গল্প : দূর্বাদল : কাজী লাবণ্য

প্রাকৃতিক নিয়মে শরত ফুরিয়ে হেমন্ত আসে। হেমন্ত ফুরিয়ে শীত। নামেই শীত কিন্তু  ঠাণ্ডা কাবু করে না। এ শহরে শীত তেমন একটা কামড় বসাতে পারে না।

বহু বছর আগে, সে বুঝি আরেক জনমের কথা, তখন গ্রামে  ভয়াবহ ঋতুর নাম ছিল শীতকাল। কী কষ্টের সময় ছিলরে বাবা! দিনের পর দিন সুয্যিমামা গা ঢাকা দিয়ে থাকত। তখন কাপড়েরও অভাব ছিল, কিছুতেই শরীর উষ্ণ হতো না। চামড়া ফুঁড়ে মাংস ভেদ করে হাড় কাঁপিয়ে দিত। সে-সময়ে মনে হতো এই শীতকাল বুঝি আর কাটবে না। রাতের বেলা হাড়কাট্টা সামর্থ্যবান জোয়ান মানুষের বাহুর ভেতরে বেড়াল কুণ্ডলী না পাকালে কিছুতেই ঘুম আসত না আমিনার। আবার সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গার পর কিশোরী রোদে উঠোনে পা দিতেই শরীর মন চনমনে হয়ে উঠত। বাড়ির উত্তর দিকে তাকালে যতদূর চোখ যায় হলুদ বিছানা পাতা। রাতের শিশিরে ঘাসের ডগায় চকচকে হীরকদ্যুতি যেন গ্রামের অসংখ্য মেয়ের নাকের নাকফুল হয়ে জ্বলজ্বল করে। আমিনার খুপড়ি হাঁস মুরগিতে ভরা। আগল খুলে কিছু খুদ ছিটিয়ে দিলে ওরা খেয়ে কলকল করে চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। এরপর কাদাপানিতে সামান্য একটু গোবর দিয়ে গোলা করে উনুন ও চারপাশটা লেপে নিয়ে দ্রুত হাতে চাল ধুয়ে তাতে দুটা আলু ফেলে দিয়ে চুলায় বসিয়ে দেয়। শুকনা ঘুঁটের লাল আগুন ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে। ভাত হয়ে গেলে মাড় গালিয়ে হাড়ি নামিয়ে খুপড়ি থেকে একটা ডিম বের করে ভেজে, আলু ভর্তা করে নেয়। বরতনে গুছিয়ে ভাত তরকারি বেড়ে ছেলেকে দেয়। দিয়ে সে একটা ছড়া সুর করে বলতে থাকেÑ

‘ইন পিন সেফটি পিন

পোলায় খায় ভাইটামিন

ভাইটামিনে পোকা

পোলা হামার বোকা’

বলে আর ছেলের গাল টিপে আদর করে। নিত্যদিন এক ছড়া শুনতে শুনতে ছেলে মহাবিরক্ত হয় কিন্তু আমিনার ছড়া থামে না।

আলুভর্তা, ডিমভাজি, গরম ভাত খেয়ে বাবু হয়ে সে স্কুলে রওনা দেয়। আমিনা ছেলের পেছন পেছন ঝুরিনামা বটতলা পর্যন্ত আসে, যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়ে থাকে দূরে সরতে থাকা ছেলের পিঠের দিকে। বিয়ের আগে এই বটতলা ছিল ওদের খেলার আখড়া। এ গাছে দুনিয়ার পাখি থাকে আর ঠিক মধ্যিখানে থাকে হাড়গিলা পাখি। সবাই বলত হাড়গিলা পাখি ছোট বাচ্চাদের ধরে গিলে খেয়ে ফেলে। সে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখে নিয়ে একটা ঝুরি ধরে একটু দোল খেয়ে নেয় আর ওই ছড়াটিই বলতে থাকে, যেটা শুনলে ছেলে বিরক্ত হয়। এরপরে একটা দৌড় দিয়ে বাড়িতে আসে।

গোয়ালের গোবর পরিষ্কার করে পোলার বাপে। গরু, গোয়াল, চালের উপর তুলে দেয়া লাউ গাছের কাজ সেরে মানুষটা ফিরলে বাকি ভাত, ভাতের মাড়, নুন মরিচ দিয়ে ওরা দুজন খেয়ে ফেলে। চাইলে একটা ডিম ভেজে খাওয়া যায়। কিন্তু ওরা তা খায় না। হাঁস মুরগির যে-ক’টা ডিম পায় ছেলে খায় আর বাকিটা বিক্রি করে ছেলের কাপড়, খাতা পেন্সিল কেনায় ভর্তুকী দেয়। মাঝে মধ্যেই ছেলে নানা জিনিসের বায়না করে। দিতে না পারলে বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড করে। তার ফুটবল চাই, নাটাই সহ ঘুড়ি চাই, বায়নার শেষ নাই।

 রিলে রেসের কাঠির মত একের পর এক বছর আসে আর চলে যায়, আসে আর চলে যায়, আর ছেলে বড় হতে থাকে… বড় আরও বড়। একসময় সে এসএসসি পাশ করে। বাবা-মা, আত্মীয় পরিজন, গ্রামের মানুষ ভীষণ খুশি হয়। সবাই বলাবলি করে ক্ষেত মজুরের ছেলে ম্যাট্রিক পাস দিলো!

 এখন তো কলেজে পড়তে হবে। একদিন বাপে বললÑ

দ্যাখ বাপ হামি তো আর পারি না। এই কলেজের খরচ বোলে ম্যালা, তা ক্যাম্বা করি হামি দেমো?

যেমন করি পারো দেও। আমি কি জানি! আমি লেখাপড়া করব। আমি অনেক বড় হব। ঠিক আছে, নাহয় তোমার এই ঘরটা বেইচা দাও। এই খড়ের ঘর থাকি কি হইবে! আমি লেখা পড়া শিখি দালানের বাড়ি করব। যা করা লাগবি কর আমাকে টাকা দেও। বাপ ঘাড়গুজে নতমুখে বসে থাকে। চোখের সামনে দালানের বাড়ি ভেসে ওঠে নাকি বিক্রি ভিটের শূন্য ছবি ভেসে ওঠে কে জানে!

কলেজের দিনগুলিও পার হতে থাকে। আমিনা গ্রামের চেয়ারম্যানের বাড়িতে কাজ করত, এবারে আরও দু বাড়িতে কাজ নেয়। আমিনার স্বামীও এই বাড়িতেই কামলার কাজ করে। দু বছর হয়ে আসে, ছেলের ফাইনাল পরীক্ষা এগিয়ে আসে। সে আরও টাকা চেয়ে পাঠায়। র্ফম্ফিলাপ করতে টাকা লাগবে, কোচিং করা লাগবে, শার্ট প্যান্টও কেনা লাগবে। এখবর পেয়ে স্বামী স্ত্রী সারারাত ঘুমায় না। কোথায় পাবে এত টাকা! ধারকর্য যা আছে সেগুলোই শোধ হয় নাই। কয়েকদিন পর ছেলে অগ্নিশর্মা হয়ে বাড়ি আসে, এসে বাপ মাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, নানান হুমকি ধামকি দেয়, পারে তো বাপের গায়ে হাত তোলে। বাড়িতে তামা-কাঁসার দু একটা হাঁড়ি কলসি ছিল আমিনার বিয়েতে পাওয়া, সেগুলি, সাথে হাঁস মুরগি বিক্রি করে টাকা নিয়ে চলে যায়। আর বলে যায় ১০ দিনের মধ্যে টাকা না পাঠালে এবারে এসে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে।

 দুজনে বহু চিন্তা ভাবনা, শলা পরামর্শ করে। একবার সিদ্ধান্ত নেয় পারবে না আর টাকা দিতে, বেটা যা পারে করুক।

দুদিন পরে একেবারে দুম করে আমিনার স্বামী চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে বলেÑ

ভিটেমাটি টুকু আপনে নিয়া নেন কত্তা। চেয়ারম্যান অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, আরে বোকা তুই তাহলে থাকবি কই? উত্তর না পেয়ে, এরপর দাম জিজ্ঞেস করলে বলেÑ

সে আপনের বিবেচনা। তা চেয়ারম্যান বিবেচনা করে ভালই দাম দেয়। এতদিনের বিশ্বস্ত কামলাকে ঠকায় না।

টাকা নিয়ে ঘরে এনে বউকে দিয়ে বলে

এই নেও বউ, বেটারে দিয়া দিয়ো। রাতের ভাত না খেয়ে সে শুয়ে পড়ে, আমিনার ডাকে প্রথমে সাড়া দেয় না। এরপর মৃদুকন্ঠে বলে ‘ভাত আর খামো না বউ, ভোক তিয়াস ছাড়ি পালাইছে’।

পরদিন সকালে হাল নিয়ে মাঠে গেলে সেখানে বজ্রপাতে গরুদুটিসহ আমিনার স্বামী মারা যায়।

শীত বর্ষা, জোয়ার ভাটা, জন্মমৃত্যু কোন কিছুতেই ছেলেকে টাকা পাঠানো বন্ধ হয় না। বন্ধ করা যায় না। টাকা দিতে না পারলে ছেলে এসে মায়ের গলা টিপে ধরে, হুজ্জত করে, চিৎকার চেঁচামেচিতে মাকে নাজেহাল করে তোলে। আমিনা ছেলেকে টাকা পাঠিয়েই যায়। যেন সিসিফাসের মতো এটাই ওর নিয়তি।

স্বামী গেছে, ভিটেমাটি, সংসার, যৌবন সব গেছে আছে কেবল ওই টাকা পাঠানো। এ শহরে সে কবে কেমন করে এসেছিল বলতে পারবে না। কেবল মনে আছে একবার লম্বা একটা ট্রেনে বসিয়ে ছেলে তাকে নিয়ে এসেছিল, বলেছিল-

-এখানে বসি থাকবা। কোত্থাও যাবা না। লোকজন টাকাটুকা দিবে লুকায় রাখবা আমি আসি নিয়া যাব। সেটাই ছিল শুরু। সেখানে ছিল বহুবছর। মানুষের মুখে শুনেছিল জায়গাটার নাম কমলাপুর ষ্টেশন। এরপর শ্যাওলার মত ভাসতে ভাসতে এ জায়গায় এসেছে। এখানে খাবার দাবারের অভাব নাই। দিন গেলে ঠিকই একবার না একবার খাবার কিছু জুটে যায়। একটা বনরুটি থেকে একেবারে বিরিয়ানির প্যাকেট পর্যন্ত জোটে। নামাজিরা হাত খুলতে কার্পণ্য করে না। তাছাড়া আজকাল আমিনার তেমন খিদাও পায় না। যেদিন করে বিরিয়ানির প্যাকেট পায় সেদিন ঠাডা পড়া সেই মানুষটার কথা খুব মনে পড়ে।

 এখানে আমিনাবুড়ির মত অনেক শ্যাওলাভাসা মানুষের বাস। এটাই ওদের কমিউনিটি। এখানে ওদের একজন সর্দার আছে সবাই তাকে মান্য করে। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হিংসা, কাড়াকাড়ি থাকলেও অন্য কেউ কিছু বললে মুহূর্তে সবাই একজোট হয়ে যায়। সবাই সবার সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ আপদে পাশে থাকে। 

ভোর হলেই যে যার মত সবাই নামাজ পড়ে গা গোসল সেরে তৈরি হয়ে নেয় কাজে যাবার জন্য। গোসল করার জন্য লেকের পানি আছে, আবার মসজিদের ট্যাপ আছে। যদিও ট্যাপে গোসল করা নিষেধ। বাইরে একটা ট্যাপ আছে সেখানেই কাজ সেরে নেয় সবাই। কে কোথায় যাবে সে সেখানে কতদিন বসবে সব ঠিক করে দেয় সর্দার। কেবল আমিনা বুড়ি বেশ কবছর ধরে এই এক জায়গাতেই আছে। সে হাঁটতে পারে না। সর্দার বলে দিয়েছে।

‘অরে কেউ কিছু কবা না’।

কমিউনিটিতে মৌসুমী নামে লাউডগার মত একটি মেয়ে আছে, এখানেই জন্ম এখানেই বেড়ে ওঠা। তার সাথে সবার খাতির। এমনকি থানার পুলিশের সাথেও খাতির। মৌসুমী মাঝে মাঝে আমিনাবুড়ির কাছে আসে ভালো মন্দ খোঁজ নেয়, কিছু লাগলে দোকান থেকে এনে দেয়। গুটুর গুটুর দুচারটা কথা বলে। কিছুদিন থেকে মাস শেষে মৌসুমীই বুড়ির ছেলেকে টাকা বিকাশ করে দেয় নির্দিষ্ট নম্বরে।  

আমিনার সেই গ্রামের মতো, ঢাকা শহরে বহুকিছু নাই, শীতও নাই।

হালকা যে শীত পড়ে তা বিভিন্ন সোয়েটার, চাদর, কম্বলে অনায়াসে পার করে দেওয়া যায়। ঢাকা শহরে অবশ্যি কাপড়ের অভাব নাই। আর এই এলাকায় তো কাপড়, খাওয়া, টাকা পয়সা কোনকিছুরই অভাব নাই। এটা নাকি ধনী মানুষের এলাকা। তা ধনীরা দানধ্যান ভালই করে তাই এখানে সকলের আয় রোজগারও ভাল। মসজিদের চারপাশে এই ভিক্ষুকদের প্রায় সবাই বিকলাঙ্গ। কারও হাত নেই, কেউ অন্ধ, আবার কারও দুই পায়ে দুর্গন্ধযুক্ত ঘা। যারা চলতে পারে না তাদের চার-চাকার গাড়ি আছে। গাড়ি ঠেলার জন্য ছোট ছোট ছেলেপেলে আছে দিনান্তে তারাও মজুরি পায়। প্রকৃতপক্ষে এদের কারও কারও হাত পা হয়তো ভাঙা বা শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক টিউমার আছে, আর বাদ-বাকিরা পটুহাতে বিকলাঙ্গ সেজে নেয়। বিকলাঙ্গ সাজার, দুর্গন্ধযুক্ত ঘা বানানোর সরঞ্জাম ওদের সাথে থাকে।      

যতটা না বয়সের ভারে তারচেয়ে জীবনের ভারে পর্যুদস্ত বয়স্ক খাঁচাখানা একফালি রোদের জন্য আঁকুপাঁকু করে। তাই প্রতিটি ঊষাকালে আমিনা বিবি গায়ের উপরের তিন/চারখানা কম্বল সরিয়ে চোখ মেলে মসজিদের মিম্বরের পাশ দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পুবের আকাশে সুর্য কী উঠল! তখনও সুর্য চোখের ডালা খোলে না। ওদিকের আকাশ আবির আভাসে উদ্ভাসিত হতে শুরু করে মাত্র। কুয়াশায় চারপাশ কিচ্ছু দেখা যায় না। অবশ্যি তার চোখে এমনিতেও কুয়াশা। ছানির কুয়াশা।

বৃদ্ধ বয়সের স্থবিরতা তাকে গ্রাস করেছে, এগিয়ে আসছে মহাশক্তিধর জরা। আত্মার অন্ধকার পথে হেটে হেটে সে আজ বড় ক্লান্ত, বিধ্বস্ত।

আমিনার মন বলেÑ এবারে হয়ত এই যাপন থেকে মুক্তি মিলবে। জীবনের সকল বন্ধন, সকল চাপ, খুধা-তৃষ্ণা সব সে একটু একটু করে অবলীলায় ঝেড়ে ফেলেছে। বেঁচে থাকার জন্য মানুষের সামনে ন্যূনতম যে ‘টোপ’ থাকতে হয়, আমিনার তা নাই। তার কিছুই নাই। সে মুক্ত।

তার কান খাড়া থাকে কখন মুয়াজ্জিন আজান দিবে! নামাজি মানুষেরা দলে দলে আসবে। ঘুমন্ত এলাকা জেগে উঠবে। মানুষের মৃদু কন্ঠস্বর, দোয়া দরুদে সরগরম হয়ে উঠবে চারপাশ।

মৌসুমী আমিনাবুড়িকে মাঝে মধ্যে দেখাশোনা করে। দিন তিনেক ধরে সে জ্বরে কাতর। কদিন ধরে খাচ্ছেও না। মানুষের দেওয়া খাবারের প্যাকেট বুড়ির পাশে পড়ে থাকে। কুকুরে খেয়ে যায় কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এসে নিয়ে যায়। মৌসুমী এসে একদিন গা মাথা মুছিয়ে প্যারাসিটামল খাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু খাবার খাওয়াতে পারেনি। জ্বরের আগে যখন সুস্থ ছিল কথায় কথায় মৌসুমীকে বলেছিলÑ

মারে, সাদা সাদা গরম ভাত, পোড়া রসুন মরিচের ভর্তা আর সরিষার ফুল দিয়ে ডিম ভাজা খাইতে মনে চায়। আহারে!

-হ, তোমার এইসব রাজা বাশশার খাবার আমি কইত্থন খাওয়ামু? বিরানি, খিচুড়ি, বনরুটি, এমনকি চিকেনের কতা কও অহনে আইনা দিতাছি। ঐসব আউল ফাউল খানাখাদ্যের কতা কইও না।

না, না, ঐসব হামি খামু না। হামি কিচ্ছু খামু না।

মৌসুমী চলে যায়। কিন্তু ওর মনে খালার অভিনব খাবারের কথা থেকে যায়। ঢাকা শহরে টাকা থাকলে নাকি বাঘের দুধ মেলে আর এই সামান্য জিনিস মিলবে না!

কদিন পরে মৌসুমী এসে দেখে গায়ে অনেক জ্বর। কপালে হাত দিয়ে সে হতভম্ব হয়ে যায়-

-এ যে ধান দিলে খই ফুটবে, এত তাপ! ওরেব্বাবারে! খালা! ও খালা! আরে ওঠো দেখি ওঠো…কোনরকমে তুলে বসিয়ে সে নিজের ওড়নার আঁচল ভিজিয়ে ঘাড় মুখ মুছে দেয়। কম্বল সরিয়ে হাত পা মুছে দিলে বুড়ি চোখ মেলে। মৌসুমী বলে ওঠে-

-নেও এখন হা কর দেখি খাবার খাও। সাথে সাথে দুই ঠোঁট চেপে ধরে দুদিকে সজোরে মাথা নাড়ে উঁহু খামু না! খামুনা! বমি পায়।

 -না, বমি পাবে না। এই দেখ কি খাবার! সে তাকায় না। কথাও বলে না।

-আরে চক্ষু দুইটা খোলনা… দেখ কি আইনেছি।

বুড়ি তাকায় কিন্তু বুঝতে পারে না। মৌসুমীর মুখের দিকে তাকায়, নাক টেনে গন্ধ শুঁকে, এবার জিগায়Ñ

-কি? মৌসুমী ধীরে ধীরে বলেÑ

-গরম ভাত, পোড়া মরিচ রসুনের ভর্তা, আর সরিষার ফুল দিয়ে ডিম ভাজা। নেও মুখ তোল আমি খাওয়ায় দেই। আমিনা বুড়ি হা করে সামনের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে, নড়েচড়ে বসে। অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে বুকভর্তি নিঃশ্বাসটাকে মুক্তি দিয়ে বলেÑ 

-সত্যি কইচিস মা! 

-হ্যাঁ খালা সত্যি। নেও, হা করতো খাও।

-মারে, আমার হাতখান ধুইয়া দে মা। নাড়িচাড়ি দেখি, হাত দিয়া খাই। প্রথমেই সে এক চিমটি রসুন মরিচের ভর্তা আঙ্গুলের মাথায় নিয়ে জিভে ছোঁয়ায়, বিস্ময়ে তার সমস্ত শরীর যেন চাঙা হয়ে ওঠে, মুখটা দীপ্তিমান হয় আর চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সবটুকু খাবার সে খেয়ে নেয়। থালার শেষ ভাতটিও পড়ে থাকে না।

কত জনম পরে আমিনা আজ তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। এরপর সে দুহাত তুলে মোনাজাত করে

-মাবুদে এলাহি! যে হামাক বেহেশতের এই খানা খাওয়াইল তার উপর তুমি রহম করো। তাকে তুমি দয়া করো। তার সজ্ঞল পাপ মাফ করি দেও। বাইচা থাকা বড় সংগ্রামের, বড় কষ্টের, পাপ তো হইবই… সে পাপ তুমি মাফ কইরা দেও… বুড়ি হুহু করে কেঁদে ওঠে।

মৌসুমীর মাথা দুহাতে ধরে শত চুমু খায় কপালে। এই অনাবিল আদরে, দোয়ায় মৌসুমীর চোখও শুকনো থাকে না। সে বুড়িকে যত্ন করে শুইয়ে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিয়ে নিজের জায়গায় চলে যায়। ওর মনটা খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। 

রাত বাড়তে থাকে। মসজিদের শেষ মুসল্লিও দ্রুত বাড়ি চলে যায়। কেউ বেশি রাত করে না। সব মানুষের মনে আতংক, ভাবে রাতবিরেতে বাইরে থাকা ঠিক না। একে একে নিভতে থাকে মসজিদের বাতিগুলি। মুয়াজ্জিন তাহাজ্জত পড়ার জন্য মোবাইল ফোনে এলার্ম দিয়ে শুয়ে পড়ে।

লাউডগা মৌসুমীর কাছে সুখ দুঃখের দুইটা আলাপ করতে আসে রাতের পুলিশ। দিলখুশ মৌসুমী খপ করে পুলিশের চুলগুলো ধরে বিছানায় ফেলতে ফেলতে গুনগুন করে হিন্দি গান ধরে। 

আমিনা বিবি একটা সবুজ রঙ শাড়ি, কানে কানপাশা প’রে ছেলের হাত ধরে আইলের মাঝ দিয়ে হাঁটছে। চারপাশে হলুদ বিছানা, মিঠে রোদ। সে ছেলেকে শোনাচ্ছেÑ

‘ইন পিন সেফটি পিন

পোলায় খায় ভাইটামিন

ভাইটামিনে পোকা

পোলা হামার বোকা’

ছেলে রাগ করে একদিকে চলে যায়। আমিনা হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে সে মানুষটাকে খোঁজে, তার নিজের মানুষ। চোখ তীক্ষè করে এদিক-ওদিকে তাকায়! গেল কই মানুষটা! আরে! ঐতো সে অদূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। আমিনা ঝামরে ওঠে-

-আপনে কেমন মানুষ! আমারে একলা থুইয়া কই গেছেন!

-এইতো বউ হামি তোমার লগেই আছি। আমিনা তাকিয়ে দেখে হলুদ বিছানা কখন যেন সবুজ হয়ে গেছে।

গাঢ় সবুজ। ঘন সবুজ।

পা ফেললে পা ডুবে যাচ্ছে এত নরম! সবুজ ঘাসের ডগায় হাজার কোটি হীরার নাকফুল ফুটে আছে, এত বাহার! এত সুন্দর! এত উজ্জ্বল! আহারে!

হঠাত বরফ শীতল হিম, পা বেয়ে উপরে আসতে থাকে। কনকনে ঠাণ্ডায় আমিনা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। সে ব্যাকুল হয়ে স্বামীকে ডাকে

-আপনে কই! কই আপনে! হামার বড় ঠাণ্ডা নাগিচ্চে। শক্ত সামর্থ্যবান জোয়ান স্বামী পরম মমতায় দুই বাহু বাড়িয়ে এগিয়ে আসে, আমিনা নিশ্চিন্তে সেখানে বেড়ালকুণ্ডলী পাকিয়ে সেঁধিয়ে যায়।

পরদিন সকালে ওদের কেউ কাজে যায় না। সবাই নিজেদের মধ্যে চাঁদা তোলে, ভিখ মাগে, যেভাবে হোক আমিনা বুড়ির সৎকারের ব্যবস্থা করে। তার আগে ওর ছেলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে শুনে সে ফোন কেটে দেয় কিংবা ফোনটা কেটে যায়। এরপরে বহুবার ফোন করা হলে সে ধরে না। একবার ধরে জানিয়ে দেয় সে কোন বুড়িকে চেনে না। এই বুড়ি ওর মা নয়।

ভাসমান মানুষগুলোর মুখে কোন কথা থাকে না। শোকতাপে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। যেন মসজিদ প্রাঙ্গণে কেমন এক শ্যাওলার ছায়া ঘিরে ধরে। তাজ্জব মানুষগুলো মুহূর্তে যেন পাথরের মুর্তি হয়ে যায়।  

কিছুটা সময় গেলে কে একজন ফুঁসে ওঠেÑ

‘শালার পোলা! তোর মুখে মুতি দেই, ঠ্যাং তুলি ছড়ছড় করি মুতি দেই!

ওই! অত চিন্তা বাদ দেও। আঞ্জুমানে মফিদুলকে খবর দেও। হামরা আছি না! মরি নাই তো। বুড়ি হামার সজ্ঞলের মা। মায়ের সউগ কাম হামরা নিজেরা করমো’।

সারাদিনের ডিউটি শেষে হা-ক্লান্ত পুলিশটি আসে। কিন্তু আজ লাউডগার মন ভালো নাই। বারবার জিজ্ঞেস করার পর সব ঘটনা জানায়। পুলিশের মনও খারাপ হয়ে যায়। মৃত্যুর খবরে নয়, রাস্তায়, নদীতে, মর্গে, তাকে নিত্য মরা আধমরা দেখতে হয়। কিন্তু মাকে অস্বীকারের খবরে সে হতবাক হয়ে যায়!

-কুত্তার বাচ্চা মানুষ, এত বেঈমান, এমন নেমকহারাম হয়! তুমি চিন্তা কইরো না। দাঁড়াও ওরে আমি আনাচ্ছি।

-হ, সবাই কইল আইলো না, আর আপ্নে…

নম্বর নিয়ে পুলিশ ফোন করে।

-হ্যালো, ভাই! এখানে একজন বুড়িমা কিছু টাকা আমার কাছে আমানত রাইখা মইরা গেছে, মরার আগে টাকাগুলা তার ছেলেরে দিতে কইছে। আপনি কি সেই ছেলেকে চেনেন? না, ভাই হাতে হাতে দিতে কইছে, বিকাশ ফিকাশ আমি করতে পারব না।

কানে চেপে ওপারের উত্তর শুনে ফোন নামিয়ে রাখে। মৌসুমী উৎসুক তাকিয়ে থাকলে ওর মাথায় আলতো একটা হাত রেখে, বিকৃত মুখে বলেÑ

আমানত নিতে আইতাছে।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares