আষাঢ়ের এক সকালে : মাসউদ আহমাদ

ভোরবেলায় ঘুম ভাঙার পর, বাবু সেজে হাঁটতে বেরুনো প্রতিদিনের অভ্যেস তবিবুর রহমানের। শরীর খারাপ বা বিশেষ কোনো ব্যাপার না ঘটলে এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। ঘর থেকে বেরোনোর সময় তিনি হয়তো খেয়াল করেন, স্ত্রী শরিফা রহমান ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরছে। অনেক সময় এসব খেয়ালও করেন না, নিজের মতো বেরিয়ে পড়েন।
ঘর থেকে বেরিয়ে রমনা পার্ক কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। সেখানে নিয়মিত হাঁটতে যান তবিবুর রহমান। আজ বাড়ির গলি ছেড়ে সদর রাস্তায় উঠতেই তিনি চমকে গেলেন। রাস্তার ওপাশে বেশ ঘন গাছপালা, বাংলো বাড়ির মতো বুনো পরিবেশ, যদিও ভেতরে কোনো বাড়ি নেই। কোনো পয়সাওয়ালা জায়গাটা কিনে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু ভেতর থেকে পাখির কলকাকলি ভেসে আসছে। পাখির কিচিরমিচিরে তাঁর মনটা প্রশান্ত হয়ে উঠলো। একটা দুটো নয়, অজস্র পাখি এই সাতসকালে আনন্দ ও স্ফূর্তিতে নিজের মতো ডাকছে, কথা বলছে।
শেষরাতে একবার তিনি পাখির ডাক শুনেছেন। ভেবেছেন, শহুরে পরিবেশে পাখি আসবে কোত্থেকে? ভেবে পাশ ফিরে শুয়েছেন। এখন তিনি হাঁটতে হাঁটতে মনে করার চেষ্টা করলেন, পাখির ডাকে কবে ঘুম ভাঙত নগরবাসীর? এমন স্মৃতি মনে করাই দুষ্কর।
তবিবুর রহমানের মনেই পড়ে না, শেষ কবে পাখির ডাকে ঘুম ভেঙেছে। যানবাহন আর নির্মাণ-সামগ্রীর বিকট শব্দে বরং ঘুমানোই ছিল মুশকিল। করোনাভাইরাস নামক এক অসুখের কারণে চারপাশের পরিবেশ পাল্টে গেছে। নগরবাসী নতুন এক শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে ‘লকডাউন’। এ পরিস্থিতিতে সবকিছুই থমকে আছে। শহর থেকে গ্রামজুড়ে এক নিঃসীম নিস্তব্ধতা। কৃত্রিম কোলাহল নেই। সে কারণেই ভোর হতেই কানে সুখের মতো বেজে উঠেছে পাখির কলকাকলি। এমনটা বেশ ক’দিন ধরেই হয়তো চলছে, তবিবুর রহমান খেয়াল করেননি।
ভোরবেলায় বের হলে সাধারণত গাড়ির ইঞ্জিন ও হর্ন আর নির্মাণ-কাজের শব্দই বেশি শুনতে পাওয়া যায়। লকডাউন শুরু হওয়ার পর পাখির ডাক শোনা গেল। শহরে থেকেও যে পাখির এমন মিষ্টি মধুর গান শোনা যায়, তা এই শহরের মানুষের সঙ্গে তবিবুর রহমানও ভুলেই গিয়েছিলেন। এখন ঘরের ভেতরে শুয়ে-বসে থাকলেও পাখির ডাক শোনা যায়। আগে গাছের তলায় বসেও সেটি সম্ভব ছিল না।
আর মিনিট পাঁচেক হাঁটলে রমনা পার্কে পৌঁছে যাবেন তবিবুর রহমান। কিন্তু আচমকা তিনি টের পেলেন, বাঁ পায়ের গোড়ালিতে প্রচণ্ড ব্যথা। কোনো আঘাতজনিত ব্যথা নয়, পা মচকে গেলে যেমন ব্যথা হয়, তেমন। সমস্ত শরীর ও মনজুড়ে ভোঁতা একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো। তিনি বুঝতে পারলেন, কোনোভাবে বাসায় ফেরা সম্ভব হলেও এই পা নিয়ে আজ আর তিনি হাঁটতে যেতে পারবেন না।
পথে দাঁড়িয়ে ফাঁকা রাস্তায় তাকিয়ে থাকেন তবিবুর রহমান। এক অদেখা ঢাকা শহর দেখতে থাকেন। পথে মানুষ নেই। গাড়িও প্রায় নেই। চেনা ঢাকা শহরকেই অন্যরকম লাগছে।
রিকশায় চেপে বাসায় ফিরলেন তবিবুর রহমান। বাবা ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়েছেন। টুপি মাথায় দিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছেন। তিনি না দেখার ভান করে ঘরে ঢুকে গেলেন।
কাজের বুয়াটা ততক্ষণে এসে পড়েছে। তাকে বুঝিয়ে বললেন, পায়ে শেক দিতে হবে, একটু ব্যবস্থা করতে। বুয়া গরম পানি আর কাপড় দিয়ে গেল। তবিবুর রহমান গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে পায়ে চেপে ধরার ফাঁকে বার কয়েক হাই তুললেন।
এ সময় ঘুমানোর শখ বা অভ্যেস কোনোটাই নেই তবিবুর রহমানের। মচকে যাওয়া পা নিয়ে স্ত্রীর পাশে শুতে গেলে তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে; অগত্যা তিনি বসার ঘরের সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিলেন। সোফায় শুয়ে তাঁর চোখ গেল দেয়ালে। দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝুলছে। ক্যালেন্ডারে শেখ মুজিবের ছবি। সরাসরি ছবি নয়, আঁকা ছবি। শিল্পীর ছবি আঁকার হাত বেশ ভালো … এসব ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখ আঠার মতো লেগে এলো।
একসময় তবিবুর রহমান ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঘুমের মধ্যে তবিবুর রহমান কথা বলে উঠলেন। তাঁর বাবা শফিকুর রহমান একবার বসার ঘরে এসে অবাক হলেন। ভাবলেন, ছেলে তো এই সময় ঘুমায় না। ঘটনা কী?
ঘটনা কী, তা জানার জন্য তিনি ব্যাকুল হলেও ছেলেকে ডাকলেন না। নীরবে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
তবিবুর রহমানের বাবা শফিকুর রহমান রোজা রেখেছেন। রমজান মাসের রোজা নয়, ধর্মীয় বিশেষ কোনো দিবসেরও রোজা নয়। তবে একটা ব্যাপার, এই দিনটিতে তিনি চুপ হয়ে যান। কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলেন না। বকা দেন না। কোনো অঘটন ঘটে গেলেও এতটুকু রাগ-ঝাল করেন না।
…তবিবুর রহমান ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের ভেতরে দেখতে পেলেন, বাবা রোজা রেখে নীরব হয়ে আছেন। নিঃশব্দে তিনি বাড়িময় পায়চারি করছেন। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। ছোটবেলা থেকেই তবিবুর বাবাকে এভাবে দেখে আসছেন।
ঘুমের ঘোরেই পাশ ফিরে শুলেন তবিবুর রহমান। একবার তাঁর নাক ডাকার শব্দ হলো। তিনি নিজেই শুনতে পেলেন, নাক ডাকছে।
ভোরের আভাস ফুরিয়ে গেছে। পরিষ্কার সকাল হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের কেউ কেউ ঘুমের থেকে জেগে উঠে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে মগ্ন হতে শুরু করেছে।
বসার ঘরের সোফায় তবিবুর রহমানের ঘুম আরও গাঢ় হয়ে নেমে এলো।
ঘুমের মধ্যে তবিবুর রহমান দেখতে পেলেন, দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের মানুষটি তাঁর সামনে নেমে এসেছেন। একটা পুরোনো আমলের কাঠের চেয়ারে আরাম করে বসে আছেন। তাঁর মুখে মৃদু হাসি। তিনি যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছেন; এমন ভঙ্গিতে সাদা পাজামা ও পাঞ্জাবি পরে পুরো পরিবেশটা আলো করে বসে আছেন। তাঁর সামনে দাঁড়ানোর জন্যও এক ধরনের প্রস্তুতির দরকার হয়। তবিবুর সেটা পাননি। তাই, ঘুমের ভেতরেই থতমত খেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তবিবুর রহমান ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন, এত বড় মানুষ তাঁর সামনে বসে আছেন? এ যে স্বপ্নের মতো। তিনি অস্থির হয়ে উঠে বসলেন। একসময় দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন, তাঁর ঘুম ভাঙলো না। তিনি সোফায় ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলেন, যেভাবে একজন ঘুমন্ত মানুষ শুয়ে থাকে। কেবল তাঁর চোখের সামনে চলন্ত ছবির বাকসো খুলে যেতে লাগলো।
একসময় তবিবুর রহমান বুঝতে পারলেন, তিনি একটি কবরস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশে নীরব ও নিস্তব্ধ। চারপাশে কোনো মানুষ নেই। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। দূরে নীল আকাশ ছুঁয়ে কিছু পাখি উড়ে যাচ্ছে। কবরস্থান যেমন নির্জন ও নিরিবিলি হয়, এখানেও তেমন। কিন্তু অন্য কবরস্থানের মতো এখানে অপরিচ্ছন্ন ব্যাপার নেই। কবরের চতুর্পাশ ঝকঝকে। কোথাও কোনো আবর্জনা ও ময়লা নেই। চারপাশে কৃত্রিম আলো। সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু আলোগুলো কেউ নিভিয়ে দেয়নি। বোঝা যায়, এই কবরটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানুষ নিয়োজিত আছে।
কবরের একপাশে মৃত ব্যক্তির নাম ও জন্ম-মৃত্যুর তারিখ লেখা রয়েছে।
তবিবুর রহমান সেই লেখাটি পড়তে চোখ নামিয়ে আনলেন। এমন সময় একটা গম্ভীর ও দরাজ গলা শুনে তাঁর পিলে চমকে গেল; কে তুই? এখানে কী চাস?
তবিবুর রহমান ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকালেন। কাউকে দেখতে পেলেন না।
এত সকালে তবিবুর কীভাবে এখানে এলেন, বুঝতে পারলেন না।
কিছুক্ষণ পর, দেয়ালে নির্মিত বিশেষ নির্দেশনা থেকে তবিবুর রহমান বুঝতে পারলেন, এটা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। গ্রাম হলেও এলাকাটা বেশ সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন। আর এটা হচ্ছে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার। তাঁর অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল, একবার এখানে এসে ঘুরে যাবেন। আজ তিনি এখানে এসেছেন, কিন্তু কোথাও একটা রহস্যময় ব্যাপার ঘটে চলেছে। তাঁর কেমন ভয় ভয়, কিংবা হয়তো ভয় নয়, কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা মনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
সকালবেলায় আমি মাজারে কেন?
প্রশ্নবাণে নিজেকে জর্জরিত করতে লাগলেন তবিবুর রহমান। তাঁর শ্বাস দ্রুত হতে লাগলো। গলা শুকিয়ে এলো। তিনি আশপাশে কাউকে দেখতে পেলেন না।
কবরস্থানের অদূরে একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে পাইপ টানছেন একটা লোক। লোকটাকে দেখেই চিনতে পারলেন তবিবুর রহমান। ইনি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই বঙ্গবন্ধু। এটি তাঁরই মাজার। কিন্তু তিনি তো মারা গেছেন সেই কবে। তাহলে?
তবিবুর রহমানের ভয় ভয় করতে লাগলো। তিনি ঘুমের মধ্যেই সোফা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গেলেন। কিন্তু আশ্চর্য, তাঁর ঘুম ভাঙলো না।
কাছে আয়; গম্ভীর গলায় বললেন বঙ্গবন্ধু।
তবিবুর রহমান চমকে পেছন ফিরে তাকালেন। দেখলেন, শেখ মুজিব আলিশান ভঙ্গিতে পাইপ টানছেন। তাঁর হাতে একটা বই।
তবিবুর রহমান কম্পিত ও ধীর পায়ে বঙ্গবন্ধুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। প্রথমে দৃশ্যটা তাঁর কাছে বিভ্রম বলে মনে হলো। এ হতেই পারে না। আমি সামান্য মানুষ, আমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কথা বলবেন, তাও এই এখানে…
ঘাবড়ে গিয়েছিস তো?
বঙ্গবন্ধুর হাতে ধরা বইটির নাম পড়তে চেষ্টা করলেন তবিবুর রহমান। অর্ধেক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তাতেই বুঝে গেলেন তিনি। জসীমউদদীনের কবিতার বই।
কাঁপা গলায় তবিবুর রহমান বললেন, বঙ্গবন্ধু, আপনি কেমন আছেন?
আমি ভালো আছি। দেখছিস না, বই পড়ছি। পাইপ টানছি। এগুলো আমার প্রিয় কাজ। সকালবেলায় এই প্রিয় কাজ করছি, তার মানে আমি ভালো আছি।
কিন্তু আপনি তো সেই কবেই মারা গেছেন। তবু কীভাবে এই টুঙ্গিপাড়ায় এভাবে চেয়ারে বসে কথা বলছেন? পাইপ টানছেন?
বঙ্গবন্ধু সশব্দে হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন, এই দ্যাখ।
সামনে দাঁড়ানো মানুষকে দেখানোর মতো করে বইটি প্রদর্শন করলেন বঙ্গবন্ধু। জিজ্ঞেস করলেন, এটা কার বই?
তবিবুর রহমান কাঁপা গলায় বললেন, আমাদের পল্লীকবি জসীমউদদীনের।
জসীমউদদীন আমার প্রিয়তম বন্ধু। কিন্তু বল তো, তিনি কি জীবিত, না মৃত?
এবার সহজ হয়ে এলেন তবিবুর রহমান। বললেন, তিনি তো সেই কবেই গত হয়েছেন।
কিন্তু তাঁর বইটি তো গত হয়নি। কাজের মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে। আছেন কিনা?
কথার এমন দমক; যেন প্রায় ধমক দিয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধু।
তবিবুর মাথা দুলিয়ে সায় দিলেন, জি। আপনি ঠিকই বলেছেন।
কথা বলতে বলতে একটু বিরতি পড়ছিল। যে কারণে পাইপের আগুন হয়তো নিভে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেটাকে আবার জ্বালিয়ে নিলেন।
কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এলো।
হঠাৎ মনে পড়েছে; এমন ভঙ্গিতে তবিবুর রহমান বললেন, আমার বাবা শফিকুর রহমান সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের ছেলেপুলেকে দেখলে একদম সহ্য করতে পারেন না। পারলে ঠ্যাঙ্গাবেন, এমনই মনোভাব। কিন্তু তিনি ১৫ আগস্ট এলে রোজা রাখেন। আর নীরব হয়ে যান। সারাদিন কারও সঙ্গে কথা বলেন না। কোনো কারণেই কাউকে বকাঝকা বা গালমন্দও করেন না। কেবল সন্ধ্যার পর, তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের সামনে বসিয়ে চকলেট খেতে দেন আর আপনার ছোটবেলার গল্প বলেন।
যেন তিনি জানতেন, বা শফিকুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু চেনেন, এমন আবহ তাঁর মুখে ফুটে উঠলো। মৃদু হাসলেন। বঙ্গবন্ধু।
তবিবুর রহমান বললেন, আমি আপনার জীবনের গল্প ও সংগ্রাম সম্পর্কে জেনেছি। কিন্তু একটা কথা বাবার কাছেও জানতে পারিনি। আপনার কাছে জানতে চাই…
কী কথা? দরাজ গলায় বঙ্গবন্ধুর কথাগুলো গমগম করে উঠলো।
বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেন, সমাজ ও দেশ পরিচালনা করেন, সবাই কেবল আমি আমি করেন। সবকিছুই আমার। আমি এটার মালিক ও অধিকর্তা। আমি এটা করেছি। এটা আমার…
পাইপ টানায় বিরতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু পা নাচাতে লাগলেন। তাঁর চোখ ছোট হয়ে এলো। কপাল কুঞ্চিত হলো।
তবিবুর রহমান বুঝতে পারলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর বাকি কথাগুলো শুনতে চাচ্ছেন।
তবিবুর রহমান বললেন, আপনি সবসময় বলেছেন, আমরা। সমস্ত বাঙালিকে বলেছেন আমার লোক। কিন্তু আপনার পরের রাজনৈতিক নেতারা বলেন, আমি, আমার ইত্যাদি।
ফোস করে একটা শব্দ হলো।
বঙ্গববন্ধু কি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন? পাইপে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, তোর নাম কী?
জি, তবিবুর রহমান।
দেখ তবিুবর, আমি রাজনীতি করেছি পূর্ববাংলার সমস্ত মানুষের জন্য। যারা বহু বছর ধরে কখনও ইংরেজ শাসক এবং কখনও পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর দ্বারা শোষিত হয়ে এসেছে। এসব থেকে বাঙালির মুক্তি জরুরি ছিল। আমি তো নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজনীতি করিনি। রাজনীতি করতে গিয়ে জেল খেটেছি, অত্যাচার সহ্য করেছি, সব আমার পূর্ববাংলার মানুষের জন্য। আমার নিজের জন্য কিছু করব, সেটা কখনও মাথায় আসেনি।
এই যে আপনি সারাটা জীবন পূর্ব বাংলার মানুষকে নিয়ে ভেবেছেন, সংগ্রাম করেছেন; কী পেয়েছেন?
কী পেয়েছি, সেটা বড় কথা নয়। আমি বাঙালির মুক্তির জন্য কাজ করতে চেয়েছি। এটাই আমার ধ্যানজ্ঞান ছিল। এর চেয়ে বড় চাওয়া বা স্বপ্ন আর কী হতে পারে?
তবিবুর রহমান হাত কচলাতে লাগলেন। কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এলো।
কোথায় যেন পড়েছিলাম; আপনারই কথাÑ আপনার চরিত্রের সবচেয়ে ভালো দিক: আপনি বাঙালিকে ভালোবাসেন। আপনার চরিত্রের সবচেয়ে খারাপ দিক: আপনি বাঙালিকে ভালোবাসেন।
বঙ্গবন্ধু পাইপ সরিয়ে রেখে হা হা করে হেসে উঠলেন; দেখ তবিবুর, একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।
তবিবুর বললেন, কিন্তু এত প্রাণশক্তি আপনি পান কোথায়? এসব কিছুর উৎস কোথায়?
বঙ্গবন্ধু একটা আঙ্গুল সোজা করে ওপরে তুললেন। আঙ্গুলটা নামালেন না। বললেন, এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং আমার অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।
সমাজের ভালো মানুষরা যে খানিক বোকাও হয়, আপনি কি তা বিশ্বাস করেন?
হতে পারে। বঙ্গবন্ধু বললেন।
তবিবুর রহমানের মাথাটা নুইয়ে এলো খানিকটা। তিনি বঙ্গবন্ধুর আরও কাছে সরে এলেন। বললেন, বঙ্গবন্ধু, আপনাকে আমি একটু ছুঁয়ে দিতে চাই।
বাতাস কাঁপিয়ে বঙ্গবন্ধু কাচ ভাঙার মতো করে হেসে উঠলেন। বললেন, আমি কি হেমিলিয়নের বাঁশিওয়ালা, নাকি জাদুকর? আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে কী হবে?
তবিবুর রহমানের গলাটা কি কেঁপে গেল? তিনি বললেন, এক হাজার বছর পর, বাংলাদেশের মানুষও এর ইতিহাস যদি কেউ লিখতে বসে, সে যদি আপনার সম্বন্ধে কোনো কিছু নাও জানে, দৈবশক্তিতে হলেও প্রথমেই আপনার নামটি সে লিপিবদ্ধ করবে, এটা নিশ্চয় করে বলা যায়।
এসব নিয়ে আমি ভাবিনে, তবিবুর।
এখন তো কোনো বড় নেতা দূরে থাক, ছোটো নেতার বাড়িতেও সহজে যাওয়া যায় না। আপনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও আপনার বাড়ির দরজা সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত করে রাখতেন, সব সময়। এটা কি ভুল ছিল?
ভুল হবে কেন? বাঙালিকে দাবায়ে রাখা যায় না। আর আমি তো মানুষকে ভালোবাসি। মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আমি বঙ্গবন্ধু হয়েছি। পূর্ববাংলার সব মানুষ কেউ আমার বাবা-মা-ভাই ও বোন। আমি কার জন্য বাড়ির দরজায় পুলিশ পাহারা বসাব? আমি সবাইকে ভালোবাসি এবং বিশ্বাস করি।
এই বিশ্বাসই আপনাকে নিঃশেষ করে দিল…
কী বললি?
বঙ্গবন্ধু কি কথাটা শুনতে পাননি? তিনি কি দ্বিতীয়বার কথাটি শুনতে চান?
তবিবুর রহমান বোকার মতো দাঁড়িয়ে আবারও হাত কচলাতে লাগলেন।
তোর বাবাকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস।
জি, আচ্ছা।
অচেনা একটা পাখি ডেকে উঠলো। বঙ্গবন্ধু বললেন, বাহ, ভারি মিষ্টি তো পাখির ডাকটা।
পাকা মেঝেতে ঝনঝন করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হলো। কোথাও কিছু ভেঙে পড়ল কি?
আষাঢ় মাসের সকাল। কিন্তু বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। সকালবেলায় বিদ্যুৎ চলে গেছে।
এমন সময় কেউ এসে তবিবুর রহমানের গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে। বাবা। বাবা।
তবিবুর রহমানের ঘুম পাতলা হয়ে এলো।
ও মা দেখে যাও, বাবা সোফা থেকে পড়ে গিয়ে কীভাবে ঘুমিয়ে আছে…
আরও কিছুক্ষণ পর, ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নও ভেঙে খান খান হয়ে যায়। উঠে বসেন তবিবুর রহমান। আড়মোড়া ভেঙে দুহাতে চিরায়ত ভঙিতে চোখ ডলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেন। করোনাভাইরাসের কথা মনে পড়ে যায়; হাত না ধুয়ে চোখে-নাকে-মুখে নিজের চিরচেনা ও প্রিয় হাত দুটো ছুঁতে না পারার ব্যর্থতায় ঘরের মেঝের ওপর কাঠ হয়ে বসে থাকেন। স্বপ্নের ভেতরে ঘটে যাওয়া মুহূর্ত ও দৃশ্যগুলো তাঁর মন ও মস্তিষ্কে মৌমাছির মতো গুন গুন করতে থাকে। সেই গুঞ্জরণের ভেতর থেকে কিছুতেই তিনি বেরুতে পারেন না।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.