প্রবন্ধ : আনিসুল হকের এখানে থেমো না : মিল্টন বিশ্বাস

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আনিসুল হকের (১৯৬৫) সিরিজ উপন্যাসের অন্যতম হলো এখানে থেমো না (২০২০)। ২৭১ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটির আগে যারা ভোর এনেছিল (২০১২), উষার দুয়ারে (২০১৩), আলো-আঁধারের যাত্রী (২০১৮), এই পথে আলো জ্বেলে (২০১৯) পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ধারাবাহিক এই পাঁচটি উপন্যাসের ইতিহাসই চিত্তাকর্ষক। যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী এবং এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো নাÑ উপন্যাসগুলোর মূল আখ্যান ১৯২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্ম থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের মার্চ মাস পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে রচিত হলেও এগুলো ইতিহাস নয়, উপন্যাস। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে তিনি সত্যরক্ষার চেষ্টা করেছেন পুরোমাত্রায়। তবে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঘটনার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। আখ্যানে জাতির পিতাকে আমরা দেখি প্রখর আত্মপ্রত্যয়ী একজন মানুষ হিসেবে। বেগম মুজিবের চরিত্রেও দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যায়। স্বামী কারাগারে থাকলেও সন্তানদের নিজের পক্ষপুটে নিয়ে দিনাতিপাত করেছেন তিনি; কখনও হতাশ হননি। বরং পরিজনের অনুপ্রেরণায় ইতিহাসের নতুন নতুন অধ্যায় রচিত হতে থাকে শেখ মুজিবের জীবনে।

সিরিজের প্রথম থেকেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবন এবং ভারতবর্ষ ও পাকিস্তানের ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্তে কাহিনি হয়ে উঠেছে গতিময়। ইতিহাসের উপকরণ আনিসুল হক সংগ্রহ করেছেন দেশ-বিদেশে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত গ্রন্থ এবং অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচায় বিধৃত ঘটনাসমূহ থেকে। এ ছাড়া চিঠিপত্র ও বিভিন্ন ব্যক্তির স্মৃতিচারণে কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি পুনর্নির্মাণ করেছেন ইতিহাসকে। আনিসুল হকের রচনানৈপুণ্য অনস্বীকার্য। কিন্তু শুষ্ক ইতিহাস বর্ণনা করেননি; এমনভাবে নিজেই জড়িয়ে পড়েছেন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে যে তিনি ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির মতো পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতা।

২.

যারা ভোর এনেছিল এবং উষার দুয়ারে উপন্যাসদ্বয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে একটি বিশেষ যুগ ও সেই যুগের মানুষের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন উন্মোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক ঘটনা ও কাহিনি অবলম্বন করায় দেশ ও জাতির জীবনের দ্বন্দ্ব সমস্যা-সংকট পরিস্ফুট। রাজনৈতিক মতবাদ কিংবা প্রচারসর্বস্ব উপন্যাস এগুলো নয়। বরং দেশ ও জাতির প্রাণময় উত্তেজনা একটি সার্বজনীন ভাবাবেগে বিধৃত। যার কেন্দ্রে ছিলেন শেখ মুজিব। এসব উপন্যাসে বিষয় ও উপকরণে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এদিক থেকে আখ্যানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, একটি জাতির সাংস্কৃতিক সংকট ও সর্পিলতার প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক জীবন, দ্বন্দ্ব ও আন্দোলন এবং সামাজিক জীবন এখানে মুখ্য। এ দুটির কাহিনিতে রয়েছে দেশভাগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তেজনা, বিরুদ্ধ মতবাদের তীব্র সংঘর্ষ, নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা, স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন স্তর, মন্বন্তর, দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট ও কমিউনিস্ট মতবাদ এবং আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আর দেশপ্রেমিকের দৃষ্টান্ত। আনিসুল হকের কথায়, ‘আমরা বিভিন্ন বক্তৃতায় বলে থাকি, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষরাই বলি- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ, এরপর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে আরও অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে।’ বায়ান্নর আগেও ভাষা আন্দোলন হয়েছিল উল্লেখ করে আনিসুল হক বলেছেন, ‘১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বড় ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। তখন পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি তোলেন। কারণ ছয় কোটি মানুষের মধ্যে চার কোটিই ছিল বাঙালি। কিন্তু দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হতে শুরু করল।’

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা অর্জনের কঠিন পথযাত্রার কথা বলা হয়েছে যারা ভোর এনেছিল উপন্যাসে। ইতিহাসের ঘটনা বর্ণনায় সত্যতা রক্ষার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন লেখক। এর কাহিনি রচনার সময় বিভিন্ন লেখকের নানা বই থেকে তথ্য-উপাত্ত গ্রহণ করেছেন; কোথাও কোথাও উদ্ধৃত করা হয়েছে অবিকল, কোথাওবা পুনর্লিখন রয়েছে। এ গ্রন্থে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। গ্রন্থটির ফ্ল্যাপের লেখা এ রকমÑ ‘কলকাতার সিরাজউদ্দোলা ছাত্রাবাসে শেখ মুজিব ডাকলেন সবাইকে। ব্রিটিশরা বিদায় নিচ্ছে, পাকিস্তান ও ভারত আলাদা আলাদাভাবে স্বাধীন হচ্ছে। এখন কী করা যাবে? ঢাকায় ফিরেই শেখ মুজিব ঝাঁপিয়ে পড়লেন রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। পাকিস্তানের বয়স তখন মাত্র কয়েক মাস। আর সেই সব আন্দোলনের পাশাপাশি যোগ দিচ্ছেন তরুণতর তাজউদ্দীন আহমদও। একটা সাইকেল নিয়ে তিনি চষে বেড়ান ঢাকা শহর। ঢাকায় আসেন মওলানা ভাসানী, আসেন সোহরাওয়ার্দী। তরুণ মুজিব এরই মধ্যে জনপ্রিয়, তিনি বারবার গ্রেপ্তার হন, কারাগারে যান, মুক্তি পাওয়ার জন্য দাসখতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। ওদিকে টুঙ্গিপাড়ায় সন্তানদের আগলে রাখেন রেনু। তিনি তাঁর স্বামীকে যেন উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য। এমনই প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় আসে ১৯৫২ সাল, আসে একুশে ফেব্রুয়ারি। যাঁরা ইতিহাস নির্মাণ করেছেন, তাঁরাই এই উপন্যাসের চরিত্র। ইতিহাসে সন-তারিখ থাকে, থাকে না ব্যক্তিমানুষের হৃদয়ের সংবাদ। যারা ভোর এনেছিল একটা ট্রিলজির প্রথম খণ্ড, যা পাঠকের সামনে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে হাজির করবে আমাদের ইতিহাস-নির্মাতাদের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক দিনে অর্জিত হয়নি, এর পেছনে আছে দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রাম। এই আখ্যান আমাদের জানাবে সে কথাই, কিন্তু তা নিছক ইতিহাস হয়ে রইবে না, হয়ে উঠবে কতগুলো মানবচরিত্রের গল্প। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’ মুহম্মদ জাফর ইকবাল এ গ্রন্থের ব্যাক পেজের প্রচ্ছদে লিখেছেন, ‘যাঁরা ভোর এনেছিলেন, তাঁরা ছিলেন শ্রদ্ধা আর সম্মানের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকা দূরের মানুষ। আনিসুল হক গভীর মমতায় তাদের আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন।’ (যারা ভোর এনেছিল, প্রথমা, ২০১২) অর্থাৎ যারা বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাণ করেছেন তাঁরাই এই উপন্যাসের পাত্রপাত্রী। কেন্দ্রীয় চরিত্র শেখ মুজিবকে ইতিহাসের সন-তারিখের বাইরে এনে ব্যক্তি-মানুষ হিসেবে তাঁর হৃদয়ের সংবাদ অন্বেষণ করেছেন ঔপন্যাসিক। ইতিহাসের পটে মানব-চরিত্রের গল্প বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা ভোর এনেছিল কাহিনির পট উন্মোচিত হয়েছে।

যারা ভোর এনেছিল গ্রন্থে যেসব চরিত্র অঙ্কিত হয়েছেন তাঁরা হলেনÑ শেখ মুজিবুর রহমান, পিতা শেখ লুৎফর রহমান, মাতা সায়রা বেগম, স্ত্রী রেনু, তাজউদ্দীন আহমদ, আবুল হাশিম, কামরুদ্দীন আহমদ, আইয়ুব খান, কায়েদে আজম, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, খাজা নাজিম উদ্দিন, লিয়াকত আলি খান, জওহরলাল নেহরু, ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন, স্ত্রী এডুইনা মাউন্টব্যাটেন, মওলানা আকরম খাঁ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমদ, তমুদ্দুন মজলিসের আবুল কাশেম, গাজীউল হক, অলি আহাদ, শামসুল হক, মুনীর চৌধুরী, জসীম উদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ফররুখ আহমদ, সালাম, শফিউর, মোহাম্মদ তোয়াহা, শাহ আজিজ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ। এসব চরিত্রের মধ্য দিয়ে যথাযথ ইতিহাস অনুসরণ করে উপন্যাস রচনা করেছেন লেখক। এভাবে আনিসুল হক ইতিহাসের সেসব মানুষকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে পাঠকের কাছে উপন্যাসের চরিত্ররূপে তুলে ধরেছেন, তাঁরাই এই দেশটিকে জন্ম দিয়েছিলেন।

৩.

যারা ভোর এনেছিল উপন্যাসের পরবর্তী পর্ব উষার দুয়ারে। শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনীর অনেক প্রসঙ্গ এ উপন্যাসে গৃহীত হয়েছে। তবে এসবই হয়েছে পুনর্লিখন। আনিসুল হক বলেছেন, ‘…এই বই উপন্যাস, ইতিহাস নয়। বাংলাদেশ নামের এই প্রিয় দেশটি আমরা কীভাবে পেলাম, কারা ছিলেন আমাদের স্বাধীনতার ভোরের কারিগর, কেমন মানুষ ছিলেন তাঁরাÑ ইতিহাসের নির্জীব শুষ্ক মানুষ নয়, জীবন্ত মানুষÑ এই কাহিনিতে তা-ই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।’ (ভূমিকা, উষার দুয়ারে) গ্রন্থটির ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে- ‘পুলিশ ভেঙে ফেলল ১৯৫২ সালের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পেলেন ফরিদপুর কারাগার থেকে অনশন ধর্মঘট করার পর। তাঁর আব্বা তাঁকে নিয়ে গেলেন গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই মুজিব জানতে পারলেন তাঁর নেতা সোহরাওয়ার্দীর মনোভাবÑ বাঙালিদেরও উর্দু শিখতে হবে। এবার কী করবেন মুজিব? তাজউদ্দীনরা ভাবছেন, একটা আলাদা দল করতে হবে। গণতন্ত্রী দল গঠনের তৎপরতার সঙ্গে খানিকটা যুক্ত থাকলেন তিনি। মওলানা ভাসানী কারাগারে। সেখান থেকে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়া, তাজউদ্দীনের আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, এ কে ফজলুল হকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া আর শেখ মুজিবের মন্ত্রিত্ব লাভ এবং মন্ত্রীর বাড়ি থেকে সোজা জেলযাত্রা। তিনটি শিশুসন্তানকে নিয়ে রেনুর অকূলপাথারে পড়ে যাওয়া। রাজনীতির ডামাডোল ওলটপালট করে দেয় ব্যক্তিমানুষের জীবন। এই রাজনীতির গতি-প্রকৃতি কেবল একটি দেশের নেতা বা জনগণ নির্ধারণ করে না, তা নির্ধারণের চেষ্টা চলে ওয়াশিংটন থেকেও। ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি তো তা-ই বলতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের ইচ্ছাটা কি জয়ী হয় না?’ (উষার দুয়ারে, ২০১৩)

প্রথম পর্ব যারা ভোর এনেছিল এর ধারাবাহিকতায় উষার দুয়ারে উপন্যাসের কাহিনির পট উত্তোলন করেছেন আনিসুল হক। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির বয়ান দিয়ে এটির সূচনা। এখানেও রাজনৈতিক ঘটনাবর্ত মুজিবের পারিবারিক জীবনের সংগ্রাম, তার আশা-আকাক্সক্ষার পরিসমাপ্তিতে কাহিনির কার্যকারণ বিন্যস্ত। ‘রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ঘটনাবর্ত ব্যক্তিমানুষের মনন ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বলেই একজন প্রকৃত ঔপন্যাসিকের জীবননীতি ও শিল্পনীতি রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়। কেননা আমরা জানি, প্রত্যেক মানুষের আবেগ-অনুভূতি-চিন্তা, সমাজ-গোষ্ঠীর জীবনপ্রবাহ এবং সংগ্রামের সঙ্গে অর্থাৎ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ কারণেই রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কোনো বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চলের সব মানুষের জীবনের ভবিতব্যকে নির্দেশ করে।’ (মিল্টন বিশ্বাস, শওকত আলী ও সেলিনা হোসেনের উপন্যাস : প্রসঙ্গ রাজনীতি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ ১) রাজনৈতিক বাস্তবতার সূত্রে ঔপন্যাসিক আনিসুল হকের প্রগতিশীল অনুভাবনা আত্মপ্রকাশ করেছে শেখ মুজিবের আবেগ-মনন ও সংগ্রামের অনুপুঙ্খ বর্ণনায়।

৪.

সিরিজ উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব আলো-আঁধারের যাত্রী (২০১৮) উপন্যাসটি আগের দুটির মতই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভিত্তিক আখ্যান। এই বইয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনে ঘটে যাওয়া ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৬ সালের ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনৈতিক দল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর যে দিনলিপি তাই উপন্যাসের আখ্যানে প্রকাশ করতে চেয়েছেন লেখক। তবে বঙ্গবন্ধুর জীবন বর্ণনা করতে গিয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচার কিছু ঘটনাও তুলে ধরেছেন। বলা চলে ইতিহাসের উপকরণকে তিনি নিজস্ব বয়ানে উপস্থাপন করেছেন। আনিসুল হকের বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক উপন্যাস রচনার চতুর্থ পর্ব হলো এই পথে আলো জ্বেলে (২০১৯)। এ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের একটি অংশকে তুলে ধরা হয়েছে যার ব্যাপ্তি ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল। ‘দুটো কথা’ অংশে লেখক বলেছেন- ‘যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী এই তিনটা বইয়ের পর এই পথে আলো জ্বেলে। ১৯২০ সালে যাত্রা শুরু করে আমরা ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত আসতে পারলাম। ২০১১ সালে শুরু করেছিলাম এই উপন্যাসধারা রচনার কাজ। ৯ বছর কেটে গেল। প্রয়োজনীয় দুটে কথা বলে নিই। এক. এটি উপন্যাস হিসেবে পড়তে হবে, এই হলো লেখকের অভিপ্রায়। ইতিহাস হিসেবে এটিকে না পড়াই ভালো। যদিও কোনো ঐতিহাসিক তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়নি, বরং সত্যতা রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে পুরোপুরি। দুই. আমি স্পষ্ট ভাষায় বলছি যে, বহু বই থেকে এই বইয়ে সরাসরি উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, বহু বই থেকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সাহায্য নেওয়া হয়েছে।’

অর্থাৎ আলো-আঁধারের যাত্রী যেখানে শেষ হয়েছে, এই পথে আলো জ্বেলে সেখান থেকেই শুরু বলা যায়। তবে এই অংশে যে কালপর্বের কথা বলা হয়েছে তখন বেশির ভাগ সময় শেখ মুজিব যাপন করেছেন জেলে। তাই এ অংশে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বেশি কিছু পাওয়া যায় না। অবশ্য তাঁকে ঘিরে শেখ হাসিনা ও স্ত্রী রেনু এবং দলের কর্মীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। এ অংশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষত ৩৫ থেকে ৫৭ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত শেখ মুজিবের পাশাপাশি নির্মলেন্দু গুণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে দেখানো হয়েছে শেখ মুজিবকে মুক্ত করার প্রয়াসে লিপ্ত এদেশের প্রগতিশীল একজন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনি কবিতাকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছিলেন। সেটাই বেশি করে তুলে এনেছেন লেখক। এই পথে আলো জ্বেলে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সালের কাহিনি স্থান পেয়েছে, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, তার নায়কদের কথা, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবি উত্থাপন, তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্দোলন, তাঁর গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তার হওয়া, সর্বংসহা সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা রেনুর সংগ্রাম, শেখ হাসিনার সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে আসা, মওলানা ভাসানীসহ বামদের ভূমিকা, জেলে তাজউদ্দীনের জীবন, পিতা হিসেবে শেখ মুজিবের সান্নিধ্যবঞ্চিত ছোট ছেলেমেয়েদের দুঃখ। এসব বেদনা আনিসুল হক দরদ দিয়ে তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আর ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সংগ্রামে গণজোয়ার; অনেক প্রাণের আত্মাহুতি শেষে শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তি, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তরফ থেকে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা- এসবও এ উপন্যাসে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। উপন্যাসের আখ্যানের একটি অংশে আছে এরকমÑ দেখতে দেখতে এসে যায় আটষট্টি সাল। জেলবন্দি শেখ মুজিবের কাছে জেল কর্তৃপক্ষের পদস্থ একজন এসে বলেন, তাঁকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। সন্দেহ হয় মুজিবের। মাথা উঁচু করে বাইরে বেরিয়ে দেখতে পান সামরিক বাহিনীর গাড়ির বহর। তাঁকে আবার জেলগেট থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার মুখে শেখ মুজিব ‘মাটিতে বসে পড়লেন। বাংলার ধূলিমাটি তিনি স্পর্শ করলেন পরম মমতায়।’ তারপর ‘বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।’ (এই পথে আলো জ্বেলে, পৃ ১৪০) তবে এই বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির পেছনে সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের সময়, প্যারোলে বা জামিনে মুক্তি না নিয়ে নিঃশর্ত মুক্তি পাওয়ার অংশটুকু গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া এই পথে আলো জ্বেলে গ্রন্থে শহীদ মতিউর, শহীদ আসাদের বিবরণগুলো তাৎপর্যপূর্ণ। বলা চলে লেখক রাজনৈতিক ইতিহাসটা যথার্থ লিখেছেন তবে চরিত্র-নির্মাণ ও অন্য বিবরণে স্বাধীনতাটুকু নিয়েছেন। সিরিজটির আরেকটি গ্রন্থ ‘এখানে থেমো না’ বের হয়েছে ২০২০ সালে। ১৯৭১ সালে এসে এটি সমাপ্তিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের জন্মের বিশালতা এই শেষ বইয়ে আছে। এখানে আমরা জীবন্ত মানুষদেরই দেখতে পাচ্ছি। আসলে ইতিহাসে প্রাণবন্ত মানুষকে পাওয়া যায় না; যে মানুষ খায়, ঘুমায়, স্বপ্ন দেখে; সেই মানুষটা থাকে অনুপস্থিত। এ জন্য ইতিহাসকে অবলম্বন করে আনিসুল হক উপন্যাসে চোখের সামনে দেখা যায় এ রকমভাবেই উপস্থাপন করেছেন চরিত্রসমূহকে।

৫.

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত আনিসুল হকের এখানে থেমো না উপন্যাসটি ঐতিহাসিক কিন্তু সামাজিক আখ্যান। লেখকের ‘জরুরি কথা’ অংশে আছেÑ ‘১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ সালের সময়পর্ব এখানে ধরার চেষ্টা করা হলো। বিভিন্ন বই থেকে ব্যাপক সাহায্য নেওয়া হয়েছে, স্মৃতিকথার বই থেকে প্রায় হুবহু উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনার বেলায় চেষ্টা করা হয়েছে যথাসম্ভব নির্ভুল তথ্য দেওয়ার। একজন সৃজনশীল লেখকের দৃষ্টিতে দেখা ইতিহাস হলো এই বই। ব্যক্তির সৃজনশীল কলমে ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা, কল্পনা ও বয়ান এতে উঠে এসেছে। এটাকে পড়তে হবে উপন্যাস হিসেবে, ইতিহাস হিসেবে নয়।’ অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের চরিত্র রূপায়ণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক চেতনা রক্ষিত হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা এবং পাকিস্তানি শাসকদের বিচিত্র আচরণ উপস্থাপনে ইতিহাসসম্মত বর্ণনা লক্ষণীয়। আর আমরা জানি, ইতিহাস সময় কিংবা ঘটনার মুখশ্রী ধারণ করে; ঘটনার চেহারা বর্ণনা করে। অন্যদিকে উপন্যাস এই সময় ও ঘটনার মুখশ্রী শুধু নয়, অন্তরও ধারণ করে। অর্থাৎ ঘটনারই শুধু বর্ণনা নয় তার পেছনের ঘটনাও টেনে আনে। সেখানেই মিশ্রিত হয় বাস্তবের সঙ্গে কল্পনা। সে কল্পনা এখানে থেমো না উপন্যাসের কাহিনির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাস্তবতার সূত্রে উপন্যাসের সঙ্গে ইতিহাস, জীবনী, ভ্রমণকথা এমনকি সংবাদেরও বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তফাৎ এতটুকুই- এসব শিল্প নয়। ইতিহাস, জীবনী, ভ্রমণকথায় কল্পনা নেই, অলংকার, রূপ, রস, হিউমার নেই। অন্যদিকে উপন্যাসে কল্পনার মিশ্রণ আছে। হিউমার আছে, অলংকার আছে, রূপ আছে, রস আছে। শুধু কল্পনায় রচিত উপন্যাস বাস্তবের কাছে দায়বদ্ধ নাও হতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস বাস্তবের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ এখানে সত্য আছে। তাই এই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারেন না ঔপন্যাসিকরা। উপন্যাস রচনার আগে অনুসন্ধান করতে হয় ইতিহাসের পেছনের গল্প বা ইতিহাসের অন্তর। ইতিহাসের সেই সত্য আবিষ্কার করেই নির্মাণ করতে হয় উপন্যাসের শরীর। ইতিহাসের বিকৃত বা অসত্য ঘটনা দিয়ে উপন্যাসের শরীর নির্মাণ করা যায় না। সেটা শরীর হয় না। সেটা হয় ইতিহাসের কঙ্কাল। যা কখনও প্রাণবন্ত হয় না। সে উপন্যাস সমাদৃতও হয় না।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত আনিসুল হকের এই উপন্যাসে ইতিহাসের সঙ্গে রাজনীতির মেলবন্ধন রয়েছে। কারণ রাজনীতি বাস করে ইতিহাসের ভেতর। রাজনীতির ইতিহাসই মোটা দাগে মানুষের মনে রেখাপাত করে। তবে রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে সমাজ ও পরিবার জড়িয়ে থাকে। প্রতিটি মানুষই সমাজ ও পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। আর রাজনীতিই রাষ্ট্র ও জীবন পরিবর্তনের প্রধান পথ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইতিহাসের যত যুদ্ধ-বিদ্রোহ অভ্যুত্থান আন্দোলন সংগ্রাম সবটাই বলতে গেলে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। তাই পৃথিবীজুড়ে অনেক লেখকেরই লেখায় কমবেশি রাজনীতি এসেছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যাকে উপন্যাসের বিষয় করেছেন। বঙ্গবন্ধু চরিত্র রূপায়ণে ইতিহাস ও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে ঘটনাসমূহ। তবে সেই চরিত্রের বিকাশ ঘটেছে সচেতন ঔপন্যাসিকের সচেষ্ট প্রয়াসে। ৭৩টি অংশে এখানে থেমো না উপন্যাসে অনুপুঙ্খ বর্ণনায় বিভিন্ন চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে।

আগেই লিখেছি, জাতির পিতার দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি নিয়ে আনিসুল হকের সিরিজ উপন্যাস রচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম ছিল তর্কাতীত। ঐকান্তিকতায় পূর্ণ ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ তাঁকে জেল থেকে বের করে এনেছে। ঐতিহাসিক ঘটনা পরম্পরায় দেখা যায়, ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র করে সরাতে না পেরে সশস্ত্র বাহিনীকে লেলিয়ে দেয় তারা। বন্দি করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে বাঙালি আবার তাঁকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনে। এ জন্য এখানে থেমো না উপন্যাসে দেখা যায়, ঐতিহাসিক অংশেরই প্রাধান্য; বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিক্ষুব্ধ সময়ের মধ্যে পড়ে রাজনৈতিক চরিত্রগুলো পরস্পরের কাছে এসেছে- সেখানে তাদের মানসিক সংঘর্ষ ও পরিবর্তনের চিত্র উদ্ঘাটিত হয়েছে। তবে ইতিহাস এখানে পারিবারিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বিজড়িত। অর্থাৎ ইতিহাস বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পারিবারিক জীবনকে আলিঙ্গন করে এগিয়ে চলেছে। এ জন্য কাহিনিতে মানুষের সাধারণ মনোবৃত্তিসমূহ, প্রেম, ঈর্ষা, বন্ধুত্ব অঙ্কিত হয়েছে; ইতিহাসের জটিল-কুটিল দৃষ্টির তলায় আবর্তিত হয়েছে মানবতা। কাহিনির বৃহত্তর সংঘটনের মধ্যে কিংবা যুগান্তকারী ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব সংঘাতে নিম্নবর্গের মানুষ উপেক্ষিত হলেও সর্বক্ষেত্রে নয়। যদিও আখ্যানের চরিত্রসমূহ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কখনও উচ্চপদস্থ। তাঁরা রাজনৈতিক আবর্তের বিক্ষোভ-বিকম্পিত ইতিহাসের গর্ভের ভেতর জন্মগ্রহণ করে বর্ধিত হয়েছেন। ইতিহাস এদের পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করে স্বাভাবিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে এবং তার তুচ্ছতম বিষয়ের সঙ্গে একান্ত অপ্রত্যাশিত ও নির্মম পরিণতির সংযোগ স্থাপন করে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বিশাল ইতিহাস ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত জীবনকে প্রায় গ্রাস করে নিয়েছে। তবে ঐতিহাসিক কোলাহলের মধ্যে নিজ নিজ কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেননি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। ইতিহাসের প্রবল আকর্ষণে শাখা-কাহিনির সাধারণ জীবন তার স্বভাবমন্থর গতি হারিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনার বেগবান প্রবাহে চলতে বাধ্য হয়েছে। ইতিহাসের গ্রাস থেকে ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারেননি অনেকেই রাজনৈতিক কারণে। অবশ্য ইতিহাসের সর্বগ্রাসী একাধিপত্য থেকে মানবজীবনের স্বাধীনতা ও গৌরব বাঁচাতে চেয়েছেন লেখক। এজন্য ইতিহাসের নিষ্পেষণে চরিত্রগুলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারায়নি। ইতিহাসের নাগপাশের মধ্যে মানব-হৃদয়ের সর্বাপেক্ষা স্বাধীন স্ফুরণ ঘটেছে আখ্যানে। রাজনীতির আবর্তের মধ্যে ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা ঘূর্ণিত হলেও ইতিহাসের প্রবাহধারায় তা নিশ্চেষ্ট হয়নি। ইতিহাসের পাষাণ-প্রাচীর চারিদিকে থেকে ধেয়ে এলেও ব্যক্তির স্বাধীনতাকে ব্যাহত করেনি। উপন্যাসে কোনো কোনো ঘটনা বিচিত্র ও চিত্তাকর্ষক। যেমন, পাকিস্তানি শাসকদের প্রেম ও নারীপ্রীতির প্রসঙ্গ। তাদের ক্ষেত্রে কখনো কখনও চরিত্রের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে ঘটনাসমূহ। আবার ইতিহাসের প্রসিদ্ধ ঘটনার মধ্যে ব্যক্তিচরিত্রের শৃঙ্খলিত জীবন যোজিত হতে দেখা যায় কখনও কখনও। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত জীবনে ইতিহাসের গতিবেগ সঞ্চারিত হয়েছে; ফলে দুই ভিন্ন প্রকৃতির উপাদানের সমন্বয় ঘটেছে উপন্যাসে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এই উপন্যাসে দেখা যায়, লেখক তাঁর নিজের কালের বাস্তবতার পরিবর্তে অতীতে বিচরণ করেছেন। আনিসুল হক দেশভাগের আগে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্বে এসে থেমেছেন। অতীত ইতিহাস তাঁর সব উপন্যাসেই আছে তবে তার মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। আলোচ্য উপন্যাসে ঘটনা-কাহিনি ঐতিহাসিক বলেই লেখককে সমকালীন রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার-সংস্কার, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সব বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়েছে। আবার ঐতিহাসিক বাস্তবতা উপস্থাপনে নির্লিপ্ত থেকেছেন তিনি। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বঙ্গবন্ধুসহ সকলে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হিসেবে কীর্তিমান। আর পাকিস্তানি শাসকবাহিনী অপকীর্তির দরুন নিন্দিত-ঘৃণিত। দুই ধরনের চরিত্র রূপায়ণে লেখককে ইতিহাসের প্রতি যথাসম্ভব বিশ্বস্ত থাকতে হয়েছে। আনিসুল হক বঙ্গবন্ধুর পাশে তাজউদ্দীন, মোশতাক, ভাসানীসহ আরও অনেক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্র ইতিহাসের উপকরণের জন্য সরাসরি গ্রহণ করেছেন।

৬.

আনিসুল হকের নির্মেদ কথ্যভাষার রূপ বিচিত্র মাত্রায় উদ্ভাসিত হয়েছে সিরিজ উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহের আকস্মিকতায়; নাটকীয়তা এসেছে বিষয়ের বর্ণনায়। আর অসাধারণ বর্ণনাশৈলি ও মমত্ববোধ কাহিনিকে খুব সহজেই হৃদয়গ্রাহী করেছে। রাজনৈতিক ইতিহাসকে উপজীব্য করে তাঁর পাঁচটি উপন্যাসের রূপ-রস নির্মিত; ফলে পাঠকের কাছে ইতিহাস নতুনভাবে ধরা দিয়েছে। লেখক ইতিহাসের চরিত্রসমূহকে সাধারণ পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রাত্যহিক জীবনধারা নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে পাঠকের কাছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অজানা তথ্য ও মানসিকতার সঙ্গে পাঠক সহজেই পরিচিত হতে পেরেছেন। বিশাল ব্যক্তিত্বকে আখ্যানের একটি চরিত্র হিসেবে ফুটিয়ে তোলার জন্য লেখকের উপস্থাপন-কৌশল এবং সর্বোপরি লেখকের নিষ্ঠাবোধের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি কাহিনির অগ্রভাগে এসে পাঠকের চিত্তাকর্ষণ অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমির মুখেই ইতিহাসের অনেক তথ্য-উপাত্ত অকপটে বর্ণিত হয়েছে এবং তাদের মুখে বর্ণনা করে লেখক যে কৌশলটি অবলম্বন করেছেন তা পাঠককে কাহিনির গহিনে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমির কথার ভঙ্গি অসাধারণ। লেখকের বর্ণনায় আরেকটি বৃক্ষ পাঠক হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে। বৃক্ষটি হলো একটি বটগাছ। একটি অংশ- ‘ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বটগাছের পাতায় পাতায় উড়ে বেড়ায়। তারা গল্প করে।’ (পৃ ১২০) আনিসুল হক জীবনভিত্তিক এই উপন্যাসে সহজ-সরল ভাষায় বর্ণনা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন এবং কর্ম। তবে তিনি আখ্যান নির্মাণে অন্য বইয়ের সাহায্য নিয়েছেন। তবে লেখকের নিজস্ব একটা ভঙ্গি দৃষ্টিগোচর হয়। সিরিজের শেষ উপন্যাস এখানে থেমো না-এ লেখক শেখ মুজিবের জীবনকে তুলে এনেছেন পরিচ্ছন্ন বিবরণে। তবে বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, দলের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি এ আখ্যানে পরিবার এবং রাজনৈতিক আন্দোলনকে একটু বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। এ জন্য খাবার টেবিল থেকে শুরু করে পারিবারিক অনেক প্রসঙ্গ আখ্যানে উপস্থাপিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক এই আখ্যান সামাজিক উপন্যাস। কারণ ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অন্যদিকে সামাজিক উপন্যাসে সামাজিক ঘটনা, সমস্যা, সমাজের প্যাটার্নের ও মানসিক বৃত্তের ভাঙচুর বেশি তাৎপর্য পায়। উপন্যাসের সঙ্গে সমাজগতির সম্পর্ক নিবিড়। ঔপন্যাসিক এসব মাথায় রেখেই সমাজের প্রতিষ্ঠাভিত্তিকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থেকেছেন। সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধের বিপরীতে নতুন কিছু উপস্থাপনও করেননি। ঐতিহাসিক চরিত্রের সামাজিক রূপ তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে প্রাধান্য পেয়েছে পাকিস্তানি ইয়াহিয়া, ভুট্টোর মতো ষড়যন্ত্রকারীদের নানা অপতৎপরতা, তাদের মানসিকজগৎ, মনোবৃত্তি, নিষ্ঠুরতার ইঙ্গিতময় কথনবিশ্ব। তবে দ্বান্দ্বিক মনোজগতের বিবরণও আছে উপন্যাসে।

এখানে থেমো না উপন্যাসটি সহজ-সাবলীল গদ্যে লেখা ও সুখপাঠ্য। লেখক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত তথ্য ব্যবহার করেছেন নিবিড় পরিচর্যা ও সতর্কতার সঙ্গে। কখনো বা কোনো গবেষণা-গ্রন্থের তথ্যনির্দেশ না দিয়ে ইতিহাসকে রক্ষা করেছেন। আসলে এ উপন্যাস নতুন প্রজন্মকে নানা বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করবে এবং ইতিহাসের সত্যকে পুনঃপাঠে সক্ষম হব আমরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে অপপ্রচারের ইতিহাস পুঞ্জিভূত হয়েছিল তা ভেদ করে প্রকৃত ইতিহাস আবিষ্কারই এ লেখকের অন্যতম কাজ। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বৈরী মনোভাব এবং বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টির অবসানকল্পে জাতির পিতার স্বমহিমায় বাংলা উপন্যাসে চিত্রিত হওয়া তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

৭.

বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক আনিসুল হকের পাঁচটি উপন্যাস পাঠ করলে বোঝা যায়, পাকিস্তানি রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মের শোষণ-বঞ্চনা ও নিপীড়নে মানুষের জীবনচর্যা ও রাজনীতি যে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল, তার স্বরূপ উন্মোচনে লেখক আন্তরিক। তিনি কখনও বা বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডকে প্রতীকী তাৎপর্যে জীবন্ত করেছেন আখ্যানে; আবার রাষ্ট্রনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের এই তৃতীয় বিশ্বের ভিন্নতর বাস্তবতার আলোকে সংগ্রামের পেছনে পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের শেকড় সন্ধান করেছেন। মূলত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তথা জীবনসত্যের অন্বেষণে বহির্জাগতিক ঘটনার আলোড়নের পটভূমিতে রচিত হয়েছে কাহিনি; যেখানে পাক-শাসকের নিষ্পেষণে পদদলিত সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা। এই আশা-আকাক্সক্ষা প্রমূর্ত রাখার দায় লেখকের। এ জন্য উপন্যাসে বঙ্গবন্ধুর দর্পণে বাঙালি জাতীয়তাবাদী-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেছেন কথাকার। এখানে সামষ্টিক অস্তিত্বের রূপান্তরিত পরিস্থিতির মধ্যে ঔপন্যাসিকের জীবনজিজ্ঞাসা প্রোথিত। রাজনৈতিক চরিত্রকে সমকালীন চেতনার আলোকে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ঐতিহাসিক আন্দোলনের ঘটনাক্রম এবং ব্যক্তিক সক্রিয়তার রূপায়ণে ঔপন্যাসিকের জীবনবোধের বস্তুঘনিষ্ঠতা উন্মোচিত যা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অপপ্রচারের সমুচিত জবাবও।

 লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares