বৃষ্টি; না পুরুষ, না নারী : খালিদ মারুফ

আমি দৌড়াচ্ছিলাম। স্বপ্নের গতিতে। স্বপ্নে এমন দৌড় আমি অনেক দৌড়েছি, আপনারও হয়তো এমন অভিজ্ঞতা থেকে থাকবে। গতি ভীষণ, অথচ পথ কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। একবার পড়ে যাই, আবার উঠি, পেছনে ধেয়ে আসা উন্মত্ত কুকুরটা কিংবা একদল খুনি অথবা একটি সাপ আমাকে ধরে ফেলেÑ আবার ধরতে পারে না। আমি দৌড়াই-ক্রমাগত দৌড়াই-দৌড়তে থাকি। একসময়; সামনে একটা দেয়াল। লাফিয়ে উঠি, পার হয়ে যাই অথবা পার হতে পারি না, আমার পতন ঘটে। ঘুম ভেঙে যায়। তবে যে দৌড়ের কথা আমি বলছি সেটা স্বপ্ন নয়, বাস্তব। কেউ আমাকে তাড়া করেনি। সোনালি রংয়ের লালা ঝরা কুকুর, তিনটে কি চারটে খুনি, চকচকে ছোরা হাতে; অথবা একটা সাপ, কালকেউটে না-কি ভয়াল গোখরা, ভীষণ বয়েসি, হিংস্র, ফণায় চুল গজিয়ে গেছে, ধূসর; এসব কিচ্ছু না। আমি আসলে দৌড়াচ্ছি নিজের গতিকে ছাপিয়ে যেতে।

দৌড়ে আমি কোনোদিনই ভালো নই, ছিলাম না; এমনকি শৈশবেও। আমি দৌড়াচ্ছিলাম, যেন পার্টিটা শুরু হবার পূর্বেই ওখানে পৌঁছতে পারি। এই মুহূর্তে দৌড়ের বিকল্প আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। রিকশা নিতে পারতাম, তবে সন্ধ্যার পর প্রতিদিন এই রাস্তাটার যা অবস্থা হয়; আজও তাই। হাজার-হাজার রিকশা, ‘সঙ্গমরত কুকুরের মতো’ একটা আরেকটার পেছনে লেপ্টে আছে। সেগুলোর ফাঁক গলে দৌড়ে এগুনো কষ্টকর। ইতিমধ্যে আমার পায়ে-হাঁটুতে-বুকে রিকসার হ্যান্ডেল-চাকা-এক্সেলের বেশকিছু ঠোকাঠুকি ঘটে গেছে। এগুলোর কোনোটি আমার পরনের প্যান্ট ফুটো করে দিয়েছে কি-না, না-কি ছিঁড়ে নিয়েছে নিয়েছে হাঁটুর চামড়া তা বোধ করবার-দেখবার সুযোগ নেই। দাঁড়িয়ে, উবু হয়ে এইসব ক্ষুদ্রক্ষত অবলোকন বা উপলব্ধির জন্য যতটুকু সময় দরকার তা আমার নেই। কেননা, আমাকে পৌঁছতে হবে পার্টি শুরু হবার পূর্বেই।

পার্টি শুরু হয়ে গেলে আধিকারিক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলার ফুরসৎ পাওয়া যাবে না, তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, তার মতো আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলাপে-আপ্যায়নে। অতসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ঠেলে, সামনে গিয়ে আমার এই ক্ষুদ্র বিষয়টা তাঁর মাথায় ঢোকানো কঠিন হবে। তিনি কর্ণপাত করবেন না। কিংবা এমন একটা সময়ে আমার সেখানে হাজির হওয়া, একইসঙ্গে একটি অনভিপ্রেত বিষয়ের অবতারণা তাঁকে বিরক্ত করবে; করাটাই স্বাভাবিক। এছাড়া তিনি একবাক্য শেষ না হতেই কথার ভিতর ঢুকে পড়েন, অপর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতোই; এটা তাঁর মুদ্রাদোষ এবং তার মতো একটি যেনতেন সমাধান বাতলে দিয়ে ঘন গোঁফের আড়াল থেকে মিষ্টি করে হাসবেন, চোখের ইশারায় চলে যাবার নির্দেশ দেবেন। ফলে, এই হাঁপিয়ে-ঘেমে একাকার হয়ে যাওয়া দৌড়ের ফাঁকে আমার আসলে চিন্তা করা উচিত, একটি মোক্ষম বাক্য। যে বাক্যটি ব্যবহৃত হবে কথার শুরুতেই। এমন একটি বাক্য যা দিয়ে শুরুতেই তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়, যাতে মাঝখানে আমাকে না থামিয়ে পুরো বিষয়টি শুনতে তিনি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তবে সবকিছু নির্ভর করছে পার্টি শুরু হওয়ার পূর্বেই আমার সেখানে পৌঁছতে পারার উপর। উচিত ভাবনাটি আমার মাথায় খেলছে না, খেলে না; যখন দরকার।

আমার মাথায় চেপে বসে থাকে একটা ভূত; ভীষণ দুঃখী। যেটাকে আমি বয়ে বেড়াচ্ছি; শৈশব থেকে। এক চাঁদনী রাতে, আমার বড়ো ফুপু, যিনি যুদ্ধের সময় দখলদার বাহিনীর একদল সেনার হাতে ধর্ষিতা হয়েছিলেন। যার বিয়ে হয়েছিল একজন আইনজীবীর সঙ্গে। স্বামী তাঁকে ভালোবাসতেন না-কি বাসতেন না, আমি জানি না, বুঝতে পারিনি। যৌতুক ছাড়াই ঐ আইনজীবী আমার ফুপুকে বিয়ে করেছিলেন, তাঁদের চারটি সন্তান রয়েছে, এবং তিনি দীর্ঘ-দীর্ঘ দিন আমাদের বাড়িতে অর্থাৎ তাঁর পিতার বাড়িতে অবস্থান করতেন তবে ঘরে তিনি নির্যাতনের শিকার এমন কোনো গল্প আমি শুনিনি কোনোদিন। তিনি; অর্থাৎ আমার বড়ো ফুপু ঐ বুড়ো আর দুঃখী ভূতটার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, বলা যায় আমার কাঁধে তুলে দিয়েছিলেন, অজ্ঞাতে-অজান্তে। ভূতটা একসময় মানুষকে ভয় দেখনোর কৌশল ভুলে যায়, এই অপরাধ কিংবা অযোগ্যতার কারণে ভূতের সমাজ ওকে পরিত্যাগ করে। মন্বন্তরের বছরগুলোতে ভূতটা পা ছড়িয়ে একটা নবীন বটগাছে বসে থাকতো, শেওড়া গাছের দখল সে আগেই হারিয়েছে। পাঠশালা ফেরত বালক-বালিকাদের সঙ্গে ওটার ভাব জমে গিয়েছিল একসময়। হাটফেরত লোকদের ভয় দেখিয়ে মাছ সংগ্রহের কৌশল যেহেতু ও ভুলে গেছে, তাই, নাকি-সুরে হাটফেরতদের কাছে মাছ ভিক্ষা চাইতো। কেউ ওর আবেদনে সাড়া দিত না, বিনিময়ে বাড়িয়ে দেওয়া শীর্ণ হাতে দিয়ে দিত বিড়ির অগ্রভাগে ফুটে থাকা জোনাকির মতো, অথচ নিষ্ঠুর আগুনের ছেঁকা। হু হু শব্দে কেবল কাঁদত সে। আমি ওটাকে দেখিনি কোনোদিন, ঐ একই বটগাছ, মন্বন্তর আর যুদ্ধ পেরিয়েও দাঁড়িয়ে ছিল, সজীব। যখন আমি ঐ একইপথ দিয়ে একই পাঠশালায় গেছি, তখন, আমি ওটাকে দেখবার জন্য দৃষ্টি দিয়েছি যৌবনবয়েসি বটগাছটার শাখায়, পাতার ফাঁকে। কোনোদিন দেখিনি। হয়তো ও আর ছিল না, কিংবা মুক্তি পেয়ে মরে গিয়েছিল। আমি অজস্রবার ওটাকে ভুলে থাকতে চেয়েছি। ভুলে থাকিও, তবু এমনসব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অপদার্থটা আমার মাথায় এসে জায়গা করে নেয়। আমি ও-র বুড়ো কণ্ঠের নাকি-কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই।

শরীরটাকে ঝাড়া দিই, ভুলে যাই ওটাকে। ঠিক কোন বাক্যটি দিয়ে আমি আধিকারিক মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলা শুরু করব আর কিভাবে; সংক্ষেপে অথচ হৃদয়গ্রাহী উপায়ে আমার এই ভীষণ সমস্যাটা তাঁর নিকট উপস্থাপন করব সে বিষয়েও আমি আর ভাবি না। আপতত যথাসময়ে সেখানে পৌঁছানোই মূল চিন্তা। আমি আধিকারিকের পুরাতন অট্টালিকার চূড়া দেখতে পাই। নদীর পাশে, এই পুরাতন অট্টালিকা, নদীটা মরো-মরো হয়ে সরে গেছে ওটার সামনে দিয়ে, বেশ খানিকটা দূরে। বাহির থেকে পুরাতন হলেও ভেতরটা এখনও নতুন, প্রাণবান প্রাসাদ। সময়মতো এর আসবাবসমূহ পরিবর্তন করা হয়, পরিবর্তন করা হয় আলোকসজ্জাও। আধিকারিক মহোদয়ের পূর্বপুরুষের তৈরি অট্টালিকা। নানাদিক থেকে এটি একটি ব্যতিক্রমী বিষয়ও বটে। কেননা, ঔপনিবেশিক সময়ের মহান পুরুষ, যারা ন্যাটিভ হয়েও এমনতর অট্টালিকা গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন, সেগুলোর কোনোটাই এখন আর তাদের উত্তরপুরুষের হাতে নেই। এমনতর ভবনসমূহের অধিকাংশই এখন পুরাতত্ত্ব বিভাগের মালিকানায়, কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, কিছু রয়েছে কোনো না কোনো ট্রাস্টের মালিকানায়। আমার জানা মতে এই একটি ভবনই যথাযথ উত্তরাধিকারের হাতে রয়েছে, এবং সেটা আমার আধিকারিকের। আগের মতোই, এখনও, এই ভবনে নিমন্ত্রণ পাওয়া ব্যক্তিবর্গের সবাই বিশেষ। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু অবিশেষ ব্যক্তিও এখানে নিমন্ত্রণ পেয়ে থাকেন, সেটা আমার পরিচালকের বদান্যতা কিংবা তার সংস্কৃতিপ্রীতি।

মহলের সিঁড়িতে পা-দিতেই আমি বুঝে যাই; পার্টি শুরু হয়ে গেছে। তবু আমাকে ঢুকতে হবে। বিষয়টার একটা সমাধান করতে হবে আজই; কেননা তিনি পনেরো দিনের জন্য দেশের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সভায় যোগ দিতে জেনেভা চলে যাবেন। আমি ভেতরে ঢুকি। জমকালো বৈঠকখানায় জনা তিরিশেক গণ্যমান্য, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। অনুচ্চস্বরে কথা বলছেন সকলে, প্রায় সকলের হাতেই মদের গ্লাস। আমি ফ্লোর দিয়ে হাঁটি, ডানে-বাঁয়ে তাকাই। অভ্যাগতদের কেউ খুব একটা ভ্রƒক্ষেপ করেন না। আমি আবার ভাবতে শুরু করি, সমস্যাটার বর্ণনা আমি ঠিক কীভাবে শুরু করব। তিনি নিশ্চয় জানতে চাইবেন, বিষয়টি আমি সমিতির সভাপতি-সেক্রেটারির সঙ্গে আলোচনা করেছি কি না। নাকি বলবেন, ‘তোমার মতো দায়িত্বশীল একজন মানুষের-তো এমন সমস্যায় পড়ার কথা নয়।’ এবং এ বিষয়ে তিনি কিছু করতে পারবেন না বলেও নিজের অপারগতা প্রকাশ করবেন এবং এ সময়েও তাঁর মুখে থাকবে মিষ্টি হাসি, অভিজাত গোঁফের আড়ালে।

আমি জানি না আমার বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ জমা হয়েছে, লিখিত না-কি মৌখিক, কিছুই না। আমার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়নি, আমি সরকারি সম্পত্তির কোনো অনিষ্ট করিনি, দুর্নীতির কোনো অভিযোগ আমার নামে নেই। সভাপতি-সম্পাদক দুজন মিলে বিষয়টা আমাকে জানিয়েছেন। জানাবার সময় তাদের উভয়ের মুখই ছিল কালো এবং আমার প্রতি সহানুভূতিতে গদগদ। তারা আমাকে জানিয়েছেন, বাসাটা আমার ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া উচিত এবং এ বিষয়ে কোনো তদবির করাও আমার জন্য শুভ হবে না, কেননা এতে পরে আবার একটা সরকারি আবাস বরাদ্দ পেতে আমার অসুবিধা হবে। আমার এই ধরনের প্রস্থানে তারা উভয়েই ব্যথিত বলেও আমাকে জানিয়েছেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে আমার অপরাধ বিষয়ে তাদের নিকট জানতে চেয়েছি, ঘর ছেড়ে দেওয়ার নোটিশে যেটা উল্লেখ করা হয়নি। তারা দুজনের কেউই এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। একজন মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন, অপরজন উপরের দিকে তাকিয়ে কেবল বলেছেন, ‘যা হবার হয়ে গেছে, একটা সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের আর আলাপ করা উচিত হবে না। আপনি যত দ্রুত শিফট করবেন, ততই মঙ্গল।’ এই কথা বলে তাদের কেউই আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেননি। দ্রুত পায়ে ফিল্টের রাস্তা ধরেছেন।

সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে আমি আধিকারিক মহোদয়কে দেখতে পাই না। আমি একটু দাঁড়াই; সাজিয়ে রাখা অসংখ্য মদের টেবিলটার দিকে পেছন দিয়ে। তিনি ওই টেবিলটার উপর কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিলেন, হয়তো পছন্দের বোতলটা খুঁজছিলেন, যদিও কেতাদুরস্ত চাপরাশি তাঁর পাশেই আছেন, তবু, হয়তো অন্য কোনো কারণে কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ কোনো অতিথিকে নিজ হাতে একটি পেগ বানিয়ে পরিবেশন করতে চাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন হাফপ্যান্ট পরা। এমন ধোপদুরস্ত পার্টিতে তিনি হাফপ্যান্ট পরে আছেন কেন বুঝতে পারিনি। তিনি পেছন ফিরলেন, আমাকে দেখলেন। আমিও দেখলাম এবং দেখলাম, আরও দু-তিনজন তাঁর দিকে এগিয়ে আসলেন। আমি কিছুটা প্রস্তুত হয়ে নিলাম। কিভাবে কথাটা শুরু করা যায় ভেবে নিলাম দু-দণ্ড। আরও ভাবলাম, এই পরিস্থিতিতে কথাটা তাঁকে বলা সঙ্গত হবে কি না। এগিয়ে আসা অতিথিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে, চকিতে তিনি আমার দিকে তাকালেন। খুশি হলেন, ‘হ্যালো, ইয়ং ম্যান’ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। আমি আরও এগিয়ে গেলাম, তার মুখের ওপর দৃষ্টি ফেললাম, কতটা পান করেছেন, বুঝে নিতে চেষ্টা করলাম এবং ব্যর্থ হলাম। সুখী মানুষের চেহারায় এই ফাঁকিটা লুক্কায়িত থাকে, মুখ দেখে মনের অবস্থা বোঝা যায় না। তবু আমি মনে-মনে আমার সমস্যাটা একবার আওড়ে নিলাম, মুখে উচ্চারণ করলাম না। তিনি হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধ স্পর্শ করলেন, আমি এগিয়ে গেলাম। অসংখ্য ভরা বোতলের ছিপিতে চোখ বোলালাম। আমার পরিচিত মদের দোকানগুলো; কিংবা ক্লাব, যেসব জায়গায় আমি যাই বা গিয়েছি, সেগুলোর কোনেটাতেই এই পানীয়গুলি প্রদর্শিত হয় না। সম্ভবত এগুলো অতি উচ্চশ্রেণির পানীয়বিশেষ, এখানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মতোই। তিনি তাঁর নিম্নমুখী তর্জনীটা সাজানো বোতলগুলোর ওপর একবার ঘুরিয়ে নিলেন, কয়েকটি নাম বললেন, বোতলগুলো অচেনা হলেও তিনি যে নামগুলো বললেন, সেগুলো আমার পরিচিত। বেয়ারাকে এগিয়ে আসার জন্য হাত-ইশারা করলেন। আমাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোনটা?’ আমি আঙুল দিয়ে নির্দেশ করলাম। মূলত কোনোটাই নির্দেশ করলাম না, বেয়ারা কিছু একটা বুঝে নিলেন, চটজলদি একটা বোতল থেকে খানিকটা ঢেলে মোজাপরা হাতে গ্লাসটা আমাকে তুলে দিলেন। আমি নিলাম, এবং আবারও মনে-মনে বললাম, ‘স্যার, আমি একটা নিদারুণ সমস্যায় পড়ে আপনার দ্বারস্থ হয়েছি। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা সরলো না।

মদের গ্লাসে চুমুক দেব কি না ভাবলাম, চুমুক দিলাম না, যদিও কেউ সেটা খেয়াল করলো না। আমি অধিকারিকের বাহুপাশে আবদ্ধ থাকলাম, তার সাথে পা মিলিয়ে বৈঠকখানার মাঝের দিকে এগিয়ে চললাম। সেখানে, পুরো বৈঠকখানা আলো করে বক্ষ এবং দেহে সুউচ্চ, তিনজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের জমকালো পোশাক থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে আলো। আমার স্ত্রীর কথা মনে পড়লো, মাত্র ছ-মাস আগে বরাদ্দ পাওয়া কর্পোরেশনের ঘরটি আমাদের ছেড়ে দিতে হবে, ভাবিমহল থেকে খবরটি তিনি আমার আগেই জেনে গেছেন। আমার সন্তানের কথা মনে পড়লো, জ¦র। কয়েকদিন হলো, স্কুলে যেতে পারছে না। তার ওপর এই খবর, আমার স্ত্রীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। বেরোনোর সময় আমি তাঁকে পীড়িত সন্তানের শিয়রে বসে থাকা অবস্থায় দেখে এসেছি, ‘আমি যাচ্ছি’ বলে বেরিয়ে এসেছি, তিনি উত্তর করেননি। এমন অবস্থায় সমস্যার কোনো সমাধান ছাড়াই মুখে মদের গন্ধ নিয়ে বাসায় প্রবেশ করা সুখকর হবে না বলেই মনে হলো।

মদের গ্লাস সাবধানী হাতে আঁকড়ে রেখে আধিকারিকের বাহুপাশে অবদ্ধ দশায় হাঁটতে থাকলাম। সুসজ্জিত তিনজন নারীর শরীরে পেচানো অলংকার থেকে আলো ঝরছে, ভীষণ আলো দেখলাম আমি। দামি মদের সুঘ্রাণ ছাপিয়ে তাঁদের শরীর থেকে বেরুনো গন্ধ আমার স্নায়ুকে আলোড়িত করল। আমরা তাদের সামনে চলে আসলাম। টের পেলাম, আমার আধিকারিক আমার শরীরে ভর দিয়ে হাঁটছেন, মনে হলো তিনি টলছেন। নারীদের সামনে আসলাম, তাঁরা নড়ে-চড়ে দাঁড়ালেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আধিকারিক। নারীরা আমার পরিচয় জেনে খুশি হলেন, তারা কথা বললেন, হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানালেন, তাদের মুখ দিয়ে কথা বেরুনোর পর আমি বুঝতে পারলাম, তারা কেউ নারী নন, আমি বুঝতে পারলাম, তারা কেউ পুরুষও নন।

পার্টি আরও জমে উঠল। একদল শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতে থাকল, একদল বেছে নিল দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি বিষয়ক আলোচনা, তারা মতপ্রকাশ করল, এভাবে আর বেশিদিন কিছুতেই চলবে না। তাদের আলাপে স্পষ্ট হলো, সব বন্ধ হয়ে যাক! এভাবে আর না চলুক, সেটাই তারা চাইছেন। একজন বলছিলেন, দ্রুতই তিনি সব বন্ধ করে দিয়ে টরোন্টোতে চলে যাবেন, অব্যাহতভাবে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়া, পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনগুলোর বাড়াবাড়ি রকমের উৎপাত বন্ধে সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে বিষোদগার করলেন। আমি নিজেকে শক্ত করলাম, ওদের সামনে, যারা নারীও নন আবার নন পুরুষও, আমি বললাম, স্যার! আধিকারিক আমাকে ছেড়ে দিলেন, চেনা ভঙ্গিতে বললেন, ‘শোনো ইয়াংম্যান, নিজের মেধাকে আর অপচয় কোরো না। দেশকে দেবার মতো অনেক কিছুই রয়েছে তোমার’। আমি একদণ্ড ভাবলাম, খুঁজে পেলাম না, দেশকে দেবার মতো কী আছে আমার! তিনি সুগন্ধি ছড়ানো ওই না-পুরুষ না-নারীদের সঙ্গে পুনরায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, তারা পুনরায় আমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় সন্তোষ জ্ঞাপন করলেন। আধিকারিক তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, এরা কেউই তোমার রাস্তায় দেখা হতভাগ্য হিজড়া নন। তিনি তাদের নাম বললেন, সাহিদা, মুক্তা এবং আসমা। এরা সবাই উচ্চ শিক্ষিত, হিজড়াদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করছেন, তিনজন মিলে একটা এনজিও চালাচ্ছেন, এনজিওটির নাম বললেন সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমা। এনজিওটি একটি বড়ো প্রতিষ্ঠান, আমি অবগত হলাম এবং জেনে খুশি হলাম। আধিকারিক সংক্ষেপে জানালেন, জেনেভায় লৈঙ্গিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনটা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে আমাদের দেশের না-নারী না-পুরুষদের অবস্থা কী? কেমন আছে এবং এদের উন্নতিকল্পে আমরা কী করেছি, কী করা যায়; সে বিষয়ক একটি প্রতিবেদন এবং একইসঙ্গে অধিকারিকের দেওয়া বিদায়ী পার্টিতে যোগ দিতে সাহিদা মুক্তা এবং আসমা এসেছেন। সব শুনে আমি আবারও খুশি হলাম। মদের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার জন্য সাহিদা অথবা মুক্তা কিংবা আসমা আমাকে ইশারা করলেন। আমি গ্লাসটি তুলে ধরলাম। সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমা তাঁর গ্লাসটি তুলে আমার গ্লাসে টোকা লাগিয়ে চুমুক দিলেন, আমিও চুমুক দিলাম।

আধিকারিক সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমার কোমরে হাত রাখলেন, নাচের ভঙ্গি করলেন এবং তারা নাচতে থাকলেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের কয়েকজন এগিয়ে এলেন এবং নাচে যোগ দিলেন। আমি একটু দূরত্ব তৈরি করে দাঁড়িয়ে তাদের নাচ দেখতে থাকলাম। সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমার চোখে চোখ পড়ল আমার। হাতের গ্লাস শেষ করে উঁচিয়ে ধরলাম। নাচ ভালো হচ্ছেসূচক ইশারা করলাম। সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমা চোখের ইশারায় আমাকে নাচবার জন্য আহ্বান করলেন। তাঁর আর আমার মাঝখানে মোটা বপুর একজন এসে প্রবেশ করলেন এবং নাচতে থাকলেন। আমাদের দৃষ্টি বাধাপ্রাপ্ত হলো, ফলস্বরূপ অজানা কলায় অংশগ্রহণের হাত থেকে আমি বেঁচে গেলাম। বেয়ারা আমার হাতের গ্লাস পূর্ণ করে দিয়ে গেলেন।

একজন মাঝবয়েসি উচ্চবংশীয় নারী এবার সিঁড়ি বেয়ে বৈঠকখানায় নেমে এলেন। তাঁর দিকে অসংখ্য উচ্ছ্বাসভরা প্রশংসা ছুটে গেল, তিনি সপ্রতিভ, মিষ্টি হেসে উচ্ছ্বাস ও প্রশংসার জবাব দিলেন। আমি তাঁকে চিনতে পারলাম, আমার অধিকারিকের স্ত্রী। অফিসে দেখেছি, দু-একবার। তিনি সোজা ঢুকে গেলেন পার্টির অভ্যন্তরে, মদের গ্লাস বা আপ্যায়ন সামগ্রীর কিছুতেই হাত ছোঁয়ালেন না। আধিকারিকের মুখের দিকে দৃষ্টি ফেলে বললেন, ওপরে চলো! তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আধিকারিক তাঁর টলায়মান পায়ের উপর সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। সকলের উদ্দেশে হাত নেড়ে বিদায় জানালেন, ধীর পায়ে স্ত্রীর পদানুসরণ করে উঠে গেলেন, ওপরে।

কতক্ষণ হয় আমি এখানে এসেছি, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। জমে ওঠা পার্টিতে এবার বিদায়ের সুর। মুক্তা-সাহিদা-আসমাদের মাঝেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাদের একজন, না-পুরুষ না-নারীর স্বরে আমাকে বললেন, চলুন, বেরিয়ে পড়ি। আমার বাস্তু-সমস্যার সমাধান হয়নি, হবেও না; তবু আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা হবে, হয়তো আধিকারিক আবার নামবেন, ওপর থেকে, আমাকে বলবেন, ‘তুমি যে কী একটা বলতে চাচ্ছিলে’। কয়েকদণ্ড দাঁড়িয়ে থেকে আমি বুঝতে পারলাম, এসব কিছু ঘটবে না। স্ত্রী-সন্তানের মুখ ভেসে উঠল আমার চোখে। ভুলে যাওয়ার জন্য হাতের গ্লাসের অবশিষ্ট পানীয়টুকু গলায় ঢেলে দিলাম, একবারে, অসতর্ক এবং অন্যমনষ্ক থাকার ফলে গাল ভরে উপচে পড়লো খানিকটা, বেয়ে গেল গণ্ডদেশ। কেউ হয়তো খেয়াল করলো না অথবা করলো, ভাবলো, এমন অভব্য লোককে কেন আধিকারিক মহোদয় পার্টিতে ডাকেন! আসবার সময় যতটা আত্মবিশ^াসহীন মনে হচ্ছিল নিজেকে এখন আর ততটা মনে হচ্ছে না। মদ, নাকি না-পুরুষ না-নারীদের সঙ্গ আমাকে আত্মবিশ^াসী করে তুলল বুঝতে পারলাম না। সাহিদা-মুক্তা-আসমাদের পেছন-পেছন বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে গেলাম। আমাদের বিদায় জানানোর জন্য সম্ভ্রান্তদের কেউ এগিয়ে এলেন না।

সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি হচ্ছে, দেখে মনে হলো, একটানা; যাকে মুষলধারে বলা যেতে পারে। কখন নামল এই বৃষ্টি? আমি যখন দৌড়চ্ছিলাম তখন কি মেঘ ছিল? হয়তো ছিল। আকাশের দিকে তাকাবার ফুরসত হয়নি। হয়তো ভেতরে প্রবেশের পর-পরই বৃষ্টি নেমেছে, ভেতরের কেউ নিশ্চয় টের পায়নি। অট্টালিকাটি এমন, সম্ভবত বৃষ্টি এমনকি বজ্রপাতের শব্দও ভেতরে প্রবেশ করে না। ওপর থেকে নিচে নামা সিঁড়িগুলোর ওপর আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা দেখে অনুমান করা যায়, সহসা থামবে না। সিঁড়ির গোড়া দিয়ে স্রোত বয়ে যাচ্ছে, ডান দিকে, যেদিকে নদী, নদীটা অর্ধমৃত, বৃষ্টিতে কিছুটা প্রাণ পায়। সাহিদা-মুক্তা-আসমাদের কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রাখে, একটুও চমকে উঠি না আমি, উত্তেজনা-অস্বস্তি কিছুই বোধ করি না, বরং অসময়ে কাঁধে হাত রাখা একজন বন্ধুর উপস্থিতি অনুভব করি। স্বরটা আশ্চর্য রকম মোলায়েম মনে হয়, না-পুরুষ না-নারী সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমা আমাকে বলে, চলুন দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কি, আমরা বরং বৃষ্টিতে ভিজি, ভিজে এগোতে থাকি। ভীষণ উচ্ছ্বাসে আমার দুপাশ দিয়ে দুজন নেমে যায়। সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমার হাত এবার আমার কাঁধ থেকে নেমে  সামনে আসে। হাত ধরে এক ঝটকায় আমাকে টেনে নামিয়ে আনে। ওপরে তাকাই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই বৃষ্টির একাধিক ফোঁটা আমার উন্মিলিত চোখের মণিকে আঘাত করে। চোখ নামাই, শার্টের হাতায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়া চোখটা মুছে নিই।

আমরা হাঁটতে থাকি। রাস্তাটা আশ্চর্য রকম ফাঁকা, কিছুক্ষণ পূর্বেও এই রাস্তায় পা-ফেলবার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। রাত কত হলো বুঝতে পারি না। সাহিদা-আসমা-মুক্তা দারুণ আনন্দে লাফিয়ে-নেচে পথ অতিক্রম করে। আমার দিকে টিপ্পনী ছুড়ে দেয়, আমাকে ঘিরে গান গায়, তাদের মতো; হাত নাচিয়ে কোমর দুলিয়ে কীসব বলতে থাকে। তাদের মুখের গাঢ় ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যে ধুঁয়ে গেছে। সাথে চলে গেছে সম্ভ্রান্ত-অতিসংযত আচরণ, যা এতক্ষণ পার্টিতে বজায় ছিল। একজন আমার হাত জাপটে ধরে-আবার ছেড়ে দেয়। বলে, ‘বলুন-তো, বৃষ্টির সুবিধা কী?’ ওরা আমাকে ঘিরে-সম্ভ্রমশীল দূরত্বে দাঁড়িয়ে যায়, দাঁড়িয়ে যাই আমিও। হাঁটুতে লাগা চোট এতক্ষণে অনুভব করতে পারি, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে জামা-প্যান্ট-পরিধেয় সব, এমনকি আমি নিজেও। একটু ভাবি, ভাবার চেষ্টা করি, বৃষ্টিতে মাটি উর্বরা হয়, মরা নদী প্রাণ পায়, ঘটে চারা-শস্যের বৃদ্ধি। অলস হৃদয় আন্দোলিত হয়, বুভুক্ষু-ক্ষুধার্তের বিরক্তি বাড়ে; কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে যাই। ওদের একজন বলে ওঠে, ‘কি! বলতে পারছেন না, তাইতো? আমি বলছি শুনুন, ‘এখন আমরা মূত্রত্যাগ করব, যেভাবে যে পোশাকে এখন দাঁড়িয়ে আছি, সেভাবেই। কেউ এটা দেখবে না, টের পাবে না। এমনকি আমাদের কোনো আড়াল খুঁজবার প্রয়োজন হবে না।’ বলেই চোখ বন্ধ করে মুখটা ওপরের দিকে তোলে, প্রসারিত করে দুই হাত। আমি তাঁর অভিব্যক্তি দেখে টের পাই, সাহিদা অথবা মুক্তা অথবা আসমা সেটাই করছে, যা এইমাত্র আমাকে বললো। আমি অপর দুটো মুখের দিকে তাকাই, একই অভিব্যক্তি, প্রসারিত দুই হাত, চোখ বন্ধ, মুখে হাসি। ওরা আনন্দিত।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares