লোকসাহিত্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা : সুমনকুমার দাশ

আগাগোড়া রাজনীতির মানুষ। কিন্তু শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর সে কী বোঝাপড়া! নখদর্পণে ছিল বিশ্ব-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের পারিপার্শ্বিক খুঁটিনাটিও। বলছিলাম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) কথা। কেবল নাগরিক পরিমণ্ডলে নয়, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নীরবে-নিভৃতে সংস্কৃতির সেবা করে চলা সাধক-শিল্পী- সাহিত্যিকদের সঙ্গেও তাঁর ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।

শহুরে মূলধারার বাইরে গ্রামীণ জনপদে নিভৃতে থাকা শিল্পীদের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দরদি মনোভাবের কথা সর্বজনস্বীকৃত। যে কারণে, একাত্তর-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে শত সংকট ও সমস্যা সত্ত্বেও গ্রামীণ শিল্পীদের মূল্যায়ন করতে তিনি ভোলেননি। গণভবনে প্রায়ই এসব শিল্পীকে ডেকে নিয়ে লোকগানের আসর বসাতেন। এর আগে ছাত্রাবস্থায় তাঁর রাজনৈতিক উত্থানকালেও এমন অহরহ উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গক্রমে ১৯৫৭ সালে সন্তোষে অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলনের কথা বলা যায়। সে সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গ্রামীণ প্রথিতযশা শিল্পীদের নিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু জড়ো করেন এবং সাংস্কৃতিক পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেন।

গ্রামীণ বাংলার লোকশিল্পী, গীতিকার, নাট্যাভিনেতা থেকে শুরু করে লোকসংস্কৃতির নানা মাধ্যমে কাজ করে চলা ব্যক্তিদের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে ভালোবাসা ছিল, সেটা লোকায়ত বাংলার সাধক-শিল্পীরাও অনুভব করতেন। তাঁরাও বঙ্গবন্ধুকে উজাড় করে ভালোবেসেছেন, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে রচনা করেছেন নানা ধারার সাহিত্য। পর্যাপ্ত গবেষণা, চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে এসব রচনার বিশাল অংশ হয়তো লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে।

কী ধরনের সাহিত্য রচনা করেছেন লোকায়ত ধারার সাহিত্যিকেরা? : যাত্রাপালা, বাউলগান, গণসংগীত, কেচ্ছা, ধামাইলগান, গম্ভীরা, পুথি, ভাট কবিতা, আলকাপ, জারিগান, ভাওয়াইয়া, ধুয়াগানসহ সাহিত্যের নানা ধারায় কাজ করেছেন গ্রামীণ লোকসাহিত্যিকেরা। এসব রচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের পাশপাশি তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, অসাম্প্রদায়িক ও উদার মনোভাব, আন্তরিকতা, দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব, সততাসহ আদর্শিক নানা বিষয় প্রতিফলিত হয়েছে। তবে লোকসাহিত্যিকদের এসব রচনার বেশিরভাগই এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত অবস্থায় রয়েছে।

জাগো নিউজ ২৪ ডটকম নামের একটি অনলাইন গণমাধ্যম ২০১৭ সালের ১০ আগস্ট তাদের ওয়েবপোর্টালে প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের ওপর লেখা এ পর্যন্ত দেশ-বিদেশে প্রায় ১৩ শতাধিক মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। একজন নেতার ওপর পৃথিবীর আর কোনও দেশে এতো বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ হয়নি বলে লেখক-প্রকাশকরা জানান। তারা জানান, বইগুলো বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর ওপর কিছু বই চীনা, জাপানি, ইতালি, জার্মানি, সুইডিশসহ কয়েকটি বিদেশি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।’

উপর্যুক্ত প্রতিবেদনের আলোকে বলা যায়, ২০১৭ সালের পর এ-পর্যন্ত (৯ মার্চ, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ) হয়তো আরও কয়েক শতাধিক বই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় দুই হাজার (আনুমানিক) বই যদি প্রকাশিত হয়ও, এতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কী পরিমাণ লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিক বই রয়েছে, সেটা আলোচনার দাবি রাখে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, এ চিত্র একেবারেই হতাশাজনক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একাধিক জীবনী, প্রবন্ধ, বক্তৃতার সংকলন, স্মৃতিকথা মুদ্রিত হলেও লোকসংস্কৃতিতে বঙ্গবন্ধুর অবদান কিংবা লোকশিল্পীদের দ্বারা বঙ্গবন্ধু জীবন ও কর্মভিত্তিক বই কিংবা গান, যাত্রাপালা ও পুথির সংকলন নেই বললেই চলে। বর্তমান প্রবন্ধকার এ-রকম মাত্র চারটি বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আমিনুর রহমান সুলতানের লোকগানে জনকের মুখ ও সাইমন জাকারিয়ার ‘সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি’। এসব বইয়ের মধ্যে গত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় লোকসংস্কৃতি গবেষক ও বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক সাইমন জাকারিয়ার বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। এ বইয়ে বিস্তৃতভাবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লোকায়তধারার সাধকদের রচনার বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। ‘সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি’ বইয়ে প্রসঙ্গকথা ও উপসংহার ছাড়া অধ্যায় রয়েছে চারটি। এগুলো হচ্ছে, ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বর্ণিত সাধক কবিদের গানে প্রতিফলিত বংশ- পরিচয় প্রসঙ্গ’, ‘পুথিসাহিত্যে প্রতিফলিত বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাস’, ‘জারিগানে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ এবং ‘বাউল-সুফি ও অন্যান্য লোকজ গানে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ইতিহাস’। এ চারটি অধ্যায়ে লেখক বৃহদর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমগ্র জীবনআখ্যান উপস্থাপন করেছেন, এবং, অবশ্যই তা বাংলার সাধক-কবিদের রচিত পুথি-জারি- বাউল- সুফি- লোকজগানের সূত্র ধরেই। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যে অন্তরতম সম্বন্ধ গড়ে ওঠে সাধকদের, তার প্রভাবও তাঁদের রচনায় পড়েছে। শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবোধসহ সকল বিষয়েই সাধকেরা নিজেদের রচনাকে সম্প্রসারিত করেছেন। ১৯৫৪ সালে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের সাধক শাহ আবদুল করিম লোকায়ত ধারার গীতিকারদের মধ্যে প্রথমবারের মতো শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে এক জনসভায় তাৎক্ষণিকভাবে মুজিবকে নিয়ে গান রচনার যে সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন, সেটা হালের সাধক-গীতিকারদের মধ্যেও প্রবহমান। ১৯৫৪ থেকে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দÑএই ৬৫ বছরে বাংলার গ্রামীণ পরিমণ্ডলে লোকায়ত ধারার সাহিত্যের চর্চাকারী সাধকদের মুজিব-চর্চার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস সাইমন জাকারিয়ার বইটি পাঠের মাধ্যমে জানা যাবে। পাশাপাশি বাংলা একাডেমির উপপরিচালক, কবি ও গবেষক আমিনুর রহমানের সুলতানের বইটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। 

উপর্যুক্ত বইগুলো ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে চার-পাঁচটি বইয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লোকসাহিত্যিকদের কিছু রচনা ঠাঁই পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের অনেক লোকায়তধারার সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লোকসাহিত্যের নানা ধারার সাহিত্য রচনা করেছেন।

বঙ্গবন্ধু ও লোকসাহিত্য : বিশেষত মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাংলার লোকসাহিত্যেকেরা নানা ধারার সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর কর্মগুণের প্রশংসা করে রচিত হয়েছে অসংখ্য গান, পুথি ও গম্ভীরা। এর বাইরে তাঁর জীবন ও কর্মভিত্তিক একাধিক কেচ্ছা ও যাত্রাপালাও রচিত হয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশেষত ১৯৬৬ সালের পর থেকে বাংলার লোকসাহিত্যিক ও গ্রামীণ গীতিকারেরা তাঁদের সাহিত্যে বঙ্গবন্ধুকে প্রবলমাত্রায় উপস্থাপন করেছেন। এমন কী ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদ- স্বরূপও অনেক লোকগীতিকার প্রতিবাদী গান রচনা করেছেন।

পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে যেখানে মূলধারার (?) সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত শহুরে লেখকদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদস্বরূপ কিছু কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ছড়া লিখেছেন, সেখানে গ্রামেগঞ্জে সাধনায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বাউলশিল্পী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করেছেন এবং সেসব তৎকালীন সরকারের নিষেধাজ্ঞা ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে গ্রামীণ আসরে গেয়েছেন। এ-রকমই একজন বাউলশিল্পী শাহ আবদুল করিম (১৯১৬- ২০০৯)। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পী বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি জাতির পিতাকে নিয়ে বেশ কিছু গান রচনা করেছেন। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আসরে গান পরিবেশনের আগে তিনি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচার চেয়ে গানের পর্ব শুরু করতেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় আসার আগ-পর্যন্ত এটাই যেন ছিল তাঁর আরাধ্য অভ্যাস।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শাহ আবদুল করিম রচিত একটি গান তো ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রচলিত হয়েছে। এ গানে গীতিকার মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদান এবং পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন করাসহ বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ গানটি নিম্নরূপ :

শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু সবাই কয়

বন্ধু ছিলেন সত্য বটে

আসলে শত্রু নয় ॥

স্বার্থের জন্য স্বার্থপরে

ভারত বিভক্ত করে

তেইশ বছর শোষণের পরে

বাঙালি সচেতন হয় ॥

শোষণমুক্তি চেয়েছিলেন

শেখ মুজিব দায়িত্ব নিলেন

জনগণ সমর্থন দিলেন

ছাড়িয়া মরণের ভয় ॥

গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র

এই ছিল তার মহামন্ত্র

ধর্ম নয় শোষণের যন্ত্র

নিরপেক্ষ সমুদয় ॥

এনে দিলেন স্বাধীনতা

তাই তো বলে জাতির পিতা

সাক্ষী বিশ্বের জনতা

এই কথা যে মিথ্যে নয় ॥

গোপন ষড়যন্ত্র করে

মুজিবকে সপরিবারে

অন্যায়ভাবে হত্যা করে

বিচার যে তার বাকি রয় ॥

দীর্ঘ একুশ বছর পরে

আজ বাংলার ঘরে ঘরে

আশার সঞ্চার হলো রে

হলো নতুন ভাব উদয় ॥

যারা বাংলা মায়ের ভক্ত

মনকে করে নিলো শক্ত

লাখো লাখো শহিদের রক্ত

বৃথা যাবে না নিশ্চয় ॥

শুনি জ্ঞানী-গুণীর কথা

শ্রেষ্ঠ হয় মানবতা

শেখ মুজিব জাতির পিতা

করিম বলে নাই সংশয় ॥

শাহ আবদুল করিম ছাড়াও ঢাকার ধামরাইয়ের ভবা পাগলা (১৯০০-১৯৮৪), মানিকগঞ্জের হরিহরদিয়ার মহিন শাহ (১৯০৩-১৯৯৬), সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের কামালউদ্দিন (১৯০৩-১৯৮৫), ছাতকের দুর্বিন শাহ (১৯২১-১৯৭৭), দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বীরগাঁওয়ের মছরু পাগলা (১৯২৫-১৯৯৮), ঢাকার চরওয়াসপুরের রাজ্জাক দেওয়ান (১৯৩৩-২০০৩), সিলেটের বিয়ানীবাজারের শেখ ওয়াহিদুর রহমান (১৯৩৯-২০১২) প্রমুখ বাউল- গীতিকার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান রচনা করেছেন। প্রত্যেক গীতিকারই বঙ্গবন্ধুকে কালজয়ী এক মানব হিসেবে অভিহিত করেছেন। এসব গানের পরিসর সংক্ষিপ্ত হলেও বিষয়বস্তুতে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ, ছয় দফা, উনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে পঁচাত্তর-পরবর্তী ঘটনা স্থান পেয়েছে। মোটামুটিভাবে বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত এক জীবনবৃত্তান্ত রচনাই ছিল গীতিকারদের মুখ্য উদ্দেশ্য। এসব বাউল-গীতিকার ছাড়াও লোকসাহিত্যের বিভিন্ন ধারার গীতিকার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে মাদারীপুরের শিবচরের আবদুল হালিম বয়াতি, নরসিংদীর বেলাবোর হাছেন আলী সরকার, কিশোরগঞ্জের ভাটিঘাগড়ার দেওয়ান ফরিদউদ্দিন হায়দার, খন্দকার আফিরদ্দিন মিঞা, চান মিয়া, নরসিংদীর শিবপুরের মফিজউদ্দিন, নরসিংদীর রায়পুরার দারোগ আলী, নরসিংদীর নোয়াদিয়ার গিয়াসুদ্দিন, গাজীপুরের কাওরাইদের ইদ্রিছ আলী, নরসিংদীর বেলাবোর আজিজুল হক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের যামিনী কুমার, কুড়িগ্রামের দেবালয়ের অনন্ত কুমার দেব, কিশোরগঞ্জের আবদুল খালেক, আমীর আলী, ছোরাব আলী, শুকুর মাহমুদ, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের আমীর সরকার, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ রোকনউদ্দিন, নড়াইলের তারাপুরের মোসলেম উদ্দিন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গানের বিষয়বস্তু স্বাধীনতা-চিন্তা হলেও ক্রমে তা বিবর্তিত হয়ে সংগত কারণেই মুজিব-বন্দনায় রূপ নিয়েছে। বাউল-গীতিকারদের নিজস্ব সাধনপদ্ধতি ও আচরিক রীতির ওপরেও যে মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু প্রভাব ফেলতে পেরেছেন, সেটা এসব গান পাঠে অনায়াসেই বোঝা যায়। তবে বাংলার গ্রামীণ পরিমণ্ডলে এসব গানের ব্যাপক আবেদন থাকলেও বোদ্ধা সারস্বত সমাজে যথাযথ প্রচার-প্রচারণার অভাবে সেসব গান খুব একটা পরিচিতি অর্জন করে নিতে পারেনি। একই কথা বলা চলে আলকাপ, জারি কিংবা গম্ভীরাগানের ক্ষেত্রেও। আলকাপ-গীতিকার যখন বলেনÑ‘শেখ মুজিব ছিলেন তখন/ জেলখানায় বন্দি/ আন্দোলন চালাতে বলেন/ নাই কোনো সন্ধি’, তখন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনাই শ্রোতাদের কাছে স্পষ্ট হয়। আবার একইভাবে গম্ভীরাশিল্পীর গীত পঙ্ক্তিÑ‘রক্ত দিয়ে গড়া মোদের সোনার বাংলাদেশ/ এ দেশ তোমার আমার সম অধিকার/ শেখ মুজিবের হয় আদেশ’ Ñপাঠ করলেও বঙ্গবন্ধুর সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের মনোভাব সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এ ছাড়া একইরকমভাবে যাত্রাগান, ভাওয়াইয়া, পুথিসহ লোকসাহিত্যের নানা মাধ্যমেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আদর্শকেন্দ্রিক একটা পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায়।

উপসংহার : বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের মন ও মানসকে দারুণভাবে প্রভাবিত করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমনই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সমভাবে সবার জন্য আন্তরিকভাবে ভালোবাসা পোষণ করতেন। অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের সাহিত্যচর্চা ও রচনাকর্মে বঙ্গবন্ধুর উজ্জ্বল উপস্থিতি এবং ভাবাবেগ ও ভক্তিবাদ সে তথ্যকেই প্রমাণিত করে। তবে জাতীয় ঐতিহ্যিক দায়বোধ থেকেই গ্রামীণ লোকসাহিত্যিকদের এসব রচনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। আর এটা করা গেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের এক অনালোচিত অধ্যায়ের উন্মোচন ঘটবে। এর পাশাপাশি তা বঙ্গবন্ধুচর্চায়ও আগামী প্রজন্মকে নতুন পথের সন্ধান দেবে।

 লেখক : লোকসংস্কৃতি, গবেষক

প্রতিকৃতি : মো. সাইদুল ইসলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares