শেষ রাতের আবছা অন্ধকার। আদিনাথ একবুক ঘৃণা আর আদিম এক প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে বন্দুকটা ভালো করে চেপে ধরে। আজ সে দৃঢ়সংকল্প। খতম করবে ওই লোভী তস্কর জীবটাকে। দিন দিন ওর সাহস বেড়ে যাচ্ছে। পোলট্রি ফার্মের অর্ধেক মুরগির বাচ্চা খেয়ে সাবাড় করেছে এই ক’দিনে। তার লাভবান ব্যাবসা বন্ধ হতে বসেছে। আজ একটা শেষ নিষ্পত্তি সে করবেই।

ভোর হবার এখনও অনেক দেরি। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আদিনাথের স্নায়ুগুলো কিঞ্চিৎ শ্লথ। আর কিছুক্ষণ পরেই পুবদিক হালকা হবে। হালকা হলেই শয়তানটা বের হবে রোজকার মত।

মুরগির বাচ্চাগুলো কারা খেয়ে যাচ্ছে তা প্রথমে বুঝতে পারেনি সে। বহু ঘুমহীন রাত অপেক্ষা করে ওত পেতে শেষে বুঝতে পেরেছে শিয়াল না খটাশ না, একটা কালো হুতোম প্যাঁচাই ঘাতক। আরও কিছুদিন অনুসন্ধানের পর জেনেছে পোলট্রির পিছনে কিছুটা দূরে যে বুড়ো খিরিশ গাছটা আছে তার একটা উঁচু মোটা ডালের কোটরে সে থাকে।

এতক্ষণে পুবদিকের আকাশ ফিকে হতে শুরু করেছে। এবার পেঁচাটার বেরুবার সময়। আবছা অস্পষ্টতার বুক চিরে একটা বিশ্রি কর্কশ ডাক ভেসে এল। আদিনাথ সতর্ক হয়। হাতের মুঠোয় বন্দুকটা শক্ত করে চেপে ধরে। এবার ওই ধূর্ত লোভী শঠ জীবটাকে নির্দয় ভাবে মারবে। তার সীমাহীন অপরাধ আর কৃতকর্মের জন্য। পেঁচাটা তার কোটর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। সন্তর্পণে পাখা মেলে উড়ে আসছে। এই আবছা অন্ধকারে উড়ন্ত টার্গেটকে গুলি করা মুশকিল। তবুও আদিনাথ আজ বদ্ধপরিকর। মাথার উপর দিয়ে কালো ছায়াটা যখন উড়ে যাচ্ছে, তখনই বন্দুকের ট্রিগারটা সে টিপে দিল অনেকটা আন্দাজে। নিশানা ব্যর্থ হয়েছে মনে হয়। কারণ মাটিতে আছড়ে পড়ার কোন শব্দ বা ডানার ঝাপটানি তার কানে যায় নি।

পুব আকাশ আরও অনেকটা ফর্সা হয়েছে। আদিনাথ পায়ে পায়ে পোলট্রি ফার্মের দিকে এগোল। মুরগির বাচ্চাগুলো ঠিক আছে কিনা একবার গুনে এল। আর ঠিক তখনই কোথাও মৃদু ডানা ঝাপটানোর শব্দ কানে এল। আদিনাথের মন আনন্দে ভরে গেল। যাক্ নিশানা তাহলে ব্যর্থ হয় নি, শিকার গুলি খেয়েছে। অব্যক্ত বর্বর এক জিঘাংসায় মন ভরে গেল। কাছে গিয়ে দেখল পেঁচাটা বেশ বড় সাইজের। মাটিতে পড়ে ডানা ঝাপটে বৃথা ওড়বার চেষ্টা করছে। ওর ধূসর রঙের ডানাদুটোর একটাতে গুলি লেগেছে। অকেজো রক্তাক্ত ডানাটা দেহ থেকে ঝুলছে। ওর বিশ্রি গোল মুখের হলদেটে চোখ দুটোতে যন্ত্রণার চিহ্নমাত্র নেই। পরিবর্তে হিংস্র একটা বিদ্বেষ আর ক্রোধ জমা হয়েছে।

আলো-আঁধারির অস্পষ্টতা নেই। পরিষ্কার ভোরের আলোয় মানুষ আর পেঁচার দৃষ্টি বিনিময় হল। দু’জনের চোখেই বিজাতীয় হিংসা ঘৃণা বিদ্বেষ কাজ করছিল। আহত জীবটার দিকে তাকিয়ে অপরিসীম তাচ্ছিল্যে আদিনাথ বলে উঠল, কিরে! কেমন জব্দ! আর একটা গুলি খাবি?

পেঁচাটা তার ভালো ডানাটা ঝাপটে মাটি থেকে ওঠার চেষ্টা করল। পারল না। তার ব্যর্থতা ও হতাশা দেখে আদিনাথ জোরে শব্দ করে হেসে ওঠে বিশ্রি অঙ্গভঙ্গি করে। এবার গলা বাড়িয়ে রাগে তেড়ে আসে পেঁচাটা। আদিনাথ লাথি মেরে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর জখম ডানাটা এড়িয়ে অন্য ডানা ধরে পেঁচাটাকে তুলতে গেলে প্রচণ্ড আক্রোশে জীবটা তার তীক্ষè নখ আদিনাথের হাতে বসিয়ে দিল। চামড়া ভেদ করে সুচলো নখ মাংসের অনেক গভীরে ঢুকে গেল। আদিনাথ যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। যতই সে চেষ্টা করে পেঁচাটাকে ফেলে দিতে, শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে, ততই তাকে জোরে আঁকড়ে ধরে আঁচড়াতে কামড়াতে থাকে। আদিনাথ গালমন্দ করে। অভিশাপ দেয়। তার একবার  মনে হল দেয়ালের গায়ে জোরে আছাড় মারে জীবটাকে। পরক্ষণে মনে হয়, না, একে বাঁচিয়ে রেখে যন্ত্রণা দেবে। শেষে চরম শাস্তি দান করবে।

আদিনাথ এবার দুটো হাত দিয়ে পেঁচাটাকে চেপে ধরে শক্ত করে। তারপর তার ঘাড় ঘুরিয়ে মুখে একদলা থুতু ছেটায়। পাখিটা বার দুই চোখ পিট পিট করল। সেও আদিনাথের দিকে অবজ্ঞা আর ঘৃণা ছুঁড়ে দেয়। তার চোখে কোন ভয় নেই। আদিনাথ এবার রাগে কাঁপতে কাঁপতে তার ফার্ম হাউসের বারান্দার এক কোণে ঝোলানো একটা বড় লোহার খাঁচায় পেঁচাটাকে ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে দিল।

বেয়াড়া আর উদ্ধত জীবটাকে খাঁচাবন্দি করে সে কিছুটা শান্ত হল। বন্দুকটা যথাস্থানে রেখে এল। তারপর জল দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে ফার্স্ট-এড বক্স বের করে আনল। প্রথমে সে রক্তাক্ত পাখিটার ডানা পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিল। নিজের হাতেও অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগাল। ব্যান্ডেজ বাঁধল।

পরদিন সকালে উঠে আদিনাথ খাঁচার কাছে গেল। দেখল বেহায়া পেঁচাটা তার দিকে স্থির ভাবে চেয়ে আছে। আজও তার চোখে কোন ভয় নেই। হতাশ হল আদিনাথ। আর সেই হতাশা তাকে ক্ষিপ্ত করে তুলল। সে চিৎকার জুড়ে দিল, দাঁড়া দাঁড়া সবুর কর… আমি তোকে ভয় পাইয়েই ছাড়ব।

খাঁচাটা মাটিতে নামাল। খাঁচার খুব কাছে কিন্তু পাখিটার নাগালের বাইরে সে জল আর একটা বাচ্চা মরা মুরগি রাখল। পেঁচাটা নির্বিকার চোখে সব দেখল। ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর তবু সে আদিনাথের চালাকি ধরে ফেলেছে। নিরুত্তাপ রইল।

কয়েকদিন পর মুরগির বাচ্চা কিনতে একজন খরিদ্দার এল।  ইনি বেশ সম্ভ্রান্ত। মনে হয় অপেক্ষাকৃত বড় ব্যবসায়ী।

লোকমুখে পেঁচাটার কথা শুনে নিজেই এসেছেন। আদিনাথকে প্রস্তাব দিলেন, আপনি আমাকে পাঁচশো টাকায় পেঁচাটাকে বেচে দিন। এতবড় সাইজের পেঁচা সাধারণত পাওয়া যায় না, রেয়ার। আমার কালেকশন আছে।

আদিনাথ ব্যাজার মুখ করে বলল, না মশাই, মাপ করবেন। আমি ওকে হাতছাড়া করতে চাই না।

ক্রেতা ভদ্রলোক ভাবলেন দাম পছন্দ হয়নি। আচ্ছা বেশ, আমি আপনাকে সাতশো টাকা দেব, তাহলে দেবেন তো?

এতেও আদিনাথ রাজি হল না। বেশ রুক্ষ ভাবেই বলল, না, আমি ওকে বেচব না। ওর সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।

কিন্তু একটা পাখির সাথে আপনার কী বোঝাপড়া? আমি যদি হাজার দিই…

তাহলেও না. পাঁচ হাজার হলেও না! ও আমার অনেক ক্ষতি করেছে! ওকে গুলি করে মারব! নিজের হাতে শাস্তি দেব। আপনি এখন যানÑ

বেগতিক দেখে ভদ্রলোক কেটে পড়েন।

আদিনাথ এরপর দিন গোনে। কবে ওকে খতম করবে। আজকাল ও কিছুই খায় না। খাবারের দিকে তাকায়ই না। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আদিনাথের দিকে। সীমাহীন ঘৃণা আর অঢেল বিতৃষ্ণা। ওর ওই বুনো চোখদুটোতে আদিনাথ ভয় আনতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন নিজেকেই সে পরাজিত ভাবছে। হেরে যাওয়ার এক তীব্র জ্বালায় প্রাক্তন সৈনিক আদিনাথ সদর্পে ঘরে ঢুকে তার দোনলা বন্দুকটায় দুটো গুলি ভরে। বাইরে এসে চেঁচাতে থাকে, শয়তান, আজ তোকে শেষ করব!

খাঁচার লোহার পাতের ফাঁক দিয়ে বন্দুকের নলটা ঢুকিয়ে দিতে পেঁচাটা সরোষে এসে নলটাকে আক্রমণ করে। লোহার নলের কোন ক্ষতি সে করতে পারল না, হতাশ হয়ে খাঁচার একপাশে সরে গেল।

আদিনাথ বন্দুকের নলটা খানিকটা পেছনে সরিয়ে আনল। শেষবারের মত ওই কুৎসিত জীবটার চেখে অন্তিম ভয় খুঁজল, পেল না। শুধুই ঘৃণা! আদিনাথের সমস্ত বোধবুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ক্রোধান্ধ হয়ে সে ট্রিগার টেপার পরিবর্তে সেটাতে জোরে ধাক্কা দিয়ে বসল। গুলি রি-বাউন্ড হল। তাতেই ঘটল বিপদ।

প্রথমে আদিনাথ বুঝতে পারল না। গুলির শব্দের সঙ্গে  সঙ্গে ঝনাৎ করে একটা শব্দ হল। আর রাগান্ধ আদিনাথ অনুভব করল কী যেন একটা তীব্র ও তীক্ষè আঘাত করল তার বুকে। আঘাতের তীব্রতায় আদিনাথ টাল খেয়ে পড়ে গেল। তার হাতের বন্দুক ছিটকে পড়ল দূরে। সে বুকে হাত দিয়ে দেখল, তার হাত রক্তে ভিজে উঠছে। নিঃশ্বাস আটকে আসছে। গলা দিয়ে গরম তরল পদার্থ উঠে আসছে। চোখের সামনের পৃথিবীটা একটু একটু করে অন্ধকার হয়ে আসছে।

অন্তিম অন্ধকার নেমে আসার আগে, সম্পূর্ণ চেতনাহীন হবার আগে আদিনাথ বুঝতে পারছিল ভয়ংকর দুর্ঘটনাটা  কী ঘটেছে। খাঁচার ঠিক পেছনে যে সরু লোহার পাত ছিল তাতে গুলিটা লেগে ঠিকরে এসে উলটো দিকে দাঁড়ানো তারই…

ওষুধ পড়ায় এই কদিনে পেঁচার জখম ডানাটা অনেকটা ভালো। ভাঙা খাঁচা থেকে বেরিয়ে সে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এল। পিট পিট চোখে মরণোন্মুখ মানুষটার সামনে এসে দাঁড়ায়। এখন তার চোখে কোন ঘৃণা নেই, বিদ্বেষ নেই। যা কিছু বিদ্বেষ ঘৃণা ক্রোধ জিঘাংসা বা মানসিক বিকার সব ওই আদিনাথের মধ্যেই ছিল।

লেখক : কথাশিল্পী

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares