রশীদ হায়দার : জীবন ও সাহিত্য : চৌধুরী শাহজাহান

প্রধান রচনা : বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত চার কথাসাহিত্যিক

[কথাশিল্পী রশীদ হায়দার কথাসাহিত্যে অবদান রাখার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০১৪), হুমায়ুন কাদির পুরস্কার, পাবনা জেলা সমিতি স্বর্ণপদক, রাজশাহি সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০ : ৫টি উপন্যাস, ৩টি প্রায়োপন্যাস, ৯টি গল্পগ্রন্থ, স্মৃতি ৭১ (১৩ খণ্ড), ৩টি মৌলিক নাটকসহ ৭০টি]

রশীদ হায়দার নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন ১৯৬২ সাল থেকে। মন-মেজাজে, ঘুমে-জাগরণে আপাদমস্তক কবি বলে মনে হলেও গদ্যই রশীদ হায়দারের লেখার পরিশীলিত ও ছন্দোময় মাধ্যম। কবিতায় নয়, গদ্যেই নিজেকে সমর্পণ করেছেন। কথাশিল্পী ও সম্পাদক হিসেবে সমধিক পরিচিত।  তিনি সমকালমনস্ক, বাংলা-বাঙালি, মুক্তচিন্তা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন একজন বর্ষীয়ান লেখক। কথাসাহিত্য তাঁর পছন্দের এলাকা। কথাসাহিত্যের মাধ্যম যেহেতু গদ্য, তাই গদ্য নিয়ে রয়েছে তাঁর নিজস্ব-একান্ত ভাবনা। তিনি বলেন, ‘গদ্য লেখা হচ্ছে পাথরে শাবল চালানোর মতো কাজ। এটা ছেলেখেলা নয়। লেখককে পড়তে হবে, লেখককে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধি করতে হবে। লেখককে অনেক শ্রম দিতে হয়। লেখকদের নিয়মিত লেখার অভ্যাস থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত লেখার চর্চা না থাকলে সম্ভাবনাময় লেখকও হারিয়ে যায়।’ কথাসাহিত্যে উপন্যাস সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় এবং ছোটগল্প এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বস্তুত সাহিত্যের এই দুটি শাখার ঐতিহ্য আমাদের বেশি দিনের নয়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসই সর্বপ্রথম বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে রচিত। ভারতীয় উপমহাদেশে তখন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পূর্ববাংলা সেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের একটি প্রদেশ মাত্র। সেই সময় পূর্ববাংলায় কোনো আলাদা সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছিল না। বিভিন্ন রাজনৈতিক পট-পরিক্রমায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের দেশের সাহিত্যিকরা সাহিত্য রচনা শুরু করেন। সূচিত হয় নবধারার সাহিত্যÑ মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য। রশীদ হায়দারের কথাসাহিত্যে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সফল প্রতিফলন হতে দেখি গর্বিতভাবে।

রশীদ হায়দার ১৫ জুলাই, ১৯৪১ সালে দোহারপাড়া গ্রাম, পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। পুরো নাম শেখ ফয়সাল আবদুর রশীদ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন হায়দার। ডাকনাম দুলাল। পিতার নাম মোহাম্মদ হাকিমউদ্দন শেখ এবং মাতার নাম রহিমা খাতুন। ১৯৫৯ সালে গোপালগঞ্জ ইন্সটিটিউশন থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন এই গুণী লেখক। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় রশীদ হায়দার তখনকার জনপ্রিয় পত্রিকা চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন। সে-সময় তার বড়ভাই জিয়া হায়দার ঔ পত্রিকায় কাজ করতেন। জিয়া হায়দার নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার আগে তাঁর অনুরোধে কর্তৃপক্ষ ছোট ভাইকে তাঁর জায়গায় চাকরিতে নিয়োগ দেন।

১৯৬৪ সালে চিত্রালীর পাশাপাশি পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড-এর মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। তারপর তিনি চিত্রালীর কাজ ছেড়ে দিয়ে রিসার্চ সহকারী হিসেবে যোগ দেন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ত্রৈমাসিক পত্রিকা কৃষি ঋণপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মস্থল ছিল করাচি। একই বছরের নভেম্বর মাসে তিনি বদলি হয়ে ঢাকা চলে আসেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে চাকরি পান। দীর্ঘদিন চাকরির পর ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেন। পরে নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।

রশীদ হায়দার বাংলা একাডেমিতে কর্মরত থাকাকালীন অবস্থায় তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি স্মৃতি : ১৯৭১ । মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে তাঁর সম্পাদিত স্মৃতি : ১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক গ্রন্থ। ১৩ খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বুুদ্ধিজীবীদের স্বজনদের স্মৃতিচারণে সার্থকভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথার পাশাপাশি তাদের স্বজন হারানোর ব্যথা আর স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রামের জীবনকথা। বাংলাদেশের আনাচেকানাচে থাকা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার খুঁজে খুঁজে বের করা এবং তাঁদের পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে স্মৃতিকথা লিখিয়ে নেবার কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। স্মৃতি : ১৯৭১ গ্রন্থের সম্পাদক হিসেবে এখানেই লেখকের কৃতিত্ব।

২০১৩ সালে রশীদ হায়দারের একটি সম্মানজনক গল্প সংকলন দিল্লির ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া সর্বপ্রথম বাংলাদেশের যে দুজন লেখকের গল্প সংকলন প্রকাশ করে, তাঁদের একজন হলেন রশীদ হায়দার। গল্প গ্রন্থটির নাম হচ্ছে বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প। এই সংকলনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রথমে ভারতের আটটি ভাষা এবং পরে আরো ষোলটি ভাষায় অনূদিত হবে।

ছেলেবেলায় তাঁর বাবার স্বপ্ন ছিল তাঁকে মৌলবী বানাবেন। রশীদ হায়দারের নিজের মনের ইচ্ছা ছিল সিনেমা হলের গেটকিপার হওয়া। যখন একটু বড় হলেন তখন সাধ জেগেছিল ট্রেনের চেকার হবেন, যাতে নানান জায়গায় অবাধে বেড়ানো যায়। এখনও ভ্রমণ তাঁর খুব প্রিয়। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও নেপাল  তিনি ভ্রমণ করেছেন। জীবনে তিনি নানা পুরস্কারে সম্মানিত হন। তার মধ্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), একুশে পদক (২০১৪), হুমায়ুন কাদির পুরস্কার, পাবনা জেলা সমিতি স্বর্ণপদক, রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

প্রেম ও বিয়ের ব্যাপারে তিনি অকপট। তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সেই সময় তার এক বন্ধুর ছোট বোনকে কিং সাইজের ফজলি আম দিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিলেন। ছেলেবেলায় বাজারের পয়সা সরিয়ে অজস্র সিনেমা দেখেছেন। কিশোরবেলায় প্রেমকে তিনি দেখেছেন জীবনের অনিবার্য অংশ হিসেবে। তাঁর স্ত্রী আনিসা আখতার পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন, তখন ভালোভাবে তাঁদের জানাশোনা ছিল না। আনিসা আই এ ও বি.এ ক্লাসে ভালো ফল করেননি বলে পড়ালেখায় রশীদ হায়দারের চেয়ে দুই বছর পিছিয়ে ছিলেন। এরপর আনিসা যখন ঢাকায় এম. এ পড়তে আসেন তখন পুরনো দুই সহপাঠীর নতুন করে পরিচয় হয়। এরপর প্রেম এবং শেষে বিয়ে। তিনি মজা করে বলতেন, ‘ওকে, মেঘনাদ বধ পড়াতে গিয়ে দুজনই যে কখন বধ হয়ে গেছি বলতে পারব না।’

রশীদ হায়দার ও আনিসা আখতার দম্পতির দুই মেয়ে। প্রথমটি হেমন্তী হায়দার হেমা এবং দ্বিতীয়টি শাওন্তী হায়দার ক্ষমা। বর্তমানে বড় মেয়েটি গৃহবধূ এবং ছোটটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। রশীদ হায়দারের শখ হলো পড়াশুনা, আড্ডা, ভ্রমণ, টিভিতে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা দেখা এবং তিনবেলা ভাত খাওয়া।

১৯৬৭ সালে ১লা জানুয়ারি প্রকাশিত হয় রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ নানকুর বোধি। বইটির একটি কপি তিনি প্যারিসে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উত্তরে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ জানিয়েছিলেন, ‘থামবেন না, লিখে যান।’

১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন জীবনের প্রথম উপন্যাস গন্তব্যে। অর্ধেক মুদ্রিত হওয়ার পর কোনো এক অজানা কারণে লেখাটি তিনি আর লিখে শেষ করতে পারেননি। ১৯৮৬ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আকারে অসম বৃক্ষ নামে প্রকাশিত হয়।

কথাশিল্পী হিসেবে রশীদ হায়দার পাঠকমহলে সুপরিচিত হলেও তিনি কিন্তু একজন অভিনেতাও ছিলেন। ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় তিন বছরের জন্য লেখাপড়ার সুযোগ পান। তিন মাস ক্লাস করার পর বাংলা একাডেমির চাকরি হারানোর ভয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। কারণ নাটক করে সংসার চালানো সম্ভব কখনও ছিল না। তবে নাটকের প্রতি তাঁর টান রয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেন ভ্রান্তিবিলাস নামে একটি নাটকে কিংকর চরিত্রে। ছাত্রজীবনের শেষেও প্রায় দশ-বারো বছর তিনি নাট্যজগতের সাথে জড়িত ছিলেন। এই সময় অগ্রজ জিয়া হায়দার আমেরিকা থেকে ‘মাস্টার অব ফাইন আর্টস’ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে এসে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় নামে একটি নাট্যদল গঠন করেন। রশীদ হায়দারও অগ্রজের সাথে এই দলে যুক্ত হন। দৈনিক বাংলায় কেরোসিন তেল সংকট নিযে তাঁর লেখা তেল নাটকটি পড়ে নাট্যকার আলী যাকেরের ভালো লেগেছিল। তিনি রশীদ হায়দারকে তেল নাটকটির নাট্যরুপ দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পরবর্তীকালে তৈল সংকট নামে এটির নাট্যরুপ দেন। নাটকটি নাট্যবোদ্ধামহলে যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল। কিন্তু তিনি অনুভব করেন মঞ্চের সাথে যুক্ত থাকলে তাঁর স্বাভাবিক লেখালেখির কাজে সমস্যা হবে। তাই নাটক ছেড়ে কলমকেই তিনি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেন। সুদীর্ঘ লেখালেখির জীবনে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও ঘটনার ঘনঘটায় তাঁর জীবন পরিপূর্ণ। তিনি গল্প, উপন্যাসের উপাদান খুঁজে পান নিজের জীবন ও স্বদেশে ঘটে যাওয়া নানান বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে।

রশীদ হায়দারের গল্প-উপন্যাস-নাটক -অনুবাদ-নিবন্ধ-স্মৃতিকথা ও সম্পাদনা মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০-এর অধিক।। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলো হলো- উপন্যাস: খাঁচায় (১৯৭৫), অন্ধ কথামালা (১৯৮২), নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য (১৯৮২), অসম বৃক্ষ (১৯৮২), নদী ও বাতাসের খেলা, তিনটি প্রায়োপন্যাস; গল্পগ্রন্থ : নানকুর বোধি (১৯৬৭), অন্তরে ভিন্ন পুরুষ (১৯৭৩), তখন (১৯৮৭), উত্তরকাল (১৯৮৭), পূর্বাপর (১৯৯৩),  মেঘেদের ঘরবাড়ি (১৯৮২), বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প (২০১৩), মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প (২০০৫), আমার প্রেমের গল্প (১৯৮৮), খুঁজে ফিরি, সীমা পরিসীমা, বাবার গল্প, গন্তব্যে; কলাম: আত্মকথন, তিনি একজনই, ছবি অপরূপ, চিস্বুকের নিচে আলোর প্রভা, বাঙালির তীর্থভূমি; নাটক : সেক্সপীয়র দি সেকেন্ড (১৯৮৫), তৈল সংকট (১৯৭৪), গোলাপ গোলাপ; অনুবাদ নাটক: কাফকার দ্য ট্রায়ালের নাট্যরূপ-কাঠগড়া; বিবিধ: বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা (জীবনী), অসহযোগ আন্দোলন : একাত্তর (১৯৮৫) (গবেষণা), রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল (প্রবন্ধ), একুশের গল্প (সম্পাদনা), ও বেলা এ বেলা (স্মৃতিকথা), অদ্বিতীয়া ডলি (স্মারকগ্রন্থ), শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ, স্মৃতি :৭১ (১৩ খন্ড), ১৯৭১ : ভয়াবহ অভিজ্ঞতা; কিশোর উপন্যাস: শোভনের স্বাধীনতা (২০০০), যুদ্ধ ও জীবন, আমার স্কুল, পুনর্জন্ম , যদি দেখা পাও , জসীমের নকশি কাঁথা, গোলাপের জন্ম ইত্যাদি।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের অস্তিত্বের সংকট এবং চেতনার অন্তর্দ্বন্দ্বের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে রশীদ হায়দারের খাঁচায় উপন্যাসে। শহরে অবরুদ্ধ জাফরের মানসিক অবস্থার মধ্যে মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘সমস্ত অনুভূতি নিষ্ক্রিয় হয়ে রাস্তার মতো হয়ে গেছে, যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা, খাঁচাটা আরো সঙ্কুচিত হয়ে আসছে. খাঁচার চারপাশে উদ্যত মারণাস্ত্র।’১ খাঁচায় বন্দি একটি টিয়া পাখির প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক শাসন মুক্তির প্রবল বাসনা। অধ্যাপক তাহের, জাফর, আতিক, বাদল, আবেদ, রওশন, রুহুল আমিন, লিলি, লুৎফর, ফিরোজ, মন্টু প্রভৃতি চরিত্রকে কেন্দ্র করে একাত্তরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিবেশের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার ভাষণ, পঁচিশে মার্চের ভয়াল রাত এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে তাদের ধারণা একেবারেই অজানা। ‘পঁচিশে মার্চের পর থেকে যে যুদ্ধের জন্ম, তা এতো আকস্মিক ও অভাবনীয় যে কিছুই বুঝা গেল না প্রথমে, পরে জানা গেল তা ছিল অনেকটা একতরফা এবং পরে ছড়ানো ছিটানো প্রতিরোধ, যুদ্ধের বিশালত্ব বা ব্যাপকতা নেই তাতে।… পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর কাপুরুষোচিত আক্রমণের ধাক্কাটা সামলে উঠে মানুষ যখন শত্রু বিতাড়নে উদ্বুদ্ধ হলো, তা হলো বিরাট জনজীবনের আড়ালে। বৃহত্তর জনগণ জানে, মুক্তির জন্যে প্রতিশোধ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সুসংবদ্ধ চিত্র মানুষের চোখের সামনে নেই। দুই বিরুদ্ধ পক্ষের প্রত্যক্ষ যুদ্ধ যে কি ভয়াবহ, তা জাফর কেন, তাহের সাহেব বা ভাইও জানে না।’২  কিন্তু এই চরিত্রগুলিই ক্রমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে একাত্ম হয়ে অনুভব করেছে সারাদেশের মুক্তিসংগ্রামের হৃৎস্পন্দন। ‘চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে কি আমূল পরিবর্তন, জাদুর কাঠির স্পর্শে একটা মৃত্যু-পথযাত্রী জাতি জেগে উঠেছে।’৩ তারা দেখেছে অবাঙালি পাকিস্তানি সৈন্যদের সৃষ্ট সন্ত্রাস, সেই সাথে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ক্রমাগ্রসরতা। বাদশা, আবেদ, লুৎফর যুদ্ধ করেছে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে। জাফর প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ না নিলেও কাহিনিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে সে। স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রচারিত খবর তাকে উৎসাহিত করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে। জাফরের স্ত্রী লিলির পালিত টিয়ার পাখা ঝাপটানোর শব্দে সচকিত জাফর তাদের শৃঙ্খলিত অবস্থানকে উপলব্ধি করে মুক্তির জন্য অধীর হয়ে উঠেছে। এ উপন্যাসে রশীদ হায়দার হানাদার কবলিত বাংলাদেশকে খাঁচার প্রতীকে চিত্রায়িত করেছেন। আবার কখনও মনে হয়েছে ইতিহাসের অধ্যাপক তাহের, জাফর, লিলি, মন্টুসহ পুরো পরিবার যে বাড়িতে অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেÑ এ বাড়িটাই আসলে একটা খাঁচা। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করতে না পারায় জাফর আত্মগ্লানিতে ভোগে যা মধ্যবিত্ত শ্রেণীচরিত্রেরই একটি বৈশিষ্ট্য। যেমন- ‘ওরা মুক্তিবাহিনীতে। হঠাৎ জাফরের সোনার টুকরা বলে মনে হয় ওদের ; না খেয়ে না দেয়ে দিনের আরাম রাতের ঘুম হারাম করে স্টেনগান কাঁধে যুদ্ধ করছে, ওদের স্পর্শে দেশের মাটি ধন্য, ওরা যেন নক্ষত্রের মতো অনন্ত ও দীপ্যমান। নিজেকে বড্ড ছোট লাগে ওদের তুলনায়।’৪ ধারাবাহিক রাজনৈতিক পট-পরিক্রমের মাধ্যমে উনসত্তরের গণ-আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও উপন্যাসটিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের তেমন কোনো আদর্শ বা চেতনার পরিণতি পায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে লিলির পোষা পাখি টিয়ার শৃঙ্খল মুক্তির মাধ্যমে প্রতীকী হয়ে ধরা পড়েছে স্বাধীনতার আনন্দ। এই আরোপিত প্রতীকী তাৎপর্য ছাড়া এই উপন্যাসে খাঁচায় আবদ্ধ টিয়া পাখির কোনো অনিবার্যতা সৃজিত হয় নি। নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের আত্মপরতা, স্বপ্নবিলাসের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন এক খণ্ডিত বাস্তবতার রূপায়ণ ঘটেছে। খাঁচায় ও অন্ধ কথামালা উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭১, তবে ঘটনার পূর্বাপর রয়েছে। ঘটনাবিন্যাসে অন্ধ কথামালা যুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পরের পটভূমি, আর খাঁচায় যুদ্ধের শেষ তেরো দিন।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও আবেগের রূপায়ণে রশীদ হায়দারের অন্ধ কথামালা একটি পরিণত শিল্পসৃষ্টি। এই উপন্যাসের নায়ক বেলাল হোসেন একজন শিক্ষিত গ্রামীণ যুবক। তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর চলাচলের গতিকে সীমিত ও প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা ছিল একটি ব্রিজ ধ্বংস করবে তারা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার পূর্বেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোকসেদ কর্তৃক শত্রুপক্ষের কাছে ধৃত হয় বেলাল হোসেন। এই বন্দির অনিশ্চিত জীবন ও মৃত্যুভাবনা এ-উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। সময়ের দিক থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই কাহিনী। কিন্তু ঔপন্যাসিক বেলাল চরিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে একটা জনপথ, তার সমাজ, ব্যক্তির আশা-অকাক্সক্ষা ও সংকটের যে প্রতিচিত্র তুলে ধরেছেন, তা অতুলনীয়। রশীদ হায়দারের অন্ধ কথামালা বিষয়সমৃদ্ধ উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও জীবনের বস্তু সমগ্রতার উপস্থিতি এখানে কম পাওয়া যায়। এই উপন্যাসে যে জনপথ, অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা ও ক্রন্দনের কথা বলা হয়েছে, তা ব্যক্তিচেতনার সুত্রেই গাথা। বেলাল হোসেনের উচ্চারণে আমরা পাই, ‘মোকসেদ, মরে গেলে সহ্য হয়, কিন্তু আসবে-আসবে আসে না-তো এই প্রতীক্ষার মতো যন্ত্রণা আর সয় না রে। গনি জানে না আমি মরে গেছি, নওশের জানে না আমি মরে গেছি, কাসেম জানে না আমি আর ফিরবো না, কিন্তু ওরা দেখিস, আমার ঢিবিটার ওপর বসে দূর, যতদুর চোখ যায় তাকিয়ে থাকবে আর বলবে,‘ দ্যাখতো, দ্যাখতো, আমাদের বেলটুর মত মনে হয় না।’৫ পশ্চিমাদের দোসর এলাকার শান্তিবাহিনীর কমান্ডার যখন বেলালকে প্রশ্ন করে, ‘কিরে, তোর বাংলাদেশের ঠিকানা কোনে?’ তখন তার উত্তরে সে বলে, ‘বলতে চাই, হান্নান তুমি মুখটা খুলে দাও, বলছি বাংলাদেশের ঠিকানা কোথায় : বলতে চাই চোখটা খুলে দিলেই দেখিয়ে দেবো বাংলাদেশের ঠিকানা কোনটা, হাত দুটো খোলা পেলেই তোমাদের আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারবো বাংলাদেশটা আসলে কোথায় অবস্থিত।’ কিন্তু সব খুলে দেওয়া হলেও বেলালের আর বাংলাদেশ দেখানো হয় না। কারণ, ঘাতক হান্নানের হাতে আর সময় নেই।

রশীদ হায়দার গল্পের বিষয়বিন্যাস ও প্রকরণশৈলী সন্ধানে একজন সচেতন শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন। নিম্নবিত্ত- মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না ইত্যাদি বাস্তবচিত্র তাঁর গল্পের প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। নাগরিক জীবন বিশেষ করে মধ্যবিত্তের চিরাচরিত জীবনবৃত্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিচিত্র ঘটনা ও  ইতিহাস তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। রশীদ হায়দারের ছোটগল্পে অন্যতম প্রধান বিষয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের চালচিত্র। পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক লেলিয়ে দেওয়া হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের অত্যাচার-নৃশংসতার পাশাপাশি স্বাধীনতাকামী বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধ, সাধারণ মানুষের জনযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিধৃত হয়েছে তাঁর গল্পে।

রশীদ হায়দারের উত্তরকাল, তখন, পূর্বাপর প্রভৃতি গ্রন্থের গল্পসমূহে কাহিনির উপকরণ হিসেবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধকেন্দ্রিক বিচিত্র ঘটনা ব্যাপকভাবে অঙ্কিত হয়েছে। পাকিস্তান শাসিত পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী বাঙালির যৌথ প্রতিরোধ সংগ্রাম, হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার-হত্যা- নির্যাতন এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার -আলবদরদের অমানবিক নৃশংসতা এবং যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ঙ্কর মৃত্যু প্রভৃতি অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থগুলিতে বর্ণিত হয়েছে। পূর্বাপর গ্রন্থে যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার স্মৃতিময় বর্ণনা এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পরিবর্তিত সময়ে সামাজিক বিন্যাস, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানসহ নানাবিধ অসঙ্গতি স্থান পেয়েছে। একাত্তরে স্বধীনতা বিরোধীরাই উত্তরকালে দেশের নব্য মুক্তিযোদ্ধা সেজে সমাজের হত্যা-কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্তরে ভিন্ন পুরুষ গ্রন্থে গল্পের প্লট ও চরিত্রায়ণে লেখক আবেগময় বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন। এ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে কাহিনি বর্ণনার পাশাপাশি সংলাপরীতির ব্যবহার করেছেন। ‘অচেনা’, ‘পলাতক’, ‘নিষিদ্ধ এলাকা’,‘ জয়’, ‘স্বাদ’ প্রভৃতি গল্পে নাটকীয় ঘটনাবিন্যাসের ফলে চমক সৃষ্টি হয়েছে।  অচেনা গল্পে ইউসুফ সাহেবের গভীর রাতে পুত্রের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ানো এবং পুত্র ও পুত্রবধূর অন্তরঙ্গ দৃশ্যে লুকিয়ে অবলোকনের ঘটনাটি একেবারেই বেমানান। পুত্রবৎসল এবং পুত্রের কল্যাণ কামনায় ইউসুফ সাহেব দ্বিতীয় বিবাহ থেকে বিরত থাকলেও কোনো উদ্দেশ্যে তিনি একা থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা গল্পে শিল্পসম্মতভাবে বর্ণিত হয়নি। ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ গল্পের ঘটনাবিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণে লেখককে শিল্পসফল বলে মনে হয়নি। অন্তরে ভিন্ন পুরুষ গ্রন্থে আঙ্গিক-কল্পনায় আবেগময় ঘটনার প্রাবল্য থাকলেও উত্তরকাল, তখন, পূর্বাপর গ্রন্থে রশীদ হায়দার প্রকরণবিণ্যাসে নিজস্বতা অর্জন করেছেন। উপরে উল্লিখিত তিনটি গ্রন্থের গল্পসমূহের প্রধান বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ। ‘এ কোণ ঠিকানা’, ‘সেই পাখির গান’, ‘এ কোণ গৃহকোণ’, ‘এ কোন সঙ্গীত’, ‘আজ অনামিকা’ প্রভৃতি নামকরণের মধ্যেই রয়েছে স্মৃতি অনুষঙ্গ। ‘এ কোন ঠিকানা’, ‘সাঁকো’, ‘দ্বিতীয়বার’, ‘বাবার দ্বিতীয় গল্প’, ‘মর্ত্যলোক’, ‘আজ অনামিকা’ প্রভৃতি গল্পের কাহিনি উত্তম পুরুষে বর্ণিত হয়েছে। ‘এ কোন ঠিকান’া গল্পে বাসেত, ‘সাঁকো’ গল্পে ‘রাজাকার আব্বাস আলি’, ‘বাবার দ্বিতীয় গল্পে’র কাহিনী বর্ণনাকারী চরিত্রগুলি কথক চরিত্র হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক গল্পগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চরিত্রের স্মৃতিময় উচ্চারণে ও সংলাপে যুদ্ধের ঘটনা চিত্রিত হওয়ায় লেখক কাব্যময় বিশ্লেষণাত্মক পরিচর্যারীতির আশ্রয় নিয়েছেন। ‘এ কোন ঠিকানা’ গল্পে একাত্তরের যুদ্ধের সময় মাজেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নান্টুর বিশ্বাসঘাতকতায় মাজেদ ধরা পড়ে এবং নির্মমভাবে নিহত হয় পাক বাহিনীর হাতে। যুদ্ধোত্তর কালে নিহত মাজেদের ছোটভাই বাসেত হানাদার বাহিনীর সহচর নান্টুকে আমন্ত্রণ জানায় তাদের বাড়িতে। বাসেতের আবেগময় বর্ণনায় ফুটে উঠে লেখকের বিশিষ্টতা :

নান্টু ভাই, বাড়িটার দিকে আপনার ভালো করে তাকানোর দরকার নেই। খুবই সাদামাটা টিনের বাড়ি, রোদ পড়লে ঝিকমিক করে না, চাঁদের আলোয় ঝকমক করে না, বরং মেঘ লাগলে কেরোসিন টিনকাটা কালো চাল আরো বিষন্ন হয়ে যায়।। অথচ গভীর রাতে মেঘশূন্য আকাশে তারাদের উজ্জ্বলতা যখন বাড়ে, একটা মানুষও চলাচল করে না, তখন, ঠিক নান্টু ভাই, তখন আকাশ দেব-দেবীরা নেমে এসে এনামদের বাড়ির চারপাশ ঘিরে এনামের মাকে বলে, মা আপনি কাঁদছেন কেন, আপনার সুফিয়া নেই, আমরা তো আছি। এনামের মা কান্না ভুলে চোখ তুলে তাকায়। দেবীদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী সুন্দরী, যার বয়স সবচেয়ে কম সে এনামের মার বুকে মিশে গিয়ে শিশুর মতো পাগলামি করে, নান্টু ভাই দেখুন তো কী সব আজগুবি কথা। এনামের মাও ‘ওরে আমার পুটুস মনি সুফিয়া, আয় আয় চাঁদ মামা চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যায়’ বলে কিশোরী দেবীকে আদর করে, চুমু খায়। খলখল করে হাসে দেবী। ভুলে যায় এনামের মা, ভুলে যায় সেক্রেটারী ওসমান গণির ছেলে ফারুক দিন দুপুরে তাঁর মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে মিলিটারিদের হাতে তুলে দিয়েছিলো (পৃ. ১৫)।৬

তখন গ্রন্থের নিয়মের নিয়ামত বুড়ো গল্পের আয়তন ছোটগল্পের প্রথাগত ফর্মকে অতিক্রম করে গেছে। উপন্যাস হিসেবে প্রথমে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও লেখক বড় গল্প হিসেবে এটিকে গ্রন্থভুক্ত করেছেন। বস্তুত নিয়ামত আলীর ব্যক্তি চৈতন্যের ক্রমবিকাশ, তার বিশ্বাসের ক্রমরূপান্তরই গল্পটির প্রধান বিষয়। প্রথাগত ধর্মচর্চা থেকে বিরত নিয়ামত আলী এক সময় ধর্মে গভীরভাবে মনোসংযোগ করেন। নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া,  খোদাভীতি, সৎ চিন্তা-ভাবনা প্রভৃতি নিয়ামতকে ব্যাপক পরিবর্তন করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নিয়ামত আলীর আগ্রহ প্রবল। ‘আমাগো যারা কাফের কয় তাগরে মারণের জন্যে যারা আমার বাড়ির ওপর দিয়াই যায়, তাগরেই আমি দেখবার পালাম না।… দেখতে পাইলে দোয়া পইড়া বুকে ফুঁ দিয়া কইতাম, কাফের মাইরা দেখাইয়া দাও এখনো আল্লাহ আছে, রসুল আছে (পৃ.৮২)।’৭ যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ইজ্জত বাঁচাবে তাদেরকে এক নজর দেখতে না পাওয়ার জন্য নিয়ামত আলী ভীষণ কষ্ট পায়। সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধ সারা দেশবাসীর মধ্যে যে প্রাণের জোয়ার বয়ে এনে দিয়েছিল, বৃদ্ধ নিয়ামতের মাধ্যমে লেখক এই গল্পে অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে চিত্রিত করেছেন।

২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনীর আকস্মিক হামলা ঢাকা শহরে ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষ প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। ‘প্রথম দিনে’ গল্পে ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত শহরের দিশেহারা মানুষের অসহায়ত্ব ও অনিশ্চিতের কথা বর্ণিত হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রথম গুলি বর্ষণের মাধ্যমে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়। বাদশার মা রাজারবাগের পাশে গুলবাগ এলাকায় থাকে এবং তার মেয়ে রাবেয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। বাইরে বের হওয়া জীবনের ঝুঁকি জেনেও বাদশা রাবেয়াকে খুঁজতে বের হয়। পথে প্রতিবেশী আকমল সাহেবের সাথে দেখা। তিনি সাবধান করে দিয়ে বলেন, রাস্তায় মানুষ দেখলেই গুলি করে মারা হচ্ছে। বাদশা ভয়ে ফিরে আসে। তিনি আরও বলেন, তাদের পাড়ার কমান্ডার আলতাফকে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে জীপের সঙ্গে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গেছে, যিনি পাকিস্তান নেভিতে কাজ করত এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি ছিল। বিকেলে মা নিজেই রাবেয়াকে খুঁজতে বের হতে চাইলে বাদশা নিজেও যাওয়ার জন্য তৈরী হয়। কিন্তু বাদশার স্ত্রী ফিরোজা তাতে বাধা দেয়। এমন সময় হঠাৎ রাবেয়া তার পরিবারসহ হাজির হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর অতর্কিতে হামলার ফলে ভীত-সন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষের একটি ভয়াল চিত্র এই গল্পে বর্ণিত হয়েছে। যেমন-‘সহসা বাদশার সব চেতনা একসঙ্গে ফিরে আসার পর প্রথমেই মনে হয় গুলাগুলি চলছে সামনের রাস্তায়, সে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে চেঁচিয়ে বলে, ‘ফিরোজা, নেমো এসো।’ অন্ধকারে নামতে গিয়ে খাটের কোণায় গুতো খেয়ে চাপা গলায় আর্তনাদ করে ওঠে ফিরোজা আর তক্ষুনি মা দরজা ধাক্কা দিচ্ছে শুনতে পায়, ‘বাদশা ও বাদশা, ওঠ, ও কিসের শব্দ?’ অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুলে মাকে হাত ধরে মেঝেতেই বসাতে বসাতে টের পায়, মা থরথর করে কাঁপছে।’ (পৃ. ১১)।

রশীদ হায়দারের ‘হাওয়ার মানুষ’ ও ‘দ্বিতীয় বার গল্পেও’ অসহায় মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ফুটে উঠেছে। ‘হাওয়ার মানুষ’ গল্পে ঢাকা শহরে কর্মরত আলম মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শত অনিশ্চিয়তার মাঝেও লোক মারফত গ্রাম থেকে স্ত্রী আয়েশার দুইটি  চিঠি পায়। চিঠিতে সে জানতে পারে যে, আয়েশার সব গহনা চুরি হয়ে গেছে, মিলিটারি বাড়িতে আগুন দিয়েছে ইত্যাদি। প্রবল উৎকণ্ঠায় কয়েকদিন কাটিয়ে এক সময় আলম বাড়ি যায়। খাওয়ার সময় মা উদ্বেগের কথা বলে। ঘরে এসে স্ত্রীর কাছে বিস্তারিত জেনে আলম রেগে যায়। কারণ, মিলিটারিরা যখন বাড়িতে আসে তখন আয়েশা ওসমান পাগলাকে পালাতে বলতে গিয়ে মিলিটারির সামনে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিল। কন্যা বুলুকে নিয়ে কিভাবে যে পালিয়েছে তা সেই জানে। সেদিন ওসমানকে হত্যা করা হয়েছে। চিঠিতে বাড়ির সব সংবাদ জানানো হলেও ওসমান আপনজন নয় বলে কেউ তার মৃত্যুর সংবাদটা জানানোর প্রয়োজন বোধ করে নি। ‘দ্বিতীয় বার’ গল্পে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য পলায়নপর স্বামী, স্ত্রী ও শিশুকন্যার করুণ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। পাবনা শহর আক্রান্ত হলে রকিব, স্ত্রী রুবি ও শিশুকন্যা রত্নাকে নিয়ে নদীর চরে পালিয়ে যায়। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসে। সেখানে তাদের অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে গল্পের নায়ক রাকিবের ভায়ায়-… শহরের পশ্চিম সীমানায় গুলির আওয়াজ। একটি গুলি লাল হয়ে ফিকে অন্ধকার ছিঁড়ে ফুঁড়ে ঊর্ধ্বাকাশে উঠে গেল। আমি তখন রুবীর পেছনে যাওয়া বাদ দিয়ে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ি। তখন বউ-বাচ্চা অর্থহীন  না মহামূল্যবান কিছুই মনে হয় না। যখন উঠি রত্না তখন কাঁদছে।… মাথা নিচু করে ছুটতে ছুটতে মরা কাশের আড়ালে দেখলাম রুবী প্রাণপণে রত্নার কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। মরিয়া হয়ে বলি, রুবী থামাও। কান্না ধরে ওরা ধরে ফেললে আমাদের কী অবস্থা হবে বোধ হতেই প্রথমে আমি, পরে রুবী রত্নার মুখে হাত চাপা দিয়ে ফেললাম।… ভয় হয় বাতাস ধরে-ধরে শব্দ ওদের কাছে পৌঁছলে ওই শব্দই ধরে ধরে ওরা এখানে চলে আসবে। সন্দেহ যায় না। (পৃ.৮৯-৯০) রাকিব ও রুবী ভয় ও উৎকণ্ঠায় রত্নাকে মাঝখানে রেখে পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে রত্নার মৃত্যু ঘটে। শত্রুমুক্ত ঘরে ফিরে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে মস্তিষ্ক বিকৃতিতে রুবী মারা যায় এবং রাকিব সংসারত্যাগী হয়।

যুদ্ধ-বিধস্ত বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড চিত্রিত হয়েছে ‘এ কোন সঙ্গীত’ গল্পের ক্যানভাসে। দুমাস ছয়দিন পর কর্মস্থল ঢাকা থেকে পাবনার গ্রামের বাড়িতে আসে নিজাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সে স্ত্রী-সন্তানকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছিল। রাতে না শুয়ে নিজাম বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখে। পাশে মামাতো ভাই মোস্তফার জ্বালিয়ে দেওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখে সে বিস্মিত হয়ে উঠে। ‘মোস্তফার চার ভিটেয় চারটে করোগেটেড ঘর ছিল, পশ্চিম-উত্তর কোণে গোয়ালঘর ছিল, রান্নাঘরটা ছিল পূর্বকোণায়, তার এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই। চারটে ভিটে… বুক পিঠ মেলে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে।’৮ নিজাম মোস্তফার মুখ থেকেই শোনে তাদেরই বাড়িতে প্রতিবেশী জুলমতকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে। পায়চারি করতে করতে নিজাম গভীর রাতে বিশেষ একটি শব্দ শুনতে পায়। ছোটভাই হাসেম ও কাজেমকে ডেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দেখে জুলমতের মাথার খুলিটা মাটির ওপরে এবং ওটাতেই বাতাস লেগে বিশেষ সুরের (শব্দের) সৃষ্টি হচ্ছে। নিজাম খুলিটা পুঁতে ফেলতে বলে। এই গল্পে নিজামের জবানিতে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ চিত্রিত হয়েছে এভাবেÑ ‘ছোটবেলায় আমরা যেমন একটার পর একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আনন্দ পেতাম, তেমনি ওরা খেয়াল-খুশি মতো বাড়ি-ঘর জ্বালাচ্ছে। ঢাকা শহরের যেখানে-সেখানে পোড়া বাড়ি-ঘর দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল মানুষের ওপর ওদের যতটা রাগ তার চেয়ে বেশী ঘর-বাড়ির ওপর। এটাই কি আল্লাহর বিচার, সাধারণ মানুষ যারা রাজনীতির র-ও বোঝে না তারাই আজ সব কিছু হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গেছে।’৯

রশীদ হায়দারের ‘বিপদের ঘ্রাণ’ গল্পে এক অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধার আত্মগোপন করে সস্ত্রীক পলায়নের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের এস.ডি.ও আফজাল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং তার কর্মকাণ্ডের সুবাদে চারদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে তিনি পাকসেনাদের টার্গেটে পরিণত হন। এক সময় তিনি আত্মপরিচয় গোপন করে পালিয়ে আসেন। পলায়নের সময় ফেরিঘাটে আফজালের স্ত্রী দোলনসহ দোলনের প্রাক্তন প্রেমিক বোরহানের সঙ্গে আতঙ্ক-শিহরিত সময় নির্বাহ এই গল্পের মূল বিষয়। মিলিটারির নাকের ওপর দিয়ে পলায়নের ক্ষেত্রেও মুক্তিযোদ্ধা আফজালের সাহসিকতা দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো।১০ রশীদ হায়দারের ‘নিয়মের নিয়ামত বুড়ো’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের কারণে বুড়ো নিয়ামতের দৈনন্দিন কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটেছে। কিভাবে নিয়ামত যৌবনের বন্যায় ধর্মকর্ম ত্যাগ করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে গ্রামীণ মানুষ হয়ে উঠেছিল এবং বার্ধক্যে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায় নিয়ামত কিভাবে আগের সব নিয়ম মুছে ফেলতে চেয়েছিল প্রবল প্রাণশক্তির টানে, তারই আনুপূর্বিক বর্ণনা এই গল্পে চিত্রিত হয়েছে। ছেলের নিকট মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক সম্পর্কে জেনে বৃদ্ধ নিয়ামতের নামাজের সময় ওলট-পালট হয়ে যায়। যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ইজ্জত বাঁচাবে তাদেরকে একনজর দেখতে না পাওয়ার জন্য নিয়ামত আলী ভীষণ কষ্ট পায়। সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযুদ্ধ সারা দেশবাসীর মধ্যে যে প্রাণ চাঞ্চল্য এনে দিয়েছিল, বৃদ্ধ নিয়ামতের মাধ্যমে রশীদ হায়দার এই গল্পে তা অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে বর্ণনা করেছেন। ‘চেহারা’ গল্পে আশাহত এক মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের দুঃস্বপ্নের বয়ান রূপায়িত হয়েছে সেই পরিবারের এক নারীর বিবাহ না হওয়ার করুণ কাহিনিকে কেন্দ্র করে। স্বাধীনতার পর নির্লজ্জ সুযোগ গ্রহণ মনঃপূত হয়নি বলে মুক্তিযোদ্ধা মজনু বাড়িতে নিশ্চুপ বসে থাকে এবং অলস জীবন-যাপন করে। কিন্তু তার ছোট ভাই রানু দলবদল করে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা হয়ে ছাত্রাবস্থায়ই বেশ টাকা-পয়সা রোজগার করে। বোনের বিয়ের সময় সে বেশ দামি জিনিসপত্র কিনে নিয়ে বাড়ি আসে। মজনুর তাকে অচেনা মনে হয়। ওদিকে বরপক্ষ বাড়িতে এসে মজনুর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান, তাদের বাড়ি আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেয়া এবং সর্বোপরি আর্মির লালসার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পিতা কর্তৃক মেয়ের মুখ আগুনে ঝলসে দেয়া ইত্যাদি বিষয় জানার পর এই মেয়ের সাথে বিয়েতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলে যায়।

এ গল্পে মুক্তিযোদ্ধার আশাভঙ্গের চিত্র ফুটে উঠেছে মজনুকে উদ্দেশ্য করে বলা ছোট ভাই রানুর উক্তিতে। ‘আপনি মাঝে মাঝে এমনভাবে তাকান যেন আমাকে চেনেন না। বুঝি, অনেক আশা নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে জিতলেন ঠিকই কিন্তু আশা পূরণ হল না।’ ১১

রশীদ হায়দারের পূর্বাপর গল্পগ্রন্থের ‘আপনজন’ গল্পের কাহিনি থেকে জানা যায়, ওসমান গ্রামের কোনো এক ব্যক্তির মৃত্যুতে তার বাড়িতে কুলখানির অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। মাওলানা সাহেব অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তব্য দেন ইহকাল ও পরকালের পালনীয় কর্তব্য সম্পর্কে। সেখানে ‘হুর’ আর ‘শরাবান তহুরার’ কথা আসলে ওসমান রসিকতা করে বলে, ‘আমার বাপ মহা পরহেজগার ছিলেন। তিনি নিশ্চয় সত্তুরটি হুর পাবেন, তার উপর আমি যদি বেহেস্তে গিয়ে সত্তুরটি হুরসহ বাপের সাক্ষাৎকার পাই, তাহলে সে হবে এক মহাকেলেঙ্কারী। অতএব আমি স্বর্গে যাবো না।’ বাতেন ক্রুদ্ধ হয়ে ওসমানকে বলে, ‘তুই শালা কম্যুনিস্ট।’ এই অপরাধে ওসমানরা এক বছরের উপর একঘরে থাকে। ওসমান একটু বাঁকা স্বভাবের। তার বাঁকা হওয়ার কারণ পিতার অসময়ে প্রাণত্যাগ। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মুক্তিবাহিনীর দুয়েকটি দলকে আশ্রয় দেওয়ায় পিতাকে নির্মমভাবে মারা হয়। ওসমান তখন শহরের একটি মেসে থেকে লেখাপড়া করতো। ‘বাড়িতে মা রয়েছে পথ চেয়ে, ছোট একটি ভাই রয়েছে আশা করে, দুটি বিবাহযোগ্য বোন, আঁধার রাতে, গভীর রাতে, চাঁদনী রাতে কিংবা অসম্ভব নির্জনতায় নিজেদের জীবনের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।’ ১২

ওসমানের কষ্ট হয় নিয়তির নির্মম খেলা দেখে। ভাগ্য বঞ্চিত মা-ভাই-বোনদের কথা ভেবে বড়লোকি জীবনের প্রতি তার ঘৃণা আর আক্রোশ জন্মে। অথচ কুলখানির সংবাদ পেলেই ক্ষিদের জ্বালায় বড়লোকদের বাড়িতে উপস্থিত হয়। কিন্তু ওসমানের নজর থাকে বড়লোক মানুষের বাড়ির খাবার ও মেয়েমানুষের দিকে। গল্পকার এ গল্পে তীব্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে জীবনের নানা অসাম্য- অসংগতির চিত্র অঙ্কন করেছেন। দারিদ্র্যের শিকার ওসমানের মনের বিকৃতিকে প্রকাশ করেছেন খোলামেলাভাবে। যেমন- ‘ওসমানের তখন হঠাৎ উত্তেজনা-উত্তেজনা করে। জয়াপ্রদা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে এমনভাবে গায়ে গা ঠেকিয়ে শরীরে শরীর ঘেঁষে নাচন-কুঁদন করছিল যে ওসমানের ওখানেই কাপড় ভিজে যাওয়ার অবস্থা। রাতে শোবার পর আবিষ্কার করে জয়াপ্রদা তার চোখের সামনেই পা তুলে পাছা দুলিয়ে ধিন ধিন করে নাচছে। আর স্থির থাকতে পারে না সে। বাথরুমে গিয়ে উত্তেজনা প্রশমন না করা পর্যন্ত অস্বস্তি কাটে না।’ ১৩

রশীদ হায়দারের জীবনাদর্শ চারটি ‘ব’। ‘ব’ চারটি হচ্ছে বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনা, বাঙালির অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের নানা অসঙ্গতি তাঁর কথাসাহিত্যে চিত্রিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। জীবনবাস্তবতার বিচিত্র অনুভূতি শিল্পসম্মতভাবে রূপায়ণ করেন তিনি তাঁর গল্প-উপন্যাসে। রশীদ হায়দারের ছোটগল্পের রূপায়ণ সম্পর্কে বলা যায়, সমাজ জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত মানুষের জীবনকে তিনি তাঁর গল্পে কখনও গুরুগম্ভীরভাবে দেখেছেন আবার কখনও দেখেছেন চটুল রসিকতার বিষয়রূপে। তাই কখনও কখনও তাঁর সাহিত্যে শিল্পজ্ঞানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে তাতে গল্পের স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটে না। এখানেই তাঁর সার্থকতা।

তথ্য সুত্র :

১.           রশীদ হায়দার,খাঁচায়, দ্বি-সং ১৯৮৭, মুক্তধারা, ঢাকা, পৃ.১১৪।

২.          রশীদ হায়দার, খাঁচায়, প্র-প্র. ১৯৭৫, ঢাকা, পৃ. ৪৪-৪৫।

৩.          প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৪।

৪.          প্রাগুক্ত,, পৃ, ৪০।

৫.          রশীদ হায়দার, অন্ধ কথামালা ডি.এম. লাইব্রেরী, , কলকাতা,  ১৯৮২, পৃ.৭৩)

৬.          রশীদ হায়দার, এ কোন ঠিকানা, ‘উত্তরকাল’, ঢাকা, পৃ. ১৫।

৭.          রশীদ হায়দার, নিয়মের নিয়ামত বুড়ো, ‘তখন’, ঢাকা, পৃ. ৮২।

৮.          রশীদ হায়দার,এ কোন সঙ্গীত, ‘তখন’, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ২৪।

৯.          প্রাগুক্ত, পৃ.২৫।

১০. রশীদ হায়দার, বিপদের ঘ্রাণ, তখন, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ৯৪।

    ১১. রশীদ হায়দার,  চেহারা, উত্তরকাল, সঞ্চিতা, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ. ৮০।

   ১২. রশীদ হায়দার, পূর্বাপর, ১ম সং. ঢাকা, ১৯৯৩, ‘আপনজন’, পৃ. ৭৬।

   ১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৪।

ঋণ স্বীকার :

১.           বাংলাদেশের উপন্যাস : বিষয় ও শিল্পরূপ, রফিকউল্লাহ খান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৭।

২.          বাংলাদেশের উপন্যাস : নগরজীবন ও নাগরিক চেতনা, আমিনুর রহমান সুলতান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৩।

৩.          বাংলাদেশের ছোটগল্পে মধ্যবিত্ত জীবনের রূপায়ণ, মো: মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৯।

৪.          বাংলাদেশের ছোটগল্পের শিল্পরূপ, চঞ্চল কুমার বোস, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৯।

৫.          বাংলাদেশের উপন্যাসে জীবন চেতনা, ফরিদা সুলতানা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৯।

৬.          বাংলাদেশের ছোটগল্প : বিষয়-ভাবনা স্বরূপ ও শিল্পমূল্য, আজহার ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৬।

৭.          সারোয়ার জাহান, “স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যের রূপান্তর : বিষয় ও প্রকরণ, প্রসঙ্গ উপন্যাস”, ‘একুশের প্রবন্ধ-৮৮’, বালা একাডেমি, ঢাকা।

৮.          মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের সাহিত্য, আহমেদ মাওলা, মুক্তধারা, ঢাকা, ২০১৫।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares