ভ্রমণ : মাকোলা মার্কেট : মঈনুস সুলতান

গেকে। ট্যাক্সিতে ঘুরে বেড়ানো ব্যয়বহুল, এতে সহযাত্রীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না, অজানা নগরীতে সারাক্ষণ ট্যাক্সিতে ঘুরপাক করলে কেমন জানি নিঃসঙ্গ লাগে। তাই খানিক খোঁজখবর নিয়ে আজ আক্রা নগরীর রাজসড়কে বেরিয়েছি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ইস্তেমালের প্রয়াসে। যেতে যেতে অনুভব করি, গেল রাতে নগরীর একটি পর্যটকপ্রিয় স্পট স্কাই-বারের কার্নিশ ছোঁয়া ব্যালকনিতে আলাবোলা হাওয়ায় দাঁড়ানো, তারপর অবলোকন করা আক্রা নগরীর নিশিরাতের দৃশ্যপট, এ তাজা স্মৃতি যেন মথিত হচ্ছে করোটিতে। বুঝতে পারি, কেন আমার এক সুহৃদ- অত্র এলাকায় পর্যটনে পরিপক্ব পুরুষ ফ্রেড শ্যাংম্যান রাতের আক্রাকে ‘জো ড্রপিং নাইট ভিউ ’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। ঘানার রাজধানী আক্রা নগরীর আশপাশে আছে রোমান্টিক কেতার নিসর্গ নন্দিত বিস্তর সিনিক ভিউ। এ যাত্রায় আমার হাতে সময় কম, উপরোন্তু নতুন কোনো দেশে বেড়াতে গেলে হাটবাজারে ঢুঁ মারা আমার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেনাকাটার তেমন কোনো এজেন্ডা নেই, তবে বাজারে একবার যেন আমার যাওয়া চাই-ই। ফ্রেড আক্রা নগরীতেই হালফিল দিনযাপন করছেন। তিনি মাকোলা মার্কেট নামে তামাম ওয়েস্ট আফ্রিকায় মশহুর বাজারটিতে আমার সঙ্গে মোলাকাত করতে রাজি হয়েছেন। কীভাবে ভিড়সংকুল জনসমুদ্রে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেভিগেট করতে হবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরামর্শও টেক্সট মারফত পাঠিয়েছেন। তা ভরসা করে আমি মেলা দিয়েছি বাসস্টপের উদ্দেশে।

আক্রায় স্বল্প ব্যয়ে ঘোরাফেরা করার প্রধান অবলম্বন হচ্ছে ত্রো-ত্রো নামে এক ধরনের মাইক্রোবাস। আন্দাজ করেছিলাম, বাসস্টপে ভিড়ভাট্টা হবে হাসরের ময়দানের মতো প্রাণান্তকর। কিন্তু রিল্যাক্স পরিবেশ দেখতে পেয়ে রীতিমতো নাজাত লাভের অনুভূতি হয়। মাত্র দুখানা ত্রো-ত্রো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্রেফ ঝিমাচ্ছে। তাদের ছায়ায় কুটিচৌকিতে বসে কালিঝুলি মাখা মেকানিকরা কড়ির দান ফেলার কায়দায় বোর্ড গেম খেলছেন। এ খেলাটির নাম মানচালা, আফ্রিকার সর্বত্র সহস্র বছর ধরে লোকনন্দিত এ খেলাটিতে দান ফেলার সাথে সাথে বাজি ধরার ব্যাপার আছে। তবে বাজি ছাড়া মানচালা হলে তাতে প্রচুর হাসিঠাট্টা হয়। এখানেও মনে হয় চলছে জমজমাট খিস্তি খেউড়। আমার সাথে চোখাচুখি হতেই একজন খেলায় বিরতি দিয়ে বেজায় রকমের ফকফকে সাদা দাঁতে হেসে বলেন, ‘আকওয়াবা’ বা ‘ওয়েলকাম।’ আমি মাকোলা মার্কেটে যেতে চাচ্ছি, জানতে পেরে তিনি আনন্দে উথলে ওঠে পরিষ্কার ইংরেজিতে বলেন, ‘ইউ আর গোয়িং টু ফাইন্ড সামথিং রিয়েলি ম্যাজিক্যাল,’ যাদুটোনার কোনো দ্রব্যাদি খরিদ করার আমার কোনো বাসনা নেই, তবে মানচালা খেলনেওয়ালার উষ্ণ সম্ভাষণে অ্যায়সা মুগ্ধ হই যে, মনে মনে ভাবি, ঘানায় বসবাস করতে পারলে কেমন হয়? মাইক্রোবাস দুটি সাজসজ্জায় একটির চেয়ে আরেকটি অধিক বর্ণবহুল। রঙচঙা একটি বাহন যাচ্ছে মাকোলা মার্কেটের দিকে। আমি তাতে উঠে পড়ে বুঝতে পারি, এ দেশে প্যাসিঞ্জারের সত্যি আক্রা যাচ্ছে! সিটগুলো শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে। ড্রাইভার তার অবসর সময়ের ব্যবহার করছেন অতীব সৃজনশীল কায়দায়। তিনি রিয়ার ভিউ মিররের দিকে নজর রেখে, প্লাস্টিকের রেজার ব্লেডে ক্রিম-ট্রিমের তোয়াক্কা না করেই কামিয়ে নিচ্ছেন দাড়ি।

বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে মনোটনিতে বিরক্ত হই। চোখ মুদে মেডিটেশন করব কিনা ভাবছি, তখনই খেয়াল হয়, পায়ের ঘণ্টা-জোকা সফেদ লেবাস পরা এক পুরুষ সামনের সিটে বসে গোল্লা সাবানের মতো ঢেলা ব্যবহার করে তায়াম্মুম সেরে নিচ্ছেন। তিনি বসে বসে ইশারায় সম্ভবত কাজা নামাজ আদায় করতে শুরু করেন। পাশে বসে তার নেকাব পরা পত্নী ছিদ্রের জালি দিয়ে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে দেখছেন ভিডিও। তখনই আমার সুহৃদ ফ্রেডের কাছ থেকে আসে টেক্সট। জানতে পারি, ঘানার নাগরিক সমাজ কমছে-কম দুইশত পঞ্চাশটি গোত্রে বিভক্ত। এদের প্রত্যেকেরই আছে স্বতন্ত্র ভাষা। প্রতিক্রিয়ায় আমি জানাই, এসব আয়ত্ত করতে হলে নিদেনপক্ষে ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের মেধা থাকা চাই। ফ্রেডের প্রয়াত পিতা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কর্মকর্তা। সে সুবাদে তিনি শৈশবে বছর দুয়েক কলকাতায় কাটিয়েছেন, বাঙালিদের সংস্কৃতি নিয়ে তার আগ্রহ আছে, তিনি বেশ কতগুলো বাংলা শব্দ নির্ভুলভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সুনীতি বাবুর সুনাম ও পেশা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। ফের টেক্সট আসে, ফ্রেড ভরসা দিয়ে জানান, আক্রায় ঘোরাফেরার জন্য জবরদস্ত ভাষাবিদ হওয়ার আদৌ কোনো জরুরত নেই। এক জামানার ব্রিটিশ কলোনিটিতে নাগরিকরা ইংরেজিকে লিংগুয়া ফ্রাংকা হিসেবে ইস্তেমাল করছেন। তবে জনসংখ্যার নিরিখে প্রধান গোত্র আকানদের ভাষা ‘তুয়ি’ হাটবাজার ও বাস-ট্রাকে বেশি চলে। তুয়ি জবানের দু-চারটি শব্দ ও বাক্য মশকো করে নিতে পারলে পরিস্থিতি সামলাতে সুবিধা হয়। তিনি ইন্টান্যাট থেকে কিছু ‘ইউজফুল ফ্রেইজেজ’ বা দরকারি বাক্য ও বাগবিধি কপি করে আমাকে পাঠান। ত্রো-ত্রোতে বসে একটি বিদেশি জবানের কিছু বাক্য আমাকে হেফ্জ করতে হবে, পরামর্শটি লাগসই হলেও আমি ক্লান্তবোধ করি।

ফ্রেড তার পছন্দসই মানুষজনকে হাতে-কলমে মদদ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ২০০৯ সালের দিকে আমরা কাবুল শহরে মাস কয়েক পাশাপাশি কামরায় বাস করেছিলাম। আমি হাইয়ার এডুকেশন প্রজেক্টের তরফে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ অ্যাডভাইসার হিসেবে কাজ করছিলাম। বয়স ও অভিজ্ঞতার নিরিখে আমার সিনিয়র সহকর্মী ড. ফ্রেড শ্যাংম্যানের দায়িত্ব ছিল কারিকুলাম উন্নয়নের সহায়তা দেওয়া। কাবুলে আমার দিনাতিপাত কখনও সখনও ছিল জগৎ-সংসার থেকে দারুণভাবে বিচ্ছিন্ন। তখন তিনি ইন্টান্যাটে স্কাইপ ব্যবহার করার বিষয়টি আমাকে শেখান। সে দিনগুলোতে হরহামেশা শোনা যেত গোলাগুলির আওয়াজ, বিদেশ থেকে আফগানিস্তানে কাজ করতে আসা পেশাদাররা মাঝেমধ্যে শিকার হতেন সন্ত্রাসবাদী রেইড বা চোরাগোপ্তা কিডন্যাপিং জাতীয় তৎপরতার। এ পরিস্থিতির সরাসরি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় আমাদের মতো কনসালট্যান্টদের মধ্যে পানপ্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল মারাত্মকভাবে। কাবুল শহরে ফরাসি কিংবা ইতালিয়ান ওয়াইন সবসময়ই দামে ছিল দুর্মূল্য,  কোনো কোনো সময় মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সরবরাহের চোরাই পথে কিছু ডিসরাপ্ট হলে, মূল্য গিয়ে ঠেকতো বোতলওয়ারি এক শত থেকে দেড়শ ডলারের মতো। তখন খরাতাড়িত উপত্যকায় জলসংকটের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। এ ধরনের পানীয় সংক্রান্ত কাহাতের সময় ফ্রেড ঠাণ্ডা মাথায় হাল ধরেছিলেন। তিনি কীভাবে যেন আমদানি করে বসেন গৃহে বসে ওয়াইন প্রস্তুতের একটি ছোটখাট প্ল্যান্ট। কাবুলে আঙ্গুরের কোনো সংকট ছিল না। তাই তার বসার কামরাটি হয়ে উঠেছিল কুটিরশিল্পের আস্তানার মতো। প্ল্যান্টে দ্রাক্ষার পরিশোধিত তরলটি তিনি বিক্রি করতেন না, তবে তা দিয়ে মেজবানির ইন্তেজাম করতেন হামেহাল।

ফ্রেডের বিষয়-আশয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলাম, চেঁ বেঁ বেঁ শব্দে চমকে ওঠি! দেখি  হেডমিসট্রেসের মতো চশমাচোখে এক প্রৌঢ় প্যাসিঞ্জার উঠে এসে বসছেন পাশের সিটে। মহিলার হাতে বিরাট আকারের একটি ঝুড়ি, তাতে ছলবলিয়ে চেঁ বেঁ করছে গোটা তিনেক সদ্য বিয়ানো ছাগলছানা। আমি ভ্রমণলেখক, আক্রার ত্রো-ত্রোতে গণ্ডার কিংবা কুম্ভীরের বাচ্চার সাক্ষাৎ পেলে জমিয়ে লিখতে পারতাম, ছাগলের বাচ্চাগুলো আরেক দফা আওয়াজ ছাড়ে, আমার কপালে করাঘাত করতে বাসনা হয়। কন্ডাকটার ছাগলওয়ালির কাছে কী যেন জানতে চান, মহিলা নো ননসেন্স ভঙ্গিতে কপাল কুঁচকে জবাব দেন, ‘উও বে জে সেন?’ একটু আগে ফ্রেডের পাঠানো টেক্সটে লবজটি পড়েছি, এর মর্মাথ যে ‘ভাড়া কত’ তা বুঝতে পেরে লাটারি হিট করার মতো অনুভূতি হয়। মহিলা খুঁতি থেকে প্রচুর পরিমাণে রেজকি পয়সা বের করে কয়েনগুলো গুনতে শুরু করেন। তখনই খেয়াল হয়, সামনের সিটে বসে পড়েছেন বিরাট বপু আবলুশ কাঠের মতো কালো এক ব্যক্তি। তার মুণ্ডুটি পালিশ করে কামিয়ে সাদা পেইন্ট জাতীয় কিছু মাখার ফলে তাতে ছড়াচ্ছে অস্ট্রিচ পাখির আন্ডার মতো চকচকে আভা । আমার দৃষ্টিপাতে বোধ করি সচেতন হয়ে ঘানার এ নাগরিক রক্তাভ চোখে তাকিয়ে ভিরিঙ্গি দেন, আমি আঁতকে ওঠি, ভাবভঙ্গিতে উনার পাগল হওয়ার সম্ভাবনা সমধিক। মানুষটি কেন জানি বিলা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সিটের হাতলে চাটি মেরে চেঁচিয়ে ওঠেন ‘কাওয়াবেনা কাওয়াবেনা’। ড্রাইভার ও কন্ডাকটার ছুটে এসে বুঝিয়ে সুজিয়ে ধরে-টরে রীতিমতো জাপটাজাপটি করে তাকে  ত্রো-ত্রো থেকে নামান। হাঁপ ছেড়ে আমি কন্ডাকটারের কাছে জানতে চাই, মাইক্রোবাসটি ছাড়বে কখন? জবাবে যেন বহুদিন পর জুতসই কোনো চুটকি শুনেছেন, এম্নিভাবে হো হো করে হেসে তিনি আমাকে গাড়ির বডির দিকে ইশারা করেন। আমি দেখতে পাই, ওখানে পরিষ্কার ইংরেজিতে লেখা, ‘দেয়ার ইজ নো হারি ইন লাইফ।’ আপ্তবাক্যটিকে সুফিদরবেশের বাণীর মতো মহার্ঘ মনে হয়।

ঘণ্টা দেড়েক নগরীর নানা ঘাটে ভিড়ে, হরেক কিসিমের প্যাসিঞ্জারদের ত্রো-ত্রোতে তুলে, বেজায় উচ্চরোলে মিউজিক বাজিয়ে, জানপ্রাণ রীতিমতো লবেজান করে দিয়ে বর্ণাঢ্য মাইক্রোবাসটি আমাকে নামিয়ে দেয় মাকোলা মার্কেটের মোড়ে। ফ্রেডকে কোথাও দেখতে পাই না। বাজারটির ঠিক কোন দিকে দিয়ে ঢুকবো, অতঃপর যাবো কোন গলি ধরে- বোঝা রীতিমতো দুষ্কর হয়। তখনই মনে পড়ে, টেক্সট মারফত ফ্রেডের উপদেশ, ‘মাকোলা মার্কেট ডাজন্ট হ্যাভ এনি ফ্রন্ট-গেট অর এক্সিট সাইন, ইউ হ্যাভ টু নেভিগেট কেয়ারফুলি।’ সাবধানে না হয় নেভিগেটই করলাম, কিন্তু ফ্রেড এর নাগাল পাই কীভাবে? আমি একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে চুকুমবুদাই এর মতো এদিক ওদিক তাকাই। ছাতা মাথায় লোকজন হাঁটছে, নারীরা গতরে বাটিকের বেজায় রঙচঙে র‌্যাপ জড়িয়ে গালগল্প করে করে আগ বাড়ছেন। বিক্রি হচ্ছে কাটা ডাব, একজন ফেরিওয়ালা খুঞ্চাটি মাথার ওপর তুলে ধরে আওয়াজ দিচ্ছেন ‘কালেউলে কালেউলে,’ তাতে রাখা মুচমুচে করে ভাজা বস্তুটি যে আধপাকা কাঁচকলা- তা চিনতে কোনো অসুবিধা হয় না। মুখে লালচে নীল খড়িমাটির নক্সা আঁকা উত্তুঙ্গ চেহারার কয়েকটি কিশোরী আমাকে ঘিরে ধরে আওয়াজ দেয়, ‘ওবুরনি.. ওবুরনি।’ ফ্রেডের পাঠানো ইউজফুল ফ্রেইজেজ পড়ে একটু আগে জেনেছি, তুয়ি জবানে ওবুরনি শব্দটির মর্মার্থ হচ্ছে ‘বিদেশি।’ আমি স্রেফ সৌজন্যবশত হেসে তাদের দিকে হাত নাড়ি, এতে তাদের যেন পোয়াবারো হয়। ভারী নিতম্বের দুটি মেয়ে ঠিক চোখের সামনে এসে কোমরে হিল্লোল তুলে সুরে-তালে গায় ‘ওবুরনি..ওবিুরনি/গিভ আস মনি.. লটস্ অব মনি..ওবুরনি।’ বকশিশ দেয়ার ছন্দায়িত আবেদনকে উপেক্ষা করার কোশেশ করি। একটি বালিকা কাঠিলজেন্স চুষে তা আমাকে অফার করে। ভারি তো মুশকিলে পড়া গেলো।

ডাবওয়ালার দোকানের আড়াল থেকে মুশকিল আসানের কায়দায় বেরিয়ে আসেন ফ্রেড। খাকি শর্টসের সাথে আধময়লা গল্ফ শার্ট পরে আছেন। তার পেটা দেহটি অত্যধিক সূর্যস্নানে তামাটে হয়ে গেছে। কাবুলে ফ্রেড হামেশা ক্রিস্প স্যুট পরে কাজে যেতেন, পার্টি-পরবেও জাঁক করে পরতেন আফ্রো কেতার রঙচঙে আঙ্কারা ফ্যাশনের শার্ট। আজকের এ ক্যাজুয়েল বেশভূষার সাথে মানুষটিকে আমি ঠিক মানাতে পারি না। আমরা প্রথমে ওপেন-এয়ার মার্কেটে শাকসব্জি ও ফলমূলে সাজানো পরিসর দিয়ে হাঁটি। ফ্রেডের মোবাইলে টেক্সট আসে। আক্রা নগরীতে হালফিল যে বিধবা নারীর সঙ্গে ফ্রেড লিভ টুগেদার করছেন, তিনি নাকি তার সাথে জরুরি কিছু আলাপ করতে চান। ফ্রেড টেলিফোন করার জন্য পার্ক করে রাখা এক সারি ঠেলাগাড়ির পেছনে নিরিবিলি ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ান।

অপেন-এয়ার মার্কেটে দেখার মতো জিনিসের কোনো খামতি নেই। কাছেই ডুবো তেলে ভাজা হচ্ছে আদা ও কাঁচামরিচের ফোঁড়ন দিয়ে রাজ্যের সব পতঙ্গ। ছাতার তলায় চাকাওয়ালা তুন্দুরে পোড়া হচ্ছে শামুক। আমি গোল হয়ে তৈরি ছায়ায় দাঁড়িয়ে ফ্রেডের ঘটনাটা কী- তা নিয়ে মনে মনে তর্পণ করি। ফেসবুকের মেসিজ আদানপ্রদান বাবদ জানতে পেরেছি যে-ইতালিয়ান বিধবাটির নাম ট্রুডি ফরেনসো। ফ্রেড তাকে ‘হাইস্কুল সুইটহার্ট’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। ফ্রেডের পিতা সত্তর দশকের মাঝামাঝি ডিপ্লোম্যাট হিসেবে কর্মরত ছিলেন আক্রা নগরীতে। তখন ফ্রেড আক্রা ইন্টান্যাশনাল স্কুলে নাইন্থ ও টেন্থ গ্রেডে পড়াশোনা করতেন। আন্দাজ করি- ট্রুডিও সে যুগে পড়াশোনা করতেন একই স্কুলে। কিন্তু ফ্রেডের তো যুক্তরাষ্ট্রে সংসার আছে,  স্ত্রী মেরির সাথে তিনটি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিয়ে তোলা তাদের পারিবারিক ছবি প্রভৃতি আমি দেখেছি। তবে কী তাদের দিনযাপনে কোনোভাবে ফাটল ধরেছে?

ফ্রেডের ফোনে বাতচিত শেষ হচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। দোকানিরা দিশা ধরে আমার দিকে তাকাচ্ছে। তাই সামনে বাড়ি। কয়েকটি টুকরিতে চাষিরা সাজিয়ে বসেছেন ডগমগে লাল মরিচ। ভারি উজ্জ্বল এ বর্ণবিভা থেকে নজর ফেরানো মুশকিল হয়। কাছে যেতেই বুঝতে পারি, না, লোহিত বর্ণের তীব্র ঝাল গোলাকার মরিচ নয়, এগুলো হচ্ছে এক ধরনের ফল। কোমরে হিল্লোল তোলা মেয়েদের একটি এসে আমার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার ঘর্মাক্ত শরীর থেকে ছড়াচ্ছে বনাজি সালশার গন্ধ। একজন টুকরিওয়ালা দোকানি হাসিমুখে কী যেন বলেন। ভাষাটি সম্ভবত তুয়ি, আমি বুঝতে না পারলে মেয়েটি পরিষ্কার ইংরেজিতে তর্জমা করে দেয়, যার সরল বঙ্গানুবাদ হবে, গোলাকার লোহিত ফলটি হামান দিস্তায় পিষে খেলে শুধু এক রাত্রির সঙ্গমে উৎপাদন করা যাবে জোড়া সন্তান। ত্রো-ত্রো-র দেয়ালে লেখা আপ্তবাক্য ‘দেয়ার ইজ নো হারি ইন লাইফ’, এর কথা মনে আসে। ভাবি মেয়েটিকে বলব, এত তাড়াহুড়ার প্রয়োজন ই-বা কী। সে হাত বাড়িয়ে দিয়ে তর্জমার জন্য পরিতোষিক চায়। তা দিতে গড়িমসি করলে, কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে আরও গোটা দুয়েক নির্ভুল ইংরেজি বাক্য আওড়ায়। শুনে আমার তওবা আসতাগফির জপতে বাসনা হয়। এসব কথা শুনলে ফ্রেডও বুকে ক্রুসচিহ্ন এঁকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতেন। দেখতে দেখতে মেয়েটির অন্যান্য সেহেলিরা এসে আমার চারদিকে ব্যূহ রচনা করে। পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ার আগে আমি স্থানীয় কারেন্সি চেদির কয়েকখানা নোট মেয়েটির হাতে তুলে দিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘটাই।

ফোনালাপ শেষ হতেই ফ্রেড এসে পড়ে আমাকে নিয়ে ঢুকে পড়েন গলিঘুজির গোলকধাঁধায়। দোকানগুলো থেকে ঝুলছে মোটরগাড়ির পার্টস। ফুটপাতে শিকড়-বাকড় ও জন্তু-জানোয়ারের রোদে শুকানো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছেন ঘানার সনাতনী কবিরাজরা। দামদর ও মুলামুলি করে বিক্রি হচ্ছে ডেগ ডেগচি, বিডে তৈরি বর্ণাঢ্য জেওরাত। হকাররা রোদচশমা, কাঁধঝোলা ও হ্যাটের সওদা নিয়ে আমাদের অনুসরণ করে। রাজ্যের সব স্যান্ডেল মাথায় ঝাঁকামুঠেরা আওয়াজ দেয় ‘চালেউতে, চালেউতে.. বাই ওয়ান, সুপারফাইন স্যান্ডেল.. চালেউতে ইয়ে য়ে য়ে..।’ ফ্রেড আমার কব্জি ছুঁয়ে আরেকটি চিপা গলিতে ঢুকে পড়তে পড়তে বলেন, ‘পে অ্যাটেনশন টু ডিফরেন্ট সাইটস্ অ্যান্ড সাউন্ডস।’ দেখি, আমরা এসে পড়েছি জুতাপট্টিতে। ঝলমলে ব্রোকেডের কারুকাজ করা কিছু সেলিমশাহী নাগরা ঝুলতে দেখে আমি খানিক অবাক হই! ফ্রেড হাঁটতে হাঁটতে পাদুকা সম্পর্কিত বিচিত্র একটি তথ্য দেন। ঘানায় ব্রিটিশ আমলে প্রায় একই সময়ে বাজারে চালু হয় জুতা ও কড়ির পরিবর্তে রূপালি ধাতুতে তৈরি মুদ্রা। কিছু স্থানীয় লোকজন নাকি জুতা কিনে তা পায়ে পরিধান না করে- তা ব্যবহার করতো রেজকি পয়সা জমানোর ব্যাংক হিসেবে।

কাপড়ের পট্টিতে আসতেই হরেক রকমের বস্ত্রাদির বর্ণবিচ্ছুরণে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। আমি আগ্রহ নিয়ে থেমে একটি দোকানে ঢুকি। ক্রেতা মহিলারা দারুণ মনোযোগ দিয়ে শেল্ফ থেকে নিজ হাতে নামিয়ে দেখছেন বাটিক বস্ত্রের নানা কিসিমের ডিজাইন। আমি খুঁজছি হাই কোয়ালিটি কেনতে ক্লথ। ফ্রেড দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে মন্তব্য করেন, ‘রঙ প্লেস, চল তোমাকে নিয়ে যাই কেনতে ক্লথের অথেনটিক আড়তে।’ আগ বাড়তে বাড়তে ফ্রেডের বাচনিকে কেনতে ক্লথের খানিকটা ব্যাকগ্রাউন্ড জানা যায়। রিফাইন সুতি ও সিল্কের মিশ্রণে প্রস্তুত এ বর্ণাঢ্য বস্ত্রকে ঔপনিবেশিক পূর্ব যুগের ঘানার তাঁতিদের হাতে বোনা ফেব্রিকের দৃষ্টান্ত বিবেচনা করা হয়। ১৬৭০ সালে এতদঞ্চলে শক্তিমত্ত আসান্তে রাজ্যের গোড়াপত্তন হলেÑ এ কিসিমের বস্ত্র কেবলমাত্র রাজ পরিবারের জন্য তৈরি করা হতো। পরে সামান্য ভিন্ন ডিজাইনের কেনতে ক্লথ অভিজাতদের ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়। যদিও ইউরোপিয়দের কাছে ফেব্রিকটি কেনতে নামে পরিচিত, স্থানীয়ভাবে আকান গোত্রের তুয়ি জবানে এটি হচ্ছে ‘নিউয়েটোমা’। আসান্তে রাজ্যে রাজারা ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় ১৯৫৭ সাল অব্দি দাঁব-রোয়াবের সাথে রাজ্য পরিচালনা করেন। ১৯৫৭ সালের পর থেকে রাজপরিবারের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় মূলত সিরিমনিয়েল। অই সময় থেকে শুধু ঘানা নয়, পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের আম-আদমিরাও কেনতে ক্লথ ইস্তেমালের সুযোগ পান। হালফিল বস্ত্রটি বিয়ে-শাদি, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও খতনা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে রীতিমতো ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

দুপুরের সজনে ফাটা রোদে গলির পর গলি পেরুতে গিয়ে অনুভব করি, শরীর থেকে দরদরিয়ে বেরুচ্ছে তরল পছিনা। কোথাও চায়ের দোকান-টোকান পেলে থেমে ঠাণ্ডা সেভেন-আপ খেতে পারলে ভালো হতো। ফ্রেড নির্লিপ্তভাবে কেবলই আগ বাড়ছেন। এ দিকে তীব্র গর্মিতে আমার শিরোদেশে ছড়ছাম চড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। অবশেষে আমরা এসে পৌঁছি খাঁটি কেনতে ক্লথের অকুস্থলে। আড়তটির বহিরঙ্গের সাজসজ্জায় আহা মরি কিছু নেই। এখানেও সর্বত্র শেল্ফে শেল্ফে বাটিক বস্ত্রের বর্ণ-বাহার। একজন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী মা তার অত্যন্ত কিউট মেয়েটিকে খোশমেজাজে ফ্রকের কাপড় দেখাচ্ছে। দোকানের সেলসম্যানের সঙ্গে ফ্রেড পরিচিত। দেয়ালের পর্দা সরিয়ে কর্মচারীটি আমাদের ভেতরে ঢুকতে ইশারা দেয়। হলকামরাটি আধো-অন্ধকার, ওখানে সিরিয়াস গোছের বেশ কয়েকজন ক্রেতা, চালে-মাটিতে সর্বত্র রাখা থরে থরে নানা বর্ণের ও বিবিধ ডিজাইনের কেনতে ক্লথ। ক্রেতারা জলভরা বাটিতে শাহাদত আঙ্গুল ছুঁইয়েÑ তা দিয়ে আলতোভাবে স্পর্শ করে বস্ত্রের মসৃণতা যাচাই করছেন। রঙের রকমারি শেড থেকে বিচ্ছুরিত আভায় কেমন যেন ঘোর লাগে।

এক পর্যায়ে ডিজাইন ও বুননের ঘোচঘাচ দেখাতে ক্ষ্যান্ত দিয়ে যারা পাইকারি হারে কেনতে-ক্লথ কিনতে এসেছেন, তাদের পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দিই। পাগড়ি পরা এক শিখ সর্দারজিকে শানেমানে কুটিচৌকিতে বসেÑ শির দুলিয়ে মোবাইলের ইয়ারফোনে হিন্দি গান শুনতে দেখে একটু অবাক লাগে! তার ইয়ারফোন থেকে বাতাবরণে ছিটকে পড়ছে লতা ও কিশোর কুমারের ডুয়েটে গাওয়া পুরোনো দিনের গীতÑ‘পান্না কী তামান্না হ্যায় কে/ হীরা মুঝে মিল যায়ে..।’ আমার চোখেমুখে বোধকরি বস্ত্র নিসৃত বর্ণের সম্মোহন আঁচ করতে পেরে সর্দার-কা-বেটা কান থেকে ইয়ারফোন খুলে নিয়ে আওয়াজ দেন, ‘কেয়ছা লাগ রাহা হ্যায় আপকো ইয়ে কেনতে ক্লথ কা রঙবাগ?’ আমি তাকে নমস্তে জানিয়ে সওয়াল করি, ‘হোয়াটস্ ব্রিংস ইউ হিয়ার সর্দারজি।’ তিনি মোচ চুমরিয়ে জবাব দেন, ‘কেনতে কাপড়া কা বেওসা জি।’ জানতে পারি, তার নিবাস কানাডার ভেংকুভার নগরীতে। প্রতি তিন মাসে একবার করে আক্রায় আসেন, ফিরে যান নানা নক্সার বাহারে কাপড়ের গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে।

আমি কেনতে ক্লথের পাইকারি হারে কেনার মতো খরিদদার নই। ফ্রেড আমাকে আড়তের মালিকের সঙ্গে মোলাকাত করিয়ে দিতে চান। তো আমরা পেছনের দুয়ার ঠেলে ঢুকে পড়ি পাথরে বাঁধানো বড়সড় একটি উঠানে। দেখি, ওখানে সাজগোঁজ করা কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা মাদুরে গোল হয়ে বসে গুলতানি করছে। পাশের আরেকটি মাদুরে বসে চুল প্যাঁচিয়ে হেডগিয়ার পরা বিরাট আকারের এক মহিলা। এ ধরনের নারীরা ঘানায় ‘বিগ মামা পেনিওন’ নাম পরিচিত। সন্তানের জন্মদানে অপারগ বিধায় এরা ‘ওবনিন’ বা ‘নিষ্ফলা’ বলেও পরিচিত। তবে এরা কৃষ্ণাঙ্গ কুমারীদের জীবনের জৈবিক ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে সচেতন করেন এবং পরিশেষে সন্তান ধারণের ব্যাপারে প্রস্তুত করে তোলেন। এ প্রক্রিয়ার একটি প্রধান অঙ্গ হচ্ছে মেয়েদের সাজগোঁজ। এ মুহূর্তে মাদুরে বসে বিগ মামা তার সামনে রাখা বাটিগুলো নাড়াচাড়া করছেন। তাতে রাখা- পেশা শিকড়বাকড়ের কালচে-নীল থিকথিকে রস। মহিলা অতঃপর পালকের ব্রাশ দিয়ে তার সামনে বসা এক কিশোরীর ঠোঁটে বেজায় বিস্তৃত করে এঁকে দেনÑ অনেকটা লিপস্টিকের মতো নীলাঞ্জন মেশা কৃষ্ণাভ দাগ। মেয়েটির থুঁতনি ও কপালে অলরেডি আঁকা হয়ে আছে জ্যামিতির লম্ব চিহ্নের মতো দুটি গাঢ় রেখা। মনে একটি ভাবনা ঘুরপাক করেÑ এ ধরনের ফ্যাশন ঢাকাতে চালু করলে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়া যাবে কী? বোধ করি আমার অবলোকনে অপ্রস্তুত হয়ে মাদুরে বৃত্তাকারে বসা মেয়েগুলো পরস্পরের গা ঘেঁষে শরীর টিপে ফিকফিকিয়ে হাসে। ফ্রেড ফিসফিসিয়ে বলেন, এক সময়ে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মেয়েরা বাসররাতে কেনতে ক্লথ পরার সুযোগ পেত। হালফিল বস্ত্রটি সর্বত্র সুলভ হয়েছে, আপার মিডিলক্লাস মেয়েরা ডেটে যাওয়ার আগে বিগ মামার হাতে সুপ্রসাধিত হয়ে পরে নেয় কেনতে ক্লথের র‌্যাপ ও স্লিভলেস টপ।

উঠান পেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখি, গলায় চেন দিয়ে ছোট্টমোট্ট কড়ি বাঁধা দুটি গিরগিটি দিব্যি পোহাচ্ছে এক চিলতে রোদ। তাদের কাছে রাখা- পোড়ামাটির বাটিতে ক্রিমসন রঙের থিকথিকে ক্বাথ। এসব দৃশ্যপটের তসবির খেঁচা যাবে না বলে ফ্রেড আগেই সাবধান করে দিয়েছেন। তাই টেম্পটেশন সামলিয়ে আমি নিরিখ করে তাকাই। ফ্রেড ফিসফিসিয়ে জানান, বাসররাতে বিশেষ সজ্জার জন্য কখনও সখনও যুবতীরা এখানে এসে বিগ মামার হাত থেকে সনাতনী কেতার প্রসাধন গ্রহণ করে থাকে। তখন তাদের খোলা পিঠ ও উরুতে ক্রিমসন বর্ণের পেস্ট মাখিয়ে পোষা দুটি গিরিগিটিকে হাঁটাচলা করানো হয়। তাতে তৈরি নক্সার কদর নাকি সদ্য স্বামীদের মধ্যে বিপুল। আমার অনভিপ্রেত পর্যবেক্ষণে বিরক্ত হয়ে বিগ মামা রোষকষায়িত নজরে তাকান। বিব্রত হয়ে আমি জলে চোবা বিলাই এর মতো চোখ নামিয়ে চোটপাট ঢুকে পড়ি কেনতে ক্লথের গুদাম-কামরায়।

গুদাম পেরিয়ে বেরিয়ে আসতেই সাক্ষাৎ মেলে আড়তের স্বত্বাধিকারীর। চিফ-চেয়ার নামে পরিচিত-রাজ্যের জন্তু-জানোয়ারের নক্সা খোদাই করা এক ধরনের নিচু কুরছিতে দিব্যি শানেমানে বসে আছেন তিনি। ভদ্রলোকের সঙ্গে ফ্রেড পরিচিত। তার পরিবারে বেশ কয়েক পুরুষ ধরে চলছে কেনতে ক্লথের তাঁতে বুনন ও ব্যবসা। আমি তার সঙ্গে আফ্রো কেতায় শেকহ্যান্ড করে পরিচিত হই। তিনি  চিফ-চেয়ারে খোদাই নক্সার সাথে ম্যাচ করে এনিমেল প্রিন্টের ঢোলা পায়জামা পরে আছেন। তার আদুল গতরে চিতাবাঘের চামড়ায় তৈরি বুকখোলা কোটি। মাথায় পাগড়ির মতো প্যাঁচিয়ে জড়ানো জটাজুটের বিস্তার খোদ শিব ঠাকুরকে হার মানানোর মতো ব্যাপক। তাতে আংটা দিয়ে আটকানো পোড়ামাটির মালসা, তা থেকে উড়ছে ধূপধুনা। আমি যে নানা দেশে ঘুরে বেড়াই, ফ্রেডের কাছ থেকে তা জানতে পেরে নড়েচড়ে উঠে ভদ্রলোক আমার কব্জি চেপে দিয়ে বলেন, ‘আই আন্ডারস্ট্যান্ড ইউ আর আ ওয়ান্ডারার, আমাদের আকান ভাষা তুয়িতে আমরা এ ধরনের ভবঘুরেকে বলি কাবুলর। সো মি. কাবুলর, ডোন্ট ওয়ারি, সঠিক থানে তুমি এসে পড়েছ, তোমার রুচিমাফিক কেনতে ক্লথ এখানে পেয়ে যাবে।’ তার মন্তব্য শেষ হতেই একটি সেলস্গার্ল নিয়ে আসে ঝুড়ি ভর্তি কাপড়ের নমুনা। প্রচুর সময় নিয়ে আড়তের মালিক আমাকে বস্ত্রে বর্ণ ব্যবহারের মর্মার্থ বোঝান। নীলাভ শেড মূলত নারী-পুরুষের ভালোবাসাকে প্রকাশ করে থাকে। তবে সবুজ বর্ণ পরিধানে দেহমনে আসে সতেজ এনার্জি। নতুন কোনো প্রকল্প শুরু করলে একখণ্ড সবুজাভ বস্ত্র ব্যবহারের উপকারিতা অসীম। হলুদ হচ্ছে স্বর্ণ ও সম্পদের প্রতীক। তিনি অতঃপর ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতে বিজ্ঞের হাসি হেসে জানান, আগেকার জামানায় যখন আসান্তে সাম্রাজ্যের দাঁব-রোওয়াব ছিল, তখন হলুদ বস্ত্র আম-আদমির গতরে উঠলে রাজাদেশে তৎক্ষণাৎ পরতে হতো হাতকড়া। তারপর শরীরে মধু মাখিয়ে কয়েদিকে ছেড়ে দিয়ে আসা হতো এন্টহিল বা বিষপিঁপড়ার ঢিবিতে। এখন অবশ্য জামানা বদল হয়েছে। পয়লা এ কানুনের ব্যতিক্রম হয় যখন স্বাধীনতা সংগ্রামী জননেতা নক্রুমা বিটিশদের জেল থেকে ছাড়া পান। রাজা স্বয়ং তাঁকে পরিধানের জন্য পাঠিয়েছিলেন একখণ্ড হলুদ কেনতে ক্লথ।

আড়ত মালিকের বাচনিকে আরেকটি ইন্টারেস্টিং তথ্য জানা যায়, তা হলোÑ হাল জামানার আসান্তে রাজ্যের নাম-কাওয়াস্তে রাজা হিস হাইনেস ওটুমফুও নানা টুটু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমাবর্তন উৎসবে হলুদ কেনতে ক্লথ পরিধানের ইজাজত দিয়েছেন। এবার তিনি শিরে রাখা মালসার অংগার চিমটা দিয়ে খুঁচিয়ে বস্ত্রাদির ইন্ট্রিকেট নক্সাদির মর্মার্থ বোঝাতে শুরু করেন। একটি নক্সাÑ যাকে আকান গোত্রের ভাষা তুয়িতে বলা হয় ‘নকাইমকাইম’, আড়ত মালিক লবজটিকে আমার জন্য ইংরেজিতে তর্জমা করেন, ‘লাইফ ইজ নট আ স্টেইট পাথ’ বলে। ধারণাটি আমার পছন্দ হয়। প্রায় সারা জিন্দেগি ধরে আমি সরল পথের তালাশ করছি, কিন্তু আমার যাত্রাপথ ত্যাড়াব্যাঁকা হয়ে কেবলই প্যাঁচিয়ে যায়। ভাবিÑ এ বস্ত্রটি কিনে নিতে হয়। তো নোটবুক খুলে তুয়ি শব্দ-বাক্যের তালিকায় চোখ বুলিয়ে খাস আকান জবানে বাসনাটি ব্যক্ত করি, ‘ওয়া ইয়ে সে বা দিস ইজ হাউ মাচ?’ তিনি গোয়ামুরি হাসি হেসে কিমত ২০০ ডলার হাঁকেন। আমি পচপান্ন দিয়ে বারগেইনিং এর বউনি করি। তারপর পাঁচ ডলার করে আস্তে-ধীরে ওপরে উঠতে থাকি। তিনি চোখমুখ সিরিয়াস করে জানতে চান,‘ জেন্টলম্যান, ইউ আর নট আ বিবিনি, অ্যায়সা জবরদস্ত বারগেইন তুমি শিখলে কোথায়?’ বিনীতভাবে জানতে চাই, ‘হোয়াট ইজ বিবিনি?’ ফ্রেড পাশ থেকে জবাব দেন, ‘বিবিনি হচ্ছে ব্ল্যাকম্যানের স্থানীয় প্রতিশব্দ।’ প্রতিক্রিয়ায় আমি বলি, ‘দামদরের কায়দা-কানুন আমি শিখেছি কাবুলের চিকেন স্ট্রিটে।’ তিনি ইমপ্রেসড্ হন না, একশ পঁচিশ ডলারই তার শেষ কথা। আমি পাল্টি দেই, ‘দিস ইজ টু এক্সপেনসিভ।’ কপাল কুঁচকে তিনি আওয়াজ দেন, ‘অদিকপেনা, বা গুড থিংকস্ আর প্রেসিয়াস।’ কী আর করা যাবে? হাল ছেড়ে দিয়ে আমি জোড় হাতে ‘মা ডাসি বা থ্যাংক ইউ’, বলে উঠে পড়ি। মুণ্ডুতে রাখা মালশায় চিমটা দিয়ে নাড়াচাড়া করে তিনি ফের বলেন, ‘ও-কে, হাউ আবাউট হানড্রেড ডলার? দিস ইজ মাই ফাইনাল প্রাইস।’ আমি সারেন্ডার করে একশ ডলারের একটি নোট বাড়িয়ে দিই তার দিকে। মিনিট কয়েকের ভেতর কেনতে ক্লথটির প্যাকেট হাতে নিয়ে আমরা খোশমেজাজে বেরিয়ে আসি আড়ত থেকে।

এ দিকের ফুটপাতকে সরগরম দেখায়। সড়কের পাশে প্লাস্টিকের টুল-টেবিল দিয়ে চলছে চাপবার বা খাবারের ছাপড়া দোকান। পেট্রোলের তীব্র গন্ধে মিশছে পোড়া মাংশের ধোঁয়া। কোনো কোনো চাপবারওয়ালা শিককাবাব ঊর্ধ্বে তুলে ধরে আওয়াজ দিচ্ছে, ‘চিচিঙ্গা.. চিচিঙ্গা.. চিচিঙ্গা কেবুব, ভেরি ভেরি চিপ।’ প্রচুর খিদা পেয়েছে। কাবাবের গন্ধে মাতলে উঠছে বাতাস। ভাবি, কোনো চাপবারে বসে সেরে নেবো লাঞ্চ। ফ্রেড ফিসফিসিয়ে সাবধান করে দেন, ‘ডোন্ট ইভেন থিং আবাউট বাইয়িং এনিথিং ফ্রম দ্য চাপবার। কিছু মুখে দিলে লাভবান হবে ওর‌্যাল সেলাইনের কোম্পানি।’ শুধু খিদা নাÑ তৃষ্ণাও পেয়েছে দারুণভাবে। পানীয়ের চাপবারে বিক্রি হচ্ছে লাল মিলেটে তৈরি এক ধরনের স্যুপ জাতীয় খাবার। এ ধরনের খাবারের নাম সলোম। জিন্সের সাথে সুন্দর ডিজাইনের টিশার্ট পরা চশমা-চোখে একটি তরুণী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাখছে এক বাটি সলোম। মেয়েটি কী মাকোলা মার্কেটের কোন সেলস্গার্ল, নাকি সে কিছু কিনতে এসেছে? ফ্রেডের মোবাইলে কল আসে। তিনি প্রাইভেটলি বাতচিত করার জন্য একটি ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে চলে যেতে যেতে আমাকে ইশারায় জানান- আমি যেন এ ফুটপাত ছেড়ে অন্য কোন গলিতে ঢুকে না পড়ি।

আমি হাল্কা চালে হাঁটতে হাঁটতে দেখি, বিদ্যুতের তারে লেগে মরে ঝুলে আছে একটি কাক। তাকে ঘিরে চারপাশে- ডাস্টবিনের কানায়, দোকানপাটের কার্নিশে সর্বত্র জড়ো হয়েছে অজস্র কাক। তারা তেমন কোনো শব্দ করছে না, তবে এক ধরনের নীরব সহমর্মিতায় আর্দ্র চোখে চেয়ে আছে তীব্র রোদে জ্বলা পড়ন্ত অপরাহ্ণের দিকে। একটি অল্পবয়সি মেয়ে-বয়সের নিরিখে কিশোরীই বলা চলে, আমার কাছ ঘেঁষে হাঁটে। আমি সাবধান হই। পরিচিতজনের মতো মৃদু হেসে সে বলে, ‘মিস্টার, চল আমার সঙ্গে, কাছেরই একটি দোকান থেকে তুমি কিনতে পারবে অর্ধেক দামে কেনতে ক্লথ।’ আমি তাকে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করি, কিন্তু মেয়েটি নাছোড়, সে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘কিনে নাও এক টুকরো পিংক কেনতে র‌্যাপ, তোমার বম্বা তা কোমরে প্যাঁচাতে পছন্দ করবে।’ মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, ‘ হু ইজ বম্বা?’ দুষ্টুমির হাসি হেসে সে জবাব দেয়, ‘নো হ্যাভ বম্বা অ্যাস গার্লফ্রেন্ড, নো প্রবলেম মিস্টার, আমি খুঁজে দিই।’ বেশ জোরেশোরে আমি তাকে ‘নো’ বলে কাটাতে চাই। কিন্তু সে চোখে আকুলতা ফুটায়, এ ধরনের দৃষ্টিপাতকে ইংরেজিতে পাপি লুক বলে। মেয়েটি আলতো করে আমার কব্জিতে রাখে তার হাত, বিষয়টাকে ভারী উৎপাত মনে হয়। ছাড়িয়ে নিয়ে আসি আমার হাত। হতাশ হয় না সে, ‘অলরাইট মিস্টার, নট লাইক বম্বা, ঠিক আছে, তুমি লেমন লাইম নানদিনা পছন্দ করো, একহারা গড়ন, বুকে লেবুপাতার গন্ধ।’ আজ সারা দিনে রঙ্গ হয়েছে প্রচুর, নারীসঙ্গের প্রস্তাবে বেজায় বিরক্ত লাগে। তাই খেপে গিয়ে বলি, ‘গো টু হেল।’ সহজে হাল ছাড়ে না সে, বলে, ‘হাউ আবাউট মি, আই অ্যাম ফ্রি, আ লিটিল কুইকি, ফাইভ ডলার।’ এবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে, চিৎকার করে বলি, ‘গেট লস্ট, ও-কে।’ হাল ছেড়ে দিয়ে চোখমুখে কুকুরের কিউট ছানার মতো পাপি লুক ফুটিয়ে সে অন্য দিকে ঘোরে। মোবাইল গোটাতে গোটাতে ফ্রেডও এসে পড়েন। মেয়েটির গমনপথের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়ানো এ ধরনের মেয়েরা তউ-তউ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ আমলে এদের বলা হতো টু শিলিং টু পেন্স। এটাই ছিল এদের রেট। সত্যিকারের সর্বহারা এরা, তুয়ি ভাষায় এদের বলা হয় মামে-ই-দে, অর্থাৎ ডু নট হ্যাভ এনিথিং।’

পা চালিয়ে হেঁটে মাকোলা মার্কেট থেকে বেরুতে বেরুতে মনে মনে একটি মানসাঙ্কের খসড়া করি, এক খণ্ড কেনতে ক্লথ খরিদ করতে যদি ব্যয় করতে হয় এক শত ডলার, এ মূল্যে কতটি তউ-তউ মেয়ের শরীরী-সঙ্গ কেনা যায়?

  লেখক : ভ্রমণ সাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares