চলচ্চিত্র : ইরানের নিষিদ্ধ চলচ্চিত্রকার : জাফর পানাহির ‘ট্যাক্সি’ এক সোচ্চার বিদ্রোহ : আফরোজা পারভীন

যে ক’জন ইরানি চলচ্চিত্রকার বদলে দিয়েছেন ইরানি চলচ্চিত্রের দুনিয়া, জাফর পানাহি তার একজন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছেন যারা তাঁদের অন্যতম জাফর পানাহি। চলচ্চিত্র জীবনের  শুরুতে তিনি ইরানের আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আব্বাস কিয়ারোস্তামির সহকারী ছিলেন। তাঁর প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন কিয়ারোস্তামি নিজে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন পাম’ পুরস্কার জেতে ছবিটি। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায় ‘দ্য মিরর’ । ২০০০ সালে দর্শককে উপহার দেন ‘দ্য সার্কেল’। ২০০৩ সালে ইরানব্যাপী শোরগোল তুলে দেয় তাঁর ছবি ‘ক্রিমসন গোল্ড’। ২০০৬ সালে ‘অফসাইড’ নির্মাণের পর থামিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। থামিয়ে দেয় ইরান সরকার। তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০ বছর ছবি পরিচালনা, চিত্রনাট্য, গল্প, নাটক, স্মৃতিকথা এমনকি ডায়েরি লেখাও নিষিদ্ধ করা হয় তাঁর জন্য। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার প্রদান ও দেশ ত্যাগের ক্ষেত্রেও জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। এক কথায় কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর সব রকম স্বাধীনতা। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেশের ‘প্রথাবিরোধী’ প্রচারণা ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সরকারবিরোধীদের ‘উসকে’ দেওয়া।

ইরানি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় কঠোর বাধা-নিষেধের মধ্যে। অনেক নির্মাতাকেই সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। পানাহিকেও পড়তে হলো। পানাহির শাস্তির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও  ইরান সরকার ভ্রƒক্ষেপমাত্রও করলো না।

পানাহির চলচ্চিত্রের  চরিত্রগুলো  আমাদের চেনা, দেখা, বাস্তবের মানুষ যেন তারা। চলচ্চিত্রের পর্দায় তিনি তুলে ধরেন মানবতা, জেন্ডার সাম্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অনুপুঙ্খ চিত্র। দেখিয়ে দেন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি। ফিল্ম জার্নাল রিভার্স শর্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এই সমাজে বাস করি। চারপাশে যা দেখি আর যা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করে, আমার কাজের সমস্ত উপাদান তা থেকেই আসে।’

অনেকে পানাহিকে বলেন ‘অ্যাক্টিভিস্ট ফিল্মমেকার’। এর জবাবে পানাহি বলেন, ‘নিজেকে একজন সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ চলচ্চিত্রনির্মাতা মনে করি, রাজনৈতিক এজেন্ডাধারী কেউ না। আমার ছবি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। ছবির চরিত্ররা সবাই সেই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের রূপক।’

তাঁর শেষ তিনটি ছবি দ্য সার্কেল, ক্রিমসন গোল্ড ও অফসাইড নিজভূমেই নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু আজকের এই দিনে কী নিষিদ্ধ করে কোনো কিছু আটকে রাখা যায়! যায় না।  তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তার নিষিদ্ধ ছবিগুলো ছড়িয়ে যায় গোটা বিশ্বে!

ইরানিদের প্রিয় উৎসব নওরোজ। প্রিয় খেলা ফুটবল। যদিও জাতীয় খেলা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে  কুস্তিকে। ইরানি জনগণ ফুটবল প্রেমিক। কিন্তু শাসকদল ফুটবল খেলাকে মোটেই ভালো চোখে দেখে না। শর্টস আর আঁটোসাঁটো টিশার্ট  পরে খেলা নাকি ইসলাম বিরোধী। আর সে খেলা দেখে দর্শকদের মধ্যে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় সেটাও ইসলামসম্মত নয়। স্টেডিয়ামে ছেলেদের মধ্যে মেয়েদের ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়া, ফুটবলের ব্যাপারে তরুণীদের বাধভাঙা উল্লাস স্বৈরাচারি শাসকের একেবারেই পছন্দ নয়। ইসলামিক শাসনে স্টেডিয়ামে ছেলেদের সাথে মেয়েদের খেলা দেখা নিষিদ্ধ। এই বিষয় নিয়েই ২০০৬ সালে নির্মিত হয় ‘অফসাইড’।

এই ছবি নির্মাণের পেছনে পানাহি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন দুটো ঘটনা থেকে। ১৯৯৭ সালে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল ফ্রান্স বিশ্বকাপের মূল পর্বে জাতীয় দলের ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ২৯ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে  অস্ট্রেলিয়ার সাথে ২-২ গোলে ড্র করায় ফ্রান্স যাবার ছাড়পত্র পায় তারা। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজামাত্র উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা ইরান। শহর বন্দর গ্রাম কোথাও কোনো মানুষ ঘরে বসে থাকে না। দেশজুড়ে চলতে থাকে উৎসব। ছেলে বুড়ো বৃদ্ধ বৃদ্ধা তরুণ তরুণী রাস্তায় নেমে আসে। বাজি  পোড়াতে থাকে। নাচ গান চলতে তাকে রাতভর। মেয়েরা তাদের মাথার স্কার্ফ আর হিজাব খুলে ফেলে। সেনাবাহিনী আর পুলিশ বাহিনীর কর্মীরাও এতে অংশ নেয়। স্বভাবতই রুষ্ট হয় শাসক দল। ফুটবল নিয়ে এই উন্মাদনা তাদের পছন্দ নয় মোটেও।

ইরান সরকার পরে ফুটবল দলকে সংবর্ধনা জানানোর আয়োজন করে আজাদি স্টেডিয়ামে। সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, মেয়েদের যেহেতু স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষেধ তাই তারা যেন বাড়িতে বসে টিভিতে এই অনুষ্ঠান দেখেন। কিন্তু সেই বাধা মানেননি পাঁচ হাজারাধিক নারী। তারা স্টেডিয়ামের গেটে সমবেত হলে পাহারারত পুলিশ ও সেনাসদস্যরা তাদের আটকে দেয়।  পুলিশের সাথে তাদের রীতিমতো খণ্ডযুদ্ধ হয়। সেদিন পুলিশ বাহিনীকে পরাজিত করে তারা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে। আর গ্যালারি বোঝাই পুরুষরা সোল্লাসে তাদের স্বাগত জানায়।

২০০৫ সালে ফুটবল খেলা নিয়ে আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে। ওই আজাদি স্টেডিয়ামে ইরান-জাপান ম্যাচে  ইরান ফুটবল দল জাপান দলকে ২-১ গোলে পরাজিত করে। খেলা শেষে আনন্দিত দর্শকরা প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসছিল। অদূরে দাঁড়িয়ে ছিল একটা হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টারকে ঘিরে ছিল সৈন্যরা। কিন্তু আনন্দিত উল্লসিত দর্শকরা খেয়াল না করে ওই হেলিকপ্টারের কাছাকাছি চলে যায়। ব্যস সৈন্যরা শুরু করে জনতার ওপর লাঠিচার্জ।  হুল্লোড় বেধে যায়। সেদিন পদপিষ্ট হয়ে মারা যান আটজন। পরদিন খবরের কাগজে সাতজনের নাম পরিচয়সহ ছবি প্রকাশিত হয়। আটজনের বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে যায় সরকার। ইরানি জনগণ বিশ্বাস করে ওই অষ্টমজন ছিলেন একজন নারী যিনি সেদিন পুরুষের ছদ্মবেশে খেলা দেখতে ঢুকেছিলেন। কারণ সেদিন  পুরুষের ছদ্মবেশে বেশ কিছু নারীও খেলা দেখতে গিয়েছিলেন, যা সরকার স্বীকার করেনি।

ফুটবল নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছে পানাহির আগেই ছিল। এই দুটি ঘটনা তাতে জলসিঞ্চন করল। কাজেই ১৯৯৬ সালে ইরান-বাহরাইন ম্যাচের প্রাক্কালে তিনি সরকারি দপ্তরে জমা দিয়ে চিত্রনাট্য অনুমোদন করালেন। গোপন রাখলেন ফুটবল খেলতে যে যাবে সে পুরুষ নয়, পুরুষের ছদ্মবেশে নারী।

ছবিতে দেখা যায় সীমা নামের এক তরুণী পুরুষের ছদ্মবেশে আজাদি স্টেডিয়ামে ইরান-বাহরাইন ম্যাচ দেখতে রওনা হয়। প্রবেশ পথে সে ধরা পড়ে যায়। তাকে বন্দি করে রাখা হয় ছাদে একটা সাময়িক কারাগারে। আস্তে আস্তে সেখানে বন্দি হয়ে আসে আরও মেয়েরা। স্টেডিয়ামে খেলা চলতে থাকে। একই সাথে এগিয়ে যায় আখ্যানভাগ। এ তরুণীদের কেউ কিন্তু পেশাদার অভিনেত্রী নন। এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও ফুটবলপ্রেমী। তথ্যচিত্রের ঢঙে ন্যাচারাল লাইটে ছবি চলতে থাকে। মেয়েরা বন্দি ছাদের এক চিলতে জায়গায়। তাদের পাহারায় আছে তিন চারজন  সৈন্য। একটা ফোকর দিয়ে বাইরের এক চিলতে মাঠ দেখা যায়।  মেয়েদের অনুরোধে সৈন্যদের একজন খেলা দেখে দেখে ধারা বর্ণনা দিতে থাকে। পানাহির ক্যামেরা ঘোরাফেরা করে নাতিপ্রশস্ত জায়গাটুকুতে। কিন্তু কি আশ্চর্য ক্যামেরার কাজে তিনি বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা এনে দেন। খেলা যতই এগোতে থাকে ওই ঘরবন্দি মেয়েরাও নিজেদের এক জগৎ বানিয়ে নেয়। যুক্তি তর্কে কথায় কলহাস্যে আবেগে তারা একীভূত হয়ে যায়। তাদের ভালোবাসার জায়গা এক, ফুটবল। এ ছবি আমাদের মনে করায় মাজিহার বাহারির ইরানিয়ান স্টাইল (২০০১) ও আব্বাস কিয়ারোস্তামির মুসাফির (১৯৭৪) চলচ্চিত্রের কথা।

 খেলা শেষ হওয়ার আগে মেয়েদের একটা বাসে তোলা হয় পুলিশ পাহারায় থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। এর মাঝে খেলা শেষ হয়ে যায়। ২-১ গোলে বাহরাইনকে পরাজিত করে ইরান। জনতা নেমে আসে রাস্তায়। বাস আটকে যায় জনস্রোতে। মেয়েরা পুলিশের সামান্য বাধা অতিক্রম করে নেমে এসে জনস্রোতে মিশে যায়। বাজি পটকা নাচ গানে সমানতালে অংশ নেয় তারা। সাউন্ড ট্রাকে ভেসে আসে কবি হোসেন এ গোলাব এর ১৯৪৪ সালে রচিত গান ‘সরুদ-ই-এ-ইরান।’ একদিন পথে এক সবজি বিক্রেতাকে আমেরিকান সেনার হাতে নিগৃহীত হতে দেখে তিনি এই গানটি লেখেন। ইরানের বিখ্যাত সুরকার, সঙ্গীত গবেষক রুহুল্লা খারেগি গানটিতে সুরারোপ করেন। একসময় এ গানটি ইরানের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। কিন্তু বারবার নিষিদ্ধ হয় গানটি। তবে ইরানে মিছিল আর গণজমায়েতে এই গানটি দেশপ্রেমের গান হিসেবে স্বীকৃত।

বলছিলাম অফসাইডারের কথা। নিষিদ্ধ হলেন পানাহি। ২০১০ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় আদেশে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর সিনেমা বানানো। তাঁর পেছনে রয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাণে কুড়ি বছরের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বন্দিত্ব সত্যিকার নির্মাতাকে কখনোই আটকে রাখতে পারেনি। পানাহিকেও পারলো না। তিনি গৃহবন্দি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। তিনি শুধু একের পর এক প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণই করছেন না। ইরানের সবুজ বিপ্লবের সময় তিনি শহিদ ছাত্রনেতা আগা-সোলতানের স্মরণসভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। মিছিলে হেঁটেছিলেন। গণতন্ত্রী মির হোসেন মৌসভিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাই তাঁর এই শাস্তি, ছয় বছরের গৃহবন্দিত্ব। আর চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর বিশ বছরের নিষেধাজ্ঞা। সেই নিষেধাজ্ঞা ভাঙার জন্য যেন গৃহবন্দি পানাহির ছবি ‘দিস ইজ নট এ ফিল্ম’। এ চলচ্চিত্রে দেখা যায় পানাহি কখনও তার উকিল নাসরিন সাতোদের সাথে আইনি পরামর্শ করছেন, কখনও টিভি দেখছেন, কখনও পড়ছেন, কখনও ফোনে কথা বলছেন, কখনও বন্ধু মিরতা মাসব এর সাথে কথা বলছেন, কখনও বা খুঁটিনাটি কাজ করছেন। অর্থাৎ গৃহবন্দি পানাহির বন্দিত্বকালীন দিনযাপন ফুটে উঠেছে ‘দিস ইজ নট এ ফিল্ম’ এ। নিজের মোবাইল ক্যামেরা আর সহকারীর ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো। তথ্যচিত্রটি নির্মাণের পর একটা বড় কেকের মধ্য করে পেনড্রাইভে পৌঁছে যায় ইরানের বাইরে। কান, পুসান, টরেন্টো, নিউইয়র্ক বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয়ে প্রশংসিত হয়। এ ছবিটিকে শুধু পানাহির গৃহবন্দি জীবনের দিনলিপি বললে ভুল হবে। কারণ এ ছবিতে তিনি ওই ছোট্ট পরিসরে দেখিয়েছেন সারা পৃথিবীর অন্যায্যতা নৃশংসতা বর্বরতার চিত্র। যেমন একটি দৃশ্যে দেখা যায় পানাহি ক্যামেরার সামনে কথা বলছেন তার পরিকল্পিত একটি ছবির কাহিনি নিয়ে। একটা মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। কিন্তু তার গোঁড়া পরিবার রাজি নয়। সেই বিদ্রোহ। মেয়েদের প্রতি অন্যায্যতা। সমাজের ভারসাম্যহীনতা, যা তিনি বন্দি না হলেও করতেন তাই-ই করলেন বন্দি হয়ে। ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় বাইরে বাজি পটকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। পানাহি চিন্তিত হয়ে টিভি অন করলেন। টিভিতে খবর শোনা গেল জাপানে সুনামি  আঘাত হেনেছে। ইরানের রাষ্ট্রপতি নওরোজ উৎসব বাতিল করেছেন।

পানাহির ছবিগুলিকে কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার ছবি তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্রের যে সীমানা সেটা ভেঙেছে। তার শেষ দিকের ছবিগুলোতে তিনি নিজেই চলচ্চিত্রের পর্দায় উপস্থিত হয়েছেন কখনও সূত্রধর, কখনও কাহিনির চরিত্র, কখনও নিজ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে।    

‘দিস ইজ নট এ ফিল্ম’ নির্মাণের সময় তিনি আক্ষরিক অর্থেই গৃহবন্দি ছিলেন। পরে শর্তসাপেক্ষে তেহরান শহরে ঘোরাঘুরির সুযোগ পান। তিনি নির্মাণ করেন ট্যাক্সি। তার চোখ দিয়ে আমরা দেখি তেহরান শহরটিকে। পানাহির ট্যাক্সি ক্যাবের ড্যাশবোর্ডে রাখা ক্যামেরা ধারণ করে চলে যাত্রীদের দৈনন্দিন চিত্র। পানাহি নিজেই এই সিনেমার প্রধান চরিত্র। একটি সিনেমার টিকিটের সমপরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তিনি তাঁর ট্যাক্সিতে যাত্রী হওয়ার আমন্ত্রণ জানান লোকদের। একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার হয়ে পানাহি তাঁর যাত্রীদের সাথে সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে আলাপ জুড়ে দেন। ট্যাক্সির প্রথম যাত্রী টায়ার চোর। চোরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা নিয়ে পেছনের সিটে বসা নারী যাত্রীর সঙ্গে চলে তার বিতর্ক । পুরুষ যাত্রী শরিয়া আইন ও শরিয়ার কথা বলে মহিলাকে অভদ্রভাবে চেষ্টা করে চুপ রাখতে । বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য করে নেমে যায় সে। মহিলার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকেরও ভুল ভাঙে। পুরুষ যাত্রী আসলে একজন পেশাধার অভিনেতাই ছিলেন। একজন যাত্রী পানাহিকে চিনতে পেরে তার নতুন সিনেমা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। ড্রাইভিং সিটে বসা পানাহি আবিষ্কার করে স্থূলকায় ডিভিডি পাচারকারী ওমিদকে। পানাহি নিজেও যার কাছ থেকে সিনেমার পাইরেটেড ডিভিডি নিয়ে ছবি দেখে থাকেন। সারা তেহরানজুড়ে বিদেশের নাম করা ছবির ডিভিডির একমাত্র জোগানদার সে। ইরানে নিষিদ্ধ জাফর পানাহির ছবির ডিভিডি সেই দর্শকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে থাকে। উমিদ ফিল্ম মেকার জাফর পানাহিকে নিয়ে যায় তার এক গ্রাহকের কাছে। যে আর্টি (আর্ট ফিল্ম) মুভির দারুণ ভক্ত। পানাহির সাথে তরুণ দর্শকের পরিচয় করিয়ে দেয় উমিদ। তরুণ দর্শক ভালো সিনেমা বানানোর উপায় জানতে চান পানাহির কাছে। পরের দৃশ্যে প্রচণ্ড হট্টগোলের মাঝ থেকে এক বিপন্ন নারী মোটরবাইক দুর্ঘটনায় আহত তার স্বামীকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে পানাহির গাড়িতে ওঠে। সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত মহিলার মৃত্যুপথযাত্রী স্বামী চায় মরণের আগে তার সহায় সম্পত্তির যথাযথ বন্দোবস্ত করে যেতে। তার উইলের বাণী মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করে রাখার অনুরোধ করে। পানাহির মোবাইলে উমিদ মহিলার স্বামীর উইলের বাণী ভিডিও করে রাখে। তার স্ত্রী নিশ্চিত হতে চায় স্বামী মারা গেলে ভাইয়ের পরিবর্তে স্ত্রী ও সন্তান যেন তার সকল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হয়। ইরানের পুরুষ নিয়ন্ত্রিত উত্তরাধিকার আইন নিয়ে কথা উঠে আসে ছবিতে। শুধু তাই নয় পানাহির যাত্রীরা কথা বলেন ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে মৃত্যুবরণ করা রাজনৈতিক বন্দিদের ব্যাপারে। এমনকি ভলিবল খেলার কারণে জেলে যাওয়া মহিলাদের কথাও বলেন তাঁর যাত্রীরা। নির্মাতা পানাহি সুকৌশলে যাত্রীদের রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে ছবিতে চলন্ত রাস্তার বাস্তবিক পরিস্থিতি যুক্ত করে দেন। যুক্ত করেন নিজের বানানো ‘অফসাইড’, ‘সার্কেল’ কিংবা ‘হোয়াইট বেলুন’ সিনেমার অনুস্মারক। মোটরবাইক দুর্ঘটনায় পতিত যাত্রীদের হাসপাতাল অবধি পৌঁছে দেওয়ার পর পানাহির ট্যাক্সিতে লিফটের আবেদন করেন দুই বয়স্ক মহিলা। মুখ খোলা কাচের পাত্রে করে গোল্ড ফিশ নিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠেন তারা। পানাহি স্বীকার করছেন তিনি খুব একটা দক্ষ ড্রাইভার নন। কিন্তু মহিলা বলতে থাকেন, দুপুরের আগে যদি গোল্ড ফিশ দুটিকে তাদের অভীষ্ট স্থানে ছেড়ে দিতে না পারেন তাহলে বয়স্ক মহিলাটি মারা যাবেন। পানাহি রাজপথে তাদের নামিয়ে দিয়ে অন্য ক্যাব ধরিয়ে দেন। যাত্রীরা আসে এবং যায়। এর ভেতরে ছবিতে যুক্ত হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলাপের অংশ। পানাহির নিজের ভাইঝি হানা সাঈদি। স্কুল টিচার তাকে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর হোম ওয়ার্ক দিয়েছে । দৃশ্যটিতে ইরান সরকারের চলচ্চিত্র নীতি যেমন অবলীলায় ফুটে ওঠে তেমনিভাবে উঠে আসে পানাহির নিজের চলচ্চিত্র চিন্তা। এরপর পানাহিকে দেখা যায় একজন ফুলওয়ালীকে লিফট দিতে। জেলখানায় অনশনকারী কয়েদিদের দেখতে যাচ্ছেন তিনি। দর্শকদের সেই যাত্রীর নাম জানা হয় না যদিও, কিন্তু সেই যাত্রী বাস্তবিকই ইরানের একজন রিয়েল লাইফ ফিগার। ইরানের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী নাসরিন স্যতুদেক। কথাবার্তা শেষে তিনি ক্যামেরার দিকে একটি লাল গোলাপ বাড়িয়ে দিয়ে পানাহির সিনেমার জন্য শুভকামনা রাখেন। যদিও সিনেমা শেষ হয় অন্ধকার দৃশ্যে আকস্মিক নোট দিয়ে। কোনো রকমের ক্রেডিট লাইন ছাড়া। কেননা পানাহি চান না তার সঙ্গে কাজ করা সহকর্মীরা কোনো রকম বিপদের মুখে পড়ুক জাফর পানাহির সিনেমায় কাজ করার অপরাধে। তবে ছবির মূল ক্লাইম্যাক্স গল্পের অন্যত্র। নিজের প্রথম সিনেমা ‘হোয়াইট বেলুন’-এর গোল্ড ফিশের অনুস্মারক নিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠা দুই বয়স্ক মহিলা যাত্রীর ফেলে যাওয়া পার্স ফেরত দিতে গিয়ে আর নিজের গাড়িতে ফিরে আসেন না পানাহি। মুখোশধারী দুই যুবক বাইকে চড়ে এসে পানাহির ট্যাক্সির ড্যাশবোর্ডে রাখা ক্যামেরা উপড়ে ফেলে।

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের আঙ্গিকে নির্মিত আশি মিনিট  দৈর্ঘ্যরে এই সিনেমা দর্শকদের কখনও বিরক্তির উদ্রেক করে না। ছবিতে একজন মানুষ হিসেবে, একজন শিল্পী হিসেবে সর্বোপরি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে মানুষের কিংবা শিল্পীর কথা বলার মতো ও চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ‘ট্যাক্সি’ পানাহির একটি সিনেমাটিক উদ্ভাবন কিংবা রাস্তা খুঁজে নেওয়া । রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা থাকায়, সিনেমা বানানোর জন্য নিজের ভাষায় নিজের কথা বলার একটি প্রাণবন্ত চলচ্চিত্রীয় প্রক্রিয়া বলা যায় সিনেমাটিকে। সিনেমার ভাষায় পানাহি তার নিজের ব্যক্তিগত প্রতিবাদ জাগিয়ে তোলেন পর্দায়। পানাহির ট্যাক্সি তেহরান ইরানের সমাজ চিন্তাকে তুলে ধরে। ইরানি সমাজের নিষ্ঠুরতা ও কপটতার বিপরীতে সাধারণ মানুষের উদারতাকেও ফুটিয়ে তোলে এ চলচ্চিত্র ।

সরকারিভাবে তাঁর সিনেমা বানানো বন্ধ করে দেওয়া হলেও দমবার পাত্র তিনি নন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে সরকার ইরানে জাফর পানাহির চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সেই সরকারকে দেখা যায়, চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহির সরকারি আইনের নিষেধ ভেঙে গোপনে তৈরি করা সিনেমাকে বিদেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠাতে। তাও আবার ইরানের রাষ্ট্রীয় এন্ট্রি হিসেবে ইরানের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র গণ্য করে। নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে জাফর পানাহির গোপনে নির্মিত তিনটি সিনেমার মধ্যে দু’টি ফিচার ফিল্মই ইরানের রাষ্ট্রীয় লেভেলে বিদেশে যায় এবং পুরস্কার জিতেছে। বাধা নিষেধের আইনি ভেড়াজাল সত্ত্বেও অদম্য জাফর পানাহি সিনেমা বানিয়ে যেতে থাকেন। আর সরকার দেশের মানুষকে বৈধভাবে দেখার সুযোগ না দিয়ে বিদেশের দর্শকদের জন্য চলচ্চিত্র উৎসবে উন্মুক্ত করেন সেই সিনেমা। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে নিষিদ্ধ ঘোষিত চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহির সর্বশেষ নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ট্যাক্সি’ উৎসবের প্রধান পুরস্কার স্বর্ণ ভলুক তথা গোল্ডেন বিয়ার জিতে নেয়। পাশাপাশি উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার, প্রতিযোগিতা বিভাগের সেরা সমালোচক পুরস্কারও অর্জন করে ‘ট্যাক্সি তেহরান’। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন প্রদত্ত এই পুরস্কারের ভূমিকায় বলা হয়েছে, জাফর পানাহির এই সিনেমায় তাঁর ব্যক্তিগত ও  শৈল্পিক সাহসের মহত্ত্ব দেখা গেছে। লেখকের মন্তব্য হচ্ছে ‘ট্যাক্সি তেহরান’।  সিনেমায় সেই সঙ্গে আমরা দেখতে পাই চলচ্চিত্রের শিল্পচর্চায় শিল্পের প্রতি অবিচল একজন শিল্পীর দৃশ্যশ্রাব্য দুর্দশার চিত্রও।

কিন্তু কোনো দুর্দশাই থামাতে পারে না প্রকৃত শিল্পীকে। পানাহিকেও পারেনি। অভিবাদন জাফর পানাহি।

 লেখক : কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares