প্রবন্ধ : মায়াবি দৌলত : আদর্শের চেতনাপ্রবাহ : মুনশি আলিম

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই নিজস্বতায় ব্যতিক্রম। এরই মধ্যে আবার কেউ কেউ থাকে ব্যতিক্রমেরও ব্যতিক্রম। যেভাবে কেউ কেউ থাকে সেরাদের সেরা তেমনই আরকি! শতাধিক গ্রন্থের লেখক মোজাম্মেল হক নিয়োগী। তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্য বিচারে নিঃসন্দেহে তিনি মূলধারার লেখক। মায়াবি দৌলত ২০২০ সালের একুশের বইমেলায় নালন্দা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে দশ ফর্মার উপন্যাসটির প্রচ্ছদ করেছেন মামুন হোসাইনÑ যে প্রচ্ছদের ক্যানভাস জুড়েও রয়েছে রহস্যময়তার আকর্ষণ; মায়াবী দৃষ্টিতে এক আদর্শিক চেতনার স্মৃতিপটের উন্মোচন।

প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে জগদ্বিখ্যাত ভাস্কর রোদ্যার সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে বলেছিলেন- ‘যিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন, বাঁদরও গড়তে পারেন।’ এই কথাটি কথাসাহিত্যিক মোজাম্মেল হক নিয়োগীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।  সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে তাঁর অবাধ বিচরণ থাকলেও শিশুসাহিত্যে ও কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান অগ্রগণ্য।  

মায়াবি দৌলত আবর্তিত হয়েছে মুজিবকোটকে কেন্দ্র করে। কোনো কোনো উপন্যাস কাহিনিকে নির্ভর করে, কোনোটি থাকে চরিত্র-নির্ভর, কোনোটি হয় ইতিহাস-নির্ভর, আবার কোনোটি হয় দৃশ্যপট-নির্ভর; আবার কোনোটি বা কাব্যময়তায় সমৃদ্ধ। এই উপন্যাসটি বিশ্লেষণে দেখা যায় কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনো ব্যক্তি নয়, একটি কোট—‘মুজিবকোট’। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা একনিষ্ঠ প্রতীকাশ্রয়ী এমন ব্যতিক্রমী উপন্যাস আমাদের হাতে এসেছে যেখানে উপন্যাসের ক্যাটাগরি নির্বাচনে পাঠক দ্বিধাগ্রস্ত হবেন। 

একটি সার্থক উপন্যাসের জন্য প্রয়োজন শিল্পবোধ। সার্থক উপন্যাসের ঔপন্যাসিককে হতে হয় ত্রিকালদর্শীর মতো বিচক্ষণ! পঠনপাঠনসহ বিচার-বিশ্লেষণে তাঁকে হতে হয় সিদ্ধহস্ত। আর এরূপ হলেই তখন কল্পনা ও বাস্তবতার শৈল্পিক সমন্বয়ে উপন্যাসের চরিত্রগুলো হয়ে ওঠে সর্বজনীন।

উপন্যাসটির শুরু হয়েছে প্রত্যুষের এক রহস্যময় আবছা তমসার মধ্য দিয়ে এবং যে রহস্যের খেলা খেলেছেন উপন্যাসের শেষ বাক্যটি অব্দি। গ্রামীণ চিরাচরিত কুসংস্কার বা বিশ^াসের বাতাবরণে লেখক রহস্যময়তা সৃষ্টি করেছেন গ্রামীণ জীবনধারার ছবি এঁকেছেন নিবিষ্ট শিল্পীর রংতুলিতে। 

মায়াবী দৌলত উপন্যাসটি ধারণ করেছে পঁচাত্তরের পর থেকে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত সময়কে। যুদ্ধোত্তর দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিই এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে ছবির মতন। রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ নয়, তবু প্রধান চরিত্র ‘মুজিবকোট’! ‘মুজিবকোট’ মানে মুজিবাদর্শকে এই উপন্যাসে ধারণ করা হয়েছে মূল উপজীব্য হিসেবে। পঁচাত্তর পরবর্তী সময় শেখ মুজিব বা বঙ্গবন্ধু শব্দটি ছিল নিষিদ্ধ। মৌসুমি নেতৃবৃন্দও তখন পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে ভেতরে-বাইরে নিজেদের  গুটিয়ে নেয়। কেউ বা আবার খোলস বদল করে অর্থাৎ দল পরিবর্তন করে রাতারাতি হিরো বনে যায়। কেউ কেউ হয়ে যায় টাকার কুমির! বিশেষ করে দেশবিরোধীরাই হয়ে ওঠে ক্ষমতার একনিষ্ঠ ধারক ও বাহক। মায়াবী দৌলতের ক্যানভাসে সেসব দৃশ্যের রং চড়িয়েছেন লেখক একজন দক্ষ কুশীলবের মতো। 

এই উপন্যাসে মুজিবকোটের স্পর্শে আনা হয়েছে বংশ পরম্পরায় এক কুখ্যাত চোর দেলুকে যে কোনোদিন রাজনীতি করেনি। রাজনীতির ধারে-কাছেও যায়নি। উপন্যাসে দুটি ঘটনায় বঙ্গবন্ধুকে দেলু দেখতে পায়। একটি একবার সত্তরের নির্বাচনের সময় এক মাঠে বক্তৃতার সময় যখন সে সারা সময় বাদাম খেয়েছে এবং আরেকবার স্বাধীনতার পর সিলেটের এক ধনাঢ্য লোকের বাসায় চুরি করতে গিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে থেকে টিভির এক ভাষণে। এই দুটি ঘটনাই লেখকের মুন্সিয়ানা যার মাধ্যমে কাহিনির বিশ^স্ততা নির্মাণ ও কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করার যৌক্তিক কৌশল হিসেবে নিয়েছেন লেখক : 

পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে কোনো এক রাতে দেলুর চুরির অন্যান্য মালামালের সঙ্গে হাতে আসে একটি মুজিবকোট যে কোটে অবহেলার ছাপ ছিল স্পষ্ট। মুজিব- কোটটিতে অবহেলার ছাপ দেখতে পেয়েই দেলুর মানসিক পরিবর্তন ঘটে এবং আদর্শের লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। এই কোটটিকে তখনই সে ধুয়ে শুকিয়ে মগের তলা দিয়ে ইস্ত্রি করে ভাঙা বাক্সে রাখে পরম মমতায়। কোটের জন্য দেলুর মনোজগতের পরিবর্তন দেখে স্ত্রী মঞ্জিলার মনেও সংশয় দেখা দেয় এবং মনে মনে বলে তার মাথা বেঠিক হয়ে গেছে কিনা। এরপর মঞ্জিলাও দেলুর সঙ্গে একাত্ম হয় আর কোটের প্রতি তারও ভালোবাসা মনের গহিনে প্রবাহিত হতে থাকে। কোটের প্রভাবেই দেলু বদলে যেতে থাকে ক্রমধারায়। মুজিবাদর্শে বিশ্বাসী একজন মানুষকে মুজিবকোটটি উপহার দেওয়ার জন্য দেলু ব্যাকুল হলেও সেই সময়ে সেই মানুষটিকে সে খুঁজে পায়নি। আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে সহজেই উপলব্ধ হয় মুজিবকোটকে ধারণ করার মানুষ সে নয় এবং এমন একজন উপযুক্ত মানুষকে সে খুঁজে বেড়ায় যে মুজিবাদর্শে প্রদীপ্ত, আপসহীন ও গণমানুষের প্রতিনিধি। এভাবেই এই উপন্যাসের ক্যানভাসে মূর্ত হয়েছে এক মহান নেতার প্রতি প্রান্তিক জনমানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মর্যাদা, আত্মত্যাগ বদলে যাওয়ার ছবি।

মোটাদাগে বলতে গেলে এ উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে আদর্শের দ্বৈরথ। একটি আদর্শিক কোটের জাদুকরি প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে চরিত্রগুলো। কোটকে আদর্শের মেটাফর হিসেবে গণ্য করে রচিত উপন্যাসটি একটি উপন্যাস হতে পারে তা অভাবনীয়। মানুষ নানাভাবেই বদলে যায়, পরিবর্তন হয় মনের, অবস্থার। মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকের ভাষায় : ‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়, সকালে বিকালে বদলায়।’ মায়াবী দৌলত উপন্যাসে দেলু চরিত্রের ভাবান্তর, আমূল পরিবর্তন সমাজ- বাস্তবতাকেই নির্দেশ করে।

দেলুর স্ত্রীর নাম মঞ্জিলা। তাদের একমাত্র সন্তান মঞ্জু। যার বয়স চার বছর। ফুলঝুরি গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে তাদের বাড়ি। দেলু বংশ পরম্পরায় পেশাদার চোর হলেও সে কিছুক্ষেত্রে ছিল নীতিবান। কখনওই সে তার কাছে রাখা আমানতের জিনিস খেয়ানত করেনি। কারও সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাফ করেনি। এমনকি নিজের গ্রামের কারও ক্ষতি করেনি বা গ্রামের আশপাশেও চুরি করেনি। সে জীবনে আর কোনো কাজ শেখেনি বলেই জীবন ধারণের জন্য চৌর্যবৃত্তি করে। তার চোর হওয়ার কাহিনিমূল বেশ আকষর্ণীয়। 

এই উপন্যাসের আরেকটি বিশেষ দিক হলো গ্রামীণজীবনের প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের খুঁটিনাটি বিষয় নিখুঁতভাবে অঙ্কন করা। নারিকেল খেলার ঘটনাটিও অনেক চমকের ব্যাপার। এই খেলার ভিতরও লেখক ক্লাইম্যাক্সে যাওয়ার বীজ বুনে দিয়েছেন। দেলুর সংসারের অভাব মোচনের জন্য হাঁস-মুরগি পালে দেলুর অল্পবয়সী সুন্দরী স্ত্রী মঞ্জিলা। মঞ্জিলা সুন্দরী বলেই দেলু তাকে নাম ধরে না ডেকে আদর করে ডাকে ‘টুকটুকি’। একবার মঞ্জিলার আদরের লাল মোরগটি যখন শিয়ালে নিয়ে যায় তখন এই করুণ দৃশ্যটি ছবির মতো পাঠকের চোখে ধরা দেয়। মঞ্জিলা আহাজারি করে আর সে আহাজারিতে সিক্ত হয় পাঠকহৃদয়।

কালিঙ্গা বিলকে ঘিরে শ্রাবণের শেষে শুরু হয় ষোলোটি গ্রামের মানুষের বিভিন্ন উৎসব। বনগাঁওর সঙ্গে ফুলঝুরি গ্রামের হা-ডু-ডু খেলা। প্রধান আয়োজক মাতব্বর হারিছ। ব্যাপক আয়োজনে গ্রামের মানুষের উত্তেজনাকর বিরাট প্রতিযোগিতা। কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতি খেলাটিকে বেশ সরগরম করে দিয়েছে। ফুলঝুরি গ্রামের মধ্যমণি দেলু। এই খেলায় সে ‘জয় বাংলা’ বলে দম দিয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়ার সূচনালগ্নে প্রতিপক্ষ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ‘জয় বাংলা’ দিয়ে দম ধরা যাবে না এই ছিল বিরোধের সূত্র। অল্পসময়ের মধ্যেই ঘটনাটি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সংঘর্ষে হারিছও কিছু উত্তম-মধ্যম খায়। উভয় পক্ষের অনেকেই হাসপাতালে ভর্তি হয়। কেউ হয় মামলা এড়াতে আবার কেউবা মামলার রসদ জোগাতে, কেউবা সিরিয়াস আহত হয়ে। এ ঘটনার পর থেকেই সারাগ্রাম একাট্টা হয়ে যায়। দোষ দেলুর। তার কারণেই আজ সংঘর্ষ। এর জন্য সেই দায়ী। তাকে আর গ্রামে থাকতে দেওয়া যায় না। শুরু হলো উপন্যাসের পটপরিবর্তনের সূচনা। এই স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের কোথাও হা-ডু-ডু খেলা হয়েছে কি না আমাদের জানা নেই। তবে এটা হলফ করে বলতে পারিÑ ঘটনার ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে এই একটিমাত্র সেøাগানই (দম দেওয়ার কৌশল) পুরো উপন্যাসেরই বাঁক পরিবর্তনের রসদ। এটা নিঃসন্দেহে সাহিত্যবোদ্ধা পাঠকের জন্য একটি নতুন চমক।

মায়াবি দৌলত একটি মিনি মহাকাব্যিক উপন্যাস। এর বর্ণনার ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে কাব্যময়তার উষ্ণ সুঘ্রাণ। উপন্যাসের ক্ষেত্রে কাব্যময়তা মোটেই দোষের নয়; বরং গুণ হিসেবেই বিবেচিত হয়। বাংলা সাহিত্যের তিন সেরা কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের লেখনীতে কাব্যময়তা মোটেও অস্বীকার করা যায় না। কাব্যময়তার বিশেষ প্রভাব পড়েছে বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাসে। কেউ কেউ তো আবার এই উপন্যাসকে মহাকাব্য বলেও স্বীকার করে নেন। বাংলা সাহিত্যের কিছু কালজয়ী উপন্যাসের মধ্যে নিঃসন্দেহে পথের পাঁচালী অন্যতম। কাব্যময়তা নিয়ে যদি এটি কালজয়ী হতে পারে তবে এটা বলা যায় কাব্যময়তা উপন্যাসের জন্য মোটেও অবাঞ্ছিত বা অপ্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়। এটাও একধরনের অলংকরণ যা মায়াবী দৌলতে পরিলক্ষিত হয়।

উপন্যাসে প্রধান চরিত্রগুলোর উপস্থিতির গড় সময় অন্যান্য চরিত্রগুলোর তুলনায় একটু বেশি থাকাই বাঞ্ছনীয়। এদিক বিবেচনায় মুজিককোট, দেলু, মঞ্জিলা, মঞ্জু চরিত্রগুলো পুরোপুরিই সার্থক। যদিও মুজিবকোট কোনো সত্যিকার চরিত্র নয়, তবু কথাসাহিত্যিকের লেখার শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় একটি কোটই হয়ে উঠেছে রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়েও বড়ো, মহত্তর। রহস্যের মধ্য দিয়েই উপন্যাসটি এগোতে থাকে। পাঠক কখনও কখনও অনুভব করে থ্রিলার উপন্যাসের স্বাদ, কখনও সামাজিক, কখনও ঐতিহাসিক আবার কখনও বা রাজনৈতিক।

বাংলা কথাসাহিত্যে মানিক, তারাশঙ্কর এবং বিভূতিভূষণ তাঁদের নিজস্বতায় বা কর্মগুণ দিয়েই বাংলা সাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের সৃষ্টিশীল লেখনীর নৈপুণ্য দিয়ে। তাঁদের লেখার বেইজও প্রায় এক। কাহিনিগুলোকে জীবন্ত করে তোলার জন্য অঞ্চলবিশেষের মানুষের সত্যিকার ভাষাটাই চরিত্রের মুখে সেঁটে দিতেন। ফলে উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে তখন মনে হয় হাজার বছরের পরিচিত! ভাষাচয়নকেও মনে হয় আমাদের কিংবা আমাদের প্রতিবেশীর। কাহিনির বুনন এবং ভাষার যথাযথ প্রয়োগে মোজাম্মেল হক নিয়োগী এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কোনো অংশেই কম নয়। বরং তাঁর মায়াবি দৌলত উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছেÑএটি আরও বেশি জীবনঘনিষ্ঠ, আরও বেশি জীবন্ত। যেমন এক জায়গায় দেখা যায়—

দেলু মুচকি হেসে বলল, জীবনের পয়লা আইজ পরিশ্রমের হালাল পইসা দেয়া বাজার করতাছি। আমার টুকটুকি খুব খুশি অইব, দেহিস। আমার মনডাও ভইর‌্যা গেছে। হালাল রুজির মনে হয় আলাদা সুখ আছে, তুই কী কস?

তুই এতদিন পর বুজ্জস এইডাই বড় শান্তি।

বড় আশা লইয়া ঢাহা আইছি। আমার পোলাডারে মানুষ বানাইবাম।

দেলু আকাশের দিকে চেয়ে মনে মনে খোদাকে স্মরণ করে।

এবাদ দেলুকে দেখে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে।

মায়াবী দৌলত উপন্যাসের ভাষার সরলীকরণ অত্যন্ত চমৎকার। পাঠকহৃদয় ভাষাপ্রেমে আপ্লুত হলেই পঠনপাঠনের প্রকৃত স্বাদ পায়। ঔপন্যাসিকের মায়াবী দৌলত উপন্যাসে চরিত্র অনুযায়ী সংলাপের বুনন সত্যিই যথার্থ। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পঠনপাঠনে পাঠক ঘটনার পাশাপাশি দার্শনিক তত্ত্ব এবং তথ্যও খুঁজে বেড়ায়; বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে পাঠক খুঁজে পায় কাব্যময়তা, অন্নদাশঙ্কর রায়ের উপন্যাসে পাঠক খুঁজে পায় আধ্যাত্মিকতার সুঘ্রাণ আর মোজাম্মেল হক নিয়োগীর মায়াবী দৌলত উপন্যাসে পাওয়া যায় রাজনৈতিক বাস্তবতার সুঘ্রাণ! অবশ্য একই সঙ্গে কাব্যময়তা, ইতিহাসের প্রলেপমাখা রাজনৈতিক সত্য এবং দার্শনিক তত্ত্ব এই উপন্যাসকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। যেমন:

ঢাকা লন্ড্রির মালিক বাসেত বাঙালি বলেÑ এই কোটে ছয়টি বোতাম। এই ছয়টি বোতাম মানে ছয়টি অ্যাটম বোমা। বুঝলেন?

না। বুঝলাম না।

ছয় দফা ছিল বঙ্গবন্ধুর দাবি। এই ছয় দফা দাবি করার পরেই পকিস্তানি খানদের বুকে ভূমিকম্প শুরু হয়। কারণ, ছয় দফাই ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। ওই ছয় দফার ছয়টি বোতাম বঙ্গবন্ধুর কোটে লাগালেন।

মায়াবী দৌলত উপন্যাসটিতে নামোল্লিখিত মোট চরিত্র চৌত্রিশ। তন্মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র তিনটি। দেলু, টুকটুকি ওরফে মঞ্জিলা এবং তাদের ছেলে মঞ্জু। রক্ত-মাংসের এই ত্রয়ী থেকেই প্রধান হয়ে উঠেছে মুজিবকোট। মুজিবকোটকে জীবন্ত করতে, আদর্শিক রক্ত-মাংসের করে গড়ে তুলতে ঔপন্যাসিক আশ্রয় নিয়েছেন অন্যান্য চরিত্রগুলোর। বিশেষ করে  হাছুন আলী, মঞ্জিলা, মঞ্জু, সন্তোষ মণ্ডল, মজনু, হারিছ, বেনু মাঝি, করিমা খাঁ, নাদের আলী, নজর আলী, হান্নান, গোপীনাথ স¦র্ণকার, মোতালেব মেম্বার, মোতালেব কন্যা নাসিমা, আখতার হোসেন চেয়ারম্যান, নুসরাত, মুক্তিযোদ্ধা আজিজ, স্বর্ণকার মৃণাল, মাস্টার আজিজ, থানার বড় নেতা মোমিন খান, রাজাকারের ছেলে হালিম, বাজারের ইজারাদার গণি, ইমাম আলিম মুন্সি, সুহান, প্রতিবেশী হারু, পারু, এবাদ আলী, তহুরা, শ্রমিক নেতা আবু তালেব, গ্যারেজ মালিক সাধু, তরুণ রমিজ, সুজাত, বাসেত বাঙালি প্রমুখ।

মানুষমাত্রই আবেগপ্রবণ। নানাপ্রকার অনুভূতিই কারণে অকারণে মানব মনে ঢেউ খেলে যায়। মানুষের জীবন যেমন বহতা নদীর মতো। তাতে হাসি, কান্না, দুঃখ সব ভাসে; আবার মাঝে মাঝে টর্নেডোর মতো সব সমীকরণ বদলে দেওয়া ঘটনাও থাকে। এই উপন্যাসে রয়েছে এমনই নিখুঁত চিত্র।

এই উপন্যাসে মিলিটারির শাসন বলতে মূলত জিয়া এবং এরশাদের শাসনামলকেই বোঝানো হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর দীর্ঘ সময় কেউ শেখ মুজিবের নাম মুখে নেওয়ার সাহস করত না। ক্ষমতার পালাবদলে মৌসুমি রাজনীতিবিদদের নীতিরও পরিবর্তন হয়। একসময় যারা মুজিবের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এখন তারাই নির্বিকার। আর যারা দেশের বিরোধিতা করেছিল এখন তাদেরই যেনো মহাক্ষমতাধর! আশির দশকে যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে তখন দেশবিরোধী এক নেতা ভাড়ায় মুজিবকোট চেয়েছিল। বাসেত তখন বলেছিল, মুজিবকোট কখনও ভাড়ায় পাওয়া যায় না, সুজাত সাব। মুজিবকোট শরীরের পোশাক নয়, অন্তরের পোশাক। কী করে ভাড়ায় পাবেন?

মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়কে ধারণ করে লেখা উপন্যাসটিকে ঠিক ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা যায় না, আবার মুজিবকোট কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও ঠিক রাজনৈতিক উপন্যাসও বলা যায় না। মায়াবী দৌলত উপন্যাসে আদর্শের দ্বন্দ্ব, নতুন রাজনৈতিক উত্থান, ক্ষমতার টানাপোড়েন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সাম্প্রদায়িক চেতনার উত্থান, বুনো হিংস্রতা, প্রেম, দেশপ্রেম সবকিছুরই প্রতিচ্ছবি সত্যনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ঔপন্যাসিক। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে এটিকে সামাজিক- রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। 

 মুজিবকোটের আদর্শের স্পর্শে পেশাদার চোর দেলুর মধ্যে ভাবান্তর ঘটে। ভালো হওয়ার জন্য ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় এবং ক্রমেই সে ভালো হওয়ার চেষ্টায় রত ও ব্রতী হয়। কিন্তু সমাজের মানুষগুলোর কাছ থেকে প্রতি পদেই সে ধিক্কার পেতে থাকে। থানার ভারপ্রাপ্ত দারোগাও হুকুম করে মুজিবকোট পুড়িয়ে দিতে। এই ঘটনায় দেলু প্রতিক্রিয়াশীল না হলেও তার মনোজগতের দৃঢ় ও অনড় সংকল্পের নমুনা স্পষ্ট হয়। মুজিবকোটের কোথাও সঠিক মূল্যায়ন পায়নি সে; বরং যেখানেই যাকে বলেছে সেইই তাকে ভর্ৎসনা করেছে, তিরস্কার করেছে। দেলুর নিজের উপলব্ধি মতে:

এই সংসারে কে ভালা মানুষ? কার চরিত্র ঠিক আছে? বিড়বিড় করতে করতে হাঁটে, তাহলে এরা আগে কেন মুজিব নামেই বেহুঁশ হয়ে যেত? তাহলে আমার সঙ্গে এই লোকের পার্থক্য কী। আমি চুরি করে আনি আর সে কিনা কমদামে কিনতে চায়?

দেলুর কথাগুলো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চোর’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মধুর সংলাপের সঙ্গে যেন অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ: ‘জগতে চোর নয় কে? সবাই চুরি করে।’ পেশায় চোর হলেও মুজিবকোট পাওয়ার পর সে ভালো হওয়ার সংকল্প করে। কিন্তু কেউ তাকে বিশ^াস করে না। সবচেয়ে বেশি অবাক হয় তার স্ত্রী মঞ্জিলা। ছেলে মঞ্জুকে নিয়ে দেলু নতুন করে স্বপ্ন বুনে। বড়ো স্বপ্ন। আর সে স্বপ্নে প্রতিনিয়তই সে বাহারি রঙের প্রলেপ দিতে থাকে। তবে চোরের স্ত্রী হলেও মঞ্জিলা চরিত্রটি পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। চোরের বউয়েরও যে সততা আছে এ বিরল ঘটনা। বিলের ধারে কুড়িয়ে পাওয়া ডিমও মঞ্জুকে ফেরত রেখে আসতে হয়েছে মঞ্জিলার জন্য। ফলে পাঠকমাত্রেরই মঞ্জিলার প্রতি মমতা জন্ম নেয়। উপন্যাসের একটি ঘটনা থেকেই আমরা এ বিষয়টি আঁচ করতে পারি। দেলুকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনি এগিয়ে গেলেও সততার, নৈতিকতার মায়াজাল চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় মঞ্জিলা চরিত্রটি। প্রথমটায় অবুঝ প্রকৃতির; কিন্তু শেষটায় সেইই হয়ে ওঠে বিচক্ষণ, বুদ্ধিদীপ্ত ও আকষর্ণীয়। 

উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনাবলি যেন আমাদের চারপাশের চিরচেনা সমাজেরই কোনো না কোনো গল্প! বুলডোজার দিয়ে বস্তি উচ্ছেদের মতোই একসময় হারিছ তার দলবলসহ দেলুকে সপরিবারে বাসস্থানচ্যুত করে। ঔপন্যাসিকের সরস বর্ণনায় পাঠক হৃদয়েও চোর দেলুর জন্য মায়া জন্মে। ঘটনার অন্দরমহলে প্রবেশ করে পাঠকমাত্রেরই হৃদয়ে জারণ-বিজারণ ঘটবে বলে আমাদের বিশ^াস। নিয়োগীর সুললিত কাহিনি বর্ণনা পাঠককে চিত্রকল্পের মতোই টেনে নিয়ে যাবে। পাঠক আবেগমথিত হবে। রোমান্সে শিহরিত হবে। কথাসাহিত্যিক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে এমন আকর্ষণীয় আর রক্ত-মাংসের মতো জীবন্ত করে গড়ে তুলেছেন যে, মুজিবকোটের রহস্যঘন পথ ধরে পাঠক হেঁটে চলবে অবলীলায়। কথা ও ভাবের সরসতায় বিমোহিত হবে। তবে মায়াবী দৌলত উপন্যাস কখনও সখনও পাঠকমনকে ক্ষতবিক্ষত করে। কখনও বা রোমান্টিকতার ভেলায় চড়িয়ে পাঠককে টেনে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরান্তরে।

ফুলঝুরি গ্রামের শেষপ্রান্তে দেলুর বাড়ি।

গ্রাম থেকে দেলুকে উচ্ছেদ করার বেদনায় পাঠক সিক্ত হলেও ট্রেন যাত্রার মধ্য দিয়ে লেখক আরেকটি সততার বীজ বুনে রেখেছেন যা উপন্যাসের শেষে এসে এটি মহীরূহের রূপ ধারণ করে। দেলু জীবনে প্রথম ট্রেনে চড়ে টিকিট করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই দেলুর চূড়ান্ত বদলে যাওয়ার সূত্রটি স্পষ্ট হয়।

ঢাকায় আসে দেলু আত্মবিশ^াস নিয়ে। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য গায়ের শক্তিই বড় পুঁজি। সে প্রকাশও করে এই মনোভাব। আর নির্মাণকাজের শ্রমিক থেকে পেশা বদলে শেষাধি কাঁচামালের দোকানদার হয়। দেলুর ঢাকার জীবনে সিনেমাটিক ঘটনা ঘটিয়ে লেখক হয়তো অনেক ধনী বানিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু লেখক পরিমিত বোধ এবং বাস্তবসম্মত চিন্তার আঁচড়ে দেলু ও তার পরিবারের চরিত্র চিত্রণে বিশ^স্ততার স্বাক্ষর রেখেছেন। 

উপন্যাসে উঠে এসেছে ১৭ মে ১৯৮১ সালের শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সামগ্রিক চিত্র। রোমাঞ্চকর ও আবেগময় নিখুঁত বর্ণনা যেখানে লক্ষ জনতার সমাবেশে শেখ হাসিনা উপস্থিত হন।

মূল চরিত্রকে বিকশিত করতে গিয়ে হয়ত ঔপন্যাসিকের অগোচরেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মঞ্জু চরিত্রটি। মেঘনাদবধ কাব্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সবচেয়ে বেশি দরদ ছিল রাবণের প্রতি কিন্তু মহাকাব্যের শেষতক বিশ্লেষণে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে  মেঘনাদ! মায়াবী দৌলত উপন্যাসেও মুজিবকোটের পরে সবচেয়ে দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন দেলু আর মঞ্জিলা চরিত্রটি; কিন্তু শেষতক সবচেয়ে বেশি আলো ছড়িয়েছে মঞ্জু চরিত্রটি।

একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ার সময় মঞ্জু একদিন একটি মানিব্যাগ কুড়িয়ে পায়। মঞ্জু সততার সঙে কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগটি জমা দেয় থানায়। থানার ওসির মাধ্যমে তা মূল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সে জানতে পারে এই মানিব্যাগটি হলো মঞ্জুর স্কুেলর সভাপতির। যে মানিব্যাগে ছিল হাজার দশেক টাকা। মূলত এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মঞ্জুর সততার বীজের উন্মেষ ঘটে। উপন্যাসের শেষে দেলুর চেয়ে মঞ্জুর প্রতিই বেশি মমতা বাড়তে থাকে। মঞ্জুর ভালো ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঠকহৃদয়ে একধরনের উষ্ণ ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। তবে শেষতক মুজিবকোটের আদর্শের সঙ্গে সত্য ও সুন্দরের মিশেলে নতুন নেতৃত্বের জন্য দেলুর অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে মূলত লেখকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ছায়াপাত ঘটেছে।

 মায়াবি দৌলত উপন্যাসের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে পাঠকহৃদয়েও উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা ঘনীভূত হতে থাকে। শেষপর্যন্ত কাকে মুজিবকোটটি দেওয়া হবে! প্রায় এক যুগ পরে দেলু সন্ধান পায় তার স্বপ্নের মানুষেরÑ যার হাতে মুজিবকোটটি দিয়ে দেলু আত্মতৃপ্তি অনুভব করে।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares