প্রবন্ধ : হরিশংকর জলদাসের প্রস্থানের আগে : জলমগ্নতা থেকে

জ্ঞানমগ্নতায় উত্তরণের শব্দশস্য : ফজলুর রহমান

প্রস্থানের আগে (২০১৯) উপন্যাসটিতে কথাকারিগর হরিশংকর জলদাস (১৯৫৫) তাঁর আত্মজীবনের বয়ান যে জীবনাভিজ্ঞতায় বুনন করেছেন, তাতে তাঁর জীবন-সত্যের খুব একটা অপলাপ ঘটেনি। বরং এতদিনের লেখক জীবনের বিচিত্র বাঁকবদল ও অনেক অজানা সত্য; কল্পনা ও বাস্তবের সংমিশ্রণে জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে তা একদিকে যেমন লেখককে আত্মানুসন্ধানে নিমগ্ন করেছে; সেই সঙ্গে এ কাহিনি-রস পাঠককে উদগ্র এক জীবনতৃষ্ণার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বৃহদায়তন এই উপন্যাসের সৃজনভূমিতে দাঁড়িয়ে লেখক জীবনের রন্ধ্রেরন্ধ্রে ঘূর্ণায়মান নোনাজলের নোনাসংগ্রামের দলিত ইতিহাসের মেদ-মজ্জা-অস্থি-কঙ্কালের পুনর্খননের মাধমে পুরুষানুক্রমে সে ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার ও পুনর্পাঠ ঋজু গদ্যে উপস্থাপন করেছেন। দহনকাল (২০১০) ও জলপুত্রে (২০১২) লেখক পিতামহ এবং পিতার জলজীবনের লোবানগাঁথার যে পটচিত্র উন্মোচন করে পাঠকে ভাঙন ও বিপর্যয়ের নোনাস্বাদে অতৃপ্ত রেখেছিলেন; প্রস্থানের আগে উপন্যাসে সেই সমুদয় বিপ্লাবনের বেনোজলকে মথিত করে অম্ল-মধুর রসে তাকে রসাসিক্ত করে তুলেছেন। দহনকাল, জলপুত্র এবং প্রস্থানের আগে উপন্যাসের মধ্য দিয়ে লেখক আসলে তাঁর পূর্বপুরুষ হতে উত্তরপুরুষের রক্তকোষে বহমান সংগ্রামমুখর জলোস্বরকে শব্দের মানচিত্রে মূর্তমান করে তুলেছেন। এ সত্যের অনুরণন লক্ষ করা যায় তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনা নোনাজলে ডুবসাঁতার (২০১৮) গ্রন্থের আত্মস্বীকারোক্তিমূলক জবানিতে :

মূলত আমি চেয়েছিলাম পূর্বপুরুষ, তাঁদের সমুদ্র সংগ্রামী জীবন, তাদের সমাজ এবং আমার জীবন নিয়ে তিনটি উপন্যাস লিখতে। জলপুত্রে পিতামহের, দহনকালে পিতার এবং অলিখিত উপন্যাসে আমার কাহিনি থাকবে। দহনকালের শেষাংশে সে রকম একটা ইঙ্গিত আছে। রাধানাথ চেয়েছে, সমুদ্র অভিশাপ থেকে তার পুত্র হরিদাস মুক্তি পাক। ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে রাধানাথ বুঝেছিল মুক্তির একমাত্র পথ শিক্ষিত হওয়া। তাই পুত্রকে সকল কিছুর বিনিময়ে পড়ালেখা শেখাতে চেয়েছিল রাধানাথ। সেটা হরিদাস অনুধাবন করেছিল। উপন্যাসটির শেষাংশে, হানাদার পাকিস্তানি মেজর রাধানাথকে গুলি করে হত্যা করেছে। পাড়া ছেড়ে চলে যাবার পর গর্ত থেকে হরিদাস উঠে এসেছে। শরীরে অদ্ভুত এক কাঁপন নিয়ে বাপের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসেছে হরিদাস।

হঠাৎ করে হরিদাসের চোখে একটি দৃশ্য ভেসে উঠল- বাপ রাধানাথ ছেলে হরিদাসের হাত ধরে আদাবস্যারের বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। বাবার ক্ষীণ অথচ স্পষ্ট কণ্ঠও যেন সে শুনতে পেল এই সময়। বাবা বলছে, ‘আরও ইক্কিনি জোরে হাঁট অ – বাআজি।’

হরিদাস গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বাবার আকুলতাময় চোখে চোখ রেখে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘বাবারে, তোঁয়ার কথা রাইখ্যাম আঁই। আঁই হাঁইট্যম, আরও আরও জোরে সামনের মিক্কে হাঁডি যাইয়ম আঁই।’

সামনের দিকে মানে আলোর দিকে হেঁটে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে এখানে। অশিক্ষিত, অমার্জিত জেলেজীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার তীব্র বাসনার কথা ধ্বনিত হয়েছে দহনকালে। আসলে ওই বৃত্ত থেকে বেরোতে চাইনি আমি, অন্তত আরেকটা উপন্যাস লেখা পর্যন্ত। ওই অলিখিত উপন্যাসে আমার নোনাজলের ডুবসাঁতারের কাহিনি থাকবে। থাকবে আমার স্ত্রী আর সন্তানদের কথা। আমাকে ঘিরে যে সভ্যশিক্ষিত মানুষের আবর্ত এবং সেই আবর্তে কীভাবে আমি ঘূর্ণিত হচ্ছি, তার কথা থাকবে পরবর্তী উপন্যাসে। জলাবর্ত থেকে মুক্তি পেয়ে জনাবর্তে ঘূর্ণিত হতে হতে আমার যে জীবনচর্চা, তারই কথা লিখবার বাসনা ছিল মনে মনে।১

লেখক হরিশংকর জলদাসের সুপ্ত মনোরথের সার্থক রূপায়ণ লক্ষ করা যায় প্রস্থানের আগে উপন্যাসের কাহিনিবৃত্তে। বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে থাকা সাতষট্টি বছর বয়স্ক শিবশঙ্কর জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে। তাঁর আভূমা স্পর্শকারী জীবনাবেক্ষণের চিত্রার্পিত পর্দা উন্মোচনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনিসূত্র গ্রন্থিত হলেও পরবর্তী পরিচ্ছেদেই লেখক শিবশঙ্করের আঁতুরঘর উত্তর পতেঙ্গার জেলেজীবনে প্রবেশ করেছেন। সমুদ্রের নোনাজলের বিক্ষুব্ধ ঝঞ্ঝা, মাছের আঁশটে গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা বাতাস; অপরিসর, অপরিচ্ছন্ন যে জেলেপাড়াকে সব সময় সভ্য দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে; সেই জেলেপাড়া উত্তর পতেঙ্গার কর্মঠ জেলে সুধাংশু জলদাস জীবনের ঊষালগ্নেই চেয়েছেন তার পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ সন্তানদের অন্তত যে কোনো একজনকে জলদাস পরিচয় হতে মুক্ত করতে। তাঁর  জ্যেষ্ঠপুত্র শিবশঙ্কর পিতার এই সংকল্পকে স্বানুভাব দ্বারা লালন করে মাধ্যমিক পাসের মধ্য দিয়ে অশিক্ষিত জেলে সমাজে এক ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। জীবনযুদ্ধে হার না মানা দ্বৈরথ সুধাংশুর স্বপ্নরথে চালকের আসনে উপবিষ্ট হয় শিবশঙ্কর। যে গ্রামে বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা, শিক্ষার আলো নেই; এমন একটি পশ্চাৎপদ গ্রামের জেলেপুত্র শিবশঙ্কর পতেঙ্গা হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে সে মূলত নিজেকে নয়, বাবা সুধাংশু জলদাসকেই জয়ী করে তুলেছে :

গোটা জীবন নোনাজলে ডুবসাঁতার দেওয়া সুধাংশু ছেলেকে বলেছিল, তুই আমাকে জয়ী করলি বাপ। এতদিন আমি ছিলাম পরাজিতের দলে। সমুদ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে নেমে বারবার হেরেছি। যতবার হেরেছি, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে বলেছিÑ দেখে নিস বঙ্গসাগর, একদিন আমি তোকে হারাবই। আমি নিজে তোকে হারাতে পারব না, কিন্তু আমার পরিবারের কেউ না কেউ একদিন তোকে পরাজিত করবেই। দেখ সমুদ্র, সাত সাতটি ছেলেমেয়ে আমার। এদের মধ্যে অন্তত একজন তোর ঢেউয়ের ওপর উঠে বসে তোর ঝুঁটি চেপে ধরবে। আজ দেখ, আমার বেটা শিবশঙ্কর তোর দিকে  পেছন ফিরে কলেজে গেছে। সে এখন তোর দাস নয়, সে জলদাস নয়,  সে এখন মা সরস্বতীর দাস। সে আমার মতো তোর ক্রীতদাস হবে না। সে তোকে উপেক্ষা করবে। সে একদিন তোর পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে বলবেÑ হে বঙ্গসাগর, আজ আমি আমার বংশকে তোর গোলামি থেকে মুক্ত করলাম। আমি জেলে সম্প্রদায়ের ভগীরথ।২

পথের পাঁচালী  ও অপরাজিত উপন্যাসের অপুর যেমন পুনর্জন্ম ঘটেছিল স্বীয় আত্মজ কাজলের চব্বিশ বছর পরে নিশ্চিন্দিপুরে ঘন কুঁচকাঁটা ও শ্যাওড়া আচ্ছাদিত ঠাকুরদার পোড়ো ভিটেয় ফিরে; তেমনি যুধিষ্ঠির জলদাসের আত্মজ হরিশংকর জলদাসের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে প্রস্থানের আগে উপন্যাসের জলজীবী সুধাংশু জলদাসের প্রবহমান রক্তের ধারক; কিন্তু জলপুত্রের গোত্র পরিচয় অপনোদনকারী শিক্ষিত হয়ে ওঠা পুত্র শিবশঙ্করের মধ্য দিয়ে। ব্যক্তি হরিশংকর জলদাস জলজীবনে জন্মগ্রহণ করেও শিক্ষার আলোকে শেকড়ের মতো আঁকড়ে ধরে জলমগ্নতা থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞানমগ্নতায় অন্বিত হয়েছেন। উপন্যাসের শিবশঙ্করও পূর্বপুরুষের অধীত জীবনাভিজ্ঞতার পাঠগ্রহণ করে; তাঁদের চর্চিত অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনযাত্রার গণ্ডি পেরিয়ে আলোকমালার দিকে ক্রমঅগ্রসর হয়েছেন। অপরাজিত উপন্যাসে কাজলের ওপর অপুর পূর্বপুরুষের অদৃশ্য আত্মার আশীর্বাদ ছিল :

জায়গাটা খুব উঁচু ঢিবিমতো। কাজল এদিক ওদিক চাহিয়া ঢিবিটার উপরে উঠিল।… মুখ উঁচু করিয়া সে ঝিক্ড়ে গাছের ঘন ডালপালার দিকে উৎসুক চোখে দেখিতে লাগিল। এক ঝলক হাওয়া যেন পাশের পোড়ো ঢিবিটার দিক হইতে অভিনন্দন বহন করিয়া আনিলÑ সঙ্গে সঙ্গে ভিটার মালিক ব্রজ চক্রবর্তী, ঠ্যাঙাড়ে বীরু রায়, ঠাকুরদাদা হরিহর রায়, ঠাকুরমা সর্বজয়া, পিসিমা দুর্গাÑ জানা-অজানা সমস্ত পূর্বপুরুষ দিবসের প্রসন্ন হাসিতে অভ্যর্থনা করিয়া বলিলÑ এই যে তুমি আমাদের হয়ে ফিরে এসেছ, আমাদের সকলের প্রতিনিধি যে আজ তুমিÑ আমাদের আশীর্বাদ নাও বংশের উপযুক্ত হও। ৩

তাঁদের পূর্বপুরুষের এই আশীর্বাদ কাজলের কল্পনার দুনিয়াকে রঙিন স্বপ্নমেদুর করে তুলেছে। ঠিক একই আশীর্বাদে সিক্ত হয়েছেন শিবশঙ্কর জলদাস। পিতামহ দাতারাম জলদাস, পিতা সুধাংশু জলদাস, পিতার মামা জগবন্ধু জলদাসের আশীর্বাদপুষ্ট শিবশঙ্করের জীবন এইসব পূর্বপুরুষের অতৃপ্ত স্বপ্নসাধনে ও মনোবাঞ্ছা পূরণে জ্ঞানের আলোয় বর্ধিত হয়েছে। পূর্বপুরুষের বর্ণ পরিচয় ও শ্রেণি অবস্থানকে পাল্টে দিয়ে পুরো উপন্যাস জুড়ে শিবশঙ্করের যোগ্যতম উত্তরপুরুষে রূপান্তরিত হওয়া ও ফিরে আসার সাধনায় অভিব্যক্ত হয়েছে।

উত্তর পতেঙ্গা গ্রামের শিক্ষিত হোমিওপ্যাথি ডাক্তার অলক চক্রবর্তী চাননি শিবশঙ্কর শহরে ভালো কলেজে ভর্তি হোক, উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠুক। এজন্য তিনি শিবশঙ্করকে উত্তর পতেঙ্গার কাছাকাছি বেসরকারি সিটি কলেজে ভর্তি হতে বলেছিলেন। অলক চক্রবর্তী চাননি তার চেয়ে অধিক শিক্ষিত কেউ তার গাঁয়ে বেড়ে উঠুক। অলক চক্রবর্তীর পরামর্শ আমলে না নিয়ে সুধাংশ ছেলে শিবশঙ্করকে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। কলেজ জীবন শেষ করে একই কলেজে বাংলা বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন শিবশঙ্কর। আধুনিক জীবন ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে পড়া, দলিত জেলে সমাজের জন্য শিবশঙ্করের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ঘটনাটি ছিল অভাবনীয়। উত্তর পতেঙ্গার জেলে সমাজে ও সম্প্রদায়ের কাছে শিবশঙ্কর ক্রমশ স্রোতের বিপরীতে চলমান এক ব্যতিক্রমী চরিত্রে পরিণত হন। শিক্ষার স্বর্গীয় আলোয় তার জীবনের নবোন্মেষ ঘটে। তার পূর্বপুরুষ জল ও জেলেজীবনকে আঁকড়ে ধরে, শিক্ষার আলো হতে প্রবঞ্চিত হয়ে এতদিন যে জমাট অন্ধকারের তলানিতে বসবাস করেছে; শিবশঙ্কর সাহসী ডুবুরির মতো সে তলানি সেঁচে সেখানে জ্ঞানের সলতে জ্বালিয়েছেন। শত ঝড়, ঝঞ্ঝা, সংগ্রামমুখর অপ্রতিকূল প্রতিবেশে সে নিবু নিবু সলতের টিমটমে আলো নিভে যায়নি।

উত্তর পতেঙ্গার জেলে পাড়া  থেকে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের দূরত্ব প্রায় বারো-তেরো মাইল। এই দীর্ঘ পথক্লান্তি শিবশঙ্করের পড়ালেখাকে বাধাগ্রস্ত করলেও নিজের সাথে লড়াই কওে সেই উচ্চমাধ্যমিকের দোরগোড়া ভালোভাবে অতিক্রম করে যান। অনার্সে ভর্তির পর দূরত্বের সমস্যার কারণে নিয়মিত ক্লাস করার বিষয়টি দুরূহ হয়ে পড়ায় শিবশঙ্কর পিতা সুধাংশু জলদাসের সম্মতিক্রমে সুধাংশুর মামা জগবন্ধু জলদাসের মাইজপাড়ার বাড়িতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই মাইজপাড়াতেই শিবশঙ্করের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। মাইজপাড়ায় ছেলেকে রেখে পড়ানোর ব্যাপারটিতে মা অহল্যা দোমনা ভাব দেখালেও সুধাংশুর স্থির সিদ্ধান্তের কাছে তা টেকেটি। এই পাড়ার এক কিলোমিটারের মধ্যে সাহেবপাড়া বা বেশ্যা পাড়ার অবস্থান। সাহেবপাড়া অহল্যার মাতৃমনকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। ছেলে অধঃপাতে যেতে পারে অহল্যার এমন শঙ্কাকে সুধাংশু উড়িয়ে দিয়েছিল। ছেলে শিবশঙ্করের চোখে সুধাংশু বড় হওয়ার স্বপ্নটাকেই সেদিন বড় করে দেখেছিলেন।

সুধাংশুর মামা জগবন্ধুর বাড়িটি মাইজপাড়ায়। কর্ণফুলীর পার ঘেঁষে মাইজপাড়া জেলেপল্লিটির অবস্থান। এ পল্লিটিতে বসবাসরত অধিকাংশ মানুষ জেলে এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থান বিচারে তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র ও সামাজিক মান-মর্যাদার দিক থেকে নিম্নস্থানীয় ও নিম্নস্তরীয়। লেখকের বর্ণনায় মাইজপাড়ার দরিদ্র জেলে জনজীবনের চিত্র বাস্তবানুগ হয়েছে-

সুধাংশুর মামাবাড়ি কর্ণফুলীর পাড়ে, মাইজপাড়ায়। সে পাড়ায় গোটা পঞ্চাশেক পরিবার। ওপাড়ার কেউ নদী সমুদ্রে মাছ ধরে, কেউ হাটে বাজারে মাছ বিক্রি করে। ছনে-ছাওয়া ঘর তাদের। সবার ঘর যে দাঁড়িয়ে আছে, এমন নয়। কোনো বছর টাকার অভাবে ঘরদোর মেরামত করতে না পারলে ঘরটি সামনের বা পেছনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন পড়ন্ত কলাগাছের মতো বাঁশের ঠেঁস দেয় জেলেরা। বর্ষার সময় চালের ফুটো দিয়ে টপটপ জল পড়ে। ৪

জগবন্ধুর আর্থিক অবস্থা পাড়ার অন্য জেলেদের মতো এতো সঙ্গীন নয়। তার ঘরটি শক্তপোক্ত। তাঁর নিজস্ব জাল ও নৌকা আছে। তিনি মাইজপাড়া জেলেদের সর্দার। তিনি নিজে একজন শক্ত সামর্থ্য জেলে। নিজস্ব জাল ও নৌকা নিয়ে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরে চলে তার মাছ ধরার দুঃসাহসিক অভিযান। উত্তাল বঙ্গোপসাগরে একা মাছ শিকার করা দুরূহ ব্যাপার এজন্য এ সময়ে জগবন্ধু দুই-তিনজন গাউর বা সাহায্যকারী সঙ্গে নেন। পাড়ার হরিধন ও হিমাংশু তার সঙ্গী হয়। বড় বড় ঢেউকে বশ করে জীবন বাজি রেখে গহিন ঘূর্ণিজল সেঁচে সে যে জলশস্য তুলে আনে তা আবার জেলেদের নিয়মে ভাগাভাগি হয়-

নৌকা জলে ভাসিয়ে মাছ ধরে জগবন্ধু। কখনও একা, কখনও তিনজন মিলে। কর্ণফুলীতে যখন জাল বায় বা বড়শি ফেলে, তখন জগবন্ধু একা যায়। যখন বঙ্গোপসাগরে বড়শি ফেলতে যায়, তখন পাড়ার হরিধন আর হিমাংশুকে সঙ্গে নেয়। সাগরে স্রোত আর ঢেউয়ের রাজত্ব। জনবল খুবই দরকার। একজনকে হালে বসতে হয়। বড়শি ছিটাতে দুইজন লাগে। তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর বড়শির রশি জোর টানতে হয়। কর্ণফুলীতে মাছ কম, সাগরে বেশি। ঘোঁওড়া, ছোট মাঝারি হাঙর, সুন্দরী, মাইট্যা, গাউঙ্গা এসব। মাছ বিক্রির টাকা চার ভাগে ভাগ হয়। তিনজনে তিন ভাগ নৌকার এক ভাগ।৫

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে পদ্মার গহিন জলে কুবের, গণেশ, ধনঞ্জয়ের ইলিশ মাছ ধরার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল নোনাজলে জগবন্ধুর মাছ ধরার দৃশ্যটির স্থানিক পার্থক্য থাকলেও; পেশাজীবী শ্রেণি অবস্থানের দিক বিবেচনায় ধনঞ্জয়ের সঙ্গে জগবন্ধুর সাদৃশ্য বিদ্যমান। মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত লোকবলের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি বা বণ্টনে দরিদ্র জেলেকে ঠকিয়ে জাল ও নৌকার মালিককে বেশি অর্থ প্রাপ্তির যে  বৈষম্যের চিত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একদা পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে তুলে ধরেছিলেন, হরিশংকর জলদাসের প্রস্থানের আগে উপন্যাসে জগবন্ধুর মাছ ধরার অর্থ-বণ্টনে সে চিত্রের অনুরণন লক্ষ করা যায়।  বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে পদ্মা পারের জেলে জীবনে এই বৈষম্যের চিত্র প্রতিঅঙ্কিত করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-

নৌকাটি ধনঞ্জয়ের সম্পত্তি। জালটাও তারই। প্রতি রাত্রে যত মাছ ধরা হয় তার অর্ধেক ভাগ ধনঞ্জয়ের, বাকি অর্ধেক কুবের ও গনেশের।৬

জেলে সমাজে হতদরিদ্র জেলেদের যুগ যুগ ধরে প্রবঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সমুদ্রপারের জেলে জীবনের চিত্রাঙ্কনে হরিশংকর জলদাসের মৌলিকত্ব ও মুন্সীয়ানা বিতর্করহিত হলেও কালিক ব্যবধানে তিনি জেলেজীবন ও জেলেসমাজের আর্থসামাজিক স্তরবিন্যাসে; অর্থ-উপার্জনে দরিদ্র ও অপেক্ষাকৃত অর্থশালী জেলেদের ক্রমবিভাজন ও ক্রমবৈষম্যের চিত্রাঙ্কনে দীর্ঘদিনের ইতিহাস বিস্মৃত হননি।

জগৎহরি নামে ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাসের এক ঠাকুরদা ছিলেন। তিনি ছিলেন হরিশংকরের বাবা যুধিষ্ঠিরের মামা। লেখকের বিধবা ঠাকুরমা পরানেশ্বরী জীবনের এক ক্রান্তিকালে ঘোর বিপদের দিনে ভাই জগৎহরির কাছে মাইজপাড়ায় পিতৃহীন একমাত্র ছেলে যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে আশ্রয় লাভ করেছিলেন। লেখক জগৎহরিকে ‘বোনাই’ বলে ডাকতেন। পরবর্তী সময়ে লেখক ঐ মাইজপাড়ায় জগৎহরি ঠাকুরদার বাড়িতে থেকে এসএসসি পাস করেন। নোনাজলে ডুঁবসাতার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে সে প্রসঙ্গের উল্লেখ করে হরিশংকর লিখেছেন-

জগৎহরি বোন পরানেশ্বরীকে বলল, ‘মা-বাবা নেই তো কী হয়েছে? আমি তো আছি। এই জগৎহরি আছে। আমি থাকতে ভাগনে যুধিষ্ঠির কার কাছে যাবে। চলো মাইজপাড়ায়। তোমার বাপের ভিটায়, তোমার জন্মস্থানে। আমার ছোট ঘরটির এক পাশে একটা চালাঘর তুলে থাকবে তোমরা।’… উত্তর পতেঙ্গা থেকে মাইজপাড়া, রাস্তা ধরে গেলে সাত- আট-মাইল। ঘাপচি-ঘুপচি মেঠোপথ। জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য তেমন গাড়ি ছিল না। রাস্তা না থাকলে গাড়ি থাকবে কোত্থেকে? ভরসা ঘোড়ার গাড়ি বা গরুর গাড়ি। এসব গাড়িতে করে মাইজপাড়া পর্যন্ত যাওয়ার মতো টাকা পরানেশ্বরীর কোঁচড়ে নেই। তাই সাম্পানই ভরসা। জগৎহরির স্ত্রী জগতেশ্বরী সাদরে গ্রহণ করল ননদ আর ভাগনেকে। পরানেশ্বরী জগৎহরির কুঁড়ে ঘেঁষে একচালা তুলল একটা। চাটগাঁইয়ারা বলে ইয়াচালা। শণের ছাওয়া, বাঁশের বেড়া। পাশে এঁদো পুকুর। সেখানে হাজার লক্ষ মশার ঘরসংসার। এই পুকুরটা আমি দেখেছি। অনেক অনেকবার গেছি বোনাইয়ের বাড়িতে। আমার বালকবেলা, কৈশোর সময়, তারুণ্যের প্রারম্ভকালের প্রায় সবটুকু কেটেছে মাইজপাড়াতে। আমি এসএসসিটাও দিয়েছি বোনাইয়ের বাড়িতে থেকে।৭

প্রস্থানের আগে উপন্যাসে জগবন্ধুর চরিত্র নির্মাণে লেখক স্পষ্টতই জগৎহরির ছায়ামূর্তিকে মূর্ত করে তুলেছেন। স্ত্রী বিজয়া, তিন কন্যা সাধনবালা, আরতি এবং উজলাকে নিয়ে জগবন্ধুর মাইজপাড়ায় অন্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সচ্ছল জেলেজীবন। তাঁর কোনো পুত্র সন্তান নেই। স্ত্রী বিজয়া আত্মভোলা প্রকৃতির রমণী। মেয়ে তিনজনের একজনও লেখাপড়া শেখেনি, কারণ মেয়েদের পড়ালেখা করানোর কোনো রেওয়াজ নেই জেলেপাড়ায়। এ পাড়ায় জগবন্ধুর বাড়ির পশ্চিমমুখী মূল ঘরের সঙ্গে লাগানো ইয়াচালায় শুরু হয় শিবশঙ্করের জীবনের এক দার্ঢ্য অধ্যায়। সে এই জেলেজীবনে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। পাখিডাকা, শিশিরস্নাত ভোর এখানে হয় না। বাতাসে জাল ও মাছের আঁশটে গন্ধ। মাইজপাড়ায় পুব ও পশ্চিম দিকে দেশীয় ও বোম্বাইয়া মার্চেন্টদের বিশাল বিশাল গোডাউন। বড় বড় জাহাজ থেকে নামানো নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ব্যবসায়ীরা সেসব গোডাউনে মজুত রাখে। প্রয়োজনের সময়ে সে সমস্ত মাল তারা বেশি দামে বাজারে ছাড়ে এবং টু-পাইস ইনকাম করে।

উপন্যাসের বিস্তৃত পটভূমিতে অসংখ্য চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন লেখক। শহরের মূল রাস্তার ধারে কর্ণফুলীর পাড় ঘেঁষে অপেক্ষাকৃত নিচু কালো মাটিতে গড়ে ওঠা মাইজপাড়াটিকে ঘিরে কাহিনির একটা বড় অংশের পাত্রদের জটিল আবর্তন লক্ষ করা যায়। এসব চরিত্রের একদিকে যেমন রয়েছে গ্রাম্য সরলতা, পরোপকার মনস্কতা; অন্যদিকে রয়েছে কোন্দলপ্রবণতা, হিংসা, দ্বেষ, অবৈধ প্রণয় ও কামলিপ্সুতা। জগবন্ধুর বাড়ি ঘেঁষে বসবাস করে তার চাচাতো ভাই হরিবন্ধু। জগবন্ধু হরিবন্ধুর চেয়ে বয়সে বড় এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে সদভাব বজায় থাকলেও ছিপাতলি গাঁয়ের মেয়ে ফুলমালা হরিবন্ধুর ঘরে বউ হয়ে আসার পর থেকে দুই পরিবারের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফুলমালার স্বভাব-চরিত্র ভালো ছিল না। জেলে পেশা থেকে বিমুখ দরিদ্র হরিবন্ধু সংসারের ভার লাঘব করতে একদা খান অ্যান্ড খান ব্রাদার্সে কুলির খাতায় নাম লেখায়। একদিন ট্রাক থেকে পণ্য বোঝাই বস্তা নামাতে গিয়ে কোমরে চোট পেয়ে হরিবন্ধু শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। তারপর সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নেয় ফুলমালা। খান অ্যান্ড খান ব্রাদার্সে চাল-ডাল ঝাড়া-বাছার কাজ নেয় সে। কখনও কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে তার রাত হয়ে যায়। হাভাতে সংসারের ক্ষুধার্ত মুখে অন্ন জোগাতে গিয়ে ফুলমালা কোম্পানির ম্যানেজার সালামের সঙ্গে অবৈধ শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সালামকে দেহদানের মধ্য দিয়ে একদিকে হরিবন্ধু থেকে অপূর্ণ কাম বাসনা যেমন সে চরিতার্থ করেছে; অন্যদিকে বাড়তি অর্থ-প্রপ্তির মধ্য দিয়ে সংসারের অভাব অনটন দূর করতে সমর্থ হয়েছে। তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম সন্তান রাখাল হরিবন্ধুর ঔরসে জন্মালেও পরের দুই ছেলে পিন্টু ও ঝন্টুর ক্ষেত্রে ফুলমালা স্বীয় গর্ভাশয়ে সালামের শুক্রবীজ ধারণ করেছে। হরিবন্ধুর পিতৃপরিচয়ে তারা লালিত ও পালিত হলেও লেখক ফুলমালার অবদমিত কামবাসনাকে উসকে দিয়ে জেলে সমাজে অবৈধ দেহদান, সন্তান উৎপাদন ও তার পিতৃপরিচয় প্রতিপাদনের দিকটা তমসাচ্ছন্ন করে তুলেছেন। ফুলমালা তার গর্ভে অবৈধ সন্তান ধারণের প্রসঙ্গটি হরিবন্ধুকে অবহিত করলে হরিবন্ধু রাগে-ক্ষোভে গর্জে উঠলে ফুলমালাও স্বামীর অক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তীব্র কটু বাক্যবাণে হরিবন্ধুকে ধরাশায়ী করেছে  :

ফুলমালা চাপা অথচ কর্কশ কণ্ঠে বলল, চিৎকার করো, করো চিৎকার। চিৎকার পাইড়া কও, আমার বউ আমার লগে না ফুইত্তা পেড বাজাইছে। মানুষেরে বিশ্বাস করাইতে পাইরবা নি তুমি? কোমর গেলে কী হইবে, শরীর তো সুস্থসবল। তুমি যে নপুংসক হইয়া গেছ মানুষে বিশ্বাস কইরব নি?

হরিবন্ধু বউয়ের কথার কী জবার দেবে বুঝে উঠতে পারে না। গর্জন করে ওঠে, ‘খানকি’

‘খানকি হইছি কি আমার জইন্য? এই যে প্রতিদিন ভালা ভালা মাছ দিয়া ভাত খাইতাছ, ভালামন্দ পরতাছ, আজকাল যে খাডে শুইতাছ সব তো সালাম সাবের দয়ায়। তাছাড়া আমারও শরীরের খিদা আছে, আমার মনও তো চনমন কইরে উডে মাঝে মইধ্যে।’ চাপা কর্কশ কণ্ঠে বলে ফুলমালা।৮

মাইজপাড়া জেলেপাড়াটিতে নারী- পুরুষের অবৈধ প্রণয়; যুবতী নারীর পুরুষাসক্ত ও দেহদানের ব্যাপারগুলো অলিখিত বিধিবদ্ধ ঘটনা। যা প্রকাশ্যে অনিয়ম ও অনৈতিক, গোপনে তাই-ই দীর্ঘদিনের নিয়ম বলে আচারিত ও স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ পাড়ায় বসবাসরত বাসিন্দাদের জীবন নানা পঙ্কিলতার পাঁকে আচ্ছন্ন। শিক্ষার আলো বঞ্চিত অনগ্রসর এ জনগোষ্ঠীর জীবনাচারে রয়েছে চালাকি-হতাশা- হাহাকার- শঠতা-ধূর্তামি। যাপিত জীবনে তারা নিজেরা অধঃপাতে গিয়ে স্বীয় ভাগ্যকে যেমন কালিমালিপ্ত করে; তেমনি অন্যের জীবনকেও তমসাচ্ছন্ন করে তোলে। প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে এরা সুস্থ জীবনচর্চা থেকে যেমন বিযুক্ত; তেমনি প্রজন্মান্তরে অশিক্ষা, কুপ্রথা ও কুসংস্কারের ধারক। এই সমাজের সর্পিল পথ ধরে শিবশঙ্করের শিক্ষাজীবন এগিয়ে চললেও এদের ছোঁয়াচ থেকে সে জীবন বিমুক্ত হতে পারেনি। তাই মাইজপাড়ার বখে যাওয়া অশিক্ষিত যুবক তুফান, মঙ্গল ও কেষ্টর সঙ্গে এক সময় তার বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়। মাইজপাড়ায় এক কুলি গুণ্ডার হাত থেকে শিবশঙ্করকে বাঁচায় তুফান, মঙ্গল ও কেষ্ট। সেই থেকে এরা তিনজন শিবঙ্করের বন্ধু হয়ে যায়। এদের সংস্পর্শে এসে শিবশঙ্করের কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে নঞার্থক জীবনাভিজ্ঞতার রস সঞ্চয়নে, জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে ব্রতচ্যুত হবার উপক্রম দেখা দেয়।

মাইজপাড়ায় যদুনাথের ছেলে জনার্দন, তার ছেলে কেষ্ট। যদুনাথের অভাবের সংসার। ঘরে স্ত্রী, বিধবা দুই বোন। পাতনিজাল ফেলে সে কর্ণফুলীতে মাছ ধরে। দিন এনে দিন খায়। তবে সে মানুষকে গালাগালি দেওয়াতে ওস্তাদ। দুনিয়ার সব কিছুকে উদ্দেশ্য করে সে গালি দিতে পারে। একদিন তার জাল ছিঁড়ে গেলে সে পরিবার-পরিজন নিয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে পতিত হয়। মনির আহমেদ নামক তখন এক ব্যক্তি তাকে একশো টাকা অ্যাডভান্স দেন তার প্রতিপক্ষ রইসউদ্দিনকে গালি শোনানোর জন্য। মনির আহমদ ও রইসউদ্দিনের মধ্যে জমি সংক্রান্ত মামলা চলছিল। রইসউদ্দিন মনির আহমদকে খুব গালি দিত। গালির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মনির আহমদ যদুনাথকে টাকা দিয়ে রইসউদ্দিনকে গালি দেওয়ার জন্য ঠিক করে। যদুনাথের অশ্রাব্য অকথ্য গালির তোড়ে রইসউদ্দিন ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। রইসউদ্দিনকে দেখে তার মুখে বন্যার স্রোতের মতো গালির স্রোত বইতে শুরু করে। ডান হাতের তর্জনী বাগিয়ে চোখ লাল করে আকাশ ফাটিয়ে যদুনাথ বলতে শুরু কওে- ‘অ তোর মারে চুদি রইস্যা। তুই কারে গালি দেস চুতমারানির পোলা। তোর মায়ের …আমি ফালাফালা কইরা ছাইড়া দিমু।’৯

বিচিত্র জীবনাভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ লেখক হরিশংকর জলদাসের মসীতে কৈবর্ত সমাজের বিচিত্র চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে। আর্থিক অনটনের কারণে কৌতূহলের বশে জেলে যদুনাথ পেশা পরিবর্তন করে গাউল্যা যদুনাথে পরিণত হয়েছে এবং তার পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশাকে জীবিকা অর্জনের পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের বাড়ি গাউল্যার বাড়ির তকমা লাভ করেছে। মাইজপাড়া কৈবর্ত সমাজে বংশ পরম্পরা তাদের এই আচরিত পেশাকে মানুষ ঘৃণার চোখে দেখেছে। যদুনাথের স্ত্রী রামকালীও একসময় স্বামীর সঙ্গে ঘৃণিত এই পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। যদুনাথের পুত্র জনার্দন এই পেশাকে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলে এই বংশের তৃতীয় পুরুষ জনার্দনের ছেলে কেষ্ট আত্মদাহে দগ্ধ হয়েছে। বন্ধু মহলে কেষ্ট গাউল্যার  পোলা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে; যা তার আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাকে দারুণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত করেছে। মাইজপাড়ার পার্শ্ববর্তী পতিতাপল্লি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গড়ে ওঠে। পরিবার পরিজন ছেড়ে আসা স্ত্রী আসঙ্গ বঞ্চিত ইংরেজ নওজোয়ান যোদ্ধারা তাদের দেহজ্বালা মেটাতে ও দেহকে কামনির্ভার করতে মাইজপাড়ার পার্শ্ববর্তী পতিতাপল্লির জেলেবধূ হতে শুরু করে কুমারী নারীদের ওপর সাওয়ার হতো। অভাব ও দারিদ্র্যের তাড়নায় এসব নারী টাকার বিনিময়ে দেহদান করত। সেই থেকে পতিতাপল্লিটি লোকমুখে সাহেবপাড়া বলে পরিচিত হয়ে আসছে। মাইজপাড়ার বখে যাওয়া অনেক তরুণই সাহেবপাড়ার অন্ধকার ঘুপচি ঘরগুলোতে বারবিলাসীদের অঙ্কশায়িনী হয়ে দেহক্ষুধা নিবারণ করে।

মাইজপাড়ায় তরুণের সংখ্যা কম নয়।… বিবাহিতরা স্ত্রীকেই সকল বিনোদনের আধার মনে করে। অবিবাহিত তরুণদের কেউ কেউ অকালবোধনের দেহজ্বালা সাহেবপাড়ায় গিয়ে মিটায়।১০

সাহেবপাড়ার কাছে লায়ন সিনেমা হলে ব্লাকে টিকিট বিক্রির কাজ করতে গিয়ে পতিতাপল্লির  যৌনকর্মী লাস্যময়ী লাভলির সঙ্গে কেষ্টর পরিচয় ঘটে। লায়ন সিনেমা হলে অধিকাংশ খাঁউরা সিনেমা দেখতে আসে। তুফান, মঙ্গল, কেষ্টর জন্ম মাইজপাড়াতে। তাই সেই হলে লাভলির সঙ্গে পরিচয় ঘটে কেষ্টর এবং তারপর থেকে সে লাভলির বাঁধাবাবু হয়ে যায়। সাহেবপাড়ায় তাদের গমনাগমন জলের মধ্যে মীনের বিচরণের মতো সহজাত এবং তা বংশগত ধারা ও প্রথার অলিখিত অনুমোদন সিদ্ধ ঘটনা বলে বিবেচিত। তবে শিক্ষার শেকড় আঁকড়ে ধরা জেলেপুত্র শিবশঙ্করের কাছে নিষিদ্ধপল্লির অনেক কিছুই অবিদিত। কেষ্ট যে লাভলির বাঁধাবাবু সে কথা কেষ্টর মুখে শুনে শিবশঙ্কর ‘বাঁধাবাবু’র অর্থ বোঝেনি। ‘খাঁউ’ শব্দটির অর্থ যে ‘বেশ্যা’ এ কথাও তার অজানা।

বাঁধাবাবু শব্দটির সঙ্গে শিবশঙ্করের পরিচয় নেই। আগে কখনও শোনেনি শব্দটি। মানেও জানে না। এটি বেবুশ্যেপাড়ায় প্রচলিত শব্দ। তুফান-মঙ্গলরা জন্মের পর থেকেই পতিতাপল্লির অদূরে বসবাস করে আসছে। তাদের কাছে অভীক, ডালিম, কাপাখানা, খেপলু, কামোর, গাঁক, ছাব্কিবাজÑ এসবের মানে স্পষ্ট। কিন্তু শিবশঙ্করের কাছে ওই জগৎ এবং ওই জগতের শব্দনিচয় একেবারে অস্পষ্ট এবং দুর্বোধ্য। তাই ‘বাঁধাবাবু’ শব্দটি শুনে শিবশঙ্কর চমকে ওঠে।১১

লাভলির কাছ থেকে টাকা নিয়ে কেষ্ট, বাবা জনার্দনের জন্য জাল ও নৌকা কিনে দেয়। তার বাবা

‘গাউল্যার’ পরিচয় ঘুঁচিয়ে জেলে হয়ে মাছ ধরা পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়। লাভলির দেওয়া টাকার বিনিময়ে কেষ্ট লাভলির বাঁধাবাবু হয়ে ওঠে। কেষ্ট তার নিজের পুরুষত্ব ও জীবনের আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিয়ে নিজের পরিবারকে ‘গাউল্যার’ পরিবারের নিন্দিত অভিযোগ থেকে মুক্ত করতে পাপের জগতে অনন্যোপায় হয়ে পা বাড়িয়েছে। আত্মস্বীকারোক্তিমূলক জবানিতে এ কথা স্বীকার করে বন্ধু শিবশঙ্করকে তা অকপটে বলেছে কেষ্ট :

আমি লাভলির বাঁধাবাবু।… টাকা দেওয়ার সময় লাভলি আমাকে বলেছিল, তোমাকে এই টাকা ফেরত দিতে হবে না। শুধু আমার পেয়ারে মহব্বত হয়ে থাকবে। আমি যখন চাইব, এ পাড়ায় আসবে এবং আমার সঙ্গে শোবে।… লায়ন সিনেমা হলেই লাভলির সঙ্গে আমার পরিচয়। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। তাই বলে আমি কোনোদিন সাহেবপাড়ায় যাইনি আগে। বাপের জন্য লাভলির থেকে টাকা নেওয়ার পর লাভলির কাছে আমার যাতায়াত শুরু হয়। বাপকে নাও-জাল কিনে দিয়েছি। বাপ তোমার বোনাইয়ের (জগবন্ধুর) মতো নদী সমুদ্রে মাছ ধরে। মানুষরা এখন আমাদের বাড়িকে গাউল্যার বাড়ি বলা কমিয়ে দিয়েছে। একদিন হয়তো বলা থামিয়ে দেবে। কিন্তু সেটা আমার জীবনের বিনিময়ে। ১২

ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাস কেষ্ট চরিত্রের ভেতরে ও বাইরে সর্বদর্শী লেখক দৃষ্টিভঙ্গির প্রক্ষেপণ ঘটিয়ে চরিত্রটির মনস্তত্ত্বে আলো-আঁধারের দৃশ্যকাব্য নির্মাণ করেছেন। একজন নষ্ট হয়ে যাওয়া মানুষের ভেতরেও যে ভালো মানুষটি হওয়ার স্বপ্নবীজ মরে যায় না তা কেষ্টর মধ্যে ফুটে উঠেছে। লাভলির পায়ে নিজের জীবন বর্তে দিয়ে তার বাঁধাবাবু হয়ে মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে লেখক কেষ্টর মানবাত্মার আহাজারিকে মূর্ত করে তুলেছেন।

উপন্যাসের নায়ক শিবশঙ্করের মনে নিষিদ্ধপল্লির ঝলমলে জগৎ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করে মাইজপাড়ায় সঙ্গদোষে নষ্ট হওয়া আর এক যুবক মঙ্গল। শিবশঙ্কর রিজিয়া রহমানের রক্তের অক্ষর মানদা দেবীর শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত প্রভৃতি বই পড়ে জেনেছে বারবনিতাদের জীবন, তাদের দেহবেচাকেনার খবর। বারাঙ্গনা জীবন নিয়ে তার কৌতূহলে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে দেয় মঙ্গল। মুহূর্তেই শিবশিঙ্করের চোখে নিষিদ্ধপল্লির নীলপরীদের মুখগুলো ভাসতে থাকে। মঙ্গল তাঁকে বলে :

‘বড় আনন্দের বাজার রে শিবু। গলির দুপাশে দরজায় দরজায় সোন্দর সোন্দর মাইয়ারা দাঁড়াইয়া আছে। যারে ইচ্ছা, তারে তুমি ধইত্তে পাইরছ, ভাইবে দেখো কী পুলকের ব্যাপার।… তুমি চোখ ভুইজা তাদের আদর খাইতাছ। জেবন তো আমাগো একখান। এক এক জেবনে মানুষকে কত অভিজ্ঞতা লইতে হয়। এই অভিজ্ঞতা দিয়াই মানুষ তার জেবনের দিশা ঠিক করে। জানি কোনো অভিজ্ঞতা খারাপ, কোনো অভিজ্ঞতা ভালা। তুমি সব সময় ভালা অভিজ্ঞতা লইবে এমন তো নয়। মাঝে মাঝে খারাপ অভিজ্ঞতারও স্বোয়াদ লইতে হয়। দোনামানা কইরো না চলো।’১৩

মঙ্গলের আহ্বানে ক্ষণকালের জন্য শিবশঙ্কর যেন ভুলে যায় তাঁর জীবনের ব্রতের কথা। তাঁকে ঘিরে তাঁর পিতা ও পূর্বপুরুষের অভিলষিত স্বপ্নের কথা। নিজের শিক্ষা, রুচি, সংস্কার, আদর্শের উচ্চকিত সৌধ যা সে এতদিন পলে পলে বিনির্মাণ করেছে, মুহূর্তের দুর্বলতায় তা ধসে পড়বার উপক্রম হয়। যে পথ বিসর্পিল, যার শুরু এবং শেষ তমসাচ্ছন্ন; সে পথেই এক দুর্বিনেয় মনোবাসনা ও তীব্র দৈহিক দুর্দহনের বশে মঙ্গলের সঙ্গে নিষিদ্ধপল্লিতে পা রাখে শিবশঙ্কর।

কিছুক্ষণ আগে সাহেবপাড়ার মূল গেট দিয়ে ঢুকেছে দুজনে। ঢুকেই তীব্র আলোর ছটায় শিবশঙ্করের চোখ-মুখ-অন্তর ভেসে গেল। সেই কিরণ পাড়ার রাস্তার নিয়নবাতির, সেই কিরণ দরজায়-রাস্তায় দাঁড়ানো বিপুলভাবে সজ্জিত নারীগুলোর। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল শিবশঙ্কর। একী দৃশ্য। মনোহরণের একী মহা আয়োজন। কাকে দেখবে সে? একে না তাকে? না ওকে? তার শিক্ষা, তার সংস্কার, তার আদর্শ হঠাৎ করে ভেসে যেতে বসল। কী করবে সে এখন! রূপবহ্নিতে আত্মাহুতি দেবে? ফিরে যাবে? দেহসুধা গ্রহণে সাড়া দেবে? না চিৎকার করে বলে উঠবেÑ বন্ধ করো তোমাদের এই রূপের পসরা, স্তব্ধ হয়ে যাক সকল কোলাহল, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক সকল মায়াজাল।১৪

সাহেবপাড়ায় নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশের পর শিবশঙ্করের চেতনায় প্রজন্ম পরম্পরা লালিত সংস্কার তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যে নৈতিকতা ও আদর্শের শুদ্ধতার পাঠ সে তার পিতা, পিতামহের কাছ থেকে নিবিড় অনুধ্যানে রপ্ত করেছে তা ক্ষণিকের বেনোজলে ভেসে যাবে- তা সে বিশ্বাস করেনি। তিল তিল করে অর্জিত মনুষ্যত্বের যে ঝাণ্ডা ঝড়ে, ঝঞ্ঝায় এতকাল সে সমুন্নত রেখেছে তা কী নিমিষেই ভূতলে গড়াগড়ি যাবে? কামপ্রবৃত্তির দুর্বল মোহে আসক্ত হয়ে তার মতো দৃঢ়চেতা স্বপ্নচারী মানুষের নোনা সংগ্রাম কী বিসর্জিত হবে? মায়া-মাদকতার কাছে ভূলুণ্ঠিত হবে কী তার এতদিনের বিকেকবোধ? এসব কথা ভাবতেই তার দেহ-মনে ছড়িয়ে পড়ল তেতো অবসাদ। সেই অবসাদ থেকে মুক্ত করেছিল কেষ্ট। শিবশঙ্করের মনের ভেতর যখন বিবেকের তীব্র অন্তর্দাহ চলছে; তার শ্রবণ ও দর্শনেন্দ্রিয় যখন অসাড় হয়ে আসছে। চলৎশক্তি স্তিমিতপ্রায়; বিবেকের প্রদীপটিও নির্বাণোন্মুখ ঠিক তখন পতিতাপল্লির ভিড়ের মধ্যে কেষ্ট তাকে আবিষ্কার করে। তারপর কেষ্ট শিবশঙ্করকে নিষিদ্ধপল্লি থেকে বের করে টানতে টানতে কর্ণফুলী নদীপারের নির্জন জায়গাটিতে এনে দাঁড় করায়। যেখানে তারা নিয়মিত আড্ডা দেয়। ‘তারপর অতি ধীরে শিবশঙ্করের দিকে তাকিয়েছিল কেষ্ট। তার চেয়েও ধীর কণ্ঠে বলেছিল, ‘শিবু’ তুমি আমাদের আদর্শ। আমরা নষ্ট হয়েছি বলে তুমি কেন নষ্ট হবে?

তারপর মঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, মঙ্গল তুমি নষ্ট হয়েছ ঠিক আছে। সঙ্গদোষেই নষ্ট হয়েছ তুমি। মূর্খ মানুষ তুমি। একজন মূর্খের নষ্ট হওয়ায় সমাজের কোনো অনিষ্ট হয় না। শিবুর মতো শিক্ষিত ছেলেকে সাহেবপাড়ায় নিয়ে গিয়ে তুমি মস্তবড় অন্যায় করেছ।’১৫

শিবশঙ্করকে ঔপন্যাসিক জেলে সমাজের দীপাধার রূপে উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন; যার শিক্ষা-দীক্ষা, চরিত্র, ব্যক্তিত্বের আলোকচ্ছ্বটায় লেখক গোটা জেলে জনগোষ্ঠীর জীবনে সুদীর্ঘকাল ধরে জমাট অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কারের আঁধার অপনোদন করতে চেয়েছেন। তাই অসন্দিগ্ধভাবে তিনি শিবশঙ্করকে জীবনের সামূহিক ভাঙন ও বিপর্যয় থেকে বারবার রক্ষা করেছেন। শিবশঙ্করের সঙ্গে ছায়ার মতো হেঁটেছেন লেখক হরিশংকর জলদাস। শিবশঙ্করের জীবনে যখনই আদর্শের বিচ্যুতি ঘটার উপক্রম ঘটেছে; নৈতিকতার সংকট ঘনীভূত হয়েছে; সত্যাসত্যের প্রশ্নে তার চিত্ত যখন দ্বিধান্বিত ও অবসাদাক্রান্ত হয়েছে; তখনই লেখক তাকে রক্ষায় পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ঔপন্যাসিক সংসিদ্ধভাবে নিরন্তর অনুপ্রেরণায়, হার্দ্য ভালোবাসায় জয়ী করে তুলেছেন নায়ক শিবশঙ্করকে। কেষ্টর সংলাপের মধ্য দিয়ে উপন্যাসে শিবশঙ্করকে নিয়ে লেখকের ভাবনার প্রতিধ্বনিই যেন ফুটে উঠেছে। সাহেবপাড়ায় প্রবেশের ঘটনা শিবশঙ্করের মনে যে আত্মগ্লানি তৈরি করেছিল লেখক কেষ্টর মাধ্যমে সেই আত্মগ্লানি থেকে তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বিজয়া দিদিমণিকে লক্ষ করে শিবশঙ্করের বলা আত্মকথনের মধ্যে তাঁর আত্মমুক্তির বিষয়টি বিভাসিত হয়েছে-

তোমাকে কীভাবে বলি আমার কষ্টের কথা। এই কষ্টের কথা তোমাকে বলার নয় দিদিমণি। গত সন্ধ্যায় আমার যে খুব খারাপ সময় গেছে। বন্ধুর পাল্লায় পড়ে আমি যে নষ্ট হতে বসেছিলাম রে দিদিমণি। আমার বাবার স্বপ্ন, মায়ের বাসনা, তোমাদের বিশ্বাস-ভালোবাসা- সবকিছু কর্ণফুলীর জলে বিসর্জন দিয়ে আমি যে বেশ্যাপাড়ায় গিয়েছিলাম রে বিজয়াদি। শুধু তা-ই নয়, মঙ্গলের প্ররোচনায় আমার দৈহিক পবিত্রতা, মানসিক স্বস্তি ওই সাহেবপাড়ায় বিসর্জন দেওয়ার জন্য মনস্থও করে ফেলেছিলাম। ভাগ্যিস, কেষ্ট এসে উপস্থিত হয়েছিল। ও-ই বাঁচিয়ে দিল আমাকে।১৬

বিপর্যয় ও ভাঙনের কবল থেকে ব্যক্তি হরিশংকর জলদাস যেমন অনমনীয় মনোবল, দৃঢ়চেতা সাহস ও সংকল্পের জোরে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন; মাৎসর্যকাতর প্রতিপক্ষের অসত্য ভাষ্যকে সত্য ও যুক্তির ছুরিকাঘাতে খণ্ডিত করেছেন; তেমনি উপন্যাসে শিবশঙ্করও লেখকের মতো শিক্ষা, সত্য ও যুক্তির একাগ্র সাধনায় জীবনের দুর্লঙ্ঘ পথ অশঙ্কচিত্তে অতিক্রম করে গেছেন।

উপন্যাসে তিন ধরনের যাপিত জীবনের সঙ্গে শিবশঙ্কর ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। উত্তর পতেঙ্গায় জীবনের যে শাঁসবীজটি তিনি পূর্বপুরুষ থেকে জন্মসূত্রে পেয়েছিলেন; কলেজ জীবন ও মাইজপাড়ায় সে বীজটি প্রতিকূল প্রতিবেশে ভ্রুণায়িত হয়েছে এবং আমৃত্যু জীবনযুদ্ধে শিবশঙ্করকে লড়ে যাওয়ার ‘দম’ জুগিয়েছে। মাইজপাড়ার মতো ছোট্ট জেলেপাড়ায় মানব জীবনকেন্দ্রিক নানা নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। জেলেপাড়ায় নিম্নবংশজাত জেলে সম্প্রদায়ের অনেক পাত্র-চরিত্ররা সে নাটকের কুশীলবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। হরিবন্ধু, ফুলমালা, অধরচন্দ্র, জগবন্ধু, বিজয়া, মানিক, মঙ্গল, তুফান, কেষ্ট, বৃন্দাবন ঠাকুরের মতো অনেকের জীবনের আলো-আঁধারের গল্প জীবননাট্যের অনুষঙ্গ হয়ে মাইজপাড়ায় জেলেজীবনে মঞ্চায়িত হয়েছে। শিবশঙ্করের বহতা জীবন এ নাট্যমঞ্চের বাইরে থাকেনি। তবে সে এ পাড়ায় জীবননাট্যের স্থায়ী নট নয়, তার জীবনগাথা নোনাজল থেকে নগরজীবন পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত।

মাইজপাড়ায় পড়াকালীন সময়ে শিবশঙ্কর একদা উত্তর পতেঙ্গায় নিজ বাড়িতে বেড়াতে এলে অপূর্ব-শিউলির অবৈধ রাত্রিযাপনের মতো সমাজ-নিষিদ্ধ ঘটনার সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জড়িয়ে পড়েন। তাঁকে ঐ ঘটনার প্রাথমিক বিচারের দায়িত্ব পালনে অবতীর্ণ হতে হয়। উত্তর পতেঙ্গার জেলেপাড়ার ভোলানাথের বাড়ির  পেছনের বাড়িটি পরমেশ ও ধীরেশ শর্মার। গ্রামে বাড়িটি বামুনবাড়ি নামেই পরিচিত। এরা দুই ভাই গ্রামের কুলগুরু। গ্রামে সারা বছরের পুজো-আচ্চা এই দুই ভাইয়ের দ্বারা সম্পাদিত হয়। দুই ভাইয়ের মধ্যে ধীরেশ ছোট এবং সে নিঃসন্তান। পরমেশের দুই ছেলে, অপূর্ব বড়। সে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেবে। ভোলানাথের তিন ছেলে মহেন্দ্র, জোগেন্দ্র এবং নিতাই। এদের মধ্যে মহেন্দ্র বড় এবং সে বিবাহিত। বাকি দুই ভাই অবিবাহিত। মহেন্দ্র বেশিরভাগ সময় সমুদ্রে পড়ে থাকে। তিন ভাই সমুদ্রে মাছ ধরে। মহেন্দ্রর বউয়ের নাম গৌরী। মহেন্দ্রর চারটি সন্তান। তার সন্তান সংখ্যা বাড়তে থাকে। গৌরীর ভূমি ঊর্বর তিন ভাই চাষ করে। মহেন্দ্রর বড় ছেলের নাম চণ্ডী, আর সেজ মেয়ের নাম শিউলি। ভোলানাথ ও পরমেশদের বাড়ি পাশাপাশি। সম্পর্কে তারা প্রতিবেশী। দীর্ঘদিন ধরে তারা মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। মহেন্দ্রর মেয়ে শিউলির সঙ্গে বামুন পরমেশের ছেলে অপূর্বের একটা মন দেওয়া- নেওয়ার সম্পর্ক তৈরি হয় এবং শেষমেষ সে সম্পর্ক দেহ লেনদেন পর্যন্ত গড়ায়।

অপূর্ব-শিউলির সম্পর্ক চুপিচুপি চললেও একদিন সুনসান রাতে শিউলি কামোন্মত্ত হয়ে অপূর্বের ঘরে প্রবেশ করে স্বেচ্ছায় অপূর্বকে দেহদানের সময় ভাই চণ্ডীর কাছে হাতে-নাতে ধরা পড়ে যায়। এরপর জোগেন্দ্র এবং চণ্ডী মিলে অপূর্বকে বেদম প্রহার করে। চণ্ডী অপূর্বের শিশ্ন ও বীচি চেপে ধরে। মারের চোটে ব্রাহ্মণের ছেলে অপূর্ব মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত হয়। এমন সময় শিবশঙ্কর অপূর্বর জীবন বাঁচাতে ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হন। সে অপূর্বকে মারধর করতে নিষেধ করে। সে যুক্তি দিয়ে গ্রামবাসী ও শিউলির পরিবারকে বোঝায়, যে দোষে অপূর্বকে প্রহার করা হচ্ছে শিউলিও সেই একই দোষে দোষী। মার দিলে দুজনকেই দেওয়া উচিত। কারণ শিবশঙ্কর জেনেছে, শিউলি স্বেচ্ছায় অপূর্বকে দেহদান করেছে। তাই দোষ কেবল অপূর্বর একার নয়, শিউলিও সমভাবে দোষী। তার কথায় ও যুক্তিতে গ্রামবাসী আস্থা ফিরে পায় এবং অপূর্বকে প্রহার করা থেকে জোগেন্দ্রর পরিবারের সদস্যরা বিরত হয়। অপূর্ব শিউলির ঘটনার প্রথমিক বিচারে শিবশঙ্করের প্রতি গ্রামবাসীর শ্রদ্ধাবোধ বেড়ে যায় এবং ছেলের জন্য সুধাংশুর বুক গর্বে ভরে ওঠে। তবে চূড়ান্ত বিচারের দিনে শিউলি অপূর্বর ঘরে যাওয়া ও তাকে দেহদানের বিষয়টি অস্বীকার করে।

নারী-পুরুষের সমাজ গর্হিত অবৈধ প্রেম ও স্বেচ্ছায় দেহদান জেলেপাড়ায় গোপনে সংঘটিত একটা নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও প্রকাশ্যে এ ধরনের ঘটনা ধরা পড়লে এবং প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হয় নির্মম। এ ধরনের অপরাধে জেলেপাড়ার বিধি অনুসারে অপরাধী দুজনকেই ‘ঢেন্ডেরি’ নামক শাস্তি দেওয়া হয়। এ শাস্তির কথা উল্লেখ করে লেখক তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে লিখেছেন –

এ বড় কঠিন সাজা। জেলেপাড়ার সরদারদের চোখে এ তো প্রেম নয়, অবৈধ দেহসংযোগ। পাঁচ মিনিটের দেহসুখের জন্য আজীবনের কলঙ্ক। ঢেন্ডেরি মানে পুরুষের মাথা মুড়িয়ে, নারীর চুল অর্ধেক কেটে, উভয়ের গলায় ঝাঁটা-জুতো ঝুলিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরানো। সেখানেই শেষ নয়। পাড়ার ছোট ছোট অবুঝ ছেলেমেয়েরা, কৌতূহলী বয়স্করা ভাঙা থালা, ডেকচি, কাঁসা বাজিয়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের পেছন পেছন ঘুরত আর দুয়ারে দুয়ারে চিৎকার করে বলত, ইতারা কুকাম গইয্যে, ধরা পইয্যে। সরদাররা ঢেন্ডেরির শাস্তি দিএ। তোঁয়ারা ঘরত্তোন বাইর অই চাও।১৭

মহেন্দ্র জানে ঢেন্ডেরি শাস্তি থেকে শিউলিকে বাঁচানোর একটা পথ আর তা হলো অপূর্ব ও শিউলির বিয়ে দেওয়া। কিন্তু সে এও জানে জাতিবর্ণ বিভাজিত জেলে সমাজে বামুনে আর জেলেতে বিয়ে হয় না। অপূর্ব ব্রাহ্মণ আর তার মেয়ে জেলে কন্যা। জেলে সমাজ এমন বিয়ে কিছুতেই মেনে নেবে না। এর চেয়ে গর্হিত কাজ জেলে সমাজে আর কিছু হতে পারে না। সবকিছু ভেবে মহেন্দ্র জেলে সরদারদের চূড়ান্ত বিচারের আগের রাতে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিউলিকে বিচারে অপূর্বর সঙ্গে ঘটে যাওয়া দৈহিক সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করতে বলে। চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মহেন্দ্রকে এমনই পরামর্শ দিয়েছিলেন। মহেন্দ্রর কথামতো পরের দিন বিচারে শিউলি অপূর্বর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সব কিছু অস্বীকার করে। বিচারে চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন মহেন্দ্রকে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে এবং অপূর্বর পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে বলে। এমন বিচার এবং ঘটনাটি শিউলির অস্বীকার করার ব্যাপারটি শিবশঙ্করকে বিস্মিত করে। কিন্তু চেয়ারম্যান সবকিছু শিবশঙ্করকে বুঝিয়ে বলে :

তোমাদের সমাজ বড় কঠিন। এই সমাজের্ রাহ্মণ আর জেলেতে বিয়ে হয় না। আর হ্যাঁ, এই ঘটনায় অপূর্বর অপরাধও কম নয়। মার খেয়েছে বলে একটা কুমারী মেয়েকে নষ্ট করার অপরাধ থেকে মুক্তি পেতে পারে না অপূর্ব। কিন্তু আমি নিরুপায়। ওর বিচার করতে গেলে মাটির তলা থেকে কেঁচোর পরিবর্তে সাপ বেরিয়ে আসত। তাতে অপূর্ব আর শিউলির দুজনেরই ভবিষ্যৎ-জীবনটা ধ্বংস হয়ে যেত। এই জন্য চোখ বুজে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যার বিচার করে গেলাম আমি। শিবশঙ্করের চেহারা থেকে মেঘ কেটে গেল। চেয়ারম্যানের কথা শুনে তার মনে জমে থাকা এতক্ষণের বিষণ্নতা দূর হয়ে গেল। সে প্রসন্ন চোখে চেয়ারম্যানের দিকে তাকাল। যাওয়ার আগে বয়স্ক জয়নাল আবেদিন শিবশঙ্করের কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, ‘জেলেপাড়ায় বড় অন্ধকার রে বাপ! গরিব মানুষ তোমরা। দারিদ্র্য যেখানে, ঝগড়াঝাটি-মারপিটও সেখানে। এই অশিক্ষা, দারিদ্র্যকে পরাজিত করে তুমি আলোর পথে হাঁটছ বাপ। তোমাকে অনুসরণ করে হয়তো এই পাড়ায় আরও ডজন ডজন শিবশঙ্কর তৈরি হবে। আমি সেদিনের জন্য অপেক্ষা করছি শিবশঙ্কর। ১৮

জীবনাভিজ্ঞতায় পোড় খাওয়া হরিশংকর জলদাস উপন্যাসে শিবশঙ্করের মধ্যেই নিজের সুলুকসন্ধান করেছেন। লেখক জেলে সম্প্রদায়ের-ই একজন। নিজে শিক্ষিত হয়ে শিক্ষার দীপটি তিনি যেমন জেলেসমাজে উঁচু করে ধরেছেন, যেন সে আলোয় সবাই আলোকিত হতে পারে। তেমনি শিবশঙ্করের মধ্যে সেই দীপটিই জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছেন; যেন হাজার হাজার শিবশঙ্কর সে আলোয় তৈরি হয়ে জেলেসমাজের সকল অন্ধকার দূর করে দেবে। ঘরে ঘরে থাকবে না অশিক্ষা, বর্ণ বিভাজনের মতো কুপ্রথা। শিবশঙ্করের চরিত্রে লেখকের নিজস্ব প্রতিবিম্বের আঁকিবুঁকি লক্ষ করা যায়। লেখক জাতপাত বিভাজিত  কৈবর্ত সমাজে নিজে যেমন নানা ধরনের পীড়ন ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন; তেমনি স্বচক্ষে দেখেছেন বর্ণভেদ প্রথা কীভাবে জেলেদের পদে পদে হেনস্তা করে। প্রাচীনকাল থেকে হিন্দু সমাজ জাতি-বর্ণ ভেদাভেদ প্রথা ও সংস্কারের বেড়াজালে বন্দি। লোহার শেকলের মতো এই বর্ণ বিভাজন বিধির জাঁতাকলে আটকে কত নিম্নবংশজাত নর-নারীর প্রাণবায়ু বের হয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সামাজিক এই বর্ণ বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের কারণে অনেক নারী-পুরুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছে। নিরুপায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে তাদের কেউ কেউ সমাজবিচ্ছিন্ন হয়েছে; কেউবা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। উপন্যাসের ভোলা গোয়ালা এরকম একটা ঘটনার শিকার হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। তখন শিবশঙ্করের কলেজ জীবন। মাইজপাড়ায় জগবন্ধুর বাড়িতে থেকে সে চট্টগ্রাম কলেজে বাংলাতে অনার্স পড়া শুরু করেছে। একই কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র প্রিয়রঞ্জনের সঙ্গে ততদিনে গাঢ় সখ্য ও বন্ধুত্বও তৈরি হয়েছে তাঁর। কলেজে হৈ-হুল্লোড় ও আড্ডাবাজির পরও কলেজ শেষে অনেকটা সময় দুজনার হাতে থাকে। দুজনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চট্টগ্রামের শহরের পথে হাঁটতে থাকে। শতাব্দী প্রাচীন শহরটির রূপ জৌলুস মানুষের কর্মচাঞ্চল্য, আলস্য, অবসাদ, ক্লান্তি, দারিদ্র্য; তাদের শঠতা, ধূর্তামি, ভণ্ডামিও তাদের চোখ এড়ায় না। গৃহী মানুষের ঘরে ফেরা, উন্মূল মানুষের ছোট বড় অফিসের সিঁড়ির পাদদেশে খোলা ফুটপাতে শোবার আয়োজন হতে শুরু করে রাত বিলাসিনীদের খদ্দের ধরার তৎপরতা, নারীলোভী পুরুষের আনাগোনা, চোর, পকেটমার, বাটপাড়দের রাতের আঁধারে সক্রিয় হয়ে ওঠা; পুলিশের ছিটি বাজানো, পাড় মাতালদের মাতলামি কোনো কিছুই তাদের দৃষ্টিসীমাকে অতিক্রম করে যেত না। হাঁটতে হাঁটতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হতো। সন্ধ্যেও এক সময় রাতের খাপের মধ্যে ঢুকে পড়ত। ‘সেই নির্জন রাতে নিউমার্কেটের গোড়াতেই এসে মিলত দুজনে। শিবশঙ্কর মাঝিরঘাটের মাইজপাড়ার এঁদো গলি থেকে, আর নজুমিয়া লেনের বাড়ি থেকে প্রিয়রঞ্জন। তারপর ঘোরাঘুরি। কোনো রাত বটতলি রেলস্টেশন, কোনো রাত রেয়াজউদ্দিন বাজার ছাড়িয়ে কাজির দেউড়ি, কোনো রাত আসকারদিঘির পার ধরে খাস্তগীর হাইস্কুল ছাড়িয়ে চেরাগি পাহাড়। ডিসি হিলের নিচে বাঁধানো সিঁড়িতে কোনো কোনো রাতের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় দুজনে।’১৯

দুই বন্ধু চট্টগ্রাম শহরের অলি-গলি চষে বেড়াতে শুরু করে। শহর চট্টলার দামি বাড়ি, দামি গাড়ি, সুউচ্চ ভবন, উঁচু মিনার, সারিসারি দোকানপাট, ঝলমলে বিপণিবিতান, ট্রাফিক জ্যাম, মাঝিরঘাট, বটতলা, রেলস্টেশন, বস্তির ছিন্নমূল ভাসমান মানুষ, মুটে-মজুর, ভিক্ষুক, নিম্নশ্রেণি পেশাজীবীÑ ছাতা মেরামতকারী, নাপিত, পানের দোকানদার, গোয়ালা, সিগারেট, চা ও জল বিক্রেতাদের ভিড় করা মুখোচ্ছবি; পাগলা, বেশ্যা, সাধু, নামাজকামী মুসল্লিদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে দুই বন্ধু। গভীর রাত থেকে ভোর অবধি চট্টগ্রাম শহরটিকে উল্টে-পাল্টে দেখে নেয় দুজনা। এ শহরের নোংরা আবর্জনা থেকে শুরু করে তকতকে ঝকঝকে সৌন্দর্য সব কিছুই তাদের চোখ যেন গিলতে থাকে। ‘কতকিছু যে দেখা হয়েছিল সেই ভোরেÑ বটতলি রেলস্টেশনে অসহায় মানুষদের এলেবেলে শুয়ে থাকা, কলতলায় জলধরা মানুষদের ভিড়বাট্টা, ক্লান্ত-অবসন্ন শরীর নিয়ে বেশ্যাদের ঘরে ফেরা। রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকে সবজি নিয়ে মুটেদের দ্রুত পায়ে গন্তব্যে যাওয়া, নামাজকামী মুসল্লিদের প্রশান্ত মুখে মসজিদ হতে ফেরা। এসব কিছু ঘুরে ঘুরে দেখেছে দুজনে।’২০

শিবশঙ্করের চোখে ঔপন্যাসিক নগর চট্টগ্রামের যে চিত্রাত্মক বর্ণনা তুলে ধরেছেন তার সঙ্গে আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের আর এক জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৯৩৪-২০১২) প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশের অন্যতম চরিত্র সুনীলের শহর কলকাতা ঘুরে দেখার প্রসঙ্গটির মিল রয়েছে। লেখকসহ পাঁচ বন্ধুর স্বতন্দ্র্য জীবনযাপন ও জীবনকথনের সত্যভাষণে ও ব্যতিক্রমী উপস্থাপন ঔপন্যাসিক আত্মপ্রকাশের প্লট নির্মাণ করেছেন।

কাকা-কাকিমার বাড়ি ছেড়ে লেখক মৌলালির কাছে একটা মেসে উঠে পড়লে কলকাতা নগরীর সঙ্গে তাঁর সত্যিকারের আলাপ, পরিচয় ও সখ্য গড়ে উঠতে শুরু করে। সে অনুভবের কথা আত্মস্বীকারোক্তিতে প্রাঞ্জল ভাষারূপ দিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন :

আমি কলকাতার প্রতিটি রাস্তাকে আলাদাভাবে উচ্চারণ করে দেখতে চেয়েছি। এই ছন্নছাড়া আত্মবিস্মৃত শহর, এর পার্ক স্ট্রিট আর কলাবাগানের বস্তি, ক্যানিং স্ট্রিট আর নিউ আলিপুর, মাটির নিচের দোকানে হিজড়েদের নাচ, ওয়েলেসলি স্কোয়ারের সখী-সখী বালক, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট-চিৎপুর-বউবাজার-গ্রে স্ট্রিট-টালিগঞ্জে ধাপে ধাপে দর নেমে আসা বেশ্যার দল, রাত্তিরবেলা ভাঙা টিউবওয়েলের মধ্য থেকে বার করে আনা চোলাই মদের বোতল, চিনে পাড়ায় ঝিনুকের সংকেতে চণ্ডুর আড্ডা খুঁজে পাওয়া, হাওড়া ব্রিজের নিচে কড়ি খেলার জুয়া- এই সবের মধ্য দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ আমি নিজেকে শক্ত ও খাঁটি করে তুলতে লাগলুম। নিউ আলিপুর থেকে বেরিয়ে সোজা চলে আসতুম খালাসিটোলায় দিশি মদের দোকানে সেখানে- মেথরের পাশে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সাহেব, ঠেলাওয়ালার পাশে মধ্যবয়সী শিল্পী ও পকেটমার, এদের সঙ্গে সমান হয়ে বসে থেকেছি।২১

দু’জন ঔপন্যাসিক-ই নগর জীবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ নায়কের মনস্তাত্ত্বিকবোধে যে বিলোড়ন তৈরি করেছে তার সংসিদ্ধ বর্ণনা উভয় উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। তবে জলদাস বংশোদ্ভূত লেখক হরিশংকরের নিচুতলার মানুষের জীবনদর্শন ও জীবনবীক্ষণ এক্ষেত্রে সুনীলের চেয়েও বেশি নোনা অভিজ্ঞতায় সংবেদ্যজাত। চট্টলার নগর জীবনে অনভ্যস্ত শিবশঙ্কর কৈবর্ত গোত্রজাত হওয়ায় শহরের নিচুতলার মানুষকে চিনতে; তাদের নিত্যকার জীবন দর্শনে ও পর্যবেক্ষণে আলাদা করে দীক্ষা গ্রহণ করতে হয়নি। আর এ কারণে উপন্যাসে শিবশঙ্কর ও তার বন্ধু প্রিয়রঞ্জন খুব অনায়াসে ভোলানাথ, ভোলাদা বা ভোলাকার মতো একজন গোয়ালার জীবনের সহমর্মি হয়ে ওঠেন।

ভোলানাথ পেশায় একজন গোয়ালা। কর্ণফুলীর ওপাড়ে তার বাড়ি। কর্ণফুলীর উত্তরপাড়ে শহর আর দক্ষিণদিকে গ্রাম। সেই দক্ষিণের গ্রামে তার বসতি। সেখানে বিশাল বিশাল জমিতে ধান, তরমুজ টমেটো, কপি, বরবটি, আখ, সরিষা, ভুট্টা হয়। গ্রামবাসীর অনেকে গরু, মহিষের খামার থাকায় ভোলানাথ ঐসব খামার এবং গৃহস্থবাড়ি থেকে সকাল সকাল দুধ সংগ্রহ করে কর্ণফুলী নদী অতিক্রম করে কোতোয়ালি থানার মোড়ে পাঁচকড়ি ঘোষের মিষ্টির দোকানে দুধ দিত। লোকমুখে পাঁচকড়ি ঘোষ পাঁচু ঘোষ হয়ে যায়। পাঁচু ঘোষের সঙ্গে ভোলানাথের একটা আত্মিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ভোলানাথের পরামর্শে পাঁচু ঘোষ তার মিষ্টির দোকানের পরিসর বাড়িয়ে সাধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামকরণ করে। এরপর থেকে পাঁচু ঘোষের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে থাকে। বিক্রি-পাট্টা দিনকে দিন বাড়তে থাকে। পাঁচু ঘোষ এক সময় দেহ রাখলে তার ছেলে সুব্রত ঘোষ দোকানের ভার গ্রহণ করে। সেও ভোলানাথকে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধা করত। কঠোর পরিশ্রমী, সদা হাস্যোজ্জ্বল, উষ্কখুষ্ক চুল ও মলিন পোশাক পরিহিত ভোলানাথের সঙ্গে কোতোয়ালি থানার পশ্চিম দিকে অবস্থিত তেঁতুল গাছতলায়  যেসব নিম্ন আয়ের ও নিম্নবংশজাত মানুষ জমায়েত হতো তাদের সবার সঙ্গে ছিল তার নিবিড় সংশ্রব। এদের মধ্যে নাছির পাগলা, ছাতা মেরামতকারী বজল, হরনাথ শীল, সাধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে জল দেয় জলিল অন্যতম। হিন্দু সমাজের বর্ণ বিভাজনের শিকার নিম্নগোত্রভুক্ত এসব মানুষের সঙ্গে ভোলানাথের কথাবার্তা ও মেলামেশা ছিল সহজাত। ‘এই জটলার অনেকে ভোলা গোয়ালাকে চেনে। সকালে দুধ বেচার পাট চুকিয়ে দুদণ্ড এই তেঁতুল তলায় এসে বসত ভোলাকা। শোনাশুনিতে সবাই তাকে ভোলাকা বলে ডাকত। মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক সুব্রত ঘোষ ডাকত, পানি সরবরাহকারী জলিল ডাকত, তেঁতল গাছতলার নাছির পাগলাও ডাকত। হরনাথ শীল ক্ষৌরকর্মের বাক্সটা নিয়ে ওই একটু দূরের ছায়ায় বসত। গরিব মানুষেরা তার হাতে চুল কাটাত, দাড়ি কাটাত। সপ্তা-দুই সপ্তায় ভোলাকাও হরনাথের পিঁড়িতে গিয়ে বসত। বলত, ‘হরনাথদা দাড়িটা বড় জ্বালাচ্ছে। ভীষণ চুলকায়। চুলকানির হাত থেকে বাঁচাও তো দাদা।’২২

উপন্যাসে লেখক ভোলানাথকে প্রান্তজনের পরমবন্ধু এবং জাত- পাতভেদের ঊর্ধ্বে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষরূপে অঙ্কন করেছেন। তার চরিত্রে এক ধরনের তেতো জীবন দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্ট। যে দর্শন ভোলানাথ জীবনের পলে পলে দুঃখ যন্ত্রণার মাঝে সন্তরণ করে লাভ করেছে। তাই হরনাথ শীল যখন জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ভোলানাথকে একটু জিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে তখন ভোলানাথ কষ্টের হাসি হেসে বলেছে, ‘ঘূর্ণিলাগা জীবনে আবার শান্তি! কলুর বলদের আবার জিরান।’২৩

খুব ভোরে চট্টগ্রাম শহরে যখন অনেকে তন্দ্রাচ্ছন্ন তখন শহর  দেখতে বের হয়ে পড়া দুই বন্ধু শিবশঙ্কর ও প্রিয়রঞ্জনের কাছে চেনা-জানার শহরটা অন্যরকমভাবে ধরা দেয়। কোতোয়ালি থানার একটু দূরে পশ্চিম দিকের খোলা জায়গায় যেখানে একদা একটা পুকুর ছিল সেখানকার শতবর্ষী এক তেঁতুলগাছতলায় বসে তাঁদের কাছে ভোরের নগর চট্টলার খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবন ভিন্নভাবে বিভাসিত হয়ে ওঠে। হরিজন সম্প্রদায়ভুক্ত এসব মানুষের রোজকার কর্মব্যস্ততা দেখে; ভোলানাথের জীবনের গল্প শুনে তাদের মনের ঘোর কাটতে চায় না। জীবনের বিপ্রতীপ অভিজ্ঞতা তাঁদের অনুভবের জগৎকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। সংসার জালে আবদ্ধ ভোলানাথ শিবশঙ্করের কাছে জীবন ভেলায় ভাসমান এক বিবাগী বাউল রূপে ধরা দেয়। ভোলানাথের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারে তার ঘরে অসুস্থ স্ত্রী শ্বাসকষ্টের রোগী। অর্থের অভাবে দরিদ্র ভোলানাথ একমাত্র সোমত্ত মেয়ে সুচন্দাকে বিবাহ দিতে পারছে না। এসব গল্প ও ঘটনার বেশ কিছু দিন পরে তারা ভোলানাথের আত্মহননের কথা শুনেছিল। ভোলানাথ তেঁতুলগাছটায় ঝুলে ফাঁস নিয়ে মরেছিল। খবর পেয়ে তেঁতুলগাছে তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে গিয়েছিল প্রিয়রঞ্জন। শিবশঙ্কর কোনো এক কাজের ব্যস্ততায় সেদিন ভোলানাথের মৃতদেহ দেখতে যেতে পারেনি। তবে সহজ জীবন পথের অনুসন্ধানী ভোলানাথের রহস্যজনক মৃত্যু ছাত্রজীবনে দুজনকে চরম ভাবিয়েছিল। নানা প্রশ্নের জট তাদের মস্তিষ্কে তখন ঘুরপাক খেয়েছিল-

কে খুন করল ভোলা গোয়ালাকে? হঠাৎ মনের দুঃখে নিজের গলায় নিজেই ফাঁস লাগিয়েছে? কী সেই দুঃখ? ঘরের সোমত্ত কন্যাটি কি বেজাতের কারও সঙ্গে পালিয়ে গেছে? কারও কাছে ভোলাকার কি অনেক টাকার ঋণ ছিল? দিতে না পেরে লজ্জার হাত থেকে বাঁচবার জন্য আত্মহত্যা করেছে? আত্মহত্যাই যদি করবে, নদী পেরিয়ে শহরে কেন? নদীর ওপাড়ে চরপাথরঘাটায় কি ফাঁস খাওয়ার মতো গাছের অভাব ছিল? এমন কী জটিল সমস্যা যে, যার জন্য ভোলকা গলায় দড়ি দিল?২৪

অনেক বছর পরে শিবশঙ্কর যখন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যক্ষ এবং প্রিয়রঞ্জন যখন ওই একই কলেজের অধ্যাপক তখন একদা ভোলানাথের মেয়ে চন্দনা অনেক খোঁজাখুঁজি করে তাদের দুজনার সন্ধান পায়। চন্দনার কাছে দু’বন্ধু ভোলানাথের মৃত্যুর কারণ জানতে পায়। ভোলানাথের মৃত্যু তাদের মনে যে রহস্য জট সৃষ্টি করেছিল, অনেক বছর পরে সে জট খুলতে শুরু করে। তারা চন্দনার মাধ্যমে জানতে পারে, ভোলা গোয়ালা জাত-পাতের ভেদাভেদ না মানলেও তার স্ত্রীর মধ্যে জাতিভেদ প্রথা ছিল প্রবল। জাতপাতের ছোঁয়াচ ভোলানাথের স্ত্রী কোনোভাবেই মানতে পারত না। কিন্তু ভোলানাথ ছিল সর্বমানবতাবাদে বিশ্বাসী। ‘জলঅচল’ সমাজের শাস্ত্রানুশাসনের প্রতি ভোলানাথের ছিল তীব্র বিতৃষ্ণা। সর্বদর্শী লেখক হরিশংকর জলদাস এ প্রসঙ্গের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন :

ভোলানাথ ঘোষ অসাধারণ একজন মানুষ। ধীরস্থির, শান্ত মেজাজের। হিংসা করতে জানত না। মানুষের মধ্যে ভালোটুকু খুঁজে বেড়াত। মানুষের অসঙ্গতিগুলো দেখেও এড়িয়ে যেত। যেদিন কোনো মানুষের এতটুকুন উপকার করতে পেরেছে, সেদিন তার আনন্দের সীমা থাকত না। হিন্দু মুসলমানে কোনো পার্থক্য থাকত না তার চিন্তায়। হিন্দু সম্প্রদায়ে জাতপাতের যে ঠেলাঠেলি, প্রচণ্ড ঘৃণা করত ভোলাকা। কাকি ছিল তার বিপরীত। বিশেষ করে জাতপাতের ব্যাপারটিকে কোনোক্রমেই ছাড় দিতে রাজি ছিল না কাকি। কথায় কথায় বলত, বামুনরা হলেন সমাজের মাথা। তারপর সেনগুপ্ত দাশগুপ্ত, ঘোষ, চৌধুরী এরা। ঘোষরা কিন্তু উঁচুজাতের মানুষ। এমনি এমনি কী দুধবেচা পেশা তাদের? খাদ্যের মধ্যে সবচাইতে উঁচা খাদ্য হলো দুধ। দুধের যেমন তুলনা হয় না, তেমনি ঘোষ জাতেরও তুলনা নেই।২৫

ভোলানাথের মেয়ে চন্দনা নাথ বংশের ছেলে মুকুন্দ নাথকে ভালোবাসে। এ সম্পর্ক ভোলানাথের স্ত্রী স্বীকার করেননি। জাতের গরিমা তার সবার উপরে। তিনি মনে করতেন ঘোষের চেয়ে নাথ নিচু বংশ। তাই তিনি মেয়ের ভালোবাসাকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারেননি। সময়-অসময়ে মেয়ের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন। সে নিজের ভাইপো বাবলাকে দিয়ে মুকুন্দকে বেদম প্রহার করায়। ঐদিন রাতেই ভোলানাথ সব শুনে চন্দনাকে মুকুন্দের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মুকুন্দ আর চন্দনাকে পালিয়ে যেতে বলে। স্ত্রীর জাতপাতের অহমিকা আর কুসংকারাচ্ছন্ন মন ভোলানাথের জীবনটাকে বিষিয়ে তুলেছিল। তাই তিনি তার মেয়ে চন্দনার জীবনে এই বিষের ছোঁয়াচ লাগতে দিতে চাননি। জাতের চেয়ে যে প্রেম বড়; বর্ণ-বিভাজনের চেয়ে যে মানবতা, মনুষ্যত্ব বড়; গোত্র পরিচয়ভেদে উঁচু-নিচুর বিভাজন যে মানুষের তৈরি, স্রষ্টার নয়Ñ এমন বোধ ভোলানাথ জীবনের পাঠশালায় সহজ জীবন-যাপনের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন। মুকুন্দের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দেবার বর্ণনায় ভোলানাথের ভেতর এক অসাম্প্রদায়িক জাতপাতহীন উদারমানবতা বোধের পরিচয়কে ঔপন্যাসিক সংলক্ষিত করে তুলেছেন। যা চন্দনার ভাষ্যে উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে-

এরপর ভোলাকা চন্দনার ডান হাত মুকুন্দের হাতে তুলে দিয়েছিল। কোঁচড় থেকে একমুঠো টাকা বের করে মুকুন্দকে দিয়ে বলেছিল-চলে যা বাপ। যেদিকে চোখ যায়, দুজনে চয়ে যা। বিয়ে কর। তারপর নাকি গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল ভোলাকা। বলেছিল- ঘরে মুখরা বউ। বাপের পক্ষ প্রবল। ওকে বশে এনে চন্দনাকে যে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেব, সেই উপায় নেই আমার। ও প্রেমের মূল্য কী বুঝবে, ও যে সারা জীবন জাতের গরিমা ধুয়ে ধুয়ে পানি খেয়ে গেল। মুকুন্দদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে মুকুন্দকে উদ্দেশ করে বলেছিল- মাইয়াটারে কষ্ট দিয়োনা বাপ। আমার বড় সাধের মাইয়া।

‘আমরা পালিয়েছিলাম সে রাতে। আর সে রাতেই বাবা গলায় দড়ি দিয়েছিল। কেন যে ওই তেঁতুলগাছে ফাঁস খেল, কী করেই বা অত রাতে নদী পার হলো, রহস্য থেকে গেছে এখনও।’ বলে চন্দনা।২৬

ভোলানাথের জীবনের পরিণতি ও তার মৃত্যুকে ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাস পাঠকের কাছে রহস্যাবৃত করে রেখেছেন। উপন্যাসের শেষাংশে ভোলানাথের মেয়ে চন্দনা শিবশঙ্কর ও প্রিয়রঞ্জনের কাছে বাপের মৃত্যুর ঘটনা বলে মানসিকভাবে বিবেকের দায় থেকে মুক্ত হতে চেয়েছে। মূল কাহিনিস্রোত থেকে প্রবহমান একটি শাখাস্রোত হিসেবে ভোলানাথের জীবনাখ্যানকে ঔপন্যাসিক উপন্যাসের এলায়িত ক্যানভাসে অঙ্কন করেছেন। তবে এ স্রোতের কলোস্বর উপন্যাসের তটভূমিতে গুঞ্জরিত হয়ে উচ্চমার্গীয় এক জীবন ভাবনাকেই প্রমূর্ত করে তুলেছে। ভোলানাথকেন্দ্রিক এ উপকাহিনি  মূল ঘটনাপ্রবাহকে মন্থর না করে, তাকে বেগবান করেছে। উপন্যাসে ভোলানাথ বৃত্ত লেখকের জীবনদর্শনকে প্রতীকায়িত করেছে।  জাতপাতের সংস্কারে আচ্ছন্ন বেড়িবদ্ধ সমাজ ও সে সমাজের তথাকথিত উচ্চবংশ জাত বলে দাবিকৃত মনুষ্যত্ব বিবর্জিত; সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী মানুষগুলো লেখককে আজন্ম যে পীড়ন দিয়েছে সে যন্ত্রণার একটা নোনাছাপ ভোলানাথ চরিত্রে তিনি শব্দমুখর করে তুলেছেন। জীবনের কঠিন সংগ্রাম থেকে  সহজপাঠ নিয়ে ভোলানাথ চরিত্রে তিনি সহজ জীবনদর্শনকে প্রতিবিম্বিত করেছেন। নাছির পাগলা, বজল, হরনাথ শীল, জলিলের মধ্যে ভোলানাথ যেমন ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে চিরন্তন মানুষকে খুঁজেছেন; তেমনি ভোলানাথের জীবন চিত্রায়ণে ও চরিত্রটির মনোজাগতিক দর্শন গ্রন্থে লেখক হরিশংকর জলদাস তাঁর ব্যক্তি জীবনতত্ত্ব ও জীবন জিজ্ঞাসার সুলুকসন্ধান করেছেন।

উত্তর পতেঙ্গার সমুদ্রজীবী সুধাংশু জলদাসের এক বর্ধিষ্ণু জেলে পরিবারে জন্ম শিবশঙ্করের। বাবা-মা ও সাত ভাই বোনের হাঁ-করা অভাবের সংসার। মাইজপাড়ার জীবন তাঁকে সে অভাব থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখলেও যখনই তিনি উত্তর পতেঙ্গার জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তখনই দারিদ্র্যপীড়িত সংসারের ধুঁকধুঁক হৃদস্পন্দনটি শুনেছেন এবং অন্তর দিয়ে তা অনুভব করেছেন। মাইজপাড়ায় সে চট্টগ্রাম কলেজে অনার্সে পড়া স্বপ্নকাতর এক শিক্ষিত যুবা; যে আলোর পথযাত্রী শিক্ষিত জনজাতির গর্বিত অংশী। উত্তর পতেঙ্গায় ফিরলে সে যেন নিমিষেই সেই গর্বিত আলোর অংশী বিচ্ছিন্ন হয়ে জলজীবনের উত্তরাধিকার লালিত জলপুত্রের একজন হয়ে ওঠে। বাবার অর্থনৈতিক অক্ষমতা; ভাইদের শিক্ষাবিচ্যুত হয়ে বাবার সঙ্গে সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নেওয়ার দৃশ্য তাঁকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা দিত। তাঁদের নৌকা ও জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে সমুদ্র থেকে মীন সন্তানদের হস্তগত করতে হতো। পরিবারের সদস্যদের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রত্যহ দুর্বার প্রতিরোধ ব্যূহ তৈরি করতে দেখে শিবশঙ্কর মনে মনে এক ধরনের মর্মপীড়া অনুভব করত। শিবশঙ্করের অন্য তিন ভাই হলোÑ সূর্যমোহন, সীতানাথ ও ব্রজেন্দ্র। সীতানাথ বা সত্য বাবার কর্মভার লাঘব করতে সুধাংশুর সঙ্গে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী পরিবেশের প্রতিকূলতা এবং চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের অভাবে বাকি দুই ভাইয়ের শিক্ষাজীবন বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। শিবশঙ্করের দুই বোনের মধ্যে ফাল্গুনী পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। আর অনুরাধা পড়েনি। উত্তর পতেঙ্গায় মেয়েদের পড়ালেখার জন্য আলাদা কোনো হাইস্কুল ছিল না এবং জেলেসমাজের মেয়েদের শিক্ষা স্বতঃসিদ্ধ না থাকায় শিবশঙ্করের বোন ফাল্গুনীকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে পড়া ছাড়তে হয়েছিল। এই সমাজে কোনোকালে নারীশিক্ষার প্রণোদনা ছিল না। হরিশংকরের ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে উপন্যাসের শিবশঙ্করের ব্যক্তিজীবন ও পারিবারিক জীবনের নিবিড় সাদৃশ্য বিদ্যমান।

উপন্যাসে শিবশঙ্করের পিতা সুধাংশু জলদাসের অভাবের সংসারে সাতটি ভাই বোনের মধ্যে শুধু শিবশঙ্কর লেখাপড়া শিখেছে। যদিও একটি ভাই জন্মের পরে মারা যায়। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে শিবশঙ্কর সবার বড়। উপন্যাসে সুধাংশু নিজের দারিদ্র্য ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠলেও বড় ছেলে শিবশঙ্কর ছাড়া আর অন্য ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত করতে পারেননি। লেখক সুধাংশুর পারিবারিক অবস্থার চিত্র চিত্রণে লিখেছেনÑ

সুধাংশুর পরিবার অভাব কাটিয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। পরের বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না আগে। এখন তিন-চার দিনের চাল-ডাল-আনাজপাতি ঘরে জমা থাকে। একটা বিহিন্দিজাল কিনেছে সুধাংশু। প্রথম বছর সতীশ বহদ্দারের নৌকায় পাউন্যা নাইয়া হয়েছে। সে বছর মাছও পড়েছে সুধাংশুর জালে। এক জো-তে জালে পর পর দিন দিন ঘোঁওড়া আর লাম্বু মাছের ঝাঁক ঢুকল।… পরের বছর সুধাংশু আরও দুটো জাল কিনল, পুরোনো একগাছি একটা নৌকাও কিনল। সুধাংশু বহদ্দার হলো।২৭

শিবশঙ্কর ছাড়া সুধাংশুর অন্য ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার বর্ণনায় ঔপন্যাসিক লিখেছেনÑ ‘সূর্যমোহনের গণিতে মাথা মোটা। ফেল করায় এইটে দুবছর ধরে পড়ছে। সীতানাথ ধূর্ত প্রকৃতির। সে যে ভালো ছাত্র, এমন নয়। কিন্তু পরীক্ষার সময় সামনের এবং আশপাশের ছাত্রদের কাছ থেকে টুকলিফাই করে বার্ষিক পরীক্ষা ঠিকই পাস করে যায়। ব্রজেন্দ্র গাঁট্টাগোট্টা ধরনের। তার বুক চওড়া, কবজি মোটা। সে কাউকে বেশি পরোয়া করে না।… ফাল্গুনী পতেঙ্গা বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। ফাইভ পর্যন্ত পড়েও ছিল। কিন্তু এর বেশি পড়ার সুযোগ ফাল্গুনীর হয়নি। উত্তর পতেঙ্গা পিছিয়ে থাকা গ্রাম। ভাঙাচোরা ঘরের একটা হাইস্কুল আছে বটে এ গাঁয়ে, কিন্তু তা ছেলেদের। মেয়েদের কোনো হাইস্কুল নেই। শুধু পতেঙ্গায় নয়, উত্তর পতেঙ্গার আশপাশের পাঁচ-ছায় মাইলজুড়ে কোথাও মেয়েদের পড়ার কোনো হাইস্কুল নেই। তাই পঞ্চম শ্রেণির বিদ্যা নিয়ে ফাল্গুনী ঘরে থাকল।’২৮

এ রকম একটি পরিবেশে ও পারিবারিক অবকাঠামোর মধ্যে আজন্ম বেড়ে ওঠা শিবশঙ্কর জেলেপাড়ায় ঘোর অমানিশায় এক বাতিঘরের নাম। যাঁর পিতা সুধাংশু জলদাসের আর্থিক অবস্থার খানিকটা উন্নতি ঘটলেও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হতে তিনি আজীবন মুক্ত হতে পারেননি। যাঁর অক্ষরজ্ঞান ছিল শূন্যের কোঠায়, তাঁরই রক্ত অহল্যার গর্ভে ঝড়ে-ঝঞ্ঝায় ভ্রুণায়িত হয়ে শিবশঙ্করের জন্ম দিয়েছে। যে শিবশঙ্কর নোনাজল ও নোনাজীবনের মধ্যে আমৃত্যু লড়ে অমৃতের সুলুকসন্ধান করেছেন। শিবশঙ্করের অন্যান্য ভাই-বোনের লেখাপড়া না হওয়ার পেছনে সুধাংশুর আর্থিক টানাপড়েন দায়ী থাকলেও সন্তানদের চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের অভাব বিশেষভাবে দৃশ্যমান। জীবনযুদ্ধের অপরাজেয় দ্বৈরথ হরিশংকর জলদাস নিজের আত্মপ্রতিকৃতিকে বারবার শিবশঙ্করের ভেতর খুঁজে ফিরেছেন। লেখক যে পরিবার ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেছেন এবং বিদ্যার্জন করেছেন তা শিবশঙ্করের জীবনের প্রতিরূপ। সুধাংশু জলদাসের মধ্যে লেখক তার পিতা যুুধিষ্ঠির জলদাসকেই যেন প্রতিঅঙ্কিত করেছেন। সমুদ্রে অন্যের জাল ও নৌকায় মাছ ধরে, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যুধিষ্ঠির জলদাস সুধাংশু জলদাসের মতো আমৃত্যু দারিদ্র্যকেই তাড়াতে চেয়েছেন। সন্তানদের শিক্ষিত করে ‘জলদাস’ গোত্র পরিচয়ের বাইরে এনে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর কৃপা লাভের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও সুধাংশুর মতো আংশিক সফল হয়েছেন। হরিশংকর জলদাস পিতার দারিদ্র্যের মর্মন্তুদ বর্ণনা ও ভাই-বোনের শিক্ষিত না হয়ে ওঠার সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করে লিখেছেন-

প্রথম দিকে আমাদের কোনো নৌকা-বিহিন্দি জাল ছিল না। বহদ্দারদের ঘরেই বিহিন্দি জাল থাকত। থাকত গাবঘর। ঘাটে বাঁধা থাকত একগাছি নৌকা। বাবা ছিল অতি সাধারণ জেলে। সাধারণ জেলেদের টাউঙ্গা বা হুরি জালই ভরসা। খাল-বিল, কুয়া, সমুদ্রকূলে জাল ঠেলে ঠেলে মাছ ধরে। বাবাও সকালে একবার এবং রাতে আরেকবার জাল-দুইজ্যা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত, খররোদ্দুরে অথবা দুর্যোগময় ঝড়জলে। বাবার ধরা মাছের টাকায় সংসার চলত না। এগারজনের হাঁ-করা মুখে খাদ্য জোগানো সহজ কাজ নয়। বদ্দা (ঠাকুর্মা) মানুষের কাছ থেকে মাছ কিনে বাবা মাছ ধরা শুরু করার পরও, আমরা সব ভাই-বোন জন্মানোর পরও, হাটে- বাজারে, পল্লির অলিগলিতে বিক্রি করত। লাভের টাকাটা ভর্তুকি হিসেবে বাবার মাছের টাকার সঙ্গে যুক্ত হতো। এ দিয়ে আমাদের সংসার চলত। কোনো বেলা খাওয়া জুটত আমাদের, কোনো বেলা জুটত না। শাকান্নই আমাদের প্রধান খাদ্য ছিল।… আমি ছাড়া আমার অন্য ভাই-বোনেরা তেমন পড়ালেখা করেনি, একজন ভাইয়ের দুবার বিএ পরীক্ষা দিয়ে ফেল করা ছাড়া। লেখাপড়া না করার প্রধান কারণ বাবার অর্থনৈতিক অক্ষমতা। কিন্তু তারপরও আমি বলতে চাই, ভাইদের মধ্যে অধ্যবসায়ের অভাব ছিল বড়। তা নইলে কেন, সেই দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে করে আমি তো হেঁটেছি আলোর দিকে। তারা পারল না কেন? কারণ, তাদের তুলনায় আমার ধৈর্য আর অধ্যবসায় ছিল অনেক বেশি।২৯

উপন্যাসে শিবশঙ্কর ঔপন্যাসিকের ধৈর্য ও অধ্যবসায়কে জীবন উৎকর্ষের চবিশব্দ বিবেচনা করে তরঙ্গসঙ্কুল পথ অশঙ্কচিত্তে অতিক্রমে অভিনিবিষ্ট হয়েছেন। বহুধা বিভক্ত জীবনের তেতো অভিজ্ঞতাকে অবিমৃষ্যকারীর মতো নঞর্থকতার ছাঁচে ফেলে জীবনকে অবিষহ্য করে তোনেলনি। জীবন নিয়ে শ্লাঘাবোধ না করলেও বিষাদের নোনাজল যে সে জীবনের চতুর্পার্শ্বে ঘোঁট পাকায়নি এমনটা নয়। অপমান, অপযশ, লাঞ্ছনা, নিন্দা, দলিত জনগোষ্ঠী হওয়ায় উচ্চবংশজাতদের ঘৃণা, অবজ্ঞা; সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার ছোবল, প্রিয়জন হারোনোর অন্তর্দাহ, আপনজনদের কাছ থেকে আসা অপ্রত্যাশিত আঘাত শিবশঙ্করের জীবন ভাঁড়ারে এসে থরে থরে সঞ্চায়িত হয়েছে। অব্যক্ত ব্যথাকে বুকের ভেতর দুঃখের মতো পুষেছেন কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের সংকল্পে ছিলেন অপ্রকম্প। পরিশ্রম, সততা, জীবনের প্রতি দায়বোধ, প্রান্তিক বর্ণ পরিচয়কে ঘুঁচিয়ে দেবার অবিনত প্রত্যয় তাঁকে কর্তব্যকর্ম প্রতিপালনে অবিতর্কিতভাবে প্রসক্ত করে তুলেছে। পূর্বপুরুষদের জলজীবনের সংগ্রামকে তিনি কখনও বিস্মৃত হননি। পূর্বপুরুষের নোনাজীবন তার ভেতরে গভীরতর এক জীবনবোধের জন্ম দিয়েছে। মাইজপাড়ার কলেজ জীবন থেকে যখনই উত্তর পতেঙ্গার নিজ বাড়ির জেলেজীবনে শিবশঙ্কর ফিরেছেন; তখনই বাল্যবন্ধু সুনীল, অসমবয়সী চৈতন্য খুড়ার সঙ্গে সমুদ্র পারে বসে তাদের সঙ্গে ফেলে আসা জীবনের গল্প নিয়ে মেতে উঠেছেন। জল জীবনবোধ ও জেলেজীবনদর্শন তাকে ক্ষণকালের জন্য ভাবুক করে তুলেছে।

উত্তর পতেঙ্গার জেলে, জাল ও জলের জীবনে যখন শিবশঙ্কর ফিরেছেন, তখন চট্টগ্রাম কলেজে অনার্স পড়া শিক্ষিত যুবকের চরিত্র যেন আড়াল হয়ে গিয়েছে। তাঁর রক্তে জলের কলরোল ধ্বনিত হয়েছে। যে জনগোষ্ঠীর নুন-পান্তার জীবন ও নিকষ আঁধারের ভুবন হতে বিযুক্ত হয়ে আলো অভিমুখে শিবশঙ্করের অন্তর্নিবিষ্ট যাত্রা; সে জনজাতির সঙ্গে যখনই সে যুক্ত হয়েছে তখনই গায়ে জলপুত্রের আঁশটে গন্ধের অস্তিত্ব তাঁর মনকে চঞ্চল করে তুলেছে। মনের অলিন্দে জমে থাকা দুঃখ, কষ্ট, পাওয়া, না-পাওয়ার অনুতাপ কখনও বাল্যবন্ধু উদাসী সুনীল, কখনও অসম বয়সী গৃহীবাউল চৈতন্য খুড়ার সঙ্গে সে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ‘জেলেদের স্বস্তির জায়গা সমুদ্রপাড়, দুঃখ নিবারণের জায়গাও সমুদ্রপাড়। সময় পেলেই ওরা সমুদ্রপাড়ে গিয়ে বসে, নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ পরস্পরের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে। শিবশঙ্কর যখন উত্তর পতেঙ্গায় আসে, তখন সে ভুয়ে যায়, সে চট্টগ্রাম কলেজে অনার্স পড়ে; ভুলে যায়, সভ্যশিক্ষিত মানুষের সঙ্গে তার উঠাবসা। এখানে এলেই সে তার গায়ের আঁশটে গন্ধ টের পায়, এখানে কল্লোলিত সমুদ্রতট তাকে ডাকে-আয় আয়। তাই সুনীলের সঙ্গে, চৈতন্য খুড়ার সঙ্গে তার কথাবার্তা হয় বঙ্গোপসাগরপাড়ের উঁচু বেড়িবাঁধে বসে।’৩০

উত্তর পতেঙ্গার জেলেপাড়ার চৈতন্য খুড়ার সঙ্গে শিবশঙ্করের একটা মানসিক বন্ধন তৈরি হয়। বয়সের ব্যবধান বিস্তর হলেও খুড়ার বিপর্যস্ত জীবন ও যন্ত্রণাদগ্ধ মুখশ্রী শিবশঙ্করকে ব্যথিত করেছে। স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে চৈতন্য খুড়ার ভর-ভরন্ত একটা স্বস্তির সংসার ছিল। কিন্তু এই স্বস্তির জীবনে খুড়ি অকস্মাৎ বিষ ছিটিয়ে দিয়েছিল। পঁয়ত্রিশ পেরোনো খুড়ি দুই সন্তানের জননী হলেও চেহারায় একটা চিকনাই সোহাগী ভাব ছিল। স্বভাবও ছিল চটুল গোছের। ফর্সা শরীরের গড়ন তখনও ভাঙেনি। দুটি সন্তান হলেও খুড়িকে তরুণী বলেই মনে হতো। নৌকা-জাল ও সমুদ্রের জীবন নিয়ে ব্যস্ত খুড়া খুড়িকে সুখী রাখলেও মন ও দেহের সুখে খুড়ি ছিল অসুখী। এক রাতে পাশের বাড়ির অবিবাহিত যুবক গৌরাঙ্গের কাছে দেহদানের সময় হাতে-নাতে ধরা পড়ে খুড়ি। লোকজনের চিল্লা-হুল্লায় খুড়িকে নিয়ে গৌরাঙ্গ পালাতে অসমর্থ হয়। জেলেপাড়ার সর্দারদের বিচারে দুজনকে  ‘ঢেন্ডেরি’ শাস্তি দেওয়া হয়। পরেরদিন গৌরাঙ্গ খুড়িকে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে পড়ে। তারা মুসলমান হয়ে নিকাহ করে। আনোয়ার আর রহিমা নামে তারা কাটগড়ের মুসলমানপাড়ায় বসবাস করতে শুরু করে। এ ঘটনার পর চৈতন্য খুড়া জীবনের সকল আনন্দ হারিয়ে ফেলে। কখনও কখনও সে আত্মহননের কথাও ভেবেছে। গৃহে থেকেও খুড়ার মনটা গৃহসন্ন্যাসী হয়ে ওঠে। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা খুড়ার মধ্যে এক বিপন্ন মনোভাব জাগ্রত করে। খুড়ার এই মনোগত বিলাপের সুর শিবশঙ্করের মনকেও ব্যথিত করেছে। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও শিবশঙ্কর যন্ত্রণাদগ্ধ উদাসী চৈতন্য খুড়ার সহমর্মী হয়ে উঠেছে। চৈতন্য খুড়ার নির্বাণোন্মুখ জীবন প্রদীপে শিবশঙ্কর জীবনের ‘দম’ কে নতুনভাবে জ্বেলে দিয়েছেন। কারও শূন্যতার জন্য জীবন শূন্যের কোঠায় পড়ে থাকে নাÑ খুড়ার জীবনাবলোকনে এমন বস্তুবাদী দর্শনে শিবশঙ্করের মন উপনীত হয়েছে। খুড়াও শিক্ষিত শিবশঙ্করের সান্নিধ্যে ও তাঁর আর জীবনতৃষ্ণা জাগ্রত বক্তব্যে অন্ধকারেও যেন আলোর রেখার সন্ধান পেয়েছে। একটা অজানা তৃপ্তি ও স্বস্তিবোধে সে আত্মবিহ্বল হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের পাড়ে বসে শিবশঙ্কর জীবনযুদ্ধে ক্লিষ্ট, হালভাঙা নাবিক চৈতন্য খুড়াকে জীবনে উঠে দাঁড়াবার মন্ত্র শুনিয়েছেনÑ

শিবশঙ্কর এবার বঙ্গোপসাগরের দিকে নিজের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। বিশাল সমুদ্রের ওপর চোখ রেখে বলে, ‘সমুদ্রপাড়ের ওই লক্ষ কোটি মানুষের সবার মন এক রকম নয়। কেউ সুখী, কেউ দুখী। কারও ঘরে সন্তান হচ্ছে, কারও একমাত্র সন্তান মারা যাচ্ছে। কারও বিয়ে হচ্ছে, কেউ বিধবা হচ্ছে। কেউ হাহাকারে উন্মাদ, কেউ কেউ আবার আনন্দে উন্মাতাল। ঠিক কি না খুড়া?

চৈতন্য খুড়া ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বলে, তা তো ঠিক।

এজন্য কারও পৃথিবী থেমে আছে খুড়া? একজন চলে গেলে, আরেকজন এসে সেই খালি জায়গা পূরণ করে দিচ্ছে। কাউকে ছাড়া কারও জীবন থেমে যায় খুড়া?

‘না। তা তো থাইমে থাকে না।’ আমতা আমতা নিচু কণ্ঠে বলে খুড়া।

এবার কণ্ঠকে খাদে নামাল শিবশঙ্কর। দুই হাত চৈতন্য খুড়ার দুই কাঁধে তুলে দিয়ে মমতাভরা গলায় বলল, ‘তা হলে খুড়া তোমার জীবনকে তুমি থামিয়ে দিলে কেন? মানুষের জীবনে ক-ত কষ্ট জমে খুড়া। কিন্তু একটা সময় সেই কষ্টকে ভুলে মানুষ নতুন করে হাঁটা শুরু করে। তুমি তো আমাকে বারবার বলো মানুষ যে মাটিতে আছাড় খায় সেই মাটি ধরেই আবার উঠে দাঁড়ায়। তোমার সন্তানরা ঘরে। অন্তত তাদের জন্য তুমি সংসারের দিকে নতুন চোখে তাকাও। আবার হাল ধরো সংসারের।৩১

ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাস চৈতন্য খুড়া ও খুড়ির জীবনচিত্র অঙ্কনের মধ্য দিয়ে মানব মনস্তত্ত্বের এক জটিল সমীকরণের তত্ত্বানুসন্ধান করেছেন। গার্হস্থ্য জীবনের সুখ ছাড়াও মানুষ তার মনোগত ও দেহগত সুখ চরিতার্থ করার জন্য পঙ্কিল জীবনে পা বাড়াতে দ্বিধা করে না। তার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন লেখক চৈতন্য খুড়ির গৌরাঙ্গকে দেহদানের মধ্য দিয়ে।

মানুষের মানসিক ও জৈবিক চাহিদা কখনও কখনও পাশবিকতায় রূপ নেয়; তখন মানুষ প্রথাগত জীবনের চিরায়ত বিশ্বাস, নির্ভরতা ও ভালোবাসায় অনাস্থাশীল হয়ে ওঠে। যেমনটি হয়ে উঠেছে চৈতন্য খুড়ি। সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের জগৎকে কালিমালিপ্ত করে খুড়ার জীবনটাকে তমসাচ্ছন্ন করে তুলেছেন খুড়ি। লেখক উপন্যাসে এই দুই নর-নারীর দাম্পত্য জীবনের গহিনে নির্মোহ দৃষ্টি সঞ্চালনা করে ছকে বাঁধা জীবনের ঘেরাটোপ থেকে মানব মনস্তত্ত্বকে অবমুক্ত করে সেখানে মন ও কামনার নতুন নিরীক্ষণ উপস্থাপন করেছেন।

চট্টগ্রাম কলেজ কেন্দ্রিক শিবশঙ্করের যে জীবন উপন্যাসে আবর্তিত হয়েছে সে জীবনে মিছিলের মতো অনেক চরিত্র ভিড় করে এসেছে। সব চরিত্রকে লেখক উপন্যাসের শেষ গন্তব্য পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাননি। প্রিয়রঞ্জন এসব চরিত্রের মধ্যে ব্যতিক্রম। ইংরেজি বিভাগের ছাত্র প্রিয়রঞ্জনকে ঔপন্যাসিক শিবশঙ্করের কেবল বন্ধু চরিত্র হিসেবে অঙ্কন করেননি; প্রিয়রঞ্জনকে করে তুলেছেন শিবশঙ্করের ভরসা ও আস্থার প্রতীক। দুজনা ছিল দুজনার মর্মসঙ্গী। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন সময়ে অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি প্রিয়রঞ্জনের সঙ্গে শিবশঙ্কর ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। পড়ালেখা শেষে অনেক দিনের বিচ্ছেদের পর কর্মজীবনে দুই বন্ধু চট্টগ্রাম সিটি কলেজ আবার একত্রিত হয়েছেন, অধ্যাপনাও করেছেন একসঙ্গে। ততদিনে শিবশঙ্কর সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে গেছেন। নানা বিপদে-আপদে পরামর্শে প্রিয়রঞ্জন ছিল শিবশঙ্করের ভরসাস্থল। যখনই শিবশঙ্করের মন অশান্ত হয়েছে, নানা আঘাতে চিত্ত ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে তখনই বন্ধু প্রিয়রঞ্জনের সান্নিধ্যে সে প্রশান্তি লাভ করেছে। শিবশঙ্কর তখন সিটি কলেজের অধ্যক্ষ। সেই কলেজেই অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন প্রিয়রঞ্জন। উপন্যাসের উপান্তে হার্ট অ্যাটাকে বন্ধু প্রিয়রঞ্জনের মৃত্যু শিবশঙ্করকে প্রচণ্ড আঘাতে বিপর্যস্ত করেছিল। প্রিয়রঞ্জনের মৃত্যুর শোক শিবশঙ্করের কাছে আপনজনের মৃত্যুশোক থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। প্রিয়রঞ্জনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে যান শিবশঙ্কর। প্রিয়রঞ্জনের লাশবাহী গাড়িকে ঘিরে তাঁর ব্যতিক্রমী অনুভূতি প্রকাশের দৃশ্যাঙ্কনে ঔপন্যাসিকের মর্মভেদী চিত্রাত্মক বর্ণনা সিটি কলেজের উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষকবৃন্দের চোখকে যেমন সজল করেছে; তেমনি পুরো পরিবেশকে শোকভারাক্রান্ত করে তুলেছে।

সবাইকে এড়িয়ে দূর দিয়ে একজন মানুষ লাশবাহী গাড়িটির চারদিকে চক্রাকারে ঘুরে যাচ্ছে। তার গণ্ড বেয়ে জলের ধারা নেমে যাচ্ছে। সেদিকে লোকটির খেয়াল নেই। বাচ্চা মারা গেলে মা কুকুরটি যেমন মৃতদেহ সামনে রেখে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে লোকটিও সেরকম করে ঘুরে যাচ্ছে, শুধু ঘুরে যাচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে মা কুকুরটি মুখ দিয়ে কুঁই কুঁই আওয়াজ করে আর হঠাৎ হঠাৎ মৃত বাচ্চাটির শরীর লেহন করে। তারপর আবার ঘুরতে থাকে। লোকটির মুখ দিয়ে কুঁই কুঁই আওয়াজ বেরোচ্ছে না, কিন্তু আপনমনে বিড়বিড় করে কী যেন বলে যাচ্ছে লোকটা। কী বলছে, বোঝার উপায় নেই। তবে কিছু একটা যে অবিরাম বলে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।৩২

এই লোকটি হলো শিবশঙ্কর। ঔপন্যাসিক এই দুই বন্ধুকে উপন্যাসে হরিহর আত্মারূপে চিত্রিত করেছেন। শিবশঙ্করের মনে বন্ধু বিয়োগ ব্যথাকে সকরুণ ভাষাচিত্রে মহিমান্বিত করে তুলেছেন হরিশংকর জলদাস। তবে বন্ধু মৃত্যুর পূর্বে আরও অনেক ঘটনা শিবশঙ্করের জীবনকে সঙ্গীন করে তুলেছিল। জীবনের নানা চরাই-উতরায় ডিঙিয়ে, বাঁকবদলে সে সব ঘটনা উত্তাল জলস্রোত-ই সৃষ্টি করেছে। বিপুল আঘাতে তা জীবনের গতিপথকে অনেক সময় বদলেও দিয়েছে।

কলেজ জীবনের দিনগুলোতে কঠোর সংগ্রাম ও সাধনার মধ্য দিয়ে স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছে শিবশঙ্করকে। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন দিনগুলো যে সব সময় নিস্তরঙ্গ ছিল এমন নয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, রাজনৈতিক উত্তাপকে মোকাবিলা করে তাকে অবিশঙ্ক যোদ্ধা হিসেবে সমস্যাসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তবে এই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথে তিনি সালেহ আহমদ, মমতাজ উদ্দীন আহমদের মতো অনেক গুণী শিক্ষকদের ভালোবাসা লাভ করেছেন ও সান্নিধ্যধন্য হয়েছেন। দরিদ্র পরিবারে দায়িত্ব তাঁকে নিতে হবে। কতগুলো স্বপ্নমেদুর মুখ তার পানে চেয়ে আছে। বাবা সুধাংশু, মা অহল্যা ও অন্যান্য ভাই-বোনেরা ভেবেছে একদিন সে শিক্ষিত হবে। বড় হয়ে চাকরি-বাকরি করে মুখ থুবড়ে পড়া সংসারের হাল ধরবে। পরিবারের এই স্বপ্ন পূরণের তাড়না তাকে সাংঘর্ষিক মারপিটের রাজনীতি পরিহার করতে প্রণোদিত করেছে। শিবশঙ্কর সক্রিয় রাজনীতিতে না জড়ালেও মনে মনে একটা গভীর রাজনৈতিক বিশ্বাসকে  লালন করেছেনÑ

শিবশঙ্করের  যে নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস নেই, এমন নয়। সেও বিশ্বাস করে স্বাধীনতায়, সেও মনে মনে মাথা নোয়ায় সেই পুরুষটির সামনে, যিনি বাঙালিকে লাল-সবুজের একটি পতাকা এনে দিয়েছেন, যিনি উচ্চারণ করেছেন সেই মহামন্ত্রটি- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

কিন্তু তারপরও পরিবারের কথা ভেবে শিবশঙ্কর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকে।৩৩

কৈবর্ত পরিচয় ঘুচিয়ে দিয়ে সভ্য সমাজের একাংশ হয়ে জ্ঞান সাধনায় তন্নিষ্ঠ হওয়ার সংগ্রাম পরিদৃষ্ট হয়েছে শিবশঙ্করের চরিত্রে। নিরুপদ্রব জীবন সে পায়নি; পলে পলে সে জীবনপাত্রে বিষাদের রস জমা হয়েছে। তবুও সে জীবন রাজনৈতিক ভাবাদর্শচ্যুত হয়নি। অসাম্প্রদায়িক উগ্রচেতনার বিনাশী আগ্রাসনে তার বোধ ও বোধির জগতের বিনষ্টি ঘটেনি। ঔপন্যাসিকের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধ, রাজনৈতিক সচেতনতা ও ভাবাদর্শের বীজমন্ত্রটি যা তিনি সময়ের সঙ্গে বিরূপ প্রতিবেশে একাগ্রচিত্তে লালন ও ধারণ করেছেন তাকেই শিবশঙ্করের মননে ও চৈতন্যে শব্দশস্যে বুনে দিয়েছেন। এমএ পাস করার পর চাকরি না পেয়ে শিবশঙ্কর যখন অসহায় ও বিপন্নবোধ করেছেন; পরিবারের দারিদ্র্যদীর্ণ অসহায় মুখগুলো যখন তাঁর ওপর প্রত্যাশার চাপ সৃষ্টি করেছে তখনও তিনি অতীতের ফেলে আসা দিনের রাজনৈতিক পালাবদলে সুশাসন ও দুঃশাসনের গৌরবদীপ্ত ও কলঙ্কজনক অধ্যায় স্মৃতিভ্রষ্ট হননি। উত্তর পতেঙগা হাইস্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সিরাজ স্যার তাঁকে পাশের গ্রাম সাজনমেঘ এ নতুন প্রতিষ্ঠিত ‘সাজনমেঘ’ হাইস্কুলে সাতশো টাকার চাকরিতে  যোগদান করার প্রস্তাব দিলে মহূর্তেই শিবশঙ্করের চোখে রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চের পালার দৃশ্যগুলো চিত্রপটে ভেসে উঠেছে-

দিন তিনেক পরে সিরাজ স্যার শিবশঙ্করকে ডেকে পাঠালেন স্কুলে। পতেঙ্গা হাইস্কুল থেকেই এসএসসি পাস করেছিল শিবশঙ্কর। তখন সিরাজ স্যার ছিলেন সহকারী শিক্ষক। ইংরেজি পড়াতেন। কড়া ধাঁচের মানুষ। দিনের পর দিন গেছে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন গেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির দরজায় কড়া নেড়েছে। তারপর শাপলা জাতীয় ফুল, কাঁঠাল জাতীয় ফল হয়েছে। দোয়েলের মর্যাদা বেড়েছে এদেশে। জাতীয়তাবাদী বাঙালির কাছে অম্লান গানের মহিমা পেয়ে গেছেÑ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।

এরপর পঁচাত্তরের অমানিশা। তমোনাশরা হারিয়ে গেছে মীরজাফরদের ছুরিকাতলে। মীরজাফর সিরাজ-উদ-দৌলা সেজেছে। যুধিষ্ঠিরদের অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে দুর্যোধনদের দুঃশাসনের ঝাণ্ডার অতল অন্ধকারে।৩৪

সমাজ ও রাজনীতি সচেতন ঔপন্যাসিক  শিবশঙ্করের স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের তাণ্ডব এবং শাসনের নামে বাঙালির হাতে-পায়ে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে বাকস্বাধীনতা হরণের চিত্রকে মূর্ত করে তুলেছেন। পাশাপাশি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দেশীয় শোষকগণের স্বৈরশাসন ও ক্ষমতার মসনদে মিরজাফরের মতো ষড়যন্ত্র করে অধিষ্ঠিত হওয়া এবং দুর্যোধনের মতো দুঃশাসনে দেশ পরিচালনা করার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন।

সাজনমেঘ হাইস্কুলে সাতশো টাকার শিক্ষকতার চাকরি তাকে সাময়িকভাবে হতাশামুক্ত করলেও আশার আলো দেখার মতো কোনো স্থায়ী সমাধান এ চাকরি তাকে দিতে পারেনি। চার বছরের প্রচেষ্টায় সে স্কুলটিকে দাঁড় করিয়েছিল। স্কুলটির সুনামও ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। সাজনমেঘ হাইস্কুলের চাকরিটিও তাকে এক সময় ছেড়ে দিতে হয়েছিল। অপমানিত হয়ে, অভিমান বুকে চাপা দিয়ে সাজনমেঘ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শিবশঙ্করকে চাকরিটা ছাড়তে হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী  স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান রহমত আলি হায়দার শিবশঙ্করকে তার ভাগ্নেকে অনৈতিকভাবে বার্ষিক পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতে বললে শিবশঙ্কর রাজি না হওয়ায় সে শিবশঙ্করকে ছোট জাত ‘জাইল্যার পোলা’ বলে জাত নিয়ে খোঁচা দিয়ে অপমান করে। রহমত আলি হায়দারের অন্যায় দাবি না মানাতে শিবশঙ্করকে এক বিব্রত অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরবর্তীকালে সে অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে চাকরি ছেড়ে নিজের  ব্যক্তিত্ব ও পৌরুষকে রক্ষার্থে সমর্থ হয়। আলি হায়দারের ছদ্মবেশী মুখোশের আড়ালে তাঁর সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত রূপের অবয়বটিকে লেখক উপন্যাসে শব্দছবিতে চিত্রাত্মক করে তুলেছেনÑ

বড় চেটাং চেটাং কথা বলতে শিখেছেন দেখি শিবশঙ্কর বাবু। এমএ পাস করে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছিলেন। আমরা, মানে আমিই আপনাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে এই স্কুলের হেডমাস্টারের চেয়ারে বসিয়েছি।’

‘আপনি বসিয়েছেন আমাকে! শুনুন চেয়ারম্যান সাহেব, আমার যোগ্যতা বলেই আমি হেডমাস্টার হয়েছি। মাসে সাতশ টাকা বেতন দিয়েছেন, মেনে নিয়েছি। ভেবেছি-অন্ধকারে আচ্ছন্ন এই গ্রামটি আলোকিত হবে। আর কী বললেন যেন? রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছেন আমাকে!’

নয় তো কী? কী পরিচয় আছে তোমার মাস্টার? জাইল্যার পোলা তুমি। কী করে কী করে এমএ পাস করেছ। পাস করলে কী হবে, চাকরি পেতে নাকি! ছোটজাতের লোকদের আজকাল চাকরি দেয় নাকি কেউ? আমরা উদার বলে দিয়েছি।’ নিজের অবস্থানের কথা ভুলে গিয়ে হায়দার সাহেব শিবশঙ্করকে জাত-সম্প্রদায়ের খোঁচা দিয়ে কথা শেষ করলেন।’

স্তব্ধ হয়ে বসে রইল শিবশঙ্কর।… টেবিলে রেজিগনেশন লেটার চাপা দিয়ে সেই বিকেলে সাজনমেঘ হাইস্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছিল শিবশঙ্কর।’ ৩৫

স্কুলটি মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে। কমিটির সদস্যরা ছিলেন মুসলমান। তাই তাদের কেউই বিশেষত কমিটির চেয়ারম্যান রহমত আলি হায়দার প্রথমে স্কুলের স্বার্থে শিবশঙ্করকে সাজনমেঘ হাইস্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে মেনে নিলেও চার বছর পরে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে শিবশঙ্করের পরিশ্রমের চেয়ে তাঁর ‘জলদাস’ নিম্নবর্ণজাত পরিচয়টিই বড় হয়ে ওঠে। জেলে ছোটজাত। জলপুত্রের এমএ পাস করাটাকেও তিনি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। একই রকম একটি ঘটনা হরিশংকর জলদাসের জীবনেও লক্ষ করা যায়। বন্দরটিলা অঞ্চলে দক্ষিণ হালিশহর হাইস্কুল নামে একটা নবপ্রতিষ্ঠিত স্কুলে হরিশংকর জলদাস চারশত টাকা বেতনের একটি চাকরি শুরু করেন। চারজন সহকারী শিক্ষকদের সহায়তায় হরিশংকর নবনির্মিত স্কুলটি গড়ে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। স্কুলটির শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ও সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে স্কুল কমিটির মাথায় সাম্প্রদায়িক দুষ্টবুদ্ধি চেপে বসে। কমিটির সদস্যরা ছিল সকলেই মুসলমান। একজন হিন্দু নিম্নবর্ণজাত জলদাসের পুত্রকে সম্মান দেখাতে তাদের আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন হতে শুরু করে। তাদের কেউই বিশেষ করে, কমিটির বজল চেয়ারম্যান চাননি হরিশংকরের মতো কোনো জলদাস পুত্র তাদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে হেডমাস্টার থাকুক। স্কুল কমিটির সদস্য না হলেও কমিটির সব মিটিং এ উপস্থিত থাকা, সদস্যদের প্রিয়পাত্র শামসু তার সম্পর্কে কমিটির বজল চেয়ারম্যানের মনোভাব হরিশংকরকে জানিয়েছিল এভাবে :

শামসু বলে গেলেনÑ গত রাতে মোহাম্মদ আলী সাহেবের ঘরে মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে বজল চেয়ারম্যান, মোহাম্মদ ইসহাক, মোহাম্মদ মোতালেব এবং স্কুল কমিটির আরও মেম্বাররা উপস্থিত ছিলেন। বজল চেয়ারম্যানÑ যিনি স্কুলে এলে আমাকে বুকে চেপে ধরে রাখেন অনেকক্ষণ, বলেন, বাবা তোমার জন্য আজকে এই অন্ধকার বন্দরটিলা আলোকিত হচ্ছে, প্রস্তাব করেছেনÑ স্কুল তো দাঁড়িয়ে গেছে, এই জলদাসের পুত্রকে আর কেন? বলে তিনি নাকি উপস্থিত সকল মেম্বারের ওপর চোখ ফেলেছিলেন। তাকিয়ে তাকিয়ে সকলের মনোভাব বুঝে নিয়েছিলেন। তারপর বজল চেয়ারম্যান আরও বলেছিলেন, প্রায়-সময় স্কুলে যেতে হয় আমাদের। প্রধান শিক্ষক হিসেবে আদাব-সালাম দিতে হয়। একজন জাইল্যার পোলারে আদাব-সালাম দেওয়া মুশকিল। জোব্বার পকেট খেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে স্কুল সভাপতি মোহাম্মদ আলীকে বলেছিলেন- আপনি তাকে সরাসরি বরখাস্ত না করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদের প্রস্তাব দেন। বলেন, বেতন আরও পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দেব। প্রধান শিক্ষকের পদটা ছাড়েন। জেলের পোলা তো। চৌদ্দগুষ্টি ধরে সমুদ্রে মাছ ধরছে। মনটা বড় প্রতিবাদী হয় এই সমুদ্র সংগ্রামীদের। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ হলে কী হবে, বড় অভিমানী হয় ওরা। তাছাড়া এই ছেলেটার মধ্যে সম্মানবোধটা প্রবল। আপনার প্রস্তাব শুনে দেখবেন নিজে থেকেই ইস্তফা দিচ্ছে।…

সব কথা বলে শামসু জিজ্ঞেস করেছিলেন, স্যার, আপনি এখন কী করবেন? আমি তাঁর কথার কোনো জবাব দিইনি। শুধু ইশারায় সামনের চেয়ারে বসে থাকতে বলেছি।

তারপর একটা কাগজ টেনে নিয়ে খসখস করে রেজিগনেশন লেটার লিখে পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা দিয়েছি। শামসুকে বলেছি, ‘আপনাদের মোহাম্মদ আলী আর বজল চেয়ারম্যানকে বলবেন, আমি রিজাইন দিয়েছি। এই রইল রেজিগনেশন লেটার। ৩৬

ব্যক্তি জীবনে হরিশংকর জলদাস জাত-পাত-বর্ণ-গোত্র বিভাজনের মতো প্রথাগত সংস্কার থেকে মুক্ত; মানব মর্ম ও ধর্মের অসাম্প্রদায়িক স্বরূপের ধারক ও বাহক। কিন্তু তার খরস্নায়ু মন জাতি-বর্ণ-ভেদ প্রথার আঘাতে পরিক্লিষ্ট হয়েছে। তথাকথিত সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি পরিজ্ঞাত ছিলেন। ব্রাত্য জনজাতির প্রতি সমাজের অভিজাতের খড়গহস্ত সব সময় নির্মমভাবে নেমে এসেছে। জাত বিচারে যারা নিম্নবর্ণের তারা সমাজে সর্বদা অস্পৃশ্য বলেই বিবেচিত হয়েছে। উচ্চবংশজাত শ্রেণি বর্ণের মানুষের অবজ্ঞা, ঘৃণার বিষবাণ সব সময় সমাজের ‘জলঅচল’ শ্রেণির ওপর নিক্ষিপ্ত হয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষা-রুচি- সংস্কৃতিতে এগিয়ে যাওয়া ঔপন্যাসিক হরিশংকরও এই বিষবাণের নির্মম শিকার হয়েছেন। অনেকে প্রথমে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেও তাঁদের প্রকৃত রূপ ও মুখোশ পরে লেখক খুলে পড়তে দেখেছেন। তাই জনমভর আড়ালে-আবডালে, কখনও প্রকাশ্যে তাঁকে ‘জাউল্যার পোলা’ ছোটজাতের খোঁটা শুনতে হয়েছে। উচ্চবর্ণের নাক শিটকানো মনোভাব, অবহেলার উষ্মা সৃষ্টিলগ্ন থেকে নিম্নবর্ণকে ঘিরে পরিকীর্ণ থেকেছে। ঔপন্যাসিক নিজে এই অভেদ্য নিগড় থেকে যেমন মুক্ত হতে পারেননি; উপন্যাসে তাঁর সৃষ্টি নায়ক শিবশঙ্কর বা শিবুও শিক্ষিত রুচিবান হওয়া সত্ত্বেও জলপুত্রের গোত্র পরিচয় থেকে পরিত্রাণ পাননি। সাম্প্রদায়িক রোষের নিষ্ঠুর শিকার শিবশঙ্কর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সংবাদ পিতা সুধাংশুকে না জানিয়ে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের মর্মপীড়া বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। সেই মর্মযাতনা থেকে সুধাংশু নিজেই শিবশঙ্করকে মুক্ত করে দেন। ছোটজাত বলে শিবশঙ্করকে অপমান করায় শিবশঙ্কর প্রতিবাদ স্বরূপ চাকরি ছেড়ে দিয়েছে এমন তথ্য যখন সুধাংশু জলদাস জানতে পেরেছে তখন সে পুত্র শিবশঙ্করকে অপমানের সমুচিত জবাব হিসেবে চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় অভিনন্দিত করেছেন।

পুত্রের প্রতিবাদে তার বুক গর্বে ভরে উঠেছে :

সুধাংশু শিবশঙ্করকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে হু হু করে উঠল। অনেকক্ষণ পরে বুকের বাঁধন আলগা করে বলল, ‘বাবা, আমি অশিক্ষিত একজন জেলে। সারা জীবন কারও কাছে কুনু সম্মান পাই নাই। অকারণে অপমান পাইছি মানুষের কাছ থেইকে। প্রতিবাদ কইরতে পারি নাই। তুমি বাপ সেই অপমানের প্রতিশোধ লইছ। আমি যা কইরতে পারি নাই, তুমি তা কইরে দেখাইছ রে বাপ! তারপর কণ্ঠে প্রচুর আনন্দ ঢেলে সুধাংশু বলেছে, ‘চুলায় যাক তোমার হেডমাস্টারি। অই চাকরির দরকার নাই। কইরতে হইবে না তোমার অই হেডমাস্টারি। ৩৭

চাকরি ছাড়ার ব্যাপারে বাবা সুধাংশুর মানসিক ও আত্মিক সমর্থনে শিবশঙ্করের বুক থেকে একটা জগদ্দল পাথর নেমে যায়। টানাটানির নিরানন্দ জীবনে শিবশঙ্করের বিয়ে জেলেপাড়ার অন্য দশটা ঘটনার মতোই সম্পন্ন হয়। কলাবাগিচা জেলেপাড়ার রমাপতিবাবু ও গগনবালার কলেজপড়া একমাত্র কন্যা সুলেখার সঙ্গে শিবশঙ্করের বিবাহ হয়। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে আহারের জন্য আর একটি মুখ বাড়ে। সাতশ টাকার চাকরিটাও শিবশঙ্করকে ছেড়ে দিতে হয়। আর্থিকভাবে সচ্ছল রমাপতিবাবুর সঙ্গে শিবশঙ্করের একটা মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব উপন্যাসের শেষ অবধি লক্ষ করা যায়। শিবশঙ্করের সঙ্গে কন্যা সুলেখার বিয়ের ব্যাপারে প্রথমে রমাপতিবাবু রাজি ছিলেন না। পরে শিবশঙ্কর এমএ পাস সেটি নিশ্চিত হয়ে এবং চেহারা ও শারীরিক গড়ন দেখে তিনি রাজি হন। কিন্তু শ্বশুর-জামাই সম্পর্ক কখনও উপন্যাসে সহজ, সাবলীল হয়ে ওঠেনি। কোনো পক্ষ থেকেই সম্পর্কটিকে সহজ করার তাড়া বা প্রেষণা পরিলক্ষিত হয়নি। আর্থিক শ্রেণিগত অবস্থান ও বৈষম্যই এটির বড় কারণ বলে মনে হয়েছে। শিবশঙ্করের প্রতি রমাপতিবাবুর সুস্পষ্ট একটা অবজ্ঞার ভাব উপন্যাসজুড়ে দৃশ্যমান হয়েছে। তিনি শিবশঙ্করের বাড়িতে কোনো ধরনের অন্ন গ্রহণ করতেন না। শ্বশুরের প্রতি একটা অশ্রদ্ধা ও অনীহার ভাবই প্রকাশিত হয়েছে শিবশঙ্কর চরিত্রে। যদিও শ্বশুরই তার বিসিএস চাকরির বিজ্ঞপ্তিটি এনে দরখাস্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। চাকরি ছাড়ার পর টিউশনিকে যখন জীবিকার্জনের পথ হিসেবে বেছে নেন শিবশঙ্কর তখন আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পরিবারের সদস্যরা বিশেষত ভাইয়েরা তার স্ত্রী ও তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে শুরু করে। সত্যব্রত ও ব্রজেন্দ্র এবং পিতা সুধাংশুর উপার্জিত অর্থের সঙ্গে শিবশঙ্করের টিউশনি থেকে অর্জিত অর্থ যুক্ত করে কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে তাঁদের সংসার। পরিবারের ভাইয়েরা ও তাদের স্ত্রীরা তার আর্থিক অক্ষমতা নিয়ে খোঁচা দিতে শুরু করে। একটা পরিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। সত্যব্রত, সীতানাথ শিবশঙ্করকে অপমান করতে শুরু করে। সুলেখার প্রতি তারা আরও বেশি নির্দয় আচরণ করতে থাকে। ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুলেখা ভেঙে পড়ে। অন্তঃসত্ত্বা সুলেখা একদিন পুকুর ঘাটে পড়ে যায়। এ ঘটনার পরে সে একটা মৃত সন্তান প্রসব করে।

অভাবের সংসারে শিবশঙ্করের পরিবার ফাল্গুনীর বিয়ের ব্যাপারে আর একটি ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেমনটি সত্যব্রত ও ব্রজেন্দ্রের বিয়েতে করেছিল। সত্যব্রতের স্ত্রী রানিবালা এবং ব্রজেন্দ্রের স্ত্রী শিল্পীরানি দুজনের একজনও মানুষ হিসেবে উদার মনের ছিল না। ব্রজেন্দ্রের শ্বশুর হরেন্দ্র ছিলেন একজন ঠকবাজ-ধান্দাবাজ লোভী মানুষ। শিকলভাঙা গ্রামে ভজহরি চৌকিদারের ছেলে কোম্পানিতে চাকুরে অরবিন্দের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় ফাল্গুনীকে। ফাল্গুনীর সংসার সুখের হয়নি। মদ্যপ অরবিন্দ ফাল্গুনীকে কোনো মূল্যায়ন করেনি। ফাল্গুনীর ভাগ্যে আর্থিক কষ্ট ও স্বামীর লাঞ্ছনা এবং শারীরিক অত্যাচার জুটেছে। অরবিন্দ তার উপার্জিত সব টাকা মদে ও জুয়ায় ঢেলেছে। অরবিন্দকে মদ ও জুয়ার জীবন থেকে ফেরাতে ব্যর্থ ফাল্গুনী অরবিন্দ সম্পর্কে বাবা সুধাংশুকে বলেছে, ‘এই জীবন থেকে ফেরার কোনো পথ নেই বাবা। অনেক বুঝিয়েছি তারে। কেঁদে কেটে অভিমান করে, অনাহারে থেকে তাকে ফিরাবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ও ফেরার নয়। ক্যানসারের মতো জুয়া আর মদের নেশা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে বাবা।’৩৮

শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত অসুস্থ ফাল্গুনীর ধুঁকে ধুঁকে করুণ মৃত্যু হয়েছে। ফাল্গুনী মনপ্রাণ দিয়ে সংসার করতে চেয়েছিল। স্বামী অরবিন্দকে ভালোবেসেছিল। অরবিন্দ সে ভালোবাসার মূল্য দেয়নি। তাই তো  লেখক খুব নির্মোহ ও নিরাবেগ ভঙ্গিতে ভালোবাসা বঞ্চিত হতভাগা সম্ভাবনাময়ী ফাল্গুনীর জীবনের মৃত্যু সংবাদ পাঠকের কাছে সাদামাটাভাবে উপস্থাপন করেছেন –

শহরের একটা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়েছিল ফাল্গুনীকে। সুধাংশুদের জানানো হয়নি। শিবু শুধাংশুরা যখন জানল, ফাল্গুনীর প্রাণবায়ু তখন উড়ে গেছে। মৃতদেহের পাশে স্তব্ধ পাথর হয়ে বসে ছিল অহল্যা-সুধাংশু। মারমুখী সীতানাথ- সূর্যমোহন-সত্যব্রতরা যখন ক্লিনিকে পৌঁছেছিল, অরবিন্দ পেছন দরজা দিয়ে পালিয়েছিল। ক্লিনিকের দাবি মিটিয়ে বাপ-ভাইয়েরাই ফাল্গুনীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল।৩৯

স্বামীর অনাদরে ফাল্গুনীর মৃৃত্যু শিবশঙ্করের মনে স্থায়ী যন্ত্রণার দাগ কেটেছিল। আমৃত্যু শিবশঙ্কর ফাল্গুনীর অকালে ঝরে যাওয়ার ব্যাপারটি মনে রেখেছেন। একই রকম ঘটনার প্রভাব লক্ষ করা যায় হরিশংকর জলদাসের জীবনে। তাঁর দুই বোন তুলসী ও বৃন্দা। স্বামীর অত্যাচার অবহেলায় তুলসীর অকাল প্রয়াণ ঘটে। তুলসীর স্বামী ছিল মদ্যপ ও জুয়াড়ি। লেখক তুলসীর কথা স্মরণ করে লিখেছেনÑ

দাম্পত্য জীবনকে ভালো করে আস্বাদ করবার আগেই মারা গেল তুলসী। মারা গেল শুধু স্বামী অবহেলার জন্য। তুলসীর স্বামী বিচিত্র দাশ ছিল মদারু ও জুয়াড়ি। ১৯৭১ এর যুদ্ধ শেষে বিয়ে হয়েছিল তুলসীর।… এসএসসি পাস ছিল বিচিত্র। জেলে সমাজে এ রকম বর খুঁজে পাওয়া ভার। মাঝারি হাইটের হলেও বিচিত্র দেখতে খারাপ ছিল না। তুলসী বিচিত্রকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল। বিচিত্র তার দাম দেয়নি। কর্ণফুলীর ওপাড়ে জুলধা গ্রামে বিচিত্রর বাড়ি ছিল। চট্টগ্রাম শহরের পূর্বপ্রান্তে চাকরি করত সে। সপ্তাহান্তে বাড়ি যেত। গিয়েই জুয়ায় বসে যেত। সে সময় সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রবিবার। শনিবার সন্ধ্যে থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত জুয়া খেলে যেত বিচিত্র, অবিরতভাবে।… কোথায় বউ-বাচ্চার খোঁজখবর নেওয়া! কোথায় কী!

একদিন শুনলাম, তুলসীকে ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়েছে। ভীষণ অসুস্থ সে। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলাম ক্লিনিকে। একা পড়ে আছে বিছানায়।… শয্যাপাশে মাথা নিচু করে থেকেছিলাম বহুক্ষণ- আমি, আমার ভাইয়েরা, মা-বাবা। পরদিনই মারা গেল তুলসী। মানুষের হৃদয় পথর হয়ে যায়- এ রকম একটা কথা প্রচলিত আছে। আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। কাঁদতে পারিনি। ১৯৮৮ সালের ৭ নভেম্বর ছিল সেদিন। ওই দিন না কাঁদলেও প্রতিবছর ৭ নভেম্বর যখন আসে। নিভৃতে বসে তুলসীর জন্য কাঁদি।৪০

বোন তুলসীকে ঘিরে ঔপন্যাসিকের ব্যক্তি জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতি অনুষঙ্গের ছায়াপাত লক্ষ করা যায় শিবশঙ্করের বোন ফাল্গুনীর চরিত্রাঙ্কনে। প্রবহমান জীবনাভিজ্ঞতায় যে বেদনারস হরিশংকর জলদাস তাঁর মর্মের গহিনে জমিয়ে রেখেছিলেন তারই এক ধরনের যন্ত্রণাদীর্ণ বুনন প্রস্থানের আগে উপন্যাসের জমিনকে সিঞ্চিত করেছে। উপন্যাসের চরিত্র-পাত্ররা স্থান বিশেষ লেখকের কষ্টকে বয়ে চলেছে। কখনও কখনও তাদের মন পুড়েছে এবং ফাল্গুনীর মতো অন্তিমে জীবন মৃত্যুমুখে সমর্পিত হয়েছে।

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের চাকরিতে যোগদানের পরে পারিবারিক আর্থিক অভাব-অনটন থেকে ক্রমশ মুক্তি পেতে শুরু করে শিবশঙ্কর। ততদিনে যৌথ পরিবারে ভাঙনের সুর স্পষ্টতর হয়েছে। কালের চাকার আবর্তনে সুধাংশু ও অহল্যা জলদাস একসময় দেহ রাখে। উত্তর পতেঙ্গার যে জল ও জেলে জীবনে  শিবশঙ্কর জন্মেছিল; সেই জেলে জীবনের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে সুধাংশু ও অহল্যার লোকান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। দারিদ্র্যের সঙ্গে অবিরাম যুদ্ধ করে যাওয়া শিবশঙ্কর ও সুলেখা দম্পত্তির কোলজুড়ে মৃত্তিকা ও আকাশের জন্ম হয়। শহরে সচ্ছলতার মধ্যে ও শিক্ষিত সমাজের ভেতরে; জল ও মাছের আঁশটে গন্ধ বিবর্জিত বাতাসে মৃত্তিকা ও আকাশ বড় হয়ে উঠেছে। নাগরিক জীবনের সৌন্দর্যের আদলে গড়ে-পিঠে উঠেছে তাদের দেহাবয়ব। জেলে গোত্র পরিচয় থেকে মৃত্তিকা ও আকাশ বের হয়ে এলেও মৃত্তিকার অধঃপতন প্রকৃত অর্থে তার জীবন তরীকে বৃহত্তর জীবনস্রোতে সংযুক্ত করতে পারেনি।

রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে শুরু করা শিবশঙ্কর চাকরি জীবন নানা-ওলি-গলি পথ পেরিয়ে এক সময় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে এসে পৌঁছে। সেখানে গোলাপ সিংহ লেনে বাসা নিলে মাদক অধিদপ্তরে চাকুরে মেঘনাদ ঘোষ পরিবারের সঙ্গে শিবশঙ্করের পরিবারের একটা সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়। তবে ঘোষের ডাক্তার পড়য়া মেয়ে শ্রাবন্তির অবৈধ্য গর্ভধারণ ও গর্ভপাতকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের সুসম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। ঔপন্যাসিক শ্রাবন্তির অবৈধ গর্ভধারণকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি করেছেন। এই দূরত্ব তৈরির ব্যাপারটি লেখক আরোপিত এবং এ দূরত্বের কারণটিকে ঔপন্যাসিক উপন্যাসে ধোঁয়াচ্ছন্ন করে রেখেছেন। এ দিক থেকে শ্রাবন্তি চরিত্রটিকে তিনি যেমন পূর্ণতা দেননি; অন্যদিকে আকাশ চরিত্রটিকেও অপূর্ণ রেখেছেন। শ্রাবন্তিকে ঘিরে কোনো গোপন স্বপ্ন কৈশোরে আকাশের মধ্যে দানা বেঁধেছিল- এমন ভাবনার একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখক আকাশের ডাক্তার হওয়ার পরও বিবাহ না করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার মধ্য দিয়ে। সুলেখা ও শিবশঙ্কর আকাশের বিয়ের কথা যখনই তুলেছে তখনই আকাশ অসহায় ও বিপন্নবোধ করেছে। একদিন সন্ধ্যায় সুলেখা আকাশকে বিয়ের কথা বলায় আকাশের কথায় তার বিপন্ন মনোভাবের চিত্রটি ফুটে উঠেছেÑ

সুলেখা বলে উঠেছিল, ‘তোমার বিয়ে নামাতে চাইছি আমরা। তোমার মত দরকার।’

বিয়ের কথা বলার সময় এখনও হয়নি মা।’ আকাশ বলেছিল।

‘কখন হবে! বিসিএস পাস করেছ। চাকরি করছ, বয়স হয়েছে। এখনও বিয়ে করার সময় হয়নি তোমার। শিবুর গলায় বিরক্তির ছোঁয়া।

আকাশ কোনো উত্তর দেয় না। মাথা নিচু করে থাকে।

সুলেখা বলে, পছন্দের কেউ থাকলে বল, আমরা যোগাযোগ করি।’

‘যোগাযোগ করার সুযোগ নেই মা।’ বিষণ্ন কণ্ঠ আকাশের।

‘যোগাযোগ করার সুযোগ নেই মানে! বল বাপ বল তুই আমাদের। আমরা নিজেরাই উদ্যোগ নেব।’ আবেগে কেঁপে উঠল সুলেখার কণ্ঠস্বর।…

‘আমি আগে নিজের সঙ্গে যুদ্ধটা শেষ করে নেই, বাবা। যুদ্ধটা শেষ হলে তোমাদের বলব আমি।’ মায়ের দিকে তাকিয়ে সেই সন্ধ্যায় কথা শেষ করেছিল আকাশ।৪১

উপন্যাসের মূল বৃত্তায়নে আকাশ চরিত্রটির খানিকটা প্রাসঙ্গিকতা থাকলেও শ্রাবন্তি চরিত্রের তা ছিল না। আকাশ চরিত্র সৃজনে ঔপন্যাসিকের কাব্যিক কল্পনা সত্তা ও ভাবালুতা ক্রিয়াশীল থেকেছে। ফলে  লেখকের চরিত্র বর্ণনে ও চরিত্রের মনোকথন বিশ্লেষণে এক ধরনের বিক্ষিপ্ততা ও তীব্র ভাবাবেগ লক্ষ করা যায়। জীবনযুদ্ধে অসমসাহসী উদ্যমী পুরুষ শিবশঙ্করে পুত্র হিসেবে উপন্যাসে আকাশ চরিত্রটি একেবারেই তার বিপরীত বৈশিষ্ট্যের আদলে গড়েছেন ঔপন্যাসিক। ফলে আকাশ চরিত্রটি পুরোপুরি ব্যক্তিত্ববান ও মানসিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেনি। তাকে ঘিরে শ্রাবন্তি চরিত্রের আবর্তনের ব্যাপারটিকেও লেখক উপন্যাসে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছেন। কুমারী শ্রাবন্তির গর্ভধারণও অ্যবরশনের কোনো ব্যাখ্যা ঔপন্যাসিক পাঠককে দেননি। ডাক্তারি পড়ার শেষ মুহূর্তে শ্রাবন্তির জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা আকাশের কৈশোরের মনোজগতে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল কি না- লেখক তারও কোনো সুস্পষ্ট বর্ণনা উপন্যাসে দেননি। শিবশঙ্কর ও ঘোষ এই দুই পরিবারের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবানের কারণে তাদের নিজেদের মধ্যে ও উভয় পরিবারের সন্তানদের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে এমন ইঙ্গিত ঔপন্যাসিক প্রদান করার পরপরই শ্রাবন্তির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে সুসম্পর্কের ভাঙনের বর্ণনা প্রদানÑ বিষয়টি উপন্যাসের কাহিনিবৃত্তে একটা অসঙ্গতি তৈরি করেছে। শ্রাবন্তি ও আকাশ চরিত্র চিত্রণে ঔপন্যাসিকের দূরদৃষ্টি ও প্রাজ্ঞ বিবেচনাবোধের অভাব বিশেষভাবে পরিদৃশ্যমান।

শিবশঙ্করের মেয়ে মৃত্তিকা চরিত্রটিও সহজাত অবয়বে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। বাবার বিপরীত গুণগুলোই মেয়ের মধ্যে প্রকাশমান। ধনী নামকরা ব্যবসায়ী রূপক সেনের ছেলে মদ্যপ সুশান্ত সেনকে মৃত্তিকা ইংরেজি প্রথম বর্ষে পড়াকালীন সময়ে বিয়ে করে। বাবার অমতে বিয়ে করেছিল মৃত্তিকা। সুশান্তের সঙ্গে প্রেমের কারণে শিবশঙ্কর সুশান্তের সঙ্গে মৃত্তিকাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৃত্তিকার সে সংসার সুখের হয়নি। সুশান্ত উচ্ছৃঙ্খল জীবন থেকে বের হয়ে আসেনি। এমনকি মৃত্তিকার একমাত্র কন্যা প্রমা জন্মানোর পরও সুশান্তের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ঔপন্যাসিক মৃত্তিকার অসুখী জীবনের সংবাদ জানিয়ে লিখেছেনÑ

বিয়েটা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু বিয়েটা সুখের হয়নি। সুশান্তের লেখাপড়া খুব বেশি ছিল না। কুসঙ্গতে মিশত। বিয়ের পর শোধরায়নি সুশান্ত। এ নিয়ে সাংসারিক অশান্তি। অনেক কষ্টে অনার্স, এমএ করেছিল মৃত্তিকা। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে এই বিদ্যার কোনো দাম পায়নি সে। সন্তান এসেছিল মৃত্তিকার পেটে। সন্তান জন্মালে সুশান্ত পরিশীলিত হবে, এ রকম আশা করেছিল শিবু আর সুলেখা। কিন্তু প্রমা জন্মানোর পরও কোনোরূপ সংশোধন হয়নি সুশান্তের।৪২

ভালো পরিবেশ পেয়েও মৃত্তিকার মানসিক বিকাশে শিবশঙ্করের জীবনাদর্শ সক্রিয় থাকেনি। মৃত্তিকার শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত বেড়ে ওঠার কালে সে জীবন সম্পর্কিত কোনো  গভীর বোধ বা তত্ত্ব নিয়ে বেড়ে ওঠেনি। ফলে আর দশটা নারীর মতো সে গড়পড়তা প্রেম, রোমান্স, পড়ালেখাবিমুখ এক অশোধিত জীবনকে বেছে নিয়েছে। শিবশঙ্করের জীবনে পলে পলে অর্জিত সুনাম, সুখ্যাতিকে পদদলিত করেছে মৃত্তিকা। শিবশঙ্কর যে সংগ্রাম করে লাঞ্ছনা, অপমান, অবজ্ঞা, অবহেলা, ঘৃণা ও দারিদ্র্যকে  রুখে দিতে চেয়েছিলেন তা জীবনের প্রস্থানের পূর্বে পুরোপুরি পারেননি। মেয়ে মৃত্তিকা তার জীবনে সুখানুভূতির মধ্যে কাঁটার যন্ত্রণা হয়েই ঝুলে থেকেছে। মৃত্তিকার চরিত্র চিত্রণে ও পরিণতি দানে ঔপন্যাসিকের মনোযোগের কমতি পাঠকের মনে বেদনার গুরুভারকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

পঁয়তাল্লিশটি পরিচ্ছদে বিভাজিত প্রস্থানের আগে উপন্যাসটি কৈবর্ত সন্তান শিবশঙ্করের নোনাজীবনের, নোনাচেতনার; জলজঅভিজ্ঞতার অর্গল ভেঙে আলোকোজ্জ্বল উজানে পৌঁছাবার অক্ষরসমুদ্র। প্রকারান্তে শিবশঙ্করের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাসের জলজীবন ছেড়ে জ্ঞানজীবনে প্রবেশের শব্দ তোরণ এই উপন্যাস। তাই জীবনের দারিদ্র্যকে পরাজিত করে; অশিক্ষার অভিশাপ হতে মুক্ত হয়ে; ভদ্র সমাজের একজন হয়েও শিবশঙ্কর কৈশোরে কাঁধে লইট্যা মাছের ভার বহনের চিত্রটি বিস্মৃত হননি। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার পর তার সহকর্মী গণিতের সহকারী অধ্যাপক রঞ্জিত কুমার দত্ত শিবশঙ্করের অধ্যক্ষ হওয়ার পর কোন কথাটি প্রথমে মনে পড়ছে এমন প্রশ্ন করলে উত্তরে শিবশঙ্কর বলেছেÑ ‘আমার চোখের সামনে দিয়ে একটি চৌদ্দ-পনেরো বছরের বালক দৌড়ে যাচ্ছে। তার কাঁধে মাছের ভার। মাছের ভারে কুঁজো হয়ে গেছে ছেলেটা। তারপরও দৌড় থামাচ্ছে না। তাকে যে মাছের ভারটি নিয়ে তিন মাইল দূরের কমল মহাজনের হাঁটে পৌঁছাতে হবে। মাছ বেচা টাকায় কেনা চালডালে যে তার মা, বাবা ভাই-বোনদের ক্ষুন্নিবৃত্তি হবে। আর এই বালকটি আর কেউ নয় আমি। বালকবেলায় দিনের পর দিন এরকমই করতে হয়েছে আমায়।’৪৩

সিটি কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়টায় শিবশঙ্করের জীবনটাকে বিষময় করে তুলেছিলেন মোস্তফা আলি। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতার বিপক্ষীয় চেতনার ধারক ও বাহক। তার মতাদর্শে বিশ্বাসী দিলদার, আলম, মাজেদুল হক, মোনাব্বের প্রমুখ শিক্ষককের শিবশঙ্করের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিল। উপাধ্যক্ষের পদে সমাসীন মোস্তফা আলি ও তার অনুসারী শিক্ষকবৃন্দ শিবশঙ্করের অবসর গ্রহণ উপলক্ষে কোনো বিদায়ী সংবর্ধনা পর্যন্ত দেননি। উপাধ্যক্ষ থেকে অধ্যক্ষ হবার স্বপ্নে বিভোর মোস্তফা আলি হেন ষড়যন্ত্র নেই যা তিনি শিবশঙ্করের বিরুদ্ধে করেননি। শিবশঙ্করের অনুপস্থিতিতে কলেজের ক্যাশিয়ার নাজমুল আলমকে শিবশঙ্কর সম্পর্কে অপমান ও অবজ্ঞাসূচক কথা শোনান মোস্তফা আলি। অধ্যক্ষপদের জন্য বিকারগ্রস্ত মানুষটি কথায় কথায় শিবশঙ্করকে ‘জাউলার পোলা’ ‘মালাউন’ বলতে দ্বিধা করেননি। মুখে বিষোদগার করে সে ক্যাশিয়ার নাজমুল আলমকে বলেছেÑ

জাউলার পোলার জন্য আপনার এত দরদ কেন ক্যাশিয়ার? ভুইল্যা গেলেননি আমার আন্ডারে আপনারে চাকরি কইরতে হইবে?

‘দেখেন না স্যার কার ভাইগ্যে কী লেখা আছে কেউ তো জানে না। আপনার ভাইগ্যের কথাও তো আপনি জানেন না।’ মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল নাজমুল আলম।

‘প্রিন্সিপাল হইয়াই ছাড়ুম আমি। মালাউনডারে কইলাম, আমি একখান দরখাস্ত কইরতাছি স্যার, প্রিন্সিপাল পোস্টের লাইগা। আপনার তো উপরে অনেক জানাশোনা। আমার জন্য একটু তদবির করেন না স্যার। আপনার পায়ের উপর পইড়া থাকুম।’ ঘৃণা মিশিয়ে বলে গেল মোস্তফা আলি। … নাজমুলের দিকে মুখ ফিরিয়ে আবার সে বলেছিল, ‘জাউলার পোলাটা কী কইল জানেন? কইল- আমি তদবির করব আপনার জন্য। আমার তো ওপরের দিকে তেমন জানাশোনা নাই।’ তারপর মোস্তফা আলি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, ‘বুইঝলেন ক্যাশিয়ার সাব, মালাউনডার নাকি ওপরে জানাশোনা নাই! বানচোত আমারে জানাশোনা শেখায়। ৪৪

যদিও পরবর্তীকালে সে আর সিটি কলেজে অধ্যক্ষ হতে পারেননি। কিন্তু শিবশঙ্করের চাকরি জীবনের শেষাংশকে বিষজর্জর করে তুলতে সকল ধরনের অপচেষ্টায় তিনি লিপ্ত থেকেছেন। অপমানে জর্জরিত হয়ে, অবহেলার যন্ত্রণায় পুড়ে, অবজ্ঞা ও ঘৃণার অভিশপ্ত লালা গায়ে মেখে; কৈবর্ত সমাজে জন্মে শত প্রতিকূলতার চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে আলোকোভিমুখে যাত্রা করেছেন শিবশঙ্কর। তাঁর এ যাত্রার পূর্ণতর রূপ প্রতিপাদন করবে তাঁরই ডাক্তারি পড়া সন্তান আকাশ- এমনটিই স্বপ্ন দেখেছেন শিবশঙ্কর। আকাশ জলজীবন থেকে পরিপূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে স্থলজীবনের জীবিকা অবলম্বন করে সমুদ্রকে পদানত করবে। তাই সে ছেলে আকাশকে বলেছে-

জেলেসমাজে জন্ম আমার। সেখানে ঘোর অন্ধকার। দারিদ্র্য আর সমাজের বাহুবলীদের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ করে যেতে হয়েছে আমার। আপন ভাই সত্য-সীতা তারাও বিরোধিতায় পিছিয়ে থাকেনি। পদে পদে কাঁটা ছাড়িয়েছে। ওসবকে এড়িয়ে-মাড়িয়ে লেখাপড়া করেছি আমি। অন্নচিন্তা আমাকে দাবড়িয়ে বেড়িয়েছে অবিরাম। প্রতিবেলা যে খেতে পেয়েছি, এমন নয়। তারপরও থেমে যাইনি আমি। আজ তুমি যে পরিবেশ পাচ্ছ, সে রকম পরিবেশ আমি পাইনি। তোমার কোনো খাবারের চিন্তা নেই, পরিবেশের জঘন্যতার চিন্তা নেই। তোমার কাছে একটা জিনিসই শুধু চাই আমরা, তুমি ডাক্তার হবে। আমাদের সমাজে মানুষরা বড়ই দরিদ্র। শিক্ষা তো দূরের কথা, অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোর ক্ষমতা নেই তাদের। টাকার অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত জেলেরা অকালে মরে যায়। তুমি ডাক্তার হলে আকাশ, ওরা একটু সুচিকিৎসা পাবে। হাত তুলে আশীর্বাদ করবে ওরা তোমাকে। তোমাকে আশীর্বাদ করা মানে আমাদের তৃপ্তি, পরম তৃপ্তি। ওই তৃপ্তিটুকু নিয়ে আমরা মরতে চাই বাপ।…আমার বাপ-দাদা, পরদাদা পুরুষানুক্রমে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছে। জেলেজীবন ছিল তাদের। তোমার মধ্য দিয়ে সেই যুদ্ধের পুরোপুরি অবসান হবে। আমাকেও জীবনের অনেকাংশ জুড়ে জল যুদ্ধ করে  যেতে হয়েছে। আমার বংশে তুমিই প্রথম ব্যক্তি হবে, যে বঙ্গোপসাগরকে পদানত করে সম্পূর্ণ স্থলজীবন শুরু করবে। একটা বংশের পেশান্তর হবে তোমার মধ্য দিয়ে। অনালোকিত, দারিদ্র্যময় শিক্ষাহীন জীবন থেকে মুক্তি পাবে সুধাংশুর বংশধারাটি।৪৫

আকাশ ডাক্তার হয়েছে। জলজীবন থেকে মুক্ত হয়ে স্থলজীবনেই সে জীবিকার স্থায়ী ব্যবস্থা করেছে। তার ডাক্তার হওয়ার মধ্য দিয়ে তার বংশধারার পেশান্তর ঘটেছে। পূর্বপুরুষ যাঁরা এতকাল ধরে জলদাস হয়ে নিজের শ্রমকে বঙ্গোপসাগরের কাছে বিক্রি করে কৈবর্ত নামক ব্রাত্য জনজাতি রূপে পরিগণিত হয়ে এসেছে সে পরিচয় আকাশ ব্যক্তিজীবনে ঘুচিয়ে ফেলেছে। শিবশঙ্কর যা পারেনি আকাশ তা করে দেখিয়েছে। প্রান্তিক জলদাসের বর্ণপরিচয়কে পুরোপুরি মুছে দিয়ে সে ডাক্তার হয়ে উঠেছে। শিবশঙ্করের জীবনে কেবল পেশান্তর ঘটেছিল; কিন্তু আকাশের জীবনে পেশান্তর ও গোত্রস্তর উভয়ই ঘটেছে। সে সস্পূর্ণ অর্থেই জলজীবন থেকে মুক্ত হয়েছে। তবে ডাক্তার হয়েও অবিবাহিত থেকে এক বোহমিয়ান জীবনকেই সে বেছে নিয়েছে। তাই চরিত্রটি বংশানুক্রমিক ধারার পরিবর্তন ঘটিয়ে জলদাস জাতি-বর্ণ প্রথা হতে বের হয়ে ডাক্তার হলেও ঔপন্যাসিক চরিত্রটিকে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে মূর্ত করে তুলতে সক্ষম হননি। উপন্যাস শেষে চরিত্রটি এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা, উদাসীনতা ও হতাশাবোধের মধ্যে অন্তলীন থেকেছে।

জীবনের উপান্তে এসে শিবশঙ্কর পড়াশোনা ও লেখালেখিতে মনোসংযোগ করলেও ফেলে আসা জীবনই বারে বারে তার মানসভূমিকে স্মৃতিকাতর করে তুলেছে। উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছদে স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে সে হাইলোকের মায়া ত্যাগ করে অনন্ত পারাপারের অংশী হয়েছেনÑ

আজ পড়াতে মন নেই তার। আজ শুধু অতীতের কথা ভাবতে ভালো লাগছে। প্রিয়রঞ্জনের স্মৃতির মধ্য দিয়ে শিবশঙ্করের স্মৃতিমন্থনটা শুরু হয়েছিল। স্মৃতির দুস্তর পারাবার আর বিস্তৃত রুক্ষ মুরুভূমি পেরিয়ে এল শিবু। অতীতের সঙ্গে বর্তমানও এসে মিশে যাচ্ছিল। তার বাবা সুধাংশু, মা অহল্যা, ভাই সূর্যমোহন-ব্রজেন্দ্র-সত্যব্রত-সীতানাথ, মাইজপাড়া, লায়ন সিনেমা, বিজয়াদি, বোনাই, জগবন্ধু, সাহেবপাড়া-এসব বারবার উঁকি দিতে লাগল স্মৃতির দৃশ্যপটে। সবচাইতে বেশি মনে পড়তে লাগল চৈতন্য খুড়াকে। …ইজিচেয়ারের পা-দানিতে শিবুর ডান পা-টা আটকে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল শিবশঙ্কর।৪৬

শিবশঙ্করের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে থাকার চিত্র দিয়ে ঔপন্যাসিক উপন্যাসের যে পট উন্মোচন করেছিলেন তার যবনিকাপাত ঘটিয়েছেন বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকা শিবশঙ্করের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। উপন্যাসের কাহিনি একটা বিন্দু হতে গোলাকার একটি রেখার মতো ঘূর্ণায়মান হয়ে আবার সেই বিন্দুটিকেই স্পর্শ করেছে। শিবশঙ্করের প্রস্থানের আগের চিত্রটি উপন্যাসের শুরুতে প্রতিস্থাপন করে পুরো গল্পের সমাপ্তি টেনে শেষ দৃশ্যে তাঁর প্রস্থানের চিত্রটি অঙ্কন করে হরিশংকর জলদাস উপন্যাসটিকে বিন্দু থেকে বৃত্তায়নের দিকে নিয়ে গেছেন। মাঝের সাড়ে তিনশত পৃষ্ঠার সুপরিসর সৃজনভূমিতে তিনি জলজীবনের কাহিনি বয়ন করেছেন। এ যেন শিবশঙ্করের জীবন উল্টে-পাল্টে জলজীবন থেকে জ্ঞানজীবনে উত্তরণের এক শৈল্পিক জলভাষ্য রচনা করেছেন হরিশংকর জলদাস। নায়ক শিবশঙ্করের জীবন উত্তরণের সন্ধিক্ষণে উপন্যাসের আদ্যপ্রান্তে তিনি পাঠককে বিচিত্র কৈবর্ত জীবনের বিস্ময়কর জলগদ্যের কাহিনি-ই শুনিয়েছেন।

লেখক উপন্যাসে শিবশঙ্করের অবয়বে নিজেকে প্রমূর্ত করেছেন। বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আসলে তিনি বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী উত্তর পতেঙ্গা, মাইজপাড়াসহ, আরও ছোটো ছোটো অসংখ্য জেলেপল্লি ও জেলেজীবনের সুখ, দুঃখ, শোক, ব্যথা-বেদনা, নিপীড়ন, প্রবঞ্চনা, হাহাকার, সংগ্রাম, প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও সংক্ষুব্ধতার সুলুকসন্ধান করেছেন। যেভাবে অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস নদীর চিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে তিতাসপাড়ের মালোজীবনের আদ্যপ্রান্ত তুলে ধরেছেন তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে। তিতাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মালো জনজীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যথা- বেদনা, বঞ্চনা, পাওয়া না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাসের কথকথা স্থলভাগ ছাড়িয়ে জলজীবনে মিশে তিতাসের সঙ্গে যেমন অন্তলীন হয়েছে; তেমনি বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে প্রস্থানের আগে উপন্যাসে জেলেজীবনের যে বিস্তৃত কাহিনি ডাঙার জীবনের আভাস দিয়ে শুরু হয়েছিল নোনাজলের সংগ্রাম মুখরতার মধ্য দিয়ে সে কাহিনি জলজীবন হতে মুক্ত হয়ে স্থল জীবনাভিমুখি হলেও জলোশরীরে তার ভ্রুণ ভ্রুণায়িত হয়েছিল। দরিদ্র মালো জনগোষ্ঠীর জীবন প্রবাহকে তিতাস আবক্ষ ধারণ করে তার বহতা স্রোতের মধ্য দিয়ে সে জীবনের বহুবর্ণিল রূপকেই প্রত্যয়ন করে তুলেছেনÑ

মায়ের স্নেহ, ভাইয়ের প্রেম, বৌ-ঝিয়ের দরদের অনেক ইতিহাস এর তীরে তীরে আঁকা রহিয়াছে। সেই ইতিহাস হয়তো কেউ জানে, হয়তো কেউ জানে না। তবু সে ইতিহাস সত্য। এর পারে পারে খাঁটি রক্তমাংসের মানুষের মানবিকতা আর অমানুষিকতার অনেক চিত্র আঁকা হইয়াছে। হয়ত সেগুলি মুছিয়া গিয়াছে। হয়ত তিতাসই সেগুলি মুছিয়া নিয়াছে! কিন্তু মুছিয়া নিয়া সবই নিজের বুকের ভিতর লুকাইয়া রাখিয়াছে। হয়ত কেনোদিন কাহাকেও সেগুলি দেখাইবে না, জানাইবে না। কারও সেগুলো জানিবার প্রয়োজনও হইবে না। তবুও সেগুলো আছে। যে-আখর কলার পাতায় বা কাগজের পিঠে লিখিয়া অভ্যাস করা যায় না, সে-আখরে সে সব কথা লেখা হইয়া আছে। সেগুলো আঙ্গদের মতো অমর। কিন্তু সত্যের মতো গোপন হইয়াও বাতাসের মতো স্পর্শপ্রবণ। কে বলে তিতাসের ইতিহাস নাই। আর সত্য তিতাস-তীরের লোকরা! তারা শীতের রাতে কতক কাঁথার তলাতে ঘুমায়। কতক জলের উপর কাঠের নৌকায় ভাসে। মায়েরা, বোনেরা ভাই-বউয়েরা তাদের কাঁথার তলা থেকে জাগাইয়া দেয়। তারা এক ছুটে আসে তিতাসের তীরে।৪৭

সমুদ্র তথা বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে জেলেজীবনের উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া, স্বপ্ন-সম্ভাবনা ও বিপর্যয়ের যে আখ্যান হরিশংকর জলদাস রচনা করেছেন তা তিতাসসংলগ্ন মালোপাড়ার জীবন ও তিতাসের জলেতিহাসের অনুবর্তী। সমুদ্রকে ঘিরে শিবশঙ্করের মানসপটে যে মনোছবি ভেসে উঠেছে তার বর্ণনায় ঔপন্যাসিক সমুদ্রবেষ্টিত জেলেজীবনকে তিতাস তীরবর্তী মালোজীবনের মতো ব্যঞ্জনাদীপ্ত করে তুলেছেন Ñ

সূর্যের তেজ হলদে হয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণ পর আঁধার ধীরে ধীরে অপরাহ্ণের ওই হলুদ আলোকে নিজের মধ্যে টেনে নেবে। শিবশঙ্কর ওই ম্লান আলোর ভেতর দিয়ে সমুদ্রে অতল জলরাশির দিকে নিজের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দিল। সে ভাবতে শুরু করলÑ নোনাজলের এই সমুদ্রেই তো তার পিতামহ, প্রপিতামহ, পিতামহেরও বহু বহু পূর্বপুরুষ মাছ ধরেছে। …উত্তর পতেঙ্গার, উত্তর পতেঙ্গার মতো আর আর জেলেপল্লির জলপুত্ররা হাজার বছর ধরে এই সাগর জলে মীনশস্য আহরণ করেছে। কত নারীর স্বামী, কত নারীর পুত্র, মামা, ভাগ্নে, দেবর, কাকা, জেঠা যে এই সমুদ্রজলে ডুবে মরেছে, তার সুলুকসন্ধান নেই তার কাছে। এই সমুদ্রই জেলেদের বাঁচার জায়গা, আবার নোনাজলের এই বঙ্গোপসাগরই জেলেদের মরার আধার।৪৮

তিতাসপাড়ের ভূমিহীন প্রাকৃত কৃষক ও সর্বহারা অন্ত্যজ মালোজীবনের চিত্র লেখক তুলে ধরেছেন তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে। তবে মালোজীবনের চিত্রই সেখানে মৌল উপাদান রূপে বিবেচ্য। তাদের দৈনন্দিন জীবন, মাছ ধরা, কাপড় বোনার নানাবিধ প্রসঙ্গের চিত্রাত্মক বর্ণনা অদ্বৈত যেমন নির্মোহ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন; তেমনি হরিশংকর জলদাসও তাঁর প্রস্থানের আগে উপন্যাসে সমুদ্রকেন্দ্রিক জেলেদের দৈনন্দিন জীবনের জাল, জল ও মৎস্য শিকারের দৃশ্যাত্মক বর্ণনা নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। অদ্বৈত লিখেছেনÑ ‘তিতাস নদীর তীরে মালোদের বাস। ঘাটে বাঁধা নৌকা, মাটিতে ছড়ানো জাল, উঠানের কোনে গাবের মাটকি, ঘরে ঘরে চরকি, টেকো, তকলি-সূতা কাটার, জাল বোনার সরঞ্জাম। এসব নিয়েই মালোদের সংসার।’৪৯

হরিশংকর লিখেছেনÑ ‘সমুদ্রে এখন মরাকাটাল। মরাকাটালকে জেলেরা বলে ডালা। ডালাতে স্রোত কম। কম স্রোতে মাছও কম। ডালাতে জেলেরা সমুদ্র থেকে বিহিন্দিজাল-টংজাল তুলে আনে। ছেঁড়াফাটা জাল তুনা হয়। রোদে শুকানো হয়। গাবের জলে রাতভর চুবানো হয়। মৃতপ্রায় জাল তাজা হয়ে ওঠে তখন। নৌকাগুলোকে ডাঙায় তোলা হয়। জীর্ণ তক্তা পাল্টানো হয়। আগলা পেরেক হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ঠেসে দেওয়া হয়। ঠা ঠা রোদে নৌকা শুকানো হয়। ঘন করে আলকাতরা মাখানো হয় নৌকায়।’৫০

অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) মালো সম্প্রদায়ভুক্ত সমাজের প্রান্তবাসী এক হতদরিদ্র মালো ছিলেন। জন্মেছিলেন তিতাস নদী-তীরবর্তী মালো অধ্যুষিত গোকর্ণঘাট গ্রামে। দারিদ্র্যের সঙ্গে আমরণ যুদ্ধ করে কেটেছে তার স্বল্পায়ু সংগ্রামী জীবন। অভাবের কাছে নিজের শিক্ষাজীবনের পরাজয় ঘটেছে। ম্যাট্রিকুলেশনের পর পড়ালেখা ছেড়ে জীবনে নানা পেশায় যুক্ত থেকেছেন। উপার্জিত অর্থের একটা অংশ দিয়ে বই কিনেছেন। কারণ তিনি ছিলেন বিদ্যানুরাগী। বই পড়তে অভ্যস্ত সরল, উদারপ্রাণ এই মানুষটি বাকি অর্থ দিয়ে নিজে দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও স্বজাতির লোকদেও বিভিন্নভাবে সাহায্য করেতেন। মালোদের দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার, সর্বোপরি তিতাসকে কেন্দ্র করে তাদের বেঁচে থাকার যুদ্ধকে তিনি নিজ চোখে দেখেছেন এবং তারই বাস্তব অভিজ্ঞতায় বয়ন করেছেন তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের জমিন।

হরিশংকর জলদাসও বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলেপল্লি উত্তর পতেঙ্গার জেলে সম্প্রদায়ভুক্ত প্রান্তিক জেলে ছিলেন। জেলেপল্লির অন্যান্য পরিবারের মতো তাঁর পরিবার দরিদ্র ছিল। অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা। জেলেদের অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দারিদ্র্য পারস্পরিক স্বার্থকেন্দ্রিক রেষারেষি, সমাজ বহির্ভূত প্রেম, দেহকামনা, হিংসা, শঠতা; সর্বোপরি বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সংগ্রামমুখর জেলেজীবনকে তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। তিনি দারিদ্র্যের চরম ছোবলকে পাশ কাটিয়ে নিজে শিক্ষাভিমুখী হয়ে আলোর পথে হেঁটেছেন। তাঁর অধীত জীবনাভিজ্ঞতার অনন্য দৃষ্টান্ত প্রস্থানের আগে উপন্যাস। মনোভূমির গঠনে ও শিল্পসৃজনে দুজনেই স্ব স্ব স্বাধিষ্ঠানক্ষেত্র থেকে প্রণোদিত হয়েছেন। একই ভৌগোলিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে প্রপালিত হয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ যেমন তিতাস একটি নদীর নাম এ তার যাপিত জীবনের সত্যকে অনুরণিত করেছেন; তেমনি হরিশংকর জলদাসও প্রস্থানের আগে উপন্যাসে ব্যক্তিজীবন ও জেলেজীবনের ভৌগোলিক পরিবেশ- প্রতিবেশকে শিল্পের আধার করে তুলেছেন। একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে দুজনে জল ও জেলে জীবনের অনুষঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন কালের অভিন্ন অথচ স্বতন্দ্র্য ভাষাশৈলীতে গল্প বুনেছেন। একজন নদী তীরবর্তী মালোদের; অন্যজন সমুদ্র তীরবর্তী জেলেদের।

প্রস্থানের আগে উপন্যাসের সংলাপ ও ব্যবহৃত ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে চরিত্র উপযোগী হয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা বিশেষত, জেলেদের উপযোগী কথ্যভাষার ব্যবহার উপন্যাসটিতে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। সে ভাষা শিক্ষিত সভ্যজনের ভাষার মতো প্রমিত ও পরিমিত নয়। খিস্তি, খেউড়, গালাগালিতে ব্যবহৃত শব্দের মিশেল, ভাষাকে গল্প ও চরিত্রানুগ করেছে। উপন্যাসে অর্পূব ও শিউলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাতিজা চণ্ডী ও চাচা নিতাইয়ের মধ্যকার সংলাপ এক্ষেত্রে লক্ষণীয়Ñ

চণ্ডী কর্কশ গলায় বলল, ‘আমার মনে হইতাছে শিউলি বাওনাইয়ার ঘরেই আছে। অহন কী কইরবা ভাইবে দেখো।’

নিতাই বলল, ‘বজ্জাতিনিরে ধইরে আন। কোপাইয়া দুই টুকরা কর। খানকির পোলা অপূর্বর চনু কাইট্যা লমু আমি।

…শিউলীকে চাপা স্বরে ডেকে অপূর্বর ঘর থেকে বের হয়ে আসতে চণ্ডীচরণ বলেছিল,Ñ ‘শিউলি, হে শিউলি। বাইরাইয়া আয়। চোদমারানির পোলা বওনাইয়ার ঘরত্তোন বাইরাইয়া আয়।৫১

খিস্তি, খেউড়ের পাশাপাশি ক্রিয়াপদের আঞ্চলিক ও এলায়িত ব্যবহার এখানে লক্ষ করা যায়। যেমন; করবে-কইরবা, ভেবে-ভাইবে, ধরে-ধইরে, বের হওয়া-বাইরাইয়া প্রভৃতি।

এরকম অসংখ্য সংলাপ ও উদাহরণ উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। তবে জেলে সম্প্রদায়ভুক্ত দু একটি চরিত্রের মুখে চলিত ভাষার সংলাপ শুনে পাঠক খানিকটা হোঁচট খেয়েছে। শিবশঙ্কর ও চৈতন্য খুড়ার কথোপকথনে চৈতন্য খুড়া কখনও কখনও চলিত ভাষারীতিতে কথা বলেছেÑ

চৈতন্য খুড়া বলল, ‘অন্য দশজন জেলে তাদের পোলারে যে রকম ভালোবাসে, আমিও ভগীরথীরে সেই রকম ভালোবাসি। তবে তোমারে হের চেয়ে একটু বেশি পছন্দ করি আমি।’

‘কেন খুড়া, কেন?’

চৈতন্য বলল,  ‘আমার অত বিদ্যাবুদ্ধি নাই যে তোমারে অধিক ভালোবাসার কার্যকারণ বুঝাব।৫২

শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উপভাষার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। জেলেজীবন ও জেলেসমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ উপন্যাসে লেখক দক্ষতার সঙ্গে ঘটিয়েছেন। যেমন-

জোআ জোআ- প্রচুর অর্থে-পৃষ্ঠা-৫৮

গাউর- মাছ ধরার কাজে সাহায্যকারী- পৃষ্ঠা-৫৪

ঢেন্ডেরি- জেলেপাড়ায় বিচার ব্যবস্থায় প্রচলিত বিশেষ এক ধরনের শাস্তির নাম-পৃষ্ঠা-৫৫

ফুইত্যা-আনন্দ করা-পৃষ্ঠা-৮৫

ক্যাঁ কোঁরোৎ-সামুদ্রিক নৌকার একটা টাইপ-পৃষ্ঠা-৯৩

তইলা-পাইÑজাল মেরামতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দ-পৃষ্ঠা-১৪২

পাউন্যা নাইয়াÑ কম অবস্থাসম্পন্ন জেলে-পৃষ্ঠা-৩৭

বহদ্দার – অবস্থাসম্পন্ন জেলে। অনেক- গুলো নৌকা ও জালের মালিক। এবং যাঁর ধারাবাহিকভাবে সমুদ্রে মাছ ধরার ইতিহাস ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য আছে-পৃষ্ঠা-১৮৬

জুদা- আলাদা খাওয়া। পারিবারের অন্যদের থেকে পৃথক হওয়া-পৃষ্ঠা-২৪১

দুইজ্যা-সমুদ্র- পৃষ্ঠা-৩৭

খাঁউ- পতিতা- পৃষ্ঠা- ১০৭

চনু- শিশ্ন/ লিঙ্গ-পৃষ্ঠা-১১৭

জেলেদের মাছ ধরার সরঞ্জামের আঞ্চলিক নামের সার্থক প্রয়োগ উপন্যাসটিতে লক্ষ করা যায়Ñ

বিহিন্দিজাল- পৃষ্ঠা-৪৯, টংজাল- পৃষ্ঠা-৩৭

পাতনি জাল- পৃষ্ঠা-৯৭, হুরিজাল- পৃষ্ঠা-৩৭

দড়ি-দড়া- পৃষ্ঠা-৯৯ ডাউঙ্গা জাল- পৃষ্ঠা-৩৭

গোঁজ- পৃষ্ঠা ৯৯                কাঠিজাল- পৃষ্ঠা-৩৭

হালিশ- পৃষ্ঠা-৯৯

ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘নি’ পদাশ্রিত নির্দেশকের পৃথক ব্যবহার উপন্যাসেটিতে দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। সমগ্র উপন্যাসজুড়ে এমনটি লক্ষ করা যায়Ñ

দেখে নি- পৃষ্ঠা- ৬৮

করি নি- পৃষ্ঠা- ৬৩

এড়ায়নি- পৃষ্ঠা -৬২

আসে নি- পৃষ্ঠা-৮৫

হয় নি- পৃষ্ঠা-৮৮

দেয় নি  – পৃষ্ঠা-৯৩

পারে নি- পৃষ্ঠা- ৯২

উপন্যাসে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের নাম ঔপন্যাসিক সার্থকতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন- যেমন :

ঘোঁওড়া- পৃষ্ঠা- ৫৪

লাম্বুÑ পৃষ্ঠা- ৫৪

হাঙর, সুন্দরী, মাইট্যা, গাউঙ্গা, কই- পৃষ্ঠা-২২

উপন্যাসে কাহিনির অনুষঙ্গে পৌরণিক চরিত্রের নাম ও প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছেÑ যেমন:

সত্যবতী, পরাশর, ব্যাসদেব- পৃষ্ঠা-১৪

দশরথ, কৌশিল্যা, সুমিত্রা, কৈকেয়ী- পৃষ্ঠা-১৫

অভিমন্যুÑ পৃষ্ঠা-১২৫

কাহিনির অনুষঙ্গে এসব পৌরাণিক নাম সংযোজনে লেখক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

জেলেদের বাড়িঘর, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব উপন্যাসটি পরিলক্ষিত হলেও প্রস্থানের আগে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রজীবী জেলেদের এবং বিশেষভাবে শিবশঙ্করের নোনাজীবনের সংগ্রামের কাহিনি। লেখক তাঁর জীবনযুদ্ধ ও জেলেজীবনের গল্পই শিবশঙ্করের জীবন- চিত্রের মধ্যে প্রতিঅঙ্কিত করে তুলেছেন। তাই ঘুরে-ফিরে লেখক জীবনের নানা ঘটনা, উপঘটনার অনুষঙ্গ বাস্তব ও কল্পনার সংশ্লেষণে শিবশঙ্করের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে। উপন্যাসে শিবশঙ্করের ছায়ামূর্তির ভেতর দিয়ে মূলত ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাসই এই উপন্যাসের অদৃশ্য নায়কের আসনে সমাসীন হয়েছেন।

ঔপন্যাসিক প্রস্থানের আগে উপন্যাসটি লেখার সময়কালে এর দুটি অংশের প্রথমটি একী লাবণ্য পূর্ণ প্রাণে নামে অন্যদিন পত্রিকার ২০১৭ সালের ইদসংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং অন্য একটি অংশ ঢেউ নামে সমকাল-ইদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সমগ্র উপন্যাসটি একাত্তর পেরিয়ে নামে প্রকাশের ইচ্ছে থাকলেও ঔপন্যাসিকের সাহিত্যিক বন্ধু মোহিত কামালের পরামর্শে লেখক নাম পরিবর্তন করে সমগ্র উপন্যাসটি নামকরণ করেন প্রস্থানের আগে। জেলে জীবনবৃত্তে শিবশঙ্করের জীবনগাথাকেই যে লেখক উপন্যাসে বিভাসিত করে তুলেছেন তাঁর নামকরণের মধ্যে সেই সুরটিকেই যেন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৩৬), অদ্বৈত মল্লবর্মণের (১৯১৪- ১৯৫১) তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৫৬), তারশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১)হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৭), হুমায়ুন কবীরের (১৯০৬- ১৯৬৯) নদী ও নারী (১৯৪৫), সমরেশ বসুর (১৯২৪-১৯৮৮) গঙ্গা (১৯৫৫), আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩), পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৬), আলাউদ্দিন আল আজাদের (১৯৩২-২০১০) কর্ণফুলী (১৯৬২) মতো কালজয়ী নদীভিত্তিক উপন্যাসের সারিতে হরিশংকর জলদাসের (১৯৫৫- ) প্রস্থানের আগে (২০১৯)  উপন্যাসটি এক নবতর সংযোজন। যেখানে নদী কেন্দ্রিক নয়; সামুদ্রজীবী জেলেদের জীবনবাস্তবতাকে ঔপন্যাসিক ভাষারূপ দিয়েছেন। নদী ও জলজীবন নিয়ে লেখা অন্যান্য উপন্যাস যেখানে বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল দ্যুতি ছাড়াচ্ছে। সেখানে সমুদ্রের নোনাজীবনকে হরিশংকর জলদাস তাঁর প্রস্থানের আগে (২০১৯) উপন্যাসে কাহিনির মূল বিষয় করে তুলেছেন; যা কালের পরিক্রমায় হয়তো একদিন ভিন্নতর জীবনের সুর ও স্বরের দ্যোতক হয়ে উঠবে।

গ্রন্থপঞ্জি

১.            হরিশংকর জলদাস, নোনাজলে ডুবসাঁতার, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রথমা প্রকশন, পৃষ্ঠা-১৬১-৬২

২.           হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-১১

৩.           বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অপরাজিত, বিশ্বজিৎ ঘোষ (সম্পা), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, ১ম সংস্করণ, ২০০৩, আজকাল প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-২৩৮

৪.           হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-১৭

৫.           প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২১-২২

৬.           মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পদ্মা নদীর মাঝি, হায়াৎ মামুদ (সম্পা), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, ১ম মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫, আজকাল প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-৩২৫

৭.           হরিশংকর জলদাস, নোনাজলে ডুবসাঁতার, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রথমা প্রকশন, পৃষ্ঠা-৪১-৪২

৮.           হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-৪৯-৫০

৯.           প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১০০

১০.         প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১০৫

১১.         প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১০৭

১২.         প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১০৭-০৮

১৩.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১০৯-১০

১৪.         প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১১০

১৫.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১১১

১৬.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১১২

১৭.         হরিশংকর জলদাস, নোনাজলে ডুবসাঁতার, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রথমা প্রকশন, পৃষ্ঠা-৬৮

১৮.        হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে,দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-১২৯

১৯.         প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৭৯

২০.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮৭

২১.         নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (সম্পা), সুনীল উপন্যাস সমগ্র, ১ম খণ্ড, পঞ্চম মুদ্রণ, জানুয়ারি ২০১৩, আনন্দ পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা-৩৬-৩৭

২২.        হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-৮৬

২৩.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮৭

২৪.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৮৮

২৫.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩২৯

২৬.       প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৩২

২৭.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৪৯

২৮.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫০

২৯.        হরিশংকর জলদাস, নোনাজলে ডুবসাঁতার, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রথমা প্রকাশন, পৃষ্ঠা-৬৪         

৩০.        হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫৪

৩১.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫৮-৫৯

৩২.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৩৭

৩৩.       প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৭৬

৩৪.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৫৪

৩৫.       প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২২০

৩৬.       হরিশংকর জলদাস, নোনাজলে ডুবসাঁতার, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রথমা প্রকাশন, পৃষ্ঠা-৯০

৩৭.        হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-২২৯

৩৮.       প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৮১

৩৯.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২১৩

৪০.        হরিশংকর জলদাস, নোনাজলে ডুবসাঁতার, ১ম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, প্রথমা প্রকশন, পৃষ্ঠা-২২২

৪১.         হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-৩৫০

৪২.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩১৯

৪৩.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩১৪

৪৪.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৪২-৪৩

৪৫.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩২০

৪৬.       প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩৫১

৪৭.        অদ্বৈত মল্লবর্শন, তিতাস একটি নদীর নাম, শান্তুনু কায়সার (সম্পা), ১ম সংস্করণ ১৯৯৯,  ১ম

বুক ক্লাব প্রকাশ, পৃষ্ঠা-৪৭-৪৮

৪৮.        হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ,  ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-৫২

৪৯.        অদ্বৈত মল্লবর্মণ, তিতাস একটি নদীর নাম, শান্তুনু কায়সার (সম্পা), ১ম সংস্করণ ১৯৯৯,  ১ম বুক ক্লাব প্রকাশ, পৃষ্ঠা-৫২

৫০.        হরিশংকর জলদাস, প্রস্থানের আগে, দ্বিতীয় মুদ্রণ,ফেব্রুয়ারি ২০১৯, অন্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা-৫২

৫১.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১১৭

৫২.        প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫৪

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares