বিশ্বসাহিত্য : অর্ধদিবস- মূল গল্প : নাগিব মাহফুজ -অনুবাদ : রাফিক হারিরি

[নাগিব মাহফুজ : আরবি সাহিত্যের একজন প্রধান কথাশিল্পী এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্যের একমাত্র নোবেলজয়ী লেখক। জন্ম মিসরের কায়রোতে। কাসরুল শাওক, আসসুক্কারিয়া, বাইনাল কাসরাইনÑ এই তিনটি গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অর্ধদিবস গল্পটি তার ‘হাফ আ ডে’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি দ্য টাইম এন্ড দ্য প্লেস এন্ড আদার স্টোরিস থেকে নেওয়া হয়েছে।]

বাবার হাত শক্ত করে ধরে আমি তার সাথে ছুটছি। বাবা লম্বা পা ফেলে হাঁটছিলেন। পায়ের কালো জুতা, স্কুলের সবুজ পোশাক, মাথার লাল ফেজটুপিসহ সবকিছুই একদম নতুন। আমি খুব খুশি নতুন জামা-কাপড়ে। কোনো উৎসবের দিন ছিল না এটা, বরং প্রথমবারের মতো এই নতুন পোশাক পরে আমি স্কুলে যাচ্ছিলাম।

মা জানালায় দাঁড়িয়ে আমাদেরকে দেখছেন কতদূর গেলাম আমরা। বারবার পেছনে মাথা ঘুরিয়ে আমি মাকে দেখছিলাম একটু পর পর। মাথা ঘুরিয়ে মার কাছে সাহায্য চাচ্ছিলাম।

আমরা যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম তার দুপাশে সবুজ বাগান, শস্যের ক্ষেত, ক্যাকটাসের ঝোপ, মেহেদি গাছ আর কিছু খেজুরের গাছ ছিল।

‘কেন স্কুলে যাচ্ছি?’ বাবাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘আমি কখনওই তোমাকে বিরক্ত করিনি।’

‘আমি তোমাকে শাস্তি দিচ্ছি না।’ বাবা হাসতে হাসতে বললেন। ‘স্কুল শাস্তি দেওয়ার জায়গা না। এটা একটা কারখানা যেখানে তোমার মতো ছোটো ছোটো বালকদের মানুষের জন্য উপকারি তরুণ যুবক হিসেবে তৈরি করা হয়। তুমি কি তোমার বাবার মতো কিংবা ভাইদের মতো হতে চাও না?’

বাবার কথা আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি কখনওই বিশ^াস করি না সেখানে বাড়ির চেয়ে ভালো কিছু আছে। রাস্তার শেষ মাথায় বিশাল এক দুর্গের মতো ঘেরাও দেওয়া স্কুলে ভালো কিছু থাকতে পারে না।

স্কুলের গেটে পৌঁছার পর আমি স্কুলের বিশাল উঠোন দেখতে পেলাম। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে আর মেয়েদের দিয়ে উঠোনটা ঠাসা।

‘যাও নিজের মতো ঘুরে বেড়াও এখন। সবার সাথে মিশে যাও। তোমার মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখো। তুমি যে খুব ভালো মানুষ সেটা যেন সবাই বুঝতে পারে।’ বাবা বললেন।

আমি দ্বিধা করছিলাম। বাবার হাত ধরে ঝুলে থাকলাম। কিন্তু বাবা আমাকে আস্তে করে সামনের দিকে ঠেলে দিলেন। তারপর বললেন, ‘মানুষ হও। আজকে থেকে তোমার সত্যিকারের জীবন শুরু হলো। স্কুল ছুটি হলে তুমি আমাকে দেখবে বাইরে আমি অপেক্ষা করছি তোমার জন্য।’

আমি কয়েক পা সামনে এগিয়ে যাই তারপর দাঁড়িয়ে পড়ি। চোখে কিছুই দেখি না। একটু পর ছুটে বেড়ানো বালক বালিকাদের দেখতে পাই। তাদের কাউকেই আমি চিনি না, তারাও কেউ আমাকে চেনে না। মনে হলো আমি এক অচেনা আগন্তুক যে পথ হারিয়ে ফেলেছে। একটু পরেই একজন কৌতূহলী ছেলে আমার কাছে এলো। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে কে নিয়ে এসেছে?’

‘আমার বাবা।’ ফিসফিস করে বললাম আমি।

‘আমার বাবা মারা গেছে।’ ছেলেটা খুব শান্ত স্বরে স্বাভাবিকভাবে বলল।

আমি বুঝতে পারলাম না এখন কি বলব। স্কুলের দরজা বন্ধ। বাচ্চাদের মতো কেউ কেউ কাঁদতে শুরু করেছে। ঘণ্টা বাজল। একজন মহিলা এলো। তাকে বেশ কয়েকজন লোক অনুসরণ করছে। লোকগুলো আমাদের পৃথক পৃথক সারিতে দাঁড় করিয়ে দিল। স্কুলের বিশাল উঠোনে আমরা খুব অদ্ভুত সারিতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। উঠানের তিন পাশে বড় বড় অট্টালিকা। বিশাল বিশাল কাঠের বারান্দা।

‘এটা তোমাদের নতুন বাসা।’ মহিলাটা বলল। ‘এখানেও তোমাদের বাবা আর মা আছে। আনন্দ করার  মতো সব কিছু এখানে আছে। তোমাদের জ্ঞান অর্জন আর ধর্ম শিক্ষার উপকারি সব কিছু তোমরা এখানে পাবে। চোখের পানি মুছে ফেলো। নতুন জীবনকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করো।’

ভাগ্যের কাছে আমরা নিজেদের ছেড়ে দিলাম। এই আত্মসমর্পণ আমাদের জন্য তৃপ্তি আর আনন্দ নিয়ে এলো। একটা জীবন আরেকটা জীবনকে কাছে টানল। স্কুলের প্রথম থেকেই আমার অন্তর বন্ধু বানানোর জন্য মুখিয়ে ছিল। কতগুলো ছেলের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বেশ কয়েকটা মেয়েকে আমার খুব ভালো লাগল। আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে স্কুলে এত এত বিচিত্র রকম আনন্দের বিষয় আছে। আমরা সব ধরনের খেলাধুলা স্কুলে করতাম। দোলনা খেলা, ঘোড়দৌড়, ফুটবল। সংগীতকক্ষে আমাদের জীবনের প্রথম গান চিৎকার করে গাইলাম। ভাষা কীভাবে শিখতে হয় সেটা প্রথমবার জানতে পারলাম। একটা গোলক পৃথিবী দেখলাম। যেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পৃথিবীর  নানা দেশ আর মহাদেশ দেখা যায়। আমরা গণনা শিখতে শুরু করলাম। মহাবিশে^র সৃষ্টিকর্তার গল্প আমাদেরকে পড়ে শোনালেন শিক্ষকরা। সৃষ্টিকর্তা কী কী বলেছেন তার জগতের বিষয়ে আমাদেরকে জানানো হলো। খুব সুস্বাদু খাবার খেলাম আমরা। একটু ঘুমালামও। ঘুম থেকে উঠে আবার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা আর নানা কিছু শিখলাম।

নতুন যে পথে আমরা হাঁটছি সেটা এতটা মধুর আর মসৃণ ছিল না যতটা আমরা ভেবেছিলাম। অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা আর বিপদ-আপদ এখানেও ছিল। আমরা তাই সতর্ক থাকতাম। ঝগড়া রেষারেষি থেকে মারামারি পর্যন্ত লেগে যেত। ফলে যেই মহিলাকে আমরা হাসিমুখে পেয়েছিলাম দেখতাম তিনি রেগে যাচ্ছেন। কখনও কখনও আমাদেরকে ধমক দিতেন।  এমনকি মাঝে মাঝে আমাদেরকে শারীরিকভাবে শাস্তিও দিতেন।

ততক্ষণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ পার হয়ে গেছে। ফলে বাড়ির মতো স্বর্গতুল্য জায়গায় ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ ছিল না আমাদের। উদ্যম ক্রমাগত চেষ্টা আর অধ্যবসায় ছাড়া আমাদের সামনে আর কিছু ছিল না।

আবার ঘণ্টা বাজল। স্কুলের দিন শেষ হলো। কাজের সমাপ্তি ঘটল। স্কুলের মূল দরজা খুলে দেওয়া হলো। বাচ্চাদের দল ছুটে গেল খোলা দরজার দিকে। আমার প্রিয় বন্ধু আর প্রিয়তম বান্ধবীদেরকে বিদায় জানালাম আমি। চারপাশে তাকালাম। কোথাও বাবাকে দেখতে পেলাম না। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এখানে থাকবেন। কয়েক পা সামনে গিয়ে আমি অপেক্ষা করলাম। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর আমি একাই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। কয়েক পা যাওয়ার পর একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। মনে হলো এই লোকটাকে চিনি আমি। সে আমার কাছে এসে হাসিমুখে আমার হাত ধরে ঝাঁকি দিল। তারপর বলল, ‘অনেক দিন পর তোমাকে দেখলাম। কেমন আছো তুমি?’

মাথা ঝুঁকিয়ে আমি তার কথায় সায় দিলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কেমন আছেন?’

‘এই তো আল্লাহর ইচ্ছেয় আছি মোটামুটি।’

লোকটা আমার হাত ধরে আবার ঝাঁকি দিয়ে চলে গেল। আমি কয়েক কদম সামনে এগিয়ে তারপর হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। হায় খোদা! এ আমি কোথায়? রাস্তার দুপাশের সারি সারি বাগান কই গেল? এত এত মানুষের ভিড় এখানে কখন কোত্থেকে এলো? রাস্তার দু’পাশে যে বিস্তৃত মাঠ ছিল সেগুলো কীভাবে নাই হয়ে গেল? রাস্তার দু’পাশে বিশাল বিশাল উঁচু উঁচু অট্টালিকা আর রাস্তায় ফুটপাথে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এত হল্লা কোত্থেকে এলো? আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় ম্যাজিশিয়ানরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাজিক দেখাচ্ছে। তার শূন্য ঝুড়ি থেকে সাপ তৈরি করে সামনে নিয়ে আসছে। একটু দূরে সংগীত বাদকদের দল সংগীত বাজিয়ে সার্কাসের ঘোষণা দিচ্ছে। তাদের সামনে দিয়ে নানা রঙের ভাঁড়েরা ভাঁড়ামি করছিল।

আর একটু দূরে সারি সারি ট্রাকভর্তি সৈন্যরা যাচ্ছে। এত ভিড়ের মাঝে আগুন নেভানোর গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলার চেষ্টা করছে। বুঝতে পারছিলাম না এত ভিড় সরিয়ে কীভাবে এই গাড়ি জ্বলন্ত আগুনের কাছে পৌঁছবে। এর মাঝেই এক ট্যাক্সি চালকের সাথে যাত্রীর বাকবিতণ্ডা শুরু হলো। হাতাহাতি লেগে গেল। যাত্রীর স্ত্রী চিৎকার করে সাহায্য চাইছে। সেই আহ্বানে কেউ কোনো সাড়া দিল না।

হায় খোদা এ আমি কোথায় এসে পড়লাম। আমি হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। মাথা ঘুরছে আমার। প্রায় পাগল হয়ে গেছি আমি। অর্ধদিবসের ভেতর সকাল থেকে শুরু করে সূর্যাস্তের মধ্যে কীভাবে এত কিছু ঘটে গেল। বাড়িতে বসে বাবার সাথে আলোচনা করে এর উত্তর বের করতে হবে। কিন্তু আমার বাড়ি কোথায়? কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না। আমি কেবল চোখের সামনে বিশাল বিশাল অট্টালিকা আর মানুষের দঙ্গল দেখতে পাচ্ছি। আমি বাগান আর আবুখোদা রাস্তার মাঝ বরাবর দিয়ে ছুটে যেতে চাইলাম। আবুখোদা রাস্তা পার হয়ে আমাকে বাড়ি পৌঁছতে হবে। কিন্তু মানুষের ভিড় আর অসংখ্য গাড়ির ভেতর দিয়ে আমি কিছুতেই আগাতে পারছিলাম না। আগুন নির্বাপণের গাড়ি তীব্র শব্দে হর্ন বাজিয়ে শামুকের গতিতে এগোচ্ছে। আমি নিজেকে বললাম আগুন লেগে সব পুড়ে যাক।’

প্রচণ্ড রকম বিরক্ত আর হতভম্ব হয়ে আমি ভাবছিলাম কখন আমি এই রাস্তা পার হতে পারব। দীর্ঘ সময় আমি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

তারপর পাশের লোহার দোকান থেকে একজন কর্মচারী আমার কাছে এলো। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে খুব নরম স্বরে আমাকে বলল, ‘ছোটো ভাই এসো আমি তোমাকে রাস্তা পার করে দিই।’

লেখক : অনুবাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares