মাস্টারপিস : আশান উজ জামান

দাঁড়িয়ে ছিলাম তিন রাস্তার মোড়ে।

এপাশে, আমাদের বাড়ির দিকটায়, একটা পুকুর ছিল আগে। পানিতে বুক আর কাদায় ধার ভরে শুয়ে থাকত সে। পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রামে ঢোকার রাস্তাটা। বর্ষায় সে হয়ে উঠত পুকুরটারই অংশ। আকারে প্রকারে তাদের আর বিশেষ পার্থক্য করা যেত না। চেনা পা জানা চোখ না হলে রাস্তাকে পুকুর আর পুকুরকে রাস্তা ভেবে ভুল করা স্বাভাবিক। তবে অভিজ্ঞ পায়েই এ অঞ্চলের হাঁসেরা ছুটে আসত রাস্তা ধরে, আর ঠিকঠিক পুকুরপাড়েই গুঁজে দিত করিৎকর্মা ঠোঁট।

জায়গাটা এখন পুরোদস্তুর ডাঙা, তার ওপর শিকড় গেড়ে বসেছে হাতখানেক উঁচু ইটের ভিত। রাস্তাটাও কালো পিচে মোড়ানো। সারাদিনের রোদে তপ্ত সেই পিচের ওপর অনিচ্ছায় পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে দুর্বল একদল হাঁস। এমনভাবে তারা তাকাচ্ছে দেয়ালের ওপাশে, যেন পুকুরটা আজও আছে। হয়তো খাবার জোটেনি পর্যাপ্ত, বা মন ওঠেনি খেয়ে। কিংবা, কে জানে, বাড়ি যেতে এখন মন চাইছে না হয়তো। তবে যা কড়া ওদের মা, একবার কিছু বললে আর না শুনে উপায় নেই। অনেকক্ষণ হলো আমার মাও ডাকছে আমাকে, তবু আমি দাঁড়িয়ে আছি এখানে, এই রাস্তার মোড়ে।

মোড়টার ওপাশে, মানে বিগত পুকুরের বিপরীতে, একটা জঙ্গল ছিল তখন। বর্ষায় তার কাছে ছলাৎ ছলাৎ অভিসারে যেত পুকুরটা। শরতে আবার বিচ্ছেদ। বিরহে তারপর শুকিয়ে যেত পুকুর, আর জঙ্গলের বিক্ষত পাতা আর বিমর্ষ আগাছায় গড়িয়ে বেড়াত মলিন শোক। সেই শোক পায়ে এঁকে নিজেদের জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকত বাঁশঝাঁড়েরা। রাতে রাতে তাদের গায়ে জমে থাকা ঘন আঁধারে আলোর টোকা দিয়ে লুকোচুরি খেলত দুষ্টু জোনাক। রঙচঙা সেই সজীব জঙ্গলের জায়গায় এখন ধূসর দালানÑ স্বর্গের টিকিটঘর।

এমন পবিত্র ঘরের ছায়ায় দাঁড়িয়েও কেন যেন দম বন্ধ লাগছে আমার।

কোনোভাবেই আপুকে একা কোথাও যেতে দেয় না মা। আপুর কলেজ ছুটি হয় বিকেলে, আমার স্কুল দুপুরে। খেয়ে একটু জিরিয়ে তাই আমিই নিয়ে আসি ওকে। তারপর খেলতে যাই। খেলতে খেলতে ঝড় ওঠে মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝে পড়তে বসলেও ওঠে। উঠতেই আমি দৌড়ে চলে যাই ডাক্তারদের আমবাগানে। সঙ্গী সাথিরা হুটোপাটি করে টক আম কাঁচা আম কুড়োতে থাকে। আমি দাঁড়িয়ে থাকি সবচেয়ে লম্বা সবচেয়ে বড় গাছটার নিচে। ওই গাছের কাঁচামিঠা আম আমার প্রিয় খুব। আম তো না, যেন ডাসা পেঁপে যেন পাকা আপেল। মুখে দিয়ে আমি চোখ বুজে স্বাদ নিই ওর। অথচ ওর বোঁটা এত শক্ত, অন্য গাছের গোড়ায় যখন লুটোপুটি, ওর থেকে একটা দুটো পড়ে কি পড়ে না। তাও আবার কার না কার ভাগ্যে জোটে। ফলে ঝড়ে উড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমি বাড়ি ফিরি খালি হাতে প্রায়ই। দেখে মনে হয় মায়া হয় লাবু ভাইয়ার। লাবু ভাই হচ্ছে ডাক্তার কাকার ছেলে। আমাকে বলেছিল বিকেলে সে বাগানে থাকবে, আমি যেন যাই। কাল ফেরার পথে আপুকে দাঁড় করিয়ে রেখে তাই ঢুকে পড়েছিলাম ওদিকটায়। যেতেই একটা স্বর্গ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, গাছে উঠে যত ইচ্ছা আম পেড়ে নিতে। লাফাতে লাফাতে তাই উঠে গেলাম গাছে। জামা খুলে তাতে ডজনখানেক আম নিয়ে যখন আমি নিচে, গা তখন ঘামছে দরদর করে। গাছের ছায়ায় একটু ঠান্ডা হবো ভেবেও ছুটতে হলো, কারণ এই অবস্থায় কেউ দেখলেই আর রক্ষা নেই, খেপাবে আমায়। তাছাড়া আপুর কথা মনে ছিল না এতক্ষণ। রাস্তায় এসে যদিও দেখি আপু নেই কোথাও। ডাকাডাকি করলাম, একটু এদিক ওদিক খুঁজলাম। না পেয়ে বুঝে নিলাম যে আমার দেরি দেখে নিশ্চয়ই চলে গেছে। যায়নি যদিও। আমি বাড়ি ফেরারও প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পর, সন্ধ্যা উতরে গেলে, ফিরেছে আপু। ফিরেছে সারা গায়ে কাদামাটি মেখে, কাঁদতে কাঁদতে। সে কান্না থামেনি রাতেও। সকালে উঠে শুনি বিষ খেয়েছে সে। বাড়িজুড়ে চিকিৎসার তোড়জোড়, নিন্দা বিদ্রƒপের ঝড়। আব্বা আমাকে লাথি মারতে মারতে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমার জন্যই এতবড় ক্ষতিটা হয়ে গেল, রাগ লাগছে নিজের ওপর। আপুর জন্য খারাপও লাগছে। সব মিলিয়ে একটু বিষণ্ন আমি। তাই আমার ভালো লাগছে না কিছু। তাই আমার দম বন্ধ লাগছে।

এমন হলে আমি আকাশ দেখি।

আটপৌরে মেঘ আর সাধারণ মেদ ভরা সাদাসিধে স্থূল আকাশÑ দেখার কিছু নেই। তবু তাকিয়ে আছি। ঘাড় লেগে আসলে, বা চোখ ঝাপসা হয়ে এলে, জিরিয়ে নিচ্ছি একটু, বিশ্রাম দিচ্ছি দৃষ্টিটাকে। তখন আবার মনে পড়ছে সকালের ক্লেদ। আবার মন খারাপ হচ্ছে। আবার আকাশ দেখছি।

এই দেখা-না-দেখার মধ্যেই হঠাৎ দেখি মস্ত একটা শিল্পকর্ম ঝুলে আছে আকাশজুড়ে।

লাল সাপ একটা, না না, অনেকগুলো আগুনলাল সাপ, গা পেঁচিয়ে বসে আছে। পাশেই রাজকীয় বাঘ। হরিণ দেখা যাচ্ছে কয়েকটা, দেখা যাচ্ছে ঘোড়াও। বড় বড় মাংসল পেশি তাদের, যেন এস এম সুলতানের আঁকা। তার ফাঁকফোকরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ছাইরঙা স্পেস। আর পাশঘিরে নীলাকার ফ্রেম। কী যে অদ্ভুত সুন্দর! সাদামেঘের হাতিঘোড়া, কাশবন, মেঘপাহাড়, আগুনলাগা সমুদ্রতট অনেক দেখেছি। তবে এই দৃশ্যের সঙ্গে তাদের তুলনাও চলে না। এমন ছবি বাঁধাই করে রাখতে হয়। ঝুলিয়ে রাখতে হয় ঝগড়ার ইট আর মায়ার সিমেন্টে বাঁধানো সংসারের দেয়ালে। যেন বারবার দেখা যায়, লাখ আর লাশ গোনা এই অসার সময়েও যেন বিস্মিত হওয়া যায়। ভাবতে ভাবতেই দৌড় দিলাম বাড়ির দিকে।

ক্যামেরাটা ছিল ঘরে। খুঁজে নিয়ে উঠোনে আসতেই দেখি, ওমা, ছবিটা আর নেই। সারা আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে ছাই। তা কেন! মোড় থেকে বাড়ি। এটুকু আসতেই আমার বহুক্ষণ লেগে গেল কি? বাড়িভর্তি লোক উঠোনে জড়ো হয়েছে আমার চিৎকারে। কিন্তু ভেসে চলা ছাইয়ের ভেলা ছাড়া আর কিছু তো নেই। বোনের এমন দুর্যোগের দিনে মামুলি ওই মেঘের জন্য এত উতলা হয়েছি, আমি কি পাষাণ? বকছে সবাই। তবু আমি ডুবেই আছি চিত্রকর্মটায়। মনে হচ্ছে ছাইয়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে সে, বিশ্রাম নিচ্ছে, কিছুক্ষণ পরই তাকাবে আবার। তাকালেই ক্লিক করব। আকাশে এমন থ্রিডি কালারড প্রাণীজগৎ বনভূমি দেখে কেউই বিশ^াস করবে না এটা আঁকা ছবি না। ওয়ালে ওয়ালে মিডিয়ায় মিডিয়ায় হইচই পড়ে যাবে। সেই আশায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়েই আছি। ছাইও দেখছি সরে যাচ্ছে একটু একটু করে। আর উঁকি দিচ্ছে আমার এস এম সুলতান। আমার রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আমার চিত্রা হরিণ।

বোনের ঘর থেকে তখনই বেরিয়ে এলো ওই ক্যাডারমতো ছেলেটা। মোড়ল কাকার চ্যালা, লাবু শুয়োরের বডিগার্ড। তা যা হয়েছে হয়েছে, মানী লোকের ছেলে, দু’দশ গ্রামে মানুষজন মানে, তার বিরুদ্ধে মুখ খুলে আমরা যেন আরও বিপদে না পড়ি, সে ব্যাপারে সতর্ক করতে এসেছে সে। তার ভণিতা শুনেই আব্বার রাগ বেড়ে গিয়েছিল। এখন আমার রাগ আরও বাড়ল তার হাতে আমাদের প্রাণকে দেখে। প্রাণ আমার বোনের পোষা, প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে পাখিটাকে সে। তাকে ওই মাস্তানটার হাতে বন্দি দেখে আমার সহ্য হলো না। দৌড়ে সেটা কেড়ে নিতে যাচ্ছি, এমন সময় ওঘর থেকে আহাজারি ভেসে এলো মায়ের। আর আমাকে ছুটতে হলো সেদিকে।

কিন্তু গিয়ে দেখি কিছু নেই, সারাঘর পড়ে আছে খালি। ডানের ঘরেও কেউ নেই, বাঁয়ের ঘরেও কিছু নেই। বাইরেও সেই একই অবস্থা, ফাঁকা সব। আমাদের শিকড় হয়ে উঠোন কামড়ে পড়ে থাকা মা, তাকে ছায়া দিতে গাছ হয়ে যাওয়া বাবা, রঙিন ঘুড়ির মতো উদ্ধত ভাই, বইয়ের ভাঁজে সাজিয়ে রাখা ময়ূর পাখনার মতো বিব্রত বোন, স্বরে সজারুর কাঁটা নিয়ে ফোঁড়ন কাটা প্রতিবেশীÑ কেউ নেই। যেন তারা হারিয়ে গিয়েছে আমার বুকপকেটের ছিদ্র দিয়ে গড়িয়ে পড়া শৈশবের মতো। অথবা ইটের ভিতে ফুরিয়ে যাওয়া ওই পুকুরটার মতো। কিংবা তার মৌসুমি প্রেমিক ভয়ভরা ওই জঙ্গলটার মতো।

জঙ্গলটার কোনায় একটা গোরস্তান ছিল। আর তার থেকে কিছুদূরে একটা শ্মশান। তাদের ভয়েই আমার সবুজ কাঁচা গ্রাম সেসময় শহরে যেত অষ্টপ্রহর। এখন আর যেতে হয় না, শহরই এগিয়ে এসেছে তার কাছে। উন্নয়নের কংক্রিট আর জিডিপির এনামেল পেইন্টে মুড়িয়ে দিয়েছে গা। দেখতে তাকে তাই শহরের মতো লাগে। শহরের মতো লাগা এই গ্রাম আর ওদিকের সত্যিকারের শহরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা সবচে’ টাকাওয়ালা বাড়িটায় আজ উৎসব।

কদিন আগেই এলাকার ক্ষমতা নিয়েছে লাবু মিয়া। তাকে অভিনন্দন জানাতেই এই আয়োজন। বাড়িটার আকাশে জীবন্ত রঙে লেখা ‘বিজয় সংবর্ধনা’। তার ফাঁকফোকরে হলুদ কালো ডোরা কাটা নকশি চামড়া-বাঘের, হরিণের। পাশ ঘিরে সবুজপাতার বেড়, সারাদিনের রোদে পাতাগুলো মলিন, ছাইরঙা। তারওপর কনে দেখা আলো পড়ছে, দূর থেকে দেখলে পুরো ব্যাপারটাকে একটা মনোরম চিত্রকর্মই মনে হয়। তবে ময়ূরের পেখম আর সিংহের কেশরগুলো এমনভাবে দুলছে, বিশ^াসই হয় না যে শিল্পীর কারসাজি ওসব। আয়োজকদের একজনকে জিজ্ঞেস করতেই ভুলটা ভাঙল। সত্যিকারের সিংহ ময়ূর আর বাঘ হরিণকেই নাকি এরা গেঁথে দিয়েছে আকাশে। কী ভয়ংকর! এদের কাছে কি সবই সম্ভব? কবে না জানি এরা মানুষকেও সজ্জার উপকরণ করে ছাড়বে! ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, আকাশের দিকে তাকিয়ে এই সজ্জাকেই হয়তো ছবি ভেবে অমন পাগল হয়েছিলাম ছোটবেলায়। শৈশবের উঠোন থেকে এদিকে তাকালে এসবকে তো আকাশ-কুসুমই লাগে।

আসার পর থেকেই খেয়াল করছি একটা কুকুর ছাড়া সবাই কেমন নিচু বাঁকে তাকাচ্ছে আমার দিকে, দেখছে বাঁকাচোখে। এরা হয়তো নেটে ছড়িয়ে পড়া আমার সহকর্মীর ভিডিওটা দেখেছে। বুঝতেই আমি হাওয়াই মিঠাই-চুপসে গেলাম। মাথা উঁচু করতে পারছি না, মুখের দিকে তাকাতে সাহস হচ্ছে না। লজ্জা ঢাকতে চোখের সামনে ক্যামেরা ধরেছি। ধরতেই দেখি বেশ কর্তৃত্বের ভাব নিয়ে আয়োজনের তদারকি করছে একটা ছেলে। তাকে যেন ঠিক সেই ছেলেটার মতো লাগল, যাকে আমি খুঁজছি এত বছর ধরে। তীক্ষè চোখে খেয়াল করে তারপর নিশ্চিত হলাম এ-ই সেই, যার হুমকিতে আমরা পুলিশের কাছে পর্যন্ত যেতে পারিনি। একেই বলে নিয়তি, নইলে এভাবে তাকে খুঁজে পাবো, স্বপ্নেও ভাবিনি। নজরে রাখলাম জন্তুটাকে। যেভাবেই হোক, উপযুক্ত শাস্তি তাকে আজ দেবোই।

এদিকে মিথ্যে বাণীর ঢল নেমেছে মঞ্চে। লাবু মিয়াকে দেবতার পর্যায়ে নিয়ে ছাড়ছে বক্তারা। শুনছি আর হাসছি মনে মনে। মনোযোগটা সেদিকেই ছিল, হঠাৎ খেয়াল হলো ছেলেটা নেই। কোথায় গেল, কোথায় গেল! খুঁজে দেখলাম আরেকজনের সঙ্গে গল্প করছে সে। দু’জনের হাতে দু’টো বোতল। পান করছে হয়তো। কিন্তু না, কিছুক্ষণ পরই দেখি বেরিয়ে যাচ্ছে ওরা। গেট পেরিয়েই দেখলাম অন্যজন চলে গেল বামে, বড় রাস্তার দিকে; আর সে চলল সোজা, হন হন। পিছু তাই নিতেই হলো। তবে ছেলেটার বয়স কম, গতি বেশি। আর আমার মেদমলিন শরীর, নিয়মিত হাঁটা হয় না, কুলিয়ে উঠছি না। তবু যতক্ষণ দৃষ্টিসীমায় ছিল, এগিয়েছি সমানতালে। তারপর ছুটে এলো এক আমবাগান, আর আমি হারিয়ে ফেললাম জন্তুটাকে।

তবু হাল ছাড়িনি। ভালো করে দেখার জন্য উঁচুমতো একটা ঢিঁবির ওপর উঠেছিলাম।

সেখান থেকে সংবর্ধনার দিকে তাকাতেই শিউরে উঠলাম আবার। এতগুলো বন্যপ্রাণীসহ প্রায় আস্ত একটা বন আকাশে ঝুলিয়ে যে অন্যায় এরা করেছে, তার কি কোনো শাস্তি হবে না? লোকে হয়তো ভয়ে বলছে না কিছু, কিন্তু আমি কেন চুপ থাকব? না, এই নোংরা কাজের ছবি তুলব, তারপর পাঠাব পত্রিকায়।

জায়গাটাও উপযুক্ত, আকাশের ছবি এখান থেকেই তোলা যাবে সবচে’ ভালো। তুলছি, এমন সময় ক’জন লোক এগিয়ে এলো। প্রথমে ভয়ই পেয়েছিলাম, পরে খেয়াল করলামÑ আন্তরিক চাহনী তাদের, আপন দৃষ্টি। চিনতে পেরেই বুকের ভেতর লাফিয়ে উঠল মিষ্টি ছোটবেলা। একসাথে বই পড়েছি আমরা, ঘুম পেড়েছি, পড়েছি প্রেমেও। তারপর উঠে পড়ে ছুটে পড়ে আলাদা হয়ে গেছি যে যার মতোন। আবির এখন কোটিপতি, ভেজালমালের ব্যবসা ওর। চোরাপথে সরকারি সিদ্ধান্ত কেনাবেচা করে নয়ন, আমারই মতো। বাবুরও খুব রমরমা কারবার- স্বর্গবাসের এজেন্সি। সজল ধরাছোঁয়ার বাইরে, আছে আর্মিতে। স্বপনই শুধু কিছু করে উঠতে পারেনি তেমন; সরকারি একটা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ায়, দূর মফস্সলে বাস। অথচ আমার নিতুকে কবজা করেছে ও-ই। আশিকের ঘরে আমাদের একসময়ের ম্যাডাম। তাঁকেও কামনা করতাম খুব। এতদিন পর ওদের দেখে তাই উচ্ছ্বাসের যে ঢেউ বয়ে যাওয়ার কথা বুকে, তা থিতিয়ে যেতে সময় লাগল খানিক। তারপরই প্রশ্ন: ওরা এখানে কেমন করে?

সংবর্ধনার উঠোনে আমাকে দেখেই ছুটে এসেছিল; তা ওদের এড়ানোর জন্যই নাকি বেরিয়ে এসেছি আমি! আহারে মানুষ, যা-ই ঘটুক, নিজের সাথে মিলিয়ে দেখে। কথায় কথায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওটা নিয়েও ফোড়ন কাটলো নয়ন। যদিও ওর বউ শুনেছি পালিয়ে গেছে একজনের সঙ্গে, সেসব আমি তুললাম না। তবে কিছু তো বলতেই হয়। বলতে বলতেই দেখি আকাশের ছবিটা দেখা যাচ্ছে না আর। অতবড় লেখা, অতগুলো জ্যান্ত তাজা প্রাণ, নিমেষেই মিলিয়ে গেল কী করে? ছেলেটাই বা কোথায় গিয়ে লুকোলো! ভাবার সুযোগ না দিয়ে ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে টেনে- এতদিন পর দেখা, একটু আড্ডা মাস্তি হবে।

আমবাগানের মধ্যে দিয়ে পথ। এখান থেকে ডানে বহুদূর ওই দিগন্ত পর্যন্ত আগে বুক বিছিয়ে থাকত সবুজ ধানক্ষেত। সেখানে এখন উদ্ধত কারখানা। ওপাশের লাল প্রাচীরটা মনে হয় চামড়ার, না যেন স্টিলের; এপাশের হলুদটা বিড়ি-সিগারেটের। তার গেটের সামনে কয়েকটা দোকান। সেখানে দুটো গাছ ছিল পাশাপাশিÑ একটা অশ^ত্থ, আরটা তেঁতুল। তাতে নাকি ভূত থাকত দুইঘর। তারা নাকি ভয় দেখাত মানুষকে, আর বাগে পেলেই মটকে দিত ঘাড়। সন্ধ্যা থেকে কেউ আর তাই এমুখো হতো না ভয়ে। তবে দিনের আলোয় এদিকের আলপথগুলো ছিল সুখকর শর্টকাট। এই শর্টকাট ধরেই ভয়ে ভয়ে স্কুলে যেতাম আমি। গাছদুটোর ত্রিসীমানায় এলেই মন্ত্র পড়তাম বিড়বিড়। তিরতির কাঁপা সেসব স্মৃতিই আমাকে টেনে নিয়ে গেল দোকানগুলোর দিকে।

দুজন শ্রমিক দেখলাম গল্প করছে বেঞ্চে বসে। মুখে অদ্ভুত একটা মাস্ক, দেখেই খেয়াল হলো আমারও নাক জ¦লছে ভীষণ। কোথায় পাওয়া যাবে এটা, কী বৃত্তান্তÑ জিজ্ঞেস করতেই মুখ খুলল মোটামতন লোকটা। হাতের পাঁচড়া চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘কিনবার চাইলে সুপারমার্কেটে পাইবেন। আর খালি দেখবার চাইলে এইডা লইয়াই দেখতারেন।’  বলে তার মাস্কটা সে এগিয়ে দিলো সাগ্রহে।

‘আমগো মালিকই এইডা ইমপোর্ট করতাছে অহন। সুপারমার্কেটে হ্যার শোরুম, হেইখান থেইকাই লয় মানুষ।’ চিকন ছেলেটা বলল। তার গা-ভর্তি ঘা। কিছু শুকনো, কিছু গ্যাদ গ্যাদ করছে রসে। একটা কাপড় নিয়ে তা মুছতে ব্যস্ত সে।

‘কী হয়েছে এসব? ডাক্তার দেখান না?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘দেখাইছি না আবার! গাদা গাদা ওষুধ দেয়, কাজ হয় না কিছুই।’

‘আপনার হাতেও কি একই সমস্যা?’ প্রথমজনকে বললাম।

‘হয়। শুদু আমগো না, এলেকার প্রায় হ¹লেরই এই অবস্তা। আরও কত কিসিমের রোগবালাই যে হইতাছে অহন!’

‘মাস্ক পরে আর লাভ কী হলো তাহলে?’

‘মাস্ক থাইকলে নিঃশ^াসডা অন্ততক বাঁচে, নাক মুখ জ¦লে না। তয় পানিত যে বিষ ছড়াইছে সেইডারই কোপ মনোয় এগুলান।’

‘মাটির কতা বাদ দিতাছো ক্যান, বিষ কি জমিতেও কম মিশতাছে?’

‘তাইলে বোজো, দুইডা কারখানারই এই ঠ্যালা, আর তুমি কইতাছো আরেট্টা হইলেও নিকি আমগোরই লাব!’

‘লাব যে আছে, এক চোখ বন্দ না রাইকলে তুমিও বুজতা!’

‘বুজচি তো, মালিকের তিনতলা বাড়ি ছয়তলা হইব, আর আমগোর রোগ বালাইয়ের লিস্টি বাইড়ব।’

‘রোগ শোকই দ্যাখলা শুদু, ফ্যাক্টরির চাকায় কতগুলান সুংসার যে চলতাছে সেইটে দ্যাকলা না?’

‘তা তো দেখছিই। তয় খাল ভইর‌্যা বন কাইট্যা ফ্যাক্টরি করনের কোনো দরকার দেহি নাই।’

‘আমবাগানের মালিকও হুনলাম এই কতাই কইছে। কইছে, এই বাগান আমগোর ঐতিহ্য, ইডারে কাইট্যা ফ্যাক্টরি করবার দিব না।’

এমন সময় হুইসেল বাজল কারখানায়। শুনেই ওরা ছুটল পড়িমরি।

আমবাগান পার হলে একটা খাল। শুকিয়ে যাওয়ার আগে খালটা নদী ছিল। তাকে ভরাট করে করেই সুপারমার্কেটটা বসেছে। সেদিকেই এগুচ্ছি আমরা। কিন্তু পথ ফেলে বাগান দিয়ে কেন যাচ্ছি বলতে পারি না। হাঁটার উপায় নেই, এটা যেন এদের ময়লার ভাগাড়। কালো কয়লা আর রঙিন বর্জ্যরে স্তূপ মাড়িয়ে পথ করে নিচ্ছি বহুকষ্টে। তীব্র কটু গন্ধ আসছে নাকে, বহুক্ষণ দম বন্ধ করে একবার দু’বার শ^াস নিচ্ছি। মাঝে মাঝে মুখ উঁচু করে হাঁটছি, যেন খোলা বাতাস পাই।

খালটার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেছে বড় রাস্তা। তারপরে তামাকের ক্ষেত, তারপর বন। ঠিক তার ওপরই সুন্দর আরেকটা ছবি দেখতে পেলাম। ভীষণ দৈত্যের মতো লাল, ভেতরে বাইরে ঘন ছাইরঙ। মনে হচ্ছে বড় একপাত্র আগুন, তা থেকে বলক দিয়ে উঠছে ধোঁয়া। আগের ছবিটার মতো অত সুন্দর না, তবে ইচ্ছে করলে এটাতেও বাঘ হরিণ বা অন্যান্য প্রাণের অবয়ব খুঁজে নেওয়া যায়। তাই আর ভুল করলাম না, ছবিটা থাকতে থাকতেই ক্যামেরার মুখে বাজিয়ে দিলাম ক্লিক। স্বপনের মুখে তখন আর্তনাদ, ‘আহারে, এত সুন্দর বনটা এমন বেঘোরে পুড়তেছে! এত আগুন লাগল কী করে?’ তাই তো, এ তো দেখছি সত্যিই আগুন! পট পট ঠাস ঠাস গাছ ফাটার আওয়াজ আসছে কানে। আসছে নানাপ্রাণীর চিৎকারও।

পাশেই একটা পাওয়ারপ্ল্যান্ট হওয়ার কথা। অনুমোদনের সময় যদিও পক্ষে-বিপক্ষে বকছিল নানাজন, তবে কাগজপত্রে সব ঠিকঠাকই ছিল। আর আমার আগে পরে আরও খানচারেক স্বাক্ষর পড়েছিল ফাইলটাতে, ফলে সাইন করে দিয়েছি চোখ বুজে। আমাদের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাতে বড় একটা কন্ট্রাক্ট পেয়েছে, আরও পাবে। প্ল্যান্টটা রান করলে দেশেরও অনেক লাভ। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে, বহু মানুষের কাজের সুযোগ হবে। কিন্তু কিছুই আপাতত হচ্ছে না পরিবেশবাদী এক রিটের কারণে। তারা বলছে ওখানে প্ল্যান্ট হলে নাকি উজাড় হয়ে যাবে বন। আর তার প্রভাব হবে মারাত্মক ক্ষতির। তা, এখন কী বলবে তারা, প্ল্যান্ট হওয়ার আগেই যে পুড়ে যাচ্ছে সব! ভাবছি আর ছবি তুলছি। আর আমার ক্লিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে আগুন।

ক’দিন আগে এমন করেই পুড়ছিল আমাজন। বহু ছবি তখন ভেসে বেড়িয়েছে যোগাযোগ মাধ্যমে। কত করুণ কত মর্মান্তিক ছবি যে সেসব! একটা তো আমার লেগেই আছে চোখে। বুকপানিতে হেঁটে যাচ্ছে এক উদ্ধারকারী সেনা। তার কাঁধে মাথা রেখে সন্তানের মতো শুয়ে আছে একটা বাঘ। বিহ্বল বিভ্রান্ত দুটো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে অপলক। দিগি¦দিক আগুন থেকেও যে বেঁচে এসেছে সে, বিশ^াস করতে পারছে না হয়তো। চোখজোড়ায় প্রশ্ন করুণ: ‘আমাদের কী অপরাধ!’

বনটার কাছে যেতে পারলে অমন সব ছবি তোলার সুযোগ আমারও হবে। তবে অন্ধকার নেমে গেছে, একা যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। অপেক্ষা করছি বন্ধুরা কী করে দেখার। হঠাৎ তখন দৌড় শুরু করল স্বপন, সোজা বনের দিকে। উ™£ান্তের মতো ছুটছে ও, যেন ওরই বন, তিনবালতি পানি আর দুই মগ ঘাম ঢেলে আগুন নেভাবে। অন্যরা আবার ঠিক উল্টো, ফিরে যাচ্ছে সেদিকেই যেদিক দিয়ে এসেছিলাম। মাঝখানে পড়ে আমি তখন দ্বিধান্বিত। বুঝতে পারছি না ছবি তুলতে যাব, নাকি ওদের মতো ফিরে যাব নিরাপত্তার খোঁজে। তখনই খেয়াল হলো কারখানার দিক থেকে এগিয়ে আসছে সেই ছেলেটা। কোথাও যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে আমি তাই দাঁড়িয়ে গেলাম। আসো, বাছাধন, মাস্তানির মজা এবার দেখাচ্ছি তোমারে। 

মজাটা যদিও সে-ই দেখালো।

কাছাকাছি এসেই হাতের বোতলটা ছুড়ে মারল আমার দিকে। মেরেই ছুট!

বোতলের মুখে গোঁজা সাদা কাপড়, কাপড়ে লাল আগুন। চীনা ড্রাগনের মতো উড়ে এসে সেটা পড়ল পায়ের কাছে। পড়তেই চুরমার ভেঙে গেল কাচ, বেরিয়ে পড়ল ভেতরের তরল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেল চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বর্জ্য,ে আর তা জড়িয়ে থাকা স্থৈর্যে। দেখতে দেখতে ভীষণ ভয়ের এক বাজরেখা চমকে গেল বুকে আমার। অমনি আমি শুরু করলাম দ্রুতগতির দৌড়। কিন্তু এগুতে পারছি না, কষ্ট হচ্ছে খুব। কোনোমতে হাঁচড়ে পাচড়ে যেতে যেতে দেখি, কিছুদূরেই পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে নয়ন, তড়পাচ্ছে পা ধরে। এক মুহূর্ত মনে হলো যাই, ওকে টেনে তুলি। পরক্ষণেই আবার ভাবলাম, না থাক, আগে নিজে বাঁচি। গেলাম যদিও ওর দিকেই। তবে পৌঁছানোর আগেই পায়ে পা বেঁধে পড়ে গেলাম মুখ থুবড়ে। বাগানের এলোমেলো পাথর, মাটির ঢেলা, আর শুকনো কাঠ ও কাঠিতে লেগে ছিঁড়ে গেল কয়েক জায়গায়। যন্ত্রণায় উঠতে পারলাম না কিছুক্ষণ। ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে আগুন। তাপে যেন গলে যাচ্ছে চামড়া, নাকে জ¦ালাময় বাতাস। এভাবে পড়ে থাকলে একটু পরই দাহ হয়ে যাবে আমার।  

হুড়মুড়িয়ে তাই উঠলাম পড়িমরি। উঠেই আবার দৌড়ের কসরত। না পেরে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটা।

আগুন ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে চারপাশে, বেরুনোর উপায় নেই। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে দেখলাম, উত্তর পাশটা তখনও অক্ষত, সবুজ দেখা যাচ্ছে। যেতে যেতে মনে হলো, দিকে দিকে আগুন হয়তো এভাবেই লাগানো হচ্ছে, নইলে আচমকা কেন জ¦লে উঠবে সব? ছেলেটার ছবি নিতে পারলে একটা কাজের কাজ হতো। সবচেয়ে ভালো হতো আগুনের বোতল ছুড়ে মারার ছবিটা নিলে। ইস, কী ভুলটাই না করেছি! এমনই হয় আমার সবসময়। কাজের সময় মনে থাকে না, পরে অনুতাপ করি।

অনুতাপ এক মৃদু আগুন, যতটা তা পোড়ায়, জ¦ালায় তার চেয়ে বেশি।

আগুন থেকে বেঁচেও তাই জ¦লতে থাকলাম ভেতরে ভেতরে। ততক্ষণে হাঁফ ধরে গেছে, একটু দাঁড়িয়েছি দম নিতে। বাগানের এ দিকটায় বর্জ্যরে স্তূপ নেই। তবে শুকনো ডাল পাতায় ভর করেও আগুন আসছে দ্রুত। বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না। দমটা বাগে এলেই ছুটব। তার আগেই হন্তদন্ত পায়ের আওয়াজ। তাকাতেই দেখি আমার দিকে আগুনমুখো একটা লাইটার ছুড়ে দিয়ে পালাচ্ছে ওই জন্তু। হাওয়ায় ভেসে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ল সেটা। পড়তেই সবুজ ডেনিমে ছড়িয়ে গেল কমলারঙ, ছড়িয়ে গেল জ¦লন।

আতঙ্কে লাফাতে লাফাতেও ছবি নিলাম তার একটা, সে তাতে বেশ কিছুটা দূরে। মোটা একটা গাছের আড়ালে তার পা। হাতের ব্যাজটা দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে তার ইউনিফর্মও। সবাই জানে, লাবু মিয়ার লোকেরাই অমন উদ্ধত রঙ পরে। ফলে তদন্তে এটা ভালোই কাজে লাগবে।

ছবিটা পুলিশকে দেওয়ার দরকার ছিল। তবে কী ভেবে যেন ফোন করলাম পরিচিত এক সাংবাদিককে। আর পুরোটা না শুনেই সে আমাকে যেতে বলল তার কাছে। আর গায়ের আগুন নেভাতে নেভাতেই আমি ছুটে গেলাম তার অফিসে। মেঝেতে টেবিলে দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে আছে খবর। ভেসে বেড়াচ্ছে আর্তনাদ আর উচ্ছ্বাসের রঙ। সঙ্গে আছে সংবাদকর্মীদের আড্ডা আলাপ গান। যুগপৎ আনন্দ আর বেদনায় বয়ে যাচ্ছে নির্লিপ্ত সময়ের ঢেউ। সাঁতরাতে সাঁতরাতে আমি গিয়ে ঢুকলাম সাংবাদিকের চেম্বারে।

শীতাতপ কক্ষ, বসে আছি আরামদায়ক ভিজিটরস চেয়ারে। তবে হৃদপিণ্ডটা পিংপং বলের মতোই লাফাচ্ছে উত্তেজনায়। ধোঁয়াছোটা স্বরে প্রায় চিৎকার করে কথা বলছি। ওপাশে বসে সাংবাদিকটা যদিও শুনছে না সেসব, মন দিয়ে দেখছে ছবিগুলো। আমি তাকিয়ে আছি তার পেছনে বইয়ের শেলফ আর ফাইল কেবিনেটটার দিকে। সেখান থেকে চোখদুটো মাঝেমাঝেই চলে আসছে লোকটার মুখে। হয়তো সে হিসাব কষছে ছবিগুলো ছাপলে পত্রিকার কাটতি হবে কি না; মুখটায় তাই আলগা গাম্ভীর্য, চোখদুটো সরু করে আনা- যেন বীক্ষণযন্ত্র। ভেতরে বিষয়বুদ্ধি খেলে গেলে মানুষের মুখে এমনই কপট চেহারা ভাসে।

হঠাৎই সেখানে ভেসে উঠল কুটিল একটা হাসি। দেখেই আমি স্ক্রিনে তাকালাম। আর তাকাতেই গেলাম জমে। স্ক্রল করতে করতে লোকটা আমার ব্যক্তিগত ফাইলে ঢুকে গেছে। সহকর্মীর সঙ্গে যে ভিডিওটা আমার ভাইরাল হয়েছে, সেটাই চলছে পর্দায়। কালও দেখেছি বের করে। তারপর লুকিয়ে রাখতে ভুলে গেছি নিশ্চয়ই। এখন এই.. ছিঃ ছিঃ, কী লজ্জা! ঠিক কাজটা কি কোনোদিনই ঠিক সময়ে করতে শিখব না? নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে সেঁধিয়ে গেলাম চেয়ারে।

লোকটা অবশ্য এড়িয়েই গেল ব্যাপারটা। কথা হলো ছবিগুলো নিয়ে। কয়েকটা ছবি সে রাখছে। যদি ছাপা হয়, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে তারা। এমন হলে বেশি করে দাম হাঁকতে হয়, দামদর করতে হয়। কিন্তু কিছুই করলাম না আমি; ছবিগুলো যে তারা ছাপবে, নিচে নাম থাকবে আমার, তাতেই যেন খুশি। বেরিয়ে এলাম ফুরফুরে মেজাজে। এসেই মনে পড়ল ছবির নিচে নাম থাকার ঝামেলাও আছে। সহজেই অপরাধীরা চিনে ফেলবে। ধরে যদি তখন মেরে ফেলে?

সময়টা ভালো না। সত্য-মিথ্যা বলে কিছু নেই, আছে শুধু পক্ষ আর বিপক্ষ। যা-ই আপনি বলুন, কারও না কারও বিপক্ষে তা যাবেই। গেলেই তখন আর রেহাই নেই; কোনো একদিন সকালে উঠে পত্রিকায় দেখবেন জ্যান্ত আপনাকে পুড়িয়ে মেরেছে, বা বেঁধে রেখে পিটিয়ে, অথবা কুপিয়ে, কিংবা কিছুই করেনি তবু হঠাৎ নেই হয়ে গেছেন আপনি। কত তুচ্ছ কারণেই না মেরে ফেলছে মানুষকে ওরা! না না, নামটা তাই ছাপানো যাবে না; দরকার নেই আমার বিখ্যাত হওয়ার। অনুরোধটা করতেই ভেতরে ঢুকলাম আবার। 

ঢুকেই দেখি, কোথায় সাংবাদিকের চেম্বার, এসে তো পড়েছি থানায়!

চেয়ারে এক গম্ভীর অফিসার, তার ডেস্কটপে একটার পর একটা ছবি ভাসছে। সবগুলোই আমার, আজই তোলা সবগুলো। দেশবিধাতার সংবর্ধনায় ঘুরঘুর করছি। কারখানা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলছি। তারপর আমবাগানে। শেষ ছবিটায় নিচু হয়ে আছি, মাথাটা হেলানো সামনের দিকে; হাতটা ঝোলানো, খালি; তার কিছু দূরেই আগুনের বোতল, যেন কেবলই সেটা ছুড়ে দিলাম। এ কী করে সম্ভব! ঠিকরে বেরুনো চোখে তাকিয়ে আছি, নড়তে পারছি না, যেন বাজ পড়েছে মাথায়। পাশ কাটিয়ে তখন সেই ছেলেটা ঢুকলো, বোতলটা যে ছুড়েছে আসলে। দেখেই উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। ‘ওই আমবাগানে ফ্যাক্টরি করতে চায় ওরা। কিন্তু মালিক সেটা করতে দেবে না বলেই তাতে আগুন দিয়েছে এই সন্ত্রাসী।’ বলতে লাগলাম ঠিক কখন কখন আরও কী কী করেছে সে। তবে আমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অফিসার মজে গেলেন আলাপে।

কী যে খাতির দু’জনার! এমন ভাব, যেন তারা ইয়ার-দোস্ত। ছেলেটাও ধুরন্ধর, কথা বলছে শান্ত গোছালো স্বরে। ‘বন হইতেছে প্রাণের আধার, প্রকৃতির বড় মাস্টারপিস। ব্যক্তিস্বার্থে তারেই কিনা ধ্বংস করতেছে এরা!’ আমাকে দেখিয়ে বলল, তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য আমিই নাকি আগুন দিয়েছি বনে। আর তার ছবি তুলে বিক্রি করেছি পত্রিকায়।

কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, ঠোঁটের সামনে আঙুল এনে, থামিয়ে দিলেন অফিসার। বললেন নাশকতার অভিযোগে আমাকে আটক করা হচ্ছে। কিন্তু আমি তো নির্দোষ; ধরা পড়ব কেন, শাস্তি পাব কেন? ভেবেই দিলাম দৌড়। তবে কেমন যেন ভারী হয়ে আছে পা দু’টো, তুলতেই পারছি না। অন্য সময় দেখেছি দৌড়তে না পারলে আমি উড়তে শুরু করি। উড়ে উড়ে চলে যাই এ গাছ থেকে সে গাছ। সেই আশায় পাখির ডানার মতো হাত উঁচিয়ে উড়তে চেষ্টা করলাম। চারপাশ থেকে ততক্ষণে বহু বহু হাত এসে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ফেলেছে আমায়।

এরপর কি ক্রসফায়ার, নাকি এনকাউন্টার? ভয়ে আতঙ্কে আমি গুটিয়ে গেলাম শামুকের মতো।

কত ব্যাংকে কত সম্পদ আমার, আমি না থাকলে সেসবের কী হবে?

বাবুসোনাদের মুখ মনে পড়ছে, একা ওরা থাকবে কী করে?

বাবার কেমো চলছে, মায়ের ওষুধ শেষ- কে টানবে এত?

ভাবতেই আমি পুঁতে যাচ্ছি মাটিতে। কান্না করছি, অস্বীকার করছি, বলছি সব ষড়যন্ত্র, সব মিথ্যা। বলছি, ওই পাষাণটাই আগুন দিয়েছে সবখানে- বনে, কারখানায়; তারও বহু আগে আমাদের সংসারে। কিছুতেই ভ্রƒক্ষেপ করছে না কেউ। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে আমায়। যত চেষ্টা করছি ছাড়া পাওয়ার, দপাদপ কিলঘুষি তত পড়ছে চোয়ালে বুকে পিঠে।

মারতে মারতে আমাকে কবরের মতো সরু একটা ঘরে ফেলে গেল তারপর।

শরীরে তীব্র ব্যথা, চোখ জ¦লছে, বুক জ¦লছে। বন্ধ হয়ে আসছে দম।

জেগে থাকতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ, অথচ ঘুমোতে পারছি না।

তবে কি আমি স্বপ্ন দেখছি! ভাবতেই হুড়মুড়িয়ে উঠলাম, চেষ্টা করলাম জেগে ওঠার। কিন্তু জাগতেও পারলাম না।

দেয়ালে টিকটিক করছে সময়। ঘড়িতে গভীর রাত। কাঁটায় কাঁটায় অন্ধকার। আঁধার আমার চোখেও। কালির মতো ঘন সে আঁধার, পাপড়ি থেকে যেন চুঁইয়ে পড়ছে নিচে। একটু নড়তেই হোঁচট লাগল ছোট্ট একটা টেবিলে। তার ওপর পানি, ঢকঢক করে খেলাম এক মগ। কিন্তু পানি যেন তা না, যেন বিষ যেন গরল, গলাবুক জ¦লতে লাগল আরও। মাথার ওপরে খোলা ঘুলঘুলি দিয়ে বাতাস ঢুকছে। তাতে শিসার গন্ধ, নাক জ¦লছে তীব্র তেজে। বিছানা হাতড়ে মাস্ক খুঁজলাম, নেই।

কী করব বুঝতে না পেরে আমি তখন বেরিয়ে গেলাম ঘুলঘুলিটা দিয়ে।

আকাশে তখনও জাদু-মস্ত একটা শিল্পকর্ম ঝুলে আছে। কালো-হলুদ বাঘ, আর হলুদ-সবুজ হরিণ। আর গাছ। আর ময়ূর। আর মানুষ পাখি সাপ। সবার গায়ে আগুন, বেঘোরে পুড়ছে প্রাণ।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares