি। দুজন লোক কানাই রামের মৃত শরীরটাকে আরও কয়েক ঘা লাঠির আঘাত করে চলে গেল।

রাঙ্গা বাচ্চা দুটোর কাছে এসে তাদের শরীর চাটতে লাগল। কিন্তু থেঁতলে যাওয়া শরীর দুটো কিছুতেই সারা না দিতে সে বিকট সুরে গোঙাতে লাগল। বাজপাখিটা কিছুক্ষণ থেমে ছিল এখন আবার রাঙ্গা মেনির বিলাপে সুর মিলাল। এর সাথে এসে জুটল রাজ্যের কাক। সব মিলিয়ে স্বজনহীন কানাই রামের মৃত্যুতে একটা ভয়াবহ শোকের আবহ নেমে এলো।

৪.

রাঙ্গা মেনি : বেশি দূর যাস নে বাছা, আজ চাঁদ নেই। তারাগুলোও দেকা যাচ্ছে নে। আহা কে শুনচে কার কথা। দেক দেখি?

বন্ধ্যা খেতের পাশের ঝোপ-ঝাড়। লাল মেনির বাচ্চা বেড়াল দুটো পাতা সরিয়ে সরিয়ে বালি নিয়ে খেলছে। আর মাঝে মাঝে চোখদুটো বড় করে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা কানাই রামের বাড়ির দিকে তাকাচ্ছে। কিছু মানুষ জনের শোরগোল পাওয়া যাচ্ছে।পাঁচুনি মেনি ও কালি মানি হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল,

পাঁচুনি মেনি : কিরে কানাই রামের ভিটেতে আগুন নেগেচে। গ্রামের নোকরা কেমন ঘুমুচ্ছে। এক সাথে চল একটু কেঁদে কেটেনি। নোকজন জানাতে হবে না?

কালি মেনি : দৌড়ে এয়েচি গা। ধোঁয়া দেকচি অনেক উপরে উটে গেচে। আজ সন্ধ্যে থেকেই বুঝতে পারছিলুম কিছু একটা হবে এই গ্রামে।

রাঙ্গা মেনি : তোমরা পারও বাপু! এত আত্রিরে নোক জন উটে করবেটা কি আর কানাই রামের ভিটে পুড়লে কার কি এসে যায়? সে তো আর পিতিবিতে নেই গা।

পাঁচুনি মেনি : তাই বলে একানে পা ছড়িয়ে গা চাটবি? চ গিয়ে দেকে আসি গে।

রাঙ্গা মেনি : হয়েচে, আর দেকতে হবে নে। এই তো সেকান থেকেই এলুম।

কালো মেনি : গিয়েচিলি তবে? কি দেকে এলি রে?

রাঙ্গা মেনি কিছু না বলে বাচ্চা দুটোর দিকে এগুতে শুরু করলেই। সাদা হুলো চিতার মতো লাফিয়ে  এলো।

সাদা হুলো : কিরে তোরা একানে গপ্প করচিস? আর ওদিকে সব্বোনাশ হয়ে গেচে। ম্লেছ ছিল কানাই রামের ভিটেতে। ওরা এয়েচে আগুন নিভোতে। একন আশেপাশে জলও পাচ্ছে নে।

রাঙ্গা মেনি : আমার ছা দুটো যকন মরে গেলো তকন তো তোমাকে এভাবে নাফাতে দেকি নি, একন রাবনের মুণ্ডু বাঁচাতে এয়েচ? সেগুলো তার আস্ত নেই।

সাদা হুলো : তুই জানলি কেমন করে? গিয়িছিলি নাকি?

রাঙ্গা মেনি : গিয়েছিলুম তো। সন্ধ্যে থেকেই মদ গিলেছে, আস্ত পাঁঠা পুড়ে খেয়েচে, মর্কটগুলো।

সাদা হুলো : তারপর?

রাঙ্গা মেনি : তারপর আর কি? ওরা ঘুমিয়ে পড়তেই আমি ঘরে ঢুকেছিলুম। উনুনের আগুন ধিক ধিক কচ্ছিল। আমি কেবল মুখে করে ওদের গায়ের কটা জামা, কটা খড় উনুনের ওপর রেকে এয়েচিলুম। এই তো! আগুন নেগেচে অনেক আগেই, যম এতক্ষণে নরকে নিয়ে চলেও গেচে।

কালো মেনি : কি বলছিছ মুখপুড়ি এ তোর কাজ!

রাঙ্গা মেনি : কি করব বল দিদি? খেমা কত্তে শিকিনি যে।

কালো মেনি : আহা বাছা, তিন কাল দিয়ে এককালে ঠেকেছে একন আর এইসব পেতিশোধ ভালো নাগে নে।

পাঁচুনি মেনি : তাই বল। তা আগে বলবি তো? মিছিমিছি ধেয়ে এলুম। আমি যাই গনেশদের বাড়িতে এঁদুর এয়েচে কিছু।

রাঙ্গা মেনি : নতুন বাচ্চা হয়েচে, একটু সাহায্য গুচ্চ করিস গা, এঁদুর পেলে দুটো দিয়ে যাস।

পাঁচুনি মেনি একবার ফিরে তাকিয়ে কালো মেনির সাথে চলে গেল। সাদা হুলো একটু অপেক্ষা করে রাঙা মেনির কাছ ঘেঁষে বসল,

 ভালোই করেচিস, একদিন আমার পাছায় লাথি মেরেছিল। আমিও ছেড়ে দেইনি। ওদের শুকোতে দেওয়া কাপড়ে হেগে দিয়েছিলুম।

রাঙ্গা মেনি : তা তোমার পোদে হাগা ছাড়া আর আচে কি! হাগুরে কোতাকার।

সাদা হুলো : তর এককান কতা। ছানাগুলো তো বড় হয়ে যাচ্চে রে।

রাঙ্গা মেনি : তাতে তোমার কী? গোপিনীদের জাহাজে ফেলে এয়েচ, চিন্তে হচ্চে নে?

সাদা হুলো : না না। আজ আত্তির রাঁধার।

রাঙ্গা মেনি : উউ, ত্রিলোকচন্দ্র এয়েচে।

সাদা হুলো : শুন না, মানে বলছিলাম কী, সাদা হুলো রাঙ্গা মেনির আরও একটু কাছ ঘেঁষে বসে তার সামনের পা দুটো চেটে দিল। লাল মেনি তেমন একটা গা করল না। সে মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে ছানাগুলোকে দেখতে থাকল। ছানাগুলো একবার সাদা হুলোর কাছে এসে বড় বড় চোখে তাকিয়ে থেকে আবার পাতার খেলতে চলে গেল। সাদা হুলো এটা ওটা বলতেই থাকল। কানাই রামের বাড়িতে হঠাৎ আগুন কিছু একটা গ্রাস করার সময় বিকট শব্দ তৈরি করল। মুহূর্তেই রাঙ্গা মেনির কান দাঁড়িয়ে গেল।  সে মুখ নিচু করল, চোখের পাতা শক্ত করল তারপর দেখতে চেষ্টা করল। 

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares