পদশোভা সু-স্টোর : বাশিরুল আমিন

কড়া দুপুর। এখন ব্যবসায়ীদের ভাতঘুমের সময়। প্রায় সবক’টি দোকান বন্ধ। নিপাট-নীরব। কোন হৈ-হল্লা নেই, হাঁকডাক নেই। জুলাইয়ের খাঁ খাঁ রোদে বাজারটা যেন খানিকটা বিশ্রাম নিচ্ছে। গ্রামের বাজার এ রকমই। সকাল সন্ধ্যায় তারা প্রাণোচ্ছল থাকে আর দুপুরটা জিরিয়ে নেয়। কেবলমাত্র হরমুজের চায়ের দোকানটায় লোকজনের আনাগোনা থাকে। এক কোণে তাস  পেটায় বেকার যুবকরা, আরেক কোণে ওসমান বয়াতিকে নিয়ে ছোটখাটো একটা জলসা বসে। সময়টা নিরিবিলি থাকে বলেই বয়াতি গলা মেলে গান ধরেন, মারেফতি বেদ নিয়ে আলাপ তোলেন। অকাল প্রয়াত গুরুদের স্মৃতি রোমন্থন করেন। আরও কত শত বিষয় নিয়ে তার বয়ান-বর্ণনা চলে। তার এসব কথা বিমুগ্ধ হয়ে শোনে  গ্রামের মানুষ। তাঁর দিকে খুব শ্রদ্ধাভরে অপলক তাকিয়ে থাকে শ্রোতারা, যেন তিনি এক মহান কিতাব।

চুল-দাড়ি সাদা হয়ে আসা নিঃসঙ্গ মানুষ ওসমান বয়াতি। ঘর-সংসার নেই। বিয়ে থা করেননি। ঘরছাড়া বিবাগি না হলেও পুরোদস্তুর বাউলের জীবন যাপন করেন। পিছুটানহীন। তেল চিকচিকে কালো পেটানো শরীর। হাতের পেশিগুলো কুস্তিগিরের মতো সুঠাম আর উত্থিত বক্ষ। শরীরের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে অতি সামান্য। চোয়ালের প্রায় সবক’টি দাঁত এখনও বর্তমান। গলায় যে স্বর আছে তাতে মাইকের কাজ চলে যায়। যদিও আসর ছাড়া তার কণ্ঠে বরাবরই একটা গাম্ভীর্য বিরাজ করে। খুব ধীর লয়ে রয়ে সয়ে কথা বলেন। বয়স তার চুল দাড়িকে কাবু করতে পারলেও শরীরটাকে তেমন একটা কমজোর করতে পারেনি। তবে  তার একটি পা নেই। বাম পা-টা আছে আর ডান পায়ের জায়গা দখল করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত ক্রাচ। পাÑটা হারিয়েছেন যুদ্ধে। থাক; সে এক দীর্ঘ গল্প।

যুদ্ধ থেকে ফিরে ভাইয়ের সাথে থাকতেন, ভাই মরার পর থাকেন ভাতিজার সাথে। থাকা বলতে গেলে শুধু রাত কাটানোটাই। দিনে ক্রাচে ভর দিয়ে এদিক-ওদিক শিষ্যদের বাড়ি, চায়ের টঙ আর বাজার ঘাটেই হেঁটে-চ’লে খান।  শীতকালে উরসমেলা আর বাউল গানের আসরে তার দিন-রাত কাটে। পুরো দেশ ঘুরে বেড়ানো লোক। আয় রোজগার মন্দ হয় না। এক পেট চালাতে আর কতটুকুই বা লাগে। কয়েক কাপ চা আর হাকিমপুরি জর্দ্দা সমেত খিলি দশেক পান হলে তাঁর সারাটা দিন চলে যায়। ভাত-মাছ তার কাছে মুখ্য কোনো বিষয় নয়। শরীরটাকে সেভাবেই পোষ মানিয়ে নেওয়া। দেহতত্ত্বের ব্যাপারে তার রয়েছে অগাধ জ্ঞান। সকালে এসে যে হরমুজের স্টলে বসেছেন এখনও ওঠার নাম গন্ধ নেই। সকাল গেল, দুপুর গেল তেমন কোনো খানা খাদ্যও খাননি। পান আর চায়ের ওপরই চলছে। সিগারেট বিড়িতে নেশা নেই তার। কেউ সাধলে না করেন না। সাধা জিনিস ফেলতে নেই বলেই হয়তো তিনি খান।

 বৈদ্যুতিক পাখায় আর কাজ হচ্ছে না, গরমে সবাই হাঁসফাঁস করছে। ফলে আড্ডাটা মিইয়ে আসছে। দুয়েকজন উঠে বাড়ির দিকে রওনা হলো। আড্ডা ভেঙে উঠবেন বলে  দেয়ালের সাথে ঠেস দেওয়া ক্রাচটা হাতে নিলেন ওসমান বয়াতি। ক্রাচটা বগলে রাখবেন এমন সময় কোরবান আলি বললোÑ ‘খই যাইতা বয়াতি ছাছা… চলোউক্কা এসিওয়ালা দোকানটা দেইক্কা আই… মাগনা মাগনা থুড়া বাতাস খাইয়া আইলাম।’ ‘নারে বা আরেকদিন যাইমু নে, আজকে বাদ দেও’ বলে অনীহার কথা জানালেন বয়াতি। কিন্তু একরকম জোর করেই বয়াতিকে নিয়ে বাজারের দক্ষিণ কোণে সদ্য চালু হওয়া অভিজাত জুতার দোকান পদ শোভা সু-স্টোরের দিকে রওনা হলো কোরবান আলি। বাজারে এই একটি মাত্র ঘর যেখানে এয়ারকন্ডিশন আছে। এই তপ্ত দুপুরে এসির একটু ঠান্ডা হাওয়া খেতে অনেকেই এই দোকানে উঁকি ঝুঁকি দেয়। বাচ্চারা থাইয়ের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, দরজা খুললে একটু শীতল হাওয়া বের হয়ে তাদের শরীরে যদি আদরের মতো বুলিয়ে যায়। সপ্তাহ দুয়েক ধরে বাজারের একমাত্র বিশিষ্ট দোকান হয়ে সবার সমীহ পাচ্ছে পদশোভা সু-স্টোর। কৌতূহলের শেষ নেই এই দোকান নিয়ে। কী সুন্দর ডেকোরেশন। ঝা তকতকে জুতার র‌্যাক। সারি সারি স্ট্যান্ডে হরেক রকমের সেন্ডেল। সু-ক্যাটস তো আছেই আলাদা হুক স্ট্যান্ডে। জুতার দোকানের বুঝি এত বাহারি সাজ হয়! না দেখলে বাজারবাসীরা তা বিশ^াসই করত না।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোরবানের টানাটানিতে পদশোভা সু- স্টোরের দিকে রওনা হলেন ওসমান বয়াতি। ঠক ঠক পায়ে-ক্রাচে করে বাজারের দক্ষিণ মাথায় চললেন। ভাবলেন এত দামি একটা দোকান হলো বাজারে আর তিনি একটিবারের জন্যও গেলেন না। তা তো বেমানান। তাছাড়া দোকানটি বাজারের শান-শওকত বাড়িয়েছে অনেক; এ হিসেবেও তো দোকানটিকে এক নজর দেখে আসা দরকার। অনেক দিন হতে চলল জুতা কেনেন না, এই ফাঁকে এক জোড়া জুতাও কিনে নেবেন বলে মনস্থির করলেন।

দোকানের বাহিরে রাখা পাপুশের পাশে বা-পায়ের জুতাটি রেখে ক্রাচে ভর দিয়ে পদশোভা সু-স্টোরে ঢুকলেন বয়াতি। পেছনে পেছনে কোরবান আলি। দোকানে ঢুকতেই ঠান্ডা একটা বাতাসের ঝাপটা খেলেন তারা, যেন হু হু করে শরীরে ঢুকছে মেঘালয় থেকে নেমে আসা মাঘের শীত। ক্যাশে বসে থাকা এক সুশ্রী যুবক তাকে সালাম দিয়ে সেলসম্যানকে চেয়ার এগিয়ে দিতে বলল। তার এই সম্ভাষণে বয়াতি খুব আপ্লুত হলেন। ধারণা করলেন ছেলেটি তাকে ভালো করে চিনতে পেরেছে। কিন্তু তিনি তাকে চেনেননি। পুরো এলাকা চষে বেড়ানো লোক বয়াতি। তাকে চেনে পুরো জেলার মানুষ, তিনিও দশগ্রামের মানুষ চেনেন অথচ এই ছেলেটিকে চিনতে পারলেন না। ভিনদেশি কেউ নাকি! এই বাজারে দূর থেকে কে-ই বা ব্যবসা করতে আসবে। পরক্ষণে নিজের বেখেয়ালিপনা আর অজ্ঞতাকেই দুষলেন। আজ দু-সপ্তাহ হলো দোকানটি উদ্বোধন হয়েছে অথচ তিনি তার বিস্তারিত কিছুই জানেন না। মালিক কে?  আর কারাই বা এটা চালাচ্ছে। এমন হলে হয়। গ্রামে থেকে যদি এরকম অপরিচিতি আর অজানার ঘটনা ঘটে তবে তো নিজেকেই ধিক্কার দেওয়া দরকার।

চেয়ারে বসতে বসতে শরীরটা জুড়িয়ে গেছে বয়াতির। যেন হাবিয়া দোজখ থেকে ছায়া-শীতল কোন রাজ-বাগিচায় ঢুকলেন। চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন পুরো দোকান। আহা কী আলোকোজ্জ¦ল ঘর, চারদিকে বিভিন্ন রঙের  জুতোগুলো যেন হেসে উঠছে। নিজের একমাত্র পায়ের দিকে দৃষ্টি গেল। অনেকদিন পর ডান পায়ের শূন্যতা অনুভব করলেন। ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। ডানপা-টা থাকলে কতই না ভালো হতো আজ। এখান থেকে সবচে সুন্দর জুতাটি কিনে হনহন করে হাঁটা দিতেন উত্তরে। একদম গারো পাড়ায় অথবা অন্য কোথাও।  জুতা কিনবেন বলে উঠে দাঁড়িয়ে কোরবানকে বললেন:

আয় ব্যাটা আইজ জুতা দেখি, আমার লাগি সবচে সুন্দর জুতাখান ছয়েজ করবে, বুজ্জছনি  বে?

তুমি আর সুন্দর জুতা দি কিতা করতায়? ঠ্যাঙ অইল এক্কান, ইকানও কবরের পথে। জুতা একখান অইলেও অয়… বাদ দেও…

না বে, কয়দিন আর বাঁচমু সাধ-আল্লাদ ফুরাইলাই!

ইকান তাকি অতো দাম দি জুতা না কিনিয়া অন্য কোনান তাকি লইবায় নে।

ফকেটো ফয়সা আছে, কিনি লাই এক্কান…

আরও  কয়েকবার নিজের একমাত্র পায়ের দিকে গভীর মনোযোগে তাকালেন ওসমান বয়াতি। একবার নিজের পা দেখেন আরেকবার জুতা দেখেন। ডান পা-টার জন্য আফসোস হয়… নিজের ভুলের কারণেই হারাতে হলো পা-টা। ৭১-এর কার্তিকমাস। ৫নং সেক্টরে যুদ্ধ করে বেড়াচ্ছেন বয়াতি। হঠাৎ খবর এলো পাকিস্তানিরা সুরমা নদী পেরিয়ে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে ক্যাম্প করেছে। সাব-সেক্টর কমান্ডার রাত দশটায়  হঠাৎ ঘোষণা দিলেন অপারেশনে যাবেন আজ রাতেই। তিনি নাকি কাল রেকি করে এসছেন। যেই কথা সেই কাজ। সব জোগাড় যন্ত্র করে ঘণ্টা খানেকের ভেতর প্ল্যান ফাইনাল করে রওনা হলো ২০ সদস্যের এক গেরিলা দল। হাওরের মাঝ বরাবর। ধানক্ষেতের বাতার ধরে।

রাত তিনটায় ক্যাম্প ঘেরাও করে গেরিলা হামলা চালাল মুক্তি ফৌজ। অপ্রস্তুত পাক বাহিনীকে নাজেহাল করে ছাড়ল। কথা ছিল উপর্যুপরি গুলি আর গ্রেনেড ছুড়ে আবার হাওর হয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু অপারেশনের শেষের দিকে পাকিস্তানিরা রি-এটেম করলো। পাকিরা চেষ্টা চালাল ঘুরে দাঁড়ানোর। মুক্তিদের কয়েকজন শহিদ হলো। জীবিতরা ক্ষিপ্রতার সাথে সরে পড়লো পিছনে কিন্তু বয়াতি দলছুট হয়ে  গেলেন। সবাই তাকে রেখে চলে গেছে। তিনি একদমই একা। তার পাশে যে ছিল সে স্পট ডেড। ফেরার পথ হারিয়ে ফেললেন। গামছা দিয়ে এলএমজিটা প্যাঁচিয়ে এক গ্রামে ঢুকে পড়লেন। রাতের শেষ। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি। পা আর চলে না। ক্ষুধায় পেট চু চু করছে। ফজরের আজানের সময় একা একা গিয়ে হাজির হলেন এক বাড়িতে।  বিশাল পাকা বাড়ি। সুনসান নীরবতা। হঠাৎ এক যুবককে দেখলেন বদনা নিয়ে টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসছে। তার কাছে আশ্রয় চাইলেন। আশ্রয় পেলেন। সেই সাথে কিছু জল খাবারও পেলেন। বাড়ির বাংলা ঘরে তাকে জায়গা দেওয়া হলো। খুব ঘুমালেন।

দুপুরের দিকে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল বয়াতির। দরজা খুলে দেখেন বাড়ির মালিক যুবকটি ক’জন পাকিস্তানি আর্মি নিয়ে দরজার সামনে টুল পেতে বসে আছে। তাকে দেখেই ঠা ঠা করে হেসে উঠল। যুবকটিকে পা’ক আর্মিরা বললÑ ‘সা’দাত! ভাই তু নে কামাল কর দিয়া! বহুত দিনকে বাদ শিকারকি মুলাক্বাত পায়া!’ যুবকটি ‘জি ছাহেব, আপকা খুশ নছিব’ বলল। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো বয়াতির। এলএমজি আছে ঠিক-ই। কিন্তু গুলি যে নাই! বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করলেন। বিখ্যাত সা’দত রাজাকার আর পাকিস্তানি আর্মির দল তাকে পিছমোড়া বেঁধে ক্যাম্পের দিকে রওনা হলো। সুরমার পার ঘেষে হেঁটে চললো তারা। সুরমার উঁচু আর খাড়া পার। এপাশটায় চর নেই। বয়াতি ভাবলেন দুই পা এগিয়ে লাফ দিলেই সরাসরি পানিতে পড়ে যেতে পারবেন।

ক্যাম্পে নিয়ে তাকে অত্যাচার করে মুক্তিবাহিনীর যাবতীয় তথ্য আদায় করার চেষ্টা করবে। বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে। তার চেয়ে নদীতে পড়ে মরা ভালো।  আচমকা দৌড়ে গিয়ে নদীতে লাফ দিলেন ওসমান বয়াতি। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেল রাজাকার সা’দত আর পাক আর্মিরা। নদীতে নামার সাহস না পেয়ে তারা বয়াতিকে লক্ষ্য করে নদীর পানিতেই ব্রাশ ফায়ার করলো। বয়াতির ডান-পাটা ঝাঝরা হয়ে গেল। হাত দু’টি বাঁধা। কেবল পা দিয়ে ডুব সাঁতার দিচ্ছিলেন। এখন ডান পা’টাও অকেজো। স্রোতের পানিতে রক্ত দেখে বয়াতিকে মৃত ভেবে আর্মিরা চলে গেল। এশার সময় বয়াতি নিজেকে অচেনা এক ঘরে আবিষ্কার করলেন। ইসলামপুরের এক জেলে তাকে উদ্ধার করেছিল।

জুতা দেখতে দেখতে স্মৃতি কাতর হয়ে গিয়েছিলেন বয়াতি। ডান পা-টা কেটে দেওয়ার পর অনেকদিন পর্যন্ত ঘুমালে তার মনে হতো ডান পা-টা আছে। এমনকি অস্তিত্বহীন ডান পায়ে মশার কামড় পর্যন্ত অনুভব করতেন। পা-হারিয়েছেন আজ ৪৭ বছর। এখন আর ডান পায়ের শূন্যতা তেমন একটা অনুভব করেন না। তবে আজ করছেন। অন্তত ভালো এক জোড়া জুতা পড়ার জন্য হলেও দু’টো পা থাকা দরকার ছিল।

কোরবান আলির সাহায্য নিয়ে এক জোড়া চামড়ার স্যান্ডেল পছন্দ হলো তার। বেল্টওয়ালা কালো রঙের স্যান্ডেল। দাম ২২০০ টাকা। একদাম। এই প্রথম তিনি এত দামে জুতা কিনছেন। এত দামে জুতা কিনেও একটা জুতা তার ফেলে দিতে হবে অথবা মুচিকে দিয়ে দিতে হবে। ভেবে খুব আক্ষেপ হলো। জুতা অর্ডার করে প্যাকেটজাত করার কথা বলে ক্যাশের সামনে গিয়ে বসলেন বয়াতি। তাকে আর কোরবান আলিকে চা-বিস্কুট দেওয়া হলো।

ক্যাশে বসে থাকা থাকা সুশ্রী যুবকের সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলেন;

কিতা বা ছাছা! তোমারে চিনলাম না… বাড়ি কোন জায়গাত?

অউতো ছাতক, নোয়ারাই

তে তো তোমার বাড়ি বেশি দূর নায়? কার কিতা লাগো তুমি?

জি না, ইন তাকি তো ঘণ্টা খানিকের রাস্তা! আমি সা’দত লন্ডনির নাতি?

সা’দত লন্ডনি?

জি, তাইন ৭১ এর পর লন্ডন গেছলা। আমরা গাউর প্রথম লন্ডনি… ছিনইননি?

বয়াতির মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। এই ছেলে তবে সা’দত রাজাকারের নাতি। তার এই পায়ের হন্তারক। আজ এতটা বছর পর তার খোঁজ পেয়েছেন। ভেতরে তার তুমুল ঝড় বয়ে যায়, প্রতিশোধের আগুন দাউদাউ করে জ¦লে ওঠে।  কিন্তু বুঝতে দেন না কিছুই। দীর্ঘ একটা নিঃশ^াস ছেড়ে বলেন;

হে ব্যাটা এখন কই বা, দেশো আইন্নানি?

জি অয়, এখন আইন। ইবার  চেয়্যারমেনিত উবাইতা!

এখন কিতা বাড়িত নি? না লন্ডন?

জি না, বাড়িতও আছইন।

জুতা প্যাকেট করে বয়াতির হাতে এনে দিল সেলসম্যান। দাম পরিশোধ করবেন এমন সময় কোরবান আলিকে বললেন, প্যাকেট খুলতে। বয়াতি শুধু বাম পায়ের জুতাটা নেবেন, ডান পায়েরটা নেবেন না। দামও দেবেন অর্ধেক অর্থাৎ এক জুতার দাম দেবেন।

ক্যাশে বসা যুবক মানতে নারাজ। জু’তা একটা নেন আর দু’টা, দাম দিতে হবে পুরো দুইটারই। একটা করে কোথাও যে জুতা বিক্রি হয় না তা বারবার বলতে লাগলো। বয়াতিও নাছোড়বান্দা জুতা সে একটাই নেবে। একটাই তার দরকার। দামও দেবে একটার। বিক্রেতা যুবক প্রশ্ন করল অন্য জুতাটি তবে কার কাছে বিক্রি করবে সে? বয়াতির উত্তর সে ব্যবস্থা হবে। কাস্টমার পাওয়া যাবে। কাস্টমার না পাওয়া গেলে তিনি ব্যবস্থা করে দেবেন। তবুও অযথা ডান পায়ের জুতাটি নেবেন না। দামও দেবেন না। একবার বিক্রেতা তার কাছ জুতা না বেচার কথা বলেছিল- তিনি উন্মাদের মতো ক্ষেপে গিয়েছিলেন। তার চিৎকারে লোক জড়ো হয়।

একটা  হৈ হুল্লোড় বাঁধিয়ে দিলেন বয়াতি। সে একটা জুতা নেবে, দামও দেবে একটার। চিল্লা-ফাল্লা শুনে ইতোমধ্যে দোকানে আরও অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। অনেকেই বয়াতিকে পুরো জুতা-জোড়ার দাম দেওয়ার অনুরোধ করল। কিন্তু বয়াতি অনড়।  গোঁ ধরে বসলেন, একটি জুতা ছাড়া তিনি উঠবেন-ই না। তার পাগলামির কারণেই হোক আর লোক জমায়েতের কারণেই হোক বিক্রেতা শেষতক একটির দাম রাখতে বাধ্য হলো। আর অপর জুতাটি রেখে দিল।

ডান পায়ের একটি বেজোড় জুতা পদ শোভা সু-স্টোরের এক কোণে পড়ে রইল অসহায়ের মতো ।

দু’দিন পরের নিরিবিলি দুপুরে পদশোভা সু-স্টোরের যুবক মালিকের কাছে বাড়ি থেকে ফোন এলোÑ ‘সুরমা নদীতে নিজের কার্গোজাহাজ দেখতে গিয়ে পা হারিয়েছে তার দাদা সা’দত লন্ডনি। কে বা কারা যেন তার একটা পা কেটে ফেলেছে। কার্গোর লেবাররা তাকে গাড়ি করে সিলেট নিয়ে যাচ্ছে।’ এইটুকু জানান দিয়ে ফোন কেটে গেল।

একটু সময় শোকাহত থেকে দোকানের এক কোণে পড়ে থাকা ডান-পাটি জুতার দিকে অপলক চেয়ে রইল যুবক। একটু পরপর একে ওকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছেÑ দাদুর কোন পা কাটছে? ফোনের ও প্রান্ত থেকে কোনো সদুত্তর না পেয়ে আবার অন্য কাউকে ফোন দিচ্ছে- দাদুর কি ডান পা কাটা গেছে? ডান পা?

 কে কাটলো? কেন কাটলো? আর কীভাবেই কাটলো তার দাদার পা এসব কিছুই তার মাথায় আসতেছে না। যুবকের মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে দাদুর কোন পা কাটা গেছে? বাম-পা না ডান-পা।

দোকানের কোণে অসহায়ের মতো পড়ে থাকা জুতাটির শেষতক কি একটা গতি হবে!

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares