সাক্ষাৎকার : ‘কবিতা মিশিয়ে এক রকমের গল্প লেখার চেষ্টা চলছে উভয় বাংলায়’- রাহাত খান

‘মানুষকে নির্বিশেষে যিনি ভালোবাসেন হৃদয়ের সমস্তটুকু আন্তরিকতা দিয়ে, তিনিই বোধ হয় সময়ের পরীক্ষায় ভালোভাবে উতরে যান। যা লিখতে হবে, তা তিনি জানেন।’Ñ কথাশিল্পী রাহাত খান এমনই মানুষ। ১৯৪০ সালে কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি সাংবাদিকতায় আসেন। ১৯৭২ সালে অনিশ্চিত লোকালয় গল্পগ্রন্থ প্রকাশের পর থেকে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবলভাবে আলোচিত। এ যাবত উপন্যাসসহ ৩২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। প্রথিতযশা এই কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মণীশ রায়

গল্পের প্রতি প্রবল টান আপনি ঠিক কোন বয়সে এসে প্রথম টের পেলেন নিজের ভেতর? মনে পড়ে?

বই। আর পরিপার্শ্ব। আর হয়তো ভেতর থেকে উথলে উঠতে থাকা একরকমের ব্যাকুলতা। এসবই গোপনে আমাকে টানত। আমি আমার খুব স্পর্শকাতর কৈশোরে বুঝতে পারতাম আমি ব্যর্থ হতে চলেছি। বাঁচার জন্য কিংবা বলা যায় অন্যদের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য লেখা ছাড়া আমার সামনে আর কোনো যাদুই যে  ছিল না!

তবে বিষয়টা যেভাবে বললাম সেটা তো সচেতনভাবে কিছু জানতাম না। বইয়ের পোকা ছিলাম। এছাড়া গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে প্রায় উদ্বাস্তু হয়ে ওঠার জীবনে আশা করার মতো কিছু ছিল না। পোকা ছিলাম। এ অবস্থা থেকে বই-ই টেনে তুলেছিল। আমার অজ্ঞাতে  অবশ্যই। আমি বলি, সংবেদনশীলতা আর মনের বেশিরকম স্পর্শকাতরতা একটা লক্ষণ। এছাড়া যে কোনো লেখকের প্রথম ও শেষ সঞ্চয়-সূত্র হচ্ছে বাইরের-ভেতরের অভিজ্ঞতা প্রেরণাদায়ক বই। কৈশোর থেকেই একটু একটু লিখতাম। সেসব লেখা পড়ে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন বলেছিল, ‘দোস্তো, তোর পায়ে পড়ি। তুই খামোকা আর লিখিস না। কাগজ, কালি আর কলমের এমন অপচয়  দেখে বড় কষ্ট  হয়।’

বন্ধুদের এসব কথা শুনে তখন প্রকাশ্যে কিছু না জানিয়ে গেরিলা স্টাইলে গোপনে লিখতাম। শেষে কলেজের বার্ষিক পত্রিকায় আমার একটা লেখা ঠিকই ছাপা হয়ে গেল। খুব যে একটা আনন্দ হয়েছিল তা বোধ হয় নয়। বরং গল্পটা নিয়ে কে কী বলে বসে সেটা নিয়ে মনে মনে আতঙ্কিত  ছিলাম।

বই আমাকে টানত। এখনো যেমন টানে। আর গোপনে কত কিছু যে স্মৃতি ধরে রাখতে জানে। তো এভাবে যেতে যেতে বাস্তবতা ও  অদৃশ্য থেকে একটা তাগিদ পাই। এভাবেই কিছু একটা হয়ে ওঠা আর কি। গল্পলেখক কেউ বলতে চাইলে  বলতেও পারে। কচু কাটতে কাটতে ডাকাত। বই আর পরিপার্শ্ব পড়তে পড়তে লেখক ! দুটোই তো কাছাকাছি।

অভিভাবকের নাম কিন্তু বই। ভালো বই। প্রেরণা উদ্রেককারী বই। যা শতবার পড়লেও পুরনো বলে মনে হয় না সেই ধ্রুপদী গ্রন্থ। অবশ্য ব্যক্তির পরিপার্শ্ব দেখা আর মুখস্থ করে স্মৃতি-ঘরে জমিয়ে রাখার ব্যাপারটাও এর মধ্যে ধরতে হবে বৈকি। খুবই স্পর্শকাতর এবং কঠোর শ্রম দিতে পারা লোক ছাড়া তো কিছুই হওয়ার নয়।

গল্প শোনা শোনাবার যে আদি-অকৃত্রিম বাসনা যা প্রতিটি মানুষের ভেতরই থাকে তা থেকে একজন শিল্পী কিভাবে নিজেকে আলাদা করেন?

শোনা, শোনানো সবই তো ঠিক আছে। এর সাথে শেখাটা যোগ করে নাও। তাহলে কেউ হয়তো লেখা, গান গাওয়া, ছবি আঁকার অন্ধ তাগিদটি নিজের ভেতর অনুভব করবে। আসলে একজন গল্পকারের মূল বাহনটি তার ভাষা-শৈলী। যে কোনো মাধ্যমের শিল্পীর মধ্যেই এই ধারানুক্রম রয়েছে। কারো ভাষা, কারো কণ্ঠ, কারো তুলি। আমার মনে হয় এক ব্যক্তির মধ্যে তার পরম্পরার বহু মানুষের ছায়া আছে। প্রেরণা  ও সাহস আছে।

তবে  হয়ে ওঠাটাই আসল কথা। ইতিহাস জানায়– কেউ হয়, কেউ হয় না। গল্পে তিনিই হয়ে ওঠেন যার ভাষাচর্চা নিখুঁত বা কাছাকাছি। আসলে সত্যিকারের এক ভালো গল্প তো গল্পকার নিজেই।

আপনার মতো প্রথিতযশা গল্পকারের বেলায় গল্পটা আসে কিভাবে? এর জন্য ছক খসড়া এসবের দরকার হয় নাকি লেখার টেবিলে বসলেই অনায়াসে গল্পগুলো বের হয়ে আসতে শুরু করে মনের লুকনো কুঠুরি ছেড়ে?

মণীশ, নিজেও তো তুমি একজন গল্পকার। হয়ে উঠেছ তো নিশ্চয়ই। তবে কতটা সেটাই প্রশ্ন। শুধু তোমার বেলায় নয়, সবার বেলাতেই এটা প্রযোজ্য।

গল্পের অংকটা সবার বেলায় এক নাও হতে পারে। কেউ  প্রচারণা, সংগঠনও নিজের বাস্তবত গুণে খুব খ্যাতি পায়। নিজের ধরনের গল্পটা সে পাঠককে গেলাতে পারে খুব। তবে অনেক সময়ই দেখা যায় মৃত্যুর দু-এক বছরের মধ্যেই হয়তো তিনি বিস্মৃত লেখকে পরিণত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ ফায়দাবাজ। ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেলবে, এরকম হাবভাব। আঙ্গিক বদলে দেবে, বিশ্বের সর্বশেষ দর্শনকে ধারণ করবে, মাটির লেখক হবে… এরকম কত কি। এরা সাহিত্যের ছোট মাছ। জলে বাস করে  বড় বেশি লাফায়।

একটি স্বচ্ছ, সুন্দর ও সাবলীল ভাষা যার আয়ত্তে এবং মানুষকে  নির্বিশেষে যিনি ভালোবাসেন  হৃদয়ের সমস্তটুকু আন্তরিকতা দিয়ে, তিনিই বোধ হয় সময়ের পরীক্ষায় ভালোভাবে  উতরে যান। যা লিখতে হবে, তা তিনি জানেন। সব প্রস্তুতি থাকে তাঁর, মনে থাকা উচিত।

আপনার একটি নির্মেদ বাগভঙ্গি রয়েছে। আপনি কি মনে করেন শুধু একটি চাঁচাছোলা গল্পভাষা একজন লেখকের গল্পকে উতরে দেবার জন্য যথেষ্ট?  চাইলে একজন বড় ভাষাবিদ কি তাহলে বড় গল্পকারও হতে পারেন?

না।  গল্পের ভাষা চাঁচাছোলা হবে কেন। হবে সাহিত্যের ভাষা। গল্পের যা আবেগ তা দিতে হবে পরিমিতি বোধ বজায় রেখে। গল্পের আবেগ প্রকাশে উচ্ছ্বাস এসে গেলে বিপদ। গল্প মার খেয়ে যাবে। কবিতা মিশিয়ে এক রকমের গল্প লেখার চেষ্টা চলছে উভয় বাংলায়। এটা বড়জোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলা যেতে পারে। এও বলা যেতে পারে গল্পের এই নিরীক্ষা উত্তীর্ণ হবে, এমন সম্ভাবনা প্রায় নেই। 

আমাকে একবার মধ্য ষাটে অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, যার সঙ্গে মতাদর্শগত কোনো মিল নেই আমার, আচমকা অফিসে টেলিফোন পেলাম তাঁর। পাকিস্তানি আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব দাপুটে, খুব শৌখিন এক অধ্যাপক তিনি। তাঁর ফোন পেয়ে বিশ্বাসই হচ্ছিল না সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের মতো লোক রাহাত খানের মতো তখনো তেমন না হয়ে ওঠা লেখককে ফোন করবেন। যাহোক, তিনি আমাকে তাঁর নাজিমুদ্দিন রোডের বাসায় বিকেলে চায়ের দাওয়াত দিলেন।

নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে উপস্থিত হই। পড়ন্ত রোদে বাড়ির সামনের লনে বসার ব্যবস্থা। প্রশ্ন ছিল ইংরেজি বিভাগে আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম কিনা। জবাবে আমার বিনীত ‘না’ শুনে এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা পাস করেছি জেনে মনে হলো একটু অবাকই হলেন। বললেন, তোমার লেখার বাক-ধারা (ঝুহঃধী) দেখে তো মনে হয় তুমি ইংরেজি বাকধারা, শব্দচয়ন, গল্পের কাঠামো ও বুননের অনুসারী। ইচ্ছে হয়েছিল বলি, বাংলা সাহিত্যের মূলধারায় ইংরেজির প্রভাব তো সেই তিরিশ দশক থেকেই শুরু। ইচ্ছেটা দমন করি। নিজের অজ্ঞতা ঢেকে রাখতে মৌনতার মতো এমন ছদ্মবেশ আর হয় না।

আমার গল্পে অযথা ভারি শব্দ ব্যবহার করি না। আমি রবীন্দ্রনাথে বিশ্বাসী। সহজ কথা যায় না বলা সহজে। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি নিরন্তর সেই যাদু আয়ত্ত করতে। কতটা পেরেছি বা পারিনি সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

একেকটা গল্প একেক রকমের ভাষা- নির্মাণ দাবি করে। সেটা পেরে ওঠা সহজ নয়। তবে সহজ না হলেও পেরে ওঠার চেষ্টা তো করা যায়।

একজন সফল গল্পলেখক হিসেবে যে চরিত্রটি আজ আপনার কলম মনন থেকে বেরিয়ে এলো  তা আগামী প্রজন্মের কাছে কতখানি  বিশ্বস্ততা অর্জন করবে বলে আপনার ধারণা? এক্ষেত্রে একজন লেখকের কতটুকু আধুনিক মনস্ক হওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন? জরাহীন, দ্বিধাহীন, সাহসী, মুক্ত সংস্কারহীন  লেখকমন  কি এজন্য খুব জরুরি?

 শেষ পর্যন্ত একজন লেখককে জীবনের দিকে তাকিয়ে সত্য কথাটাই বলতে হয়। কথাটা একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করা যাক। কোনো  লেখক লোক হিসেবে, হয়তো কর্তৃত্ববাদী কিংবা বৈষয়িক নন;  জীবনানন্দ যেমন ছিলেন কিংবা কোনো লেখক হয়তো বেশি ধান্দাবাজ;  টাকার লিপ্সা তাকে নিয়ে লোফালুফি করে অথবা বলা যাক বাড়াবাড়ি রকমের তার নারী-প্রীতি ইত্যাদি। যাপিত জীবনের পরতে পরতে তার হয়তো ভুল-ত্রুটির অসংখ্য চোরাকাঁটা লেগে থাকতে পারে; কিন্তু অজস্র  মানুষের কষ্ট ভেতরে চেপে সহানুভূতি, মর্মিতা কিংবা অনুতাপে দগ্ধ হতে হতে তিনিই লেখেন। সত্যিকার কোনো লেখক যখন অনুতপ্ত বা অনুপ্রাণিত হয়ে লিখতে বসবেন তখন তিনি একেবারেই অন্য মানুষ। সত্য ও বাস্তবতা, আইডিয়া এবং সৃষ্টির উন্মাদনা তাঁকে দিয়ে গল্প (বা কবিতা বা উপন্যাস) লেখাতে ভূতের বেগার খাটাবে। ধরো জীবনানন্দ দাশের কথা। বাংলা কবিতার হাজার বছরের ফর্মটাই পাল্টে দিলেন। তিনিই একমাত্র পারলেন। অথচ জীবদ্দশায় তাঁকে অনেকে কবি বলতেই নারাজ ছিলেন। সত্য মানুষকে পাল্টে দেয়। বিশেষ করে লেখককে। রোমানটিক কবি কীটস তো সমালোচনার কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। এখন এমন কোনো ইউনিভার্সিটি আছে যেখানে কীটস পড়ানো হয় না? কিংবা এমন বাঙালি আছেন যিনি জীবনানন্দ পাঠ করে সমৃদ্ধ হননি ! 

আধুনিকমনস্কতার কথা বলছ? তুমি লেখক, তুমি নিজেও জানো। একজন লেখককে সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকতে হয়। সাহিত্যের সংজ্ঞা প্রতিদিন নানাজনের হাতে পড়ে বদলাচ্ছে। মার্কেস তাঁর হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড যেভাবে লিখেছেন তাও অজানা থাকলে চলবে না। আমার টেবিলে অমিতাভ ঘোষের দ্য হাংরি টাইড পড়ে আছে; তাঁকেও পড়তে হবে। মোদ্দাকথা, লেখালেখি হচ্ছে একজন শ্রমিকের প্রতিদিনকার সংগ্রাম; আর এর প্রধান পুঁজি হচ্ছে পড়াশোনো এবং অভিজ্ঞতার আবেগ। এক্ষেত্রে নিজেকে প্রস্তুত রাখাটাই হচ্ছে  সত্যিকার অর্থে  আধুনিকতা। বুদ্ধদেব বসু লেখার মানবিক ও সমষ্টিগত ইতিহাস জানতেন বলেই বাংলা ভাষা ও নিজের সৃষ্ট বিষয়ের ভেতর আধুনিকতার বিস্তার ঘটাতে পেরেছিলেন। যদিও আধুনিকতার কথাটা আপেক্ষিক।

আপনার বিশাল গল্পসম্ভার থেকেÑ আমাদের বিষবৃক্ষ, চুড়ি, প্রতিদ্বন্দ্বী, ইমান আলীর মৃত্যু, শরীর ইত্যাদি গল্পের কথা মনে পড়ছে,  যেগুলোর ভেতর  মানবীয় বোধের পরম প্রকাশ ঘটেছে ; এমন কোনো গল্পের কথা কি আপনার মনে পড়ছে যা পুনরায় লিখতে ইচ্ছে করে?

আমার তো সব গল্পই নতুন করে লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু অসুবিধা কি জানো, লিখতে গিয়ে যে ভাবাবেগ  একজন লেখককে আমূল নাড়িয়ে দিয়ে একটি গল্প বা উপন্যাসের জন্ম দেয়, পরবর্তীকালে তা আর থাকে না। দেবদাস লিখতে গিয়ে যে আবেগ শরৎচন্দ্রকে নাড়িয়ে দিয়েছিল তা কি পথের দাবি লেখার সময় থাকবে বলে মনে কর ? পথের দাবি বা শেষ প্রশ্ন-র মতো উপন্যাস লেখার সময় তাঁর মানসগঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন ; তখন যদি তিনি পুরনো দেবদাস লিখতে চাইতেন তো  সেটি দেবদাস না হয়ে অন্য কিছু হতে পারত।

 আমি একটা কথা প্রায়ই বলি। আমি ষাট ভাগ মুসলমান, বিশভাগ হিন্দু, দশভাগ খ্রিশ্চিয়ান আর দশভাগ বৌদ্ধ। কেন বলি জানো? সব মানুষ তো আল্লাহরই সৃষ্টি। বহু ধর্ম, বহু মত, বহু স্ব-বিরোধিতা নিয়েই মানুষের ইতিহাস। আমি মনেপ্রাণে মুসলমানই তো বটে ; কথাটা বললাম যাতে অন্য ধর্মের প্রতি কোনোভাবে অসম্মান প্রকাশিত না হয়, সেজন্য। আমাদের মহান নবীজীও সবাইকে সম্মান করতেন। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যদি কূপমন্ডূক হয় তো তাকে দিয়ে ভালোবাসা ও আত্মার সংবাদ সাহিত্যে বা যে কোনো শিল্পমাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব নয়। ‘আমাদের বিষবৃক্ষ’ গল্পটি বোধ করি সেই চেতনা থেকেই লেখা। আর ‘চুড়ি’? এটি হচ্ছে নারীর সেই প্রতীকী অলঙ্কার, যার টুং-টাং ধ্বনির ভেতর লুকিয়ে থাকে দয়িতর প্রতি দয়িতার প্রগাঢ় ভালোবাসা ও সমর্পণের সুরময় ছন্দ। আমি এই রূপককেই ব্যবহার করেছি এই গল্পটিতে।

হে শূন্যতা শিরোনামে একটি উপন্যাস আপনি লিখেছিলেন যেখানে সমসাময়িক আর্থসামাজিক রাজনৈতিক হতাশা উঠে এসেছে। প্রগতিশীল ধারার একজন আশাবাদী ঔপন্যাসিক আপনি। মুক্তিযুদ্ধের পর  আপনি আসলে কী রকম সমাজ দেখতে চেয়েছিলেন আর কিরকম দেখছেন? এসবের চাপ একজন লেখকের উপর কতটুকু?

হে শূন্যতা উপন্যাসে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার একটি বর্ণনা রয়েছে। ওটি লেখার সময় আমি কেঁদেছিলাম। তবে কখনোই হতাশাগ্রস্ত হইনি । বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ  এবং বাংলাদেশে আস্থাবান  আমি সেই ষাট দশক থেকে।

 হ্যাঁ,  উপন্যাসটি শুরু হয়েছিল ওই সময়কার  চারপাশের হতাশার ছবি দিয়ে ; কিন্তু ধীরে ধীরে মূলধারাতেই ফিরে আসতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, লাল-সবুজ পতাকা, প্রাণের চেয়ে  প্রিয় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ জাতীয় সঙ্গীত এসবই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে উপন্যাসটিতে।  চিরকালের নিরঙ্কুশ আশাবাদী মানুষ হিসেবে একজন লেখক আগামীকেও তো কিছুটা কিছুটা দেখতে পান। আমি আমার প্রতিটি লেখায় সেই চেষ্টাই করে গেছি।

উত্তর আধুনিককালে পরাবাস্তবতা, যাদু বাস্তবতা  কিংবা বিমূর্ত  অনুভবের প্রকাশ ঘটছে গল্পে উপন্যাসে। গদ্য লেখকরা নানাভাবে তাদের ফর্মকে উল্টে পাল্টে কিংবা বিষয়বস্তুর কথনভঙ্গিতে নানাকিছুর মিশেল দিয়ে নতুনত্বের স্বাদ এনে দিতে চেয়েছেন পাঠককে। আপনার উপন্যাসে এর প্রভাব কতটুকু?

সাহিত্যে তুমি যা কিছুই কর না কেন, মূলধারার সঙ্গে সংগতি রেখেই তা করতে  হবে। তুমি মার্কেস পড়ে উপকৃত হতে পারো ; কিন্তু বাংলাসাহিত্যের ধারাটিকে না বুঝে এর প্রতিফলন সাহিত্যে ঘটাতে চাইলে ফল খুব একটা আহামরি কিছু হয় না বলেই আমার ধারণা। নতুনত্ব আসে গভীর জীবনবোধ থেকে। হারম্যান ম্যালভিলের মবিডিক উপন্যাসটির গল্পকথন যেভাবে কথক ইশমায়েল এগিয়ে নিয়ে যায় তা কি চমকপ্রদ নয়?  তুমি কীভাবে গল্পটা বলতে চাও তা তোমারই ওপর নির্ভর করছে। একটি গল্পকে তুমি যত গহীনে পৌঁছুতে সক্ষম হবে তত তোমার কলাকৌশল প্রয়োজন হবে লেখক হিসেবে। নতুন নতুন আইডিয়া এবং দর্শনকে জানতেই হয়। তবে সাহিত্য-শিল্পে সেগুলোর রান্না-বান্না কিভাবে করছÑ সেটাই কথা। আইডিয়া ও দর্শনই তো লেখার বিষয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান শিশু যেরকম করে রূপকথা শুনতে অভ্যস্ত, তোমার দেশের স্টাইল কিন্তু সেরকম নয়। অবাস্তব ও পরম্পরাহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা অন্তঃসারহীন প্রচেষ্টার নামান্তর। তোমাকে তোমার পথে থেকেই নতুনত্বের সন্ধান করতে হবে। তবেই তা টেকসই হবে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সঙ্গত নয়; কারো কারো কাছে বানোয়াট বলে মনে হতে পারে। 

হে অনন্তের পাখি আপনার লেখা একটি বড় মাপের উপন্যাস। এই উপন্যাসে কোনো ভাসা ভাসা চরিত্র নেই। প্রতিটি চরিত্র স্পষ্ট, সবল বিশ্বস্ত এই উপন্যাসটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

উপন্যাস আসলে কি বল? বলা যায় সময়ের ছবি, ব্যতিক্রমের সংকট, জীবনের পরিচিতিপত্র হে অনন্তের পাখি  উপন্যাসটি সম্ভবত সেভাবেই লেখা। কাহিনিকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো চরিত্রের জীবনাচরণ। এই উপন্যাসের ব্যাকরণ হচ্ছে নানারঙের চরিত্রের সমাবেশ। যে যত মুন্সিয়ানা দেখাতে সক্ষম এখানে, সে তত শক্তিশালী লেখক। সংঘর্ষ  শিরানামে একটি উপন্যাস রয়েছে আমার। সেখানে একটি গ্রাম্য বালককে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। সে সেই শাস্তি সহ্য করতে না পেরে ছুটে পালিয়ে গেল সালিশের লোকজনের সামনে থেকে। যাওয়ার সময় সে তার ক্ষোভ প্রকাশ করছে পরনের লুঙ্গি উঠিয়ে এই বলে, তোমরা আমার এ্যাইডা ছিঁড়বা? শাস্তি ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের মাগী শব্দটির ব্যবহার লক্ষ করেছো? কিংবা ফটিক গল্পের ‘ওই হোঁথা ’? একটি দুটি শব্দ দিয়ে তিনি যে আবহ তৈরি করতে পেরেছিলেন তা আর কিছু দিয়ে কি সম্ভব? আমরা রবীন্দ্রবলয়ে বাস করি না এখন; কিংবা বাস করি। তিনিই তো বাতিঘর এমন কি বুদ্ধদেব বসু যে বাস্তব-অবাস্তব গদ্যের সূচনা করেছিলেন তার থেকেও হয়তো এগিয়ে গেছি। আমরা এখন গল্প উপন্যাসে যে ভাষা যে চরিত্র ব্যবহার করি তা আমাদের নিজস্ব কিন্তু পরম্পরাবর্জিত নয়। ব্যক্তিগত জীবনে আমি গ্রাম যেমন দেখেছি, শহরও দেখেছি। একটি দুটি শহর নয়। অনেকগুলো। সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে সফরে যাওয়ার সুবাদে প্রায় অর্ধেকটা পৃথিবী ঘুরেছি। বহু শহর বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। বড় বড় মানুষদের সঙ্গে ছিল ঠাট্টার সম্পর্ক। সেসব অভিজ্ঞতা একজন ব্যক্তি বা লেখকের ওপর প্রভাব খাটাবে তাই তো স্বাভাবিক। তাই নয় কি?

আপনার গল্প উপন্যাসে আধুনিক জীবনযাপনের প্রচুর উপকরণ রয়েছে। আপনার সমসাময়িক অনেক লেখকই যখন গ্রাম কিংবা গ্রাম ঘেঁষা বাংলাদেশের  শহরকে বেছে নিয়েছেন নিজেদের গল্প উপন্যাসের একমাত্র পটভূমি হিসাবে তখন বিশ্বের নানা জায়গা থেকে উঠে এসেছে  আপনার চরিত্রগুলো, এক প্রিয়দর্শিনীর কথা তো বলতেই পারি প্রসঙ্গে। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে চেতনায় মননে এই যে আধুনিক জীবনবোধ তা কতটুকু জরুরি?

একটি স্মৃতিকাহিনি বলি প্রশ্নের উত্তরে। ওয়ারির বলধা গার্ডেনে তো গেছ, তাই না? সেখানে আচার্য্যবাবু নামে একজন ছিলেন। সেখানে প্রায়ই যেতাম আমি। গেলেই তিনি আমার পাশে বসে গাছের গল্প করতেন। কত রকমের যে গাছ আর তাদের গোত্র! তিনি বললেন গাছকে চিনতে পারলে আমি কে সেটাও জানা যায়। মানুষটাও ছিলেন অন্যরকম; অকৃতদার; দেখলেই মনে হত ভূমানন্দে রয়েছেন। এঁকে আমি ভুলি কিভাবে? এঁর ছায়া যেমন আমার গল্পে খুঁজে পাবে তেমনি সুদূর সাইপ্রাসবাসিনী রোদে পোড়া গ্রীসিয়ান কোনো নারীকেও তুমি পাবে আমার গল্প-উপন্যাসে। আসলে মানুষে-মানুষে এই মেলবন্ধন আর যোগসূত্রটারই আজীবন খোঁজ করে চলেন একজন লেখক।  নিজের সঙ্গে পৃথিবীকে মেলাবার চেষ্টাটার নামই আন্তর্জাতিকতাবাদ। 

আজকের একজন তরুণ গল্পকার বা ঔপন্যাসিককে কী বলবেন?

পড়, পড় এবং পড়। পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। সস্তা চটি সাহিত্য নয়। ক্লাসিক সাহিত্য। বাংলাভাষার সেরা লেখাগুলো যেমন পড়তে হবে তেমনি বিদেশি সাহিত্যের হীরা-জহরতগুলোও বাদ যাবে না। ওরাই পথ দেখায় একজন লেখককে। 

আপনার গল্প উপন্যাসে চরিত্রের আচার-আচরণে  হাস্যরসের বেশ একটা প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। ভাঁড়ামো আর অন্তর্নিহিত  হাস্যরসের মাঝে তফাতটা কী? একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন কি?

সত্যজিৎ রায়ের বই তো পড়েছ। কোথাও ভাঁড়ামো নেই। কিন্তু হাসির খোরাকের অন্ত নেই সেখানে। জটায়ূ নামের লেখক,  যিনি প্রতিটি অভিযানেই অংশগ্রহণ করেন ফেলুদার সঙ্গে,  তিনি নিজেই একটি কমিক চরিত্র। তাঁর বহু অভিজ্ঞতা, আবার প্রতিটি অভিজ্ঞতাই লেখকের বলার মুন্সিয়ানায় হাস্যরসসিক্ত। অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো নির্মল হাসি যা জীবনেরই অঙ্গ, লেখক সেটিকেই উপস্থাপন করেন পাঠকের সামনে। সেই হাসি প্রিয় পানীয়ের  মতো  আস্বাদন করতে হয়। ইন-বিল্ট যন্ত্রের মতো, একে মূল চরিত্র বা ঘটনা থেকে আলাদা করা যাবে না ; বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক সব লেখকদেরই এই গুণটি ছিল। আর ভাঁড়ামো তো হলো অঙ্গভঙ্গি দিয়ে জোর করে কাউকে হাসাবার চেষ্টা করা। আরোপিত হাসি প্রথমদিকে ভালো লাগলেও শেষ পর্যন্ত এর অতি ব্যবহার বিরক্তির জন্ম দেয়। 

দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে আপনার সৃষ্ট চরিত্রগুচ্ছের দিকে তাকিয়ে কি কখনো মনে হয় যে, যে বিশাল জীবনকে ছুঁতে চেয়েছিলাম তা পেরেছি কিংবা পারিনি? কী মনে হয় আপনার সময়ে দাঁড়িয়ে?

পুরনো লেখাগুলো যখন মাঝে মাঝে খুলে বসি তখন সহসা মনে হয় , বাহ্ এটুকুন তো ভালোই লিখেছি। আবার কোনো কোনো লেখা পড়ে ভাবি, এটা আবার লিখলে বোধ হয় আরো ভালো বলতে পারতাম। তুমি তো জানো, আমার বেশিরভাগ লেখাই তাগিদ দিয়ে লেখানো। ছাপাখানায় ঈদ সংখ্যা  ছাপা হচ্ছে; আমার লেখার জন্য পুরোটা ছাপা যাচ্ছে না। এ ধরনের বাইরের চাপ থেকে লেখার তাগিদ তৈরি হয়। এবং  এত বছর ধরে এভাবেই লিখে যাচ্ছি। একবার মনে হয়েছিল, যে লেখাগুলো তাড়াহুড়োর কারণে, যা আরো বিশদভাবে বলতে পারতাম, তা বলা হল না, সেগুলো পুনরায়  লিখতে  বসব। কিন্তু হয়ে ওঠে না। অতৃপ্তি তো একজন শিল্পীর সফরসঙ্গী। আজীবন এই খেদ নিয়েই চলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares