গল্প : উদ্বাস্তু : পলাশ মজুমদার

আমার সঙ্গে বিক্রমপুর যেতে পারবেন?

কেন নয়। অবশ্যই পারব। কখন যেতে চান?

আগামীকাল সকালে। কালকের পুরো দিনটা রেখেছি এজন্য।

বিক্রমপুরের কোথায় যেতে চান?

মালখানগরে।

কেন? সেখানে কী আছে?

আমার পূর্বপুরুষের ভিটে।

ও। আপনারা কি বিক্রমপুর থেকে কলকাতায় গিয়েছিলেন?

অনেকটা সে রকম। আমার ঠাকুরদা পশ্চিম বাংলায় চাকরি করতেন। সেই সুবাদে আমার বাবা বড় হয়েছিলেন ওপারে। তবে বাবার জন্ম মালখানগরে। শৈশবও কেটেছে এখানে। পড়েছেনও গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। তারপর পরিবারের সবাইকে ঠাকুরদা তার কর্মস্থল চব্বিশপরগণায় নিয়ে যান। এখনও দেশ বলতে বাবা বিক্রমপুরকে বোঝেন; কথাও বলেন বিক্রমপুরী ভাষায়। আমরা এ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, দেশ ছাড়লেও দেশের ভাষা কেন ছাড়ব। তার মানে এই নয় যে তিনি ঘটি-ভাষায় কথা বলতে পারেন না। আসলে বলতে চান না। বিক্রমপুরকে বুকে ধরে রাখতে চান আমৃত্যু। খুব ইচ্ছে এখানে যেন মরতে পারেন। তিনি প্রায়ই বলেন, জন্ম যেখানে, মরণও যেন হয় সেখানে; যে গ্রামের ধুলাবালি কাদা মেখে বড় হয়েছি, সেই মাটিতে যেন মিশে যায় এই শরীর। ওখানে মরতে পারলে শান্তি পেতাম। আর হারিয়ে যান শৈশব-কৈশোরে। পুকুর-খাল-নদী-গাছ-গাছালি-মানুষ—আরও কত কী! আনমনা হয়ে পড়েছেন কিছুটা। নানা রকম বায়না ধরছেন কেবল। জন্মভিটায় একবার আসার জন্যও ভীষণ মরিয়া! বয়স হলে বোধ হয় মানুষ শিশুর মতো অবুঝ হয়ে যায়!

আপনার বাবার বয়স কত?

প্রায় ৯৩ বছর। তবে বয়সের তুলনায় বেশ সুস্থ-সবল আছেন এখনও। একা একাই চলতে-ফিরতে পারেন। কারও ওপর নির্ভর করতে চান না। তবু আমরা একা বের হতে দিই না।

আর আপনার মা?

নেই। দেহরক্ষা করেছেন বছর দশেক আগে। মজার বিষয় কী জানেন—মা ছিলেন নবদ্বীপের মেয়ে। ঘোর বৈষ্ণব। মাছ-মাংস খেতেন না। অথচ বাবা গরুর মাংস খেতেন—ঠাকুর-দেবতা মানতেন না। আমাদেরও ওসব শেখাননি কখনও। শিখিয়েছেন মানুষকে ভালোবাসতে, মানুষের মর্যাদা দিতে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে বাবার বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। বাবার বন্ধুরাও আসত আমাদের বাড়িতে। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন হাফিজুর রহমান, কল্যাণ ডি কস্তা আর সুনির্মল বড়ুয়া—ছোটবেলায় তাঁদের কাছে জেনেছি মানুষের বিশ^াসের বৈচিত্র্য। বাবার সঙ্গে মায়ের অনেক বিষয়ে অমিল থাকলেও তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। এমনকি এসব মতপার্থক্য পারিবারিক জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেনি; বরং বাঙাল-ঘটি ও বিভিন্ন মতবাদী মানুষের সংমিশ্রণে আমরা পেয়েছি এক মিশ্র উদার সংস্কৃতি। 

আপনারা কয় ভাইবোন?

আমার কোনো ভাই নেই। তবে দুই বোন আছে। দুজনেই বয়সে আমার ছোট। ওরাও স্বামী-সংসার নিয়ে কলকাতায় থাকে। একজন ডাক্তার আরেকজন কলেজের শিক্ষক।

আপনার বাবারা কয় ভাইবোন?

চারজন। তবে বাবারও কোনো ভাই ছিল না। আমার পিসিরাও সব ওদিকেই সেটেল্ড। একজন বেঁচে আছেন।

আপনাদের কোনো আত্মীয়স্বজন কি বাংলাদেশে থাকে?

শুনেছি বাবার এক মামাতো ভাই ও তাঁর ছেলেরা ঢাকায় থাকে। ওই কাকুর নাম প্রিয়তোষ। তিনি সরকারি চাকরি করতেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাবা আর এদিকে আসেননি। তার আগে দেশের কথা মনে পড়লে মাঝে মাঝে চলে আসতেন তাঁদের কাছে; তবে আমাদের আনেননি কখনও।

আপনার বাবা কেন আর এদিকে আসেননি?

একাত্তরে যুদ্ধের সময় কলকাতায় গিয়ে আর ফিরে আসেননি বাবার আরেক সমবয়সি মামাতো ভাই— আমাদের মনতোষ কাকু। কিন্তু প্রিয়তোষ কাকু সরকারি চাকরি করতেন বলে ফিরে এসেছিলেন; তিনিই মনতোষ কাকুকে জানিয়েছিলেন, তাঁদের বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মনতোষ কাকু মারা যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়ির কথা ভেবে কষ্ট পেয়েছেন, তবু আসতে চাননি। সে সঙ্গে বাবার আসাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

আপনার প্রিয়তোষ কাকুর ছেলেদের সঙ্গে কি যোগাযোগ রাখেননি?

কারও সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ নেই। এটুকু জানি, বাবার মামার বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জের শিবালয়ে। শুনেছি সেখানে পদ্মা-যমুনা একসঙ্গে মিশেছে। বাবা কতবার যে সেই মোহনার গল্প করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।

আপনার বাবার নাম?

শোভনলাল ঘোষ।

ও। আপনারা তাহলে বিক্রমপুরী ঘোষ।

এ-কথায় দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠি। এমন করে প্রাণ খুলে হাসতে আমি তাঁকে আগে কখনও দেখিনি। হাসতে হাসতে বলি—যতদূর জানি, বিক্রমপুরের লোকেরাই ভারতবর্ষে বাঙালিদের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে আছেন।

বাহ্! আপনি তো দেখছি বেশ ভালোই খোঁজখবর রাখেন।

কথা হচ্ছে অভীকদার সঙ্গে। পুরো নাম অভীক ঘোষ। বয়স প্রায় ৬৫। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। দুই বাংলায়ই তিনি সমান সমাদৃত। বিশ^বাংলাসাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় এসেছেন।

তিনি আমাকে জানালেন, ঢাকায় আসার আগে তাঁর অশীতিপর বাবা বারবার বলেছেন, তিনি যেন তাদের বিক্রমপুরের আদি বাড়িতে একবার ঘুরে যান। আর বাড়ির উঠোন থেকে একটু মাটি নিয়ে আসেন; সম্ভব হলে গাছের নারকেল বা আম বা জামরুল জাতীয় কোনো ফল। দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বাবা আরও বলেছিলেন, প্রায় সত্তর বছর হয়ে গেল। সময় যে কীভাবে বয়ে যায়। মাহমুদের কাছে পরিচয় দিলে তোকে ফেলে দেবে না। মাহমুদ বেঁচে আছে কি না, জানি না। তবে মাহমুদের ছেলেদের বললে অবশ্যই সহযোগিতা করবে।

অভীকদাকে প্রশ্ন করি, কে এই মাহমুদ?

উত্তর চব্বিশপরগণার যে বাড়িটি এখন আমাদের, সেটা আসলে মাহমুদ আঙ্কেলদেরই বাড়ি। আর তারা থাকেন আমাদের বিক্রমপুরের বাড়িতে। এক্সচেঞ্জের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাবা আর মাহমুদ আঙ্কেল মিলে। বাড়ি বিনিময়ের বন্দোবস্ত হয়েছিল জেলগেটে।

বিস্ফারিত চোখে বললাম—জেলগেটে? কখন?

১৯৪৭ সালের ১৬ আগস্ট। সে এক বিশাল কাহিনি।

তখন তো তাদের বয়স অনেক কম ছিল।

হ্যাঁ। বড়জোর ২৩ হবে।

অভীকদার কথায় আমি ইতিহাস টের পাচ্ছি। ওই সময় আসলে কী হয়েছিল, তা জানতে কৌতূহল বোধ করি। বললাম, দাদা, খুলে বলুন তো। কী হয়েছিল তখন?

বলব। সব বলব। আগামীকাল।

এখানে আমার সম্পর্কে দু-একটি কথা বলে নিই। আমি ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার সহকারী সাহিত্য-সম্পাদক। সাহিত্যজগতেও একেবারে অপরিচিত নই। লেখালেখির সুবাদে তিনি আমার পূর্বপরিচিত। ফেসবুকেও মাঝে মাঝে কথা হয়। আমরা কেবল ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড নই; গত বছর কলকাতায় বেড়াতে গেলে তাঁর সঙ্গে আমার কফি হাউজে দেখা হয়; আড্ডাও জমে উঠেছিল বেশ। আমার মতো এক নবীন সাহিত্যিক ও সম্পাদককে তিনি যেভাবে বরণ করলেন, তাতে আমি যারপরনাই বিস্ময়বোধ করি। আমি বেশ মুগ্ধ হয়েছিলাম তাঁর আন্তরিকতায়। তখন তিনি আমাকে ঘুণাক্ষরেও বলেননি যে, তাঁর পূর্বপুরুষরা পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) থেকে পশ্চিম বাংলায় গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গ না ওঠায় আমিও যেচে তাঁর কাছে তখন কিছু জানতে চাইনি।

এমন বড় মাপের একজন মানুষ তাঁর ভ্রমণসঙ্গী হতে বলায় মনে মনে আমি কিছুটা গর্ব বোধ করি। সেই সঙ্গে ইতিহাসের রহস্য উদ্ঘাটনের অভিপ্রায়ে বেশ উৎসাহ নিয়ে বলি—চলুন তাহলে।

পরদিন সকাল ৭টায় আমি হোটেলের লবিতে হাজির। গাড়ি আগেই ঠিক করা ছিল। রিসেপশান থেকে ফোন দেওয়ার ১০ মিনিট পর তিনি নেমে এলেন। ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত অভীকদাকে দেখে মনে হলো এক সাক্ষাৎ দেবদূত। বললেন, এসো, ব্রেকফাস্ট সেরে নিই। তারপর রওনা দিচ্ছি।

যেতে যেতে তিনি সব খুলে বলেন আমাকে। আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাঁর কাছে যেন গল্প শুনছি আর শিহরিত হচ্ছি এ ভেবে যে, এমন নিষ্ঠুর সময় আমাদের পূর্বপুরুষরা পার করেছে।

দুই.

সে বছর প্রবল বৃষ্টিতে বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট-প্রান্তর জলে টইটম্বুর। দিকে দিকে নদীর জল বেড়ে বন্যাও হচ্ছিল। পদ্মা-মেঘনা-গঙ্গা-যমুনা ভয়াল রূপ ধারণ করে ভাসিয়ে দিচ্ছিল দুকূল। উপকূলীয় অঞ্চলও প্লাবিত। বানভাসি মানুষের হাহাকার চারদিকে। ত্রাহি ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। বন্যার এই দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় দাঙ্গার বিভীষিকা। এত বৃষ্টি হচ্ছিল তবু দাঙ্গার আগুন যেন কিছুতেই নিভছিল না। থেকে থেকে দাঙ্গা চলছিল কোথাও না কোথাও। কখনও একটু স্বাভাবিক হয়, পরক্ষণে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভয়ে-আতঙ্কে মানুষ ঘরের বাইরে যেতে সাহস করছে না। যদি না অনভিপ্রেত কিছু ঘটে যায়। চার দেয়ালের ঘরও কি নিরাপদ? নিরাপত্তা যেন দূর অতীতের বা অদূর ভবিষ্যতের কোনো বিষয়।

নারী, বিশেষ করে কুমারী মেয়েদের মা-বাবার চোখে তখন ঘুম ছিল না। অনেক যুবকের কাছে ধন-সম্পদের চেয়েও যুবতীর দেহ তখন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কখনও একা, কখনও দল বেঁধে বের হয় তারা। এদিক ওদিক হামলা করে। ভিন্ন ধর্মের সুন্দরী তরুণীদের ছিনতাই করে নিয়ে আসে। তারপর চলে পালাক্রমে ধর্ষণ। ধর্ষণ শেষে মেয়েটাকে তারা কখনও হত্যা করে; কখনও রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়ির সামনে বা রাস্তায় ফেলে চলে যায়; কখনও লাশ ভাসিয়ে দেয় নদীতে। যে হিন্দু ছেলে নিজের বোনকে হারিয়েছে, সে মুসলমানের মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করে তার বদলা নিচ্ছে। আবার বোন-হারানো মুসলমান ছেলেটিও প্রতিশোধের নেশায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে হিন্দু মেয়েদের ওপর। এভাবে চলছিল পাল্টাপাল্টি আত্মঘাতী খেলা।

মানুষ এতই অনিরাপদ জীবনযাপন করছিল যে, সব হারানোর জন্য তারা সদা প্রস্তুত। কি ধনসম্পদ, কি নারীর সম্ভ্রম—সবই যেন অরক্ষিত। যেকোনো সময় হারিয়ে যেতে পারে! অতর্কিতে যেকোনো বাড়িতে হানা দিয়ে ধনসম্পদ লুট করা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়েছিল। যেন মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছিল দেশ।

শোভনলাল ঘোষ এ ধরনের অপকর্মে আগে কখনও জড়ায়নি; না জড়ানোর কারণ এই নয় যে, এমন জঘন্য নীতিবর্জিত কর্মকে ঘৃণা করে সে। আসলে সে ছিল ভিতু।

শোভনদের দেশের বাড়ি পূর্ববঙ্গে। ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। তবে বাবার কর্মসূত্রে তারা উত্তর চব্বিশপরগণার গোবরডাঙায় থাকে। বছরের অন্য সময় না হোক, পুজোর ছুটিতে অন্তত এক মাসের জন্য তাদের বিক্রমপুরে যেতে হয়। বিক্রমপুর যে তার দেশ; সেখানে গ্রামের বাড়ি; সে বাড়িতে যে ঠাকুরমা থাকেন। এখানে তো প্রয়োজনে থাকা। প্রতিবেশীর কাছে তারা নিজেদের ঢাকা বা বিক্রমপুরের মানুষ বলেই পরিচয় দেয়। কেউ কেউ তাদের বাঙালও বলে। হঠাৎ শোভনের বাবার মৃত্যুতে তাদের সংসারটি যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে; সবকিছু লণ্ডভণ্ড।

তখন চারদিকে চলছে লুটতরাজ, ধর্ষণ ও হানাহানি। মানুষের মনে একদণ্ড শান্তি নেই। কখন কী হয়, কেউ জানে না। প্রতিটি দিন কাটছে আতঙ্কে ও অজানা শঙ্কায়। দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলছে। কমবেশি সবখানে। কখনও ঢাকায়, কখনও বর্ধমানে, কখনও নোয়াখালীতে, কখনও মুর্শিদাবাদে, কখনও কুমিল্লায়, কখনও কলকাতায়। প্রতিদিন আসছে কেবল এসব সংবাদ। মহাত্মা গান্ধী শান্তির বাণী নিয়ে ছুটছেন দিকে দিকে; আর আহ্বান জানাচ্ছেন মানবহত্যার এই হোলিখেলা বন্ধ করতে। কে শোনে কার কথা। শান্তিপ্রিয় মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে ভগবানের কাছে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলছে—আর যে পারছি না, প্রভু! দেশভাগের জন্যই যদি এত দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলে, তবে দেশটাকে ভাগ করে হলেও স্বাধীনতা দাও। তবু এসব বন্ধ হোক; অশান্তি যে আর ভালো লাগে না।

বাবার মৃত্যুতে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় শোভনের; ইতি ঘটে কলেজ-জীবনের। অসহযোগ আন্দোলনে সে যুক্ত হয়েছিল স্কুলজীবনে; আগস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে জেলও খাটে কিছুদিন। জেলে থাকার সময়ই কিছু বিপ্লবী নেতার সংস্পর্শে তার চিন্তাধারায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। তখন পুলিশের অত্যাচারের ভয়ে নিজেকে স্বদেশী কর্মকাণ্ড থেকে গুটিয়ে নেয় সে; বিসর্জন দেয় বিপ্লবী হওয়ার স্বপ্ন। অন্য দশজনের মতো জীবন পার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনোরকমে কাটাচ্ছিল দিন। এর কয়েক বছর পর আবার শুরু হয় অরাজকতা। স্বাধীনতার চেয়েও দেশভাগের জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে ওঠে; যেন ইংরেজ স্বাধীনতা দিয়ে চলে গেলে সব ওলট-পালট হয়ে যাবে। আড়ালের কলকাঠি ইংরেজ নাড়ালেও এদেশের মানুষ যেন কিছুই বোঝে না—এমন একটা ভাব সবার চোখেমুখে। শান্তির ললিতবাণী যেন পরিহাস। এসব ভেবে শোভন মনে মনে হাসে।

এই সুযোগে কিছুটা কৌতূহল, কিছুটা খেয়ালের বশে এমন অশোভন কর্মকাণ্ডে শোভনলাল নিজেকে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে।

সেদিন বৃষ্টি কিছুতে থামছিল না। সকাল থেকে মুষলধারে একটানা বৃষ্টি। তার জীবনে এমন বৃষ্টি সে কখনও দেখেনি। বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু ধরে আসে। এই বৃষ্টিভেজা বিকেল তার ভেতর সৃষ্টি করে অন্য রকম এক উন্মাদনা। মাঝে মাঝে সেই নেশা জেগে উঠলেও সে নিজেকে সংযত রাখত। আজ আর সে নিজেকে সংবরণ করতে চাইল না। যে কাজ সে আগে কখনও করেনি, কেবল করতে শুনেছে, তা করার জন্য তার শরীর হঠাৎ জেগে ওঠে। অগত্যা ছাতা মাথায় সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।   

পথে মানুষজন নেই বললে চলে। চারদিক কেমন যেন থমথমে। নীরব। নিস্তব্ধ। কুকুর পর্যন্ত চুপচাপ। ভূতুড়ে পরিবেশ। পায়ে পায়ে হেঁটে বন্ধুদের খুঁজে বের করে সে। শোভন জানত যে এ অসময়ে বন্ধুরা কোথায় থাকতে পারে। একা কোনো কিছু করার সাহস নেই বলে বন্ধু সাহচর্য পেতে সে উৎসাহী হয়ে ওঠে তখন। পেয়ে যায় বন্ধুদের। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় সবাই মিলে অপকর্মের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়। তার বন্ধুদের মধ্যে বাসুদেব ছিল অসমসাহসী ও নির্ভীক। বাসুদেব সবাইকে আশ^স্ত করে। বলল, আমি যা বলব সবাই তা করবে।

সবাই একবাক্যে মেনে নেয় বাসুদেবের প্রস্তাব।

কাছাকাছি একটি মুসলমান পাড়া আক্রমণ করার জন্য তারা এগিয়ে যেতে থাকে। ‘বন্দে মাত্রম— ভারত মাতা কী জয়’—স্লোগান দিতে দিতে।

অন্য প্রান্তে শোনা যাচ্ছে—‘নারায়ে তাকবির— আল্লাহু- আকবর—পাকিস্তান জিন্দাবাদ—লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’।

বেধে যায় মুখোমুখি সংঘর্ষ, হতাহত হয় দুই পক্ষেরই অনেক বীরযোদ্ধা। শোভনও জখম হয় মারাত্মকভাবে। ঘটনাস্থলে নিহত হয় দুই পক্ষের চারজন। পুলিশ সময়মত উপস্থিত না হলে সেদিন আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। ওই ঘটনাটি এমনই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে যে খবরটির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিবিসি ও রয়টারে প্রচারিত হয়।

হাসপাতালে সাংবাদিক এসে ভিড় করে। একজন শোভনের কাছে জানতে চায়, আপনারা কী উদ্দেশ্যে মুসলমান পাড়া আক্রমণ করতে গিয়েছেন?    

কোনো উদ্দেশ্যে নয়, আমার কাছে এটি ছিল নিছক অ্যাডভেঞ্চার। তবে অনেকের মধ্যে ছিল প্রতিশোধের স্পৃহা। বিশেষত যারা স্বজন হারিয়েছে দাঙ্গায় এবং মুসলমানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এটা কি অন্যায় নয়?

আসলে তখন আমাদের ন্যায়-অন্যায়বোধ ছিল না। সবার মধ্যে পাশবিক প্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।

আপনারা কি বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছিলেন?

আমার মনে হয়, মানুষ আসলে এমনই—সব সময় মুখোশ পরে থাকে। সময় ও সুযোগ পেলে প্রকাশ পায় মানুষের আসল চেহারা।       

তার পাশের বেডে শুয়েছিল মুসলমান ছেলেদের দলপতি মাহমুদ উদ্দিন। মাহমুদও সেদিন মারাত্মক আহত হয়। একটা হাত ভেঙে যায়। মাথায়ও বেশ আঘাত লাগে। মাহমুদকে প্রশ্ন করা হয়, এমন ঘৃণ্য কর্মে তারা লিপ্ত হলো কেন?

আমরা অনেকেই মা-বাবা, বোন-ভাইকে হারিয়েছি। হিন্দু গুণ্ডারা কয়েকদিন আগে আমাদের পাড়ার কয়েকটি বাড়ি লুট এবং নারীদের সম্ভ্রম হরণ করেছে; পুড়িয়ে দিয়েছে ঘর। প্রতিশোধ নিতে আমরা হিন্দু পাড়ার দিকে রওনা হয়েছিলাম।

তবু কাজটা কি ঠিক হলো?

না। ঠিক হয়নি। সবার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছিল তখন। আসলে এত কিছু ভাবিনি আমি। সবাই প্রতিহিংসার আগুনে জ¦লছিল।

আপনারা কি কোনো নেতার কাছ থেকে এমন কিছু করার নির্দেশ পেয়েছেন?

না। আসলে আমরা তখন প্রতিশোধের নেশায় টগবগ করছিলাম।

আপনাদের কি বিশেষ কোনো লক্ষ্য আছে?

না। সে রকম কিছু নেই। শুধু জানি, বসে থাকলে হিন্দুদের হাতে মার খেতে হবে। তাই বসে থাকতে চাইনি।

তার দুই দিন পর পুলিশ এসে সবাইকে জেলে নিয়ে যায়।

বিভিন্নজনকে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ঘটনাচক্রে শোভন ও মাহমুদকে পাঠানো হয় যশোর জেলখানায়।    

জেলে দু’জনের মধ্যে বেশ ভাব হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তর্কেও লিপ্ত হয়ে যেত তারা। একদিন দুজনের মাঝে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে শোভন বলল, তোমাদের জন্য আজ দেশ ভাগ হতে চলছে; একবার ভেবে দেখো, একসঙ্গে থাকলে সব বাঙালির জন্য কতই না ভালো হতো।

মাহমুদ ক্ষিপ্ত হয়।—এসব কী বলছ তুমি! হিন্দু নেতাদের জন্য আজকের এই পরিণতি। এবার বুঝবে স্বাধীনতা কী জিনিস? দেশ আর দেশ থাকবে না। বাংলাভাগের জন্য অনেক বাঙালিকে উদ্বাস্তু-জীবন যাপন করতে হবে। হারাতে হবে বাস্তুভিটা।      

মাহমুদের কথা শুনে শোভনের ভেতর তীব্র অনুশোচনার জন্ম নেয়। শোভন দীর্ঘশ্বাস ফেলে—তখন না বুঝলেও এখন বুঝতে পারছি, বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করতে বাঙালির ঐক্য নষ্ট করা হয়। স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে এই দাঙ্গা সৃষ্টিতে প্ররোচনা দেয়। আর আমরা হয়ে পড়ি তাদের হাতের পুতুল।

মাহমুদ হতাশ কণ্ঠে বলল, হিন্দু মহাসভাপন্থি ও শিল্পগোষ্ঠীরা অখণ্ড বাংলা কিছুতে মেনে নিতে পারছিল না। তাদের কলকাতা চাই-ই চাই। পশ্চিম বাংলা ভারতের অঙ্গীভূত না হলে যেন তাঁদের বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে! তাদের স্বার্থেই বাংলা বিভক্তির জন্য তারা তৎপর হয়ে ওঠে। এই চক্রটি জানত, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছাড়া বাংলাবিভক্তি ত্বরান্বিত করা যাবে না।

শোভনের কথায় মাহমুদ একমত পোষণ করে বলল, বাঙালিরা অবাঙালিদের ফাঁদে পড়ে নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারল। বাংলা অখণ্ড থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেতে পারে—এ ছিল মৌলবাদী ও ব্যবসায়ীদের ভয়। শুনেছি দাঙ্গা ছড়ানোর জন্য এদের ভূমিকা ছিল প্রধান।

দুজনের চেহারায় ফুটে ওঠে অসহায়ত্ববোধ; দুজনই নৈকট্য বোধ করতে থাকে।

এর পরদিন তারা জানতে পারল যে, হিন্দু-মুসলমান নেতৃত্ব ও ইংরেজের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে বিভক্ত ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে ১৫ আগস্ট।

১৬ আগস্ট এসব কয়েদিকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে আনন্দের বদলে অনেকের মনে ভর করে বিষাদ। কে ভারতে থাকবে আর কে পাকিস্তানে যাবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয়, দ্বিধা ও অস্বস্তি।  জেলগেটে শোভনকে মাহমুদ প্রশ্ন করে, তুমি কোন বাংলায় থাকতে চাও?  

একই প্রশ্ন শোভনও করে মাহমুদকে।

শোভনের বাড়ি বিক্রমপুরে হলেও সে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর মাহমুদের বাড়ি চব্বিশপরগণায় হলেও সে পূর্ববঙ্গে চলে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। তারা এটুকু বুঝতে পারে যে, নিজ বাড়িতে থাকলে তাদের হতে হবে দেশের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক; আর দেশ পরিবর্তন করলে হতে হবে উদ্বাস্তু। দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার চেয়ে তারা উদ্বাস্তু হওয়াকেই শ্রেয় মনে করল।

মাহমুদ প্রস্তাব দেয়, তোমরা চাইলে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারো। বিনিময়ে তোমাদের বিক্রমপুরের বাড়িটি আমাদেরকে দিয়ে দাও।

শোভনের প্রস্তাবটি বেশ পছন্দ হয়।

বিষয়টিতে একমত হয় দুজনেই।

পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েক দিন পর বাড়ি বিনিময় হয়ে যায়।

তিন.

মালখানগরের বাড়িটি খুঁজে পেতে অভীক ঘোষকে বেগ পেতে হয়নি। বাড়ির আঙিনায় পা দিয়েই তিনি টের পেলেন অন্যরকম এক অনুভূতি, যার সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত। ছোটবেলায় বাবার কাছে শুনতে শুনতে যেসব ছবি তাঁর মনের মধ্যে জেগে উঠত, তার সঙ্গে মেলাতে শুরু করলেন বাড়িটির বিভিন্ন দৃশ্যপট। ঘুরেফিরে সব দেখে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলেন, এই বোধটা এত দিন কোথায় ছিল?

মুহূর্তে মনে পড়ে তাঁদের প্রতিবেশী মৃণাল বোসের একটি কথা। ছোটবেলায় অনেকটা গালির সুরে মৃণাল বোস তাঁদের বলত, তোরা তো রিফিউজি। ক্লাসের বন্ধুরাও আড়ালে আবডালে তাঁকে ওইভাবে সম্বোধন করত কখনও। আর ঝগড়ার সময় বলত প্রকাশ্যে।

তখন কথাটার মানে না বুঝলেও এখন বেশ বুঝতে পারলেন, তাঁদের শেকড় যে এই মাটিতে পোঁতা। আর পশ্চিমবঙ্গে তাঁরা তো আসলেই উদ্বাস্তু।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares