গল্প : মুনিয়া এবং কাহিনি একাত্তর : মাহবুব আলী

মেয়েটিকে নিয়ে এখন কী করা যায়?

মধ্যরাত শেষের অস্থিরতায় এই প্রশ্ন বড় জোরালো হয়ে ওঠে। গোর-এ-শহিদ ময়দানের বিস্তৃত ফুটবল গ্রাউন্ড। পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে চিকন রাস্তা উত্তর-দক্ষিণ চলে গেছে। ডিসি সাহেবের বাসভবন। সার্কিট হাউস। আরও সামনে…সে যা হোক, ফুটবল মাঠের পশ্চিমে রাস্তা, তার পুবে জল নিষ্কাশনের সরু খাল ছেড়ে কাঠের কয়েকটি ঘর নিয়ে গ্রিনরুম কাম রেস্টহাউস। মেকআপ আর বিশ্রামাগার। মার্চ শেষে এপ্রিলের পাতাঝরা তপ্ত দিনকাল। কখনও বাতাসে গুমোট তাল-লয়ে বারুদের হালকা স্পর্শ লেগে থাকে। সেই গন্ধে জড়িয়ে থাকে শুকনো রক্তের বীভৎস দাগ। রাস্তার গোপন কোঠরে এবং প্রকাশ্যে ছড়িয়ে থাকা লাশের ব্যাদান চোখ-মুখ। কখনও শকুন আর কুকুরে খুবলে তুলছে মৃত মানুষের শরীর। শহরের রাস্তায় মহল্লার অলিগলিতে মানুষ মানুষের মুখের দিকে তাকাতে পারে না। চোখে-মুখে ভয়-ভক্তি-আশঙ্কা লেপ্টে থাকে। ভক্তির উৎস অন্য কোথাও, সেটি অন্ধ মোহ কিংবা স্বার্থবুদ্ধির কূটজাল কে জানে। মানুষ আপাতত বিচ্ছিন্ন আবার সংঘবদ্ধ হয়ে সকল দূরত্ব হ্রাসে কাজ করে যায়। কেউ কেউ নিজেদের ঘরদোর পাহারা দিয়ে রাখে। রাত পাহারা চোখ অন্ধকারের প্রহর গুনে গুনে সতর্ক সাবধান। এর মধ্যে মেয়েটি।

আমরা জেগে থাকি। টিমের নয়জন তিনভাগে দুই-তিন প্রহরের দেখাশোনা। কোথায় কী হয়? কী হতে পারে? কী হচ্ছে বা হতে চলেছে? এইসব অস্থির ভাবনার মধ্যে দায়িত্বের অংশ হিসেবে অন্ধকারের রাস্তা-অলিগলি আর পাড়াগুলোর আশপাশ মহল্লার চারদিকে তাকাতে হয়। পশ্চিমে রাস্তা পেরিয়ে মিশন রোড। কাঁচাপাকা খড় ছাউনির ঘর, টিন ছাপরা আর দু-চারটি সাদা বিল্ডিং। পনেরো-কুড়ি পরিবারের সত্তর-আশিজন মানুষ। কয়েকদিন আগেও এই ঘরগুলোয় বুড়োবুড়ি আর জেদি মানুষজন ছাড়া কেউ ছিল না। ওদিকে কয়েকটি বিশাল দেবদারু আমগাছের উন্মুক্ত ছায়ায় ছোট ছোট টোপর-ঘর, ঘরের সারি, বিস্রস্ত আসবাব-তৈজস, এখানে-ওখানে বেঁধে রাখা বা মুক্ত ছাগল-দুম্বা; এসবের মধ্যে বসবাস শিয়া সম্প্রদায়ের একদল মানুষ। মানুষজন ইরানি নামে চেনে। তাদের এখন কেউ বেঁচে নেই। এই যে কোথায় কী যেন নেই, ছিল কিংবা আছে অথবা এখন নেই…তার নাম ভয়। স্বস্তি উধাও হয়ে গেছে। আমরা রাত নয় কিংবা দশের দিকে এখানে আসি। একটি রং চটা ক্যারম বোর্ড মেঝেতে সাজানো, ক্রাইস্টাইল স্বচ্ছ প্লাস্টিকের উনিশটি গুটি আর স্ট্রাইকার বরিক পাউডারের মধ্যে এলোমেলো ছড়িয়ে থাকে, যেন আমার দেশ আর মানুষজন অস্থির এদিক-ওদিক ভাবনা-দুর্ভাবনায় বিশুষ্ক আর কোনো স্বপ্ন দেখে যায়। প্রায়শ বিনোদনের এসবে কোনো মনোযোগ নেই আমাদের। আমরা অন্ধকার রাতের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভোরের প্রতীক্ষায় থাকি। ভোর মানে সকাল। একটি সকাল আমাদের বড় আকাক্সক্ষার। আমাদের নেতা সাতই মার্চ আগুনঝরা ভাষণ দিলেন। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা-আল্লাহ্।’

আমরা কখনও সকালে এসে বসি। সারাদিন কেটে যায়। বাচ্চুর পকেটে কিংস্টোর্ক সিগারেট থাকে। কখনও স্টার…ফিল্টার উইলস্। মোরগ বা ট্যাক্সি মার্কা দেশলাই। আমি জানি রাফিদুলের কাছে পেট্রল লাইটার আছে। তেমন একটি জিনিস কেনার জন্য কয়েকদিন জেলরোড-লিলিমোড়ের দোকানে ঘুরেছি। অবশেষে সেই তিন-চার টাকা ক্রিসেন্ট বুক স্টলে মাসুদরানা সিরিজের বই কিনে শেষ। সিরিজের পাঁচ নম্বর বই। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা। আমরা এখন সেই পাঞ্জা লড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই সকাল-দুপুর-বিকেল। একাডেমি স্কুলের মাঠে যখন আতা আর বেলগাছের পাতাগুলো ঝিরিঝির ঝরে পড়ে, পড়তে থাকে, কেউ কেউ রাইট টার্ন-কুইক মার্চ আর রাইফেল চালনা শেখে। আমার শেখা হলো না। বাড়ির সামনে ছাত্রলীগ অফিস। গণেশতলা সেন্ট যোসেফস্ স্কুল রাস্তার অপরদিকে গোডাউনের মতো বিশাল ঘর সকাল-বিকেল-রাত গমগম করে। আলাপ-আলোচনা অনেক কিছু চলে। কোনোদিন উঁকি মেরে আলোচনা শুনি। একদিন মোতালেব ভাই বের হয়ে জিজ্ঞেস করেন-

‘পড়াশোনা কেমন? দেশের জন্য এবার কাজ করো। আমাদের সাথে এসো। মাও সেতুং-কার্ল মার্ক্স-লেলিনের নাম জানো?’

‘শুনেছি। মাও সেতুং-এর বইগুলো ডায়রির মতো লাল। বেশ সুন্দর দেখতে।’

‘পড়েছ?’

‘বুঝতে পারি না।’

‘একদিন বিকেলে আসবে, গল্প করব। আগামীকাল নেতার ভাষণ…শুনবে।’

আমার যাওয়া হয় না। সাতই মার্চের ভাষণ ওইদিন রেডিওতে প্রচার হলো না। বাবা পরদিন সকালে ফুল ভলিউমে ভাষণ শুনছেন। মারফি ডিলাক্স রেডিওর সাউন্ড গলির মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। উত্তরপার্শ্বের বাড়ি থেকে নন-বেঙ্গলি আহমেদ রফিক ছুটে এলেন। চুল-দাড়িতে মেহেদি রং।

‘ক্যায়া বাত উকিল সাব? শাদি লাগগিয়া ক্যায়া?’

বাবা কিছু বললেন না। ভলিউম কমিয়ে দিলেন। আমার শ্রুতিতে বেজে চলে, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা-আল্লাহ্।’ আনন্দ-খুশির নেশায় রক্ত টগবগ করে নাচে। এই তো এক বছর দশ মাস আগে মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে। ঘবরষ অৎসংঃৎড়হম চাঁদের বুকে পা রেখে ইথারে জলদগম্ভীর ঘোষণা ছড়িয়ে দিলেন দঞযধঃ’ং ড়হব  ংসধষষ ংঃবঢ় ভড়ৎ সধহ, ড়হব মরধহঃ ষবধঢ় ভড়ৎ সধহশরহফ.’ আমার সপ্তর্ষি-সন্ধ্যাতারা-ধ্রুবতারা-লুব্ধক সন্ধানী মন নেচে নেচে রাস্তা, স্কুল এবং তারপর গোর-এ-শহিদ ময়দানের আড্ডায় ছুটে এলো। ডরষষু খবু-র ঞযব ঈড়হয়ঁবংঃ ড়ভ ঝঢ়ধপব বই হাতে। মনের আকাশে ফ্লাইং সসার আর গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে অ্যলিয়েন অনুসন্ধান। মন আমার কোথায় হারিয়ে যায়! অলীক কল্পনা?

উত্তাল উনসত্তর। বছরের শুরুতে আগরতলা মামলায় বন্দি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং সহযোগীদের মুক্তি আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। বাংলার মানুষের স্বাধীনতার রূপরেখা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ ছয়দফা আর ছাত্র সংগ্রাম কমিটির কয়েকটি দাবি যোগ হয়ে এগারো দফা আদায়ের আন্দোলন জোরদার। সেই আন্দোলনে যোগ দিল আরও কিছু সংগঠন। রাস্তায় রাস্তায় মিছিল। এখানে-ওখানে আলোচনা। উদ্দীপ্ত শপথ উচ্চারণ। উত্তপ্ত বক্তৃতা। সরকার সান্ধ্য আইন জারি করল। সড়কে জোরদার টহল। অস্থির বাতাসে কী হয় কী হয় ফিসফাস আলাপ। চব্বিশে জানুয়ারি আইয়ুব শাসনের উৎখাত আর নেতাদের মুক্তি দাবিতে মানুষজন সান্ধ্য-আইন উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে পড়ল। স্লোগানমুখর সময়। শাসকের পেটোয়া বাহিনী বসে রইল না। যত রকম পদ্ধতি সবগুলোর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেল। রাইফেল গর্জে উঠল। ক্লাস নাইনের ছাত্র মতিউর গুলিতে আর একজন রুস্তম ছুরিকাঘাতে নিহত হলে সরকারের অবস্থা টালমাটাল। দেন-দরবার আলোচনা ব্যর্থ হলো। অবশেষে পঁচিশে মার্চ লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। ইয়াহিয়া খান ওইদিন দুপুরে সংবিধান স্থগিত রেখে নিজেকে প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ঘোষণা করলেন। রাতে আরেক ভাষণ। বাংলার মানুষ শুনল নির্বাচনের আশ্বাস।

আমরা কাঠের গ্রিন রুম কাম রেস্টহাউসে ঘরে-বারান্দায় গল্প করি। গল্প শুনি। এ হলো নন-ফিকশন গল্প। আলোচনা চলে…গভীর রাত আরও নিবিড় হতে থাকে। পুনর্ভবা নদীর স্রোতের মতো এক সূত্র থেকে অন্য সূত্রে ঢেউ বয়ে যায়। আমার ক্লাসমেট বাচ্চু। সে বোঝে। আমি রাফিদুলের মতো হাঁ হয়ে শুনি। ইয়াহিয়া খান ছাত্রছাত্রীদের আইডেন্টিটি কার্ড সিস্টেম প্রবর্তন করেছেন। অনেক সুবিধে। ট্রেন-বাসের ভাড়া অর্ধেক। সিনেমার টিকিট প্রায় ফ্রি। আমরা কোনোদিন দল বেঁধে ম্যাটিনি শো দেখেছি। দিলীপ সোমের সাত ভাই চম্পা-য়  খান আতার ‘হক মওলা’ কারও মুদ্রাদোষ হয়ে গেল। রহিম নেওয়াজের সুয়োরানি দুয়োরানি-র নায়ক-নায়িকা প্রেমের দশকলা শেখায়। কাজী জহিরের ময়না মতি। মানুষ আপনমনে গুনগুন গায় ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’। আমি ভুলে যাই, মানুষ এই তো সেদিন চাঁদ জয় করেছে।

রাত সম্ভবত সাড়ে বারো। রাফিদুল-শহিদ-মনোয়ার প্রথমে লক্ষ করে ছায়া। সেই বিরান পাথার, যেখানে শিয়াদের দলবেঁধে আস্তানা ছিল, এখন কেউ নেই, জায়গাটা ভূতুড়ে আবাস, অশরীরী অস্ফুট দীর্ঘশ্বাস বাতাস ভারী করে রাখে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যে আর রাত, সেখানে কেউ একজন বা কিছু একটা নড়ে ওঠে। কে সে? কোনো মানুষ অথবা গরু-ছাগল? শহরে এখন কোথাও কোথাও গরু-ছাগল ইতস্তত চরে বেড়ায়। মালিক নেই। কারও কারও ঘরবাড়ি নেই। কারও ঘরবাড়ি আছে মানুষ নেই। চারদিক শূন্য খাঁ-খাঁ অস্থির সময়ের ক্ষণ-অনুক্ষণ বয়ে যায়। মধ্যরাতের নিশ্চুপ প্রহর। কখনও আচমকা রাইফেল ফায়ার হয়। পটাশ! কখনও কুকুরের উল্লাসী অথবা অসহায় ক্রন্দন বাতাস থমথমে করে রাখে। আমাদের ঘুম নয়, তন্দ্রাঘোর, সেও বোধকরি ঠিক নয়, চোখদুটো খোলা রেখে রাত পাহারা; তাই সতর্ক ফিসফাসে জেগে উঠি। এ তো জেগে ওঠা নয়, দৃষ্টির সকল কেন্দ্র দূরে একটু দূরে আছড়ে পড়ে। আজ রাত তেমন আবছায়া নয়। আকাশে নক্ষত্রমালা-ছায়াপথ যতটুকু মৃদু আলো ছড়িয়ে রাখে, আমরা দেখি গরু-ছাগল কিংবা রাতে দুড়দাড় দাপটি শূকর নয়; একজন ছায়ামূর্তি। মানুষ। বোধকরি মেয়েমানুষ। রাফিদুল আর শহিদ আস্তে আস্তে নিজেদের আড়াল করে এগিয়ে ধরে ফেলে তাকে। আমরা কাঠঘর বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি একজন মানুষ ঝুপ করে নিচে আছড়ে পড়েছে। এরপর শহিদ যখন টর্চের সতর্ক আলো চোখে-মুখে ছড়িয়ে দেয়, আর কেউ না হোক আমি চিনতে পারি। মুনিয়া।

সেন্ট যোসেফস্ স্কুলের পশ্চিমে রাস্তা। সেটি পেরিয়ে একসঙ্গে পর পর চারটি দোকান। জান মহম্মদের বেকারি। বেকারির ভাঁজকরা সবুজ রং কাঠদরজা। সেখানকার কোনো ফাঁকফোকর গলিয়ে দুপুরের বাতাসে তন্দুরে সেকা বিস্কুট-পাউরুটির সুবাস ছড়িয়ে যায়। দক্ষিণের তিনটি দোকান মাটি থেকে তিন ফুট উঁচু। প্রথমে মিজানুর বা লুডু মিয়ার মুদি দোকান। সবশেষে মটরসাইকেল আর সিঙ্গার সেলাই মেশিনের ওয়ার্কশপ। মালিকের মুখে সবসময় পান। আশপাশে জরদার মাতাল গন্ধ। আহমদ হাসান মধ্যখানের দোকানে কাজ করেন। আমি তাকে চাচা ডাকি। দোকানের সামনে চার-পাঁচ ফুট প্রশস্ত বারান্দা। এককোনায় একটি বেঞ্চ। বই বাঁধাইয়ের কাজ হয়। তিনি কখনও বারান্দায় বসেন। কতগুলো বই রোদে শুকোয়। সব ধরনের সেলাই হয়। আমার স্কুল মর্নিং। কোনোদিন স্কুল শেষে বাসায় ফিরে ব্যাগ রেখে সেই বেঞ্চে বসি। পকেটে মাউথঅর্গান। কখনও গানের সুর তোলার হাজার চেষ্টা। ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা, না জানে কিস্ পে আয়েগা।’ বাবাকে খুব মানে আহমদ চাচা। তার আইনের বই ফরমাশ মতো বাঁধাই হয়। আমি কাজ দেখি। লম্বা হাতলঅলা খুন্তির মতো হাতিয়ার, নিচে অর্ধবৃত্তাকার ব্লেড, শিলপাথরে ঘষে ঘষে আরও ধারালো হয়, তবেই মোটা মোটা বইয়ের প্রান্তদেশ মসৃণ কেটে ফেলা। মুনিয়া কাপড়ের পোটলায় খাবার নিয়ে আসে। বাবার হাতে দিয়ে সামনের টিউবওয়েল থেকে জগে পানি ভরে। তারপর বেঞ্চের একপ্রান্তে বসে গান শোনার আবদার।

‘ভাইয়া…ভাইয়া ওই গানটা বাজা না?’

‘কোনটা?’

‘ওই যে কুছ লোগ রুঠ কারভি লাগতে হ্যাঁয় কিত্নে পেয়ারে। হি হি হি!’

‘দূর আমি পারি না।’

‘ভাইয়া হবে হবে তুমি বাজাও না?’

আমি পকেট থেকে মাউথঅর্গান বের করি। অনেকদিন ধরে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কেনা। চায়নার তৈরি চৌষষ্টি ঘরের সুর মায়াজাল ভিক্টরি। মুনিয়াকে পরিস্তানের পরি মনে হয়। সোনালি-কালো ঝাঁকড়া চুলের ছায়ায় অসম্ভব উজ্জ্বল ফরসা মুখছবি। গোলাপি রং লিপিস্টিক চিকন ঠোঁটে কিংবা আলতা আবীর। নীল চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে কেমন শিহরণ লাগে। আমার সুর তোলা হয় না। ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা, না জানে কিস্ পে আয়েগা।’ হয় না। মাউথঅর্গান শুধু পোঁ-পোঁ করে। আহমদ চাচা অজু করে এসেছেন। কোরআন শরীফ সেলাই করতে হবে। আমি লক্ষ্য রাখি। কেমন করে জুস সেলাই হয়। মুনিয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পারি। তার সারা মুখে অদ্ভুত আলো। আহমদ চাচা হাসতে হাসতে বলেন, –

‘কি রে বেটা পেঁ-পোঁ বাঁশি বাজাচ্ছিস? মেট্রিক ইমতেহান সামনে। প্রিপারেশন কেমুন? উকিলের ছেলে ব্যারিস্টারি পড়তে হবে। বাপ্ কা নাম রওশন করনে হোগা।’

‘স্কুল তো ছুটি চাচা। আব্বা বইয়ের খোঁজ নিতে বলেছে।’

‘উকিল সাব কো বলবে কাল এতোয়ার কা দিন হ্যায়, ইখানে যেনো আসেন।’

‘আচ্ছা।’

মুনিয়া বাসনপত্র গুছিয়ে ব্যস্ত হয়। ফিরে যেতে হবে। গণেশতলা মসজিদের গলি হয়ে অনেক পেছনে ভাড়া বাড়ি। আমি সেখানে কয়েকবার গিয়েছি। মুনিয়া মাসুমার ক্লাসমেট। একই স্কুলে পড়ে। সই পাতিয়েছে। ওদের দু-জনের বন্ধুত্বে দুই পরিবারে মেলবন্ধন। মুনিয়ার বড়ভাই সুইহারিতে মটর গ্যারেজে কাজ করে। একদিন তার সঙ্গে দেখা হয়। সেদিনও মাসুমার আবদারে যাওয়া। আমার হাতে ক্যামেরা। বাচ্চুর কাছ থেকে ধার নিয়েছি, কিন্তু মনের আড়ালে লুকোচুরি ভাব অন্যরকম, যেন জিনিসটা আমার। সকালে নতুন ফিল্ম লোড করা হয়েছে। মাসুমা বান্ধবীর সঙ্গে ছবি তুলবে। আমি দক্ষ ক্যামেরাম্যান। তখন আখলাকের সঙ্গে দেখা। গোলাপি উজ্জ্বল ফরসা, নাকের নিচে লালচে-কালো গোঁফ, সাদা পাজামার সঙ্গে ঘি-রং ঝুল পাঞ্জাবি, সেখান থেকে অচেনা কোনো আতরের সুবাস ভেসে বেড়ায়। সাইকেল নিয়ে বেরোবে। আঙিনা থেকে চেঁচিয়ে বলে, –

‘আম্মি ম্যায় যা রাহা হু, লওটনে সে দের হোগা। আস্সালামু আলায়কুম।’

‘ওয়ালাইকুম আস্সালাম। আল্লা হাফিজ বেটা।’

‘আল্লা হাফিজ।’

তারপর আমাদের দেখে একগাল মৃদু হেসে বলে উঠে, –

‘মুনিয়া দেখ্ দেখ্ কে এসেছে। মাসুমার বড়াভাই ভি আয়া।…আউর ছোটেভাই হামার একটা ফটো তুলবে না? হা হা হা!’

‘হা হা জরুর ভাইজান।’

‘না রে ইয়ার্কি করছি। বহুত কাম আছে। আভি যেতে হবে। অন্যদিন বাতচিত করব কেমুন। আল্লা হাফিজ।’

সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ জয় হয়েছে। এবার মানুষ নিজেদের ভাগ্য গড়তে পারবে। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের শোষণ-বঞ্চনার অবসান হবে। বাংলার মানুষ এতদিন রাওয়ালপিন্ডি-ইসলামাবাদ শহরের সুরম্য প্রাসাদ আর রাস্তাঘাটের জন্য টাকা জুগিয়েছে। তাদের হাড়ভাঙা ঘামঝরা শ্রমে সৌন্দর্য পেয়েছে পশ্চিম পাকিস্তান। পুবের অংশে কোনোকিছু হয়নি। আজও এখানকার লক্ষ মানুষ রাতে খালিপেটে ঘুমোতে যায়। পোড়ামাটির শানকিতে মোটা চালের ভাত খোঁজে। একটু লবণ একটি পেঁয়াজ। এখানকার গরিব আখ ফলিয়ে চিনি করে, মিষ্টির স্বাদ নেয় পশ্চিমের মানুষ। বাঙালি এবার ক্ষমতায় গিয়ে হিসেবের ভাগ কড়ায়গণ্ডায় আদায় করবে। এত স্বপ্ন এত আয়োজন, অথচ ক্ষমতা অর্পণের দাবা খেলা তালবাহানা চলে। চলতে থাকে আলোচনা আর আলোচনা। ধৈর্যেরও সীমা থাকে। অবশেষে সাতই মার্চ মুক্তির ডাক। স্বাধীনতার আহ্বান।

আমাদের গল্প-কাহিনির আড্ডা। কথার পিঠে কথা চলে। ইয়াহিয়া খান বাঙালিকে ক্ষমতা দেবে না। পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয়ী পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে রাখে। সারা বাংলার মতো দিনাজপুর শহরের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ গোপনে ভারতের সঙ্গে শুরু করেন যোগাযোগ। সভাপতি অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান, সম্পাদক ইউসুফ আলীসহ আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা প্রমুখ নেতাও মুক্তি আন্দোলনে একাত্ম হতে থাকেন। জনগণের রায় বাস্তবায়িত না হলে…সামরিক জান্তার বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষমতা না পেলে কী করা যায়; চলতে থাকে সেই গোপন প্রস্তুতি। আমার শহর বাদ থাকে কেন? সারাদিন মিছিল স্লোগান মিটিং-এর সঙ্গে এগিয়ে যায় গেরিলা প্রশিক্ষণ। ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্ট থেকে সদ্য অবসর নেওয়া জর্জ মিয়া দায়িত্ব নিয়েছেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে একাডেমি স্কুল। তারই বিস্তৃত মাঠে শুরু হয়েছে ড্রিল শেখার ছায়ায় অস্ত্র চালনার কায়দাকানুন শেখা। গোর-এ-শহিদ ময়দান, খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল অ্যান্ড পাবলিক লাইব্রেরি (বর্তমান নাম : হেমায়েত আলী পাবলিক লাইব্রেরি) আর এখানে-ওখানে যেতে-আসতে দেখি মুক্তিসেনারা লেফ্ট-রাইট দেখি। তাদের হাতে ক্যাডেট প্রশিক্ষণের কাঠ-রাইফেল। একদিন সত্যিকারের অস্ত্র হাতে আসবে। সেই ভরসায় অব্যক্ত চোখে-মুখে উদ্দীপ্ত স্বপ্নরেখা জ্বলজ্বল করে। বাংলার আকাশে পতপত উড়বে লাল-সবুজ পতাকা। সেই পতাকার মধ্যখানে একটি মানচিত্র জ্বলজ্বল উজ্জ্বল ঘোষণা করে যায় নতুন দেশ, দেখ পৃথিবীর মানুষ, এই আমাদের সোনার বাংলা। আমার সোনার বাংলা…আমি তোমায় ভালোবাসি।

পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবস তেইশে মার্চ। এবার কি আগের মতো উৎসব হবে? বাঙালি ইপিআরদের মধ্যে সন্দেহের বীজ দানা বেঁধে উঠেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফার্স্ট ফিল্ড কোম্পানির দেড়শ সৈন্য দু-দিন আগে আচমকা এসে পড়ল। তারা কুঠিবাড়িতে না গিয়ে সার্কিট হাউসে ছাউনি ফেলে। এমন কখনও হয়নি। রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের মধ্যে জিজ্ঞাসা। তাদের মনে সন্দেহ আর আশঙ্কা ঘনীভূত হতে শুরু করে। সেক্টর কমান্ডার কর্নেল কোরেশী পরদিন ব্যারাক সংলগ্ন আমবাগানে দরবার আহ্বান করলেন। আগের দিনের মতো একই আদেশ। সেনাবাহিনীর অফিসার আর অবাঙালি ইপিআর ছাড়া সকলেই সিভিল পোশাকে হাতিয়ারবিহীন উপস্থিত হবেন। বাঙালি কেন সেই কথা মেনে নেবে? ওইদিন দরবারে কোরেশী প্রকাশ্যে বলে উঠলেন, ‘তুম বাঙালি লোগ হারামখোর গাদ্দার হ্যায়। তুমহারে পাস না কোই ঈমান হ্যায়, না সাচ্চা ইসলাম, না ওয়াতন্ কে লিয়ে কোই মহাব্বত।….তুম লোগো কা সাথ্ এ্যায়সা কারওয়াই করনা হোগা য্যায়সে কুত্তো কা সাথ্ কিয়া যাতা হ্যায়।’ দরবার শেষে বাঙালি সৈন্যরা যাতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে না পারে সেই কৌশল হিসেবে অনেককে ঠাকুরগাঁও এবং সীমান্তে বদলির আদেশ জারি করা হলো। পরিস্থিতি মহা সংকটের দিকে ধাবিত হতে থাকে। তারপর কালরাত্রি পঁচিশে মার্চ। ঢাকাসহ বড় বড় শহরে ঘুমে আচ্ছন্ন মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানি সেনারা। যাকে যেখানে পারল হত্যা করল। শিশু-নারী- পুরুষ-বৃদ্ধ কেউ রক্ষা পেল না। যাদের রক্তে ভেসে গেল সব, তারা জানল না কে হত্যা করল, কেন আর কী জন্য, কোন্ অপরাধে।

দিনাজপুর শহরের পরিস্থিতি ভালো নয়। অনেকেই কোনো অজানা আশঙ্কায় চিন্তাগ্রস্ত। আমার মহল্লা অবাঙালি প্রধান। সকালে বাবা-মা ভাইবোন সবাই রিকশা নিয়ে গ্রামে চলে গেলাম। এ হলো পালিয়ে যাওয়া। বাবার কঠিন নির্দেশ। দাদুবাড়ির আঙিনায় বসে শহরের খবর নেওয়া হয়। গ্রামে হয়তো তেমন নিরাপত্তাহীনতার ভয় নেই। আমরা জানি, আমরা দেখেছি শহরের অবস্থা। কেউ কারও দিকে তাকাতে পারে না। মানুষের অপাঙ্গ দৃষ্টিতে কী আছে কে জানে? কেউ জানি না কে কোথায় খঞ্জরে শান দেয়। তাই পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা। একদিন-দুইদিন-তিনদিন। শহরের কোনো খবর পাওয়া যায় না। এই সময়ের গল্প শুনি বাচ্চু আর মহিদুলের কাছে। সেই গল্পে যোগ দেয় মনোয়ার-রাফিদুল-শহিদ আরও কেউ কেউ। শহিদ আর মনোয়ার আমাদের অনেক সিনিয়র। তারা অনেক জানে। কলেজের আইএ-বিএ  ছাত্র। রাজনীতি করে। ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়ন। কখনও মোতালেব ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। ছাত্রলীগ অফিসের বারান্দা ছেড়ে কোনোদিন লুডুমিয়ার দোকানে ক্যাপস্ট্যান সিগারেট কিনতে যান। গণজাগরণ সংগীত আসরে গভীর কণ্ঠে গান করেন। এতকিছু ভালোলাগার মধ্যে এই সময়ে মন খারাপ হয়ে থাকে। দাদুবাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। মা-বাবা আর ছোট ভাইবোনেরা কেমন আছে? বাবা এসেছিলেন। বুকে জড়িয়ে কঠিন শাসন শেষে আদরের আবদার। শহরের পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশে কী হতে চলেছে কে জানে…ফিরে চল। কোর্ট-কাচারি বন্ধ। সবকিছু খুললে আবার আসা যাবে। এখানে তোকে একা ছেড়ে থাকা যায়? ইত্যাদি কথার মধ্যে তার শাসন আর রাগ। দুর্ভাবনা দুশ্চিন্তা। আমার নাছোড়বান্দা মন কিছুতেই নরম হয় না। অবশেষে বাচ্চুর ওপর দায়িত্ব দিয়ে বিষাদ চোখে ফিরে গেলেন। আমি কোনোদিন বাচ্চুর বাড়িতে খাই। কোনোদিন মায়ের ধর্মবাবা তোজাম্মেল নানার বাসায়। এই সকল ভাবনার মধ্যে গল্প আর আলোচনা। কথায় কথায় নানান দৃশ্য ছায়া ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। এপ্রিলের উতলা বাতাস চোখে-মুখে ছড়িয়ে রাখে অস্থির বিষাদ শঙ্কা। কখনও দূরাগত ভাটিয়ালি সুর বয়ে আনে স্বপ্নের মায়াজাল। আলিম বাঁশিঅলা কোথাও সুর তোলে। দেশ স্বাধীন হবে। বাংলাদেশ। আমার সোনার বাংলা। আমাদের বিকেল গল্পে গল্পে সন্ধ্যে, সন্ধ্যে থেকে রাত; তারপর রাত পাহারা চোখ সতর্ক দৃষ্টি ছড়িয়ে রাখে। রাত কত? কারও রিস্টওয়াচ ইরিডিয়ামের আলোয় জানান দেয়। জেলখানার এখন আর ঘণ্টি বাজে না। কেননা এ তো জেলের প্রাচীর নয়, গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। কয়েদি মানুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুুষজন সকলেই মুক্ত হাওয়ায় হুড়হুড় করে বের হয়ে গেল। এখন কে চোর-ডাকাত আর কে ভদ্র সাধারণ মানুষ বোঝার উপায় নেই। সারা শহর জেল-কারাগারের মতো অস্বস্তি-অস্থিরতার গোলকধাঁধা বিস্তার করে রাখে। আমরা এখন কী করব?

আমরা সকলেই কাঠের ঘরবাড়ি থেকে নিচে নেমে ড্রেন পেরিয়ে রাস্তায় আসি। আবছায়া আলোয় দেখা যায় মুনিয়া দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। সে আধশোয়া কিংবা ভেঙে পড়েছে, জীবিত কিংবা মৃত অথবা মারা যাচ্ছে বোঝা যায় না। প্রায় তিন-চার বছর হয়, আহমদ চাচা গণেশতলার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে নিউটাউন চলে গেছেন। কোয়াটার পেয়েছেন। সেখানকার বাজারে দোকান চলে। বই বাঁধানোর ফাঁকে ফাঁকে পুরোনো আলমারির তাকে স্টেশনারি পণ্য শোভা পায়। কোনোদিন বড়মাঠে স্কুললীগ ফুটবল খেলা শেষে বেড়াতে যাই। কখনও মুনিয়ার দেখা হয়। প্রায়শ হয় না। কোনো অচেনা মায়া জড়িয়ে থাকে তার দু-চোখে। ঠোঁটের কোনায় রহস্যময় মায়াবী হাসির রেখা। কী কথা হয় চোখে চোখে, মন থেকে মনে, ইথারের মায়ায় বোঝা যায় না; আমার মাউথঅর্গান হারিয়ে গেছে। তারপর দিন গড়াতে গড়াতে সময়ের দূরত্বে অনেক চেনা-জানা বন্ধন সম্পর্ক মুছে যায়। মুনিয়াকে আর দেখা হয় না। জগৎ সংসারে এই নিয়ম।

আমি মেয়েটির দিকে ঝুঁকে পড়ি। আসলেই কি মুনিয়া অথবা অন্য কেউ যাকে ভুল ভেবে ভুল করে বসি? তার বিস্রস্ত বেশবাস। মাথার চুল এলোমেলো পাগলিনি। নক্ষত্রের হালকা আভায় কেবল একটি ফরসা মুখছবি হাজার জিজ্ঞাসা তুলে ধরে। সেই জিজ্ঞাসায় একটি জবাবের অনুসন্ধান করতে থাকে আমিও। তার কপালের ডানদিকে কেটে রক্ত জমাট। চোখ-মুখ বসে চোয়াল উৎকট হয়ে আছে। শরীর কিংবা পাজামা-কামিজ থেকে অদ্ভুত বোঁটকা গন্ধ। এ মুনিয়া হতে পারে না। আমাদের ঝুঁকে পড়া দৃষ্টি কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক অন্বেষণে উত্তেজিত হতে থাকে। শহিদ জিজ্ঞেস করে,Ñ

‘এই তুই কে? কোথা থেকে এসেছিস?’

‘এত রাতে এখানে কী? তোর নাম কী?’

অন্য একজনের প্রশ্ন। উত্তরের জন্য অপেক্ষা। মেয়েটি মাথা তোলে। তার কোটরগত চোখ অসহায় বোবা দৃষ্টি সহ্য করা যায় না। তারপরও মন মুখিয়ে থাকে। কে এই মেয়ে? এবার আমাদের কী করণীয়?

‘ভাইজান কুছ খানে কো হ্যায়?’

‘তোর নাম কী?’

‘ম্যায় আইরিন ভাইজান। উধার মেরে ঘর হ্যায়।’

‘তুম কাঁহা থে?’

এই জিজ্ঞাসার জবাব হয়তো জানা আমাদের। আমাদের ঝুঁকে নেমে যাওয়া মাথা, চোখের দৃষ্টি আরও একবার উঠে দাঁড়ায়। তাই কি? আমি জানি না। পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকায় যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ হয়ে যায়, সেই আতঙ্ক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলা। দিনাজপুরেও সংক্রমিত হয়। কোনো অণুজীব আতঙ্কের মতো বিস্তৃত হতে থাকে গ্রামাঞ্চলেও। কেউ কেউ শহর ছেড়ে গ্রামের নিরিবিলিতে নিরাপত্তার সন্ধানে ছুটে যায়। নিজে বাঁচতে হবে। পরিবার রক্ষা করা চাই। পরদিন ছাব্বিশে মার্চ সকাল এগারোটায় শহরে কারফিউ জারি হলো। মানুষ অবরুদ্ধ। রাস্তায় টহল দিয়ে চলেছে পাঞ্জাবি-পাঠান আর বিহারিরা। বাতাসের ডগায় ভেসে ভেসে উড়ে চলেছে হাজার গুজব। নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। সৈয়দপুরে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গাফ্যাসাদ। সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত। জেলা প্রশাসক ফয়েজউদ্দিন আর বাঙালি সেনা ক্যাপ্টেন নজরুল হক সার্কিট হাউসে বন্দি। দশমাইল এলাকায় ব্যারিকেড দিতে যাওয়া কয়েকজন বাঙালি যুবককে কুঠিবাড়িতে ধরে আনা হলো। প্রচণ্ড নির্যাতন চালানো হয়। তাদের লাশ পাওয়া যায় ঘাগড়ার পাড়ে। এরই মধ্যে কুঠিবাড়িতে বাঙালি জওয়ানদের বিদ্রোহ। চারদিকে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের আগুন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সার্কিট হাউসে শুরু হলো আলোচনা বৈঠকের নামে অভিনব মঞ্চায়ন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ হত্যার কৌশলী ষড়যন্ত্র। একসময় বাইরে  বৈঠকে সকল রাজনীতিককে হত্যার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ কারফিউ ভঙ্গ করে পুনর্ভবা নদীপাড়ে জড়ো হতে শুরু করে। এরই মধ্যে দশমাইলে ঘটে গেল আরও কিছু নৃশংস হত্যার ঘটনা। কুঠিবাড়িতে অবাঙালি ইপিআরের দল কিছু বুঝে উঠবার আগেই সবকিছু দখল করে নিল বাঙালি সৈনিক। নিহত হলো পাঞ্জাবি-পাঠান ইপিআর। কুঠিবাড়ির ভেতরের গোলাগুলির আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে শহরের প্রায় সব জায়গায় আতশবাজির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছে। মানুষজনের ছোটাছুটি চিৎকার আর্তনাদ আর গোলাগুলির ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পুরো শহর। কে কাকে মেরে ফেলছে, সে বাঙালি নাকি বিহারি কে দেখে? মানুষের কানে কানে হাজারও কথা, সে-সবের কতটুকু সত্য কিংবা গুজব; কে জানে? কে যাচাই করে? তাদের চোখে-মুখে শুধু অচেনা আতঙ্ক ঘুরেফিরে ডেকে আনে অন্ধকার।

তেমনই অন্ধকারের মধ্যে ত্রিশ মার্চ বাঙালি সেনাগণ পাকিস্তানি পাঞ্জাবি-বেলুচ-পাঠান সৈন্যের কবল থেকে দিনাজপুর শহর মুক্ত করেন। দেশের অন্য অনেক এলাকায় তখনও পাকিস্তান সেনার অধীনে। সাতই মার্চের পর যেমন সৈয়দপুরে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গার খবর ছড়িয়ে পড়ে, অনেক অবাঙালি-বাঙালি নিহত হন; তেমন দিনাজপুর শহরের বিহারিও বাদ যায়নি। তাদের অনেকের লাশ পুনর্ভবা নদী পাড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাই শহর মুক্ত করেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং যাতে আর কোনো অবাঙালি হত্যার শিকার না হয়, সেদিকে দেওয়া হয় কঠোর মনোযোগ। সকল মানুষের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা। অবাঙালি অনেক পরিবারকে নিরাপত্তা বলয়ে বা আশ্রয়ে আনা হয়। তারপরও উন্মত্ত মানুষের ক্রোধ থেকে অনেকে রক্ষা পায়নি। আইরিন পালিয়ে এসেছে তেমনই এক শিবির থেকে। তার সেই শিবির বা স্কুলের নাম মনে নেই। রাতের অন্ধকারে স্বার্থবাদী নিষ্ঠুর কোনো দল সেখানে হামলা চালিয়ে অনেককে মেরেছে। পাহারা বসিয়ে চলেছে লুটপাট আর বিবিধ অপকর্ম। রেহাই পায়নি সে। অচেতন হয়ে পড়েছিল রক্তাক্ত মেঝেয়। আতঙ্ক-ভয়ে বের হতে পারেনি। কিন্তু কতদিন? দুই তিন কিংবা চারদিন পেটে কোনো দানা পড়েনি। সে ভেবেছিল বেঁচে নেই। বেঁচে থাকা বড় স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্ন। একটি নাকি দুটি গুলি চলে যায় কপালের পাশ ঘেঁষে। তারপর মনে নেই।

এপ্রিল চার, একাত্তর। আওয়ামী লীগ এবং রাজনৈতিক অন্যান্য দলগুলোর সাধারণ সভা। দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিকের আগমন। ভারত থেকেও এসেছেন কয়েকজন। গঠন করা হয়েছে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদই দেখবে শহরের শান্তি-শৃঙ্খলা আর মুক্তি সংগ্রামের গতিপথ। আমরা এমন কথা জেনে গ্রিন রুমে বসে আড্ডা দিই। আমাদের আলোচনা একুশে ফেব্রুয়ারি, ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন আর সাতই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে নতুন কোনো দিশার সন্ধান করে। এপ্রিলের বাতাস হলকা ঢেউ হয়ে পাশ দিয়ে বয়ে যায়। কোথাও পচে যাওয়া শবদেহের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। কেউ কেউ কপট নিঃশ্বাসে নিজেদের কথা ভাবে। আমার মনেও মা-বাবা আর ছোট ভাইবোনের কথা। কেমন আছে তারা। আগামী দু-একদিনের মধ্যে যেতে হবে। তোজাম্মেল নানাকে বলে রেখেছি। বাচ্চু তার সাইকেল দেবে। দশ মাইলের পথ। একঘণ্টার মধ্যে যাওয়া যায়। রাস্তায় তিনটি নদী। সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসতে পারব ভরসা আছে। বাবা আমায় আর আটকাবে না। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখাব ভেবে রেখেছি। মা-বাবা অবশ্যই রাগ করবে না।

আইরিনকে নিয়ে কী করা যায়? মনোয়ার অবশেষে চিনতে পেরেছে। তার বাড়ির দুই বাড়ি পেছনে আকরাম মুদিঅলার মেয়ে। এবার এসএসসি দেবে। আমার শুধু মুনিয়ার কথা মনে পড়ে। অনেকদিন দেখি না তাকে। কেমন আছে সে? আমার হাতে ক্যামেরা। বাচ্চু বলে দিয়েছে, হাত যাতে না কাঁপে; ক্যামেরা নড়ে গেলে ছবি ভালো হবে না। সেদিন পুরো ফিল্ম শেষ করে আসি। আঙিনার পুবপ্রান্তে হালকা রোদ। কসমস-ডালিয়া আর গাঁদা ফুলের বাগান। সেখানে বেঞ্চ পাতা হয়েছে। মাসুমা তার বান্ধবী মুনিয়াকে নিয়ে বসেছে। মুনিয়াকে অনেক সুন্দর দেখায়। আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো পরি। আমি একবার দূরে আরেকবার কাছে গিয়ে মাথায় হাত দিয়ে পজিশন ঠিক করে দিই। মাসুমা মিটিমিট হাসে। একফাঁকে ফিসফিস করে বলে, ‘ভাই মুনিয়াকে কিন্তু আমার ভাবি করব, বেশি স্পর্শ করিস না, ক্ষয়ে যাবে।’ মুনিয়া শুনে ফেলে। চোখ-মুখ লাল করে তাকায়। আমার লাজুক দৃষ্টি। কোনো ছবিই ভালো হলো না। আমার হাত বারবার কেঁপে যায়। সুস্থির থাকে না। বুকের কাঁপন কোনো অচিন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে।

আইরিনের জন্য খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনোদিন বিকেলে যেমন বাদাম কেনা হয়, কিছু বিস্কুট কিংবা পেটিশ; তারই কিছু ছিল। মেয়েটি বাদাম খায়। মনোয়ার বাদামের খোসা ছড়াতে ছড়াতে জিজ্ঞেস করে, –

‘আকরাম চাচা কোথায়? চাচি? তোর ছোটেভাই?’

‘জানি না ভাইয়া?’

‘তুই কোথায় ছিলি? কেমন করে বাহার এলি?’

‘কুছ জানি না ভাইয়া।…ভাইজান মুঝে মার দোগে?’

আইরিনের ভাবলেশহীন চোখে-মুখে আচমকা আতঙ্ক দোলা দেয়। মনোয়ার জগ থেকে পানি ঢেলে খাওয়াতে থাকে। এই একটি কথায় আমাদের কোথায় দেশ কোথায় আন্দোলন সব থমকে দাঁড়ায়। আমরা চমকে নিজেদের মুখ দেখতে থাকি। সেখানে কোনো বিশ্বাস-ভালোবাসা-প্রেম আছে কি না দেখতে পাই না। অথবা আমাদের কাছে জিজ্ঞাসা বড় অভিনব বড় অদ্ভুত লাগে। আমরা এমন শব্দের সঙ্গে পরিচিত নই। মনোয়ারের হাতে অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাস। সে কাঠের মেঝেয় রেখে ঘোষণা করে বসে।

‘তোরা কিছু মনে না করলে একটি কথা বলি?’

‘বল বল। একে নিয়ে কী করব আমরা? শালা বিহারির বাচ্চা।’

‘ওভাবে বলছিস কেন? সে কী জানে?…আমি একে বিয়ে করতে চাই।’

‘কি! ব্যাটা কয় কি? প্রেম উথলে উঠছে? কী খাওয়াবি? তোর তো কোনো চাল নাই চুলো নাই। ভ্যাগাবন্ড। এ ছাড়া মেয়েটি বিহারি। আমাদের শত্রু। বিহারিরা অনেক বাঙালিকে জবাই করেছে।’

‘এর তো দোষ নাই। আমি একে বিয়ে করব।’

‘আমি বলি কি, একে কসবায় আমার মামার কাছে রেখে আসি। শহরের পরিস্থিতি ভালো না। কোন্ সময় কী হয়। আর একজন সেয়ানা মেয়ে এখানে থাকবে কী করে?’

আমরা মহিদুলের কথায় মেয়েটির দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকাই। কথা ঠিক। কিন্তু মহিদুলের একশ কথার মধ্যে আশিটা মিথ্যে। তার কী মতলব কে জানে? আশ্রয়ের নামে অন্যকিছু করবে না তো? কে জানে? তারপরও প্রস্তাব মন্দ লাগে না। সেখানেই যাক, বাঁচার অন্তত সুযোগ আছে। সে বাঁচবে। সে বেঁচে থাক।

‘সেই ভালো। এখন রাত প্রায় দুটো। ভোর থাকতে থাকতে নিয়ে গেলে হয়। তারপর পরিস্থিতি ভালো হলে দেখা যাবে।’

‘কেন বে, ও আমার প্রতিবেশী, আমি বিয়ে করলে কার কী অসুবিধা?’

‘সে পরে দেখা যাবে। আগে ওকে কসবায় রেখে আসি। বাঁচবে কি না কে জানে? এখন কি বিয়ে করার মতো হুঁশ আছে? যত্তসব পাগলের আবদার।’

‘ভাইজান মুঝে মাত মারো।’

আইরিনের ঝুলে পড়া মাথা একবার উঁচু হয়। সে কী বলে অথবা তাকে নিয়ে কী আলোচনা হয় হয়তো বোঝে না। তারপর ভোর ভোর রাত, আকাশে তখন নক্ষত্রের আলো মুছে গেছে, দু-চারটি তারা মিটমিট নিষ্প্রভ জেগে থাকে, পুবের আকশে একটুখানি উষার আভা অথবা অন্ধকার। মহিদুল রাফিদুল মনোয়ার আর শহিদ রেডি হয়। তারা আইরিনকে নিয়ে যাবে। সে হেঁটে চলার মতো তেমন সুস্থ হতে পেরেছে কি না জানি না। সকল ক্লান্তির মধ্যে তার দুটো চোখ ভয়ার্ত অথবা ভাবলেশহীন আমাদের দেখতে থাকে। বিশুষ্ক মুখছবিতে অচেনা অন্ধকার। একসময় সে ক্লান্ত মনোরথ তাদের সঙ্গে যেতে উঠে দাঁড়ায়। তার কান্নাভেজা কাঁপা কাঁপা অস্ফুট আর্তনাদ পাথরের প্রচণ্ড আঘাতের মতো লাগে।

‘ভাইজান মুঝে মার দোগে? মাত মারো ভাইজান…মাত মারো।’

আমার দৃষ্টি কখন ঝাপসা হয়ে গেছে জানি না। কেন? কী জন্য? অথবা সবকিছু ঘটে চলে, যেন এমনই হওয়ার কথা, কেন-কীভাবে. কোনো বোধগম্যতার ভেতরে কিংবা বাইরে; আমরা কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারি না। আমরা কাঠের গ্রিন রুম থেকে বের হয়ে মাঠে নামি। এপ্রিলের ভোররাতে মাঠের সবুজ ঘাসে শীতল শিশির। চারজনের একটি দল রাস্তায় নেমে গেছে। তারা দক্ষিণে সতর্ক হেঁটে যায়। ছায়া ছায়া আবছায়ায় ছায়াগুলো মিশে গেলে ফিরে আসি। রাত ভোর ভোর রাত। সকাল হতে দেরি নেই। আমার মনে স্বার্থপর ভাবনার অনুরণন। সকালে একবার যেভাবে হোক নিউটাউন যেতে হবে। সেই বাড়ির রাস্তা মনে আছে কি না জানা নেই। কেন জানি মুনিয়াকে একবার দেখতে বড় সাধ জাগে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares