গল্প : বিলুপ্ত কৈশোরের দেশে : শাহাব আহমেদ

দেশের নাম চকবরকত।

কীভাবে আমি সেই দেশে গিয়েছিলাম মনে নেই। কবে গিয়েছিলাম তাও কুয়াশার  ধোঁয়াশায় ঢাকা। কেন গিয়েছিলাম মনে আছে, বলবো সময়ে। সম্ভবত গিয়েছিলাম বিজয়পুর থেকে গরুর গাড়িতে চড়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে। পিচ এসফাল্ট নয়, নরম মাটির পথ। পথে খানাখন্দ গর্ত আর গোবরের স্তূপ।

ডান দিকে ধানখেত ডানের দিগন্ত ছুঁয়ে, বামদিকেও ধানখেত বাম-দিগন্তের করপুটে কর রেখে। দূরের আকাশে গলা বাড়িয়ে ছিল লম্বা লম্বা সুপারি গাছ। তালগাছগুলো উস্কোখুস্কো অগোছালো চুলের কৃষকের মতো। নারিকেল গাছের পাতা আকাশকে বাঁকা পিঠ দেখিয়ে নড়ছিল। রোদ ছিল ঝরঝরে কৃষাণীর আঁচলের মতো, সোনালি রোদ নয়, তামায় তাতানো আগুনে পোড়া।সেই দেশে একজনমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।

একজন পীর।

ঢাকা নামের অন্য একদেশে আমি থাকতাম। সেই দেশে তখন কালো চশমা পরে টগবগ করে হাঁটতেন জগৎ-সংসারের ‘এক নম্বর’। অনেক মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তিনি রাতে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতেন। তাকে পিছন থেকে একদল উন্মত্ত ঐরাবত তাড়া করতো। চোখ বুজলেই দৌড়াতে শুরু করতেন, দৌড়াতেন সারা রাত, ক্যান্টনমেন্টের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তার ফাঁসে শ্বাস-রুদ্ধ এককালের বন্ধুদের আত্মা ছিল সেগুলো, যাদের তিনিই গুনে গুনে হত্যা করিয়েছিলেন। সবচেয়ে বেশি তাড়া করতো যে, তার সাঁড়াশির মতো হাত প্রায় ছুঁয়ে ফেলতো। শুধু এক পা, একটি পায়ের দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতো না রজ্জু গলার কর্নেল।

 ছেঁড়া গেঞ্জি ঘামে ভিজে জেগে উঠতেন কালো চশমার মেজর জেনারেল। জল খেতে গিয়ে মনে হতো রক্ত পান করছেন। যুদ্ধে নিহত নামহীন অজস্র মানুষের রক্তের সাথে মেশানো আরও অনেকের রক্তের নোনা স্বাদ জলে। তৃষ্ণা আরও বাড়তো। মুক্তিযোদ্ধার রক্ত ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় পানীয়।

আবার তাই ছিল তার দুঃস্বপ্নের জন্ম-ঠিকুজি। মুক্তিযুদ্ধের আগুনে বিশুদ্ধ হয়েছিল যারা, তারা ছিল বিষকাঁটা তার বিশাল পরিকল্পনার পথে।

তিনি ঘন ঘন রাষ্ট্রীয় সফরে যেতেন বিভিন্ন পীরের দেশে । আসতেন চকবরকত রাষ্ট্রের রাজধানীতেও। সেখানকার রাষ্ট্রপ্রধান তাকে মৃতদের কুনজরের থেকে রক্ষা-তাবিজ দিতেন।

আর দিতেন রাষ্ট্র চালনার আক্কেল। কারা মিত্র, কারা নয়, কাদের গলা কাটতে হবে তিনি পইপই করে চিনিয়ে দিতেন। এই দ্বি-পাক্ষিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে পীর তার দেশের মানুষের যথেষ্ট উপকার ও অপকার  করেছেন। কথাগুলো হয়তো নিরপেক্ষ নয়।

‘ঢাকা’ দেশের মত ‘না ঢাকা’ দেশের লোকজনও দুর্মুখ। তারা অযথা কথা বলে বহু এবং সব কথায় কান দিতে নেই। তবে এই পীর বা এই কালো চশমার ‘বীর’ সম্পর্কে এই গল্প নয়। গল্প হলো সেই পীরের দেশ নিয়ে। দেশটা সুন্দর! সেখানে টাকা-পয়সার লেনদেন হতো বেশ।

যেখানে গরু ছাগল ভেড়া বকরি আর নিরীহের চেয়েও নিরীহ কৃষক বেশি সেই সব জায়গায় সেই আমলে কোনো ব্যাংক শাখা খুলতো না। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে এখানে একটি ব্যাংকের শাখা খুলিয়েছিল। সেই শাখায় গরুই হাঁটতো মূলত, স্তূপ স্তূপ গোবর ডিপোজিট করে। মাঝে মধ্যে দু-একজন মানুষ যেত টুপি মাথায়। কিছুদিন আগেও এই টুপি-গোষ্ঠীর অন্য বিশেষণ ছিল কিন্তু এখন তারা সাচ্চা।

এই দেশপ্রেমিকদের সেবা করার জন্য আমার পরিচিত এক লোক সেই ব্যাংকে গিয়েছিল ম্যানেজার হিসেবে। কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলায় আসা পোস্টমাস্টার বাবুর যে দশা হয়েছিল প্রায় এক শতাব্দী আগে, এই ভদ্রলোকের অবস্থা তার চেয়ে ভালো ছিল না।

বড় কষ্টে দিন কাটছিল। আমার যে শত্রুর শত্রু, মায়ের পেটের বিষফোঁড়া বোন, সবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ করেছে। বাবা বলল, তাকে ঐ ভদ্রোলোকের কাছে দিয়ে আসতে।

না এমনিতেই নয়। ঐ লোক কিছুদিন আগে দেনমোহর- কাবিন-কবুল ইত্যাদি ঝামেলা অতিক্রম করে তার বৌকে আমাদের বাসায় রেখে গিয়েছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য।

সে আমার বোন নয়, ঘসেটি বেগম।

আমার রং ও বর্ণাভার তালিকায় তখনও বাস্তব জগতের ধূসর রংটি যুক্ত হয় নি। আমি ছিলাম ভেদা মাছের মতো নরম ও নির্বোধ। অপটু ছিল পার্থিব বস্তু-বোধ। ট্রেনে পচন, বাসে ঝাঁকুনি, তারপর গরুর গাড়ি । আজাব আর কাকে বলে। সারা রাস্তা মায়ের পেটের শত্রুর বকা শুনতে শুনতে কানের খৈল কান ছেড়ে ঝাঁপ দিয়েছে। তারপরেও গিয়েছি। পুরুষের কাজ, এগিয়ে যাওয়া, পছন্দ না হলেও। তার মানে আত্মহত্যা করা নয়। অবশ্য আত্মহত্যা করলেও খারাপ হতো না।

২.

তবে আমার চকবরকত দেশটি খুব ভালো লেগেছিল।

গাছপালা ছায়া অনেক। ঝুঁটিওয়ালা লাল মোরগ, প্যাঁক প্যাঁক করা হাঁস, চিনাবাদামের মতো গোটা গোটা ‘লাদা’ নিষ্ক্রমণ করা বকরি, আর দার্শনিকের মতো দাঁড়িওয়ালা চোয়াল নাড়ানো ছাগলের আগে এত কাছ থেকে দেখি নি। ভোরের আলো হবার আগে পাখির আনন্দ-কোলাহল, কিচির-মিচির আর মোরগের আজান। পাখি সেখানে নিজেই গায়। লাল ও গোল সূর্য ওঠে মাঠ ছাড়িয়ে অনেক দূরে পুবের বারান্দায় আর সন্ধ্যায় অস্ত যায় মাঠ পেরিয়ে অনেক দূরে পশ্চিমের চৌহদ্দিতে। ভালোবেসে বাঁকা হয়ে চেয়ে থাকে বকফুল। চেয়ে থাকে সমস্ত অন্তরাত্মা উজাড় করে দিয়ে।

আমি ‘ঢাকা’ দেশের কীট-সুজন, শহরেই জন্ম, শহরেই বড় হয়েছি। এ সবই আমার নতুন অভিজ্ঞতা। অমন আদিগন্ত মাঠ দেখার সুযোগ আমার আগে হয় নি। সাপ যেমন এঁকে বেঁকে হাঁটে তেমন করে রাস্তাও যে খেতের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে হারিয়ে যেতে পারে এই ধারণা আমার ছিল না। শহরের মতো রাস্তার আবর্জনা, ড্রেনের গন্ধ, বাসের ভো, ট্রাকের কৃষ্ণকলি পশ্চাৎ নির্গমন, রিকশার টুংটাং বা পায়ের ওপর দিয়ে রিকশার চাকা উঠে যাওয়ার সৌন্দর্যের বাইরেও যে একটা জগৎ আছে, আমি এই প্রথম জানতে পেরেছিলাম।

আমার তখন সবে নাকের নিচে দিকচক্রবালের ক্ষীণ রেখার মতো ঈষৎ কালো রেখা দেখা দিতে শুরু করেছে। রাতে রাতে গন্ধম বাগানে হাঁটার তীব্র ইচ্ছেরা মাতোয়ারা করতে শুরু করেছে। পাশের বাড়ির ‘তরু’কে নিয়ে রঙিন ফানুস কল্পনা আর ওর বেণী-ত্রিবেণী-স্তন ইত্যাদি নিয়ে কৌতূহলে মাথা কিলবিল করতো বলে সহজে ঘুম আসতো না। আর কষ্টের ঘুম যখন আসতো, লুঙ্গির নিচে নড়াচড়া শুরু করতো তাগড়া ও বুদ্ধি-বিবেকহীন এক চিকা। চোখে এত এত রং ও বর্ণাভা ধরা পড়তে শুরু করেছে যে রীতিমত অবাক হয়ে ভেবেছি ওই রঙগুলো আদৌ আগে ছিল, না ছিলো না? ১-২-৩ বছরের বড় বন্ধুদের কাছে জানতে পেরেছি, ছিল। শুধু আমার চোখে সব রঙ দেখার ‘রড’ ‘কোণ’গুলো তখনও সাবালক হয় নাই। বিড়ি ফুঁকে দেখেছি, ভালো লাগে নাই, কিন্তু বন্ধুদের কাছে খাটো হতে চাই নি। চালিয়ে গেছি। অভ্যাসের সিঁড়ি বেয়ে ভালো লাগতে শুরু করেছে যখন, তখন বাবার হাতে মার খেয়েছি।তা সত্ত্বেও বাবার পকেট থেকেই দুচারটা সিগারেট যে চুরি করি নাই তা নয়।

এ ছিল সেই সময়টা যখন ‘ঢাকা’ দেশে স্বাধীনতার স্বপ্নের বুক ঝাঁঝরা করা হয়ে গেছে, অঘাটায় ঘন ঘন ফাঁসির উৎসব চলছে, আর গট গট করে হাঁটছে কালো চশমার একজন স্বঘোষিত ‘এক নম্বর’। এখন সে সময়টা ভুলে গেছে সবাই, আমিও। তবে কালো চশমার সেই ‘এক নম্বর’কে এখনও অনেকেই পীর মনে করে। কিন্তু আমার যৌন জাগরণের সমান্তরালেই ঘটেছিল পিতৃহত্যা, রক্তপাত ও স্বপ্নের নিধনযজ্ঞ। চলছিল বলেই আমার একটার কথা মনে করতে গেলে, অন্য অনেক কথা অবিকল মনে আসে সারি সারি পিঁপড়ের মতো।

অবশ্য মরণ ও মড়ক এর আগেও এই দেশে ছিল। সর্বহারা ও গণবাহিনীর কচুগাছের মতো গলাকাটার উৎসব ও তাদের ধরার নাম করে রক্ষীবাহিনীর সন্ত্রাস ও যুব-সমাজের নিপীড়ন ছিল বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে। যারা গ্রামে থেকেছে তারা খুব জীবন্তভাবে সে সব স্মৃতি মনে করতে পারে। আমি পারি না। ঢাকা শহরে থাকার এই ছিল সুবিধা, ওই ঘটনাগুলো সেখানে অত প্রকট ছিল না, তাই আমার চোখে ও চামড়ায় গেঁথে যায় নি। তাই মাঝে মাঝে স্মৃতিবিভ্রম হয়, মনে হয় ৭১ এর পরে এবং ৭৫ এর আগে বাংলাদেশে রক্ত আর ঝরে নি। স্মৃতি ঝাঁঝরের মতো।

বৌ যার, তার জিম্মায় বোনকে রেখে আমি গরুর গাড়িতে চড়ে বসি। সেই অনিন্দ্য আপাত শান্তির চকবরকতের মেঠো চিত্রের ঢাল বুকে ও দৃষ্টিতে গেঁথে বর্ডার পার হয়ে আসি। ওটা অন্য দেশ, সম্পূর্ণ ভিন্ন, কৈশোরের দেশ। স্মৃতির কুজ্্ঝটিকার আড়ালে।

আমার দেশ ঢাকা। আবারও মনে করিয়ে দেই, আমার দেশেই ৩২ নম্বর সড়কের সিঁড়িতে উবু হয়ে ছিল বিশাল ঝাঁঝর বুক। অদূরে ছিটকে পড়েছিল ট্যোবাকোর পাইপ আর জেলের নিরাপত্তায় নিহত হয়েছিল বিশাল আয়তাকার আশা। আমি কি কিছু ভেবেছি গরুর গাড়ির দুলুনিতে বসে? মনে পড়ে না। আমাদের এত রক্তে অর্জিত বিজয়কে এত সহজে লুণ্ঠিত হতে দেওয়ায় পবিত্র নিহতদের কোনো ভূমিকা ছিল কি? অর্থাৎ তারা কি জাতির এই পরাজয়ে শুধুই ষড়যন্ত্রের শিকার ছিলেন, নাকি ছিলেন ক্ষমতান্ধ প্রকৌশলীও?

৭১ বা ৭৫ এ মাসুম বাচ্চা হলেও এমন প্রশ্ন করা এখন অন্যায়।

দুটি মহিষ আমাকে নাচাতে নাচাতে নিয়ে এসেছিল অন্য এক দেশে। নাম তার বিজয়পুর। সেখানে রিকশা চলে, বাস চলে, ট্রেন ও গরুর গাড়ি চলে। আমি এক রাতের অতিথি হয়েছিলাম এক বাসায়, আত্মীয় নয়, বোন জামাইয়ের কলিগের বাসায়। ভদ্রলোক ছিলেন খুবই ভদ্র, তার বৌ আরও বেশি, আকাশে ওড়া সাদা পেঁজা মেঘের মতো। উষ্ণ ও নম্র দম্পতি।

তাদের একটা ছেলে ছিল ছোট এবং একটা মেয়ে আমার মতোই বয়স। আমার মতো বয়স বলেই সে দেখতে ছিল আমার চেয়ে বেশি প্রস্ফুটিত। মেয়েরা ছেলেদের আগে ফোটে।

ছেলেরা ধীর, শরীরেও, মগজেও।

ওর চোখ দুটো ছিল বড় বড় পদ্মফুলের মতো। চোখের তুলনা পদ্মফুলে হয় না, কিন্তু ওর চোখ দুটো আসলেই ছিল পূর্ণফোটা পদ্মফুলের মতো। এত্তো এত্তো বড়! চাঁদনি রাতের তীব্র গোল চাকতি যেন! ওর মুখে একটুও বেমানান ছিল না। মনে হয়নি গ্রাম্য মেয়ের ‘এলিয়েন’ চোখ। ওকে তৈরি করার সময় ঈশ্বর হয়তো খুব ভালো মুডে ছিলেন। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। কী যে মায়াবী চেহারা! শুধু তাই নয়, চোখের ডিমের পেটে ছিল, আমি নিশ্চিত, এক জোড়া চুম্বক।

হয়তো তাও নয়, মনে হয়েছে ওই চোখেদের হাত পা ছিল। যেন বুকের চামড়া, মাংস ও পাঁজর ভেদ করে খুব দৃঢ় অকম্পিত হাতটি আমার হৃৎপিণ্ডটা হ্যাচকা টান মেরে বের করে নিয়ে গেছে। নিজেরই বেণীর চেয়ে সামান্য মোটা, লম্বা ও সোজা ও অথচ কী আকর্ষণ। চিকন হওয়ার কারণেই হয়তো মনে হয়েছে আমার চেয়ে বেশ লম্বা। একই কৃশকায়তায় তার ঈষৎ উঁচু বুকে মনে হয়েছে তালশাঁস লুকিয়ে আছে। ঠিক কেন তালশাঁস, কেন কাঁচা পেয়ারা, গাব, সফেদা বা কদবেল নয় তা আমার মনে নেই। মনে আছে সেদিকে তাকিয়ে আমার কেমন যেন খাবি খাওয়ার ভাব হয়েছিল।

৩.

যে কখনও খাবি খায় নি তার মনে হতে পারে এটা বেশ প্রীতিকর কোনো অভিজ্ঞতা। কিন্তু আসলে তা নয়। হঠাৎ স্রোতের ঘূর্ণিতে পড়ে গেলে ডুবা-উঠা-আবার ডুবার যে শ্বাসহীন ক্রিয়া-প্রক্রিয়া চলে, খাবি খাওয়া হলো সেই জিনিস। আমি তার স্তনের সৌন্দর্যে খাবি খেয়েছিলাম। ভেদা মাছের মতো হলেও মনটা ইচড়ে পেকে গিয়েছিল অথবা কাঁচা ছিল নেহায়েতই কাঁচা বরইয়ের মতো। একটা কিছু যে অ্যাবনরমাল ছিল সেটা এখন ঠিক বুঝতে পারি। এখন কোনো বুকই কানে-মাথায় অমন বোমারু বিমানের ঝাঁ ঝাঁ শব্দ করে না।

আহা যদি করতো!

আমরা এক টেবিলে বসে খেয়েছিলাম। সে একটা কথাও বলে নি কিন্তু চোখ দিয়ে আমার মাথা চিবিয়েছে এবং সেটা আমি মাথার হঠাৎ ভারশূন্যতায়ই টের পেয়েছি। মেয়েরা ছেলেদের দিকে, ছেলেরা মেয়েদের দিকে চোরা চোখে তাকাবে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ওর ছোট ভাইটা তখনও এই কেমিস্ট্রির জটিলতাটুকু জানতো না। সে বোনকে এই নিয়ে কিছু একটা ঠাট্টা করেছিল, ‘ছেলে পছন্দ হয়েছে বুঝি ?’

বলা বাহুল্য, যতদূর মনে পড়ে আমি সেখানে বিয়ে করতে যাই নাই এবং আমি ছাড়া সেখানে অন্য কোনো ছেলের উপস্থিতিও ছিল না। কিন্তু মেয়েটির হঠাৎ কী হলো, যেন হিরোশিমার সমান বিস্ফোরণ ঘটলো বিজয়পুর নামক দেশটির এপিসেন্টারে। সে তার ভাইকে সংহার করতে উদ্যত হলো মা কালীর খড়গ হাতে। সে কী চিৎকার চেঁচামেচি। কুরুক্ষেত্রের বমশেলের শব্দের মতো শব্দ। শেষ পর্যন্ত মা ক্ষেপে গিয়ে মেয়েটিকে ঠেলতে ঠেলতে একটি খালি রুমের ভিতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিলো।

এই শিকল তুলে দেবার দৃশ্যটা খুব চোখে পড়ে। পঁচাত্তরের নভেম্বর মাসে এমন শিকল তুলে দেওয়া দরজার উল্টা অন্ধকারে সাংঘাতিক কিছু ঘটেছিল। আলতু ছুটে এসে চেঁচিয়ে বলেছিল, ‘জেলখানায় নেতা গো মাইরা ফালাইছে, হায় হায়!’

আমরা তখন ঘুমাচ্ছিলাম।

একটু জেগে আড়মোড়া ভেঙে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আবার।

কী থেকে কী যে হয়ে গেল!

একটা সুন্দর স্মৃতিময় সন্ধ্যা হতে পারতো কিন্তু হলো অসুন্দর ও কদাকার। দরজার অন্যদিক থেকে দানবী কিশোরীর দক্ষযজ্ঞের শব্দ আসছিল, সে দরজা ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছিল এত শক্তিতে যে, সারাটা বাড়ি যেন থরথর করে কাঁপছিল।

ওর মা চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, ‘বাবা মনে কিছু করো না, আমাদের মেয়েটা অসুস্থ। ওর প্রায়ই এমন হয়, আমরা থামাতে পারি না। ওর যখন রাগ ওঠে আমরা সবাই যেন ওর হাতে জিম্মি। কত মারধর করেছি, ডাক্তার দেখিয়েছি, কোনো কাজ হয় নি।’

নতুন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। এ বাড়ি এ নিয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু অপরিচিত অতিথির সামনে হয়তো প্রথম। বন্দিনীর রুমটির ভিতরে কোনো আসবাবপত্র বা ভাঙার মতো কিছু ছিল না। ছিল শুধু সিমেন্টের ফ্লোর। বসতেও ফ্লোর, ঘুমাতেও ফ্লোর। যেন ওই রুমের ব্যবহার ওই একটাই, ‘ইয়ং ক্যাপটিভের’ রাগ সংহারের আন্দামান। তার চিৎকার ও গালাগালি শোনা যাচ্ছিল দীর্ঘক্ষণ, তারপরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।

রাত বাড়ছিল ধীরে ধীরে। কেউ তাকে শিকল খুলে বের করে আনে নি। গৃহস্বামী বসেছিলেন ভিতরের ঘরে সিগারেট হাতে পাথরের মূর্তির মতো, একটা কথাও বলেন নি। গৃহিণী কাঁদছিলেন নীরবে। ভাইটা কুঁকড়ে গিয়ে বই নিয়ে বসেছিল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। ‘প্রতিটি সুখী পরিবার অবিকল একই রকমের সুখী, প্রতিটি অসুখী পরিবারের দুঃখ ভিন্ন ভিন’, আমি তখনও তলস্তয় পড়ে এ কথা জানি নি।

জীবন শিখিয়েছিল।

ঢাকায় ফিরে এসে শুনি জাপানি প্লেন, ফাঁসি ও মৃত্যুর মহামারি ঝড়ের দমকা হাওয়ার মতো নাড়িয়ে দিয়েছে দেশ। ফাঁসির পরে ফাঁসির প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকার বাইরে প্রতিটি ক্যান্টনমেন্ট। যারা ঝুলছে বেছে বেছে প্রায় সবাই মুক্তিযোদ্ধা। রাজাকার সবছিল নেতৃত্বে, আর্মিতে একজনও ছিল না।

কালো চশমার ‘এক নম্বরের’ দুঃস্বপ্নের নাম মুক্তিযুদ্ধ।

সবাই ভুলে গেলেও, সত্য এ-ই; কালো চশমার দুঃস্বপ্নের নাম মুক্তিযুদ্ধ। তার পরিকল্পিতভাবে বেছে বেছে মুক্তিযোদ্ধা নিধনই বলে সে ছিল সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার সন্তান, অবশ্য পরে বুঝতে পেরেছি।

ঢাকা থম থম করছে। আমার কৈশোরের ঢাকা, থম থমের ‘নাইটমেয়ারের’ দেশ। 

ইতিহাস বোবা শিক্ষক, ইতিহাস কাউকেই কোনোদিন কিছু শিখায় নি।

আহা দেশগুলো!

ঢাকা, চকবরকত, বিজয়পুর। ছোট ছোট দেশ। মসৃণ তাদের সীমান্ত! কোনো পাসপোর্ট ভিসা কাস্টমস নেই। শুধু ফুল আর ফুল আর ঘাস-শিশির-পাখি। স্মৃতি-পাখি উড়ে যায় এক সীমান্ত ছেড়ে অন্য সীমান্তে।

সময় উড়ে যাওয়া চিল। মেয়েরা সুন্দর, সুন্দর বুকে নীলপদ্মের ঝিল।

রক্ত, কান্না ও ফাঁসি। শিকল দেওয়া দরজার অন্ধকারে পিশাচের অট্টহাসি।

ডাকিনী, নাগিনী, হায়েনা, তক্ষক ও তস্করের ভিড়ে সেই দিনগুলোতে আমার দেখা হয়েছিল বাইপোলারের ঝড়াক্রান্ত কোনো এক মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ের সাথে। পদ্মফুলের মতো বড় বড় চোখ ছিল তার। ঈশ্বরের অকল্ক মুডের সময়ে তৈরি।

তার পিতা-মাতা মূর্তির মতো বসে থাকতো রুদ্ধদ্বার হতাশার বিবরে।

তাদের চোখ দিয়ে ঝরতো অশ্রু, ডালা ভাঙা আহত বৃক্ষ-কষের মতো শব্দহীন,

অশ্রু না রক্ত, কেউ বুঝতে পারে না।

 লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : রাজীব দত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares