বায়েজিদ : জিল্লুর রহমান সোহাগ

বায়েজিদ নামের লোকটি বাস্তবে এই গলি, মেইন রোড ধরে কখনও হাঁটেননি। তবে একই নামের অন্য অনেকেই হয়তো হেঁটেছেন বা এখনও হাঁটছেন। হতে পারে সে এই রাস্তা-ঘাট ধরে হেঁটে যাওয়া বা এই শপিংমলে ভিড় করা টুকরো টুকরো বায়েজিদের একটা লব্ধি, তবে বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র। বায়েজিদ নামক লোকটিকে আমি তুলে এনেছি আমার কল্পনা-খুঁড়ে, দীর্ঘ পাঁচ বছর পর।

একটা সময় ছিল এবং আমি ও আমার বন্ধু কাবির নিয়মিত গল্প বানানোর খেলা খেলতাম। ১৫ নম্বর গলির মুখে যে বহুতল শপিং কমপ্লেক্স, প্রতিদিন বিকেলে আমরা বসতাম সেটার গ্রাউন্ড ফ্লোরের সিঁড়িতে। সামনে মেইন রোড দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা শপিংমলে ভিড় করা মানুষজন থেকে আমরা যে কোনো একজনকে বেছে নিতাম, তারপর তাকে নিয়ে গল্প বানাতাম অনুমানে। আমাদের প্রায়ই এরকম হতো যে গল্প বানাতে বানাতে আমরা নিজেরাই শুরু করতাম সেটাকে বিশ্বাস করতে এবং তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ত আমাদের উত্তেজনা। আনন্দটা ছিল সম্পূর্ণ নতুন কিছু একটা আবিষ্কারের মতোই। কাবির আমেরিকা প্রবাসী হবার পর থেকে আমরা দু’জনেই এখন হয়ে গেছি আলাদা আলাদা দু’ট গল্প। অথচ সেই শপিং কমপ্লেক্সটা আছে এখনও আগের জায়গাতেই এবং সামনের মেইন রোডে আগের মতোই ব্যস্ততা মানুষ ও যানবাহনের।

খেলাটা আমি প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম, হতে পারে এটা আমাদের দু’জনের যৌথ আবিষ্কার ছিল বলে। অনেকদিন পর খানিকটা জিরিয়ে নেবার জন্যই সেই একই সিড়িতে বসে মনে পড়ে পুরোনো অভ্যাসটার কথা। ‘বায়েজিদ ভাই’ বলে কেউ একজন কাকে যেন ডাক দ্যায়। আমি ঘুরে তাকিয়ে ভাবি এই শপিং কমপ্লেক্সটার উল্টো দিকের ফুটবল মাঠের গেট দিয়ে ছোটখাটো সাধারণ চেহারার যে মানুষটা মাত্রই বেরিয়ে এলো ইনিই বোধহয় ‘বায়েজিদ’। আচমকা মনের ভেতর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে গল্প বানানোর পুরোনো অভ্যাসটা। দেখা যাক কতদূর পারা যায়।

‘বায়েজিদ’ বিষয়ক গল্প বানাতে গিয়ে প্রথমে মাথায় আসে রাতভর অসুস্থ মা’য়ের পাশে পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পরি বায়েজিদ বোস্তামির কথা। ধরে নেওয়া যেতে পারে তার ‘বায়েজিদ’ নামের পেছনে মূলত মাতৃভক্তি বিষয়ক এই গল্পটাই কাজ করেছিল অনুপ্রেরণা হিসেবে। কিন্তু আমরা সাধারণত নামের সাথে চরিত্রের যোগ খুঁজতে গিয়ে উল্টোটাই দেখি ঘটতে। এ কারণেই বরং নাম-চরিত্র যোগ বিষয়ক গল্প-নির্মাণ এড়িয়ে আলোকপাত করা যাক মোটাদাগে যা দৃশ্যমান তার ওপর।

ধরা যাক, স্বভাবে তিনি নতমুখ। তবে তিনি যেটা হতে চেয়েছেন বা যেটা হওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেটা হলো তাকে ঘিরে থাকা বন্ধুদের তুলনায় নিজের অবস্থানটা একটু হলেও উঁচু রাখতে। তিনি স্বভাবে ঠিক ততটা হিংসুটেও নন। বন্ধুদের সাফল্যে তাকে বরং দেখা যায় আনন্দিত হতে। কিন্তু নিজের অপরিবর্তনীয় অবস্থান ও প্রতিটি পরাজয়েই তিনি মুষড়ে পড়েন কেটে ফেলা কলাগাছের মতো। মৃত্যুভয়টা তার সাধারণ মানুষের মতোই। তবে ব্যক্তিগত গ্লানিটা চরমে উঠলে তিনি সংকল্প করেন অদৃষ্টকে এক হাত দেখে নেওয়ার। তখন আর তিনি মৃত্যুভয়টা টের পান না। মৃত্যুকে তখন সিঁড়ি মনে হয় অদৃষ্টের সাথে ডুয়েল লড়বার ক্ষেত্রে পৌঁছনোর।

বন্ধুদের সাথে রোজগের আড্ডা শেষে তিনি কোনো কোনো দিন বাসায় ফেরেন ভীষণ কর্মোদ্যম নিয়ে আবার কখনওবা গ্লানিসর্বস্ব হয়ে। গ্লানিকর দিনে কেউ তার খোঁজ পায় না। তিনি তখন এমন এমন এক ঘোরের ভেতর ডুবে যান যেখানে শুধু নিজের কণ্ঠস্বরটাই শুনতে পাওয়া যায়। সহধর্মিণী রাফিয়ার সাথে তার সম্পর্কের সুতোটা এতটাই ঢিলে হয়ে পড়ে যে ঘুমের ভেতর রাফিয়ার হাত তার শরীর স্পর্শ করলে তার ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি চমকে জেগে ওঠেন সেটাকে দুর্বৃত্তের হাত ভেবে। এত কিছুর পরও তিনি বন্ধুদের আড্ডা একদম এড়াতে পারেন না, বন্ধুদের সাথে বেশিরভাগ সময়েই তর্কে হেরে যাওযার ব্যাপারটা তাকে আহত করে ঠিকই কিন্তু তর্কে জেতার জন্য বিরতিকালীন সময়ের প্রস্তুতিই তাকে এনে দেয় বেঁচে থাকার মতো এক প্রকার অনুভূতি। তবে ইদানীং তিনি টের পেতে শুরু করেছেন যে, তিনি আগের মতো প্রাণখুলে হাসতে ভুলে যাচ্ছেন। তিনি ঠিক জানেন না এর সাথে তর্কে হেরে যাওয়ার কোনো যোগ আছে কিনা।

তিনি যে মেধাবী তার স্বাক্ষর রেখেছিলেন শিক্ষাজীবনে। সেক্ষেত্রে এটা ভেবে নেওয়াই সঙ্গত ছিল যে, তিনি কর্মজীবনেও তার মেধা দিয়ে সফলতা নিশ্চিত করবেন। সেদিকেই আগাচ্ছিলেন যতদিন পর্যন্ত না মাথায় ঢুকে পড়লো শেয়ারবাজারের ভূত। যে বছর মানুষ ক্ষেপেছিল শেয়ারবাজারে টাকা খাটিয়ে রাতারাতি বড়লোক বনে যাবার স্বপ্নে, ব্যাপারটা তাকেও বেশ আগ্রহী করে তুলেছিল। অফিসের এক সহকর্মীর কাছ থেকে শেয়ারবাজার সংক্রান্ত প্রাথমিক পাঠ নিয়ে বিনিয়োগ করলেন প্রাইমারিতে, লাভও করলেন টানা কয়েকবার। এরপর অতিরিক্ত মুনাফা লাভের লোভটা তাকে টানতে শুরু করল চুম্বকের মতো। দোনোমনা করতে করতে তিনি অনেকগুলো টাকা বিনিয়োগ করলেন সেকেন্ডারি শেয়ারে।

দুর্ভাগ্যবশত : সেই বছরই কোনো একদিন দেশের সব বড় বড় সংবাদপত্র সয়লাব হয়েছিল হাতে গ্যাসবেলুন ধরে রাখা একজন মাঝবয়েসি মৃত ব্যক্তির ছবিতে। মৃতদেহটি পড়ে ছিল স্টক একচেঞ্জের সামনে, ফুটপাতে। আগের রাতে স্ত্রীর সাথে ফরমায়েশি সহবাস শেষে বায়েজিদকে বেগ পেতে হচ্ছিল সাউন্ড স্লিপের জন্য। তিনি জেগেই ছিলেন এক প্রকার, অথচ সেদিন রাতেই তার বাসায় চুরির ঘটনা ঘটেছিল। বন্ধু বাবর যাকে তিনি দু’চোখে দেখতে পারেন না সে যখন দুপুরে ফোন করে শেয়ারবাজারে ভরাডুবির কথা তাকে জানিয়েছিল তিনি টের পেলেন শুধু তার বাসায় নয়, দেশের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটেছিল সেদিন রাতেই। গতকালের ঘটনায় আসা যাক, তিনি ফিরছিলেন অফিস থেকে। বন্ধুদের আড্ডা গতকালও ছিল, তিনি এড়িয়ে গেলেন নিজ থেকেই। একটা বিশেষ বিষয়ে তর্কে হেরে যাবার পর নিজেকে মানসিকভাবে কিছুটা স্থির করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আপাতত কিছুদিন তাদের সঙ্গ এড়িয়ে যাবেন। ওদের ভেতর বাবরের কথা-বার্তা ইদানীং একটু বেশি বেড়েছে। বাবরের চটাস চটাস কথা তার কাছে লাগে চপেটাঘাতের মতো। তিনি মনে মনে ভাবেন অনুকূল সময়ে তিনিও এসবের শোধ তুলে নেবেন সুদে-আসলে। তা ছাড়া তিনিও যে কেনো নিজের সম্পর্কে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতে যান সেটা ভেবেও বিরক্ত হন নিজের ওপর। প্রতিদিনই ভাবেন বসে থাকবেন মুখে কুলুপ এঁটে, প্রয়োজন ছাড়া কথা বলবেন না একটিও। শুধু অন্যদের কথা শুনে যাবেন এবং জায়গামতো জুড়ে দেবেন একটা দু’টো ভারী মন্তব্য।

তাতে করে ব্যক্তিত্বে যোগ হবে বাড়তি একটা ওজন। কিন্তু দিনশেষে যখন নিজেকে আবিষ্কার করেন বরাবরের মতোই সবচেয়ে বেশি কথা খরচকারী হিসেবে তখন বুঝতে পারেন তার স্বভাবটা চলে গেছে নিজেরই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

নভেম্বরের বিকেলে হিম বাতাসকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে হটিয়ে দিয়ে গতকালও জেঁকে বসেছিল ধূলোমাখা গুমোট হাওয়া, ট্রাফিক জ্যাম ও হুড়োতাড়া করা মানুষের বৃহৎ প্ল্যাটুন। উবারের মোটরবাইকে চেপে তিনি আটকে ছিলেন সিগন্যালের জ্যামে। চোখ পড়েছিল একটা সদ্য নির্মীয়মাণ মসজিদের সামনে চেয়ার টেবিল পেতে বসে মাইকে ওয়াজ করতে থাকা একটা অশীতিপর বৃদ্ধের দিকে। ওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে লোকটি তার সামনে দিয়ে যাওয়া পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন নির্মীয়মাণ মসজিদের অর্থ সাহায্যের জন্য। তার চামড়া ঝুলে যাওয়া চোয়াল ও প্রায় দন্তহীন মুখের ভেতর থেকে সুর থেকে-থেকেই বেসুরো হয়ে ছিটকে পড়ছিল স্বাভাবিক লয় থেকে। তা দেখে একটা চোরা ভয় আচমকাই ঢুকে পড়ল বায়েজিদের মনের ভেতর। বৃদ্ধ লোকটি তার ওয়াজে বারবারই টেনে আনছিল আখেরাত বা পরকালের কথা, জান্নাত-জাহান্নামের কথা আর সিগন্যালটাও ছাড়ল হুট করে।

একটু হলেই বায়েজিদ ছিটকে পড়তে বসেছিলেন মোটরবাইকের পেছন থেকে। বুকের ভেতরকার কাঁপুনিটা বেড়ে গেলো কেন না, ছিটকে পড়লেই রাস্তা দিয়ে ছুটে যাওয়া দ্রুতগতির গাড়িগুলো তাকে মুহূর্তেই পিষে দিয়ে যেত। রাস্তাটা আড়াআড়ি পার হয়ে গলিতে ঢোকার মুখে পকেটের ভেতর আচমকা গো গো শব্দে কাঁপতে থাকা মুঠোফোন সাহায্যকারীর ভূমিকায় বুকের ধুকপুকানিটা কমিয়ে দিলো একরাশ বিরক্তি উজাড় করে দিয়ে। তিনি নিশ্চিত, ফোন করেছে রাফিয়া। এই সন্ধ্যায় রাফিয়ার ফোন মানেই ঘরের কাঁচা-বাজার ফুরিয়ে যাবার ইঙ্গিত। রোজ তিনি যাদের সাথে আড্ডা দেন তাদের সাথে তার বন্ধুত্বটা অনেকদিনের। তিনি ভাবেন ওদের প্রায় সকলেরই শুরু থেকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকায় সময়ের বিনিয়োগটা বেশিরভাগই বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায়। এ কারণেই তিনি যুক্তি-তর্কে ওদের সাথে পেরে ওঠেন না। সেক্ষেত্রে তাকে লড়তে হয় বিগত বছরের হারিয়ে ফেলা প্রাচুর্যের পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে তাতে করে চলে যায় দিনের সিংহভাগ সময়। বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাটা তার কাছে এখন বিলাসিতা। কিন্তু তবুও তিনি মোটেও মেনে নিতে পারেন না হেরে যাওয়া। বাবর আচরণে ভীষণ উদ্ধত, তার সাম্প্রতিক সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্থানটা তাকে করে তুলেছে আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য। আর এসবের শিকার বায়েজিদকেই হতে হয়, কারণ হয়তো তার পরাজয়ের ইতিহাসটা খুব স্পষ্ট ও দৈর্ঘ্যওে অনেকটা লম্বা।

পকেটের ভেতর মুঠোফোন কেঁপে উঠল আবার। এক হাত দিয়ে পকেট থেকে মুঠোফোনটা বের করে তাকাতেই স্ক্রিনে রাফিয়ার নাম দেখে তিনি অবাক না হয়ে সচেতনভাবেই উপেক্ষা করে পুনরায় মুঠোফোনটি চালান করে দিলেন পকেটে। সড়ক-গলি পার হয়ে তিনি যখন কাঁচা বাজারের সামনে এসে মোটরবাইক থেকে নেমে পকেটের মানিব্যাগে হাত দিলেন ভাড়া দেবেন বলে ব্যাপারটা তখনই টের পেলেন যে একটু আগে নিশ্চিত দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ার দরুন বুকের কাঁপুনিটা আবারও শুরু করেছে বাড়তে। ভয়টা ফিরে এলো, ভাবলেন তাহলে কি ভাগ্যবিধাতার সাথে ডুয়েল লড়বার প্রত্যয়টা পুরোপুরি কেটে গ্যালো? রাগ অনেক সময় ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে ভেবেই মোটরবাইক চালককে উদ্দেশ করে কড়া সুরে বললেন ‘মিয়া সাবধানে বাইক টান দিবা না? আরেকটু হইলেই তো পইড়া গেছিলাম গা’, তিনি দেখলেন বাইক চালক ছেলেটির ঠোঁট একদিকে  বেঁকে গেলো এক টুকরো হাসিতে যেটা নিশ্চিত তাচ্ছিল্যের, একটু দূরেই কফিশপের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা টিনেজ মেয়েদের সাথে চোখাচোখি হলে তিনি যেমনটা দ্যাখেন ঠিক তেমন।

ম্যানিব্যাগ বের করেই দেখলেন সেখানে একটাই হাজার টাকার নোট, স্বাভাবিকভাবেই উবার চালক ছেলেটি ভাংতি দিতে পারবে না সেটা জেনেই তিনি অস্বস্তি সহকারে নোটটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন। ছেলেটি ঠোঁটে আগের মতোই হাসি ঝুলিয়ে রেখেই বললেন ‘সরি ভাই, ভাংতি নেই।’ বায়েজিদের মেজাজ চড়ে গ্যালো, একগুঁয়ের মতো বললেন ‘ভাংতি আমার কাছেও নাই, তোমার ভাড়া তুমি যেমনে পারো বুইজা লও।’ ছেলেটার ঠোঁট থেকে হাসি মুছে গেলো, চোখে ফুটে উঠলো স্পষ্ট বিরক্তি ‘ভাংতি নেই আগেই কইতেন, তাইলে আপনারে যাত্রী হিসেবে নিতামই না।’ তিনি মনে মনে ভীষণ অপমান বোধ করলেন। আশপাশে তাকাতেই চোখে পড়লো কেবল কয়েকটা রিকশাওয়ালা। ছেলেটাকে এখানে অপেক্ষা করতে বলে তিনি এগিয়ে গেলেন সামনের কফিশপটার দিকে তাতে করেই বেরিয়ে গেল অতিরিক্ত দু’শো টাকা। যে দেশে পাঁচশ টাকার ভাংতি পেতে হয়রান হতে হয়, সে দেশে হাজার টাকার নোট বের করার জোকারি করবার জন্য দেশের সরকারকে তিনি মনে মনে গালি দিলেন এক চপট।

নভেম্বরের ছোট হয়ে যাওয়া দিনের নিকেশ করে দিয়ে এবং দোকানে দোকানে উজ্জ্বল হ্যালোজেন আলো ও মানুষের ভিড়-বাট্টা এড়িয়ে ততক্ষণে নেমে এসেছে রাত। বায়েজিদ কাঁচা বাজারে ঢুকেই দেখলেন সেখানে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। অন্যান্য দিন দোকানিরা পারলে খদ্দেরের জামা-কাপড় ধরে টান দ্যায় তার দোকান থেকে সওদা করার জন্য, সেখানে দোকানিরা যেভাবে একে অন্যের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে গল্প-গুজব করছে তাতে করে মনে হচ্ছিল তাদের বিন্দুমাত্র বিকার নেই সামনে এলোমেলোভাবে হেঁটে যাওয়া খদ্দেরের উপস্থিতি সম্পর্কে। ওরা ধরেই নিয়েছে খদ্দেরকে এত তেলানোর কিছু নেই, প্রয়োজন হলে ওরা নিজ থেকেই আসবে সওদা করতে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ দরদাম করতে এলে দোকানিরা উত্তর দিচ্ছিল বিরক্ত ভঙ্গিতে। বায়েজিদ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আজ কাঁচা বাজার করবেন না, এগিয়ে গেলেন মাছের বাজারের দিকে। সেখানে গিয়েও দেখলেন আরেক অদ্ভুত পরিস্থিতি। পছন্দসই কয়েক রকমের মাছের গায়ে হাত দিয়ে দরদাম করতে গিয়ে দেখলেন সেখানেও আগুন। তিনি বুঝতে পারলেন না রাতারাতি দেশে দুর্ভিক্ষ লাগলো নাকি?

এক সারির একেবারে শেষ মাথায় কোনার দিকে নির্লজ্জের মতো দাঁত বের করে হাসতে থাকা একজন মাছ বিক্রেতা তাকে ডাকলো ‘স্যার, মাছ নিবেন তো এই দিকে আহেন।’ তিনি দেখলেন লোকটির সামনে ডালার ওপর নড়াচড়া করছে ধাঙ্গড় সাইজের কয়েকটা চাষের মাগুর মাছ। তিনি কিছুটা কৌতূহল নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যেতেই লোকটি আগের মতোই হাসতে হাসতে বললো ‘মাছগুলান খুব স্বাদের, নিয়া যান। পুরাই একের জিনিস। কয়দিন পর এই দামে মাছে কাটাকুটিও খুইজ্জা পাইবেন না স্যার।’ মাগুর মাছ তার খুব অপছন্দের মাছ। ব্যাপারটা ঠিক স্বাদের নয়, মাগুর মাছ দেখলেই তিনি এক প্রকার অস্বস্তি বোধ করেন। তাছাড়া মাছ বিক্রেতার কথায় বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই তিনি সেটা জানেন। কিন্তু যখন তিনি হিসাব করে বুঝতে পারলেন যে এই মুহূর্তে একমাত্র মাগুর মাছই তার ক্রয়ক্ষমতার ভেতর তিনি কোনো প্রকার ভাবনা চিন্তা ছাড়াই কিনে ফেললেন বড় সাইজের দু’টো মাগুর মাছ। বাসায় ঢুকেই ঘর-ভর্তি মানুষজন দেখে বায়েজিদ পড়ে গেলেন অদ্ভুত এক মানসিক সংকটে। তার ব্যাগের ভেতর খলবল করে নড়ছে মাগুর মাছ দু’টো। সংকট সৃষ্টির কারণ আপাতত এই মাছদু’টোই। তার ইচ্ছে হলো মাছদু’টোর গলাটিপে ধরতে, মনে মনে নিজেকে গাল দিলেন ‘ইস কি বুঝেই যে মাগুর মাছ কিনতে গেছিলাম।’ চোর চোর একটা ভাব তাকে ফেলে দিলো চরম এক অস্বস্তিতে। ড্রয়িংরুমের সোফায় পা তুলে মোবাইল ফোন হাতে ছোট শ্যালিকাকে দেখতে পেয়েই তিনি বুঝতে পারলেন অতিথি শ্বশুরবাড়ি পক্ষের।

বায়েজিদ ঘরে ঢুকতেই ছোট শ্যালিকা মোবাইল ফোন থেকে চোখ তুলে বললো ‘স্লামালিকুম দুলাভাই’, ওঘর থেকে শাশুড়ি হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে বলল ‘এতক্ষণে এলে বাবা?।’ নিজের অপ্রস্তুত অবস্থা ঢাকতেই বায়েজিদ চেহারায় এক প্রকার কার্টুন হাসি ফুটিয়ে কোনোমতে দু’জনেরই সম্ভাষণের জবাব দিয়ে দ্রুত পায়ে ঢুকে পড়লেন রান্নাঘরে। মাছদু’টো তখনও বেয়াড়ার মতো খলবল করছিল ব্যাগের ভেতর। তিনি একটা বালতিতে খানিকটা পানি দিয়ে তার ভেতর মাছদু’টো জিইয়ে রেখে একটা সিলভারের ঢাকনি দিয়ে ঢেকে দিলেন। তার মনে ফিরে এলো কিছুটা স্বস্তি, ভাবলেন আপাতত মান ইজ্জতটা বাঁচানো গেলো। সকালে উঠে না হয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে। শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের সামনে মাগুর মাছ কিনে বাড়ি ফেরার ব্যাপারটা তার কাছে মনে হচ্ছিল রীতিমত লজ্জাজনক।

বাসার ভেতর উৎসবের আমেজ, অথচ তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না উপলক্ষটা কি। ওঘর থেকে ভেসে আসছিল রাফিয়ার উচ্চস্বরে হাসির আওয়াজ। বালতির ভেতরেও মাছদু’টো শব্দ তুলে খলবল করে উঠছিল একটু পর পর। তিনি ভয় পেতে শুরু করলেন এই ভেবে যে রাফিয়া জানলে নিশ্চিত আজ তাকে আরেক তরফা অপদস্থ হতে হবে। ধুর! ক্যানো যে মাছ বিক্রেতার কথায় মাগুর মাছদু’টো কিনতে গেলেন, বেড়েই চললো তার নিজের প্রতি বিরক্তি। মাছদু’টোকে তার মনে হতো লাগলো বাবরের মতো। বাবর  যেমন মুখিয়ে থাকে বায়েজিদকে ভরা মজলিসে অপদস্থ করার সুযোগের অপেক্ষায়, মাগুর মাছদু’টোর এই সশব্দ খলবলানি দেখে মনে হচ্ছিলো মাছও ঠিক একই প্রকৃতির।

তার একমাত্র মেয়ে তৃণা, গত সেপ্টেম্বরে পা দিয়েছে চারবছরে। বাসায় ঢুকলেই তৃণা দৌড়ে তার কাছে চলে আসে। একমাত্র এই একটা জায়গাতেই তিনি প্রচণ্ড নিরাপদ বোধ করেন। হয়তো তার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে যে একমাত্র তৃণাই পারবে তার এই মুহূর্তকালীন মানসিক সংকট থেকে উদ্ধার করতে। তিনি বেরিয়ে এলেন রান্নাঘরে থেকে, ড্রয়িংরুম পেরিয়ে নিজের শোবার ঘরের ভেতরে দৃষ্টি পড়তেই তিনি দেখতে পেলেন তৃণাকে ঘিরে গল্পের আসর বসিয়েছে তার শাশুড়ি ও বেশ কয়েকজন তার বয়েসি মহিলা। বায়েজিদ ওদের সবাইকেই চিনতে পারলেন। তৃণা আপাতত ওদের মধ্যমণি। তিনি বুঝতে পারলেন এই মানুষজন পেরিয়ে তৃণার কাছে তার পৌঁছাবার সাধ্য নেই একদম। তার ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তে বাসা থেকে বের হয়ে নিরিবিলি কোথাও গিয়ে বসতে। শোবার ঘরে ঢুকে যে পোশাক-আশাক পাল্টাবেন তারও উপায় নেই। ভাবলেন এর চেয়ে বরং ড্রয়িংরুমে বসে ছোট শ্যালিকার সাথে গল্প-গুজব করে পরিস্থিতিটাকে একটু হালকা করে নেওয়া যাক। কিন্তু রাফিয়া তখনই ঘরের ভেতর থেকে উড়ে এলো ঝড়ের বেগে, রেগেমেগে বলতে শুরু করল ‘তোমার কি কখনওই বিন্দুমাত্র কমনসেন্স হবে না? তোমাকে কতবার ফোন দিয়েছি দেখছ?’ ‘কিন্তু এসবের উপলক্ষ কি’ প্রশ্নটা বায়েজিদের ঠোঁটে আসতেই সে তাড়াতাড়ি গিলে ফেলে আমতা আমতা করতে করতে উত্তর দিলেন ‘মোটরবাইকে ছিলাম, খেয়াল করতে পারিনি।’

কিন্তু উত্তরে রাফিয়া যে একদমই সন্তুষ্ট হতে পারেনি সেটা বোঝা গেলো তার চোখ-মুখের বক্রতা দেখেই। রাফিয়া কথা না বাড়িয়ে গটগট করে বেডরুমের দিকে ঢুকে পড়লে বায়েজিদ এগিয়ে যাচ্ছিলেন ড্রয়িংরুমের সোফার দিকে, তখনই তার কানে এলো রান্নাঘরে মাগুর মাছ রাখা বালতিটা উল্টে পড়ার শব্দ। তিনি দ্রুত ছুটলেন রান্নাঘরের দিকে কিন্তু ততক্ষণে বেহায়া মাগুর মাছদু’টো বালতির বাইরে এসে মেঝেতে সাপের মতো একেবেঁকে রান্নাঘর থেকে আসতে শুরু করেছে ড্রয়িংরুমের দিকে। তিনি সাথে সাথে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ে দু’হাতে দুটো মাছকেই ধরতে গেলেন কিন্তু দু’টোই হাত থেকে বেরিয়ে গ্যালো পিছলে। মাথার ভেতর বাবরের ছবিটা ভেসে এলো, তিনি রাগে গজরাতে গজরাতে শক্তহাতে বাবরের গলা চিপে ধরেছেন এমন ভঙ্গিতে মাগুর মাছ দু’টোকে পাকড়াও করতে গিয়ে দেখলেন ততক্ষণে বাসার সবাই তার কাণ্ড দেখতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে, রাফিয়ার কুঁচকানো ভ্রুতে তীব্র বিরক্তির ছাপ। বায়েজিদের মনে হলো তিনি লজ্জায় অপমানে মিশে যেতে শুরু করেছেন মেঝের সাথে এবং মেঝেতে তখনও এলোমেলো ছুটতে থাকা মাগুর মাছদু’টোর মতোই তার ব্যক্তিত্ব উপচে পড়েছে একইভাবে।

টের পাচ্ছি বায়েজিদের ঐ মুহূর্তের প্রবল হীনম্মন্যতা আমার চোখে এক প্রকার ঝাঁঝালো আলো ফেলতে শুরু করছে, চোখ জ্বালা-পোড়া শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। বন্ধু কাবিরকে মিস করছি খুব, কারণ সিরিয়াস গল্পে মশকরা যোগ করার আশ্চর্য ক্ষমতাটা তারই ছিল। শুনতে পাচ্ছি ‘বায়েজিদ ভাই’ বলে এখনও কে যেন ডেকে যাচ্ছে পেছন থেকে। আমি সেই কণ্ঠস্বর অনুসরণ করে ঘুরে তাকাতেই দেখি একজোড়া ভীষণ পরিচিত চোখ আমার দিকেই তাকিয়ে আছে সোজাসুজি।

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares