ধারাবাহিক জীবনকথা : যে জীবন আমার ছিল-১ : ইমদাদুল হক মিলন

শেষ বিকেলের মনোরম আলোয় সাতটা পাখি নেমেছে বাগানে। পাখির নাম ছাতারে। আমরা বলি ‘সাতবোন পাখি’। সাতটা একসঙ্গে থাকে। হত কুচ্ছিত ধরনের পাখি। গায়ের রং মাটির মতো। বাগানে নেমেছে পোকামাকড় খেতে। আমাকে দেখে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল।

আমি আজ পুরানবাড়ির মাঠে খেলতে যাইনি। বাড়ির কিশোর ছেলেরা সবাই গেছে। মার মেজোচাচার ছেলে জাহাঙ্গীর আলমগীর, ছোটচাচার ছেলে রব মোতালেব তালেব। এদিককার মানুষজন চাচা বলে না, বলে কাকা। মেজোকাকার বড়ছেলে হাফেজ। বংশের বড় ছেলে। তার ছেলে ছানা সেন্টু মিন্টু। তারা গেছে। আমার বড়ভাই আজাদও গেছে। হেমন্তকাল শেষ হয়ে আসছে। ধানকাটা হয়ে গেছে। চারদিকে পাকা ধানের গন্ধ। খড়নাড়ার গন্ধ। ধানসিদ্ধ চলে দিনভর। হাজামবাড়ির অজুফারা এসে ধানসিদ্ধ করে, ধান ভানে। ঢেকিতে পাড় দেয় আর গান গায়। ‘ও ধান বানি লো ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া…’। আলা চাউলের কী মিষ্টি গন্ধ! চারদিকে উৎসব আনন্দ চলছে। পদ্মার চর থেকে ধান কাটতে আসা লোকগুলোকে বলে চউরা। তারা রোজ দরে ধান কাটে। ভোর রাতে উঠে ধান পাড়ায়। অর্থাৎ মলন দেয়। আমার নানাবাড়ির ঘরে ঘরে চউরা। আমাদের ঘরের চউরা লোকটির নাম ছিল আলফু। একটু চুপচাপ ভাবুক ধরনের লোক। হাতে কাজ না থাকলে নিজের নাড়কেলের হুকায় শুধু তামাক টানতো। বাগানের নিমগাছটার তলায় ধানসিদ্ধ করার জোড়া চুলা। চুলার পারে বসে উদাস হয়ে থাকত। হাজামবাড়ির পুকুরে পলো দিয়ে আলফু একবার একটা ধবধবে সাদা বোয়াল ধরেছিল। এত সাদা বোয়াল জীবনে দেখিনি। আমরা নানিকে বলি বুজি। বুজি সেই মাছ ধরলেনই না। অজুফাকে দিয়ে দিলেন। ওই বোয়াল নাকি দোষী। খেলে অনিষ্ট হবে। হাজামবাড়ির মানুষ মজা করে খেল। তাদের হলো না কিছুই।

হাজামবাড়ির ছেলে রব আর হাফিজদ্দি আমার বন্ধু। দুজনেরই চেহারা ভালো। তবে গায়ের রং ঝিমকালো, তেলতেলে। ওই বয়সেই পাঁঠার মতো শক্তি গায়ে। লেখাপড়া করে না। বাড়ির কাজকাম করে। অতি পাকনাটাইপ। দুনিয়ার সবকিছুই জানে। সারাক্ষণ ছোটাছুটি করছে, গানের গলা ভালো। রব হচ্ছে হাফিজদ্দির মেজোবোন অজুফার ছেলে। ভাগ্নে। মামু ভাগ্নের গলায় গলায় দস্তি। হাজামবাড়ির মানুষজন বুজিকে খুবই মান্য করে। বুজি তাদের প্রশ্রয় দেন। এই কারণে বাড়ির অন্য দুই শরিক, মার মেজো আর ছোটকাকা হাজামদের দেখতে পারে না। হাজামবাড়ির ছেলেদের সঙ্গে চলি বলে আমার ওপর তাঁদের ঘরের অনেকেরই বেদম রাগ।

আমি কী করব, আমার যে ওদের ভালো লাগে! পুরানবাড়ির মাঠে আমার খেলতে ভালো লাগে না। আমি একটু গাবদা গোবদা, আপনভোলা। দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি তেমন করি না। ফুটবল খেলতে গিয়ে বল পা দিয়ে ছোঁয়ার চান্সই পাই না। কেউ না কেউ কেড়ে নেয়। খেলতে ভালোও লাগে না। একদিন ছানা না সেন্টু, বড় বলে আমরা ডাকি ছানদা, সেন্টুদা, কে একজন বেদম জোড়ে কিক করল। বল এসে লাগল আমার বুক আর পেটের মাঝখানে। দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। বুজি আমার খেলা বন্ধ করে দিলেন। সবার সঙ্গে মাঠে গেলেও আমি খেলতে নামি না। মাঠপাড়ে বসে থাকি। উদাস চোখে তাকিয়ে থাকি বিলের দিকে। বিলের মাঝখানে গ্রামের গোরস্তান। গোরস্তানের বাঁশঝাড়গুলো দিনমান শন শন করে উদাসী হাওয়ায়। গোরস্তানের পশ্চিমে বিলের বাড়ি। বিশাল একটা শিমুলগাছ আকাশে মাথা ঠেকিয়েছে। চৈত্রমাসে শিমুল ফুলে লাল হয়ে যায় সেই বাড়ি। বাড়িটা পরিত্যক্ত। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদেরই সম্পত্তি। এককালে বসতবাড়ি ছিল। বিলের মাঝখানে একলা একটা বাড়ি। বর্ষাকালে রোজ রাতে ডাকাত আসতো। ডাকাতের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে লোকজন চলে এলো গ্রামের পুব-দক্ষিণ দিকে।

মেদিনীমণ্ডল বড়গ্রাম। এজন্য দুটো ভাগ করা হয়েছে। উত্তর মেদিনীমণ্ডল, দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল। আমার নানাবাড়ি দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলে। সেই গ্রামে আমি বুজির কাছে থাকি। মা বাবা ঢাকায়। জিন্দাবাহার থার্ডলেনে বাসা। বছর বছর বাচ্চা হয় আমার মায়ের। এত বাচ্চা একা কেমন করে সামলাবে? আমাকে রেখে দিয়েছে বুজির কাছে। বাড়িতে পুনুখালাও আছেন। মার ছোটবোন। আমরা ডাকি ‘আম্মা’। তাঁর স্বামী আবদুল মজিদ ঢাকায় থেকে কলেজে পড়েন আর রাজনীতি করেন। খালার দিকে ফিরেও তাকান না। টাকার দরকার হলে শ্বশুরবাড়িতে এসে বুজির কাছ থেকে নিয়ে যান।

ছেলেবেলার এই জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখেছি ‘কেমন আছ, সবুজপাতা’। জিন্দাবাহারের জীবন নিয়ে লিখেছি ‘জিন্দাবাহার’। তার পরের দুই পর্ব ‘মায়ানগর’ আর ‘একাত্তর ও একজন মা’। একাত্তর সাল পর্যন্ত জীবনের খুটিনাটি আর দুঃখ বেদনার কথায় ভরা আত্মজৈবনিক উপন্যাস।

পুরানবাড়ি মানে নোয়াব আলী নানারবাড়ি। মার একটু দূরের চাচা। একই বংশ। মেন্দা। অদ্ভুত পদবি। আর কোথাও এই পদবির কথা শোনা যায় না। দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলে তিনটা মেন্দাবাড়ি। প্রথম বাড়ি বোধহয় নোয়াব আলী নানার বাড়ি। এজন্য পুরানবাড়ি। আরেকটা বাড়ি হচ্ছে উত্তরে, খানবাড়ির পশ্চিম দক্ষিণ কোণে। সেই বাড়িকে বলে বড় মেন্দাবাড়ি। আরেকটা হচ্ছে আমার নানাবাড়ি। এই তিন বাড়ির মানুষরাই মেন্দা। সেই ছেলেবেলার একষট্টি বাষট্টি সালের পর কোলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকার একটি গল্পে ‘মেন্দাবাড়ি’ নামে গ্রামের উল্লেখ পেয়েছিলাম। এছাড়া আর কোথাও কখনও শব্দটাই শুনিনি।

আমি গিয়েছিলাম সড়কের দিকে। শ্রীনগরের ওদিক থেকে এসে এই সড়ক গেছে মাওয়ার দিকে। সড়ক কেউ বলে না। বলে হালট। সড়ক হালটের পার্থক্য বুঝি না। হাত দশেক চওড়া মাটির পথ। মানুষের পায়ের চাপে মাঝবরাবর জায়গাটা সাদা, ধুলোময়। বাকিটায় দুর্বাঘাস। হালটের দুপাশে ফসলের মাঠ, মানুষের বাড়িঘর।

নানাবাড়ি থেকে পুবদিকে এই হালট। বাড়িটা উত্তর দক্ষিণে। তিন শরিকের বাড়ি। আমার নানারা তিনভাই। বড়জন আমার নানা। তাঁর নাম আলতাবউদ্দিন সারেঙ। মেজোজন সালতাবউদ্দিন। তিনিও সারেঙ। ছোটজন ইন্তাজউদ্দিন। তিনি জাহাজের কেরানি। আমার নানাকে আমরা কেউ দেখিনি। আমার মায়ের বিয়ের আগেই তিনি মারা গেছেন। তাঁর অনেক গল্প কাহিনি মা আর আম্মার মুখে শুনেছি। বুজির মুখে শুনেছি। ছোটনানার মেজোছেলে হামিদ। হামিদমামা গল্প করতে ভালোবাসেন। তাঁর মুখেও নানার অনেক কথা শুনেছি। লম্বা ধবধবে ফর্সা, সাহেবদের মতো দেখতে ছিলেন নানা। মাল জাহাজের সারেঙ ছিলেন, জাহাজের নাম ‘জনার্দন’। কোলকাতা গোয়ালন্দ নারায়ণগঞ্জ এইসব বন্দরে যাতায়াত করত সেই জাহাজ। ‘বেলফাস্ট’ নামের একটা ব্রিটিশ জাহাজেরও সারেঙ ছিলেন। তখন তো ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’র কাল। ছোট দুই ভাইকেও জাহাজের চাকরি দিয়েছিলেন নানা। প্রথম ঘরের মেয়ের জামাইকে দিয়েছিলেন, ভাগ্নেদের দিয়েছিলেন। প্রথম স্ত্রী এক মেয়ে রেখে মারা যাওয়ার পর বুজিকে বিয়ে করেন। ছোটখাট শরীরের বুদ্ধিমতি মহিলা আমার বুজি। বাড়ির সবাই তাঁকে খুবই মান্য করত। আমার মায়ের মতো বুজিরও বছর বছর বাচ্চা হতো। বেঁচে ছিল দুই মেয়ে আর একটা মাত্র ছেলে। বড়মেয়ে আমার মা। তার নাম আনোয়ারা। বাড়ির লোক আর আত্মীয় স্বজনরা ডাকে আনু। তারপর আরেক মেয়ে, দেলোয়ারা। ডাকনাম পুনু। ‘আহুজঘরে’ (আঁতুড়ঘর) মারা যেত বুজির ছেলেমেয়ে। শুধু ছোট ছেলেটা সাত আট বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিল। তার নাম টগর। সেই অদেখা মামাটিকে আমরা টগরমামা বলে ডাকতাম। বাগানের পশ্চিম পাশের একটা আমগাছের নাম ‘বৈশাখি’ আরেকটা ‘কাউয়াঠুইট্টা’ অর্থাৎ কাকঠুঁটো। বৈশাখি নাম হয়েছে বৈশাখ মাসে ওই গাছের আম পাকতো। আর কাউয়াঠুইট্টার আমগুলোর নিচের দিকটা কাকের ঠোঁটের মতো বাঁকা। এই দুটো গাছের মাঝখানে নানা আর টগরমামার কবর। ঠাকুরবাড়ি থেকে একথাবা দূর্বাফুলের লতা এনে কবরে ফেলে রেখেছিলাম। দূর্বাঘাসের মতো যেখানে ফেলা যায় সেখানেই গজায়। বছর ভর মেরুন রংয়ের ফুলে ভরে থাকতো বাপ ছেলের কবর।

বাগানে অনেক আমগাছ ছিল। রান্নাঘরটা পুবে। তার পিছনে জোড়া জামগাছ। এই বড় বড় টসটসা জাম হতো। কেউ খেত না। বুজি জামের সিরকা বানিয়ে বোতলে ভরে রাখতেন। সেই সিরকা কী কাজে লাগতো, জানি না। বাগানের আমগুলো যে কী মিষ্টি একেকটা! একেক গাছের আম একেক স্বাদের। বড়ঘরের কারে বিছিয়ে রাখা হত আম। পাকা আমের গন্ধে ঘর ভরে থাকত। আমি আর আজাদ আম খেতে খেতে পেট ফুলিয়ে ফেলতাম।

আজাদকে ডাকি দাদা। বড়ভাইকে দাদা ডাকারই নিয়ম। এত চঞ্চল আর দুষ্টু দাদা। একটা ছাগলছানা কিনে এনেছে গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে। কিছুদিন পর জানা গেল ছাগলটা অন্ধ। বাড়ির পশ্চিম পাশে লম্বা মতন একটা পুকুর। সেই পুকুর আমাদের না। সমেদ খাঁ নানার। মার দূর সম্পর্কের মামা। আমাদের সীমানায় সমেদ খাঁ নানার পুকুরের দিকে কাঁশ টোসখোলা ছিটকি আর অচেনা আগাছার ঝোপ। সেই ঝোপে পাতা খেতে যায় অন্ধ ছাগল। কোন ফাঁকে পুকুরে পড়ে গেল। আমরা টেরই পেলাম না। দাদা তার ছাগল এদিক খোঁজে ওদিক খোঁজে। কোথাও নেই। বিকেলের দিকে ভেসে উঠল। দাদা কোলে করে তুলে আনল। সেই ছাগলছানা বুকে জড়িয়ে কী কান্না!

একটা বকের ছানা পালতো দাদা। এদিক ওদিক ওড়াউড়ি করে, ডাকলেই কাঁধে এসে বসে। হামিদমামার বড়ভাইয়ের নাম গণি। সুন্দর মার্জিত শিক্ষিত মানুষ। ঢাকায় থেকে জগন্নাথ কলেজে পড়েন। তার নামেই তাঁদের ঘরের নাম। গণিমামাদের ঘর। তাঁদের বাংলাঘর আমাদের বড়ঘরের উত্তরে। ঘরের সামনে হাসনাহেনার ঝোপ। ফুল ফোটার রাতে বাড়ি ভরে যায় মনোহর গন্ধে। ঘরের পিছনে বড় একটা তেঁতুলগাছ, দুটো কদমগাছ। ভাঙনের দিকে দুতিনটা হিজল বরুণ গাছ। বরুণ গাছকে আমরা বলি ‘বউন্না গাছ’। বর্ষাকালে রাজহাঁসের ডিমের মতো সাদা সাদা গোটা হয়। গাছগুলো জড়াজড়ি করে নেমে গেছে সমেদ খাঁ নানার পুকুরে। বর্ষার মুখে মুখে টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছে হিজলগাছে। ডিম ফুটে বাচ্চা ফুটেছে তিনটা। দাদা গিয়ে তিনটা ছানার পায়ে সুতা বেঁধে রেখে এসেছে। বড় হয়ে যেন উড়ে যেতে না পারে। সে টুনটুনি পুষবে। মাকে নিয়ে, অন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে আব্বা এসেছেন বাড়িতে। আমার পর ভাইবোন যমজ। বাদল আর পলি। বাদল বুজিকে ছাড়া থাকতে পারে না। বাদলকে বুজির কাছে রেখে যাবেন। আব্বাকে বুজি ডাকেন ‘খোকার বাপ’। আব্বা তাঁকে ডাকেন ‘মা’। দুজনে বিরাট খাতির। রান্নাঘরে একসঙ্গে বসে জামাই শাশুড়ি সংসারের গল্প করেন আর নারকেলের হুকায় তামাক টানেন। শাশুড়ি মুরব্বি। প্রথমে তিনি অনেকক্ষণ তামাক টেনে, যেখানে মুখ লাগিয়ে টানতে হয়, ফুটোর জায়গাটা, সেই জায়গা হাতের তালু দিয়ে মুছে জামাইকে দেন। অতি সমীহের ভঙ্গিতে হুকা নিয়ে টানতে থাকেন জামাই। এরকম হুকা টানাটানির ফাঁকে টুনটুনি ছানার পায়ে সুতা বাঁধার কথা আব্বাকে বললেন বুজি। আব্বা নরম মনের মায়াবী ধরনের মানুষ। শুনে চমকে উঠলেন। না না, এটা অন্যায়। আমার কাছে আমার ছেলেমেয়েরা যেমন টুনটুনি পাখির কাছে তাদের ছানারা তেমন। আমার বাচ্চাদের কেউ বেঁধে রাখলে আমার কেমন লাগবে!

বর্ষার পানি উঠে গেছে হিজলগাছের কোমর পর্যন্ত। সেই পানি ভেঙে আব্বা গেলেন টুনটুনি পাখির বাসার কাছে। ছানাগুলো বড় হয়ে গেছে। এখন ওড়ার সময়। আব্বা অতিযত্নে পায়ের সুতা কেটে দিলেন। ছানা তিনটা ফুরুৎ ফুরুৎ করে উড়াল দিল। বাড়ির ছেলেমেয়েরা আমরা সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। দাদার মন খারাপ। আদর করে আব্বা তাকে অনেক রকমের বুঝ দিলেন।

এই বাড়ির অনুপুঙ্খ বর্ণনা আছে ‘কেমন আছ, সবুজপাতায়’ আছে ‘বাঁকা জল’ উপন্যাসে।

আমাদের বড় ঘরটা ইস্টিমারের মতো। কয়েকটা কামরা আছে। অদ্ভুত অদ্ভুত নাম কামরাগুলোর। কেবিন, বারান্দা, খোপ। কেবিনটা ঘরের পশ্চিম দিকের অর্ধেক জুড়ে। পাটাতন করা। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। তারপর আরেক সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় ‘কার’ এ। কার মানে কাঠের পাটাতন করা দোতলা। রেলিং বারান্দা নেই বলে দোতলা ঘর বলা যায় না। নানা দোতলা ঘরই করতে চেয়েছিলেন। মারা গেছেন বলে করা হয়নি। মারা যাওয়ার আগে বেশ কয়েক মাস মানসিক রোগে ভুগেছেন। হাতলঅলা চেয়ার নিয়ে বাগানে থম ধার বসে থাকতেন। জাহাজে তার কর্মচারী ছিল আলী আহম্মেদ। আমার নানাকে বাবা ডাকত। নানাও তাকে ছেলে মনে করতেন। বিশ্বাস করতেন খুব। সেই বিশ্বাসী মানুষটি নানার জমানো টাকা মেরে দিয়েছিল। কত টাকা তা কে জানে! টাকার শোকে নানা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছিলেন। বড়ঘরের ছেলে টগর মারা গেল, তিনি বাগানে বসা। আমার মা দ্বিতীয় পক্ষের বড় মেয়ে। মহা আদরের। রাজকন্যার মতো অবস্থা। সেই মেয়ে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বাপকে জানাচ্ছে। শুনে তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর শোকে বুক চাপড়ে ছিলেন। মারা যাওয়ার সময় সেই সাত আট বছরের বাচ্চা ছেলে টগর মামা নাকি তার মাকে অর্থাৎ আমার বুজিকে বলেছিল, আমি যাই মা…

জীবনে দুবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছিলেন বুজি। একবার ডাকাতি হলো বাড়িতে। তখন কাঁচা টাকার চল। কয়েন। সাতশো টাকা ডাকাতরা বের করল কাঠের সিন্ধুক থেকে। তাঁর জমানো টাকা নিয়ে যাচ্ছে ডাকাতে। বুজি দিশেহারা ভঙ্গিতে ডাকাতের হাত টেনে ধরলেন। আমার টেকা কই নেও? হাতের দা দিয়ে ডাকাত কোপ দিল বুজির কপাল বরাবর। সেই প্রথম মানসিক ভারসাম্য হারান বুজি। আরেকবার হারান আটষট্টি সালে। আমি পড়ি ক্লাস এইটে। ঢাকার গ্লোরিয়া হাইস্কুলে। বুজির কাছে গিয়ে মেদিনীমণ্ডলে ছিলাম। তাঁকে নিয়ে এসেছিলাম ঢাকায়। এই ঘটনা একটু অন্যরকম করে লিখেছিলাম ‘কেমন আছ, সবুজপাতা’য়। যেহেতু আত্মজৈবনিক উপন্যাস কিছুটা কল্পনার মিশেলও ছিল লেখায়। ওই উপন্যাস চার পর্বে লেখা। মেদিনীমণ্ডলের জীবন নিয়ে ‘কেমন আছ, সবুজপাতা’ বাকি পর্বগুলো ঢাকার জীবন নিয়ে। জিন্দাবাহারের জীবন নিয়ে ‘জিন্দাবাহার’। এই নামে সৈয়দ আলী আহসানের লেখা আছে, কোলকাতার বিখ্যাত শিল্পী পরিতোষ সেনের লেখা আছে। তারপরও ‘জিন্দাবাহার’ ছাড়া আমার ওই উপন্যাসের অন্যনাম দেওয়া সম্ভব ছিল না।

পরের পর্ব দুটো গ্লোরিয়ার জীবন নিয়ে। ডিস্টিলারি রোডের উত্তর দিককার গরিব মানুষের মহল্লা ‘মুরগিটোলা’। ওই মহল্লার জীবন নিয়ে ‘মায়ানগর’। আফতাব মিয়ার বাড়িতে ভাড়ায় থাকতাম আমরা। পাগল বুজিকে নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিলাম। পাশেই একটা পুকুর। বুজি সারাদিন সেই পুকুরে নেমে বসে থাকেন আর বিলাপ করে শুধু একটা কথাই বলেন, ‘আমার পানির তল, পানির তলরে’। একদিন সেই পুকুর থেকে আর উঠলেন না। ডুবে মরলেন। ১৪ আগস্ট ১৯৬৮ সাল। আমি সেদিন ঢাকায় ছিলাম না। মুন্সীগঞ্জের দক্ষিণ দিকে দিঘিরপার। সেখানকার গ্রাম বেসনাল। আব্বার সৎমায়ের ভাইয়ের বাড়ি। অর্থাৎ আব্বার মামাবাড়ি। সেই মামার ছেলেমেয়েরা হচ্ছে আমাদের কাকা ফুফু। বাড়ির বড়ছেলের নাম মালেক, মেজো ওয়াজেদ। আমরা বলি ‘মালেক কাকাদের বাড়ি’। আমি কয়েকদিনের জন্য গিয়েছিলাম সেই বাড়িতে।

ঢাকায় ফিরে এসে বাড়িতে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাই। হাতে সস্তা রেকসিনের ব্যাগ। বুজিকে খুঁজি। মা চিৎকার করে ঘর থেকে বেরুলেন, তর বুজি তো নাই…। শুনে প্রথমে কাঁদতে পারিনি। কোত্থেকে অদ্ভুত এক কাঁপুনি এলো শরীরে। আমি থর থর, থর থর করে কাঁপতে লাগলাম।

কেন যে এই কাঁপুনি হয়েছিল!

তার পরের পর্ব ‘একাত্তর ও একজন মা’। গ্লোরিয়ার এক বাসা থেকে আরেক বাসা, আব্বার চাকরি নেই, তীব্র অভাব সংসারে তার ওপর দেশে চলছে স্বাধীনতার যুদ্ধ! আহা কী যে কষ্টের দিন! আব্বার চাকরি হারানোর কারণেই মাথাটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বুজির। নাতি নাতনিরা ছিল তার জান। এতগুলো নাতি নাতনি কী খেয়ে বাঁচবে? কী হবে তাদের? এই দুশ্চিন্তা পাগল করে দিয়েছিল মানুষটিকে।

‘বাঁকা জল’ উপন্যাসে নানাবাড়ির ডিটেলটা ছিল। বাড়ির লোকজনের কথা ছিল। বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে বাড়ি। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেত হয় পানি ভেঙে। স্রোত বইছে বাড়ির উঠানে। বাড়ির আঙিনাকে বলে ‘পালান’। উঠান পালান পানিতে ডুবছে। এসবের ভিতর দিয়ে বইছে আরেক চোরাস্রোত। জীবন জটিলতার স্রোত। সম্পর্কের স্রোত। এক যুবতীর আত্মহত্যা আর একটা সাত আট বছরের বালক সব দেখছে, শুনছে। এই উপন্যাসও এক অর্থে আত্মজৈবনিক। শুধু ওই প্রেম ও আত্মহত্যার ঘটনাটুক ছাড়া। ঔপন্যাসিক শওকত আলী জগন্নাথ কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। ভালোবাসতেন খুব আমাকে। বড় ঔপন্যাসিক। ‘বাঁকা জল’ পড়ে বুঝে গিয়েছিলেন কোথায় বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল দিয়েছেন লেখক। উপন্যাস স্যারকে উৎসর্গ করা। আমাকে ডেকে বললেন, শেষটা বানাতে গেলে কেন? সব লেখা বানাতে হয় না।

‘বাঁকা জল’ নামটা নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ থেকে। ‘চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।’ জীবনের বাঁকা জল কতদূর নিয়ে যায় মানুষকে! কোন দুর্বিপাকে ফেলে!

বাড়ি থেকে বেরুবার দুটো পথ। উত্তর দিকে ‘বাইরবাড়ি’। বাড়ির বাইরের দিককার অংশ বলে এমন নাম। আমাদের ঘর থেকে উত্তর দিকে বেরিয়ে উঠান। উঠানের দুদিকে মেজোনানা ছোটনানার ঘর, পুবদিকে মেজোনানার, উত্তরে ছোটনানার। মেজোনানার ঘর চারটা, রান্নাঘর নিয়ে। ওই দিককার দ্বিতীয় ঘরটা মেজোনানার বড়ঘর। তার পরের ঘরটা বড়ছেলে হাফেজের। বড় সংসার তার। বাপ কাকাদের নাম রাখতে পারেননি। করেন কাঠমিস্ত্রিরির কাজ। কানে কম শোনেন। ‘বাঁকা জল’ এ অনেকখানি আছে তাঁর কথা।

হাফেজ মামার ঘরের পর মেজোনানার বাংলাঘর। তারপর গরুর ঘর, গোয়াল। বেশ কয়েকটা গরু পালেন নানা। জাহাজ জীবন শেষ করে বাড়িতে আছেন। লম্বা চওড়া সুপুরুষ। গায়ের রং দুধের সরের মতো। মাদ্রাজিদের ভঙ্গিতে হাঁটুর উপর লুঙ্গি ভাঁজ করে, ঊর্ধ্বাঙ্গ খালি, নানা কাজ করছেন। গরমের দিন। নানার পিঠে তোকমা দানা ভিজিয়ে রাখলে যেমন হয় তেমন গুঁড়ি গুঁড়ি ঘাম জন্মেছে। এই দৃশ্য এখনও আমার চোখে ভাসে।

আমাদের খুব ভূতের ভয় ছিল। এই বাড়িতে ভূত আছে। ভূতকে বলা হয় ‘শকসো’। উঠানে কাপড় শুকাবার লোহার তার টাঙানো। রাত দুপুরে সেই তারে নাকি টং টং করে তিনটা শব্দ হয়। সেন্টুদাকে নিয়ে মেজোনানা হারিকেন হাতে গেছেন গরুর ঘরে। একটা গরু অসুস্থ। হারিকেন রেখে গরুর পরিচর্যা করছেন নানা, সেন্টুদা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। কোত্থেকে এল বড়সড় এক বিড়াল। হারিকেনের হ্যান্ডেলের ভিতর গলা ঢুকিয়ে সেই হারিকেন নিয়ে উধাও হয়ে গেল…। এইসব গল্প শুনে গুটিসুটি হতাম আমরা। একা এত বড় ঘরে থাকতে ভয় লাগত। মানুষ বলতে বুজি আম্মা দাদা আর আমি। ফতির মা থাকতো আমাদের ঘরে। এই বাড়ির দূরসম্পর্কের আত্মীয়া। মুখের একটা দিক পোড়া ছিল। বাড়ির আশ্রিতা। মৃগীরোগ ছিল। কুপি হাতে কাজ সারতে বেরিয়েছিল, রোগ চাড়া দিল। কুপির আগুন লেগে গেল কাপড়ে, মুখ অনেকখানি পুড়ে গেল। এই মহিলার কথাও লিখেছি ‘বাঁকা জল’ এ। তো ভূতের ভয়ে রাতে আমরা একা ঘর থেকে বেরুতাম না। কেবিনে ঘুমাতাম। হিসি লাগলে বুজি বা আম্মাকে ডেকে তুলতাম। দক্ষিণ দিককার জানালা খুলে কাজ সারতাম। আমাদের দুই ভাইয়ের নিয়মিত ওই কর্মের ফলে জানালার শিকে জং ধরে গিয়েছিল।

বাদল ছিল পেটরোগা। প্রায়ই রাতেরবেলা তার ওটা চাপতো। আমাদের পায়খানা ঘর বাগানের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে। চারকোণা ছোট্ট একটা ঘর। কাঠের সিঁড়ি আছে, ওই সিঁড়ি দিয়ে যেতে হয়। বাগানে এত গাছপালা, পায়খানার ওদিকটায় ঝোপজঙ্গল। পিছনে মিয়ারবাড়ির সীমানায় অনেকগুলো হিজলগাছ, একটা বিশাল চালতাগাছ আর বাঁশঝাড়। দিনেরবেলাই একলা যেতে ভয় লাগে। আমরা পায়খানা ঘরে ঢুকতাম না। সিঁড়িতে বসে কাজ সারতাম। পায়খানা ঘরের ভিতর, চালের দিকে দোয়েল পাখি বাসা বাঁধতো। দোয়েল পাখিকে আমরা বলি ‘দইকুলি’। সেই পাখির ডাক অনুবাদ করি ‘কেচিছেকুকিলজামানা’। কোনো অর্থ নেই। ঘোরতর বর্ষায় আর খরালিকালে (গ্রীষ্মকাল) পাঁচ সাত হাত লম্বা ‘খৈয়াজাত’ বিড়া পাকিয়ে বসে থাকতো পায়খানা ঘরের ভিতর। কে যাবে ওখানে রাতেরবেলা? বাদলের জন্য মাটির পুরানা হাঁড়ি ঘরের এক কোণে রেখে দিতেন বুজি। রাতেরবেলা ওই হাঁড়িতে কাজ সারতো বাদল। ভোরবেলা সেই হাঁড়ি নিয়ে পায়খানার ওদিকে ফেলে দিতেন বুজি। আহা রে, কোথায় হারিয়ে গেছে আমার সেই মায়াবী বুজি! কোথায় হারিয়ে গেছে আমার ভাইটি, বাদল! মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে ডায়াবেটিস থেকে হাইপো হয়ে মারা গেল। ‘বাদলের মুখ’ নামে একটা লেখা লিখেছিলাম ওকে নিয়ে। ‘প্রিয়’ উপন্যাসে আমার ভাইটির আদলে একটা চরিত্র আছে। যমজ ভাইবোন। ভাইটি চলে যাওয়ার পর বোনের মনের অবস্থা লিখবার চেষ্টা করেছিলাম।

বাইর বাড়ির দিকে কত ঘটনা। তখনকার দিনে গ্রামে গরু ছাগল মরতো বেশ। মরা গরু ছাগল যেখানে ফেলা হয়, জায়গাটাকে বলে ‘মড়কখোলা’। গৃহস্থের কুকুর বিড়াল মরলেও ওখানেই ফেলা হয়। গোয়ালিমান্দ্রা হাটের কাছে একটা মড়কখোলা ছিল। কাজির পাগলা ছাড়িয়ে গোয়ালিমান্দ্রার দিকে হেঁটে গেলে হাতের ডানদিকে পড়তো। মাওয়ার ওদিকে ছিল ‘রিশিপাড়া’। চামার মুচিদের পাড়া। গরু ছাগল মরার খবর পেলে তারা এসে পটুহাতে চামড়া ছাড়িয়ে নেয়। ছাল চামড়া ছাড়া থকথকে গরু ছাগল পড়ে থাকে মড়কখোলায়। রিশিদের মতো শকুনরাও খবর পায়। ‘শকুনের দোয়ায় গরু মরে না’ বলে একটা প্রবাদ আছে। এই প্রবাদ মিথ্যা হয়ে যেত। শকুনের দোয়ায়ই হয়তো গরু বেশি মরতো। তখন শকুনও ছিল দেশে! দক্ষিণ মেদিনীমরুলে মড়কখোলা ছিল না। মরা গরু ছাগল বিলের দিকে নিয়ে ফেলে দেওয়া হতো। রিশিরা চামড়া নিয়ে চলে যাওয়ার পর, বা তারা থাকতে থাকতেই আকাশ কালো করে নেমে আসতো শকুনের দল। মেয়ে শকুনগুলোর কেতাবি নাম ‘গৃধিনী’। আমরা বলতাম ‘গিন্নি’। খাওয়া দাওয়া শেষ করে কোনও কোনও শকুন গৃহস্থবাড়ির উঠান পালানের গাছে এসে বসতো। পিঠে মাথা গুঁজে ঝিমাতো আর কুরুৎ কুরুৎ করে বিষ্ঠা ত্যাগ করতো।

গণিমামাদের বড়ঘরের পিছনে, উত্তর দিকটায় আম জাম কদম পেয়ারার গাছ। মরা গরু খেয়ে এক শকুন এসে বসেছে ওখানকার আমগাছে। হাফেজমামার সেজোছেলে মিন্টু বেজায় দুষ্টু। বাড়ির লোকজন ছেলেপুলেদের নাম ঠিক মতন উচ্চারণ করে না। মিন্টুকে ডাকে ‘মিন্টা’। মিন্টু ফর্সা সুন্দর, চালাক চতুর। গ্রামের ভাষায় ‘টরটইরা’। মেজোনানার ছোটছেলে আলমগীর। বাড়ির লোকে ডাকে আলইম্মা। আমাকে ডাকে মিলইন্না। এই তিনজনের একটা দল ছিল আমাদের। রব হাফিজদ্দি ছাড়া মিন্টু আলমগীরের সঙ্গেও আমি চলি। সেদিন পুরানবাড়ির মাঠে খেলতে যাবো, বাইরবাড়ি থেকে মাত্র চকের দিকে নামবো, মিন্টুর চোখে পড়ল আমগাছে শকুন বসে আছে। দৌড়ে গেল গাছতলায়। গিয়ে শকুনটার লেজ বরাবর মুখ হাঁ করে বলতে লাগল, ‘ওই শকুনের পো শকুন, আমার মুখে হাই¹া দে।’ আমি আর আলমগির খিটখিট করে হাসছি। শকুনটা বোধহয় মিন্টুর কথা মান্য করল। পিঠে গুঁজে রাখা মাথাটা তুলে এনে মিন্টুর দিকে একবার তাকালো। তারপর কুরুৎ। একদম মিন্টুর মুখে। শকুনের মরাগরু হজম করা জিনিসে মিন্টুর মুখ গাল ভরে গেল। আমি আর আলম এমন চিক্কইর দিলাম, মিন্টার মুখে শকুনে হাই¹া দিছে…

মুহূর্তে সারাবাড়িতে ছড়িয়ে গেল ঘটনা। মিন্টু তখন ছুটে গেছে নতুন পুকুরের দিকে। আমার আর আলমগীরের মুখে ঘটনা শুনে মামি বেদম বকা বকতে শুরু করেছেন ছেলেকে। তাঁর একটা গাল আমার মনে আছে, ‘শয়তানের পয়দিস’। অর্থাৎ শয়তানের পয়দা। বাড়িতে তখন কী যে হাসাহাসি! বুজি ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে রেখেছিলেন। আম্মা থু করে একদলা ছ্যাপ (থুতু) ফেললেন। ছি!

হাফেজমামির ছিল আরেক কারবার। বাড়ির পুবদিককার পুকুরটা তিন নানার। পুকুরের পুবপারে রহার ছাড়া, অর্থাৎ রহিমুদ্দির ছাড়াবাড়ি। সেই বাড়ির দক্ষিণ পাশটা হাজামবাড়ি। আমাদের বাগানের পুবদিকটায় আমিনুল মামাদের বাড়ি। বাড়ির তিন শরিকের আলাদা আলাদা ঘাটলা। ঘাটলা মানে বাঁশের খুঁটি পুতে পাঁচ সাতহাত লম্বা চওড়া একটা তক্তা পাতা। ওখানে বসে ধোয়া পাকলার কাজ করে বাড়ির লোকজন। পিতলের বদনা ভরে পানি তুলে আমরা গোসল করি। এই পুকুর নিয়ে ভৌতিক সব ঘটনা আছে। পুকুরে নাকি জাহাজ বাঁধার শিকলের মতো শিকল আছে। মেজোনানার সীমানার দিকটা বেশি গভীর। ওদিকটায় থাকে সেই শিকল। সঙ্গে আছে তামার বিশাল বিশাল সাত ডেগ ভর্তি সোনাদানা, মোহর। ওদিকটায় নামলে সেই অলৌকিক শিকল প্যাঁচ দিয়ে ধরে পানির নিচে টেনে নেয়, ডুবিয়ে মারে। হাফেজমামি একদিন স্বপ্নে দেখেন সাতটা ওরকম ডেগ তাঁর ঘরের সামনে উঠে এসেছে। এসে তাঁকে বলছে, বড় পুকুরের পানিতে প্রতিদিন একঘণ্টা হাত ডুবিয়ে রাখলে এক ডেগ সোনাদানা মোহর তিনি পাবেন। এই ব্যাপারটাকে গ্রাম্য ভাষায় বলে ‘পাওয়া’। পাওয়া পাইছে বা পাওয়া পাইবো এই রকম। সারাটা ছেলেবেলা মামিকে ঘাটলার কাঠের সিঁড়িতে বসে পুকুরের পানিতে হাত ডুবিয়ে রাখতে দেখেছি। কোনও কাজ হয়নি। সংসারে তীব্র অভাব ছিল হাফেজমামার। ছেলেদের লেখাপড়া শিখাতে পারেননি। করেন কাঠ মিস্ত্রিরির কাজ। তাও সব সময় কাজ থাকে না। একটা দুটো গরু পালেন। ছেলেরা অল্প বয়সে খলিফাগিরি (দর্জিগিরি) করতে পাচ্চর, ঠাকুরগাঁ ওসব এলাকায় চলে গেছে। মিন্টু ঢাকায় গিয়ে কিছুদিন ছিল তার ফুফু সাফিয়া খাতুনের বাসায়। গাউসিয়া মার্কেট তখন মাত্র হয়েছে। সেখানকার এক জুতার দোকানে কাজ করতে চলে গিয়েছিল। থাকতো নিউমার্কেটের পশ্চিম দিককার নোংরা কাদাপানি ভরা খিতখিতে একটা মেসে। হামিদমামাও থাকতেন সেই মেসে। তিনি কাজ করেন নিউমার্কেটের নামকরা একটা থান কাপড়ের দোকানে। আমি দুয়েকবার গিয়ে হামিদমামার ওখানে থেকেছি। তখন মিন্টুকে নতুন করে যেন দেখেছিলাম। যে দোকানে সে কাজ করতো সেই দোকানের ম্যানেজার লোকটা হোতকা টাইপের। তার বোধহয় হরমোনের প্রবলেম ছিল। মেয়েলি ঢংয়ে কথা বলতো, চালচলনেও ওই ঢং। মিন্টু তার সঙ্গে থাকতো। চল্লিশ বছর বয়সের আগেই কী এক অজানা রোগে পঙ্গু হয়ে গেল মিন্টু। হাত পা কাজ করে না। অতিকষ্টে চলাফেরা করতো। ওই অবস্থায় একবার আমাদের গ্লোরিয়ার বাসায় এসেছিল। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার দেখাবে। সে-ই মিন্টুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। সেবারের বর্ষাকালে কিশোর ছেলেটাকে নিয়ে ভাঙা কোষানাওয়ে করে কামাড়বাড়ির ওদিকে গিয়েছিল শাপলা তুলতে। সংসারে অভাব। শাপলা রান্না করেও তো পেট ভরায় লোকে! শাপলা তুলতে গিয়ে খালে পড়ে গেল মিন্টু। পঙ্গু মানুষ, আর উঠতে পারলো না। কিশোর ছেলেটি অসহায় ভাবে চেষ্টা করল বাবাকে তুলতে। চিৎকার করে লোকজন ডাকলো। দেশগ্রামে কে কার দিকে অতটা মনোযোগ দেয়! মিন্টুকে তোলা গেল না। পরে লাশ ভেসে উঠেছিল ধানক্ষেতের দিকে।

এলাকার বাড়িগুলো বর্ষাকালে হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্ন একেকটা দ্বীপ। চকেমাঠে আট দশহাত পানি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতে হয় নৌকা নিয়ে। বাড়ির গরুগুলো আথালে। গৃহস্থলোক বিলের দিকে গিয়ে নৌকার ডরা (খোল) ভরে নধর নধর কচুড়ির ডগা কেটে আনে। ‘দল’ নামের একটা জলজ ঘাস কেটে আনে। গরুর খাবার। এলাকায় ছাড়াবাড়ি অনেক। ‘ছাড়াবাড়ি’ মানে যেসব বাড়ি ছেড়ে গেছে লোকে। এলাকাটা ছিল হিন্দু প্রধান। সাত চল্লিশের আগে পরে, দেশভাগের সময়, রায়টের সময় হিন্দু সম্প্রদায় বাড়িঘর ফেলে পশ্চিম বাংলায় চলে গেছে। তাদের পরিত্যক্ত বাড়িগুলো ছাড়াবাড়ি। ঝোপঝাড় ঘাস জঙ্গলে ভর্তি। বকরি (ছাগল) ভেড়া ওইসব ছাড়াবাড়িতে নৌকায় করে নিয়ে নামিয়ে দিয়ে আসে গৃহস্থরা। সারাদিন ঘাস আর আগাছা খেয়ে বকরি ভেড়াগুলো ভালোই থাকে। শুধু বড় গরুগুলোর নড়াচড়ার উপায় নেই। বাছুরগুলোও বকরি ভেড়ার সঙ্গে কখনও কখনও ছাড়াবাড়িতে চড়তে যায়। ওইসব বাড়িতে ‘চিনাজোঁক’ বিস্তর। বকরি ভেড়া আর বাছুড়গুলো ঘাস খায়, চিনাজোঁকে খায় তাদের রক্ত। গরু বরকির দেখভাল, বাড়ির বাজারহাট এইসব কাজে ব্যস্ত পুরুষরা। সকালে বেরিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর। বাড়িতে শুধু পোলাপান (বাচ্চাকাচ্চা) আর মহিলারা। এই অবস্থায় একদিন বাইরবাড়ির সামনে পচা কচুড়ির একটা ভাসমান ভিতের তলা থেকে উঁকি দিল বিষাক্ত এক খৈয়াজাত। এই সাপ পানিতে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। নিশ্চয় বাড়িতে উঠবে। আর বাড়িতে ওঠা মানে সমূহ বিপদ। কাকে না কাকে দংশাবে! জাতসাপ মানে গোখড়ো সাপ। দুই রকমের জাতসাপ দেখা যায় এলাকায়। একটা খৈয়াজাত, গেরুয়া রংয়ের ছোপ ছোপ শরীর। আরেকটা ‘কালজাত’। ঝিমকালো। সেটা বেশি পাজি। কেউ যদি এই সাপকে ব্যথা দিয়ে ফেলে তাহলে সাপ নাকি সেই লোককে অনুসরণ করে বাড়ি পর্যন্ত আসে। রাতের অন্ধকারে ঘরে ঢুকে খুঁজে পেতে ঠিক সেই লোককেই দংশায়। কোনোভাবেই এই সাপের হাত থেকে বাঁচোয়া নেই।

ছোটনানি কী কাজে গিয়েছিলেন বাইরবাড়ির দিকে। গিয়ে হঠাৎই পচা কচুরির ভিতের তলা থেকে মাথা তুলতে দেখে ফেলেন সাপটাকে। ভয়ে ভয়ে বুজিকে এসে বললেন। বাড়িতে আতঙ্ক তৈরি হলো। কী হবে এখন? বাড়িতে ‘পুরুষপোলা’ কেউ নেই। সাপটা না মারলে বিপদ!

চউরা আলফু আমিনুল মামাদের বাড়ির দিক থেকে আমাদের কোষানাও নিয়ে বাগানের কাছে ফিরেছে। বুজি তাকে বললেন, সাপ মারার ব্যবস্থা কর আলফু। শুনে ঘাবড়ে গেল আলফু। সে নরম নিরীহ ভীতু মানুষ। এই সাপ মারবে কেমন করে? বুজি বললেন, জুতি দিয়া কোপ দে।

জুতি জিনিসটাকে কোথাও কোথাও বলে ‘জুইত্তা’। টেটার চেয়ে শক্তিশালী একটা মাছ মারার অস্ত্র। বড়মাছ মারার জন্য ব্যবহার করা হয়। হাফেজমামার ঘরের বাইরে, ছনছার  (সানসেট) তলায় চালার কাছে দড়ির আংটায় একটা জুতি ঝোলানো। আলফু সেই জুতি নামিয়ে ভয়ে ভয়ে সেটা বাগিয়ে বাইরবাড়ির দিকে গেল। আমরা সবাই তার পিছনে। বাড়ির মহিলারা, পোলাপানরা। কিছুক্ষণ পর পরই ভিতের তলা থেকে মাথা বের করছে সাপ। আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আলফুর হাত চলছে না। বুজি অবিরাম তাকে ধমকাচ্ছেন। আলফু কিছুতেই জুতি ছুঁড়ে সাপটাকে গাঁথতে পারছে না। ভীতু চোখে বুজির দিকে তাকায়, সাপটার দিকে তাকায়। আমাদের চেয়ে সে-ই  যেন বেশি ভয় পাচ্ছে। যদি জুতি ছোড়ে, যদি সাপ গাঁথতে না পারে, যদি সাপ ব্যথা পেয়ে পালিয়ে যায় তাহলে তার বিরাট বিপদ। থাকে আমাদের বড়ঘরের বারান্দায়। যদি রাতের অন্ধকারে টিনের বেড়ার তলা দিয়ে ছিলছিল করে এসে ঢোকে ঘরে, যদি তাকে খায়? এই সাপ প্রতিশোধ পরায়ণ। ব্যথা পেলে আলফুকে সে ছাড়বে না। বোধহয় এই ভয়ে আতঙ্কে ভিতরে ভিতরে অস্থির সে। মুখ শুকিয়ে মরা আমপাতার মতো হয়ে গেছে। চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি। থেকে থেকে ঢোক গিলছে। পিছন থেকে অবিরাম বুজির ধমক। ধুরো, এই মেউন্নারে (মেনিমুখে, ভীতু) দিয়া কাম হইব না। সাপে কারে জানি খায়!

এ সময় নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ি আর সমেদ খাঁ নানার বাড়ির চিপা দিয়ে একটা কোষানাও এলো। নাওয়ে দুজন মানুষ। বোধহয় সীতারামপুরের দিকের লোক। বাড়ির কাছাকাছি এসে কৌতূহল হলো তাদের। কী হইছে এই বাইত্তে?

অচেনা পুরুষ দেখে বাড়ির মহিলারা মাথায় ঘোমটা দিয়েছে। বুজি সাপের কথা বললেন। লোক দুজন একজন আরেকজনের দিকে তাকালেন। একজন নৌকা বাইছে, আরেকজন বসে আছে। বসে থাকা জন উঠে দাঁড়ালো। সঙ্গীকে বলল, ল, সাপটা মাইরা দিয়া যাই। বাড়ির মাইনষে ডরাইতাছে…

ছোটনানার পশ্চিম উত্তর দিককার সীমানায় সাবধানে নাও ভিড়ালো তারা যাতে শব্দ পেয়ে সাপ পালিয়ে না যায়। দুজনেই নামলো। যে কথা বলছিল সে এসে আলফুর হাত থেকে জুতি নিল। দেন আমারে…

এত খুশি মনে জুতিটা তার হাতে দিল আলফু! যেন বিরাট আজাব থেকে সে বেঁচে গেছে। সাপটা এসময় শুকনা গোবর রঙের কচুরি পচা ভাসমান ভিতের আড়াল থেকে অনেকখানি মুখ বের করল। সঙ্গে সঙ্গে সেই লোক জুতি ছুড়ল। একবারেই কাজ সাড়া। সাপ গেঁথে গেল জুতির নালে (ফলা)। পুরো শরীর ভিতের তলা থেকে বের করে মোচড়াতে লাগল। এতক্ষণকার চাপা ধরা আতঙ্ক কাটিয়ে আমরা হাঁপ ছাড়লাম। সবার মুখে হাসি, আনন্দ। লোকটাকে মনে হচ্ছে বীর। তার মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। মহিলারা কৃতজ্ঞ চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। আমরা কোলাহল করছি। তবে তখনও কাজ বাকি। এখন কী হবে?

সেই লোক আমাদের সাবধান করল। সবারই পিছিয়ে যেতে হবে। কারণ সে জুতিটা এখন টেনে আনবে। ডাঙায় তুলে পিটিয়ে মারবে সাপ। আলফুকে বলল লাঠি আনতে। ছুটে গিয়ে উঠানের দিক থেকে শক্ত, হাত পাঁচেক লম্বা লাঠির মতো এক টুকরা কাঁচাবাঁশ নিয়ে এলো সে। সেই লোকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজেই আমাদের আগে সরে গেল। আলফুর কারবার দেখে মহিলারা মুখে আঁচল চেপে হাসছে। বুজি তাকে আবার একটা ধমক দিলেন। ধুরো মেউন্না…

লাঠি নিল দ্বিতীয়জন। প্রথমজন লুঙ্গি কাছা মেরে পানিতে নামল। সাপ গাঁথা জুতি সাবধানে টেনে আনতে লাগল। অন্যজন লাঠি বাগিয়ে প্রস্তুত। আমরা দূরে দাঁড়িয়ে দম বন্ধ করে আছি। জুতিতে গাঁথা সাপ আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিজেকে ছাড়াবার। কিছুতেই পারছে না। কারণ গেঁথেছে এমন ভাবে, জুতির ধারালো বাঁকা নাল সাপের গলা মাথা এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলেছে।

ডাঙায় তোলা হলো সাপ। বাপরে, বিরাট লম্বা। ছয়সাত হাতের কম হবে না। জাহাজের কাছির মতো মোটা। সেই সাপ অনেকক্ষণ ধরে নানান কায়দায় পিটিয়ে মারা হলো। কাজ সেরে লোক দুজন বীরের ভঙ্গিতে চলে গেল। তখন এগিয়ে এলো আলফু। এসে নতুন এক তথ্য দিল। এই সাপ মরেও মরে না। এজন্য পিটিয়ে থেঁতলা বানিয়ে ফেললেও আগুনে পোড়াতে হয়। না হলে আবার জীবিত হবে, যাকে পাবে তাকেই দংশাবে। বুজি বললেন, তাইলে পোড়া!

আমাদের ঘর থেকে কেরোসিন নিয়ে এলো আলফু। খড়নাড়া আর শুকনা পাতা প্রচুর পরিমাণ রাখলো মরে ভর্তা হয়ে যাওয়া সাপের ওপর। ম্যাচের কাঠি জ্বেলে ফেলল সেই স্তূপে। খৈয়াজাত পুড়তে লাগল। খানিকপর সাপপোড়া এমন গন্ধ! আমরা নাকমুখ কুঁচকে ফেললাম। আলফুর মুখে বিস্তীর্ণ হাসি।

চরের বাড়িতে আলফু কমই যেত। সংসারে কে কে ছিল তার বুজি বোধহয় জানতেন। আমরা জানতাম না। বছরে একবার দুবার সে বাড়ি যেত। বেশিদিন থাকতো না। দশ বারোদিন, পনেরো দিন। পদ্মার কোন পাড়ে বাড়ি, কীভাবে বিশাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে যেতে হয় তাও জানতাম না। একবার বািড়ি গিয়ে আলফু আর ফিরছেই না। বর্ষার শেষ দিকে গেল, শরৎ হেমন্ত পার হয়ে গেল, প্রায় চার পাঁচ মাস। ভাদ্র আশ্বিন কার্তিক অঘ্রাণ, আলফু ফিরছে না। বাড়িতে কত কাজ বুজির। বর্গা দেওয়া জমির ধান হিসাব করে ঘরে তোলা, জমিতেই ধান ভাগ করে ফেলে কোনো কোনো জমির বর্গাদার, সেই ধান কেটে আনা। কী করে এসব হবে, কে করবে কাজ? আলফু বাঁধা কামলা। সব জানে বোঝে। তাকে খবর দেওয়ারও বোধহয় চেষ্টা করা হলো। খবর পাওয়াই গেল না। তখনকার দিনে কার বাড়িতে কোন চরের লোক এসে থাকে কে অত খবর রাখে?

আলফু হঠাৎ করেই একদিন ফিরে এলো চৈত্রমাসের দিকে। চকেমাঠে তখন খাঁ খাঁ রোদ। জমিতে হাল পড়েছে অনেক আগে। মাটির চাকা (ডেলা) চিৎকাত হয়ে আছে জমিতে। চৈত্রের রোদে শুকিয়ে ইটের চেয়েও শক্ত হয়েছে। ইটামুগুর দিয়ে সারাদিন গিরস্থলোক সেই চাকা ভেঙে পাইট (পটি) করে। বৃষ্টি নামলেই মাটি হবে মোলায়েম। আমনের বীজ ফেলা হবে জমিতে। বাড়ির পশ্চিম উত্তর কোণে বিরাট এক জমি আমাদের। সেই জমি মন্নাফ মামাকে বর্গা দেওয়া হয়। সেবার বোধহয় বর্গা দেওয়া হয়নি। বুজি নিজেই লোক দিয়ে করাবেন। বুদ্ধিমতি কর্মঠ মহিলা। হাল দেওয়া হয়ে গেছে। এখন ইটামুগুরের কাজ। সেই কাজ করবার লোক খুঁজছেন। এসময় আলফু এসে হাজির। কিন্তু লোকটাকে দেখে আমরা হতবাক। একেবারেই অন্যমানুষ। চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, ভরাট মুখ ভেঙেচুরে একাকার। রোদে যেন আরও পুড়েছে। একেবারে পোড়াকাঠ। রোগা লিকলিকে। ময়লা নোংরা সবুজ রঙের লুঙ্গি পরা। গায়ের পিরনের রং বোঝাই যায় না। পুরনো আরেকটা লুঙ্গিতে গাট্টি বেঁধে নিজের কাঁথা বালিশ নিয়ে এসেছে। নাড়কেলের হুকাটা চিকন দড়িতে ঝুলছে গাঠঠির সঙ্গে। এলো দুপুুরের পর পর। কিন্তু কারও সঙ্গে কথা বলে না। বুজি আম্মা ফতির মা কতজন কত কথা জিজ্ঞেস করে, আলফু কথাই বলে না। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে আলফুকে দেখি। ফতির মা ভাত দিল। আলফু চুপচাপ গোসল করে এসে খেতে লাগল। ভাত খেয়ে নিমতলায় বসে নিজের হুকায় তামাক খেল। রাতেরবেলা বুজি তাকে কাজের কথা বললেন। আলফু শুনলো। সকালবেলা ইটামুগুর নিয়ে কাজেও গেল। কিন্তু মুখে কথা নেই। কয়েকদিন পর রোজা শুরু হলো। আলফু রোজা রাখে সব সময়। সেবারও রাখলো। রোজা রেখে ইটামুগুর চালাবার মতো কঠিন কাজ সে করে যাচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার হলো চৈত্রমাসের গরমেও তার গায়ে খয়েরি রঙের একটা চাদর থাকে। একে কথা বলে না, গায়ে শীতের চাদর জড়িয়ে ইটামুগুর চালায়, রোজাও রেখেছে, বুজি আম্মা ফতির মা, বাড়ির অন্য মহিলারা সবাই আলফুকে নিয়ে ভাবে। ছোটনানা দেশে নেই। জাহাজের চাকরিতে কলকাতায়। মেজোনানা আছেন, হামিদ মামা ননি মামারা আছেন। সবাই আলফুকে খেয়াল করে। নানা রকম চেষ্টা করে কথা বলানোর, বলাতে পারেন না। একদিন আরেক অদ্ভুত ব্যাপার আবিষ্কার হলো। বড়ঘরের পশ্চিম দক্ষিণ কোণায় সমেদ খাঁ নানার পুকুরের দিকে ঝুঁকে আছে বাঁকা একটা আমগাছ। গাছটা ফজলি আমের। বড় বড় ফজলি আম হয়। পাকলে ভারি সুগন্ধ কিন্তু খাওয়া যায় না। চুকা (টক)। এজন্য ওই গাছের আম পাকানো হয় না। সাইজ মতো হলেই আমরা পেড়ে আনি। বুজি মুরব্বা দেন। সেই আমগাছটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন আম্মা। দাঁড়িয়ে ক্ষেতের দিকে তাকিয়েছেন। দেখেন আলফু ইটামুগুর চালাতে চালাতে হঠাৎই থামলো। লুঙ্গির কোচর থেকে কী যেন বের করে মুখে দিল। ঘটনা কী? আলফু তো রোজা রেখেছে! রোজা কি ভেঙে ফেলল?

বুজিকে ডাকলেন আম্মা। ঘটনা শুনে বুজিও দাঁড়ালেন। তাকিয়ে রইলেন ক্ষেতের দিকে। এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সব। কিছুক্ষণ পর আবার একই কারবার করল আলফু। বুজি আম্মা দুজনেই ভাবলেন আলফু বোধহয় রোজা ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু খায় কী? কী নিয়ে গেছে লুঙ্গির কোচরে?

রোজার দিনের রান্নাও দুপুরে হয়ে যায়। বুজি আম্মা ভাবলেন আলফু যেহেতু রোজা ভেঙে ফেলেছে, দুপুরে তাহলে খেতে আসবে। না, আলফু এলো না। ক্ষেতের ধারে বসে নামাজও পড়তে দেখা গেল তাকে। সন্ধ্যাবেলা ইফতার করল। বাড়ির সবাই অবাক! ব্যাপারটা কী? তিন-চার দিন দেখা গেল এরকম দৃশ্য। বাড়ির সবাই দেখল। পাঁচ সাত দিনের মাথায় একদিন সকাল থেকে আলফু আর নেই। নেই তো নেই। কোথাও নেই। উধাও হয়ে গেছে। থাকতো আমাদের বারান্দায়। বারান্দা মানে একটা কামরাই। দরজা জানালা আছে। ভোরবেলা দেখা গেল দরজা খোলা, আলফু নেই। তার জামাকাপড় সব আছে শুধু গায়ের চাদরটা নেই। প্রথমে বাড়ির কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। ভেবেছে এদিক ওদিক গেছে কোথাও। সময় মতো এসে ইটামুগুর নিয়ে ক্ষেতে যাবে। বেলা হয়ে যায়, আলফু ফেরে না। ফেরে না তো ফেরেই না। সেই যে উধাও হয়ে গেল মানুষটা, আর ফিরে এলো না। কোথায় যে গেল? কোনো খবরই আর কোনো দিন পাওয়া গেল না। তারপর থেকে কতদিন আমি আলফুর কথা ভেবেছি। সারাটা ছেলেবেলা আমার কেটেছে আলফুর কথা ভেবে। এখনও হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়। উধাও হয়ে যাওয়া সেই মানুষটির রহস্য এই জীবনে আর উন্মোচিত হলো না।

আমাদের যে জমিটায় ইটামুগুর দিয়ে মাটি ভাঙতো আলফু, বর্ষায় সেই জমিতে আটদশ হাত পানি হতো। আমন ধান সবুজ হয়ে আছে পানির ওপর। জমির আল অনুমান করে সেই বরাবর ‘দোয়াইর’ (চাঁই) পাততো দাদা। পরদিন দোয়াইর তোলার সময় পানির তলা থেকে ‘ইচামাছের’ (চিংড়ি) ছট ছট শব্দ আসতো। ভোরের আলো তখন মাত্র ফুটছে। চারদিকে বর্ষার পানি রঙের আলো। এখন জায়গাটার দিকে তাকিয়ে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না ওখানটায় আটদশ হাত পানি হতো বর্ষায়। দিনের বেলাও, বিশেষ করে দুপুরের পর এমন নির্জন হতো ক্ষেতটা! ক্ষেতের পশ্চিম দক্ষিণে নোয়াব আলী নানার ছাড়াবাড়ি। সেই অর্থে বাড়িটাকে ছাড়াবাড়ি বলা যাবে না। আসলে বাড়িটায় ঘরদুয়ার নেই। কেউ থাকে না। মালিক হচ্ছেন নোয়াবআলী নানা। বাড়িটায় নানা রকম গাছ। কতগুলো বিশাল বিশাল আমগাছে অন্ধকার হয়ে আছে। সেই নির্জনতার দিকে তাকালেই ভয় লাগতো আমার। একা কোনো দিনও ওদিকটায় যাইনি। চৈত্রমাসের দুপুরবেলা হাওয়ার ঘূর্ণি উঠতো ক্ষেতটার ওইদিকে। এই ঘূর্ণিকে এলাকায় বলে ‘বানাডুলি’। আসল শব্দটা বোধহয় ‘বানকুড়ালি’। খুবই কাঁচা হাতে ‘বানকুড়ালি’ নামে একটা গল্প লিখেছিলাম। বানাডুলি না বানকুড়ালি আসলে নাকি হাওয়া না। দিনের আলোয় মাঠের ওপর দিয়ে  তেনারা যখন চলাফেরা করেন তখন নাকি এরকম হয়। ওই জিনিস দেখলেই বুকে থুতু দিতাম আমরা। মানুষের থুতুর গন্ধে তেনারা নাকি কাছে আসেন না। চৈত্রমাসের বানাডুলি ওড়া সেই ক্ষেত এখন ‘ছেলেবেলা’ নামে বাড়ি। এলাকাটাই চেনা যায় না। পাকা রাস্তা চারদিকে। সুন্দর সুন্দর বাড়ি। গাড়ি ছুটছে এদিক ওদিক। পুবদিকে চারলেনের মহাসড়ক। ঢাকা থেকে সোজা এসে পদ্মাসেতু পার হয়ে চলে গেছে দক্ষিণ বাংলায়। সেই ষাট বাষট্টি সালে এই অবস্থা কেউ কল্পনাও করেনি। যেখানে চারলেনের রোড ওই জায়গায়ও আট দশহাত পানি। বর্ষাকালে ‘টিকারা’ (কাড়া, নাকাড়া ধরনের) বাজিয়ে গয়না নৌকা যায় পদ্মার দিকে, ঢাকার দিকে। গভীর রাতে গয়না নৌকার টিকারার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যেত। মনে হতো এরকম এক গয়না নাওয়ে করে আব্বা আসবেন কোনো একরাতে। সেই নাও থেকে তাঁর ডাক শুনে হাজামবাড়ির আজিজ মজিদ বা তাদের বড়ভাই আবদুল আব্বাকে গিয়ে ডিঙি নৌকায় করে বাড়িতে নিয়ে আসবে। আব্বা ওভাবে কোনো দিন আসেননি। তবু আমি তাঁর অপেক্ষায় থেকেছি।

তখনকার দিনের বর্ষাকালগুলো যে কী লম্বা ছিল, কী যে একঘেয়ে ছিল! সাত-আট দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে তো হচ্ছেই! সারাদিন, সারারাত। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চকমাঠের পানি। বাড়ির উঠান পালান ধীরে ধীরে ডুবছে। ঘর থেকে বেরুবার উপায় নেই। ফতির মাকে নিয়ে বুজি রান্নাঘরে গিয়ে রান্নাবান্না করছে। কী একটা ‘বাগার’ দিয়েছে। সেই গন্ধ ভাসছে বৃষ্টি ভেজা বাতাসে। টিনের চালায় ঝমঝম শব্দ, গাছের পাতারা বৃষ্টিধোয়া হচ্ছে। আমি উদাস হয়ে বসে আছি কেবিনের জানালায়। ঘরটাকে মনে হচ্ছে বড় একটা খাঁচা। কয়েকটা কামড়া আছে সেই খাঁচায়। এক কামড়া থেকে আরেক কামড়া পর্যন্ত চলাফেরা করা যায়। কোনো কোনো সময় পুরো বাড়িটাই আমার কাছে বিশাল এক খাঁচা। চাইলেই বাড়ির বাইরে, খাঁচার বাইরে যাওয়া যায় না। বৃষ্টির জোর যে রকম, বর্ষার পানি এবার ঘরে ঢুকবে। আমার দিন কাটে না, রাত কাটে না। মনটা উদাস হয়ে থাকে।

দশ এগারোদিন পর একদিন দুপুরের পর বৃষ্টি থেমেছে। বিকেলের মুখে একটুখানি রোদও উঠল। বাড়ির গাছপালা আর টিনের চালায় পড়েছে রোদ। ভিজা উঠান আঙিনায় পড়েছে। ঘর থেকে বেরিয়ে বাইর বাড়ির দিকে গেছি। ওদিকটায় হাফেজ মামার কোষা নৌকা বাঁধা। আমি গিয়ে হামেদ মামাদের কদমগাছটার তলায় দাঁড়িয়েছি। পায়ের দুতিন হাত দূরে বর্ষার পানি। পানিটা এত পরিষ্কার, তলায় তেঁতুল বিচি পড়ে থাকলেও দেখা যাবে। হঠাৎ দেখি দূর থেকে বেশ বড় একটা মাছ আনমনা ভঙ্গিতে আমার দিকে আসছে। একটা নলামাছ। নলামাছ সাধারণত পারের দিকে আসে না। শোল গজার টাকি বোয়াল এইসব মাছ আসে কেঁচো খেতে। নলা জাতিয় মাছ আসে না। এই মাছটা বোধহয় পথ ভুল করে এসেছে। পাড়ের কাছাকাছি এসে এদিক ওদিক একটু ঘুরে লেজ নাড়াতে নাড়াতে ফিরে গেল। সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো, আমি কেন মাছ হইনি! ওই নলামাছ যদি হতাম তাহলে বর্ষার পানিতে সাঁতার কেটে যেদিকে ইচ্ছা চলে যেতাম। এই ভেবে ওরকম আলোকিত বিকেলবেলাটায়ও আমার মন ভার হয়ে থাকলো।

বাইর বাড়ির দিকটায়, বাড়ির ঘাটে এসেছে বর্ষার নতুন পানি। বাড়ির পোলাপান সেই পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করে। দুপুরের মুখে হৈ চৈ আর আনন্দ। গোসল করার উৎসব যেন। কেউ সাঁতার দিয়ে একটু দূরে চলে যাচ্ছে, কেউ ডুব দিয়ে ফিরে আসছে। আমি সাঁতার জানি না। কোমর পানিতে নেমে দাঁড়িয়ে থাকি। ডুব দিতে পারি। ডুব দেই কাকপক্ষির ভঙ্গিতে। দেখে একদিন ছানদা না সেন্টুদা যেন আমাকে বলল, আয় তরে সাতর শিগাই। আমি একটু ভয় পাচ্ছিলাম, একটু না না করছিলাম। সে শুনলো না। দুহাত মেলে আমাকে উপুড় করে শোয়ালো হাতে। একটা হাত বুকের কাছে, আরেক হাত উরুর কাছে। এবার হাত পাও লাড়… আমি টাবুর টুবুর করে হাত পা নাড়তে লাগলাম। মুখে পানি নিয়ে ফুরুক করে ছুড়ে ফেললাম। এই ফাঁকে মানুষটা আচমকা আমাকে ঠাঁই (থই) না পাওয়া পানির দিকে ছুড়ে দিল। যা, ওহেন থিকা সাঁতরাইয়া আয়…

আমি যেন অথৈজলে পড়লাম। হাত পা নেড়ে, কয়েক ঢোক পানি খেয়ে দিশেহারা ভঙ্গিতে ডুবে যেতে যেতে ভেসে উঠলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। যদি সাঁতরাতে না পারি, যদি ডুবে যাই তাহলে আমাকে টেনে তুলবে।

আমি পারলাম। দুতিনবার ডুবে যেতে যেতে আমি ভেসে উঠলাম। অপটু হাত পা নাড়িয়ে সাঁতরে পারের দিকে ফিরতে লাগলাম। সবাই খুশি। এই ত্তো মিলু সাতর শিখ্খা হালাইছে…। সেই মুহূর্তে পারের দিকে আসা নলা মাছটির কথা আমার মনে হয়েছিল। আমি যদি মাছ হতাম! আমি যদি মাছের মতন সাঁতার কেটে চকমাঠের যেদিকে ইচ্ছা চলে যেতে পারতাম! একবিল ছাড়িয়ে চলে যেতে পারতাম আরেক বিলে! একগ্রাম ছাড়িয়ে চলে যেতে পারতাম আরেক গ্রামে!

ছেলেবেলায় আমি মাছ হতে চেয়েছি, পাখি হতে চেয়েছি।

[চলবে]

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares