রাহাত খানের হে অনন্তের পাখি : রেজাউদ্দিন স্টালিন

রাহাত খানের স্কুলের আমি ছাত্র। তা’যে শুধু লেখার অনুরাগ থেকে তা’নয়, বরং তার নিজস্ব জীবন পদ্ধতি আমরা যাকে লাইফ স্টাইল বলি তারও। ১৯৮২ সালে রাহাত খানের সাথে সরাসরি পরিচয়। তারপর ঢাকায় এসে এক দীর্ঘ কবি লেখক সম্পর্ক আর তা’ হলো গুরু-শিষ্যের। ১৯৮২ সালে যশোরের সুহৃদ আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে রাহাত খানকে সুহৃদ সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। সেই সূত্রে যশোরে আমার পরিবারের সাথেও একটা আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ঢাকায় এসে যখন নীনা ভাবীকে দেখলাম তখন নিজের মায়ের মতোই তাকে মনে হলো। নীনা ভাবী খুলনার মেয়ে-আমার মাÑনীনা ভাবীদের সবাইকে চিনতেনÑসব মিলিয়ে রাহাত খানের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক। কিন্তু গুরু শিষ্যের সম্পর্কই প্রধান। যশোরে থাকা কালেই আশির দশকে যখন ইত্তেফাক ভবন থেকে সাপ্তাহিক রোববার বেরুলো-তখন রাহাত খান ছিলেন ঐ পত্রিকার সার্বিক তত্ত্বাবধানে। রোববারেই প্রথম তার সাড়া জাগানো উপন্যাস হে অনন্তের পাখি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হলো। তখন সাপ্তাহিক কাগজের সংখ্যা বেশ কয়েকটি। বিচিত্রাÑরোববার-সচিত্র সন্ধানী একটু পরে বেরুলো সচিত্র স্বদেশ, তার কিছু দিন পর সাপ্তাহিক ‘বিপ্লব’। আশির দশকের এই হলো সাহিত্য সাংস্কৃতিমুখী কাগজের নাম। এই তালিকায় রোববার ছিলো বিচিত্রার পরেই। প্রভাবশালী এবং পাঠক নন্দিত।

সেই তারুণ্যে পড়েছিলাম হে অনন্তের পাখি’। নামের মধ্যে উদাস করা সম্মোধন। আর আধুনিকতা ও ধ্রুপদী শব্দবন্ধের মিশেলে চমৎকার। বইটি যখন ছাপা হলো তখন এবং অবশ্যই এখন আমার হাতে। আরেকটা ভাললাগা এই বইতে কাজ করছে সেটি হলো আমার মাতৃতুল্য নীনা ভাবীকে বইটি উৎস্বর্গীকৃত, নীনা ভাবী না থাকলে রাহাত খান এত প্রেরণা কোথায় পেতেন। কত হতাশা ও দুঃখে নীনা ভাবী রাহাত ভাইকে অভয় দিয়েছেন। কখনো দেখিনি সংসারে অশান্তি করতে। এই সংসার ও সমাজ জীবনের কথা, দুঃখ, বেদনা ও বিজয়ের কথা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হে অনন্তের পাখি উপন্যাসে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও একটা অন্তস্রোতের মতো সুসমন্বিত-ধারাবাহিক জীবনোপাখ্যান। সমাজ ভাঙছে, মানুষ নতুন করে তার অবস্থান বদলাচ্ছে। মধ্যসত্ত্বভোগীরা গুলশান বনানীতে বাড়ি বানাচ্ছে। নরনারীর সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। পুরানো সেই সংসার ভেঙে গড়ে উঠছে নতুন বিশাল ভবন ইমারত। আগে যা ছিলো সমাজের চোখে পাপ কিংবা অন্যায় তাই হয়ে উঠছে গ্রহণীয়। মানুষ বদলে যাচ্ছে, তার শ্রেণী চরিত্র বদলে যাচ্ছে কিন্তু চিরায়ত যে মানবানুভূতি তা’ যেন সেই আগের মতোই শতসিদ্ধ রাহাত খান তা’ বিশ্বাস করেন।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। সমাজে প্রতিপত্তি অর্জন করছে। অথচ যারা দেশ মুক্তির জন্য জীবন ও সংসার বিসর্জন দিলো তাদের স্বপ্ন চলে যাচ্ছে অতলে। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদপুষ্ঠ আলবদর রাজাকার শ্রেণীর উত্থানকে লেখক ভালো চোখে দেখেননিÑ মেনে নিতে পারেননি। তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় রাহাত খান স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির নাম সরাসরি না নিলেও এই উপন্যাসে অভিনব পন্থায় ‘ক’ চরিত্র নির্মাণ করেছেন। এরকম ব্যঞ্জন বর্ণের সাহায্যে তার আগে কোন চরিত্রের নাম নির্মিত হয়নি। নীরীক্ষাপ্রবণ লেখক হিসেবে বরাবরই রাহাত খান আদৃত। তার আছে একটি সাবলীল ভাষাভঙ্গি-যা’ তার সম্পূর্ণ নিজস্ব। বাক্যগঠন বড় দীর্ঘ নয়। ছোটে ছোটো বাক্যে ফুটিয়ে তোলেন চরিত্রগুলোর কাজকর্ম। ভালোলাগে এবং অনায়াসে পাঠ করা যায়। ‘হে অনন্তের পাখি’ উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র কিন্তু প্রত্যেকে স্বভাববশে একে অন্যের চেয়ে আলাদা। জামিল এই উপন্যাসের কেন্দ্রে কিন্তু মূখ্য নয় বরং আরো কিছু চরিত্র আছে সবাই মিলেই জামিলের পূর্ণতা। বকুল যার স্বামী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। কিন্তু বকুল হঠাৎ ওজন বাড়িয়ে ফেলে ৭১ সালের পর। এর মধ্যে একটা সামাজিক পরিবর্তমানতার ইঙ্গিত থেকে যায়।

বকুল সিগারেটও খায়। জামিলের সাথে তার সখ্য। জামিল সাহিত্যমনা মোট কথা ভালো কথাশিল্পী। তার মস্তিষ্কে জায়গা করে নেয় ‘নতুন পংক্তি-পদ্মিনী। পদ্মিনী নারীর রাগ রক্তিমা কি আপনি চান না-সঙ্গে সঙ্গে এই বাক্যটি তার মস্তিষ্ক তাকে উপহার দিলো। আর দেরি করলো না জামিল। ছুটলো নিজের ঘরে। বকুল পেছন থেকে ‘এই, কই যাস, শোন শোন বলছিলো। জামিল শুনলো না।’

এই অবস্থা থেকেই জামিলের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র সম্পর্কে ধারণা নেয়া যায়। এই উপন্যাসে আরেক চরিত্র তৈফুর, যে পলিটিক্সে এগিয়ে আছে, স্ত্রী রওশন জানে পলিটিক্সে আয় ইনকাম ভালো। সামাজিক অবস্থানও হয়। অর্থাৎ ঐ আশির দশকেই রাজনীতি আখের গোছানোর সিঁড়ি। ত্রিশ বছরে এই সত্য আরো প্রকট। ১৯৭৫ সালের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এত দ্রুত ঘটে যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিমানবিকতা দেখা দেয়। রাহাত খানের উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই অনিবার্য এবং তাদের ক্রিয়াকর্ম এখনকার সময়ের জন্যেও প্রাসঙ্গিক। প্রতিটি চরিত্রেরই আলাদা বৈশিষ্ট্য। লেককের সার্থকতা যদি খোঁজা হয় তবে এখান থেকেই তার বীজ নিতে হবে। এই উপন্যাসে জামিল যে কেন্দ্রীয় আলো তার বিয়ে হয়Ñমুমুর সঙ্গে। বকুলের ড্রয়িং রুমেই তাদের থাকার ব্যবস্থা। মধ্যবিত্ত জীবনে যে সব ঘটনা ঘটে তার প্রায় সবই উপন্যাসে দৃশ্যমান। ‘ক’ সাহেব তিনি স্বাধীনতা বিরোধী কিন্তু মাঝে মাঝে পেয়ে বসে দার্শনীকতা তার সবকিছুই একটু অন্যরকম আলাদা তার শ্রেণী চরিত্র।

শাসম তার ভাতিজা। তাকে সে বোঝাতে চেষ্টা করে পাকিস্তানী কায়দায়-‘বাঙালি বলতে যদি কমন ম্যানদের বুঝিয়ে থাকো তা হলে তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু যারা যাদের টাকা আছে-সঞ্চয় আছে, পুঁজি আছে, তাদের একটাই জাত, তারা না বাঙালি না মুসলমান, না হত ইংল্যাণ্ড না জার্মানি।’ আপাত:দৃষ্টিতে কথাগুলো সত্য। এই ‘ক’ সাহেব বিপদে পালাতে চায় সংঘবদ্ধ হতে চায়Ñ যে অবস্থাটা আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি। রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও ‘ক’ সাহেব ক্রিয়াশীল। এই বাস্তবতা আমাদের নিয়ে যায় এমন এক সত্যে যা সমকালীন এবং সব সময়ের জন্যে প্রাসঙ্গিক। উপন্যাসের শেষে কমিউনিস্ট নেতা আলী আকবর যার মৃত্যু মর্মান্তিক। যে সুতপাকে ভালোবেসে বহিস্কৃত হয়েছিলো। সাভার থেকে বকুলের পরিচিতজনরা তাকে বাসায় নিয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে সে মৃত্যুর দেশে যাত্রা করেছে। কত স্মৃতি-কত আনন্দকর দিন-যা নি:শেষিত। মনে পড়ে শীর্ষেন্দুর ঘুন পোকার নায়ককে তার পরিনামও এই মৃত্যু। কমিউনিস্টরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিলেও দুই কুকুরের লড়াই বলে আলাদা হয়ে থেকেছে। বাস্তবতা আর তত্ত্ব যে এক নয়Ñস্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থা তা’ আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে হাড়ে হাড়ে।

হে অনন্তের পাখি উপন্যাসে রাহাত খানকে খোঁজার চেষ্টা করেছি কিন্তু যেহেতু উপন্যাসটি উত্তম পুরুষে নয় সেহেতু লেখককে খুঁজে পাওয়া দূরূহ। পল ক্লোদেল তার এক খেরো খাতায় লিলেছিলেনÑদান্তের ডিভাইন কমেদিয়ার প্যারাগোট্রেরিও অংশে যে বর্ণনা তা’ আমরা বিশ্বাস করতে বাধ্য হই কেনো না এখানে আছে এক বিশ্বাসযোগ্য আতিশ্বর্য। মনে হয় আমাদের জন্যে দান্তে বর্ণিত নরক যন্ত্রণা অপেক্ষা করছে। ‘হে অনন্তের পাখি’ উপন্যাসটির চরিত্র আলী আকবরের পরিণাম সেরকমই আমাদের শঙ্কিত করে। আমরা সার্বিক বিবেচনায় আমাদের মহৎ উপন্যাসগুলোর পুন:পাঠে অংশ নেবো। যেভাবে ইংরেজি ভাষায় আনিয়া লুম্বা শেক্্সপীয়রের দ্য ট্রেমপেস্ট’ নাটকের অসামান্য উপনিবেশোত্তর পঠনক্রিয়াকে সামনে এনেছিলেন সেরকম ভাবেই মাইকেল মধুসূধন দত্তেরÑ মেঘনাদ বধ, বঙ্কিমেরÑদেবী চৌধুরানী ও আনন্দমঠ কিংবা তারাশঙ্করের-গণদেবতা, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, বিভূতিভূষণেরÑআরণ্যক ও ইছামতী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়েরÑপদ্মানদীর মাঝি গ্রন্থগুলোর উপনিবেশোত্তর পুনঃপাঠ সময়ের দাবি। পুন:পাঠের এই অধ্যায়ে নিঃসন্দেহে যুক্ত হবে অদ্বৈত মল্লø বর্মণের- তিতাস একটি নদীর নাম, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহরÑলালসালু, শওকত ওসমানেরÑজননী, শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেরÑখোয়াব নামা, সেলিনা হোসেনেরÑযমুনা নদীর মুশায়েরা এবং রাহাত খানের হে অনন্তের পাখি। এই পুনপাঠ তালিকা আরো দীর্ঘ হবে। বাংলা ভাষার উপন্যাসের বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের সমরেশ বসুর-বিবর, মহাশ্বেতা দেবীর- অরণ্যের অধিকার, দেবেশ রায়েরÑতিস্তা পারের বৃত্তান্ত, অনীল ঘড়াইয়েরÑনুনবড়ি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের-পূর্ব পশ্চিম। আরো আলাদা করে উল্লেখ করবো কমল কুমার মজুমদারেরÑঅন্তর্জলি যাত্রা’র কথা।

আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী সাহিত্যকে যদি উপনিবেশোত্তর চেতনার অভিজ্ঞানে জারিত করি তবে আমাদের পাঠচেতনা পুননির্মিত হবে। বিশ্বসাহিত্যের অনিবার্য অংশ হিসেবে আমরা সমুপন্থিত কিন্তু নানা আর্থ রাজনৈতিক অবস্থা আমাদের টেনে রাখে উপনিবেশের মানসিকতার কালে। অবক্ষয়ী সময়ে নামমাত্র আধুনিকতাক্লিষ্ট সমাজে পথ ও পাথেয় মোটেও সহজলভ্য নয়। সেজন্য রাহাত খানকে খুঁজে বের করতে হয়েছে তার কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মুক্তির পথ। এই উপন্যাসের পুন:পাঠ বীক্ষা আমাকে দাঁড় করায় Ñ has a past to legitimate a vengeanee extract. প্রতি মুহূর্তে নতুন সংবেদন নিয়ে আমরা অনুভব করবো ‘হে অনন্তের পাখি’। এবং নিশ্চয়ই ভাববো যে- আলো আছে শুধু আবিষ্কারে তা কোনো মহৎ উপন্যাস পুন:পাঠের ক্ষেত্রে পরম সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares